বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ মার্চ ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ৪টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৪৩

মা (মে ২০১১)

মোট ভোট ৪৩ মরীচিকা প্রসূত

রাহাত
comment ২২  favorite ০  import_contacts ৩১৬
ফ্ল্যাশ মারার কারণে একটু কুঁচকে গেছে চোখ দুটো । তাও মুখের দুষ্টু হাসিটা ধরে রেখেছে। যেটা ম্লান করে দিয়েছে পেছনের নদী আর আকাশের অংশটুকু।
ছেলেটির ছবির দিকে এক সমুদ্র তৃপ্তি নিয়ে অপলক তাকিয়ে আছেন মিসেস নার্গিস আক্তার। ধীরে ধীরে ঠোটের কোণে ফুটে উঠছে মুচকি হাসি। আবার হঠাৎ করে সেটা উবে যাচ্ছে কোন এক অজানা আশঙ্কায়। অনেক যত্ন করে ছবিটার উপর হাত বুলিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলেন।
হঠাৎ করে যেন বড় হয়ে গেলো ছেলেটা।
রণ-র এই বড় হওয়াটা তিনি বুঝতে পেরেছেন আজ কলেজ থেকে ফেরার পথে। তিনি দেখলেন একটা কারে করে তার রণ যাচ্ছে; পাশে তার সম বয়সী অপরূপ একটি মেয়ে। মেয়েটিকে তিনি চেনেন। তিথি- রণর সাথেই পড়ে। ওরা খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু কথা এখানে নয়। কথা হচ্ছে এধরনের দৃশ্যে বিশেষত্বের কিছু কখনো দেখেননি মিসেস নার্গিস আক্তার। কিন্তু আজ দেখেছেন। কারণ আজ গল্প করতে বসে তার এক কলিগ মিসেস শাহানা বেগম এক পর্যায়ে বলে বসেছেন, যে প্রায়-ই দেখা যায় বিয়ের পর ছেলেরা পর হয়ে যায়। তখন স্ত্রী-ই তাদের সবকিছু। মায়ের কথা চিন্তা করার তাদের সময় থাকে না।
কথাটা খুব সাবলীল হলেও মিসেস নার্গিস আক্তার রীতিমত চমকে উঠেছেন। ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু তিনি এরকম মানুষ নন। কারো কথায় কর্ণপাত করে দুশ্চিন্তা করার মানুষ তিনি নন। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। আজ কথাটা উঠবে আর আজ-ই তার চোখে পড়বে এরকম দৃশ্য?
রণ-র বাবা মারা গেছে, আজ প্রায় আঠার বছর হতে চললো। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একটি বারের জন্যেও রণকে বুঝতে দেননি তার অপূর্ণতার কথা। ওর যে বাবা নেই এধরণের কোন প্রশ্ন কখনো তাকে শুনতে হয়নি।
শুধু তাই নয় রণ এখনো বিশ্বাস করে যে তার মা-ই তার সব। রণ তার বাবার সম্বন্ধে সব কিছু জানে। তবুও রণ তার মা-বাবাকে দুটো আলাদা অস্তিত্ব হিসেবে মনে করে না। মায়ের মাঝেই সে তার বাবার প্রতিবিম্ব খুঁজে পায়।
মিসেস নার্গিস আক্তার খুব ভালো করেই তা জানেন। কিন্তু আজ হঠাৎ এমন লাগছে কেন? প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে বুকের ভেতরটায়। ব্যাপারটা ভুলে থাকার জন্য বিকেল থেকে সন্ধ্যা সাতটা অবধি নিজেকে ব্যস্ত রাখলেন সংসারের নানাবিধ কাজে। তারপর কলিঙবেলের আওয়াজ শুনতেই তার মুখে ফুটে উঠলো পরম স্বস্তির হাসি।
দরজা খুলতেই ভেতরে হুরমুর করে ঢুকে পড়লো ছেলেটি, কানে ফোন। অনবরত কথা বলেই চলেছে। মাকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিলো রণ।
মুখে হাসিটা ধরে রেখেই ছেলেকে পর্যবেক্ষণ করছেন মা। প্রতিদিনের মত আবারো তার মনে পড়ে গেলো, রণ অবিকল ওর বাবার মত হয়েছে। একই শারীরিক গড়ন, চেহারা, হাটার ভঙ্গিমা, উত্তেজনা সবকিছু।
বাইরের দরজা লাগিয়ে তিনি আবার কাজে মন দিলেন। রণ-র ঘর থেকে ওর অবিরাম কথা এখনো কানে আসছে তার।
হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই কি যেন মনে হতে রণ-র ঘরের দিকে রওনা হলেন তিনি। ঠিক দরজাতে রণ দাড়িয়ে।
‘আমি জানতাম মা, ঠিক এ সময়টাতেই তোমাকে এখানে পাবো’।
‘খাওয়া-দাওয়া করেছো?’
‘হুম। তাড়াতাড়ি চলো, খাওয়া-দাওয়ার কথা বাদ। আগে আমাদের বাজির খেলাটা শেষ করি। আজ তোমাকে আমার হারাতেই হবে। কাল তোমার কাছে হেরে গিয়ে রাতে আমার ঘুমই হয়নি।’
মা নার্গিস আক্তার ছেলের সুন্দর চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললেন, ‘তুমি ঘুটিগুলো সাজাও আমি কফি করে নিয়ে আসি।’
‘ওকে।’
কিছুক্ষণপর ড্রইং রুমের সোফায় মা-ছেলেকে পাওয়া গেলো গভীর চিন্তামগ্ন অবস্থায়। দুজনেরই কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সেদিকে তাদের খেয়াল নেই। মাঝখানে দাবার ছকের উপর এলোমেলোভাবে সাজানো ঘুটিগুলো দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে আছে দুজনেই। মাঝে মাঝে রণ তার ঘুটিগুলোর দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে আবার সরিয়ে নিচ্ছে। মিসেস নার্গিস আক্তার কিছুক্ষণ পর পর একটি দুটি চাল দিচ্ছেন। রণ-র ভ্রু আগের চেয়ে আরো কুঁচকে উঠছে। হঠাৎ রণর চেহারাটা হাসিতে ভরে গেলো। একটা ছোট্ট চাল দিয়েই সোফা ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠলো। তারপর ধেই ধেই করে নাচতে লাগলো।
মিসেস নার্গিস আক্তার ভ্রূকুটি করে তাকিয়ে আছেন ঘুটিগুলোর দিকে। তার চেহারায় পরাজয়ের গ্লানি। দু’দিকে মাথা দোলাচ্ছেন।
‘ইসস! খেয়াল-ই করিনি।’ বলে হাসিমুখে তাকালেন ছেলের দিকে।
রণ তখনো লাফিয়ে চলেছে।
‘হুম, এবার আমার পুডিং, আমার পুডিং।’ নাচানাচি থামিয়ে রণ বলতে লাগলো বাজির কথা।
‘তৈরিই আছে। চল।’
‘ও তারমানে তুমি আগেই জানতে যে আজ হারবে! নটি মম।’ সুর করে বলে মায়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে চললো ডাইনিং টেবিলের দিকে।

সেদিন রাত এগারটার দৃশ্যও গত দিনগুলোর চেয়ে ব্যতিক্রম নয়। ড্রইং রুমে দু’জন বসে আছে টিভির সামনে। টিভিতে একটা ইংলিশ মুভি চলছে। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে ওরা। মাঝে মধ্যে দু-একটি কথা বলছে। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লো রণ মায়ের কাঁধে মাথা রেখে।
মুভি শেষ হয়ে গেছে। মিসেস নার্গিস আক্তারের চোখ এখনো টিভি পর্দায়। কিন্তু তার মন অন্য খানে।
দুটো দিনকে আলাদা করে ভাবতেই পারেন না মিসেস নার্গিস আক্তার। আজ, গতকাল; তার আগের দিন, একই রকম দৃশ্য। ঠিক একই রকম দৃশ্য ছিলো রণ-র জন্মের আগেও। তখন সারাদিন অফিস শেষে রণ-র বাবা বাসায় আসতেই শুরু হতো তাদের আড্ডামুখর সময়। মুভি দেখা, খেলাধূলা, গান শোনা সবি হতো। মাঝে মধ্যে রাত দশটার পর ছাদেও উঠতো। এখন রণর বাবার পরিবর্তে রণ। মিসেস নার্গিস আক্তার ভাবলেন, নিজেকে দোলন ঘড়ির কেন্দ্রবিন্দুর মত মনে হচ্ছে। তাকে ঘিরেই যেন সব ঘটনাগুলো এপাশ থেকে ওপাশে দোলছে। কখনো সকাল, কখনো সন্ধ্যা, কখনো রাত। শুধু তার পাশের মানুষগুলোর মাঝে এসেছে একটু পরিবর্তন।
তার এখনো মনে পড়ে, রণর বাবার সাথে প্রায়ই তাস খেলা হতো। রণ যখন পেটে, তখন ওর বাবা একা একাই খেলতো। বলতো, ‘এখন আমি তোমারটা খেলে দিচ্ছি, আমার পাটনার আসার পর কিন্তু আমার হিসেবের কড়ায়-গন্ডায় ফেরত চাই’। তিনি বলতেন, ‘ও তোমার পার্টনার হবে না, আমার পার্টনার হবে’। ওর বাবা তর্ক করতো, ‘কিছুতেই না আমার ছেলে আমার পার্টনার-ই হবে। আমরা দুজনে মিলে তোমাকে হারাবো’। তিনি নিজেও গোঁ ধরে থাকতেন। তার ছেলে তার হয়েই খেলবে। তখন ওর বাবা তার পেটের দিকে তাকিয়ে বলতেন, ‘আচ্ছা ডিয়ার, তুমিই বল, তুমি কার দলে, আমার; না তোমার মায়ের?’
মিসেস নার্গিস আক্তারের চোখ টলমল করে উঠলো। ঘাড়ের কাছে ছেলের গরম নিঃশ্বাস পড়তেই তিনি ছেলেকে নিয়ে উঠে দাড়ালেন। ছেলের বা হাতটা নিজের ঘাড়ের উপর দিয়ে ঘুড়িয়ে নিয়ে ছেলেকে ভালভাবে ধরে রাখলেন যেন পড়ে না যায়। ছেলের ঘরের দিকে যেতে যেতে মনে পড়লো, যখন ওর বাবা ছিলো তখন ওরা তিনজন এখানটায় বসে টিভি দেখতো। রণকে রাতের খাবার খাওয়ানোর পর ঘুমিয়ে গেলে তিনি নিজেই কোলে করে ঘরে নিয়ে যেতেন। এখন ছেলে বড় হয়েছে। এখনো মাঝে মধ্যে এভাবে ঘুমিয়ে পড়ে। এখনো যেন সেই ছোট্ট রণটাই আছে।
রণকে শুইয়ে দিয়ে এসে ওরা আবার ড্রইং রুমে বসতো। মধ্য রাত পর্যন্ত চলতো তাদের গল্প।
রুণকে ওর বিছানায় শুইয়ে ড্রইং রুমে এসে টিভির সামনে বসলেন তিনি। কিন্তু টিভির দিকে তার মন নেই। মিসেস নার্গিস আক্তার ভাবছেন, রণ শুধু তার সমস্ত ভালবাসার কেন্দ্রবিন্দুই নয়; বরং তার নির্ভরতার প্রতীক, পরম শান্তির আশ্রয়স্থল।
মাঝে মাঝে কলেজে কাজের চাপ বাড়লে ফিরতে একটু দেরী হয় তার। বাসায় ফিরে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাও রণকে বুঝতে দেন না। তাদের খেলা, টিভি দেখা, আড্ডা দেয়া সেদিনো চলে। তবে তিনি একটু অন্য মনস্ক থাকেন। এগারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন। কখনো ডাইনিং টেবিলে, কখনো ড্রইংরুমে। কিন্তু প্রতিবার-ই ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে খুঁজে পান নিজের ঘরে নিজের বিছানায়। অবাক হয়ে যান তিনি।
ভেবে তার চোখের নিচে গন্ডদেশের শুকনো পথটা ভিজে উঠলো। একটা পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

পরদিন বিকেলের আবহাওয়াটা নার্গিস আক্তারের মুডটা একেবারে খারাপ করে দিলো। কলেজের গেটে কেবল এসেছেন আর অমনিই শুরু হলো ঝমঝমে বৃষ্টি। যদিও আগে থেকে গম্ভীর আকাশটা একটু একটু জানান দিচ্ছিলো। কলিগরাও খুব করে থাকতে বলেছিলো কিন্তু তিনি থাকবেন না; জাবেন-ই। কারণ ওদের আলাপচারিতা তার ভালো লাগে না। শুধু অপরের দোষ বিচার করে নিজের দুঃখটাকে জাহির করার অপচেষ্টা। কিন্তু এখন তো না থেকেও আর উপায় নেই। এই বৃষ্টিতে তিনি গেট থেকেই বেরুতে পারবেন না। তাই বাধ্য হয়ে করিডরে গিয়ে অন্যদের সাথে মিলিত হলেন। তারপর একটু বিরতি দিয়েই শুরু হলো সেই অস্বস্তিকর আলোচনা। একজন
বয়স্ক মহিলা তো কাঁদতেই শুরু করে দিলেন। নাক ঘষতে ঘষতে বলতে লাগলেন, ‘শিক্ষকতাটা করছি তাই রক্ষা, নইলে তো বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে পোঁচতে হতো’। সবাই তাকে শান্তনা দিতে লাগলেন। ‘কি আর করা, এই তো এযুগের নিয়ম’- আরেকজনের দীর্ঘঃশ্বাসের সাথে বেরিয়ে এলো কথাটি।
নার্গিস আক্তার নাক সিটকালেন। তার ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে এই শিক্ষিত মহিলাগুলো কি করে পারে এভাবে চিন্তা করতে! এদের আর মধ্যযুগের কুসংস্কারাচ্ছন্ন নারীদের মধ্যে তো কোন পার্থক্যই নেই!
ধীরে ধীরে বৃষ্টি কমে আসলো। এখনো টিপ টিপ পড়ছে। তিনি সবাইকে বিদায় জানিয়ে কোন রকম পালিয়ে বাঁচলেন। গেট পেরিয়ে কিছু দুর হেটে গেলেন। প্রতিদিন যেখান থেকে রিক্সা নেন সেখানে এসে দাড়াতেই এক বৃষ্টি ভেজা শীতল বাতাস তার মনটাকে নাড়া দিয়ে গেলো। ভালো হয়ে গেলো মনটা। টের পেলেন টিপ টিপ এই বৃষ্টির মধ্যে পিচঢালা পথটা হাটতে তার ভালই লাগছে। চারপাশে তেমন মানুষজন নেই, গাড়ি-ঘোড়াও কম। দু’তিনটা রিক্সা খুব দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে। না, আজ আর রিক্সায় নয়; হেটেই যাওয়া যাক।
হাটতে হাটতে ভাবছেন আর ক্রমেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন নার্গিস আক্তার। আজ তারিখ ১৫ জুন। মনে পড়ে যাচ্ছে, রণর বাবা আর তিনি এরকম বর্ষণমুখর দিনে কত হেটেছেন, কত হারিয়ে গেছেন পথ থেকে পথে, দিক থেকে দিগন্তরে! এখন ওগুলো শুধুই স্মৃতি।
হঠাৎ করে তার মন আবার ছেঁয়ে গেলো কিছুক্ষণ আগে উপেক্ষা করে আসা কথাগুলোতে। ওদের কথা কি আসলেই সত্যি! সন্তানরা কি পারে?.....এতটা.....নির্মম হতে?
হঠাৎ একটি রাস্তার বাঁকে এসে তিনি দাড়িয়ে পড়লেন। এই পথটা তার খুব ভালো লাগে। মাঝে মাঝে মন খারাপ থাকলে তিনি এ পথে বাড়ি যান। এ পথে রণর বাবা আর তিনি অনেক এসেছেন। পাশের ফুলের দোকানটা ওদের খুবই পরিচিত। আগের সেই বিক্রেতা আনান ভাই আর নেই। এখন তার ছেলে জয় ক্লাসের ফাঁকে মাঝে মধ্যে বসে। রণর সাথেই পড়ে। ওর খুব ভালো বন্ধু। ফুলগুলো কিন্তু আগের মতই সুবাস ছড়ায়।
ফুল কেনার কথা মনে হতেই তিনি পা বাড়ালেন সেই ফুলের দোকানটার দিকে। আর মানসপটে ভেসে উঠলো সেদিনের ছবিগুলো। ওগুলো যেন জীবন্ত! রণর বাবা আর তিনি হাত ধরাধরি করে ফুলের দোকান থেকে ফুল কিনে বেরুচ্ছেন। কল্পনায় বিভোর হয়ে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু.... না ওটা কল্পনা নয়। আসলেই ওখানে এক জোড়া ছেলেমেয়ে হাত ধরাধরি করে হাসতে হাসতে বেরুচ্ছে। দুজনের হাতেই ফুল। প্রাণবন্ত দৃশ্যটার দিকে তিনি কয়েক মুহুর্ত নির্বাক তাকিয়ে রইলেন।
হঠাৎ আচমকা তার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেলো। স্বপ্ন থেকে যেন তিনি বাস্তবে ফিরে এলেন। আবিষ্কার করলেন, সেই ছেলেমেয়ে দুটো আর কেউ নয়। রণ আর তিথি। একটা দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেলেন তিনি। ওদেরকে দেখে তার একই সাথে খুব ভালো লাগলো আবার কষ্টও লাগলো। কিন্তু কষ্টটা কেন তা বুঝতে পারলেন না। মনে হচ্ছে তার ছোট্ট পৃথিবীটা থেকে রণ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তার শূন্য দৃষ্টির সামনে থেকে কখন ওরা অদৃশ্য হয়ে গেছে টেরই পাননি তিনি। চারপাশ তাকালেন। ওদের আর খুঁজে পেলেন না। নিজেকে কেমন যেন প্রচন্ড নিঃস্বঙ্গ মনে হলো।

সেদিন বাসায় গিয়ে দেখলেন দরজা আনলক করা। নিশ্চই রণ আগে চলে এসেছে। কলিঙবেল টিপতেই দরজা খুলে ওপাশে যে মুখটি ঊঁকি দিলো তাকে দেখে চমকে গেলেন নার্গিস আক্তার। মন ভোলানো হাসি নিয়ে কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে তিথি। নার্গিস আক্তার বুঝতে পারলেন না, তার কি হয়েছে। ও তো আগেও এখানে এসেছে। তখন তো এরকম লাগেনি। তিথিকে কিছু বুঝতে না দিয়ে একটা ইতস্তত হাসি উপহার দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন তিনি।
‘ক্যামন আছো তিথি, কখন এলে..?’
‘এই তো আন্টি, মাত্র এলাম। আপনাকে কিছুটা ক্লান্ত লাগছে!’
‘কিছুটা নারে মা...অনেকটাই ক্লান্ত। বৃষ্টির মধ্যে রিক্সাই পাইনি, সারাটা পথ হেটে আসতে হয়েছে।’
তাল মিলিয়ে মিথ্যেটা বললেন ঠিক-ই কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারলেন না।
‘তোমরা কিছু খেয়েছো? রণ কোথায়?’
‘ওর রুমে আছে। আন্টি আপনার কিছু লাগবে। জুস করে দিই।’ চট করে বলে বসলো তিথি।
‘তুমি বসো, আমি বানিয়ে খাচ্ছি।’
‘আহা...! আপনি বসেন না। আমি জুস বানাতে পারি।’
‘সেতো আমি জানিই ডিয়ার।’ অবশেষে নাছোরবান্দা মেয়েটাকে ওর কাজে ছেড়ে দিয়ে ড্রইরুমের সোফার দিকে এগুলেন নার্গিস আক্তার।
সোফায় বসতেই পাশে দেখলেন অনেকগুলো ফুল। ফুলগুলোর নীচে একটা সিডি। সিডিটা কলকাতা বাংলা গানের। সিডি উল্টিয়ে দেখলেন মৌসুমী ভৌমিক, লতা মঙ্গেশ্কর, হৈমন্তী শুক্লা, স্রেয়া ঘোষাল প্রমুখ সহ আরো কিছু নামকরা কলকাতা শিল্পীদের গানের শিরোনাম লেখা। সবগুলোই তার প্রিয়।
কিছুক্ষণ পর তিথি জুসের গ্লাস হাতে এসে সামনের টি টেবিলটাতে নামিয়ে রাখলো। আর যেমনিই চোখ পড়লো নার্গিস আক্তারের হাতের দিকে অমনিই তার হাত থেকে একরকম কেড়ে নিয়েই সিডিটা দু’হাতে চেপে পেছনে লুকিয়ে ফেললো। তারপর ফুলগুলোও তুলে নিলো। এমন সময় ড্রইং রুমে এলো রণ।
‘কি ব্যাপার আম্মু......।’ তিথির দিকে তাকিয়ে থমকে গেলো রণ।
নার্গিস আক্তার টের পেলেন ওরা চোখে চোখে ইশারা-ইঙ্গিতে কি যেন বলছে।
হঠাৎ তিথির যেন কি হলো। পাশের সোফা থেকে নিজের ব্যাগটা উঠিয়েই বাইরের দরজার দিকে দৌড়ে গেলো। যাবার সময় বলে গেলো, ‘প্লিজ আন্টি, জুসটা খেয়ে নেন।’
নার্গিস আক্তার সোফার উপর দিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলেন, রণ চোখে রাগ নিয়ে কটমট করে এগিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।
যখন ফিরে এলো তখন নার্গিস আক্তার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি রণ, কোন সমস্যা?’
প্রত্যুত্তরে শুধু ‘কিছু না মম্’ বলেই নিজের ঘরে চলে গেলো। নার্গিস আক্তারও আর কিছু বললেন না। তবে অজানা এক ক্ষোভ হঠাৎ করে তার মনে দানা বাধতে শুরু করলো।
সন্ধ্যার পর নার্গিস আক্তার নিজে থেকেই সহজ হবার চেষ্টা করলেন। সবকিছু দ্বিধাগ্রস্ত ভাব কাটিয়ে আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু বিকেলের কথা জিজ্ঞেস করতেই রণ একথা-সেকথা বলে পাশ কাটিয়ে গেলো।
‘রণ, তুমি কখনো আমার কাছে কিছু লুকাওনি। কিন্তু এখন তুমি চেপে রাখছো কেন? কোন সমস্যা হলে শেয়ার করো। আমিও তো কোন সমাধান দিতে পারি!’ আপ্রাণ চেষ্টা করলেন নার্গিস আক্তার ছেলের মনের ভেতর ঢোকার জন্য।
‘আম্মু, একটা তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে কেন তুমি এতো মাথা ঘামাচ্ছো? এটা তেমন কোন জটিল ব্যাপার নয়। একান্তই আমাদের ফ্রেন্ডদের ব্যাক্তিগত ব্যাপার। তোমাকে বলা গেলে তো অবশ্যই বলতাম। প্লিজ মম্, বাদ দাও।’
নার্গিস আক্তারের চোখের সামনে সবকিছু যেন ঘোলাটে হয়ে গেলো। চারপাশের রঙ-বেরঙের আলোগুলো যেন সব কৃষ্ণ গহ্বরে মিলিয়ে গেলো। নিরাশার বড় বড় ঢেউগুলো চারপাশ থেকে তাকে আঘাত করতে লাগলো। নিজেকে মনে হলো অথৈ সমুদ্রে এক টুকরো কাঠ।
তখন থেকে বাকশূন্য হয়ে বাকিটা সময় কাটালেন। একসাথে বসে রাতের মুভি দেখা হলো ঠিকই কিন্তু খেলা হলো না। হলো না প্রতিদিনের জমজমাট আড্ডা। অবশেষে অজানা কারো প্রতি প্রচন্ড বিতৃষ্ণা আর ক্লান্তি নিয়ে ড্রইং রুমের কার্পেটে বসে সোফায় মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি।
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে নিজেকে যথারীতি নিজের বিছানায় পেলেন। প্রচন্ড ভয় লাগছে তার। খুব একা একা লাগছে। রণর বাবার মৃত্যুর পর এমনটা আর কখনো লাগেনি। প্রচন্ড ঘেমে উঠেছেন। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। বেড সাইট টেবিলে এক গ্লাস পানি প্রিচ দিয়ে ঢাকা ছিলো। এক নিঃশ্বাসে ওটা খালি করে ফেললেন।
উল্টো-পাল্টা নানা রকম চিন্তা এসে ভর করলো মনে। রণ আর তিথির মধ্যে নিশ্চই একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু..... কিন্তু থাকুক না। থাকলেই বা কি। তিথি খুব ভালো একটা মেয়ে। ওর বাবা-মা তার সুপরিচিত। তাছাড়া ওরা প্রাপ্ত-বয়স্ক। নিজেদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার ওদের অবশ্যই আছে। কিন্তু ....কিন্তু.....আমার রণ....ওকে ছাড়া.....।
আর ভাবতে পারলেন না তিনি। স্থির করলেন, কাল-ই দেখা করবেন তিথির সাথে। কিন্তু কি বলবেন তা এখনো জানেন না।
পরদিন কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে আগে আগে বের হয়ে এলেন নার্গিস আক্তার। ধানমন্ডি লেকের পার্কের এক জীর্ণ বেঞ্চিতে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন তিথির জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রায় তাড়াহুড়ো করে এসে তার সামনে দাড়িয়ে হাপাতে লাগলো তিথি।
‘কি আন্টি....কি ব্যাপার বলুনতো?’
‘তোমার ক্লাসের কোন সমস্যা হবে না তো?’
‘সে তো অনেক দেরী। এখন সবে মাত্র এগারটা, ক্লাস সেই দুইটায়। আপনি বলুন’। বলে বসে পড়লো তার পাশে।
‘দেখো মা, আমি বয়স্ক মানুষ। তোমাদের মত করে সবকিছু আমি বুঝতে পারি না। হয়তো পারি না মেনে নিতেও। তোমাদের কাছে যা খেলা আমার কাছে তা গুরুত্বপূর্ণও হতে পারে। আমি কি বলছি তুমি কি তা বুঝতে পারছো?’
‘উমমম...না আন্টি...!’ তিথি এখনো নির্লিপ্ত। বুঝতে পারছে না ওর কি বলা উচিত।
‘তুমি তো জানো রণ ছাড়া এ দুনিয়াতে আমার আর কেউ নেই। ওকে ছাড়া আমি এক মুহুর্তও থাকতে পারবো না।’
খুব ধীরে ধীরে কথাগুলো বলে থামলেন নার্গিস আক্তার।
‘হুমম, কিন্তু আন্টি....একথা কেন বলছেন...? আর এভাবে..?’ তিথি বিঃশ্বাস করতে পারছে না। কারণ ও সব সময় দেখে এসেছে তার স্পষ্টভাষী আচরণ। একজন শিক্ষয়িত্রী হিসেবে তাকে খুব সহজ, নীতিবান এবং বাস্তববাদী বলে জেনে এসেছে সে। কিন্তু আজ তার এ রূপ.. কিছুতেই বুঝতে পারছে না।
‘তুমি রণকে ভালবাসো, তাই না তিথি..?’ অবশেষে বলে ফেললেন তার হৃদয় গহীনের কথাটি যেটা তার যন্ত্রণার একমাত্র কারণ।
তিথির ভাব-ভঙ্গিমায় এখনো দ্বিধান্বিত নার্গিস আক্তার। তিথিকে তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান জানেন। কিন্তু এখন ওর চোখের বোকা বোকা চাহনী তাকে সন্দিহান করে তুলছে।
‘তুমি বলো, তিথি, রণ তোমাকে ভালবাসে। তোমরা একে অপরকে ফিল করো না? বলো, বলো তিথি; চুপ করে থেকো না।’
তিনি দেখলেন ক্রমেই তিথির সুন্দর নিষ্পাপ মুখটার সাদা আকাশটা কালো মেঘে ছেয়ে গেলো। ধীরে ধীরে অশ্রুসজল হয়ে উঠলো ওর সুন্দর চোখদুটো।
‘আন্টি, এ আপনি কি বলছেন?’ কান্না রুখে কোন রকম বলতে পারলো কথাকটি সে।
‘হ্যা, এটাই ঠিক। আমি তোমাদেরকে বুঝি..।’ এ বলে প্রমাণ দেখাবার মত কিছু ঘটনার কথা বললেন। যে কথাগুলো শুনে তিথি বাচ্চা মেয়েদের মত কেঁদে উঠলো।
তার সাথে নার্গিস আক্তার আরো জুড়ে দিলেন, ‘রণ সব কিছু আমার সাথে শেয়ার করে কেবল তোমার কথা ছাড়া। সবার কাছে যা যা শুনি এখন তার চাক্ষুষ করতে পারছি আমি। আমি সহ্য করতে পারছি না তিথি। তুমি...তুমি আমার ছেলেকে কেড়ে নিয়ো না তিথি। কেড়ে নিয়ো না। ও আমার একমাত্র অবলম্বন। তুমি একটু...।’
এবার বাধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়লো তিথি। যেন মায়ের বকুনি খেয়ে কাঁদছে। নার্গিস আক্তারকে আর বলতে না দিয়ে ও কান্না ভেজা কন্ঠে অনুনয় করে উঠলো, ‘প্লিজ আন্টি.... চুপ করুন....প্লিজ চুপ করুন।’
আর কিছু বেরুলো না কম্পিত অধর জোড়ার ফাঁক গলে। দ্রুত উঠে দাড়িয়ে হন হন করে হেটে চলে গেলো তিথি। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নীচে তাকালেন নার্গিস আক্তার। প্রচন্ড অনুতাপে দু’ফোটা অশ্রু বের হয়ে গড়িয়ে পড়লো তার দৃষ্টি পথে।
সেদিন রাত দশটায় মুখ ভার করে বাসায় ঢুকলো রণ। মা জিজ্ঞেস করাতে একটা দায়সারা গোছের জবাব দিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো। সেদিকে করুণ চোখে তাকালেন নার্গিস আক্তার। সেদিন খেলা হলো না, মুভি দেখা হলো না আর আড্ডা তো অপ্রাসঙ্গিক। মা নার্গিস আক্তার একাই বসেছিলেন ড্রইং রুমে টিভি বন্ধ করে। ছেলে আসছে না দেখে উঠে গিয়ে রুমে ঢুকলেন। দেখলেন রণ ঘুমিয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পাশে বসে মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলাতে লাগলেন। হঠাৎ সকালের পুরো অনুতাপটুকু তার অশ্রু ফোটা হয়ে গড়িয়ে পড়লো ঘুমন্ত ছেলের গালে। সেদিকে তার খেয়াল নেই। কিছুক্ষণপর উঠে দাড়িয়ে নিঃশ্বব্দে চলে গেলেন ঘর ছেড়ে।
মা চলে যেতেই রণ চোখ খুললো। ঘুমের ভান করে এতক্ষণ পড়েছিলো ও। গালের উপর অশ্রু ফোটাটা আঙ্গুল দিয়ে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করলো। ফোটাটা আঙ্গুল থেকে বালিশে পড়ে মিলিয়ে গেলো কাপড়ে। রেখে গেলো রণর আঙ্গুলে কিঞ্চিত ভেজা অংশ। সেদিকে তাকিয়ে অনেক কষ্টে সে কান্না রুখলো।

পরদিন গতানুগতিকভাবে মা নার্গিস আক্তার প্রথমে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। যাবার আগে ছেলেকে এক নজর দেখে যেতে ভুলেননি। কলেজে প্রচন্ড ব্যস্ততায় ডুবে থাকলেন। বাইরে বের হতেই দেখলেন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। খুশি মনে তার সেই প্রিয় পথের দিকে হাটতে শুরু করলেন। সেই ফুলের দোকানটির সামনে এসে দাড়ালেন। দেখলেন দোকান বন্ধ। একটু মন খারাপ হলো। আজতো বন্ধ থাকার কথা না। আজ কত তারিখ... মনে করতে পারলেন না নার্গিস আক্তার। কিন্তু তার মনে হলো খুব প্রিয় কোন স্মৃতি তিনি ভুলে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ সেই প্রিয় স্মৃতি মনে করার ব্যর্থ চেষ্টা করে হাটতে লাগলেন।
বাসার সামনে পৌছলেন অনেকটা নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে। যেন কোন কিছুতেই তার কিছু যায় আসে না। কলিঙবেল বাজাতেই খুলে গেলো দরজাটা। ভেতরে ঢুকে দেখলেন সারাটা ঘর অন্ধকার। বামপাশটা হাতড়ে সুইচ অন করতেই সারা ঘর আলোকিত হয়ে উঠলো আর প্রচন্ড শব্দে চমকে উঠলেন নার্গিস আক্তার। ভয়ে কান পর্যন্ত উঠে গেলো তার হাত দুটো। সাথে সাথেই টের পেলেন উপর থেকে জড়ি ছিটিয়ে পড়ছে তার সারা শরীরে। আর তার সাথেই বেজে উঠলো সেই চেনা সুর, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ...
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ....হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার মাম্মি...,হ্যাপি বার্থডে টু ইউ....।
সুরটা বাজতেই থাকলো। বিস্মিত নার্গিস আক্তার দেখলেন, বাসা ভর্তি মানুষ। সব রণর বয়সী। ওদের মধ্যে কয়েকজনকে তিনি চিনতে পারলেন। বুঝতে পারলেন সব রণর বন্ধু-বান্ধব। তিনি বিঃশ্বাস করতে পারছেন না। শুধু ক্লান্ত চোখে সবার মাঝে খুঁজে চলেছেন রণকে।
সবাই তাকে ঘিরে নিয়ে চললো তার নিজের বেডরুমে। সেখানে তিনজনের মাঝে তিনি আবিষ্কার করলেন নিজের ছেলেকে।
‘মম, হ্যাপি বার্থডে.....।’ হাতের র্যা পিং করা উপহারগুলো বাড়িয়ে ধরলো রণ মায়ের দিকে।
মা একবার উপহার আরেকবার রণর দিকে তাকাচ্ছেন। তার এখনো বিঃশ্বাস হচ্ছে না। শুধু এতটুকু বুঝতে পেরেছেন, যে প্রিয় স্মৃতিটুকু তিনি বারবার ভুলে যাচ্ছিলেন সেটি ছিলো তার জন্মদিনের স্মৃতি। আজ ১৭ই জুন। কিন্তু রণ .... জানলো কি করে...?
রণর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার বড় হয়ে ওঠা সেই ছোট্ট রণটিকে দু’চোখ ভরে দেখতে লাগলেন।
ওদিকে চোখ রাঙিয়ে রণ বলে উঠলো, ‘ভেবেছো কি, তুমি না বললে আমি বের করতে পারবো না তোমার বার্থডে?’
মা নার্গিস আক্তার সবকিছু ভুলে হাসি-মুখে জড়িয়ে ধরলেন রণকে।
উচ্চস্বরে বেজে উঠলো বাঁশি, আনন্দ-ধ্বনি করে উঠলো সবাই। শুরু হলো উৎসব। সবাই প্রাণ ভরে মজা করছে। কিন্তু নার্গিস আক্তার এখনো পুরোপুরি স্বস্তি পাচ্ছেন না। আসলে তিনি তিথির কথা ভাবছেন। মেয়েটার উপর তিনি বড় অন্যায় করে ফেলেছেন। নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছেন না। অবাক চোখে দেখছেন তিথি ঠিকই সবার সাথে মানিয়ে চলছে। কিন্তু ওর মুখের হাসিটাও কৃত্রিম। কেন যেন পুরোপুরি সহজ হতে পারছে না। তার সাথে চোখাচোখি হতেই হাসি থামিয়ে চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকছে।
অবশেষে রাত সাড়ে নয়টার দিকে শেষ হলো সব উৎসব। একে একে সবাই চলে গেলো। শুধু থেকে গেলো দুজন-জয় ও তিথি।
নার্গিস আক্তার ছেলে রণকে নিয়ে সারাদিনের পাওয়া উপহারগুলো র্যা পিং পেপার খুলে খুলে দেখছে। এমন সময় একটি নির্দিষ্ট উপহার; যেটা স্বয়ং ছেলে তার মাকে দিয়েছে- সেটা খুলবার সময় রণ জয় ও তিথিকে ইশারায় কাছে ডাকলো।
জয়ের মুখে দুষ্টুমি হাসি আর তিথি মাথা নিচু করে আছে। যেন বড় কোন দোষ করে ফেলেছে।
নার্গিস আক্তার উপহারটার র্যা পিং পেপারটা খুলতে গিয়ে প্রায় শেষের দিকে থমকে গেলেন। তিনি দেখলেন, র্যা পিঙের আড়াল থেকে সেদিনের সেই সিডিটা ঊঁকি দিচ্ছে, যেটা তিথি তার হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিয়েছিলো। সিডিটা উল্টে-পাল্টে দেখে তিনি তাকালেন তিথির দিকে তারপর নিজের ছেলের দিকে। তারপর পাশে সেই ফুলগুলো তবে আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না। কারণ আজকের বেশীর ভাগ উপহার-ই ফুল।
নার্গিস আক্তারের মনের ভেতর জমে থাকা ঘন কুয়াশায় যেন মিষ্টি রোদের ছটা পড়লো। চোখে কিছুটা প্রশ্ন আর পুরোটা অনুতাপ নিয়ে তাকালেন তিথির দিকে।
‘আসলে, আন্টি, সেদিন সিডিটার কথা বলে ফেললে সারপ্রাইজটা আর দেয়া হতো না। তাছাড়া আমার-ই ভুল হয়েছিলো। ওগুলো ওভাবে সোফার উপর ফেলে রাখা ঠিক হয়নি। আমার বোঝা উচিত ছিলো যে তা আপনার চোখে পড়ে যেতে পারে। এই সহজ ব্যাপারটা বুঝতে না পারায় রণ আমার উপর খুব রাগ করেছিলো। তা-ই ঐভাবে চলে আসা...।’
নার্গিস আক্তার বড় বড় চোখ করে ছেলের দিকে তাকালেন।
এবার বলতে শুরু করলো জয়, ‘আসলে আন্টি, পুরো প্ল্যানটা করেছে রণ-ই। আমার দায়িত্ব ছিলো ফুলগুলো যোগাড় করা। তিথি ছিলো সিডির দায়িত্বে আর রণ ছিলো ঘর সাজাবার দায়িত্বে। তাই আমাদের দোকান থেকে ফুলগুলো নিয়ে ওরা বের হয় ঠিকই কিন্তু তারপর দুজন চলে যায় দুদিকে। রণ বাসায় আর তিথি সিডি কিনতে।’
‘আন্টি, সেদিন রাতে..... আসলে রণ আপনার সামনে ....আমার ফোন ধরেনি কারণ...... সবকিছু আপনার কাছে প্রকাশ হয়ে যাবে, তাহলে আর....আপনাকে সারপ্রাইজ... দেয়া হবে না... তাই। ফোনে তখন ও আমাকে খুব বোকছিলো আমার বোকামির জন্য।’
একেবারে বাচ্চা মেয়েদের কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে কথাকটি বললো তিথি। যেন মাকে টেবিল থেকে গ্লাস পড়ে ভেঙে যাবার কৈফিয়ত দিচ্ছে। কথাগুলো বলার সময় সারাক্ষণই ওর চোখ ছিলো নার্গিস আক্তারের হাতের উপহারগুলোর দিকে।
ওদিকে নার্গিস আক্তারের চোখ থেকে অবিরাম ধারায় অশ্রুঢল নামছে। কিছুতেই রুখতে পারছেন না।
উপহারগুলো পাশের টেবিলে রেখে তিথিকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। তিথি টের পেলো রণর মা-র কাঁধটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
‘আমাকে ক্ষমা করে দাও মা। আমি তোমাদের বুঝিনি।’ কান্নার ফাঁকে কোনভাবে বের হয়ে এলো শব্দগুলো।
‘আন্টি, সেদিন আপনাকে রেখে আমার ওভাবে চলে আসাটা মোটেই ঠিক হয়নি। আমি মাফ চাচ্ছি আন্টি।’ আবেগাপ্লুত কন্ঠ তিথির।
‘আম্মু, আমি তিথির কাছে সব শুনেছি। আমি আর তিথি খুব ভালো বন্ধু। তোমাকে আমি আগেও বলেছি, ও আমার খুব কাছের একজন বন্ধু।’
নার্গিস আক্তার বেদনাতুর চোখে তাকালেন রণর দিকে। সে দৃষ্টির ভাষা ওরা সবাই বুঝলো।
‘রণ, তুমি কি জানো, তোমার মা তোমাকে আসলে কতটা ভালবাসে? পার্কে বসে তিনি আমাকে যে কথাগুলো বলছিলেন, তাৎক্ষণিকভাবে তার মর্মোদ্ধার করতে না পারলেও পরে আমি অনেক ভেবে দেখেছি। তিনি আসলে তোমার প্রতি অগাধ ভালবাসা নিয়েই সেগুলো বলেছেন। অন্য সবার মত তিনি তোমাকে হারাতে চাননি।’
রণর মুখে এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো।
নার্গিস আক্তার এবার তার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
‘আমাকে ক্ষমা করেছো তো বাবা?’ অনেকটা ফিসফিসিয়ে বললেন নার্গিস আক্তার।
‘আম্মু, তুমি নিজের ভালবাসার উপর ..........নির্ভর করতে পারো না? তিলে তিলে যে ভালবাসা দিয়ে আমাকে বড় করেছো, লোকের কথায় কেন তুমি তা নষ্ট করো! আমি অন্য কারো ছেলে নই, .....আমি .......তোমার ছেলে।’
কথাগুলো বলতে বলতে রণর চোখে জমে থাকা পানিগুলো টিপটিপ বৃষ্টির মত ঝরতে লাগলো।
ক্ষীণ কন্ঠে ও বলে উঠলো, ‘ইউ আর গ্রেইট। আই লাভ ইউ মম্...।’
‘মি টু....মাই সান।’ উচ্ছ্বসিত এবং দৃঢ় কন্ঠে প্রত্যুত্তর করলেন নার্গিস আক্তার। তারপর ছেলের কাঁধের উপর দিয়ে তাকালেন পেছনের দেয়ালে টাঙানো স্বামীর ছবিটির দিকে। সেখানে ওদের দুজনের জন্য ভালবাসার এক আশ্চর্য পরিস্ফুটন। যেটার পরিসরে ছবিটাকে আর শুধু ছবি বলে মনে হচ্ছে না। ছবিটা যেন জীবন্ত। যেন হাসছে তার দিকে তাকিয়ে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • সূর্য
    সূর্য রাহাত এই গল্পটা কোন ভাবেই এরচে ভালো হতে পারতোনা। মা-ছেলের ভালবাসা আমার চোখের কোনটা ভিজিয়ে দিয়েছে। দুটো বিষয় আমার হার্টের বারোটা বাজানোর জন্য যথেষ্ট একটা মায়ের ভালোবাসা আর একটা মুক্তিযুদ্ধ। এদুটোতেই ব্যক্তিগত পাবার কিছু থাকেনা, কিন্তু দেবার থাকে ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৭ মে, ২০১১
  • সূর্য
    সূর্য আর একটা স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ করলাম। তোমাকে বলে দিচ্ছি অসাধারণে ভোট দিলাম.......... বলাটা যদিও ঠিকনা.... তবুও
    প্রত্যুত্তর . ২৭ মে, ২০১১
  • আনিসুর রহমান মানিক
    আনিসুর রহমান মানিক অনেক ভালো লাগলো /
    প্রত্যুত্তর . ২৯ মে, ২০১১