বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৮৮টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৭৬

বিচারক স্কোরঃ ৩.৭৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৩ / ৩.০

অনুভবে অনুরণন

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

অদৃশ্য অবান্তর

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

ভেঙে যায় খেলাঘর

আমার স্বপ্ন ডিসেম্বর ২০১৬

মুক্তিযোদ্ধা (ডিসেম্বর ২০১২)

মোট ভোট ৪৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৭৬ পরাণ রে তুই কাঁদবি কত আর...!

সেলিনা ইসলাম
comment ২০  favorite ০  import_contacts ৮৪২
এক.
শিখার বয়স যখন পনের বছর তখন সে চিকিৎসক বাবার হাত ধরেই সেবা করতে ছুটে গেছে মুক্তিসেনাদের তাবুতে তাবুতে। বাবা শিবনাথ বাবু মেয়েকে একা বাসায় রাখা নিরাপদ মনে করলেন না আর তাই তাকে বোঝালেন
-চল আমার সাথে, সেবিকার কাজটা বেশ ভালই করতে পারবি। এখন ওদের পাশে যদি থাকতে না পারিস তাহলে সারাটা জীবন আফসোস করবি। চল মা আমার সাথে
-কিন্তু বাবা আমি তো নার্সিং-এর কিছুই জানিনা। আর সুইফোটাতে আমার অনেক ভয় লাগে। আমি কিভাবে স্যালাইন দেব সবাইকে?
শিবনাথবাবু মেয়ের কথা শুনে অনেক হেসেছিলেন। আত্মীয় স্বজন সবাই ওপারে চলে গেছে কিন্তু তিনি যেতে পারেননি। আর যেতে চায়নি শিখা। কেমন করে যাবে সে সুভাষকে ছেড়ে। মানুষটা কবে ফিরে আসবে আর বুকের ভেতর জমে থাকা না বলা কথাটা তাকে বলে যন্ত্রণাটা হালকা করবে সেই দিনের অপেক্ষায় আছে সে। শিখা জানে না সুভাষ কোথায় গেছে। ভেবেছে হয়ত ওপারে চলে গেছে কাকার পরিবারের সাথে। কিন্তু একবারটি বলে যাবার প্রয়োজন অনুভব করেনি তাকে! আবার ভাবছে হয়ত দেশটাকে স্বাধীন করতেই যুদ্ধে গেছে । কথাটা মনে হতেই রেডক্রসের সদস্য হয়ে বাবার সাথে চলে আসে এবং তাবুতে তাবুতে ঘুরে সেবা শুশ্রূষা করার নামে খুঁজে চলে প্রিয়তমকে।

একদিন শিখাকে তাবুতে রেখে বাবা পাশেই একটা রোগী দেখতে যায়। বাবা বলে যায় কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সে ফিরে আসবে। সেইদনই রাজাকাররা অতর্কিত আক্রমণ করে। আর তখনই শিখা বাবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুধুমাত্র যুবতী মেয়েদেরকে তুলে নিয়ে রাজাকাররা রুগীদেরসহ সবাইকে মেরে ফেলে। মেয়েদেরকে একটা ঘরে বন্দী করে রাখে। ছয়জন মেয়েকে ঐখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় পিশাচের দল। বাকী থাকে শিখা আর একটা মেয়ে। এই দুজনকে নিয়ে ছিল অন্যকোন ভাবনা। কিন্তু সেই ভাবনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেইদিন রাতেই মুক্তিসেনারা ঘরটাকে ঘিরে ফেলে এবং হাত পা মুখ বাঁধা অবস্থায় ওদেরকে রক্ষা করে। শিখা প্রথমে ভাবে এরাও রাজাকার এবং এরা হয়ত এখন ওদেরকে নিয়ে তুলে দেবে মিলিটারিদের হাতে। আর তাই মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় মরে যাবে তবু নিজের সতীত্ব খুয়াবে না ঐ পিশাচদের কাছে। কিন্তু তার ভুল ভেঙ্গে যায় একটা কণ্ঠস্বরের বলা কথায়'বেঈমানের দল নাই কেউ, মনে হয় সব জাহান্নামে গেছে।' মনের মাঝে হেমন্তের শীতল হাওয়া বয়ে যায়। সারা মন জুড়ে সুবাসিত গুঞ্জন উঠে 'সে আছে,সে আছে এখানেই কোথাও!'

দুই.
একটা শব্দে চোখ মেলে তাকাতেই সূর্যের আলো এসে চোখে লাগে। মাটির মেঝেতে উঠে বসে দুর্বল শরীরে। কিছুক্ষন ঠায় বসে থাকে তারপর হেঁটে বাইরে আসে। কেউ নেই কোথাও। ঐ শব্দটা ছাড়া একটা পাখীরও আওয়াজ নেই। এদিক ওদিক তাকাতেই আবিস্কার করে সে এখন একটা জঙ্গলের মাঝে আছে। শব্দটা লক্ষ্য করে ক্লান্ত শরীর টেনে সেখানে যায়। দেখে একটা ছেলে পাঁথরে ঘষে ঘষে একটা দা ধার দিচ্ছে। দূর থেকেও একটুও চিনতে ভুল হলনা শিখার। ছুটে যায় একেবারে কাছে। নারিকেলের শুঁকনো পাতায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় সে। তড়িৎ বেগে দা'য়ের জায়গা দখল করে মেশিনগান। তাক করে ঠিক শিখার কপালে। দাড়ী আর চুলে ঢাকা মানুষটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে শিখা। গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসে
-কি রে আমার পিছন ধাওয়া করতে করতে এ পর্যন্তও চলে এলি?
শিখা সব ভাষা হারিয়ে ফেলে। নির্লজ্জ চোখের পালকে মেঘ নামে, তারপর ঝমঝম বৃষ্টি!
-হা হা হা পাগলিই রয়ে গেলি -তোকে শিখা যে কেন রেখেছিল মাসীমা তাই বুঝে পাইনা। শিখা কি এতো সহজে নিভে যায়? এবার শিখা সত্যি লজ্জা পায়। উঠে দাঁড়ায়। তখনও বৃষ্টি থামেনা।
-সুভাষদা বাবা...বাবা কোথায়? হু হু করে কেঁদে যায় সে বাবার কথা ভেবে। নিশ্চয় বাবাকে ওরা মেরে ফেলেছে।
-কাকাবাবু আছেন । তাঁকে খবর দেয়া হয়েছে যে তুই বেঁচে আছিস এবং বহাল তবিয়তে বাসর ঘরেই আছিস!
বাবার সাথে দেখা হবে ভেবে খুশীতে ভরে যায় মন। কিন্তু শেষে বলা কথাটায় সে খুশী প্রকাশ না করে বলে উঠে
-ধেৎ সুভাষদা তোমার মশকারী করা কথা শুনতে ভাল লাগছে না।
-তাই! ঠিক আছে তাহলে আর বলব না। কোন কথাই বলব না।
-সেইটা কখন বললাম। একটু থেমে আবার বলে
-আমাকে না বলে চলে এলে কেন সুভাষদা?
একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে সুভাষের বুকচীরে; কিছুই বলে না সে। আবার একই কথা বলে শিখা। এবার খুব ধীরে ধীরে বলে-
-পাগলকে যদি কিছু বলতাম তাহলে কি আজ আমি আসতে পারতাম? তুই কি ভেবেছিলি আমি কিছুই বুঝিনি? আরে আমি তোর থেকে কি ছোট আর বোকা নাকি যে কিছুই বুঝব না? চুপি চুপি নাড়ু, মোয়া এনে খাওয়াতি কি এমনি এমনি? আর কারনে অকারনে আমাদের বাসায় আসতি হয় পূজোর ফুল নিতে না হয় অন্যকোন ছলে। কিন্তু তোর নজর খুঁজে বেড়াত কাকে হুম?
লজ্জা ঘিরে ধরে শিখাকে। কি বলবে বুঝে উঠতে পারেনা। যেখানে কেউ জানেনা দুজন মানুষ অপারে গেছে নাকি শিকারী শিয়ালের নজরে পড়েছে, বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে! আজ এতোদিন পর দুজন দুজনের মুখোমুখি হয়ে ক্ষনিকের জন্য ভুলে গেছে কাল,ক্ষণ ও পরিবেশ!
-কি ক্ষুধা লেগেছে?
কথাটা শুনেই পেটের ভীতরে মোচড় দিয়ে উঠে।
-এই নে খা শুকনো নারিকেল । এছাড়া আজ আর কিছু হবে না খাওয়া। খেয়ে নে কখন দৌড় দিতে হয় কে জানে। কি রে দৌড়াতে পারবি তো নাকি আমাকেই কোলে নিয়ে দৌড়াতে হবে।হা হা হা হা।
অবাক হয় শিখা । এই দুর্যোগের সময়ে কি করে হাসছে মানুষটা? খসখস একটা শব্দ হতেই এক ঝটকায় শিখাকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে আড়ালে চলে যায়। হাতে তুলে নেয় অস্ত্র। একটু পরই তাকায় শিখার দিকে। ভয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁপছে থরথর করে। 'কি রে চোখ খোল। নতুন বৌয়ের মত করে আছিস কেন রে হা হা হা'
-এদিকে আসো দাদা কথা আছে।
শিখা দেখে একটা ছেলে। সুভাষ এগিয়ে যায় ছেলেটার দিকে। তারপর ফিসফিস করে কিসব কথা বলে। চিৎকার দিয়ে উঠে সুভাষ-'জয় বাংলা' খুশীতে যেন নাচতে থাকে সে। ছেলেটা চলে যায় একটা ব্যাগ সুভাষের হাতে ধরিয়ে দিয়ে।

তিন.
চারদিক থেকে একের পর এক শহর-বন্দর-নগর মুক্ত করার খবর এসেছে আজ। ১৪ ডিসেম্বর থেকে জেনারেল নিয়াজির উদ্দেশ্যে আত্মসর্মপণের জন্য জেনারেল ম্যানেকশ'র ঘোষণা বারবার শোনা যাচ্ছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং আকাশবাণী থেকে। ঢাকার একেবারে উপকণ্ঠ মিরপুর লোহার ব্রিজের অপর পাশে আমিন বাজারে এসে ভারতীয় মেজর জেনারেল নাগরা মাইকে তার এককালের ব্যাচমেট পাকিস্তানী মেজর জেনারেল জামশেদকে আত্মসমর্পনের আহ্বান জানাচ্ছেন, তিনি নাকি চিরকুটও পাঠিয়েছেন। এসব খবর শুনে চরম উত্তেজনায় টবগব করছে মুক্তিসেনাদের মন। ক্যাম্পের সবাই গেছে গ্রামের কলেজে মিলিটারিদের পরাজিত করে কলেজটা দখলে নিতে। চারিদিক থেকে কলেজটা ঘিরে রেখেছে সবাই, থেমে থেমে গুলি চালাচ্ছে বটে, কিন্তু পাল্টা কোন গুলি আসছে না। এ থেকে বুঝতে বাকি রইলো না জানোয়ারদের শক্তি ও মনোবল একবোরেই নিঃশেষ। দু'দিন ধরে সবাই কলেজটাকে ঘিরে রেখেছে। সুভাষও ছিল এই দলে কিন্তু কাল আচমকা খবরটা পেয়ে আর কাউকেই না পাঠিয়ে নিজেই ছুটে গেছে মেয়েদের উদ্ধার করতে। রাজাকারের দল ক্ষুধার্ত পশুর মত হয়ে গেছে। তারা কোনভাবেই পরাজয় মেনে নিতে পারছে না। কুত্তারে ভেবেছিল হিংস্র দানব এখন দেখে এ যে বিলাইয়েরও অধম। কত আশা করেছিল দলে ভিড়ে কুকর্মে সহায়তা করে একটা বড় পদ পাওয়া যাবে। কিন্তু এ কি হল! আর তাই দিক্বিদিক হয়ে যা মাথায় আসছে তাই করছে।
সুভাষ ব্যাগটা রেখে এগিয়ে আসে শিখার দিকে। বেশ সময় নিয়ে কি যেন ভাবে তারপর বলে
-তোর একবারও মনে হচ্ছে না কিভাবে তুই এখানে এলি?
অবাক হয় শিখা! সাথে সাথে বলে উঠে -তার মানে তুমি সব সময় জানতে আমি কোথায় আছি কিভাবে আছি?
-মায়ের জন্য জান বাজী রেখে যুদ্ধ করেছি আর সময়ে সময়ে প্রিয়ার খবর নিয়েছি
-তুমি অনেক স্বার্থপর। কথাটা বলে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে শিখা
-নারে আমি স্বার্থপর নই। ঐ মেয়েগুলোকেও আমরা বাঁচাতে চেয়েছিলাম কিন্তু কুত্তার বাচ্চারা যে রেডক্রসের তাঁবুতে হামলা দেবে এটাই মাথায় আসেনি। তারপর যখন জানতে পারলাম ঐ বাড়ীতে তুলেছে তখনই সবাইকে উদ্ধারে ছুটেছিলাম কিন্তু...!
-কিন্তু তার আগেই ঐ কুত্তার দল মেয়েদেরকে নিয়ে গেছে। আমাকেও যদি তুলে...কথাটা শেষ করার আগেই মুখে হাত চাঁপা দেয় সুভাষ।
-নারে আর সইতে পারব না। বাবা মা ভাই বোন সবাইকে একই রাতে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে কুত্তার বাচ্চারা.....আর আর এখন তোকে হারালে আমি কি নিয়ে..কন্ঠ রোধ হয়ে আসে। তারপর ভাবে
এখন দুর্বল হবার সময় নয়...কিছুটা কাজ এখনও বাকী আছে তাঁর। ভাবনাটা মাথায় আসতেই কথা ঘুরিয়ে ফেলে সুভাষ
-না তুই যদি নিজে থেকে চলে যেতে চাস চলে যা,আমি বাঁধা দেব না...। এবার শিখা সুভাষের বুকে একরকম ঝাঁপিয়েই পড়ে শিকারী বাঘিনীর মত। 'আর কোনদিন যদি এমন করে বলেছ তোমাকে একেবারে খুন করব, মেরে ফেলব' সুভাষ ফিসফিস করে কানের কাছে মুখটা নিয়ে বলে “'মেরেতো অনেক আগেই ফেলেছিস এখন কি তবে চিতায় নিবি' আলতো করে কানে ছুয়ে দেয় ঠোঁট। শিখার সমস্ত শরীর কেপে উঠে। দুজনে হারিয়ে যায় অচেনা স্বর্গ পথে। বাধাহীন নিশ্চল ভীরুপাখীর ডানা মেলে।
আজ এই আনন্দের ক্ষণে প্রিয়তমাকে কাছে পেয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি সুভাষ। ঘুমন্ত ভালোবাসা জেগে উঠে এই স্বপ্নিলক্ষণে! কিন্তু এই আনন্দের স্রোতটা যে সুনামী বইয়ে দিতে পারে জীবনে তা একেবারেই মাথায় আসেনি কারো। ভালোবাসা বুঝিবা এমনই-মানেনা যুদ্ধ,করেনা জীবনের পরোয়া।

ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ সকাল ৮টার দিকে মিরপুর ব্রিজের উপর জেনারেল নাগরা আর কাদের সিদ্দিকীর কাছে পাকিস্তানী বাহিনীর প্রথম দলটি আত্মসমর্পন করে এবং এদিন বিকেল বেলা যে কোন সময় পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার নিয়াজি তিনিও আত্মসমর্পণ করবে বলে নিশ্চিত খবর আসে। অবশেষে এদিন বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে নিয়াজি তার পুরো ট্রুপসহ রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ করে। প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ হয় শত্রুমুক্ত।

চার.
এবার ঘরে ফেরার দিন। শিখা বাবার সাথে গ্রামে এসে দেখে তাদের বাড়ীঘর সব দখল করে নিয়েছে রাজাকার মোত্তালিব । শিবনাথ বাবুকে হুমকি দেয় ভিটায় ঢুকলে মেয়েসহ জানে মেরে ফেলবে। ক্লান্ত শিবনাথ বাবুর সাহস হলনা সামনে এগোতে। তিনি পাশের গ্রামে জহির মোল্লার বাড়ীতে আশ্রয় নিলেন। জহির মোল্লা তার বাড়ীকেই নিজের মনে করে থাকার কথা বললেন। এই ভয়াবহ সময়ে শিবনাথ বাবুকে ডাক্তারী কাজে সহায়তা করতে লাগলেন এই জহির মোল্লা।
দিন যায় মাস যায় সুভাষ আর ফিরে আসে না। তিনমাস যেতে শিবনাথ বাবু মেয়েকে ঘরের বাইরে আসতে দেননা। তিনি কোন দিশা খুঁজে না পেলেও এটুকু বুঝতে পারেন সবাই যখন ব্যাপারটা জানবে মেয়ের জীবন তখন কতটা দুর্বিষহ হবে। সবাই ভাব্বে এই সন্তান মিলিটারিদের। এদিকে শিখা পথ চেয়ে থাকে...! শিবনাথবাবু খবর নিতে গিয়ে জানতে পারেন সুভাষকে রাজাকারের কয়েকজন মিলে নৃশংসভাবে হাঁটু থেকে দু'পা কেটে দিয়েছে। কেউ বলে গুলি করে মেরে ফেলেছে। আবার কেউ বলে সুভাষ অত্যাচার সইতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। কেউ কেউ আবার বলে তারা নাকি সুভাষকে শহরে দেখেছে। শিখা কারো কথা বিশ্বাস করতে পারে না। সে শুধু জানে একদিন তার কাছেই সে ফিরে আসবে। ভালোবাসার নিগূঢ় টানে তাকে যে ফিরে আসতেই হবে!

একদিন ভোরে শিখাকে অজ্ঞান করে প্রভাতের প্রথম সূর্য হাসে। সেই হাসি দেখার আগেই শিবনাথ বাবুর ঠিক করা নিঃসন্তান ধাই রানী আপন করে নিয়ে যায় নিজের বাড়ীতে। শিখা জ্ঞান ফিরে জানতে পারে তার মৃত সন্তানের কথা। মন মানে না তবুও বাবাকে অবিশ্বাস করতে পারেনা ! শিবনাথ বাবু মেয়েকে আদর করে বলে
-মা রে সবাই জানবে তোর সন্তান মিলিটারীদের। সবাই তোকে ধিক্কার দেবে এটা তুই সইতে পারবি না। তার চেয়ে ঈশ্বর যা করেছেন ভাল ভেবেই করেছেন।শিখা জানে এ সন্তান তার ভালোবাসার ফসল। এই সন্তানকে বুকে নিয়ে সে হাজারও কলঙ্ক সইতে পারত!

দুঃখ ব্যাথা বেদনা এসব কিছুই বাস্তবতার কাছে কখনো কখনো হার মেনে যায়। হার মানতে বাধ্য হয়। চারিদিকে মহামারী আর দুর্ভিক্ষের হাহাকার। শিবনাথ বাবুর রুগীর সংখ্যা বেড়ে যাবার সাথে সাথে শরীরটাও খারাপ হয়ে যায়। বাবা এবং গ্রামের অন্যদের পাশে থেকে সেবা দিতে দিতে শিখা সামনে এগিয়ে যায়। পাশের গ্রামের এক বিধবার ছেলেকে যমের মুখ থেকে ছিনিয়ে আনলেও নিজের বাবাকে ফেরাতে পারেনা সে। ছেলেটাকে বাঁচিয়ে যেন হারানো ধনকে সে ফিরে পায়। কিসের টানে বারবার এই কুঁড়ে ঘরেই সে শান্তির পরশ পায়। কষ্ট আর অভাব নিয়েই শিখা গ্রামের মানুষের পাশে বাবার রেখে যাওয়া ডাক্তারী ব্যাগটা হাতে নিয়ে ছুটে চলে এ গ্রাম থেকে সে গ্রামে। আর এদিকে বিধবা কি এক অপরাধে অন্তরে অন্তরেই মরে যায়। যুবক ছেলেটার কাছে মাসীমাই তার আসল মা মনে হয়। মনে হয় মা-ই পারে এতো ভালবাসতে। কিন্তু মাসীমা পারেনা কঠোর বাঁধনে বেঁধে রাখতে। বিধবা মা মারা যায় রোগ শোক ও ক্ষুধার কষ্টে। কিন্তু নেশাগ্রস্ত যুবকের কাছে নিজেকে নিয়ে ছাড়া আর কাউকে নিয়ে ভাবার সময় কোথায়!

পাঁচ.
আজ এই প্রথম একটা অপারেশন শেষ না করে প্রদীপ ফিরে এসেছে! আজ দশ বছরের অভিজ্ঞতায় সে কখনোই এভাবে ফিরে আসেনি । এখন কি করবে বা কিভাবে বসের সামনে যাবে তাই ভেবে পাচ্ছে না। এদিকে এডভান্স এই কাজের জন্য নেয়া হয়েছিল দশ হাজার টাকা। আর বাকী দশ হাজার কাজ শেষ হলে পাবে এমনই কথা ছিল। সে যখন কাজটা নিয়েছিল তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি পরাজিত হবে। যদিও দলের সবাই ওকে কাজটা শেষ করতে বলেছিল না হলে নিজেদের জানটাই দিয়ে দিতে হবে তাও তারা জানিয়েছিল। কিন্তু সে নিজেও কাজটা করল না এমন কি দলের কাউকেও করতে দিলনা। এখন সবাই মিলে বসের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
জনি অনেকক্ষণ ধরে নিজেই নিজের উপর গজরাচ্ছে কেন প্রদীপের কথা শুনে ছুটে পালিয়ে এসেছে। বরং ওটাকে শেষ করে দিলে বসের কাছে অনেক সমাদর পেয়ে প্রদীপের জায়গাটাও পেয়ে যেত। বস বারবার মোবাইলে ফোন দিচ্ছে কিন্তু প্রদীপ ধরছে না। রেজা এবার খিস্তি দিয়ে উঠে
-ঐ শালা ফোন ধরিস না কেন? তুই কি জানিষ তুই কার সাথে পাঙ্গা নিয়েছিস? নিজে মরবি আমাদেরকেও মারবি। যদি জানতাম তুই বেঈমানী করবি তাহলে কোন শালা তোর সাথে যেত হ্যাঁ? শালা এখন ইঁদুরের গর্তে থেকে মরতে হবে।
প্রদীপের ফোন আবার বেজে উঠে ।
-শালা ফোনটা ধর !
এবার পায়চারী থামিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে প্রদীপ
- ফোন ধরে কি বলব হ্যাঁ, বল সালা ! বলব বস এই অপারেশন করতে পারিনি ক্ষমা করে দেন টাকাও যা নিছিলাম ফুর্তি করে উড়াই দিছি মাফ করে দেন। এইটা বলব?
-তাহলে তুই চলে এলি কেন? সামনে পেয়েও ঐটাকে শেষ না করে ...কেন এমন করলি?
কথার কোন জবাব দেয়না প্রদীপ।'মা মরে যাবার সময়ে রুঢ়সত্যটা বলে পাপমুক্ত হয়ে গেছে আর আজ আমি...ক্যামন করে আমি আমার...' আপন মনে বিড়বিড় করে কথা বলে । কি উত্তর দেবে সে ? কি বা বলার আছে তার? কি করে বোঝাবে সবাইকে তার বুকের ভেতরের দাহটা কতটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে তাকে!

শেষ.
সময় চলে যায়, পৃথিবীও বদলায়। বদলায় মানুষের মন। বাড়ে স্বাধীন দেশের বাতাসে শকুনের পালের দাপট।
শিখা বাপ দাদার ভিটাটুকু পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তার ইচ্ছা জায়গাটাতে যাদের ঘরবাড়ী নেই তাদের থাকার ব্যবস্থা করবে। এছাড়াও সে গ্রামের দুঃস্ত মহিলাদেরকে হাতের কাজ শেখানোসহ, মেয়েদেরকে স্কুলে যেতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। অত্যাচারী মেয়েদের পাশে ছায়া হয়ে থাকে। এই ছায়াকে অনেকেই সইতে পারেনা, পারেনা কোনভাবেই বশ করতে। অন্যায়ের কাছে শিখা অগ্নি্দাহ আর ন্যায়ের কাছে মমতায় ঘেরা আবাস চত্বর।
শিখার এখন বয়স হয়েছে চোখেও দেখে না ভাল। কিন্তু কাল সে কাকে দেখেছে সামনে? সেই চোখ, সেই মুখ! হাতে একটা কালো কি যেন নাড়িয়ে বলছিল 'ঘোড়া যখন চলব তখন মাটিতে সুয়াইয়া দিমু' সেই কণ্ঠস্বর! সবকিছু আবছা আবছা দেখেছিল শিখা। ধস্তাধস্তিতে চশমাটা ধারে কোথাও পড়েছিল। ঐ ছেলেটিই এনে চোখে পরিয়ে দিয়েছিল। তারপর শিখা কিছু বুঝে উঠার আগেই যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল। কে ও? কি চায় শিখার কাছে? তবে কি সবাই যা বলছে তাই ঠিক? তার মানে মোত্তালিব তাকে...! মনে মনে হাসে সে...সে কি বেঁচে আছে? নাকি মরে বেঁচে আছে? দেশকে স্বাধীনতা এনে দিতে যতটা গৌরব আর আনন্দ পেয়েছিল আজ এই দীর্ঘ বছর পরেও সেই আনন্দ নিয়েই মাটি আঁকড়ে সবার পাঁশে রয়েছে সে। কিন্তু যখন দেখে মোত্তালিবের মত মানুষেরা মাথা উচু করে দেশের কর্ণধার হয় তখন সব আনন্দ আর গৌরব ঘৃণায় মিশে যেতে চায়। কিন্তু সেই ঘৃণা মাথানত করে বিশ্বের মানচিত্রে রক্ত দিয়ে লেখা জ্বলজ্বল করা একটি নামে! আজ মুত্তালিবের মত মানুষের ছেলেমেয়েরা বিলাসিতার মার্গে গর্ব করে এ দেশকে নিয়ে। অথচ একজন বীরাঙ্গনার সন্তান মুখ লুকিয়ে ভুলে যেতে চায় গর্বিত সেইদিনটাকে কাল অধ্যায় ভেবে। এ কি তবে নিয়তির নির্মম পরিহাস...নাকি স্বর্গ জয়ের আগাম পূর্বাভাস!
শিখার হয়ত আরো কিছুটা সময় অবশিষ্ট আছে কাউকে একনজর দেখার আশায়! এখনো সে অপেক্ষায় থাকে প্রিয়তমর। রাতের অন্ধকারে সারা পৃথিবী যখন নিদ্রার কোলে আশ্রয় নেয় সুখে, শিখা তখন দুচোখের জানালা মেলে স্মৃতিরপাতা হাতড়াতে হাতড়াতে পথ চেয়ে থাকে। এই বুঝি এলো সে... একবার সে কাছে এলেই মুক্তির স্বাদটা নিতে পারত পুরোপুরিভাবে!
দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু বিষাক্ত বীজ বেড়ে উঠেছে সমাজের পরতে পরতে। এ বীজকে সমূলে উপড়ে ফেলা শিখার একার পক্ষে সম্ভব নয়! দেশের মানুষ এই জীবন থেকে মুক্তির পথ কিভাবে পাবে তাও সে জানেনা। আদৌ এই মুক্তি সে দেখতে পারবে কিনা তাও জানেনা। তবে কাল পর্দায় ঢাকা একটা আলোর আভাষ সে দেখতে পায়, যদিও তা বেশ খানিকটা দূরে...!
পরদিন সকালে শিখা হেটে যায় গ্রামের মেঠো পথ ধরে। শিশির ভেজা বাতাসে মন ভরে শ্বাস নেয়। তারপর শরীরে বেশ জোরে একটা ঝাঁকি লাগে তার...ছিটকে গিয়ে পড়ে পাশের ক্ষেতে। সবুজ ক্ষেতটা ধীরে ধীরে লাল হতে থাকে। অনেক মানুষের ভীড় জমে উঠে। শিখার কানে ভাসে ঘ্যার ঘ্যার ঘ্যার শব্দ ।
সবাই সেদিকে তাকায় । দেখে একটা ছোট্ট কাঠের ঠেলাগাড়ী । যার চালক নিজের দুই হাত দিয়ে বাতাসে সাঁতার কেটে কেটে এগিয়ে আসছে । হাত দুটিতে টায়ারের তৈরী একধরনের স্যান্ডেল । লোকটির হাটু থেকে দুটি পা-ই নেই । বড্ড বেশী দেরী করে ফেলেছে সে...তবুও কিছুটা অপার শান্তি -সে এসেছে ! অভিনব এক কায়দায় ঘ্যার ঘ্যার শব্দে ছুটে আসে চুল দাড়ীতে ঢাকা বৃদ্ধ লোকটি...।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • সিয়াম সোহানূর
    সিয়াম সোহানূর শুরুতেই গল্পটা টেনে নিল গল্পের ভিতর । আর বাস্তবটাও উঠে এসেছে আপন মহিমায়-- "আজ মুত্তালিবের মত মানুষের ছেলেমেয়েরা বিলাসিতার মার্গে গর্ব করে এ দেশকে নিয়ে। অথচ একজন বীরাঙ্গনার সন্তান মুখ লুকিয়ে ভুলে যেতে চায় গর্বিত সেইদিনটাকে কাল অধ্যায় ভেবে।''
    প্রত্যুত্তর . ২৪ ডিসেম্বর, ২০১২
  • তাপসকিরণ রায়
    তাপসকিরণ রায় গল্পটি ভালো লাগলো--মনে হলো বেশ দীর্ঘ কাহিনীর.অনেকটা উপন্যাস ধরনের.কোনো কোনো জাগায় কিছুটা এক ঘেয়েমিও লেগেছে.তবু লেখার ধারাবাহিকতা,ভাব,ভাষা ও শেষ দিকটা বেশ ভালো লেগেছে.
    প্রত্যুত্তর . ২৪ ডিসেম্বর, ২০১২
  • সূর্য
    সূর্য গল্পটা খুলেছিলাম গত পরশুদিন মনটা বিক্ষিপ্ত থাকায় পড়িনি। গল্পের প্লাটফর্মটা বিশাল, অনেকটা উপন্যাসের আদল পেয়েছে। প্রদীপকে দিয়ে খুন না করানোটা অনেক অন্ধকারের মাঝেও একটু খানি আলো। স্বার্থান্বেষি মানুষ যে কোনভােবই তার স্বার্থ উদ্ধার করে, তাই খুনিকে না চিনলে...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৫ ডিসেম্বর, ২০১২
    • সেলিনা ইসলাম প্রদীপকে দিয়ে দুইটা চিত্র তুলে ধরেছি ১/একজন মুক্তিসেনা ও বীরাঙ্গনার সন্তানও আমাদের দেশের পরিবেশে সন্ত্রাসী হয়ে উঠছে ২/সে খুন না করে ফিরে আসা-এটা দিয়ে বুঝাতে চেয়েছি সে সন্ত্রাসী/খুনী হলেও মাকে খুন করতে পারেনি যা একজন রাজাকারের সন্তান হলে পারত! লেখাটা নিয়ে দোটানায় ছিলাম ভেবেছিলাম উপন্যাস লিখব কিন্তু দেখি বিশাল হয়ে যায় আর তাই পরে মন পরিবর্তন করে গল্প লিখতে গিয়েই এই আস্বাদন!(যা হয় আরকি)শিখা তো একটু সুখ পেয়েছে দুঃস্থ্য মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাওয়া। এই চিন্তাটুকুও ভাল মানুষদেরকে কিছু সুখ বা আত্মতৃপ্তি দেয় আর সেখানে সে তো বাবার ব্যাগ নিয়েই গ্রামের মানুষের দারে দারে ছুটে গেছে। সুভাষরা ঠিক সময়মত একটা কাজই করেছিল যুদ্ধ করে 'স্বাধীনতা' এনেছিল। তারপর দেরী করবার একটাই কারন সেই সময়কালের পিশাচদেরকে বাঁচিয়ে রাখা নাহলে কি আজ শিখাকে জীবন দিতে হত? বা সুভাষকে দেরী করে ফিরতে হত? মনে হয়না হত! এতো সুন্দর মন্তব্য আর এতো মন দিয়ে পড়ার মত এমন পাঠক পেয়ে,তাও আবার একজন শক্তিশালী ও প্রিয়লেখকের কাছ থেকে আমি রীতিমত আনন্দে আছি অনন্ত শুভেচ্ছা ও শুভকামনা-ধন্যযোগ ।
      প্রত্যুত্তর . ২৫ ডিসেম্বর, ২০১২