বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ মার্চ ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ১৪টি

হ্যাকিং গোল্ডওয়েজ

বৃষ্টি আগস্ট ২০১২

(রহস্য গল্প) নিয়তির হাসি – ২

সবুজ জুলাই ২০১২

কমেডি

শীত জানুয়ারী ২০১২

শীত (জানুয়ারী ২০১২)

নিয়তির হাসি

নাজমুল হাসান নিরো
comment ২৮  favorite ২  import_contacts ৫৪৭
শেষ পর্যন্ত সমস্যাটার একটা সমাধান খুঁজে বের করতে পারলাম আমি। তিথীকে সরিয়ে ফেলতে হবে দুনিয়া থেকে। অসহ্য এই মেয়েটাকে যে কোন কুক্ষণে বিয়ে করেছিলাম! মেয়েটার জন্য আমার জীবনের সমস্ত আনন্দ মাটি হতে বসেছে।
কী আছে মেয়েটার মধ্যে! একেবারে সেকেলে ধরণের একটা মেয়ে। অবাস্তব সেকেলে!!! আধুনিক যুগের মেয়ে হয়ে কোথায় শার্ট-প্যান্ট, না-হয় টপস্-জিনস্ পড়বে; এ্যাট-লিস্ট ফতুয়া পড়লেও পড়তে পারতো। তা-না ওর একটাই কথা ও শাড়ী ছাড়া কিছু পড়বে না। শত বলেও কিছু করা যায় না। আমার অফিসিয়াল পার্টিতে তো ও আমার জন্য লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আমার কলিগদের ওয়াইফরা যেখানে কত স্মার্ট হয়ে আসে সেখানে ও গোঁড়ামী করে শাড়ী পড়ে যাবে। বলে এটা নাকি বাঙ্গালিয়ানা পোশাক। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায় সবার মুচকি-মুচকি হাসি আর কটাক্ষ দেখে। আরে ওসব বাঙ্গালিয়ানার দিন কী আছে! সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল ব্যাপার। এখন অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। ও তা বুঝতেই চায় না।
আবার নাকি আমাকে জীবন দিয়ে ভালবাসে। ঢং আর কি! করে তো একা সাধারণ রিসিপশনিস্টের চাকুরি। সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ডিউটি। সারাদিন কাছে পাবার উপায় নেই। সন্ধ্যা হলে ভাঙ্গা রিঙ্ার মত ঠেলতে ঠেলতে বাড়ি এসে রান্না শুরু করে দেয়। আর মাস শেষে মাত্র কিছু টাকা এনে তুলে দেয় আমার হাতে। এখনকার যুগে সেটা তো কোন টাকাই না। চা-সিগারেটের খরচ আর-কি। আমার বেতনটা অবশ্য খারাপ না। তারপরও এই যুগে এরকম বেতনে কোনভাবেই আভিজাত্যের সাথে চলা যায় না। আর সবচেয়ে বড় যেই ব্যাপার সেটা হল উপরে ওঠা দরকার। এই পজিশনে পড়ে থাকলে চলবে না। যেটা তিথীকে দিয়ে সম্ভব না। ওর ফ্যামিলিতে এমন কেউ নেই যে আমাকে এত্তটুকুও হেল্প করতে পারে।
এক্ষেত্রে আমার জন্য বড় ধরণের একটা অপরচুনিটি লামিয়া নামের মেয়েটি। আমার এম.ডির মেয়ে। এক অফিসিয়াল পার্টিতে পরিচয়। সেই পরিচয়টা অল্প অল্প করে অনেক গভীরে চলে গেছে এখন। আমার সুদর্শন চেহারায় একদম মজে গেছে মেয়েটা। যে কোন সময় আমাকে বিয়ে করতে প্রস্তুত। শুধু বলে তিথী নামের ভূতটাকে ডিভোর্স দিয়ে সরিয়ে ফেলতে। তারপর আমাদের বিয়ে করতে কোন বাধা নেই। বাবার একমাত্র মেয়ে। মেয়ের ইচ্ছায় কোনভাবেই অমত করবে না ওর বাবা - এটা আমরা দুজনই জানি। লামিয়াকে বিয়ে করতে পারলে আমার উপরে ওঠার সিঁড়িতে আর কোন বাধা নেই। বিয়ের সাথে সাথে শুরু হবে প্রমোশনের চেইন। আর শ্বশুর মশাই গত হলেই তো একেবারেই মওকা। একেবারে পুরো প্রপার্টির মালিক বনে যাব আমি। এই সুযোগটা কোনভাবে হাতছাড়া করা যায় বলুন?
কিন্তু সমস্যাটা হল তিথীকে কোনভাবেই ডিভোর্স দেয়া সম্ভব না। ও জীবন থাকতেও ডিভোর্স লেটারে সই করবে না এটা ভালভাবেই জানি আমি। তাছাড়া ডিভোর্স লেটার পেয়ে ও যদি আত্নহত্যা করে বসে তাহলে সেটা আবার আরেক ঝামেলার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আর মোটের উপর ওর সাথে আমার এমন কিছু ঝগড়া-ঝাটি হয়নি যে হঠাৎ করেই ডিভোর্সের কথা তোলা যাবে।
সুতরাং...
বিকল্প ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে আমাকে।
খুন করব আমি তিথীকে। এছাড়া আমার সামনে আর কোন রাস্তা নেই। লামিয়াকে একটা অপরচুনিটি হিসেবে পাওয়ার জন্য কাজটা আমাকে করতেই হবে। তাছাড়া একটা বড় সুযোগ চির জীবনের মত হাতছাড়া হয়ে যাবে আমার।
কিন্তু কাজটা করব আমি প্রচন্ড নিখুঁতভাবে। একটা কাক-পক্ষীও টের পাবে না। এমনকী তিথীও জানবে না ওকে খুন করলাম আমি। পুরো একটা সাইলেন্ট এ্যাসেসিন লিড করবে কাজটার।
আজ শুক্রবার। আমার অফিস নেই।
তিথী যে হসপিটালে চাকুরি করে সেটা খুব নামকরা। বাইরে থেকেও প্রচুর রোগী আসে। আর সেজন্য শুক্রবারেও ওর হাফ-ডে অফিস করতে হয়। দুপুর পর্যন্ত বাসায়ই থাকে। দেড়টা বাজলেই বাসা থেকে বের হয়ে যায় আবার ফেরে আসে ঠিক সাড়ে ছ'টায়। এসেই আবার রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে।
দুপুর পর্যন্ত আমাকে খুব উৎকন্ঠায় থাকতে হল। তিথী কখন যাবে এই নিয়ে। ওর সাথে ঠিকমত কথাও বলতে পারলাম না। বারবার আড়ষ্ঠ হয়ে যাচ্ছিলাম। অন্য কেউ হলে ঠিকই ধরে ফেলত। কিন্তু তিথী অতটা চালাক চতুর মেয়ে নয়। ওর চোখে কিছুই ধরা পড়ল না। দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে ঠিকঠাকমত বের হয়ে গেল।
আর তিথী বের হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমার সমস্ত দ্ভিধা উদ্বিগ্নতা যেন উবে গেল। পূর্বের ছাঁচে ফেলা প্ল্যান অনুযায়ী আমি কাজ শুরু করে দিলাম।
আমার প্রথম কাজ হল একটা কয়ের দেড় ঘন্টায় ঠিক কতটুকু পোড়ে তা বের করা।
দুটো কয়েল নিলাম। একটা জ্বালিয়ে দিলাম আর মোবাইল ফোনের রিমাইন্ডারে ঠিক এক ঘন্টা তিরিশ মিনিট সেট করে দিয়ে সোজ বসে পড়লাম টিভি দেখতে। কয়েলটা ধীরে ধীরে ধোঁয়া আর ছাইয়ে কনভার্ট হচ্ছে আর আমার ফুর্তিটাও ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে। তিথী কী ঘূণাক্ষরেও টের পাচ্ছে আজকে ওর জীবনের শেষ দিন হতে যাচ্ছে।
রিমোটে চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে কখন যে দেড় ঘন্টা পার হয়ে গেল টের পাইনি। চমকে উঠলাম রিমাইন্ডারের এ্যালার্ম শুনে। দেড় ঘন্টা শেষ হয়ে গেছে। উঠে দ্রুত নিভিয়ে ফেললাম কয়েলটা।
কয়েল দুটো একটার উপর আরেকটা রাখলাম। দেখলাম কয়েলটা দেড় ঘন্টায় পাঁচ খাঁজের কিছু বেশি পুড়েছে। পুরান কয়েলটা যে পর্যন্ত পুড়েছে নতুন কয়েলের ঠিক সেই জায়গায় ভাল করে মার্কার পেন দিয়ে দাগ দিয়ে নিলাম।
আপাতত কাজ শেষ। আবার বসলাম টিভি দেখতে চারটা পঞ্চাশে এ্যালার্ম দিয়ে।
চারটা পঞ্চাশে আবার ঝটপট উঠে পড়লাম। সোজা চলে এলাম রান্নাঘরে। একটা কাগজকে ভাঁজ ভাঁজ করে কয়েলের টেম্পোরারি ষ্ট্যান্ড বানালাম। অরিজিনাল ষ্ট্যান্ড ব্যবহার করা যাবে না। কারণ সেটা ক্লু হয়ে যেতে পারে। তাই এই ব্যবস্থা।
রান্নাঘরের দুদিকের জানালাই বন্ধ করে দিলাম। কিছু ওয়েষ্ট পেপার রাখরাম কয়েল ষ্ট্যান্ডের পাশে। যাতে কয়েলের ছাই আর কাগজ পোড়ানো ছাই একত্র হয়ে কয়েলের ছাইটা বিলীন হয়ে যায়। কেননা কয়েলের ছাইটাও একটা ক্লু হয়ে যেতে পারে। কারণ রান্নাঘরে কেউ তেমন একটা কয়েল জ্বালে না। রান্নাঘরে মশা হয় না। আর কাগজের ছাই? রান্নাঘরে ওয়েষ্ট পেপার সকলেই রাখে দিয়াশলাইয়ের কাঠি বাঁচানোর জন্য। সুতরাং কাগজের ছাই কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়।
এবার কয়েলটা ষ্ট্যান্ডের উপর রেখে দিয়াশলাইয়ের ঠিক পাঁচটা কাঠি রাখলাম কয়েলের দাগ দেয়া জায়গার একটু পেছনে। একটু পেছনে রাখলাম কারণ তিথী এসে যদি সামান্য একটু রেস্ট নেয়। যদিও ও রেস্ট নেয় না তারপরও আমি রিস্ক নিতে চাইছি না। আর রেস্ট যদি নাও নেয় তাহলেও পরিস্থিতির কোন হেরফের হবে না।
কয়েলটা জ্বালিয়ে দিলাম।
আর সবশেষে গ্যাসের চুলা দুটো ফুল পাওয়ারে ছাড়িয়ে দিয়ে বের হয়ে এলাম দরজাটা ভাল করে বন্ধ করে।
যারা ইতোমধ্যে আমার প্ল্যানটা ধরে ফেলেছেন তারা অতিশয় চালাক এটা আমাকে স্বীকার করতেই হবে। আর যারা এখনও আমার প্ল্যানটা বুঝতে পারেননি তারা নিতান্তই বোকা সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ঠিক আছে আমি বুঝিয়ে বলছি ব্যাপারটা।
শুনুন - মিসেস তিথী অফিস থেকে ফিরবে ঠিক সাড়ে ছয়টায়। আগেই বলেছি ও অফিস থেকে ফিরে সোজা রান্নাঘরে যায়। এখন রান্নাঘরে গেলে কী হবে? শুনুন তাহলে।
আমি ঠিক পাঁচটায় চুলার গ্যাস ছেড়ে দিয়েছি। একটানা দেড় ঘন্টা গ্যাস ছাড়া থাকলে গোটা ঘর ভর্তি হয়ে যাবে গ্যাসে। আর দেড় ঘন্টায় কয়েলটা ঠিক যতটুকু পুড়বে ঠিক তার কাছেই রাখা আছে দিয়াশলাইয়ের কাঠি। দেড় ঘন্টার মধ্যে কয়েলটা জ্বলতে জ্বলতে কাঠির জায়গায় পেঁৗছে যাবে। আর সাথে সাথে জ্বলে উঠবে পাঁচটা কাঠি। তার মানে কী? মানে দুইয়ে দুইয়ে চার।
তিথী ঠিক যে মুহূর্তে রান্নাঘরে ঢুকবে তার দুই-এক মিনিটের মধ্যেই ঘর ভর্তি গ্যাস দিয়াশলাইয়ের কাঠির আগুন পেয়ে ঠিক বোমার মতই বিস্ফোরিত হবে। আর তিথী? বুঝতেই পারছেন।
আমার পুরো প্ল্যান সাকসেস হয়ে যাবে।
সব ঠিকঠাক রেখে দরজায় তালা মেরে আমি বেরিয়ে পড়লাম হাওয়া খেতে। ইচ্ছেটা এরকম সাতটার দিকে এসে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দেব। পাশের পার্কে এসে বসলাম দু' ঘন্টা সময় কাটানোর জন্য।
দেখতে দেখতে পৌণে এক ঘন্টা কেটে গেল। প্রায় ছ'টা বাজে। আর মাত্র আধাঘন্টা। তাহলেই আমার পুরো প্ল্যান সাকসেস হয়ে যাবে।
হঠাৎ একটা সন্দেহ মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠল। সবকিছুই ঠিকঠাকমত করেছি মনে পড়ছে। কিন্তু চুলার গ্যাস ছেড়েছি কি-না কোনক্রমেই নিশ্চিতভাবে মনে করতে পারলাম না। বারবার সন্দেহ হতে লাগল গ্যাসের চুলাটা ঠিকমত ছেড়েছি তো। সন্দেহটা মাথা থেকে সরাতেই পারলাম না। আবার ঠিকমত মনেও করতে পারলাম না ছেড়েছি কি-না।
নাহ্- ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে আসা দরকার। কাছেই তো বাসা। পাঁচ মিনিটের রাস্তা। অগত্যা আবার বাসার রাস্তা ধরলাম।
রান্নাঘরে ঢুকে গ্যাসের গন্ধতেই টের পেলাম নাহ্ ভুল হয়নি। গ্যাস ছেড়েই গিয়েছিলাম। কয়েলটাও ঠিকঠাক আছে কি-না দেখার জন্য কয়েলের দিকে তাকালাম।
আর মুহূর্তেই অাঁতকে উঠলাম। একি! একটা কাঠি কিভাবে যেন গড়িয়ে কয়েলের আগুনের উপর গিয়ে পড়েছে।
অর্ধ সেকেন্ডের মধ্যে বুঝে গেলাম কী ঘটতে যাচ্ছে। একটা চিৎকার দিয়ে সোজা লাফ দিলাম কয়েলের উপর। কাঠিটাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য।
কিন্তু তার আগেই ব্যাপারটা ঘটে গেল অবিশ্বাস্যভাবে। জ্বলে উঠল কাঠিটা আর গোটা ঘরের গ্যাস মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হল।
আমার আমিটা আমার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শূন্যে ভেসে উঠলাম। কিন্তু ঠিক তার আগেই আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পেলাম নিয়তি আমার দিকে তাকিয়ে ক্রুর হাসি হাসছে। হাসিটার মর্মও বুঝতে আমার দেরি হল না।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন