বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ আগস্ট ১৯৮৩
গল্প/কবিতা: ২৪টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১৭৭

ঘড়ি

দেশপ্রেম ডিসেম্বর ২০১৩

কবি ও জীবন

আমি নভেম্বর ২০১৩

বেপুথমতী ইচ্ছে

ইচ্ছা জুলাই ২০১৩

বিশ্বকাপ ক্রিকেট / নববর্ষ (এপ্রিল ২০১১)

মোট ভোট ১৭৭ এই গোধূলিতে

রওশন জাহান
comment ১৬১  favorite ১০  import_contacts ১,৯৬৪
যদিও সন্ধ্যা । কাবেরি নদী জলে সূর্য অস্ত যায়নি আজ । দেবদারু শাখাগুলো জল আরশিতে মুখ দেখে হাসেনি অহংকারের গোপন হাসি । আমার পৃথিবীতে সূর্য অস্ত যায়না কোন দিন ।
এই গোধূলিতে সন্ধ্যামণির ফুল ফুটেছে আমার আঙ্গিনায় । অজান্তেই চেয়ে আছি আলোহীন চোখে । শীত গিয়েছে রিক্ত করে, বসন্ত চলে যায় আমার ভুবন হতে, চৈত্রের নিদান আমাকে ঘর ছাড়া করে ফেরে । বৈশাখ আসতে খুব কি দেরী ? ক্ষনে ক্ষনে দৃষ্টিহীন চোখে তাকাই আকাশের পানে । কি জানি মেঘ করল কিনা । মাঝে মাঝে ঈশান কোণ আধাঁর করে মেঘ জমে, জলের দেখা পাওয়া যায়, আর আজন্ম অন্ধ আমি অন্তরের আলোয় পথ চলি । কখনো সহজে কখনো হোচঁট খেয়ে ।
তবু কৃষ্ণচূড়ায় যখন রঙ লাগে, পদ্মপাতায় শিশির টলমল করে, আমের মুকুলের গন্ধে বাতাস মাতাল হয়, আমি অনুভব করতে পারি । প্রতিটি ঋতু আমাকে তার সৌরভ দিয়ে যায় । আমি হৃদয়ের চোখ মেলে ধরে রাখি । এছাড়া আমি কিই বা করতে পারি ।
এক নদী ধলেশ্বরী বয়ে চলে আমার আঙ্গিনা দিয়ে । ভাঙ্গনের গান শুনে জেগে উঠি আমি প্রভাতে, যে গতিহীন জীবন আমাকে আষ্টে-পৃষ্টে বেধেঁ রেখেছে আজন্ম কাল হতে, এক পাতা কুড়ানী মেয়ে আমি তাকে কিভাবে অস্বীকার করতে পারি ।

শিশুকালে যখন মায়ের সাথে ভোর বেলায় বেরিয়ে পড়তাম একেক দিন একেক গায়েঁ, তখন হয়তো নদী থেকে কেবল জেলেরা ফিরে আসছে ছোট বড় মাছের ঝাঁকা মাথায় নিয়ে । মক্তবে মৌলভীরা আরবি পড়াচ্ছে আমারই মতো আরো শিশুকে । অনেক বাড়ির দরজা খোলেনি তখনো । প্রথমেই যে বাড়িতে গিয়ে ভিক্ষা চাইত মা, অনেকেই কটু কথা বলে তাড়িয়ে দিত আমাদের, এত সকালে ভিক্ষা করতে যাওয়ায় । কিছু বাড়িতে খেতে দিত আগের রাতের বেচে যাওয়া পান্তা । সেই খাদ্যই আমাদের কাছে অমৃত মনে হতো । খাওয়া শেষ হলে মা এক হাত তুলে মোনাজাত করত, অন্ন দাতার সুখ সমৃদ্ধি কামনা করে । আরেক হাত নাড়াঁনোর ক্ষমতা তার ছিল না কোন কালেই তাই কোন কাজও মিলত না তার । ভিক্ষা করতে মা আর আমি দুজনে মিলে গান গাইতাম । কত রকমের গান যে মা গাইতে পারত ! মা ছিলো যাযাবর বেদেনি ঘরের । নৌকায় করে এ নদী সে নদী কত নদীর পাড়ে যে কাটিয়েছে শৈশব কৈশরের দিনগুলি । তারপর আমার বাবার সাথে পরিচয় এক গাঁয়ের মনসাঁ পূজায় । বাবা গানের দলে গান গাইত । অনেক গ্রাম থেকে ডাক আসত । একেকবার কয়েক সপ্তাহের জন্য চলে যেতো । কিন্ত ফিরে এসে ঘরে মন বসত না তার । এক যাযাবর জীবনের নেশা তাকে তাড়িয়ে বেড়াত । একদিন তিনি ঘর সংসার সব কিছু ফেলে চলে যান । আমরা তার আর কোন খোঁজ পাইনি । তবুও আমরা প্রতীক্ষায় থাকি ।
আজ মা বিছানায় পড়ে থাকে । শরীরে বাসা বেধেছেঁ কত রোগ । ভিক্ষা করতে যেতে পারেনা আমাকে নিয়ে । অনেক সময় কাজ করে ধানের কলে । সারাদুপুর বসে বসে শুকোতে দেয়া ধানকে পাহারা দেয় পারিযায়ি পাখিদের কাছ থেকে । আমি মানুষের বাড়ির পেছনে পাতা কুড়াই । কেউ দয়া করে কিছু দান করলে তা দিয়ে চলে আমাদের দিন রাত্রি ।
এক এক দিন গায়েঁর পাঠশালার শিশুরা খেলতে খেলতে চলে আসে উঠানে, সন্ধ্যামণির না ফোঁটা কলি নিয়ে যায় ছোট অঞ্জলি ভরে । আমি এক অন্তরদাহে পুড়ি দৃষ্টিহীন হয়ে । শিশুরা দেখতে কেমন ! এই জনমে কোনোদিন তা জানা হবে না ।
আমি কোন দিন জানবনা সূর্য অস্ত যাবার রং, বৃষ্টি ঝরার দৃশ্য কেমন । নতুন বছরের প্রথম দিনের অপরাহ্নে যখন কাল বৈশাখী ঝড় সব তছনছ করে দেয়, শিলা বৃষ্টিরা পাড়ি দিয়ে চলে আসে হাজার মাইল দূর থেকে, আমি চুপ করে আমার খিড়কির পথ খুলে রাখি । সেই জানালা দিয়ে মাতাল হাওয়ার সাথে যদি চেনা কোন পরশ আমাকে ছুয়েঁ যায় এই ভাবনায় । কেউ বুঝেনা । যে নদী বয়ে গেছে আমার ঠিকানায়, সে আর সব পথ ভুলে কার আঙ্গিনা দিয়ে চলে যায় । কেউ তা জানেনা । দৃষ্টিহীনা হৃদয় তবু কিছু মানেনা ।

আগে বৈশাখের প্রথম দিনে মা ভিক্ষে করতে বের হতো না । সারা সকাল মানুষের বাড়িতে ঘুঁটে কুড়িঁয়ে ক্লান্ত মা যখন দুপুরে ফিরত, কতবার মার সাথে অভিমান করেছি বাহেরচরের চৈত পরবে নিয়ে যেতে । শুনতাম সেখানে মেলায় হাতির খেলা হয় আর নানা রঙের কাচের চুঁড়ি ফিতা উঠে । দুই একবার মা আমাকে নিয়ে গেছে বাহেরচরের চৈত পরবে । বাতাসা, ডুগডুগি আর কয়েকগাছি চুঁড়ি নিয়ে যখন দুই তিন গ্রাম হেটেঁ সন্ধ্যা নাগাদ আমাদের পাতার কুটিরে ফিরতাম, না দেখা পৃথিবীর জন্য কোন আক্ষেপ থাকতনা মনে ।
চৈত্র মাসের নিদান কালে সারা হাওর জুড়ে যখন হাহাকার পড়ে, ফসলবিহীন চারিদিক ধূঁ ধূঁ করে । একটু খাবারের আশায় কাজের লোভে কত মানুষ যে পাড়ি জমায় অন্য গায়েঁ ! আধবেলা খেয়েও আমরা পড়ে থাকি সেই আগের মত আগের ঠিকানায় । কারো অপেক্ষায় । আমাদের কোথাও যাবার নেই । অন্য কোন ঠিকানা নেই ।
শ্রাবনের কান্নায় যখন কদম ফুলেরা ভিজে পাঁপড়ি মেলে তাকায় আকাশের পানে, আমাদের পাতার কুটিরও সঙ্গী হয় সেই আনন্দের । আর আমরা দুটি প্রাণী সিক্ত হই । ভিজেঁ কাক হয়ে থাকে আমাদের মন ।
অগ্রহায়ন মাসে ধান কাটা হয়ে গেলে গানের আসর বসে এই হাওরের মাঠে । কখনো কখনো আমাকেও নিয়ে যায় গান গাইতে । রাত জেগে পালাগান করি আমি । আস্তে আস্তে লোকজন বাড়ি ফিরে যায় গভীর রাতে গানের আবেশে । নিজেকে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও চাঁদ সওদাগরের ডিঙ্গিতে খুঁজে ফেরে । আমারও বুকের ভিতর কেমন জানি শূন্য লাগে । চাঁদজাগা হাওরে বসে থাকি আমি কমলা মহূয়ার ব্যথা বুকে নিয়ে । জানি চন্দ্র অস্ত যাবে এক সময়, কাবেরি নদী জলে ছায়া ফেলবে দেবদারু শিশুরা, সূর্য ও উঠবে জানি কাল ভোরে পৃথিবীতে । কিন্তু এ বুকে ?
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন