বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ আগস্ট ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ১১টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৩৮

অসময়ের আগন্তুক

উপলব্ধি এপ্রিল ২০১৬

আমার ভয়

বৈরিতা জুন ২০১৫

মধ্যরাতের বৃষ্টিতে চার যুবক

ভালবাসি তোমায় ফেব্রুয়ারী ২০১৪

গ্রাম-বাংলা (নভেম্বর ২০১১)

মোট ভোট ৩৮ নুর ইসলামের টি স্টল

রাজিব হাসান
comment ৩৩  favorite ১  import_contacts ৫২৬
প্রতিদিন যাকে দেখতে হয়; সেই দাড়ি গোফওয়ালা লোকটির বয়স প্রায় ত্রিশ-পয়ত্রিশ হবে, কিন্তু দারিদ্রতা এবং সংসারের দায়িত্বে মনে হয় যেন ষাট-পয়ষট্টি বছর। নাম তার নুরইসলাম।
সকাল বিকাল এলাকার মানুষের আসর জমে ওঠে এই নুরইসলামের টি স্টলে। দিনরাতের মতো এটিও যেন বিধাতার কোন চিরন্তন নিয়ম। একমাত্র অবলম্বন জীবন ও সংসার চালানোর তার এই টি স্টল । তার উপর থাকে মাসের পর মাস বাকী পরে তবু নুরইসলাম মুখ ফুটে কখনও বলেনা "ভাই টাকাটা কবে দিবেন খুব বিপদে আছি!" অবশ্য সবার সাথে তার ভাব থাকায় কিছু দিন দেরী হলেও পাওনাটা পায় অবশেষে । কিন্তু সোহরাব টি স্টলের সোহরাবের হয় সমস্যা। একটাকা খেলেও দিনে সাত বার তার তাগাদা পরে "ভাই আমার টাকাটা তো দিলেন না,কামডা তো ভাল করলেন না।" সোহরাবকে নিয়ে মাঝে মাঝে কঠিন রসিকতা করা হয় । সোহরাব সেটা ভাল করে জানে। কখনও সোহরাবকে রুস্তম বলে ডাকা হয় তাতে অবশ্য সোহরাব মাইন্ড করে না। কিন্তু কথা একটাই "বাকী খাইতে পারবেন না" বলেই মুচঁকি হাঁসি দেয়। মুচঁকি হাঁসিতে সোহরাবকে অপূর্ব লাগে। ওরা প্রায়ই সোহরাবের সাথে মজা করে। লিটু প্রায় দু'মাস হলো ওর দোকানে ষোলো টাকা বাকী বাধিঁয়েছে। তাই সোহরাব কিছুটা কঠিন গলায় বলে "যানতো খালি নুরইসলামের দোকানে আমার এহানে কি? যান তার ধারে গিয়ে আড্ডা মারেন । আর লিটু মিয়ারে কইয়েন আমার ষোলো টাকা যেন্ দিয়া দেয়; ব্যাডায় বড় ভ্যাজাইল্লা।" অবশেষে কাতর কন্ঠে বলে "ভাই কিছু মনে কইরেন না, আহেন চা খাইয়া যান টিহা এ্যাহন না দিলেও হইবো "।
গ্রামের এমন টি স্টল ঘিরে মিশে থাকে ওদের মত একদল স্বপ্নহারা বেকার যুবকদের আনন্দ বেদনার গল্প। প্রাথমিক শিক্ষার পরে এসে মাধ্যমিক এ যখন সবাই জীবনের স্বপ্ন বুনতে শুরু করে তেমনি শিক্ষা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অজস্র যুবক ওদের মত বেকারত্ব আর হতাশার মাঝে ডুবে যেতে থাকে ক্রমাগত.........। তবু স্বপ্ন! বেঁচে থাকার.......।
যেদিন টি স্টল বন্ধ থাকে সেদিন ওদের আসর জমে ওঠে বাবলু'র ভিসিডির দোকানে। প্রায়ই বিবাদের সৃষ্টি হয় বাবলুর সাথে । ইদানিং বেশি লাভের আশায় দোকানে অশ্লীল সিডি বিক্রি করছে । সন্ধার পর তাই দোকানে ভীড় লেগেই থাকে। নিষিদ্ধ আকর্ষণে ছুটে আসে কিশোর যুবকরা । এর প্রতিবাদ স্বরূপ সেদিন লিটু,হাসান,মামুন গিয়েছিল স্থানীয় হাবিলদারের কাছে। কিন্তু প্রতু্যত্তরে হাবিলদার বলেছিল "আমার দ্বারা কি সম্ভব এগুলো দেখা; পরে ব্যাবস্থা নিব; আচ্ছা এখন তোমরা যাও।" সালা হাবিলদার সমাজের খারাপ কাজ দূর করতে পারবিনা তো হাবিলদার হয়েছিস কেন? সরকারের বেতন খেতে! তোদের বেতনের বদলে পাবলিক টয়লেটের মল খাওয়ানো উচিৎ। আর ডিউটি রেখে পারার ছোট-ছোট ছেলেদের সাথে সিগারেট টানবি। এই হলো তোদের কাজ। এ সকল নাজুক প্রশাসনের কারণে আজও দেশে চলছে অরাজকতা। এদের উস্কানি পেয়েই বাবলুর মত দোকানীরা মুচঁকি হেঁসে ব্যবসার নামে ছাত্র সমাজকে নষ্ট করে ফয়দা লুটে নিচ্ছে। হাসানের অবশ্য এই ভৃত্য সমেত প্রশাসনের উপর একটা ক্ষোভ গত বছরের ১৭ এপ্রিল থেকেই তৈরী হয়েছে! কারণ গত বছর ছোট বোনের যৌতুকের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বড় ভাই এখনও জেল হাজতে আছে। যৌতুক লোভী স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে রাহাতকে। প্রশাসন এটা জেনেও না জানার ভান করে এরেস্ট করে নিয়ে গেল! তারপর অনেক চেষ্টা.......ফলাফল অরণ্যে রোদন!
ভোর হলে সবাই বাসা থেকে বের হয়ে সেই টি স্টল । জমে ওঠে ওদের জীবনের প্রথম ভাগ। বাবা_মার টাকা চুরি করে চলতে হয় ওদের। তাই কিছুটা হিসেব থাকে নিজেদের মধ্যে। পূর্ন কাপ চায়ের বদলে অর্ধ কাপ চা। নাম তার 'সিংগেল কাপ চা'। দলের প্রায় সবাই হতাশার মধ্যে জীবন যাপন করে। তবু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নিজেদের নষ্ট হতে না দিয়ে সমাজটাকে শুদ্ধ করার। কিন্তু ক'জন মিলে একটা সমাজের পরিবর্তন ঘটানো এতটা সহজ নয় এটা ওরা ভালো করে জানে। তবুও চেষ্টা...............যেমন বিন্দু বিন্দু জলে মহাসাগরের জন্ম! মাঝে মাঝে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে লিটু গেয়ে ওঠে গান-

"আসলে কেউ সুখী নয়
সুখের এই পৃথিবীতে........"

প্রায়ই জোছ্না রাতে নদীর উপর বিশাল ব্রিজে লিটু, হাসান, জাফর, মামুন গন্জিকা আর ফেনসিডিল খেয়ে মাতাল হয়ে সুখ খুঁজে বেড়ায়। এই সুখ হলো সেই সুখ যে সুখ মানুষ প্রিয়জনকে হারিয়ে খোঁজে। নিষিদ্ধ নেশায় ডুবে থাকে ওদের কষ্টটা ভুলে থাকার জন্য। রাত বাড়ার সাথে সাথে নেশাটাও বেড়ে চলে ক্রমাগত..........ওদের সাথে আকাশে জেগে থাকা চাঁদ ও মাতাল হয়ে সারারাত জোছ্না বিলায় আর মিটিমিটি হাঁসে! নেশায় মাতাল মামুন হঠাৎ চিৎকার করে বলে ওঠে-"ওই সালার চাঁদ! চাইয়া চাইয়া কি দেখিস্; সাহস থাকে তো নাইম্মা আয়, এক বোতল ডাইল খাইয়া যাবি; আরাম পাবি। বেশি বেশি আলো দিতে পারবি। আর শোন! তুই তো সব দেখতে পারিস্, দেখিস্তো আমার দোস্তের একজন প্রিয় মানুষ হারাইয়া গেছে, খুঁজে পাস্ কিনা; নাম হইলো......নাম হইলো.....ধ্যাত! মনে পড়ছেনা..........যা সালার চাঁদ। আজ তোকে বিদায়..........।" এই বলে সবাই উচ্চস্বরে হেঁসে ওঠে হা .......হা ........হা ...............
গভীর রাতে দূরে শোনা যায় নারীর কন্ঠস্বর। মাঝে মাঝে বলে ওঠে "আরে করেন কি করেন কি.....মাইনশে দিইখ্যা ফালাইবো" পৃথিবীর প্রায় সকল নষ্ট কাজগুলো আধারে হয়ে থাকে। প্রকৃতিই বোধহয় নষ্ট কাজগুলো হবার জন্য আলাদা সময় দিয়ে থাকে। তাই দিনের পরে রাত আসে। ব্রিজের উপর মাতাল চোখে ওরা দেখে চিনতে পারে সেই সকল লোকগুলো। সেই হোমিও ডাক্তার, নৈশ্য প্রহরী, স্কুল মাস্টার সহ আরও অনেককে। যারা দিনের শেষে রাতের আধারে ডুবে থাকে বেশ্যার কোলে সুখের খোঁজে। পৃথিবীতে মানুষের মত সুখেরও ভিন্নতা আছে। এই সুখ হলো "নষ্ট সুখ"। যা শুধু ভদ্রবেশী নষ্ট মানুষের জন্য প্রয়োজন। অন্য কারো নয়। ভদ্র মানুষগুলোকে রাতের আধারে অভদ্র পাড়ায় ঘুড়াঘুড়ি করতে দেখে ওদের ভীষণ কষ্ট হয়। তাই ব্রীজের উপর থেকে জাফর চিৎকার করে বলে ওঠে "ভাই কই যান; রাত্তিরে চাম করা ভাল না। এইড্স হইয়া যাইবো" ভদ্র মানুষগুলো দ্রুত তাদের আধারের চাদরে লুকিয়ে ফেলে। তখন মদের বোতলে চুমুক দিয়ে একসাথে গেয়ে ওঠে ওরা

"মীরাবাঈ...হেইলা দুইলা...হেইলা দরবার নাচায়....
ঝাকানাকা ঝাকানাকা ঝাকানাকা.....
দেহ দোলা না"

আধার শেষে নষ্ট দেহটাকে ঢেকে দেয় ভদ্র পোশাকে। ওরা প্রতিবাদ করতে পারেনা। ওদের মত প্রতিবাদী সমাজে নগণ্য।
প্রতিদিন এভাবেই সকাল দুপুর সন্ধা কেটে যায় নুরইসলামের টি স্টলে আড্ডা মেরে আর মাঝেমাঝে শুনতে হয় তার দু:খের ইতিহাস। কিভাবে তার ছোট মেয়ে যৌতুকের নির্মমতায় প্রাণ হারালো,কিভাবে তার সত্রী তাকে রেখে পালিয়ে গেল! হঠাৎ সবার মন গভীর শোকে ভারী হয়ে যায় নুরইসলামের চোখে জল দেখে।
রাত নামার সাথে সাথে আবারো বিষন্নতায় মেতে ওঠে ব্রিজের উপর সকলে। তবে আজ ওরা একত্র হয়েছে নিজেদের জন্য নিজেরাই কিছু একটা করার পরিকল্পনা নিয়ে। আজও সেই পরিচিত কালো দৃশ্য। তবু চেয়ে চেয়ে দ্যাখে আর মাতাল কন্ঠে বলে ওঠে ওরা "ওই সালার নষ্টের দল! সমাজটাকে সুস্থ্য করতে পারিস্না; তোরাই তো নষ্টের মূল। যা সালা! রাত্তিরে বেশ্যার লগে চাম না কইরা বাড়ি গিয়া বাত্তি নিভাইয়া বউ'র লগে ঘুমা। জানিস্না ঈযধৎধপঃবৎ রং ষড়ংঃ বাবৎুঃযরহম রং ষড়ংঃ. সালা শু...য়ো...রের বাচ্চা"। ব্রীজের উপর হাসিতে উন্মাদ হয়ে পড়ে সবাই। ওদের মন আজ শান্ত! অজানা,অচেনা কিংবা উদ্দেশ্যহীন এক শান্তি। আকাশে চাঁদটাকে আজ ভীষণ আপন আপন লাগছে। যেন ছোট বেলায় মায়ের কোলে মাথা রেখে গল্প শোনার অনুভূতি! একে একে সকলে দাড়িয়ে হাটতে শুরু করে গন্তব্যের খোঁেজ গন্তব্যহীনভাবে! চলতে চলতে সকলে চিৎকার করে রাতের নিরবতায় গেয়ে চলে.....

'আজকে রাতে তুমি অন্যের হবে
ভাবতেই জলে চোখ ভিজে যায়
এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়.....'


উৎসর্গ:
যারা আমাদের প্রতিটি গ্রামকে সুন্দর, মাদকমুক্ত,অন্যায়মুক্ত রাখতে চায়, রাখতে চায় পুত:পবিত্র; যেসকল সমাজসচেতন সমাজপতিরা নিজেদের চোখের তারায় দেখতে পায় পবিত্র প্রিয় মাতৃভূমিকে; ঠিক মায়ের মত করে !!!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • রাজিব হাসান
    রাজিব হাসান ওয়াছিম এবং প্রজাপতি মন : দিনের আলোতে আমরা কখনো রাতের দৃশ্য গুলো দেখতে পারিনা তাই একদল যুবকের হাতে এই সামান্য সময়ের জন্য নেশা তুলে না দিলে কি কখনো আমরা জানতাম আসলেই কি হয় রাতের আধারে......???
    স্বপ্নহারা একদল প্রতিবাদী যুবক সাময়িক ভাবে নেশাখোর হলেও ইচ্ছে শ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৪ নভেম্বর, ২০১১
  • তানি হক
    তানি হক খুব ভালো লাগলো ... আপনাকে ধন্যবাদ
    প্রত্যুত্তর . ২৫ নভেম্বর, ২০১১
  • রাজিব হাসান
    রাজিব হাসান tani hoqe : ধৈর্য পরীক্ষা দেয়ার জন্য ধন্যবাদ.....গল্প পড়া সত্যি ধৈর্যের বিষয়.......
    প্রত্যুত্তর . ২৫ নভেম্বর, ২০১১