বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ মে ১৯৬৮
গল্প/কবিতা: ১০৬টি

সমন্বিত স্কোর

২.৪৮

বিচারক স্কোরঃ ১.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ০.৮ / ৩.০

তিথির নীল কষ্ট

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

কোজাগরি পূর্ণিমার রাতে

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

রামদুলালের ঢোল

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

প্রত্যয় (অক্টোবর ২০১৪)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৪৮ এমন যদি হতো

মিলন বনিক
comment ৭  favorite ১  import_contacts ৯৪৪
এমন যদি হতো।
আজ মানদা বালার বিয়ে। শহরের অভিজাত শ্রেণীর উচ্চ বর্ণের সব বাবুরা এসেছে। মানদাকে আশীর্বাদ করছে সবাই। কালু ডোম ধোলাই করা ধূতি পাঞ্জাবী পরে সবাইকে খাতির যত্ন করছে। অতিথিদের সবার সাথে এক পাতে বসে কালু ডোমও মেয়ের বিয়ের খাবার খাচ্ছে। মহিলারা সবাই উলুধ্বনি করছে। আনন্দে মানদার চোখ দিয়ে অশ্রুর বন্যা বইছে। কালু ডোমও আনন্দে বার বার চোখের জল মুছছে। আনন্দের কারণ আজ থেকে কেউ আর কালু ডোমকে অস্পৃশ্য বলবে না। নিচু জাত বলে কেউ এড়িয়ে চলবে না। কেউ আর চণ্ডাল বলে ঘৃণা করবে না। সমাজে একটা মর্যাদার আসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বড় বড় বাবুরা সবাই এসেছে।

কালু ডোম আদর করে মেয়েকে ডাকে মানু। একমাত্র ছেলে জগাই। উনিশ বছর বয়স। মদ গাজা ভাং খেয়ে পরে থাকে শ্মশানে। শ্মশানটাও সামাল দিতে হয়। মানুষের জন্ম যেমন হচ্ছে মৃত্যুও হচ্ছে। এটাই সত্য। সৃষ্টির সাথে ধ্বংস। এভাবেই চলে আসছে। বলুয়ার দীঘি মহাশ্মশানের একমাত্র ডোম কালু। জাতে অস্পৃশ্য। নিচু জাত চণ্ডাল বলে কোন সামাজিক মর্যাদা নেই। ডোম সমাজে যা একটু খাতির যত্ন হয়। কারণ বলুয়ার দীঘি শ্মশান মন্দির পরিচালনা কমিটির বাবুদের সাথে কালু ডোমের জানাশোনা আছে। বাবুদের একটু ফাই ফরমায়েশ খাটে। মাঝে মধ্যে বাবুদের সাথে কথাবার্তা হয়। এটাই কালু ডোমের অনেক বড় পাওনা। কারণ বাবুরা সবাই জাত, কূল, মানে অতি উচ্চ বংশ।

তবে কালু ডোম খুব গর্ব করে বড় বাবুর কথা বলে। বড় বাবু হচ্ছে সভাপতি। বাবু মৃদুল কান্তি দে।কালু বলে, বড় বাবু হামাক খুব আদোর করে। ভালোবাসে। হামাক পরিবারের খবর লয়। গায়ে, কাঁধে হাত দিয়ে কথা বলে। হামি একবার পেনাম করে পায়ের কাছে বসে বললাম, বাবু হামারা জাতে ডোম, আপনি হামাক কাঁধে হাত রেখে আদর করে কথা বললে আপনার জাত যাবে যে। হামি তো জীবনে ভুলব না। বাবু হামাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বড় বাবুর পাশে বসিয়ে বললেন, ব্রাক্ষণ চণ্ডাল সবাই মানুষ। উঁচু আর নিচু বলে কিছু নেই। সব মানুষের সৃষ্টি। সেদিন কালু ডোমের গর্বে বুক ভরে গিয়েছিল।

শহরে একটা মাত্র মহাশ্মশান। মরা পোড়ানোই কালু ডোমের একমাত্র পেশা। মানুষ মরে। যারা বাড়িঘরে নিয়ে যায় তো যায়। বাকীদের এই মহাশ্মশানই ভরসা। কালু ডোমকে দিয়েই মৃতের সৎকার করাতে হয়। এমন কি ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী যে ব্রাহ্মণ মৃতদেহের পৌরহিত্য করেন তাদের কাছে তো জীবজগতের অস্পৃশ্য এক প্রাণী এই কালু ডোম। তবুও কালু ডোমের দুঃখ নেই। সে সান্ত্বনা খুঁজে পায় মৃতদেহ সৎকার করে। কালু চিন্তা করে, হামি যদি এই কাম না করি তাহলে এতগুলো লোক কোথায় যাইবে। সারাক্ষণ গাঁজা ভাং, তাড়ি খেয়ে পরে থাকে। এসব না খেলে মরা পোড়ানো যায় না। কতক্ষণ আর আগুনের তাপ সহ্য করা যায়। আগুনের চেয়েও মনের তাপদাহ অনেক বেশী। তাছাড়া একের পর এক মানুষ আগুনে পুড়িয়ে মুহূর্তে ছাই করে দিচ্ছে। ভাবতেও কেমন গায়ে কাটা দিয়ে উঠে।

সাথে যারা আসে তারা বিলাপ ধরে কাঁদে। কত কান্না। স্বামী, স্ত্রী, ভাই, বোন, আত্মীয়, স্বজন, প্রেমিক, প্রেমিকা সবার কান্না সহ্য করতে হয়। কেউ জিজ্ঞাসা করলে কালু বলে, এসব মায়া কান্না। আজ বাদে কাল তিন দিন। একসময় সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সবাই সবকিছু ভুলে যাবে। কোন শিশু কিশোরকে পোড়াতে গেলে কালু নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। সেদিন অতি মাত্রায় নেশা করে। গাঁজা ভাং না খেলে কালু এসব সহ্য করতে পারে না।

মনের মধ্যে বৈরাগ্য লাভ হয়। সংসার অনিত্য। মৃত্যুই সত্য। এই ধারনাকে পোষণ করে ব্যোম ভোলা বলে কাজ শুরু করে দেয়। বংশের একমাত্র আয়ের পথ। ধরে রাখতে হবে। তাই ছোটবেলা থেকে জগাইকেও তালিম দিয়েছে। এখন কালু না থাকলেও জগাই একা শ্মশান চালাতে পারে। সৎকার করতে পারে। যেদিন শ্মশান ঘাটে যাত্রী বেশী হয় সেদিন বাপ বেটা দু’জনেই খাটাখাটি করে। দু’জনে একসাথে বসে গাঁজা খায়। নেশা করে। মাঝে মধ্যে রাত বিরাতেও ডাক পরে। ডাক পরলেই আসতে হয়। বাসি মরা নিয়ে বসে থাকা যায় না। শ্মশানের পাশেই কালুর বাসা। ডোম সমাজের আরও কয়েকজন সোয়ারী থাকে। ওদেরকে কালু ডেকে নেয়। আয়ের একটা অংশ ভাগ দেয়।

আজ মেয়ের বিয়ে। কালুর জানাশোনার পরিধিটা খুব ছোট। কমিটির বড় বাবুর সাথে ভাবটা বেশী। মেয়ের বিয়ের জন্য বেশকিছু খরচাপাতিও দিয়েছে। সাহস করে বড় বাবুকে সবার আগে নেমন্তন্ন করেছে। অন্যান্য যাদের সাথে কালুর জানাশোনা আছে তাদেরকেও নেমন্তন্ন করেছে। কালু নিশ্চিত জানে কেউ আসবে না। কালু এর মধ্যে তাড়ি খেয়েছে কয়েকবার। মেয়ের বিয়ে বলে কথা। একই কলোনির একটা ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। অতিথি সজ্জন সব মিলিয়ে শ’খানেক মানুষের ব্যবস্থা। বিয়ের অনুষ্ঠান প্রায় শেষ। এমন সময় বড় বাবুকে গাড়ী থেকে নামতে দেখে কালু দৌড়ে এসে পায়ে লুটিয়ে পড়ল। চোখ মুছে বলল, বাবু এ আমি স্বপ্ন দেখছি না তো।

বড় বাবু পরম মমতায় কালুকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন,
- কই তোমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।
- হ বাবু।
- তোমার মেয়ে কই।
- আছে বাবু। ভিতরে। হামার মেয়েকে আপনি মাথায় হাত দিয়ে একটু আশীর্বাদ করে দিন বাবু। হামার মানু সুখী হোবে।
- চল, তোমার মেয়েকে আশীর্বাদ করি। কালু বড় বাবুকে ভিতরে নিয়ে গেলেন।
- খাওয়া দাওয়া শেষ। জিজ্ঞাসা করলেন বড় বাবু।
- হ বাবু, সবাইর খাওয়া হয়েছে। হামারা নিজেরা এখনও খায়নি।
- চল, আমিও তোমাদের সাথে খাবো।
- এ আপনি কি বোলছেন বাবু, আপনি হামাক সাথে খাবেন!
- কেন খাবার নেই? আমার ক্ষুধা পেয়েছে।


কালু আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। অঝোরে কাঁদছে। বুক ফেটে কান্না আসছে। এ যে সুখের কান্না। এত বড় মানুষটা কিনা নিজে এসে কালু ডোমের ঢেরায় ভাত খেতে চাচ্ছে। যে মানুষটা দানে, ধর্মে, কর্মে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে পূজনীয়। যাকে এক পলক দেখার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাড়িয়ে থাকে। যে মানুষটির হাতের স্পর্শে মঠ মন্দির থেকে শ্মশান খোলা পর্যন্ত স্ব-মহিমায় সমুজ্জ্বল, সে মানুষটি কি না আজ তার ঘরে। এ যে স্বপ্ন না বাস্তব বুঝতে পারছে না। জগাইর মাকে ডেকে বলছে, ও জগার মা, আজ হামার ঘরে ভগবান এসেছে। এখন হামি হামাক ভগবানকে কোথায় রাখি। বড় বাবু মুখ টিপে হাসলেন। একসাথে বসে খাবার খেলেন। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললেন, আহ! বড় ভালো লাগলো।

সত্যিই একদিন কালু ডোমের বৈরাগ্য লাভ হয়েছে। সেদিন শ্মশান মন্দিরে অনেক লোক ছিল। এখন জগাই সেদিনের স্মৃতি স্মরণ করে আর চোখের জল মুছে। কত লোক এসেছে। উৎসব হচ্ছে। ঢোল করতাল শাঁখ আর মুহুর্মুহু উলুধ্বনির শব্দ। আকাশটাও ছিল পরিষ্কার। কোন মেঘ ছিল না। লোকে লোকারণ্য উৎসব অঙ্গন। কালু ডোম ব্যস্ত শ্মশান নিয়ে। এই কিছুক্ষণ আগে একটা মৃতদেহ সৎকার করেছে। আর একটা মৃতদেহ এসেছে। স্নান করানো হচ্ছে। আত্মীয় স্বজনদের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। এদিকে হরি নাম সংকীর্তন চলছে। সুন্দর তপ্ত দুপুর। আর কিছুক্ষণ পর ঠাকুরের ভোগ নিবেদন করা হবে। তারপর মহাপ্রসাদ বিতরণ। ব্রাহ্মণ চণ্ডাল সবাই একসাথে বসে মহাপ্রসাদ নেবে। এক ফাঁকে শ্মশান মন্দিরের এক কোণায় গিয়ে থলে থেকে গাঁজার কলকেটা বের করলেন কালু ডোম। হাতের তালুতে এক পুরিয়া গাঁজা ঘষে কল্কেতে সাজিয়ে নিশ্চিন্তে কয়েকটান দিয়ে নিল কালু। চোখ দুটো আগুনের মত টকটকে লাল। কালো শরীর। ময়লা গামছাটা মাথায় বেঁধে নিল। ময়লা ঘামে কালো শরীরটা চিক চিক করছে। এক খোঁচা করে পরা কালো ধুতিটা ধোয়ার সময় হয়না। এর মধ্যে পুরোহিতের কাজ শেষ। শব তুলে দেওয়া হল চিতায়। এখনি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠবে। মুহূর্তেই আর একটি দেহ পুরে ছাই হয়ে যাবে।

মন্দিরে বড় বাবু এসে কালুর খোঁজ করলেন। শ্মশানের কাজ শেষে ডেকে পাঠালেন কালুকে। কালু এসে পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। বড় বাবু হাতে তেল সাবান আর নতুন কাপড় তুলে দিয়ে বললেন, যাও সুন্দর করে দাড়ি গোঁফ কামিয়ে ¯œান করে নতুন কাপড় পরে তাড়াতাড়ি এসো। এর মধ্যে সিংহাসন সাজানো হয়েছে। রাজ সিংহাসন। সিংহাসনের পেছনে বড় দুটি হাত পাখা নিয়ে দু’জন পেয়াদা দাড়িয়ে আছে। রাজা এসে সিংহাসনে বসবেন। তারপর শুরু হবে তোপধ্বনি। পেয়াদারা বাতাস করবে। এ যেন এক বিরল কর্মযজ্ঞ। কালু কিছু না বলে বাবুর কথামত তাড়াতাড়ি ফিরে আসলেন। কালুকে খুব সুন্দর লাগছে। ঠিক রাজার মত। জরির পাড় করা সোনালী রংয়ের ধুতি পাঞ্জাবী। নতুন কাপড় পরে বড় বাবুর সাথে যারা আছে তাদেরকেও প্রণাম করলেন।

বড় বাবু বুকে জড়িয়ে ধরলেন কালু ডোমকে। আজ বাবুর চোখে জল। জগাই বাইরে থেকে সব দেখছে। তার বাবাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে। বাবুর কথামত কালুর পরিবারের সবাই এসেছে। বড় বাবু কালুকে সিংহাসনে বসিয়ে দিলেন। কালু প্রতিবাদ করল, সে কি বাবু। আপনি এ কি করছেন। হামি বসবেক নাই। ঐ রাজ আসন তো আপনার জন্য। আপনি বসবেন। বড় বাবু হাসলেন। বললেন, আজ তুমিই রাজা। আমি প্রজা। আজ তুমি সিংহাসনে বসে থাকবে। যা করার আমি করব। কোন কথা বলবে না।

কালুর মনে হল সে স্বপ্নের ঘোরে আছে। নেশাটা বোধ হয় বেশী হয়েছে। পাথরের মত বসে আছে সিংহাসনে। বড় বাবু অপূর্ব সুন্দর একটা জড়ির চাদর গলায় ঝুলিয়ে দিলেন। নক্সা করা একটা পিড়ি কালু ডোমের পায়ের নীচে রেখে পা দু’টো নিজ হাতে তুলে পিড়ির উপর রাখলেন। বড় বাবুর কাঁধে গামছা। চোখ বুজে আছে কালু ডোম। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পরছে। চোখ দুটো দিয়ে এত জল কখনও গড়িয়ে পরেনি। জল মুছতে পারছে না কালু। চিত্রাপিতের মত চুপ করে বসে আছে। কাঁদছে বড় বাবু। এবার জল ভর্তি সুদৃশ্য কাঁসার পাত্র এলো। বড় বাবু ঐ জল দিয়ে কালুর পা ধুইয়ে দিলেন। নিজ হাতে কাঁধের গামছা দিয়ে সযত্নে মুছে দিলেন দুটো পা। তারপর চরণে ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম করে পুষ্পার্ঘ্য দিয়ে পঞ্চপ্রদীপ সহ পঞ্চউপাচারে বরণ করলেন। তারপর দুজন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে অনেক্ষণ কাঁদলেন। চারিদিকে উলুধ্বনির ঝড় উঠলো। এত লোকের মধ্য থেকে উচ্চ বর্ণের এক বিদগ্ধ ব্রাহ্মণ নীরবে বলে উঠল, সমাজটা একেবারে উচ্ছন্নে গেলো। ধর্ম বলে আর কিছু থাকলো না। পাপ, পাপ, এ সবই পাপ। এ পাপ ভগবান সইবে না।

জগাইর চোখের সামনে আজও জ্বল জ্বল করছে সেই দৃশ্য। কালু ডোম মারা গেছে। ছেলে জগাই নিজেই শবদাহ করেছে। নিজেই মুখাগ্নি করেছে। বড় বাবুরা উপস্থিত ছিল যেদিন কালু মারা গেল। সমাজে অস্পৃশ্য হিসেবে নয় একজন মানুষ হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদায় কালুর শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছে। বড় বাবু নিজে উপস্থিত থেকে সবকিছু করেছেন।

আজ জগাইকে খুব অস্থির লাগছে। সারা শহরে খবর ছড়িয়ে পরেছে বড় বাবু মারা গেছেন। মানুষ মরবে। এটাই সত্য। কিন্তু বড় বাবু মারা গেছেন। এটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। শহরে শবদেহ নিয়ে শোক মিছিল হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ সেই মিছিলে শরীক হচ্ছে। জগাই যেতে পারছে না। শ্মশান কর্ম জগাইকে করতে হবে। এর মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত নেশা করেছে জগাই। কোন কিছুই আর তার ভালো লাগছে না। মৃত্যটাকে বড় অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। সনাতনী সমাজের বর্ণ বৈষম্য দূর করার জন্য যে মানুষটা পূজা পার্বণে, উৎসবে আনন্দে সকলকে বুকে তুলে নিয়েছেন, নর’কে নারায়ণ জ্ঞানে সকলের চরণ সেবা করেছেন, আজ তাঁর দেহটা জগাইকে পুড়ে ছাই করে দিতে হবে। জগাই আর কিছু ভাবতে পারছে না। সে আবারও গাঁজার কল্কি নিয়ে বসেছে। সিদ্ধি খেলে নাকি দিব্য জ্ঞান লাভ হয়। রক্তবর্ণ চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে। চোখের দৃষ্টি দিয়ে অন্তরের ভেতরে শুধু বড় বাবুর ছবিটায় ভেসে উঠছে বার বার।

জগাই নিজের জীবনকে নিয়ে নতুন ভাবে ভাবতে শুরু করলো।
ভাবলো আমার তো পাপের জীবন। এ জীবন দিয়ে তো মানুষের জন্য কখনও কিছু করা সম্ভব নয়। আমার এ জীবনতো সমাজের কোন কাজে আসবে না। আমার এই জীবনের মূল্যই বা কি। এই ভাবতে ভাবতে কাঁদতে শুরু করলো। ভগবানের উপর বিশ্বাস বেড়ে গেলো। নির্ভর করতে শিখলো। স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করলো। হে ভগবান, তুমি দয়াময়। তুমি অন্তর্যামী। তুমি সবকিছু করতে পারো। তুমি জীবন দিতেও পারো আবার নিতেও পারো। বিশ্বাস আরও গভীর হল। ভগবান সব কিছু করতে পারবেন। জগাই ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে বলল, হে ভগবান, তুমি আমার জীবনের বিনিময়ে আমার বড় বাবুর জীবন ফিরিয়ে দাও। আমার জীবন দিয়ে তো কিছু হবে না। উনি বেঁচে থাকলে সমাজের গরীব দুঃখী লোকজন আরও অনেক কিছু পাবে। আমাদের মত চণ্ডালরা সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে।

শ্মশান মন্দিরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মানব প্রেমের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মানুষটির জন্য সবাই কাঁদছে। পুরোহিতের সব কাজ শেষ। এখনি শ্মশানে তোলা হবে। জগাই নিজের পুরানো পোশাক পাল্টে নতুন ধুতি পাঞ্জাবী পরে নিয়েছে। ঠিক রাজার মত যেভাবে কালু ডোমকে সাজানো হয়েছিল। শ্মশান ঘর থেকে সবাইকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল জগাই।

পায়ে পরে কাঁদছে আর ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছে। আমি এ মানুষটির চিতা জ্বালাতে পারব না। ভগবান প্রার্থনা শুনলেন। সন্তুষ্ট হলেন। জগাইয়ের বুকে একধরনের কষ্ট অনুভব হল। অলৌকিকভাবে বড় বাবুর দেহে প্রাণ সঞ্চার হয়েছে। সৌম্য দিব্যকান্তি এক পুরুষ। ঠিক বড় বাবুর মত একটি লোক ধীরে ধীরে উঠে আসলেন শ্মশান থেকে। জগাইয়ের কাছে এসে তাকে আলিঙ্গন করলেন। কানে কানে বললেন, এ তুমি কি করলে। আমাকে কেন এভাবে তুলে আনলে। জগাই অনেক কষ্টে বলতে পারল-বাবু হামার এ পাপের জীবন দিয়ে তো কিছু করতে পারবো না। আপনার আরও অনেক কাল বাঁচতে হবে। সমাজের অনাচার জঞ্জাল সাফ করার জন্য আপনার মত মানুষের বড় প্রয়োজন। এই বলে জগাই মহামানবটির কোলে ঢলে পরলেন এবং সমাহিত হলেন।
জগাই একজন মহৎপ্রাণ মানুষের মর্যাদায় স্বীকৃত হলেন।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন