বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ৪৮টি

সমন্বিত স্কোর

৬.১৪

বিচারক স্কোরঃ ৩.৮৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২৯ / ৩.০

চোখে চোখে

উচ্ছ্বাস জুন ২০১৪

খোলা চিঠি দিলাম তোমায়

ভালবাসি তোমায় ফেব্রুয়ারী ২০১৪

তোমার জন্য

ভালবাসি তোমায় ফেব্রুয়ারী ২০১৪

শীত (জানুয়ারী ২০১২)

মোট ভোট ১৩০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.১৪ ওম

বিষণ্ণ সুমন
comment ৬৬  favorite ১৬  import_contacts ১,৩৩৩
এই হুনছেন। জ্বলদি উডেন। মাইয়া জানি কেমন করতাছে। কানের কাছে শরীফার রীতিমত চিতকার শুনতে পেয়ে ধড়মড়িয়ে জেগে উঠলো মনির মিয়া। সবে চোখটা লেগে এসেছিল। আজ ক'দিন দিন যাবত বলতে গেলে পুরোটা রাত'ই মেয়েকে নিয়ে ব্যাস্ত থাকতে হচ্ছে। ফলে ঘুমোবার সুযোগ হচ্ছে না মোটেই। অসম্ভব ঠান্ডা পড়েছে এবার। দু'চালা বেড়ার ঘর। ফাক গলে হু-হু করে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। দাঁতাল সরিসৃপের মত তীব্র কামড় বসাচ্ছে শরীরে। ছেড়া-ফাঁটা দু'ফালি কাঁথার আলিঙ্গনে এতটুকু উষ্ণতা জুটছে না। মাত্র তিন মাস বয়সী বাচ্চাটার অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। এক দঙ্গল শীতের কাপড় জড়িয়ে তার ভেতর মেয়েটাকে একটা পোটলার মত ঢেকে রাখছে শরীফা। যক্ষের ধনের মত আগলে রাখছে বুকের মাঝে। মায়ের চিরন্তন ওম্ দিয়ে তাকে শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু, আজ আর তাতেও কাজ হচ্ছে না। বারবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে শরীর। এই কিছুক্ষণ আগেও তারা দুইজনে মিলেই মেয়েটাকে মাঝখানে রেখে একত্রে জড়াজড়ি করে শুয়ে ছিল। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া মেয়েটার একরত্তি শরীরটায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক তাপমাত্রা ফিরে আসায় ভেবেছিল, এ যাত্রা বিপদ কেটে গেছে। তাই স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে সেও ঘুমিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই শরীফার ডাকে আবারো জেগে উঠতেই টের পেল অবস্থা আরো খারাপের দিকে গিয়েছে। কেরোসিন জ্বালানো আধো কুঁপির আলোয় আবিস্কার করলো, মেয়েকে বুকে চেপে ধরে তার বউ ফোঁপাচ্ছে।

কি অইছে ? কানতাছো ক্যান ? বলেই একটানে মেয়েকে নিজের বুকে নিয়ে নিল মনির। অসম্ভব ঠান্ডা হয়ে আছে ছোট্ট শরীরটা। ক্রমাগত মুখ হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেখতে পেল। জ্বলদি সইরষ্যার তেল লও। মাইয়ার শরীরে মালিশ করতে অইবো। শরীফার দিকে ফিরে প্রায় খেঁকিয়ে উঠলো। বিছানার উপর ছড়ানো ছিটানো কাঁথাগুলো ছোঁ মেরে তুলে নিল। চাপিয়ে দিল মেয়েটার পিঠের উপর। ততক্ষণে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে গেছে শরীফা। পাশেই একটা ছোট পিতলের বাটিতে রাখা সরিষার তেলটা তুলে নিল নিমেষেই। ত্বরিত সেটা সামনে রাখতেই ওতে হাত ডুবিয়ে দিল মনির। জামার ভেতর হাত ঢুকিয়ে মেয়েটার বুকে-পিঠে মালিশ করতে লাগলো। একসময় তার মনে হলো একখন্ড বরফের উপর হাত চালাচ্ছে। শেষ একটা হিক্কা দিয়ে ওর বুকের উপর'ই নিথর হয়ে গেল ছোট্ট দেহটা।



সকাল হয়েছে অনেক আগেই। তারপরেও এখানে-ওখানে ছাপ ছোপ কুয়াশা পেজা তুলোর মত ভেসে বেড়াচ্ছে। ধুসর চোখ মেলে কুয়াশার চাদরের ভেতর দিয়ে দরজার চৌকাঠে বসে উঠোনের ওপাশটা দেখার চেষ্টা করছে শরীফা। পাশেই বসে আছে মনির। তার দৃষ্টিও সামনের দিকে। একটু আগেই ওখানে তাদের আদরের ধন বুকের মানিককে চির নিদ্রায় শুইয়ে দিয়ে এসেছে সবাই। ওদের ইচ্ছেতেই ঘরের কাছে কবর দেওয়া হয়েছে মেয়েটাকে। মনিরের বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে আছে। বারবার ভিজে উঠছে চোখ। মেয়েটা তাদের অভাবের জীবনে অনেক বড় পাওনা ছিল। আসলে ও ছিল তাদের আধাঁর ঘরের একমাত্র বাতি। সারাদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরে মেয়েটার মায়াভরা মুখটা দেখে সব ক্লান্তি ভুলে যেত ও। তার ঢলোঢলো চোখের চাহনীতে খুঁজে পেত রাজ্যের সুখ। তাইতো এমন শীতের প্রকোপে নিজে কাহীল হলেও মেয়েটাকে কখনো কাছছাড়া করতো না। আর শরীফাতো সাড়াক্ষণ বুকেই চেপে রাখতো ওকে। কিন্তু কিসে কি হলো। ধরে রাখতে পারলো কই । সৃষ্টির চিরন্তন নিয়মেই তাদের বুক খালি করে চলে গেল ও। রেখে গেল একরাশ মায়া, যা এখন কুয়াশা হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশময়। তারা ভাল করেই জানে, এই কুয়াশা একসময় কেটে যাবে। সূর্যের সোনালী আলোয় ঝলমল করে উঠবে চারিদিক। কিন্তু শীতের প্রকোপ কি তাতে কমবে ? অতীব শীতের তীব্রতায় তাদের বুকের ভেতরটাকে ঠান্ডা করে দিয়ে গেছে যে নিষ্ঠুর বাস্তব, তাকে রুখবে তেমন উষ্ণতার ওম্ তাদের কই?



আস্তে করে দরজার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকলো ও। ইতিউতি তাকালো বারকয়েক। তারপর লাফিয়ে বিছানায় উঠলো। দুজন মানুষ জড়াজড়ি করে ঘুমোচ্ছে টের পেল। ওদের পায়ের কাছ দিয়ে সুরুৎ করে ঢুকে গেল কাঁথার তলে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বুকের কাছে। প্রায় লেপ্টে থাকা দুটো শরীরের ভেতর সেধিয়ে দিল নিজের নরোম শরীরটা। তার বরফ ঠান্ডা শরীরটাকে এতটুকু উষ্ণতা দেবার জন্য এই আশ্রয়টুকু ওর বড় প্রয়োজন।

ওম্মা-গো ! এইডা কি ? আমারে ধরলো কেডা ? প্রায় মাঝ রাত্তিরে মেয়েলী আর্ত চিৎকারে জেগে উঠলো মনির। ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রীতিমত কাঁপছে শরীফা। ভয় পেয়েছে বুঝতে পারলো। সেই সাথে টের পেল নরোম কি যেন একটা সুরুৎ করে তাদের বুকের কাছ থেকে দ্রুত পায়ের কাছে নেমে যাচ্ছে। পরমুহুর্তে একটা সাদাটে কি যেন তাদের পায়ের দিকের বিছানা থেকে লাফিয়ে মেঝেয় পড়তে দেখল। কুঁপির আবছা আলোয় পলায়নপর বিড়ালটাকে দেখে প্রমাদ গুনলো। আরে ধুর ! এইডা তো একটা বিলাই। ঠান্ডার লাইগ্যা আমাগো কেঁথার তলে হুইবার আইছিল। তোমার চিল্লানিতে ডরাইয়া ভাগছে। জবাবে আরো শক্ত করে স্বামীকে জড়িয়ে ধরলো শরীফা। বুঝতে পাড়লো তার ভয়টা কাটছে না। ঠিক আছে কাইলকাই আমি দরজার ফাঁকটা বন্ধ করনের ব্যবস্থা করতাছি। অহন তুমি ঘুমাও। মৃদু হেসে কথাটা বলেই চোখ বন্ধ করলো মনির।

এর পরের রাত্রেও যখন চিৎকার দিয়ে জেগে উঠলো শরীফা এবং যথারীতি পলায়নপর বিড়ালটাকে দৃষ্টিগোচর হলো মনিরের, তখন সেও কিছুটা অবাক হলো। তার স্পষ্টই মনে আছে, সে নিজের হাতে দরজার ফাঁকটা বন্ধ করেছিল। তাই সে শরীফার পিঠে হাত বুলিয়ে ওকে আশ্বস্ত করার একটা বৃথা চেষ্টা চালালো। কিন্তু, তার মনে হলো ব্যাপারটা একটু ভালভাবে পরীক্ষা করা দরকার, যেহেতু তার নিজের কাছেই ঘটনাটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। সেও দ্রুত শরীফার আলিঙ্গন থেকে শরীরটা ছাড়িয়ে নিল। মাথার কাছ থেকে টর্চটা হাতে নিয়েই লাফিয়ে বিছানা ছাড়লো। হ্যাচকা টানে দরজা খুলেই টর্চের আলো ছড়িয়ে দিল সারা উঠোনময়। কিন্তু বিড়ালটাকে কোথাও দেখতে পেলনা।

পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে শরীফা । কিন্তু আজ আর ঘুমায়নি মনির। প্রায় জোড় করেই নিজেকে জাগিয়ে রেখেছে। হাতের কাছে টর্চটাও রাখা আছে। ঘরের সমস্ত ফাঁক-ফোকর আজ ভাল করেই বন্ধ করেছে সে। কাজেই এরপরেও বিড়ালটা কি করে ঘরে ঢুকে, আজ সে দেখেই ছাড়বে। সুনসান নিরবতা চারিদিকে। কোথাও একরত্তি শব্দের সাড়া নেই। অনেকক্ষণ জেগে থেকেও যখন কিছু ঘটলো না, তখন তার মনে হলো বৃথাই কষ্ট করছে। ঢুকবার জায়গা না পেয়ে বিড়ালটা বোধকরি আজ ভেতরে আসবার চেষ্টা বাদ দিয়েছে। তাছাড়া এটাইতো স্বাভাবিক। বিড়াল জন্মগতভাবেই উষ্ণতা পিয়াসী। তাই এমনতরো শীতের রাতে একটু উষ্ণতার জন্যই তাদের কাছে এসেছিল। কিন্তু পরপর দুইদিন তাদের দ্বারা বিতারিত হয়ে ওটা স্পষ্টতই বুঝে গেছে, এখানে ও অবাঞ্চিত। তাই আজ আর এ মুখো পা বাড়ায়নি। ব্যাখ্যাটা নিজের কাছেই মনে ধরলো ওর। অগত্যা সেও চোখ বন্ধ করলো।

এরপর আরো কয়েকদিন জেগে থেকেও বিড়ালটার কোন সাড়া পেল না মনির। শরীফাও ধীরে ধীরে ওটার কথা ভুলে গেল। কিন্তু কেন জানি ওটার জন্য তার নিজেরী খুব মন খারাপ হতে লাগলো । আরো অবাক হলো, যখন শরীফা নিজেই একদিন ওটার কথা পাড়লো। হুনছো, আইজ বিহান বেলা দেহি ওই বিলাইডার মত একটা বিলাই মেম্বার চাচার মাইয়ার কোলে। হেরে হেয় এমন কইরা বুকে চাইপ্যা ধইরা রাখছিল, মনে অইতাছিল হেইডা বিলাই না, হের মাইয়া। ঘটনাটা দেইখ্যা আমার বুকের ভেত্তর কেমন জানি কইরা উঠলো। কথা ক'টি বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো শরীফা। পরক্ষণেই উদাস হয়ে গেল তার চোখ-মুখ। ওর চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠাটা নজর এড়ালো না মনিরের। ওর মনের কথাটা খুব সহজেই বুঝতে পাড়লো সে।

সে রাতে শরীফা ঘুমিয়ে গেছে বুঝতে পেরেই চুপিচুপি বিছানা ছাড়লো মনির। আস্তে করে দরজাটা খুলে বাইরে তাকালো। তারপর নিঃশব্দে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়েই শুয়ে পড়লো। সে জানতেও পাড়লো না, এক ইঞ্চির দশ ভাগের এক ভাগ সমান চোখের ফাঁক দিয়ে পুরো ব্যাপারটাই খেয়াল করেছে শরীফা। সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই তার আর শরীফার শরীরের ফাঁকে নরোম কিছু একটার অস্থিত্ব টের পেল। খুব ধীরে ধীরে কাঁথাটা সরিয়ে নিয়েই এক লহমায় বিছানায় উঠে বসলো। অবাক হয়ে খেয়াল করলো শরীফার বুকের উপর পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে সাদা একটা বিড়াল। নড়াচড়া টের পেয়ে চোখ খুললো ওটা। ওটার চোখের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল মনির। সেই ঢলোঢলো চাহনী, যে চোখের চাহনীতে মিশে আছে পরম নিশ্চিন্ত নির্ভরতা, যা কেবল একজন মায়ের বুকেই পেতে পারে তার পরম আদরের সন্তান।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন