বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ এপ্রিল ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ১২টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৮৭

বিচারক স্কোরঃ ২.৪৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

চোর

অস্থিরতা জানুয়ারী ২০১৬

মৃত্যুর কয়েক দিন আগে

দুঃখ অক্টোবর ২০১৫

পিতৃহত্যার দায়

গভীরতা সেপ্টেম্বর ২০১৫

শিক্ষা / শিক্ষক (নভেম্বর ২০১৫)

মোট ভোট ২০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৮৭ মূল্যবোধ

ফয়সল সৈয়দ
comment ১৯  favorite ১  import_contacts ৬৬৮
উত্তপ্ত রৌদ্রে হাঁটছেন মিনহাজ মাস্টার।ছাতা মাথায় ও লবণাক্তজল উপচে পড়ছে।স্যাঁত স্যাঁতে শরীরে চোখেমুখে বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট।দুটো বিশ টাকার নোট ছাড়া পকেটে তেমন কিছু নেই।হাজার খানিক টাকা না হলে বা কি দিনগুলো যে আর চলে না ।
ডিসেম্বর মাস এমনিতে ভালকাটে না।টায়ে টায়ে চলা সংসারটা এ মাসে মুখ দুমড়ে পড়ে।মিলাতে-পারে না আয়-ব্যয়ের হিসাব নিকাশ।ছাত্র ছাত্রী তেমন একটা পড়তেআসেনা।যে কয় জন আসে তারাও অনিয়মিত।কয়জন অভিভাবক-ই বাবুঝে গণিত বিষয়টি সারা বছর চর্চা করতে হয়।গণিতছাত্র-ছাত্রীদের বুদ্ধিবাড়ায়।যে ছেলে গণিতে ভাল সে ধীরে ধীরে অন্যান্য বিষয়ে ও ভালছাত্র হয়ে ওঠে।মাঝে মধ্যে ভাবেন, ইস ! গণিত স্যার না হয়ে যদি ইংরেজি স্যার হতেন।তাহলে বোধ হয় সংসারে থাকত না এত অভাব অনটন।

দ্রুত পায়ে হাঁটছেন মিনহাজ মাস্টার।
যেভাবেহউক টাকা তাকে যোগাড় করতে হবে।কিন্ত কী ভাবে যোগাড় করবে? কার কাছে যাবে? পরিচিত যে কয়জন থেকে টাকা ধার নেওয়া যায়,সবার কাছে মুখ বেচা হয়ে গেছে তার।কয়েকদিন আগে স্কুলের পিয়ন কাসেমের কাছ থেকে টাকা চাইতে গিয়ে আক্কেল সেলামি দিল মিনহাজ মাস্টার।কাসেম,পিয়ন হলেও কিহবে এই চট্টগ্রামে শহরে তার নামে কয়েক বিঘা জমি আছে।মানে পিয়ন কাসেম রীতি মত একজন জমিদারও বটে।
কাসেম।
জি,স্যার।
তুই বেতন কতপাস ?
ক্যান ? স্যার।
মিনহাজ মাস্টার জানে তার বেতন কত।তবু কাছ থেকে শুনতে ইচ্ছে করছে খুব,আ-রেবলনা।
স্যার, পাঁচহাজার, পাঁচ হাজার পাঁচশ।
কাসেমের চেয়ে তিন গুণ বেতন বেশি পায় সে।তবু সংসারে অভাব লেগে আছে।মাত্র পাঁচ হাজার পাঁচশ দিয়ে বেটা চলে কী ভাবে ? ভয়ে শিউরে উঠে।সংসারচলে তোর ! বলল মিনহাজ মাস্টার।
জি,স্যার।বউ, দু' ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভালাই তো আছি। পাহাড় তলীর জায়গাটিতে সেমিপাকা কয়েকটি ঘর তুলে ভাড়া নিচ্ছি।সব মিল্যা ভালাই আছি।ক্যানস্যার ?
না।এমনি জিজ্ঞেস করলাম।ধর পঞ্চাশটাকা দিয়ে চা-বিস্কুট খাইস।
কাঁচু মাচু করে পঞ্চাশ টাকার নোটটি হাতে নিয়ে লম্বা একটা সালাম দিয়ে সরে পড়ল কাসেম।
মিনহাজ মাস্টার অনেকক্ষণ ভাবলেশ হীন ভাবে বসেরইল অফিস রুমে।মাঝে মধ্যে তিনি নিজের উপর নিজে-ইবি রক্ত লাগে।কী দরকার ছিল উপযাচক হয়ে কাসেমের সাথে কথা বলার।আর কথা বলল যখন, তখন শুধু শুধু টাকা দেওয়ার কি দরকার ছিল।যখন চাইতে পারেনি, দেওয়ার তো মানে হয় না।তার কাছে পঞ্চাশ টাকাও এখন বিশাল অঙ্ক।

স্ত্রীর সকালের কথা গুলো এখনো কানে আছাড় খাচ্ছে।
পুরুষ মানুষ টাকা ছাড়া অর্থহীন।নপুংসক।পুরুষ সব সহ্য করতে পারে নিজের টেস্টোস্ট্রেন নিয়ে টিটকারী সহ্য করতে পারেনা।কিন্ত নিজের অস্বচ্ছলতায় জন্য মিনহাজ সেই অপবাদও হজম করে ফেলছে ইদানীং।
ঠিক-ইতো।টাকা ছাড়া পুরুষ মানুষ মেরুদন্ডহীন।এই টাকার জন্য স্ত্রীর কত ইচ্ছে যে পূরণ করতে পারেননি।তাই তার দু' কথায় মিনহাজ মাস্টার চুপ বনে যায়।কটু কথা শুনতে শুনতে তারদু' কান থেঁতলে ভোতা হয়ে গেছে।অভাবে সংসারের স্ত্রীরা একটু আধটু চিৎকার চেঁচামেচি করবে এটাই স্বাভাবিক।এরা স্বভাবত;রগচটা, ঠোঁটকাটা স্বভাবের হয়ে থাকে।

চশমা চোখে মিনহাজ মাস্টার ভরদুপুরেও ঝাপসা দেখছে।শীতের সকালের মতোন পরিবেশটা যেন গুমোট হয়ে আছে। বয়সের ভারে চশমার পাওয়ারটা এখন তেমন কাজ করেনা।একমাত্র মেয়ে নাজলীর কথা চিন্তা করতেই মাথাটা চিনচিন করে ওঠে।মেয়েটি মার মত হয়নি ।বিপদে উল্টা আশার বানী শুনায়, বাবা, দেখ মাত্রতো কয়টা দিন মাস্টার্স শেষ হলেই চাকুরি।তোমাকে আর এত চিন্তা করতে হবেনা।
মিনহাজ মাস্টারের চোখের কোণায় বিন্দু বিন্দু জল চিকচিক করতে থাকে।মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলে, নারে মা তোকে চাকুরি করতেহবেনা।একজন ভাল পাত্রের হাতে তুলে দিতে পারলেই স্বস্তি, স্বার্থকতা।
আ্যই বাবা, তোমাদের সব বাবাদের সেই এক দোষ।মেয়ে একটু বড় হলেই তাকে পর করেদেওয়ার চিন্তা। ছেলে হলে কি বলতেতোর জন্য একটি ভাল পাত্রী ... বাচ্চা মেয়ের মত খিল খিল করে হেসে উঠে বলে ; না বাবা বলতে না।
বুঝবিরে মা, বুঝবি ; সংসার কর।দায়িত্বনে।তার পর বুঝবি।
জানালার ফাঁক দিয়ে বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে মিনহাজ মাস্টার রাশভারী কণ্ঠে বলে ; পৃথিবীর অনেক কিছু-ই মানুষকে শিখতে হয়না। সময়-ইমানুষকে হাতে কলমে শিখিয়েদেয়।
বাবা, বাবা তোমার কথা বার্তা শুনে মাঝে মধ্যে মনে হয় তুমি শিক্ষক না হয়ে কবি কিংবা লেখক হলে ভাল করতে।
থাক, মা থাক।এমনিতে সংসার চালাতে বারোটা বেজে যাচ্ছে ।কবি, লেখক হলেতো... কথাই নেই।
সে কি বল ! হুমায়ুন আহমেদ শিক্ষকতা ছেড়ে লেখালেখি করছেনা।
কয়জন-ই বা হুমায়ুন আহমেদ হতে পারে।
চেষ্টা করলে তুমি পারবে বাবা তোমার কথা আর্ট আছে।
হুমায়ুন আহমেদের লেখা তুই পড়িস ?
আগে পড়তাম।
-এখন ?
-এখনও পড়ি তবে কম। ন্যাকামি লাগে।ওর লেখা গুলো পড়তে ভাললাগে।কিন্ত শেষে লেখার মাথা মুণ্ডু কিছুই খুঁজে পাইনা।
মিনহাজ মাস্টার মেয়ের কথায় হাসতে হাসতে কুঁজো হয়ে যান।এবার বল, মেয়ে হয়ে বাবার লেখা না পড়লে,বাবা হয়ে আমার কেমন লাগবে ?
-আচ্ছা, বাদদাও । হুমায়ুন আহমেদ না হয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শাহেদ আলী, শওকত ওসমান তো হতে পারতে।
ওদের জীবনী পড়েছিস ? কবি জীবনানন্দ দাশ সর্ম্পকে তুই কতটুকু বা জানিস। যা কে আমার মাথা তুলেনাচছি এখন। তিনি কিন্ত খুব অর্থে কষ্টে মধ্য দিয়ে তার জীবন পার করেছেন ,তার উপর শনিবারের চিঠিতে সমালোচকদের উৎপাত।রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো তো উনি লিখে তোষকের নীচে রেখে দিয়েছেন।এই ভয়ে কেউ আবার বলে না বসে তিনি জসিম উদদীনের স্টাইলে কবিতা লিখছেন।
-হুম,জানি বাবা জানি।উনার মৃত্যুর পরে বইটি প্রকাশিত হয়।না জলীর গলায় আগের মত সে-ইপ্রত্যয়নেই।
-আসলে মা আল্লাহ যদি আমাকে লেখালেখির শক্তি বা মেধা দিয়ে পাঠাত।তোকে বলতে হত না।আমি লেখক-ই হতাম।শিক্ষক না।ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের কথায় আর মানুষ বেঁচে থাকে লেখায়।কে না চায় বেঁচে থাকতে।অশরীর হলেও।
-না, বাবা তোমার কিছু-ইহতে হবে না।তুমি আমার বাবা এটা-ই আমার শক্তি। ডান হাতের কনুই ভেঙ্গে উঁচু করেতোলে।
মা, বাবাকে নিয়ে গর্ব করিস।মনে মনে ভাবল,মেয়েকে জিজ্ঞেস করবে।পরক্ষণে ভাবে না, তাকে নিয়ে গর্ব করার মতোন কিছু করেনি এপৃথিবীতে সে। নিজের অজান্তে আওড়ায় আবুল হাসানের কবিতার কয়েকটি লাইন , আমাদের জীবনের অর্ধেক সময় তো আমরা/সঙ্গমে আর সন্তান উৎপাদনে শেষ কোরে দিলাম।

হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াল মিনহাজ মাস্টার।পায়ের কাছে কি যেন এসে ঠেকেছে।অবনত চোখে বলে,কে ? কে ?
-স্যার আমি।ততক্ষণে সব রকম যুদ্ধে যাওয়ার মতোন উপযুক্ত বয়সী এক তরুণ তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
তিনি লক্ষ্করল ছেলেটি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রোদের উত্তাপটা নিস্তেজ হয়ে গেছে।আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে, কে ? কেবাবা।
-স্যার, আমি আপনার ছাত্র আশেক, মোহাম্মদ আশেক আলী স্যার আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না।
-ও আশেক আলী, কত বড় হয়েগেছ।তা বাবা কেমন আছ ?
-ভাল স্যার।আপনি অনেক শুকিয়ে গেছেন।
-আর কত দিন।তা বাবা তুমি এখন কোথায় আছ ?
-স্যার আমি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে আছি এখন।গত মাসে স্কলার শিপ নিয়ে আমেরিকা থেকেএসেছি।
অর্থহীন পৃথিবীতে মিনহাজ মাস্টার হঠাৎ যেন অর্থ খুঁজেপেল।
-স্যার, নাজলী কেমন আছে ?
ভাল।চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে সমাজ বিজ্ঞানে মাস্টার্স পড়ছে।

এ-ইসুযোগ ছেলেটার কাছ থেকে কিছু টাকা চাওয়ার।সদ্য প্রবাসী, পকেটে নিশ্চয় কড় কড়ে ডলার নিয়ে ঘুরছে।আরসে তো একবারের জন্য নিচ্ছেনা ।মাত্র তো কয়েকদিনের জন্য ধার নিবে।
-বাবা, ইতস্তত হয়ে কেঁপে উঠলেন মিনহাজ মাস্টার।যেন কট মট করে বুকের পাজরটা ভেঙ্গে গেল।
-জি,স্যার কিছু বলবেন ?
-না, মানে আশেক আলী আমার একটি জরুরী কাজ আছে।আমাকে যেতে হবে অনেকদূর।এখনচলি।হাঁটতে শুরু করল সে।
গন্তব্যহীন হাঁটা।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন