বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৮৮টি

সমন্বিত স্কোর

৬.৫১

বিচারক স্কোরঃ ৪.১১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

অনুভবে অনুরণন

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

অদৃশ্য অবান্তর

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

ভেঙে যায় খেলাঘর

আমার স্বপ্ন ডিসেম্বর ২০১৬

মুক্তির চেতনা (মার্চ ২০১২)

মোট ভোট ৬০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.৫১ স্বপ্নের ডানায় ভাসে ময়ূরপঙ্খি !

সেলিনা ইসলাম
comment ৩৬  favorite ১  import_contacts ১,২৩৮
একমাত্র মেয়ে শিখীকে নিয়ে বাবা মায়ের অনেক স্বপ্ন ! তাদের মেয়ে উচ্চ ডিগ্রী নিতে বিদেশে যাবে । তারপর দেশে এসে মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেবে । আর কি চাই বাবা মা হয়ে ! যেভাবেই হোক রিফাত চৌধুরী মেয়ে শিখীকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন । পড়াশুনা না করলে যে জীবন সুন্দর হয়না তা বাবা রিফাত খুব ভাল করেই টের পেয়েছে ।মামা-খালু আর অঢেল টাকা কোনটাই তার নেই ! আর তাই কোন রকমে এম,কম পাশ করেও জীবন হয় বড় বেশী বৈরী ! তাছাড়া বর্তমানে যে প্রতিযোগিতার মাঝে সবার বসবাস তাতে বাঁচতে হলে সবার সেরা হতে হবে , মেধা আর সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যদিয়ে ।তাহলে মাথা উঁচু করে বাঁচতে কেউ আর আটকাতে পারবে না!
শিখী সেই চার বছর বয়স থেকে পড়াশুনায় মনোনিবেশ করেছে । যদিও তার আগেই হাতে খড়ি নিয়েছে ।কিন্তু তা ছিল রঙ পেন্সিলে , শব্দ খেলার ছলে কিছুটা সময় কাটানো। সে নাচ , গানও শিখেছে সেই ছোট বেলা থেকেই! এখন রিতিমত স্কুলে যাওয়া এবং বাসায়ও প্রশিক্ষকের কাছে হাতে কলমে শিক্ষা নিতে হয় । খেলার সাথী , রঙিন বই আর তাধিনা ধিনা ,না তিনা তালে তালে নাচ ,হারানো দিনের গানে তালিম নেয়া । এসব কিছুই যেন স্বপ্নেরাঙা । যা বয়ে আনে প্রতিটা দিনই নতুন নতুন এক অন্যোন্য আনন্দ !

পাখীর ডানায় ভর করে একে একে বছর টপকাতে থাকে শিখী ! সে এখন ক্লাস সিক্সে পড়ে । সবকিছুতেই একশোতে একশো ! এবং সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ফাইভে বৃত্তি পায় সোনামণি শিখী।বাবা মায়ের খুশি আর ধরে না । এদিকে অসুস্থতার কারণে দাদু বেশ কয়েক মাসের জন্য এসে শিখীদের বাসায় থাকে । আর তখনই শিখীর নাচ , গান শেখা বন্ধ হয়ে যায় ! দাদুর কথা
-“এই গুলান কি হিকাইতেছো মাইয়ারে ? যাত্রা দলের রানী বানাইবার চাইতেছো ? এই গুলা আমাগো সংস্কৃতি না ! আর আমাগো বংশে এসব আগে কেউ করে নাই !তোমরা কি বংশের পরম্পরা ভাঙতে চাইতেছো? এইসব হইব না , মাইয়ারে ভাল কিছু হিকাউ ।” ব্যস , বাবা মা আর সাহস করেননি । দাদুও অনেক খুশি হয় । পরীক্ষা দেবার জন্য শিখীকে একটা দামী কলম কিনে দেয় । কলমে দোয়া পড়ে “ফুঁ” দিতে দাদু একটুও ভুলে যায় না !এখন শুধু মায়ের সাথে সাথে স্কুল , কোচিং আর বাসায় যাওয়া আসা করে শিখী !
শিখীর বন্ধুরা যখন ড্রেস,কস্মেটিক পার্লার,মুভি,গেইম , অথবা ডিস্কোভারি চ্যানেলের কোন একটা বিষয় নিয়ে তর্কে রত ! কিংবা কে কি কিনেছে ,কোথায় গিয়েছে ,কে কাকে কি উপহার দিয়েছে, সবকিছু নিয়ে একে একে সবাই মেতে ওঠে আড্ডায় । সে তখন নীরবে বইয়ের মাঝে মুখ লুকিয়ে কান খাঁড়া করে সব কিছু শুনে যায়।তাঁর মাঝে কিছুটা ভয় কাজ করে -আর তা হল , বন্ধুরা বইয়ের বাইরের কোন বিষয়ে কিছু যদি তাকে জিজ্ঞাসা করে বসে , তাহলে সে কিছুই বলতে পারবে না ।শিখী ভাবে “ইসসস্ ওদের কত মজা,কত খেলনা আছে,কত ধরনের গেইম আছে কিন্তু তাঁর ...!”সবাই বাবা মায়ের সাথে ফ্যান্টাসি পার্কে যায় । পিঁজা , ম্যাক,ফ্রাই কত কি খায় ! আর শিখী শুধু এসব বইয়ের মাঝে পড়ে! অবশ্য মাঝে মাঝে বাবা মায়ের সাথে নানু ,দাদুর বাড়ীতে যায় , তবে সেখানেও বোঝা হয়ে ঠিকই সাথে থাকে বইয়ের ব্যাগ !

শিখীর বাসার স্যার খুব ভাল ।দুদিন পর পর একটা করে ছোটদের গল্পের বই এনে দেয় আর সে তা পড়া শেষ করে আবার স্যারকে দিয়ে দেয় ! শিখী ভাবে এই গল্পের বই পড়েও সে অনেক জ্ঞানার্জন করছে ! হয়তবা আধুনিকতার কিছু কিছু দিক তার অজানাই রয়ে গেছে । কিছুটা পিছনে পড়ে আছে সে ! কিন্তু তার যে কি হয়েছে এখন, শুধু পড়তে ভাল লাগে না।বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে ইচ্ছে করে,গল্প করতে ইচ্ছে করে ,সাজতে ইচ্ছে করে । অথচ এসব কিছুতেই বাবা মায়ের কড়াকড়ি বিধিনিষেধ আছে !
একদিন টেলিভিশনে একটা কার্টুন “টম এন্ড জেরী”দেখে ভীষণ হাসছিলো শিখী। বাবা এসে তাই দেখে শিখীকে বকাদিয়ে বলেছিল
-“যাও পড়তে বস ! সারাদিন শুধু টেলিভিশন দেখা আর হিহি করে অহেতুক হাঁসা ! পড়াশুনা কিচ্ছু নাই ! এবার পরীক্ষায় ডিম পাবে! ডিম”। সেই থেকে আর টিভি দেখতে সাহস করেনি শিখী । তারপর একদিন দেখে টেলিভিশনের তারগুলো সব খুলে রেখেছে !

শিখীর এক জন্মদিনে বাবা মা জামা , জুতা কিনে দেয় আর স্যার তাঁকে একটা বারবি ডল উপহার দেয় ! একদিন সে পুতুলটাকে নিয়ে গুন গুন করে মায়ের মুখে শোনা একটা গান গাইতে থাকে , ওমনি মা ঘরে ঢুকে পুতুলটা কেড়ে নিয়ে রেগে বলে
- “এত্ত বড় মেয়ে,এই বয়সে পুতুল খেলে ! এখন কি পুতুল খেলার সময় ! যাও লেখাপড়া কর !” শিখী ভেবে পায়না সে আরকত লেখা পড়া করবে ! আগে যেকোন জিনিষ দু একবার পড়লেই মনে রাখতে পারত কিন্তু এখন কত পড়ে তবু মনে রাখতে পারে না ! কিন্তু বাবা মাকে এই কথা কোন ভাবেই বলা যাবে না , তাহলে তাঁরা অনেক বকা দেবে ।
এভাবেই শিখী কেবলমাত্র পাঠ্য বইয়ের আধিক্যতা অর্জন করে এবং বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে এক রকম কুণ্ঠা বোধ আর জড়তা নিয়ে বেড়ে উঠে । এমন করেই পার হয়ে যায় তিনটি বসন্ত !
বসন্তের কথা মনে উদয় হতেই শিখীর চোখে ভেসে ওঠে হলুদ শাড়ী , হলুদ গাঁদা , কৃষ্ণচূড়া আর রমনা বটমূল !এগুলো সবই বইয়ের বদৌলতে আর আড়ি পেতে শোনা , শিখীর পরম স্বপ্নবিলাস ! শুধুই কল্পনার সোনা ঝরা ফাগুনের দিন!যার স্পর্শ এই নব যৌবন ক্ষণে অলৌকিক অদৃশ্য শক্তির আকর্ষণে শিখীকে কি এক রোমাঞ্চকর সোপানের দিকে যেতে বড় বেশী কাছে টানে ! তার এই অনুভূতি যেন চোখের পাতায় লেখা , আর তাই সে সব সময় লজ্জা বোধ করে ।
ইদানীং বন্ধুরা নতুন বিষয় নিয়ে আলোচনায় মুখরিত ঝড় তোলে ! মোবাইল ফোন , কম্পিউটার , ফেসবুক ,কার কতজন বিদেশী বন্ধু হয়েছে , কে কতটা এসএমএস পেয়েছে ইত্যাদি।শিখী একদিন স্কুল থেকে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে
–“মা আমাকে একটা কম্পিউটার কিনে দেবে ?” মা যেন আকাশ থেকে পড়ে
- “তোর সাহস কত ! এই বয়সে কম্পিউটার কেনার কথা বলিস!”
“কেন মা ? আমাকে তো কম্পিউটারের ক্লাস করতে হয় । আর বাসায় নেই বলে আমি অন্যদের মত করে শিখতে পারছি না ,তাই নম্বরও...”। -গাল ফুলিয়ে কথাগুলো বলে শিখী ।
-“থাক ! এই একটা বিষয়ে কম নম্বর পেলে অসুবিধা নাই ! ঐ মরার যন্ত্র বাসায় এনে কি শিখবা তা আমার জানা আছে । পেপারে যা খবর বের হচ্ছে দিন দিন তা আর...” মা শেষের কথাগুলো বিড়বিড় করে বলে তাই কিছুই শুনতে পায়না শিখী ।তাঁর আর মোবাইলের কথাটা বলার সামান্যতম ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই হয়না কিন্তু মনে প্রশ্ন থেকেই যায় “কি আসছে খবরের কাগজে?” পেপার থাকে বাবার কাছে ।শিখীকে কেউ পেপারটা পর্যন্ত পড়তে দেয় না । বাবা বলে
-“ পেপারে শুধু ধর্ষণ , মারামারি ,খুন , সড়ক দুর্ঘটনা এই সব দিয়ে ভরা ! টাকা দিয়ে আর ভয় ,আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা কিনতে চাইনা ! সকালটাই শুরু হয় মন খারাপ দিয়ে । ভয় হয় , এই যে বাসা থেকে বের হচ্ছি সুস্থভাবে ফিরে আসতে পারবো তো !মেয়েটার কোন বিপদ হবে নাতো...!” মাকে বলা কথাগুলো মনে বেশ গেঁথে আছে তার ।
কখনো কখনো অযাচিতভাবেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় শিখীকে !সেদিন যেমন ক্লাসের বন্ধুরা শাহরুখ খানের ছবি “রা–ওয়ান” নিয়ে ভীষণ ভাবে অপমান করে তাকে ! সে ভাবে ওতো শাহরুখ খান কে, তাই জানে না । সেখানে “রা–ওয়ান” কি, তা কিভাবে জানবে ! স্যারের এনে দেওয়া কোন বইতে তো এই নিয়ে সে কখনো পড়েনি ! সবাই তাকে ক্ষেত , গাইয়া , বোকা , আরো কত কি বলে! তিশা তো মুখটাকে ভেংচে বলেই ফেলল
- “ওহ মাই গড, শি ইজ সো ডাম্ব !শি ডাজান্ট ইভেন নো দ্যা লিটিল সিম্পল থিংস, শিট...!”মুখ দিয়ে বিশ্রী শব্দ করে সে ।এই কথার মাঝে ঘি ঢালে জিনিয়া
-“ ইউ নো হোয়াট-সি’জ সো এনোইং…..আই বেট শি ডাজান্ট ইভেন নো হু বিন লাদেন ইজ ...?!হা হা হা এবার কথার রেশ ধরে লেখা বলে
-“ ছিঃ ! দিস ষ্টুপিড গার্ল ডাজান্ট নো এনিথিং এবাউট দিস ওয়ার্ল্ড ! সেভ মি গসস...হি হি হি হা হা হা " সবাই সে হাসিতে যোগদেয়, হাই ফাইভদেয় !শিখী কিছুই বলে না মাথা নিচু করে মুখ ঢেকে রাখে;প্রিয় গল্পের বই দিয়ে ! আসলেই সে “বিন লাদেন” কি জানে না !সবার অগোচরে দুচোখের সীমানা জুড়ে বয়ে চলে রঙিন বর্ণমালা ! যা দেখলেই অনায়াসে পড়ে ফেলা সম্ভব ! আর তাই সে লজ্জা আর ভয়ে মাথানিচু করে চোখ মাটিতে রেখে সবাইকে পাশ কাটিয়ে চলে । পাছে সবাই তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলে ।যদিও তার হরিণী দু’চোখ জুড়ে মোটা কাঁচের দেয়াল !

নিজেকে অনেক বেশী বেমানান মনে হয় এই স্কুলটাতে , এই জগতের সমবয়সী মানুষগুলোর সাথে ! দু একজন যে ব্যতিক্রম নেই টা নয় ,আছে । তবে তাঁরাও নীরব থাকে ঠিক শিখীর মত করেই ! পড়াশোনার প্রতি একেবারেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে শিখী । ক্লাসের পরীক্ষাগুলোতে শিখী আগের মত একশোতে একশো পায়না ! বাবা মা , বাসার স্যার এমন কি স্কুলের শিক্ষকেরা শিখীকে বকা দিতে থাকে ! তাকে নিয়ে তাঁদের সবার অনেক আশা ,অনেক স্বপ্ন ! হেডস্যার বাবাকে ফোন করে ডেকে এনে কিসব যেন বলে । আর তাই বাসায় ফিরেই বাবা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে -
-ছিঃ ছিঃ ! কোনদিন ভাবিনি আমার মেয়ের কারণে আমাকে মানুষ ডেকে নিয়ে বলবে যে , আপনার মেয়ে এমন রেজাল্ট করলে এই স্কুলে রাখা সম্ভব নয় !
একধরণের অপমানিত বোধ করেন রিফাত চৌধুরী । ভীষণভাবে মন খারাপ করে থাকেন তিনি । শিখীর সাথে সাথে মাকেও ভীষণভাবে বকাবকি করেন !
শিখীর মনে হয় বাবা মা খাবার বেলাতেই যেন একটু অতিরিক্তই আদর করেন ! দুজনে মুখে তুলে খাইয়ে দেন ! বাবা মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে পড়াশুনা করলে কি হবে , না করলেও তার ফল কতটা ভয়ংকর হবে তাই নিয়ে খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলে । কিন্তু রাগারাগির পরে কেউ আর শিখীকে খেতে ডাকেনা ! দুজনেরই কথা “পড়াশুনা তাঁদের মনের মত না করলে তাকে কেউ ভাত খেতে দেবে না !” সেও রাগ করে আর খেতে যায়নি ! না খেয়ে নির্ঘুম রাত কাটায় শিখী । ওদিকে জেবা ও রিফাত দুজনেই খাওয়াদাওয়া রেখে , মেয়ের ভবিষ্যতের আশংকায় ভাষাহীন নীরবে দীর্ঘ রাত পাড়ী দেয় ।

ইদানীং শিখীর জানালার কাছে নাম না জানা একটা পাখি এসে বসে ! সে অনেক খুশি হয় । শিখী মন খুলে পাখির সাথে কথা বলে ! ভালোবেসে পাখীটার নাম দেয় টুনটুনি ।সেও তাকে দেখতে আসে প্রতিদিন । স্কুল থেকে এসেই শিখী খাবার নিয়ে অপেক্ষা করে প্রিয় বন্ধুটির জন্য ! টুনটুনি শিখীকে একটুও ভয় পায়না ! সে শিখীর বিছানায় বসে ,আর শিখী হাত বুলিয়ে আদর করে দেয় টুনটুনির লাল ঝুটি আর লেজটাতে !কিছুটা ভাললাগে শিখীর । কিছুদিন ধরে অকারণেই তার দমবন্ধ হয়ে মরে যাবার একটা তীব্র জ্বালা ছিল মনে,এখন তা কিছুটা উপশম হয়েছে ! ডায়রি থাকা স্বত্বেও শিখী বাবা মা যাতে বুঝতে পারে সে ক্লাসের পড়াশুনা করছে , তাই মনের সব না বলা কথাগুলো ছোট্ট ছোট্ট অক্ষরে জায়গা দেয় একটা খাতায় । এমনকি বাবা মায়ের অতিরঞ্জিত , অহেতুক শাসন , সামর্থ্য না থাকা স্বত্বেও কষ্ট করে অভিজাত স্কুলে ভর্তি করা , শিখীর প্রতি বিশ্বাস নেই বলে সব সময় হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত থাকা , আরো অনেক বিষয়যা অন্য সবার ভাবনাকেও হার মানায় ! সব কথাঅতি যত্নসহকারে সুন্দর করে লিখে রেখেছে ! এভাবেই তার শৈশব , কৈশোর সবকিছু শুধু জ্ঞানার্জনের জন্য নিহিত থাকবে , এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা ! কিন্তু টুনটুনিকে পেয়ে শিখী মনের অনুভূতি গুলো লিখতে ভুলে গেছে । সে এখন যেন এক বাধাহীন খুশীর ঝর্ণাধারা !

- “জানিস আমার না এত পড়তে ভাল লাগে না ! আমার সবার মত বেড়াতে ইচ্ছে করে , বাবা মায়ের হাত ধরে ফেন্টাসিয়াস-এর সব স্বাদ নিতে ইচ্ছে করে ! স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে ,আমিওতো বন্ধুদের মত বড় হয়েছি ! বাবা বলে আমাকে ডাক্তার হতে হবে । আর মা বলে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। কিন্তু জানিস -আমার না খুব শখ আমি একজন আর্টিস্ট হব ! সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকবো আর সারা দেশ ঘুরে ঘুরে অনেক অনেক ছবি তুলব ! প্রকৃতির লীলাভূমির সৌন্দর্য আমার হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখে ক্যানভাসে রং তুলির সজ্জায় জীবন দেব । নীলের মাঝে সাতরঙা ঘুড়ির ঢেউ খেলানো পালে সোনালী রোদের আলো ,আর ফুলের হাসিতে পৃথিবী সাজাবো !”কথাগুলো বলে হাঁপিয়ে যায় সে । আজ যেন বাঁধনহারার দিন ।অদম্য উৎফুল্লতার জোয়ারে মেঘের ভেলায় নেচে যায় শিখী! একটু দম নিয়ে আবার শুরু করে
-“সবাই যখন ইতিহাস ভুলে যাবার আদিমতায় মেতে উঠবে , আমার আঁকা ছবি তখন কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে !এই দেখ আমিতোর ছবি এঁকেছি !” একটা কাগজ দেখিয়ে বলে “এই দেখ এইটা আমি আর আমার হাতের উপর এই দেখ দেখ , এইটা তুই বসে আছিস ! আমার যে তোর মত করে উড়তে ইচ্ছে করে !” মন এবার খারাপ হয়ে যায় ! শিখীর কথার শব্দে ঘরে ঢুকে বাবা ! চিৎকার দিয়ে মাকে ডাকে
-“জেবা ! জেবা !” মা ঘরে ঢুকতেই বাবা রেগে বলে
-“এই পাখী কোথা থেকে এলো ! এই জন্য মেয়ে রেজাল্ট খারাপ করছে ! সারাদিন বাসায় থেকে কি কর ? একটা মেয়ে তার দিকেও খেয়াল দিতে পার না যে ! সে পড়াশুনা বাদ দিয়ে কোথাকার একটা পাখীর সাথে বকবক করেই যাচ্ছে !" বাবাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই টুনটুনি চলে যায় । সেই সময়ই বাবা জানালাটা পেরেক আর কাঠের তক্তা দিয়ে আঁটকে দেয় , যেন পাখীটা আর না আসতে পারে । শিখীর এখন আর কিছুই ভাল লাগে না । স্কুলে যেতে মন চায় না । টুনটুনির জন্য আকুলতায় দিনগুলো হয় দীর্ঘায়ত ! নাওয়াখাওয়া একরকম ছেড়েই দেয় শিখী । উদাসী হাওয়ায় অনিচ্ছাকৃত ভাবেই সে তার ভারী মনটাকে বয়ে নিয়ে চলে !

কি ঝড় , অথবা বৃষ্টি , শিখী যেদিন থেকে স্কুলে যায় সেদিন থেকে আজ অব্দি একটা দিনও স্কুলে অনুপস্থিত থাকেনি ! স্কুলে ১০০%উপস্থিত থাকার সেরা সার্টিফিকেটটিও শিখীই সব সময় পেয়ে এসেছে ! একদিন সকালে শিখীর খুব জ্বর এবং প্রচন্ড মাথায় ব্যথা ,তাই শুয়ে আছে । মা ঘরে ঢুকে তাকে শুয়ে থাকতে দেখে বেশ রেগে যায়। বলে -
-“আরে তুই এখনো বিছানায় ! যা রেডী হয়ে স্কুলে যা”। কি এক অভিমানে কিছুই বলে না শিখী ! সে সত্যিই জ্বর নিয়ে স্কুলে যায় ।দুই ঘণ্টা না যেতেই শিক্ষকের ফোনে শিখীর অস্বাভাবিক আচরণের কথা শুনে বাবা মা ছুটে যায় স্কুলে । রিকশায় করে যেতে যেতে জেবা আর রিফাত বুকের ধন শিখীর জন্য অস্থির হয়ে থাকে । দুজনেই সিদ্ধান্ত নেয় সামনের ঈদের বোনাস পেয়ে সবাই মিলে শিখীর পছন্দের সমুদ্র স্নানে যাবে । মেয়েকে কষ্ট করে হলেও একটা ভাল স্কুলে দিয়েছে কিন্তু আর কিছুই তো করতে পারছে না মেয়েটার জন্য ! যে বেতন তা দিয়ে বাবা মাকে টাকা পাঠিয়ে, শিখীর পড়াশুনার খরচ করে ,যাথাকে তাতে মাসের ২০ দিনও সংসারের খরচ যায়না ।দুজনেরই বড় সাধ মেয়ে তাদের লেখাপড়া শিখে যেন নিজের পরিবারটাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করতে পারে ! জেবা আর রিফাত মেয়ের দুশ্চিন্তায় বারবার আল্লাহের কাছে দুহাত তুলে করুণা ভিক্ষা চায় , যেন শিখীকে তিনি সুস্থ রাখেন । দুজনে সোজা হেডস্যারের রুমে যায় । দেখে শিখী ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে কি যেন বিড়বিড় করে নিজের সাথে কথা বলছে ! রিফাত আদর মাখা কণ্ঠে ডাকে-
-“মা শিখী মণি ! মাগো...” হাতটা ধরতেই ছাড়িয়ে নেয় শিখী ! বাবা মাকে চিনতেই পারে না সে ! শুধুই টুনটুনিকে খুঁজে বেড়ায় আর তাঁর বুকের মাঝে যকের ধনের মত আঁকড়ে ধরে রাখে সেই নোটবুকটি । যার প্রতিটি পাতায় জায়গা করে নিয়েছে শিখীর অপূর্ণ ভালোবাসা । সুপ্ত মনের চাওয়া-পাওয়া , রূপকথার কাহনী ! সে কাল রাতেওশেষ দুটি লাইন লিখেছে-

"টুনটুনি , আমিও তোর মত স্বাধীন হব
মুক্ত ডানা মেলে,বিশ্বজগত দেখে নেব !"
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মিলন  বনিক
    মিলন বনিক মুক্তির অগ্রদূত বীর বিজয়ী...অভিনন্দন!!
    প্রত্যুত্তর . ২২ এপ্রিল, ২০১২
  • সেলিনা ইসলাম
    সেলিনা ইসলাম সবাইকে অনেক ধন্যবাদ ,আপনাদের আশীর্বাদের সম্মানটুকু অদূর ভবিষ্যতেও যেন রাখতে পারি -শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইল সবার জন্য ।
    প্রত্যুত্তর . ২৪ এপ্রিল, ২০১২
  • ফেরদৌসী বেগম (শিল্পী )
    ফেরদৌসী বেগম (শিল্পী ) সেলিনা আপা, চলে এলাম এখানেও!! আপনাকে পেয়ে সত্যিই খুব্বি ভালো লাগছে। সত্যিই গল্পটি অসম্ভব সুন্দর লিখেছেন। অনেক অনেক ভালোলাগা রইলো। সেইসাথে রইলো আমার প্রানঢালা অভিনন্দন, শুভেচ্ছা আর শুভকামনা।
    প্রত্যুত্তর . ১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪