বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ৪৮টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৫

বিচারক স্কোরঃ ৩.৩৬ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১৪ / ৩.০

চোখে চোখে

উচ্ছ্বাস জুন ২০১৪

খোলা চিঠি দিলাম তোমায়

ভালবাসি তোমায় ফেব্রুয়ারী ২০১৪

তোমার জন্য

ভালবাসি তোমায় ফেব্রুয়ারী ২০১৪

গ্রাম-বাংলা (নভেম্বর ২০১১)

মোট ভোট ১০৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৫ শিকার

বিষণ্ণ সুমন
comment ৪১  favorite ৩  import_contacts ৬৫১
ঘুম থেকে জেগেই আসমার প্রথম যে অনুভুতিটা জাগলো, তা হলো ক্ষুধার। অপুষ্টিতে ভোগা রোগা শরীর। এমনিতে চৌকি থেকে নামতে তার যথেষ্ট বেগ পোহাতে হয়। তবুও কি এক শক্তি বলে সে বেশ দ্রুতই বিছানা থেকে নেমে গেল। ত্বরিৎ এগিয়ে গেল ঘরের এক কোণে বসানো মাটির চুলাটার দিকে। ওটার উপর চড়িয়ে রাখা ঢেবা-ঢোবা পাতিলটা দৃষ্টি আকর্ষণ করল ওর। হাতের এক ঠেলায় পাতিলের উপর থেকে এক পাশ ভাঙ্গা ঢাকনিটা সরিয়ে দিল। পাতিলের তলায় পড়ে থাকা গুটি কতক ভাত দেখে চকচক করে উঠলো ওর চোখ। এক লহমায় পাতিলটা কোলের উপর টেনে নিয়ে দড়াম করে মেঝেয় বসে পড়লো। পাশেই রাখা বালতি থেকে এক খাবলা পানি ফেলল ওটার ভেতর। কাঠের একটা তাকের উপর রাখা বয়াম থেকে একটু লবন নিয়ে ভাতের উপর ছড়িয়ে দিল। খুজে পেতে বের করলো আধো শুকনো দুটো মরিচ। ভাতের সঙ্গে আচ্ছামত মেখে গপাগপ পেটে চালান করে দিল। কয়েক লোকমা গিলেই টের পেল হাত ঠেকছে পাতিলের তলানিতে। মনটা বিমর্ষ হয়ে গেল নিমেষেই। সহসা মোড়ের দোকানটার কথা মনে পড়ে গেল। সাথে সাথেই মনটা খুশীতে ভরে উঠলো তার। টিনের মগ দিয়ে আর এক খাবলা পানি পেটে ঢেলেই সে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।




বসে বসে অলস সময় পার করছে মাজিদ মিয়া। মাঝে মাঝে অনুসন্ধিৎসু চোখ মেলে পথের পানে তাকাচ্ছে। সচরাচর পাড়া গাঁয়ের দোকানগুলোর মত এতটা জৌলুসহীন নয় তার দোকানটা। গাঁয়ের লোকজনের নিত্য চাহিদা মেটাবার সব উপকরণই এখানে আছে। তবে গাঁয়ের বাসিন্দারা তেমন সচ্ছল নয় বলে, তার দোকানে লোকজনের খুব একটা ভীড় চোখে পড়েনা। গঞ্জের মূল সড়ক থেকে যে এদোঁ গলিটা এসে গাঁয়ে ঢুকেছে তার ধারেই মাজিদ মিয়ার টং দোকান। চাল, ডাল, তেল, নুন থেকে ধরে শহুরে নাস্তার টেবিলের পাউরুটি পর্যন্ত সবই তার দোকানে মেলে। নানারকম চকলেট, গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের ভাষায় যার নাম লজেন্স কিম্বা লেবেন্টুস, তাও তার দোকানে হর-হামেশাই পাওয়া যায়। সেই কারণেই গাঁয়ের ছোট ছেলেমেয়েরা ফুরসৎ পেলেই এখানে এসে হল্লা করে। মাজিদ মিয়া জানে, সারাদিনে একবার হলেও এলাকার পোলাপানদের তার দোকানে আসতেই হবে। কিন্তু, আজ কদিন যাবত সে কেবল একটা নির্দিষ্ট মেয়ের জন্যই অপেক্ষা করে।

এ গাঁয়েরই দিনমজুর রহীম শেখের মেয়ে আসমা। বাপটা ভোরে ঘুম থেকে উঠেই গঞ্জে চলে যায় কাজের সন্ধানে। মেয়েটা সারাদিন একা বাড়ি থাকে। দিনভর গতর খেটে রহীম শেখ যা কামায়, তাই দিয়ে ফেরার পথে কিছু চাল-ডাল নিয়ে আসে। রাতে ক্লান্ত শরীরে চোখ-মুখ পুড়িয়ে রান্না করে তাই দিয়ে কোনমতে বাপ-মেয়ের উদরপুর্তি হয়। ফলে মেয়েটার বাড়ন্ত শরীরের যা চাহিদা, তা কখনোই মেটেনা। বয়স ইতিমধ্যে কৈশোরে চলে এলেও রোগা শরীরে জন্য মেয়েটাকে যথেষ্ট ছোটই লাগে। এদিকে মেয়েটা আবার বোবা। তাই গেল বছর যখন তার মা যক্ষায় মারা গেল, তখন বাপটা অনেক চেষ্টা করেও এলাকার কোন অবস্থাপন্ন ঘরে মেয়েটাকে কাজে দিতে পারেনি। যে মেয়ে ইশারা ছাড়া আর কোন ভাষা বুঝেনা, তাকে দিয়ে কাজ করানো সহজ কথা না। তাই বাধ্য হয়েই এই আধপেটা খাবারেই তাকে বেড়ে উঠতে হচ্ছে।

দোকানে কোন খদ্দের না থাকায় একটু ঝিমুনি মতন চলে এসেছিল। সহসা একটা হালকা পদশব্দে সজাগ হয়ে উঠলো মাজিদ মিয়া। আসমাকে দোকানের আড় ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।

কিরে আইছস ? এত দেরি করলি ক্যায়া ?

জবাবে একটা হাই দিয়ে 'আ-আ' করে বিজাতীয় শব্দ করল বোবা মেয়েটা।

মাজিদ মিয়া বুঝলো, ও ঘুম থেকে উঠেছে মাত্র। খাইছস ? হাত মুখের কাছে নিয়ে খাওয়ার ভঙ্গি করে জানতে চাইলো। আসমা চোখ নামিয়ে নিয়েছে দেখে যা বুঝার বুঝে নিল।

ল, এইডা খায়া ল। একটা বাটার বন বাড়িয়ে দিল।

থাবা দিয়ে রুটিটা নিয়ে নিল আসমা। গোগ্রাসে খেয়ে ফেলল। কাচের গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিল দোকানী। এক ঢোকে পানিটা গিলে নিল মেয়েটা। বুকের উপর পড়ে থাকা ছেড়াফাঁটা ওড়নাটা মুখে টেনে নিয়ে ঠোঁটের পাশে লেগে থাকা বাটার মুছে ফেলল। তারপর দোকানীর দিকে তাকিয়ে একটা ফিঁকে হাসি দিল। ডান হাতটা উঁচিয়ে ঘাড়টা আস্তে করে কাত করল। এর মানে হলো সে চলে যেতে চাইছে, বুঝলো মাজিদ মিয়া।

আচ্ছা যা। দুপুরে ভুখ লাগলে আবার আইস। তোরে মাছের ঝোল দিয়া ভাত খাইতে দিমুনে।

উত্তরে আবারো হাসলো মেয়েটা। তার চোখে-মুখে জড়িয়ে আছে কৃতজ্ঞতা। চকিত খেয়াল করলো মাজিদ মিয়া, মেয়েটার বগলের কাছটায় জামাটা ছেড়া। দৃশ্যটা হাভাতের মত তাকিয়ে দেখলো সে। সহসা তারও ভীষন তেষ্টা পেল। চলে যাওয়া আসমার দিকে তাকিয়ে আস্ত একটা ঢোক গিলে ফেলল সে।




ঘরে ফিরেই অগুছালো বিছানা গুছাতে লেগে গেল আসমা। বিছানা বলতে একটা ময়লা কাঁথা, তার সাথে তেল চিটচিটে দুইটা নোংড়া বালিশ। অনেক সময় নিয়ে বেশ দায়িত্ববান মেয়ের মতই সুন্দর করে কাঁথা ভাজ করলো। তারপর ভাঁজ করা কাঁথাটা চৌকির শিয়রের দিকে বালিশের উপর সাজিয়ে রাখলো। বিছানা থেকে নেমে উঁকি দিল চৌকির তলে। নীচ থেকে ঝাড়ু টেনে নিয়ে ঘর ঝাঁট দিতে লেগে গেল। ঝাঁট দেওয়া হলে নোংড়া পাতিল নিয়ে বেড়িয়ে গেল ঘর থেকে। পাশের ময়লা পানির মাজা পুকুর থেকে ধুঁয়ে নিয়ে এসে সুন্দর করে তাকে সাজিয়ে রাখলো। এটুকুন কাজ করতেই দুপুর গড়িয়ে গেল। নিজেকে তার খুব ক্লান্ত লাগছে। কি মনে করে আস্তে করে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। মনে পড়ে গেল যখন মা ছিল, তাকে কোন কাজই করতে হতো না। অথচ আজ ভাগ্যের ফেরে এই বয়সে তাকে আস্ত একটা সংসার সামলাতে হচ্ছে। আর তা করতে যেয়ে সংসারের প্রতিটা কাজেই মায়ের অভাবটা সে ভালো করে টের পাচ্ছে। মা না থাকায় বাবাও ইদানীং রাত করে বাড়ী ফেরে। তারপরেও সে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকাটা উপভোগ করে। কারণ তিনি ফিরে আসা মানেই হলো রাতে পেট ভরে খেতে পারা। তবে আজকাল বাবা প্রায়ই খালি হাতে বাড়ী ফেরে। সে তো কথা বলতে পারেনা, তবে বাবার ভাব ভঙ্গিমায় এটা বুঝতে পারে, তার মেজাজ-মর্জী আগের মত নেই। কিন্তু, তার যে ক্ষুধা লাগে এটা কেন বাবা বুঝে না। তাই সে ইদানীং মাজিদ মিয়ার দোকানে যেতে শুরু করেছে। লোকটা কতো ভাল। সে চাইলেই খেতে দেয়। সহসা মনে পড়ে গেল, তাকে দুপুরে যেতে বলেছিল দোকানী। কথাটা মনে হতেই লাফিয়ে বিছানা ছাড়লো আসমা। ঝড়ের বেগে বেড়িয়ে গেল ঘর থেকে।




মাজিদ মিয়া সবে পেট পুড়ে খেয়ে তক্তপোশের উপর বসে আয়েশ করে পান চিবুচ্ছে এমনি সময় আসমাকে দেখতে পেল। হনহনিয়ে তার দোকানের দিকেই এগিয়ে আসছে। এতে সে বিন্দুমাত্র অবাক হলোনা। মেয়েটা যে আসবেই তা সে জানতো। তাই তার বাড়ী থেকে পাঠানো খাবারের কিছুটা আগেই আলাদা করে রেখে দিয়েছে।

দোকানের ছাউনির নীচে এসে সবে দাঁড়িয়েছে আসমা। এমন সময় তক্তপোশ ছেড়ে উঠে এল দোকানী। দোকানের এক পাশ থেকে কিছু জিনিসপত্র সরিয়ে জায়গাটা ফাঁকা করে দিল। ভাতের প্লেটটা ওখানে রেখে আসমার দিকে ফিরল।

ল, খায়া ল। মাজিদ মিয়া বলা মাত্রই প্লেটের উপর একরকম ঝাঁপিয়ে পড়লো মেয়েটা। গপগপ করে সাবরে দিতে লাগলো প্লেটের সবটুকু ভাত। অবাক হয়ে মেয়েটার খাওয়া দেখছে মাজিদ মিয়া। দৃশ্যটা বেশ তৃপ্ত করছে তাকে। তার ঠোঁটের কোণ জুড়ে সুক্ষ একটা হাসির রেখা ফুঁটে উঠছে ধীরে ধীরে।




চোখ খুলেই বিছানায় ধড়মড় করে উঠে বসলো আসমা। পাশেই মোড়ার উপর রাখা জ্বলন্ত কুঁপিটার উপর চোখ পড়ল। চকিত বাইরে দৃষ্টি দিল। ঘুটঘুটে অন্ধকার জানিয়ে দিল সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে এরইমধ্যে। এখনো বাবা ফিরে আসেনি। মনে পড়ল, সন্ধ্যায় কুঁপি জ্বালিয়ে বাবার অপেক্ষায় বিছানায় বসে মেলে দেওয়া দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল সে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কখন যে তার দু'চোখ ভেঙ্গে ঘুম নেমে এসেছিল টেরই পায়নি। মাথা ঝাঁকিয়ে তন্দ্রা ভাবটাকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইলো। কখন বাবা আসবে এই চিন্তায় তার ঘুম কেটে গেল নিমেষেই। বিছানা থেকে নেমে দরোজা দিয়ে বাইরে উঁকি দিল। অদূরেই মাজিদ মিয়ার দোকানের টিমটিমে আলোটা চোখে পড়ল। নিমেষেই পেটের ক্ষুধাটা চাগিয়ে উঠলো। সহসা ইতি কর্তব্য স্থির করে ফেলল। আস্তে করে দরজাটা বন্ধ করে রাস্তা অভিমুখে হাঁটা দিল।




দোকানের ঝাঁপি বন্ধ করে সবে শোবার আয়োজন করছে মাজিদ মিয়া এমনি সময় অন্ধকার ফুঁড়ে অশারীরীর মত উদয় হলো আসমা। ওকে দেখে বিন্দুমাত্র অবাক হলো না দোকানী।

কিরে তোর বাপ আয় নাই ? আসমা মাথা নাড়ছে দেখে যোগ করলো, খাইসছ ? এবারো সমুত্তর পেয়ে চোরা চোখে ইতি-উতি তাকিয়ে বলল, নে ভিতরে আয়। তোরে কিছু খাইতে দেই।
কৃতজ্ঞতায় ছলছল করে উঠলো মেয়েটার চোখ। বিনাবাক্যব্যায়ে উঠে এল দোকানের এক পাশের ফাঁকা জায়গাটায়, যেখানে এক মানুষ সমান জায়গা কিছুক্ষণ আগেই খালি করে রেখেছে দোকানী তার ঘুমাবার জন্য। আসমা সেখানে উঠে বসতেই সে বিন্দুমাত্র দেরী না করে দোকানের ঝাপিটা আস্তে করে নামিয়ে দিল।





মনটা অসম্ভব খারাপ হয়ে আছে রহীম শেখের। ঝলমলে চাঁদের আলোয় চারপাশ আলোকিত হয়ে থাকলেও তার মুখটা মলিন আঁধারে ঢেকে আছে। আজ কদিন যাবত ঠিকমত কাজ জুটছে না। তাই প্রায় রাতেই খালি হাতে বাড়ী ফিরতে হচ্ছে তাকে। মা মরা মেয়েটার উপোসী মুখ দেখতে ইচ্ছে করেনা বলে, ইদানীং সে বাড়ীও ফিরছে অনেক রাত করে। সকালে মেয়ে জাগবার আগেই আবার ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু, এমনি করে আর ক'দিন পালিয়ে থাকা যায়। এভাবে তো আর জীবন চলবে না। ভাবছে আজ আর ঘরেই ফিরবে না। সারারাত মাজিদ মিয়ার দোকানের বেঞ্চিতে শুয়ে কাটিয়ে দেবে। অবশ্য চলার পথে ওটাই আগে পড়বে। বাড়ীর কাছের মাজা পুকুরটার গজ পঞ্চাশেক কাছে আসতেই একটা ধুঁপ আওয়াজ শুনতে পেল। সেই সঙ্গে পানিতে হালকা আলোড়ন। দ্রুত এগিয়ে গেল সেদিকে। আবছা আলোয় পুকুরটার একটু গভীরে কচুরিপানার ভেতর একটা হালকা নাড়াচড়া হচ্ছে দেখতে পেল। মুহুর্তেই মনটা খুঁশী হয়ে উঠলো ওর। না, আর ওদের না খেয়ে থাকতে হবেনা। অন্ততঃ এক সপ্তাহের জন্য তাদের জীবন ধারন নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। দ্রুত এগিয়ে গেল বাড়ীর দিকে। উঠোনে পেঁৗছেই গতি শ্লথ করে ফেলল। মেয়েকে কিছুতেই জানান দেওয়া চলবে না সে বাড়ী ফিরেছিল। একেবারে কাল সকালেই মেয়েকে চেহারা দেখাবে ঠিক করলো।

পা টিপে টিপে ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আধো অন্ধকারে ওটা বন্ধ আছে ঠাহর করতে পেরে স্বস্থি বোধ করলো। তারপর দ্রুত পিছিয়ে এসে ঘরের চালার এক কোণে হাতড়াতে লেগে গেল। বহুল ব্যবহারে অক্ষত ধারালো শিকের কোচখানি পেয়ে গেল যথাস্থানেই। ওটা হাতে নিয়ে রীতিমত দৌড়ে চলে আসলো পুকুর পাড়ে। হাতটা যথা সম্ভব লম্বা করে কোচ'টা ছুড়ে দিল জায়গামত, যেখানে একটু আগে আলোড়নটা টের পেয়েছিল। তারপর অসীম ধৈর্য্যের প্রতীক হয়ে বসে পড়ল। মাছটা যদি রাঘব বোয়াল হয়, তবে সেও পাকা শিকারী। ঢিল ছোড়া হয়ে গেছে। জায়গামত লাগবেই, এ ব্যাপারে সে পূর্ণ নিশ্চিত।

বসে থাকতে থাকতে একসময় ঝিমুনি এসে গেল। তারপরেও ঠায় বসে রইলো রহীম শেখ। সে জানে মাছ শিকারীদের কখনো ক্লান্ত হতে হয় না। আগে সে রাত-বিরেতে এরকম কত মাছ মেরে বেড়িয়েছে তার ইয়ত্বা নেই। কাজেই তার এতদিনের অভিজ্ঞতা তো মিথ্যে হতে পারেনা। জানে কোচটা জায়গামতই পড়েছে। মাছটা যে বিঁধেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এর আগেও সে এই মাছটার পিছে কম সময় দেয়নি। পিপড়ের ডিম, উই পোকার ডিম থেকে ধরে বোলতার চাক সহ হেন টোপ নেই এটায় গেলায়নি। ভেবেছিল এতো পুরনো মাছ এদ্দিনে ধরা যখন পড়েনি, মরে টরে গেছে বোধহয়। আজ এতদিন পর সেই মাছ'ই নতুন করে জানান দিয়ে আসলে তার এই দুর্ভাগ্যের দিনে শাপে বর হয়ে ফিরে এসেছে। ভাবছে কাল সকালে কালো রঙের ঢাউস বোয়ালটা যখন মেয়েটা দেখতে পাবে, তার ক্ষুধা ক্লিষ্ট মুখটা কি পরিমাণ উজ্জল হয়ে উঠবে। চিন্তাটা সাহস যোগালো তাকে। কোচের গোড়ার দিকটা শক্ত করে চেপে ধরলো। ধীরে ধীরে আগাটা বেকে যাচ্ছে দেখতে পেল। অভিজ্ঞতায় জানে এ সময় তাড়াহুড়ো করতে নেই। বরং ধীরে ধীরে খেলিয়ে খেলিয়ে মাছটাকে দুর্বল করে তবে পাড়ে টেনে তুলতে হয়। সেও তাও শুরু করলো। নড়তে শুরু করেছে কচুরিপানার ঝোপটা। আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে পাড়ের কাছাকাছি। নিজের ভেতর প্রচন্ড একটা উত্তেজনা টের পাচ্ছে শিকারী। আস্তে আস্তে পেছনে সরে গিয়ে কাছেই একটা গাছের সাথে কোচের এ মাথাটা গামছা দিয়ে পেচিয়ে ভাল করে আটকে দিল। পরনের লুংগিটা কাছা দিল শক্ত করে। তারপর পাড়ের কাছে গিয়ে পিছলে নেমে গেল পানিতে। দু'হাত বাড়িয়ে দিল ঝোপের ভেতর। হাতের আগায় নরোম অথচ অনড় একটা কিছু ঠেকতেই সামান্য হতাশ হয়ে উঠলো। দেখাই যাক না, কপালে কি আছে। ইয়াল্লাহ্, বলে হ্যাচকা এক টানে তুলে আনলো উপরে। পরমুহুর্তে একটা আর্তচিৎকার দিয়ে পিছিয়ে এল। তার দুই হাতের মাঝে ঝুলে আছে নির্জীব আসমার নগ্ন দেহ। কোচ'টা তার গলায় বিঁধে আছে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন