বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ৮টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১১

যুদ্ধদিনের স্মৃতিগাঁথা; মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর

স্বাধীনতা মার্চ ২০১১

গানে প্রতিবাদ, গানে প্রতিরোধ

স্বাধীনতা মার্চ ২০১১

ভালোবাসার কৌতুক

ভালবাসা ফেব্রুয়ারী ২০১১

স্বাধীনতা (মার্চ ২০১১)

দেবশিশু

সন্দীপন বসু মুন্না
comment ২০  favorite ৫  import_contacts ৭৩০
এক
বিনোদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজের সামনে এক পড়ন্ত বিকেলে বিশাল এক গাড়ি থেকে নামে এক যুবক। বেশ ফিটফাট ধোপদুরস্ত পোশাক পরা যুবককে দেখে প্রথমে বিদেশী বলে ভ্রম হলেও যুবকের চেহারাতে বাঙালি ভাব স্পষ্ট। যুবক নেমে ইতিউতি এদিক ওদিক তাকাচ্ছে দেখে স্কুল সংলগ্ন চায়ের দোকানদার বাচ্চুমিঞা এগিয়ে যায়। বাচ্চুমিঞাকে দেখে যুবক তার দিকে এগিয়ে আসে আর ঠিক তখনই গাড়ির সামনের দরজাটা খুলে এক লোক প্রায় দৌড়ে এসে যুবক আর বাচ্চুমিঞার মাঝখানে দাড়িয়ে পড়ে। এরপর যুবকটি একটু ঝুঁকে বাচ্চুমিঞার সাথে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। এর কিছুক্ষণের মাঝে বাচ্চুমিঞা অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করেন বাঙালি চেহারার এই যুবক আসলে বাঙালি নন বিদেশী । আর গাড়ির সামনের সিট থেকে নেমে আসা লোকটি বিদেশী ভাষা জানা বাঙালি।
বাচ্চুমিঞা এমন আগেও অনেক দেখেছে। এলাকায় বিভিন্ন বিদেশী এনজিও সংস্থার কল্যানে বিনোদপুর বাজারে এমন বিদেশীলোক ডালভাত। তবে বাঙালি চেহারার লোক কিন্তু বাংলা জানে না এমন লোকের সাথে বাচ্চুমিঞার সাক্ষাৎ হয়নি আগে। আর লোকটির চেহারার মধ্যে এমন কিছু আছে যার জন্য বাচ্চুমিঞাও কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকে লোকটির দিকে। ততক্ষণে গাড়িটিকে ঘিরে বেশ লোক জমে গিয়েছে। নানাজনে নানা প্রশ্ন করছে। কিন্তু যুবকটি এই সব কিছু উপেক্ষা করে পা বাড়ায় স্কুলঘরটির দিকে। আর ঠিক তখনই সামনের কাশবন থেকে হঠাৎ বৈশাখের ঝড় শুরু হয়। উপস্থিত সবাই এদিক-সেদিক দৌড়াতে শুরু করে। শুধু সেই বিদেশী যুবক অনড় দাঁড়িয়ে থাকে। তার সঙ্গী বিদেশী ভাষা জানা লোকটি তখন নিরাপদে দাঁড়িয়ে যুবকটির উদ্দেশ্যে চিৎকার করছে বাচ্চুমিঞার ছাউনির নিচে চলে আসার জন্য। ঝড়ের যা তাণ্ডব দেখা যাচ্ছে এখনি হয়ত বড় ধরনের বাজ পড়বে। কিন্তু সেই অদ্ভুত যুবকটির কানে কিছু পৌঁছায় না। বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বিনোদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজের স্কুলঘরটির দিকে।

দুই
বাচ্চা নেয়াটা যে এতো ঝামেলার তা জানতো না এরিক। হুইফেনও না। দুজনে হিসেব-নিকেশ করেই সংসার পূর্ণ করতে চেয়েছিল। হুইফেন ঘুমিয়ে থাকলে এরিক ওকে দেখে মনোযোগ দিয়ে। ক্লান্ত মুখ। মায়াভরা চোখ দুটি বন্ধ। শরীরে মা হওয়ার চিহ্ন। মনে পড়ে মায়ের কথা। তার মাও তো এভাবেই তাকে পেটে রেখেছিল? জানা কথা, তাই মনে হয়, কোনো যত্ন কোনো চিকিৎসা কি পেয়েছিল? কেউ কি কখনো কপালে হাত বুলিয়ে আদর করছিল? কেউ কি পেটের ওপর হাত রেখে বাচ্চার স্পন্দন বুঝতে চেষ্টা করেছিল?
আহ! একটা আর্তশব্দ বের হয়ে এরিকের বুকের ভেতর থেকে। সে বাবা হবে আর কিছুদিন পর। কি অসাধারণ আনন্দের এক অনুভূতি! হুইফেনের যে এতো কষ্ট, তাও সে যারপরনাই আনন্দিত। বারে বারে বমি হয়। রুচি করে খেতে পারে না। সপ্তায় তিনদিন স্যালাইন নেয়া। টান টান বিছানায় শুয়ে থাকা। তবু খুশি। বাচ্চাটা বড় হচ্ছে তিল তিল করে। কোনো অভিযোগ নেই। কষ্টের কথা বলে না কখনো। পেটে হাত দিয়ে উপলব্ধি করে বাচ্চার বৃদ্ধি। আলট্রাসনোতে এরই মধ্যে জেনে গেছে কন্যা আসছে তাদের সংসারে।
এরিক ভাবে, তার মাও তো এই একই পদ্ধতিতে বাচ্চা বহন করছে। মায়েদের কি ক্ষমতা। এক দেহে দুটো প্রাণ, দুটো হৃৎপিন্ড, দুটো মাথা। বহন কর মাসের পর মাস। স্বচ্ছন্দে, নীরবে। শরীরের সারপদার্থ দিয়ে দিয়ে বড় করে তোলে বাচ্চার শরীর। তার মাও তো এমনই করেছে। হুইফেন যে যতন এবং যে সেবা পাচ্ছে ক্লিনিকে, তার মা সেসব কিছুই পায়নি। মোচড় দিয়ে ওঠে বুকের ভেতর। এরিক তো মরেও যেতে পারতো। পাষন্ডেরা তার মাকে পেট ভরে খেতেও দেয়নি। শুধু খাটিয়েছে আর নির্যাতন করেছে। না জানি কতো কেঁদেছে তার মা ! ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে এরিক।

তিন
সংসার বঞ্চিত এতিম ছেলে এরিক। মা বাবা কাউকে চোখেই দেখেনি। কেউ বেঁচে আছে কি না জানে না। তাদের চেহারা কেমন তাও জানে না। একটা ছবি পর্যন্ত নেই। আর তার আসল বাবা? সেটা কি হানাদার বাহিনীর কেউ? কোনো রাজাকার কুত্তা ? তাও জানে না। শুধু জানে, সে যুদ্ধ শিশু। স্যাম তাকে দেব শিশুর মতো বুকে তুলে নিয়েছিল। তারপর তো এই জীবন। অসলোতে বাবা স্যাম আর মা লেমিং এর সঙ্গে বসবাস। অকৃপণ স্নেহ আর ভালোবাসা সে পেয়েছে বর্তমান বাবা মায়ের কাছ থেকে।
মেঘনার কোল ঘেঁষা এক গ্রামের মেয়ে এরিকের মা। বাবা ছিলেন সাধারণ চাষা। যুদ্ধের মাত্র এক মাস আগে বিয়ে হয় তাদের। তার পরই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আঁচ তখনো গ্রামে লাগেনি। মাত্র ছয় মাসের সংসার জীবনে হঠাৎ ওলোট-পালট হয়ে যায়। একদিন আরেকজনের জমিতে কামলা কাজ শেষ করে বাড়ি আসছিল এরিকের কৃষক বাবা। মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহ করে সৈন্যরা ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। সেই তার শেষ যাওয়া। কিছুদিন পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে এসে তুলে নিয়ে যায় তার মা জরিনাকে। মাকে দিয়ে তারা ক্যাম্পের রান্না করাতো ! !
এরিকের জন্ম ১৯৭২ সালে। যুদ্ধের পর জরিনাকে খুব অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনা হয়। সেখানেই এরিক জন্ম নেয়। স্যাম তখন নিউইয়র্ক টাইমসের স্পেশাল রিপোর্টার। বাংলাদেশে এসেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের নিউজ কাভার করতে। একদিন নিঃসন্তান স্যাম নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে সেখান থেকেই নিয়ে আসে এরিককে। এরিকের মা জরিনার সঙ্গে দেখা হয়নি স্যাম এর। অফিস থেকে কিছু কাগজপত্র আর জরিনা সম্পর্কে কিছু তথ্য পেয়েছিল পিটার। জরিনা বলতে পারেনি, তার সন্তানের বাবা কে? তার স্বামী ,পাক হায়েনা না রাজাকার কেউ। পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসার পর কেবল নিজের সন্তানকে বুকে চেপে শূণ্য মুখে বসে থাকত সে। ততদিনে কান্নার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল সে।

চার
কথাটা স্কুলেই শুনেছিল প্রথমে। ভারতীয় ছেলে সন্দীপ বলেছিল,
: তুমি তো বাংলাদেশের ছেলে।
: না আমি নরওয়ের। এরিক জোর দিয়ে বলে। কতোই আর বয়স তখন ? সাত কি আট ! সন্দীপ তখনই বেশ বড়। সেও পালিত ছেলে। কথাটা এরিক জেনেছিল পরে।
: তুমি যুদ্ধ শিশু এরিক। সন্দীপ আবার বলে।
: যুদ্ধ শিশু মানে কি?
: বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের জন্ম হয়েছে, তাদের যুদ্ধ শিশু বলে। বুঝিয়ে বলে সন্দীপ।
: কিন্তু আমার বাবার নাম তো স্যাম। মায়ের নাম লেমিং। ওরা বাংলাদেশে যুদ্ধ করলো কবে?
: ওসব তুমি এখন বুঝবে না এরিক।
: নিশ্চয় বুঝবো। বলেই দেখো না।
: আমি ভালো করে জানিও না সবটা। তোমার মাকে জিজ্ঞাসা করো। সন্দীপ এড়িয়ে যায়। আগ্রহ আর অনুসন্ধিৎসার বীজটা তখন শিশু এরিকের বুকে বোনা হয়ে গেছে।
বাড়ি এসে লেমিংকে বললো,
: মা, আমি নাকি যুদ্ধ শিশু?
: কে বলেছে সোনা? এরিককে বুকের কাছে টেনে নেয় লেমিং।
: বাবা কি কোনোদিন বাংলাদেশে যুদ্ধ করেছে মা?
: না তো।
: সন্দীপ যে বললো, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের জন্ম, তারাই যুদ্ধ শিশু?
শিশু এরিকের চোখে রাজ্যের কৌতূহল। কিন্তু কি বলবে লেমিং ? ও এতোই ছোটো যে কিছু বুঝবে না। কিন্তু বলতে তো হবেই সব।
: আমি কালো কেন মা? আমি কেন তোমাদের মতো ফর্সা না? মায়ের হাতের ওপর হাতে রেখে এরিক প্রশ্ন করে।
: কে বলেছে বাবা তুমি কালো? তোমার রং হচ্ছে পাকা অলিভ এর মতো। পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর রঙ।
: আজ সন্দীপ বলেছে, আমার চুলও তোমাদের মতো ব্লন্ড নয়।
: তো কি হয়েছে?
এরিকের ঘন কালো চুলের মধ্যে আঙুল দিয়ে এলোমেলো করে দেয় সিঁথি। বলে,
: কি সুন্দর তোমার চুল! কালো চুল আমি খুব ভালোবাসি বেবি।
সন্ধাবেলা ডিনারে বসে আবার প্রশ্ন তোলে এরিক। স্যাম বললো,
: সে অনেক কথা মাই বয়। একটু বড় হও। সব বলবো। যেদিন তোমার আঠারো বছর পূর্ণ হবে, সেইদিন।

পাঁচ
স্যাম এর কাছে সেই পুনর্বাসন কেন্দ্রের একটা সাদা কালো ছবি ছিল। সেটা নিয়ে এরিক এসেছিল বাংলাদেশে। স্যাম , লেমিং এবং হুইফেনও এসেছিল। ওরা চলে গেল দশদিন পর। এরিক থাকলো আরো তিন সপ্তা। বিনোদপুরের সেই গ্রামে গিয়েছে সে। জনে জনে জিজ্ঞাসা করেছে তার বাবা মায়ের কথা। কিন্তু কেউ বলতে পারে না তাদের কথা। মাকে খুঁজে না পাওয়ার কষ্টে বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মা নেই কোথাও। অবশেষে দুয়েকজন বয়সী মানুষ তদের কথা বলেছে। বসতভিটাও দেখিয়েছে। সেখানে এখন গ্রোথ সেন্টার হয়েছে। গ্রামীণ বাজার যাকে বলে। তাদের ভিটার ওপর ধান চালের দোকান। এরিক দোকানের পাশ থেকে তুলে নিয়েছে এক মুঠো মাটি। বুকের ভেতর কেমন হু হু করে ওঠে দুচোখ ছাপিয়ে ঝরে অশ্রু। এ মাটিতে হয়তো তার বাবার পায়ের স্পর্শ আছে। এক চিমটি মাটি ঘষে নেয় বুকে, কপালে।
তার মা অর্থাৎ জরিনা বেগমের কথা কেউ বলতে পারলো না। সেই যে হারিয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধের সময় আর কেউ দেখেনি তাকে। এরিক মহিলা অধিদপ্তরেও খোঁজ করেছে। তিরিশ বছর আগেকার কাগজপত্র কোনটা কোথায় আছে, খুঁজে পাওয়া যায়নি সব ফাইল। তবে একটা পুরনো ফাইলে পুনর্বাসিত বীরাঙ্গনাদের নাম পাওয়া গেল। কে কোথায় গেছে তার ঠিকানাও ছিল সেখানে। এক জরিনা বেগমের ঠিকানায় লেখা আছে, বুড়িচং, কুমিল্লা। সেখানেও গেছে এরিক । পেয়েছেও জরিনা নামের এক মহিলাকে। কিন্তু সে তার মা নয়। তাই তো, কোথায় নোয়াখালীর বিনোদপুর আর কোথায় কুমিল্লার বুড়িচং ! তবে মা না হলেও জরিনা এরিককে নিজ হাতে রেঁধে খাইয়েছে। এরিকের কষ্ট বুঝতে পেওে কেঁদেছে। বারবার ভেবেছে এরিক, এই জরিনা যদি তার মা হতো ! এতো বড় পৃথিবীর কোথায় কার কি ক্ষতি হতো তাহলে? এমনি করে ছক সাজালে ক্ষতি কি হতো বিধাতার ? জরিনা যখন তার মাথায় হাত দিয়ে বললো, বাবা, আমার মেয়েটা বেঁচে থাকলে তোমার সমানই হতো। তারপর সে কি কান্না। কেঁদে ভাসালো এরিকও।

ছয়
উফ্ ...কঁকিয়ে ওঠলো হুইফেন। কাছেই বসে এরিক । স্ত্রীর মাথায় হাত রাখলো।
: কি কষ্ট ডার্লিং?
: দুষ্ট মেয়েটা কি জোরে পা ছুঁড়েছে। পেটের বাম পাশ উঁচু হয়ে গেছে। হাত দিয়ে দেখো।
কষ্টের মধ্যে হুইফেন হাসে মিষ্টি করে। ‘লিটল মারমেড’ (ছোট সমুদ্রকন্যা) দেশের মেয়ে হুইফেন খুব সুন্দর দেখতে। ঘিয়ে রঙের চুল। নীল নীল চোখ দুটো যেমন ডাগর, তেমনি গভীর।
মেয়েটা যেন তোমার মতো হয় হুইফি। বৌয়ের পেটে হাতে দিয়ে বাচ্চার কান্ড দেখে হাসে এরিক। বলে,
: খুব কষ্ট না?
: তুমি কাছে থাকলে কষ্ট বুঝতে পারি না এরিক।
আবার মায়ের কথা ভাবে এরিক। দুঃখিনী মায়ের পাশে এমন কেউ ছিল না যে একটু সঙ্গ দিতে পারতো কষ্টের দিনগুলোতে। আহা! তার কিছুই করার নেই এখন কেমন এক শূন্যতা। কেমন এক হাহাকার। কাউকে বোঝাতে পারে না। অজান্তেই বড় নিঃস্বাস ফেলে সে।
: এমন করে দুঃখের নিঃশ্বাস ফেলছো কেন এরিক? হুইফেন প্রশ্ন করে, শরীর খারাপ লাগছে?
: না, মন। মায়ের জন্য মন কেমন করে। কষ্ট হয় হুইফি।
: প্লিজ। তোমার মা-ই তো আসছেন আমাদের সংসারে। তাই তো আমাদের মেয়ে দিয়েছেন গড।
: তুমি বলছো?
: হ্যাঁ বলছি। আমি তো মেয়ের নামও ঠিক করেছি।
: সত্যি? কি নাম?
: জরি। জরিনার কাছাকাছি। তাই না?
আনন্দে কেঁদে ফেলে এরিক। হুইফেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা পায় না।

সাত
সিজারিয়ান বেবি এলো হুইফেনের কোলে। এরিক মুগ্ধ চোখে দেখে ছোট্ট বাচ্চাকে। এক টুকরো জীবন্ত পুতুল হাত পা নাড়ে। চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক চায়। সারাদিন কি সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার নার্স। এখানে ওখানে তার লাগিয়ে দেখে। তিনদিন ক্রমাগত চললো। তারপর জানালো, বেবির সমস্ত অর্গান পারফেক্ট।
আবার কাঁদে এরিক। একটা জীবনের কতো দাম এখানে। তার তো কোনোই চেকআপ হয়নি। তবু সে সুস্থ আছে। বড় হয়েছে। বাবাও হলো। মা দেখলে কাতোই না খুশি হতো! ছোট্ট জীবনে কতো না পাওয়া থাকে মানুষের। কতো দুঃখ জমা রাখতে হয়! পাঁচদিন পর বাচ্চা নিয়ে বাড়িতে এলো হুইফেন । এরিক বলে,
: হুইফি, আমি যদি আমাদের জরিকে মা বলে ডাকি? কিছু মনে করবে তুমি?
: সে কি কথা এরিক, আমি কিছু মনে করবো কেন? নিশ্চয় ডাকবে।
জরির জন্মের পর জরিনা স্থায়ীভাবে এরিকের সংসারে বাস করতে লাগলো। এরিক কতোবার যে ডাকে,
:মা, মা আমার! জরি মা। আমার আসল মা।
বুকটা ভরে যায়।
তবু মায়ের জন্য এরিকের মন কেমন করে! বাংলাদেশের জন্য মন কেমন করে। রূপোর কৌটোটা খুলে বিনোদপুরের মাটি তুলে নেয় একটু। কৌটোটা আবার ঝেড়ে মুছে রাখে। কৌটোটা খুললেই একটা সোঁদা গন্ধ। সেটা বড়ই প্রিয় এরিকের কাছে। ওটাই দেশের গন্ধ। ওটাই মায়ের গন্ধ, স্মৃতির গন্ধ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন