বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৮৮টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৫১

বিচারক স্কোরঃ ২.৭১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

অনুভবে অনুরণন

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

অদৃশ্য অবান্তর

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

ভেঙে যায় খেলাঘর

আমার স্বপ্ন ডিসেম্বর ২০১৬

প্রত্যয় (অক্টোবর ২০১৪)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৫১ শিশির ভেজা সুখ

সেলিনা ইসলাম
comment ১২  favorite ০  import_contacts ৮১১
গতকাল থেকে অন্যরকম এক অনুভুতিতে আছে হৃদয়। স্বপনের মোবাইলে দশটাকা ভাড়া দিয়ে পয়তাল্লিশ সেকেন্ড -এর একটা ভিডিও দেখে সে বেশ আনন্দ পেয়েছে। স্কুলের পাশে যে ছোট্ট দোকানটা আছে ওখানে পঞ্চাশ টাকা ঘন্টায় মোবাইল ব্যবহার করা যায় ! যায় যায় করে আর যাওয়া হয়নি।
-উউফফঃ একটা স্মার্টফোন সেই কবে থেকে বলছি মাকে কিনে দিতে কিন্তু মায়ের একটাই কথা-
-"সোনা স্মার্টফোন দিয়া কী করবা? একটা তো আছে,কথা বলা যায় ঐটাই ঠিক আছে"
কচু ঠিক আছে...! প্রতিদিন টাকা দিয়ে কী আর মজা নেয়া যায়? ভিডিও দেখা যায়না,ছবি তোলা যায়না,শুধু কথা বলা যায়! এইটা কোন মোবাইল হল? মামাটাও যে কী না! ভালবাসা দেখায় সব কথায়। কেউ আসলে ভালবাসে না! এদিকে শ্রাবণের কাছ থেকে তিনদিন সিগারেটে দুটো করে টান দেবার জন্য গুণে গুণে দশ টাকা দিতে হবে! আরেক ধরনের স্পেশাল সিগারেট আছে ওটা অনেক দামী খাওয়া হয়নি এখনো! এদিকে মা ইদানিং পকেট মানিও কম দিচ্ছে। দুর,এভাবে চলতে আর ভাল লাগে না। পড়ার টেবিলে ভাবতে ভাবতে এক সময় বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে সে।

শুয়ে শুয়ে হঠাৎ মনে পড়ে আজকে দীপু নতুন যে ম্যাডাম এসেছেন উনাকে দেখিয়ে যা বলেছিল না মাইরি ! তা শুনে তাকে দেখার জন্য রীতিমত নেশার ঘোর লেগে গিয়েছিল। সবাই মিলে ছুটে গিয়ে দেখি-ও মা...! ও সত্যি বলেছে! উনি তো অনেক সুন্দর! ইস কী ফর্সা ধবধবে পরিস্কার খোলা পিঠ! একটা ছোট্ট কালো তিল চাঁদের কলঙ্কের মত জ্বলজ্বল করছে ঐ খোলা মাঠে। মনে হচ্ছিল তিলটা ওখানে বসতে পেরে বেশ গর্ব করছে ! খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ছুয়ে দিতে! আর ম্যাডাম শাড়িটা এমনভাবে পরেছে, পেটের অর্ধেকটা বের হয়ে আছে। নাভীটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে....! আর ভাবতে পারেনা হৃদয়। কল্পনার তরী বেয়ে ছুটে চলে নেশাতুর নানা অলিগলি পথ। যে পথে তার প্রবেশ নিষেধ তবুও সে ইদানিং প্রায়ই পৌছে যায় শিহরীত সন্তর্পণে মায়ের অগোচরে নিজের একান্ত ঘরে।

প্রতিদিন রাতে মা এসে দেখে যায় কেমন করে ঘুমিয়ে আছে সে। আপন মনে কথা বলে যায় মা-"ছেলেটা আমার একেবারে বাবার মত করে ঘুমিয়ে থাকে! ঘুমের মাঝে ছটফট করে শুধু পাশ বদলায়। পাগল ছেলে কত কষ্ট করে লেখাপড়া করছে! একদিন বাবার মত খুব ভাল একজন মানুষ হবে সে। এই অটুট বিশ্বাসেই তো এই জীবনটা সামনে বয়ে চলেছি বাবা!" একটু থেমে আবার শুরু করে-
"যতটা সময় তোকে দেয়া দরকার তা হয়তো দিতে পারছি না সোনা,কিন্তু কী করব বল? চাকুরী করে,ঘর সংসার সামলিয়ে একা মানুষ পেরে উঠিনা। প্লিজ বাবা,মাকে ক্ষমা করে দিস! মনে রাখিস তোর জন্য এই অভাগী মায়ের বেঁচে থাকা।" টপটপ করে কিছু পানি পড়ে হৃদয়ের হাতের উপর। মা আবার বলে "জানি একদিন মায়ের সব দুঃখ কষ্ট তুই বিলীন করে দিবি;যেদিন মানুষের মত মানুষ হয়ে এই মাকে গর্বিত করতে পারবি!" মা আদরমাখা চুমুতে আলতো করে ছুয়ে দেয় একমাত্র সন্তানের কপাল। দীর্ঘশ্বাসের হাওয়া হৃদয়ের চোখে মুখে বিরক্তি ছড়ায়। তবুও ঘুমের ভান করে অনড় পড়ে থেকে মায়ের স্বপ্নের জানালা গলে আবারও পৌছে যেতে চায় সেই কল্পনার স্বর্গনীল কমলে!
কিন্তু কী আশ্চর্য! যতবার ম্যাডামের কথা মনে করতে চায়ছে কেন জানেনা হৃদয়,বারবার মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে! কানে ভাসছে ঘুমের ভানে শোনা মায়ের বলা কথাগুলো। সে জানেনা কেন ভীষন কষ্ট লাগছে। মনে মনে রাগ হয় ধ্যাৎ ম্যাডাম কী শাড়ীটা একটু ঠিক করে পরে আসতে পারে না! জানে যে এখানে ছেলেরা আছে তারা বড় হয়েছে। মা ঘর থেকে বের হতেই রাজ্যের ঘুম এসে জড়িয়ে ধরে দু'চোখ।

দিনের শুরুতেই অন্যরকম খোঁশ মেজাজে আছে হৃদয়। আজ মা অফিসে গেলেই সব বন্ধুদেরকে বাসায় নিয়ে এসে আড্ডা আর ইংরেজী ছবি দেখা হবে! ইংরেজী ছবি বলতে সেই রকম চরম বিনোদনের ছবি...! সবচেয়ে আনন্দের বিষয় রাজু বলেছে আজ অনেক মজা হবে কারন ও ওর গার্ল ফ্রেন্ডকেও সাথে আনবে। দীর্ঘ রাতটা যে কীভাবে কেঁটেছে তা কেবল সে-ই জানে। উফ...আর অপেক্ষা সইছে না...! খুশি মন নিয়ে মাকে স্কুলের কথা বলে বের হয়ে যায় সে।

স্বামী মারা যাবার পর থেকে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে পল্লবী'র জীবন। কত ঝড়ঝঞ্ঝাকে পাড়ি দিয়ে আজ এখানে দাঁড়িয়েছে সে। ভায়েরা সবাই আবার বিয়ে দিতে চেয়েছে কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে করেনি। স্বামীকে সে অনেক বেশি ভালবেসেছে। কিন্তু একটা এক্সিডেন্ট কেড়ে নিয়েছে তার সব সুখ। দুঃখ যেখানে উৎসব করে,সুখ যেন সেখানে খালি পায়েও হেঁটে আসে! নিবিড় করে জীবন বালুচরে ফুটিয়ে তোলে ফুল। তেমনি এক ফুল হৃদয়। এই ফুলকে মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে...! এ এক কঠিন দায়ীত্ব, আর তা পালনে সেই থেকে জীবন চলছে এক অসীম বিশ্বাসে। ছেলেটাকে মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে পারলে,জীবনে পাওয়া সব যন্ত্রণা মুছে যাবে। পাওয়া যাবে সীমাহীন সুখ।

ছেলে বাসা থেকে বের হতেই পল্লবী আর দাঁড়াতে পারে না। প্রজন্ড জ্বরে কাপুনী শুরু হয়। তবুও ছেলে খেতে চেয়েছে তাই তার জন্য খিচুড়ি আর গরুর মাংস রান্না করে। শরীর ভাল লাগেনা দেখে বিছানায় কেবল শুতে যাবে এমন সময় ফোনটা বেঁজে উঠে। সমানে একটা বাচ্চা হেসেই যাচ্ছে, হেসেই যাচ্ছে...! রিং টোনটা শুনেই বেশ হাসি পায় এই কষ্টের মাঝেও। হৃদয়ও ছেলে বেলায় এভাবেই হেসে কুটিকুটি হত,এটা ওরই কাজ! ফোনটা ধরে খুব কষ্টে কথা বলে-
- হ্যালো
ওপাশ থেকে বেশ খুশি খুশি কন্ঠ ভেসে আসে
- কী মা আজকে কী অফিসে কাজ নেই,ফোন ধরলে যে?
-আমি বাসায় বাবা....
এবার রাগের কন্ঠ ভেসে আসে-
- মা তুমি এখনও বাসায় ? তুমি অফিসে যাওনি?
ছেলের কথা শুনে হাসার চেষ্টা করে "না সোনা আজকে ছুটি নিয়েছি শরীরটা..." কথা শেষ হয়না হৃদয়ের জোরালো কন্ঠ শোনা যায়।
-কী যে করনা মা? অফিস কামাই দিয়ে একা একা ঘরে থেকে কী লাভ!
পল্লবী এই কথার জবাব দেয়না বলে- তুমি এখন কোথায় সোনা?
-আর কোথায় থাকব স্কুলে।
বিরক্তি ঝরে পড়ে প্রতিটা শব্দে। কথাটা বলে লাইন কেটে দেয়। এখন কী হবে? বন্ধুরা সবাই মিলে সিডি নিতে এসেছে। ওরা যদি জানে মা আজ বাসায় তাহলে সবাই ওকে নিয়ে টিটকিরি করবে আর প্লানটাও যে ভেস্তে যাবে! এখন কী করবে ভেবে পায়না হৃদয়। ভাবতে ভাবতে মাথায় বুদ্ধি আসে। আবার ফোন দেয়-
-হ্যালো মা
-হ্যাঁ বল বাবা
-তুমি খেচুড়ি আর গরুর মাংস রান্না করেছো ?
- হ্যাঁ করেছি
-ইলিশ মাছ ভাজি করেছ?
-ইলিশ মাছ তো বাসায় নাই
- মা আমি ইলিশ মাছ ভাজিও খাব
-এখন ইলিশ মাছ কোথায় পাব?
-আমি জানিনা...ইলিশ মাছ ভাজি খাব। নিউমার্কেটের ওদিকে পাবা।
-কিন্তু অতো দূর
- মা আমি ৪টাই বাসায় আসতেছি রাখি
কথাটা বলেই ফোন লাইন কেটে দেয়। পল্লবী ভেবে পায়না এখন ইলিশ মাছ কোথা থেকে পাবে সে। ফোন দেয় ভাইকে
-হ্যাঁ আপু বল
-ইলিশ মাছ কোথায় পাই বলতো
-আগে বল তোমার কন্ঠ এমন শোনা যায় কেন ? তুমি কী অসুস্থ?
-না তেমন কিছু না। বল কোথায় মাছ পাব এখন?
-বাসার কাছে যেতে চাইলে,হৃদয়ের স্কুলের উল্টোদিকে যে বাজারটা আছে না,ওখানে পেতে পার। নাইলে নিউমার্কেটে পাবা শিওর,....কিন্তু সেতো অনেক দুর।
- আচ্ছা ঠিক আছে
-বুবু আমি কালকে এনে দেই? এখন আমি শহরের বাইরে আছি,না হলে এনে দিতাম
- আমি জানি...ভাবিস না...কিছু হবে না আমার।

খুব কষ্ট হয় তবুও একটা সিএঞ্জি নিয়ে বের হয় পল্লবী মাছের সন্ধানে। কিছুদূর যাবার পরে সিএঞ্জি আর যেতে পারেনা ভাঙ্গা ঘিঞ্জি গলির ভীতর। বাধ্য হয়ে নেমে হাঁটতে থাকে। মাথাটা অনেক ভারী মনে হয়। তাড়াহুড়োই এক বোতল পানি আনতেও ভুলে গেছে সে। মনে পড়ে স্কুলের হেডমাষ্টার গতকাল ফোন দিয়ে দেখা করতে বলেছে ! কী জানি ছেলাটা কিছু করেছে কিনা? না না ছেলে তার লেখাপড়া নিয়ে অনেক সিরিয়াস। আর রেজাল্ট ওতো ভাল এসেছে গত পরিক্ষায়। তাহলে কেন ডাকল? কাল গিয়ে দেখা করলেই বোঝা যাবে। নাহ...ছেলেটা মাঝে মাঝে বাসার খাবারই খেতে চায়না অথচ আজ কত কী খেতে চেয়েছে। খেতেই তো চেয়েছে মা হয়ে এটুকুও করতে পারবে না সে! ওর বাবা বেঁচে থাকলে কত ভালবাসা আর যত্ন দিয়ে ওকে মানুষ করত। নানা কথা ভাবতে ভাবতে কেমন যেন চক্কর দিচ্ছে মাথা! আর মাত্র তো কয়েকটা বছর ছেলেটা লেখাপড়া করে নিজের দ্বায়িত্বটা বুঝে উঠতে পারলেই জীবনের সব কষ্টের জায়গাগুলো দখল করে নেবে সুখ! কথাটা ভাবতেই আনন্দে চোখ দু'টো ভিজে আসে। চোখ মুছতে মুছতে সামনে তাকায়। চলমান মানুষের মাঝে একটা চেনা মুখ দেখে দ্বিধায় পড়ে যায়। মোবাইলে সময় দেখে দুপুর একটা দশ বাজে! "না না এ সময়ে কীভাবে বাইরে আসবে? এখন তো স্কুল টাইম। তাছাড়া ছেলে আর যাই করুক মা কষ্ট পায় এমন কিছু কোনদিন করবে না। এই অটুট বিশ্বাস মা হয়ে সন্তানের প্রতি তার আছে" কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ভর দুপুরের প্রচন্ড রোঁদের তাপে নিঃশ্বাস নিতেও অনেক কষ্ট হয় তার! আর এক পাও এগুতে পারে না! চারিদিক অন্ধকার দিয়ে পুরো পৃথিবীটা দুলে উঠে সামনে।

ওদিকে হৃদয় বন্ধুদের নিয়ে বেশ খুশি মনে হাঁটতে থাকে । মনে মনে ভাবে আজ পর্যন্ত মায়ের কাছে সে যা চেয়েছে দেরীতে হলেও,হাজার অসুস্থ্য হোক বা ধার দেনা করে হোক মা তা এনে তার সামনে হাজির করেছে! সেখানে এটাতো সামান্য ইলিশ মাছ খেতে চাওয়া। অবশ্যই মা যে করেই হোক নিজেই ছেলের জন্য মাছের ব্যবস্থা করবে। মায়ের প্রতি এই আস্থা আছে বলেই ইলিশ মাছের কথা বলেছে। আর এই মাছ যে বাসায় নেই তাও সে জানে! মা নিশ্চয় মাছ কিনতে নিউমার্কেটে যাবে। যেভাবে টাকার হিসাব কষে তাতে সিএঞ্জি বা টেক্সি নেবে না,রিক্সাই নেবে। এতে সময়ও আরো বেশী লাগবে। যে যানজট তাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে কমপক্ষে চার পাঁচ ঘন্টা বা তারও বেশী সময় লাগাবে। এসব ভাবতে ভাবতে মনের সুখে হাটঁতে হাটঁতে দেখতে পায় অনেক মানুষের ভীড়! সেই ভীড় ঠেলে বের হয় রিকু ও শুভ। রিকু ফুঁপিয়ে কাঁদছে তাই দেখে শুভ ওর মাথায় ছোট্ট করে গাট্টা মারে-

-ব্যাটা এতো নরম কইলজা নিয়া মানুষ হইবি ক্যামতে? এই গরমের মইধ্যে রদ্দুরে বুড়ি বাইর হইছে কেন? তোর মা আমার মা কী বাইর হইব ? তাও এই ঘিঞ্জি রাস্তায়?
কথাটা শুনে রিকু এবার নাকি কান্না শুরু করে-
-আমি বাসায় যাব
ওর কথা শুনে সবাই হেসে দেয়। শুভ বলে-
-যাও সোনা মায়ের কোলে গিয়া ফিডার খাও...!
সবাই জোরে জোরে হেসে দেয়। হৃদয় জানে না কেন ওর মনের মাঝে হঠাৎ করে চিনচিন ব্যথা করছে! একটা শুন্যতার অনুভব মনটাকে ভীষন কাতর করে দিতে চায়ছে! কেন যেন হাসতে গিয়েও পারছে না!
"আহারে কোন সন্তানের মা এভাবে তপ্ত রাস্তায় পড়ে আছে?" "ইস বেচারীর মাথা ফেঁটে রক্ত বের হচ্ছে!" "আহারে বাড়ীর সবাই নিশ্চয় খুঁজছে...!" নানা কথা'র গুঞ্জন শুনতে শুনতে মা বের হয়েছে কিনা বাসা থেকে,সেইটা শিওর হতে কল দেয় হৃদয়। ছোট্ট সোনার নির্মল সেই হাসির শব্দ রিংটোনটা খুব কাছ থেকে শোনা যায়। মনে হয় এই ভীড়ের মাঝ থেকেই আসছে শব্দটা! এগিয়ে যেতে যেতে আবার থমকে যায় "একই রিংটোন অন্য কেউ হয়ত ব্যবহার করেছে"! কথাটা মনে আসতেই বেশ দ্রুত বন্ধুদের সবাইকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। তখনও ফুঁপিয়ে কেঁদে কেঁদে রিকু বলছে
- যে আন্টিটা রাস্তায় পড়ে আছে সে হালকা সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ পরা! ঠিক অমন একটা ড্রেস আমার মায়ের আছে। জানিস আমি প্রথমে আমার আম্মু ভেবেছিলাম...কী যে কষ্ট লাগছিল তোরা বুঝবি না। আমি কোথাও যাবনা। আমি স্কুলে যাই,তোদের সাথে আমি নেই। মা জানতে পারলে অনেক কষ্ট পাবে। আমি মাকে কষ্ট দিতে পারব না।
দীপু বেশ রাগ করে ধমকায়-
-এই ব্যাটা চুপ কর ! পকপক পকপক রেডিও জর্কি গো মত কথার জাবর কাটতেছে তো কাটতেছে, থাম....!
রিকু তবুও বলে যায়
- আর জানিস আন্টিটার মোবাইল ফোনের কভারটায়,ঠিক আমার মায়ের ফোনের কভারের মত একটা লাল টকটকে হার্টের চিহ্ন ! কী মিল দেখ....
- "আমার আম্মু....!" থমকে দাঁড়ায় হৃদয় ! মা অসুস্থ তাই কাছের বাজারে এসেছে! আর সকালে অমন একটা সালোয়ার কামিজ সেও পরে ছিল। আর কাল মাকে সে নিজেই একটা মোবাইল কভার লাগিয়ে দিয়েছে যার উপরে লাল টকটকে হার্টের চিহ্ন ! মা বলেছিল-"কী করছ সোনা? ওটা আবার কী?" সে হেসে বলেছিল -"এইটা তোমার হৃদয়। এখন থেকে আমি তোমার সাথে সাথে থাকব ঠিক আছে মা?" "পাগল ছেলে তুই তো সারাক্ষণই আমার কলিজার মধ্যেই থাকিস" ! ছবির মত সব কিছু ভেসে উঠে চোখের সামনে...! একী করল সে....! নিজের সামান্য আনন্দের জন্য মাকে এতো কষ্ট দিল....। "আসলে আমরা সন্তানরা কেউ বাবা মায়ের কষ্টের কথা ভাবি না। ভাবিনা কত ত্যাগ আর কষ্ট সয়ে নিজেদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদেরকে তারা পৃথিবী'র সবটুকু সুখ দিতে চায়! একবারও ভাবিনা এই বাবা মা সাথে না থাকলে সন্তানরা কচুরি পানার মত কোথায় স্রোতে ভেসে যেত...!" আনমনে কথাগুলো বলে হৃদয় এবার পিছনে ঘুরে হাঁটা শুরু করে। ভীড় ঠেলে দ্রুত হেঁটে যায় সামনের দিকে! পিছন থেকে সবাই ডাকতে থাকে
- এই হৃদয় কোথায় যাস? আরে রাজু কল দিছে মিথিলা আর শিখিকে নিয়ে ওরা তোদের বাড়ীর সামনে অপেক্ষা করছে।
- আরে তাড়াতাড়ি যেতে হবে কই যাস?
হৃদয় ঘাড় বাঁকিয়ে মিডিল ফিংগার দেখায়। খুব করে বলতে ইচ্ছে হয় "আর কোনদিন তোরা আমার সাথে মিশবি না! আমাকে কেউ আর কোন দিন খুঁজবিনা। তোরা আমার ভাল চাসনা। তোরা ভাল বন্ধু না....! মাত্র একমাস এই তোদের সাথে মিশে আমি আমার মাকে কষ্ট দিয়েছি... ! আমি খারাপ পথে গেছি...আমি খারাপ হয়ে গেছি....!" মনের গভীর থেকে চাপ চাপ কষ্টগুলো দু'ঠোঁটে কাঁপন তুলে কন্ঠরোধ করে দেয়। হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে ভীড় ঠেলে ছুটে যায় সামনে। মনের সাউন্ড বক্সে ফুল ভলুউমে বাজে "তোর জন্য এই অভাগী মায়ের বেঁচে থাকা। জানি একদিন মায়ের সব দুঃখ কষ্ট তুই বিলীন করে দিবি। যেদিন মানুষের মত মানুষ হয়ে এই মাকে গর্বিত করতে পারবি!"বৃষ্টির ঝড় উঠে আজ সারা দেহমন জুড়ে ! দু'হাতের চেটোয় বারবার চোখ মুছে নেয় হৃদয়।
পল্লবী অস্পষ্ট্ভাবে দেখতে পায় স্কুল ড্রেস পরা পিঠে কাল স্কুল ব্যাগ ঝুলানো একজন কিশোর হাত বাড়িয়ে সামনে আসে! তার বিশ্বাস বৃথা যায়নি...! বুকের উপর চেনা স্পর্শ....! নতুন উদ্দ্যোমে প্রত্যয়ী হয় সে- যে করেই হোক তাকে যে বাঁচতে হবে ! জীবনের হাল কোনভাবেই ছাড়বে না সে,যেভাবেই হোক এই সন্তানের জন্য তাকে উঠে দাঁড়াতেই হবে! টপটপ করে গরম তরল কিছু চোখ বেয়ে নেমে যায় নীচে...। মাথার ভীতরে ঢং ঢং বাড়ি মেরে যায় কেউ ! চোখের মাঝে এক ঝলক আলো ! সে আলোতে অনিচ্ছাকৃতভাবে মুদে আসে দু'চোখ। দূর কোন এক পাহাড়ী গুহা থেকে ধীরে ধীরে ভেসে আসে"মাগো আমাকে মাফ করে দাও! আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি ,ক্ষমা কর মা...।"
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন