বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ মে ১৯৬৮
গল্প/কবিতা: ১০৬টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৭১

বিচারক স্কোরঃ ২.১৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫৬ / ৩.০

তিথির নীল কষ্ট

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

কোজাগরি পূর্ণিমার রাতে

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

রামদুলালের ঢোল

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

দুঃখ (অক্টোবর ২০১৫)

মোট ভোট ১৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৭১ পূর্ণপাত্র

মিলন বনিক
comment ৯  favorite ১  import_contacts ৪৬৫
পূর্ণপাত্র
মিলন বনিক
মানুষের মন বলে কথা।
মনের কোন সীমাবদ্ধতা নেই। গতি প্রকৃতি বোঝার সাধ্যও নেই। মন যে কখন কাকে ভালোবাসে, কাকে ভালো লাগে, তা একমাত্র যার মন সেই জানে। যার ভাবনা সেই বলতে পারবে। হাত পা চোখ কান সব কিছুর উপর খবরদারি চলে, বেঁধে রাখা যায়। মনকে বাঁধা যায় না। বিশ্বাসের ভিত শক্ত হলে সৃষ্টিকর্তা খুশি হয়। আবার যদি হয় নারীর মন, তাহলে তো কথাই নেই। তা নাকি স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও বোঝেন না। বয়সের প্রভাব পরে মনের উপর। ভাবনার অর্ন্তজালে জড়িয়ে মন শুধু নিজেই নিজের মত করে ভাবে। কারও সাহায্য লাগে না। নির্ভর করতে হয় না। মন স্বভাব স্বাধীন, স্বনির্ভর।

ভদ্রলোক স্বপ্ন দেখেন। মনের দৌড়াত্ম্য মনকে যখন যেখানে খুশি নিয়ে যান। কোন সীমারেখা টানা নেই। স্মৃতি রোমন্থন করেন। গল্প কবিতা উপন্যাস লেখেন। পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়। আলোচনা সমালোচনা হয়। দীর্ঘদিন লেখালেখির সুবাদে নিজস্ব একটা পরিচিতিও তৈরি হয়। তাতে মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি, রাগ, অনুরাগ অনেক কিছুই জড়িয়ে থাকে।

সেই প্রথম অনুরাধার সাথে কথা হয়েছিল বৈশাখি মেলায়। চারুকলার ছাত্রী অনুরাধা। ফটোগ্রাফির শখ ছিল। কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরা। রং বেরং-এর হাতি ঘোড়া, পালকি বানিয়ে বাদ্য বাজনা নিয়ে শোভাযাত্রাটি সিআরবি-র শিরিষ তলায় গিয়ে শেষ হয়। চোখে চোখ পড়ে। ভদ্রলোকের চিনতে পারার কথা নয়। কতক্ষন তাকিয়েছিল মনে নেই। অনেক্ষন এভাবে তাকিয়ে তাকাটা বেমানান মনে হতেই মুচকি হেসে চোখ ফিরিয়ে নিল অনুরাধা। মনে মনে ভাবল, এভাবে নির্লজ্জের মত তাকিয়ে থাকাটা ঠিক হয়নি। রং ফানুশের দেশে উড়ে বেড়ানোর মতো একটা সময়। অনুরাধা একটুও সংকোচবোধ করেনি। বন্ধুদের দল থেকে ছুটে এসে জিজ্ঞাসা করল-
- আপনি নিশ্চয় শ্রী মিত্র।
- হুম।
- আমি অনুরাধা। বলতে পারেন আপনার একজন ভক্ত।
শ্রী মিত্র তাকিয়ে আছে অনুরাধার মুখের দিকে। দু’গালে লাল সবুজ রং দিয়ে কেউ একজন ছুঁয়ে দিয়েছে নকশা এঁকে। এক গালে লেখা এসো হে বৈশাখ। অন্য গালে শুভ নববর্ষ। রোদে পুড়ে ফর্সা মুখখানা তামাটে হয়ে আছে। গ্রীবা দু’টো কোন এক অজানা শিহরণে কাঁপছে। এই মুহুর্তে শ্রী মিত্রর মনটাও দিবা স্বপ্নে বিভোর। তা কি অনুরাধা বুঝতে পারছে? শুধু মন বলছে আমি চিনি গো চিনি তোমারে----।

কেটে গেলো একটা বছর। অনুরাধাকে দেখার পর প্রতিদিন কল্পনার কত রঙ্গে মন রাঙ্গিয়েছে তার ইয়ত্বা নেই। কেন ফোন নাম্বারটা নিলাম না, এই ভেবে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিল। আবার ভাবল একজন পাঠিকার কাছে হঠাৎ ফোন নাম্বার চাই কীভাবে? সময়ের ব্যবধানে একসময় স্মৃতিগুলো ফিকে হয়ে আসে। সংসারের চিলেকোটায় বন্দি পাখির মতো ছটফট করে মন। ইদানিং প্রায়ই মন খারাপ থাকে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে জানালার গ্রিলে ঠেস দিয়ে মন ভালো করা কিংবা গল্পের নতুন প্লট খোঁজার চেষ্টা চলে। মন চাই দস্যিপনা করতে। বয়স বলে, তোমার কি আর সেই দিন আছে?
এই দো-মনার টানাপোড়েন কখনও এক হতে পারছে না। একদিন ফোন আসে।
- হ্যালো শ্রী মিত্র? কেমন আছেন।
- ভালো।
- চিনতে পারলেন না তো?
- আসলে---।
- বুঝতে পারছি। আমি অনুরাধা বলছি। এবার পূজো সংখ্যায় আপনার পূর্ণপাত্র গল্পটি খুব ভালো লেগেছে।

শ্রী মিত্র চুপ। ধন্যবাদটাও দিতে ভুলে গেলো। মন এগিয়ে চলে একটা অনিবার্য পরিণতির দিকে। গল্পের রংগুলো মিলেমিশে ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। আবার ফোনে কথা হয়-
- এবার পহেলা বৈশাখে আসছেন তো?
- কোথায়?
- শিরিষতলায়।
- হুম।

মন বললো অবশ্যই আসবো। যেতেই হবে। শিরিষতলায় পাশাপাশি বসে অনেক কথা বলবো। হলোও তাই। দেহঘড়ি চলছে ধীরলয়ে, মন চলে তার সহ¯্রগুন বেগে। বর্ষবরণের এত আয়োজন, এত ডামাঢোল, আনন্দ, হৈ-হুল্লোড় কোন কিছুই আর কানের সদর দরজা থেকে মন পর্যন্ত পৌছায়নি। মন ছুটে বেরিয়েছে মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর, নির্জন-নীরবতায় ছুঁয়ে দেখার আনন্দে। কালের আবর্তে ধীরলয়ে সমুদ্রের ঢেউ উঠে। মনের গর্জন তাতে সাড়া দেয়। সং সেজে চিলেকোঠায় বন্ধকী সম্পত্তির মতো থাকতে মন চায় না। সংসার অসার। ছাড়িয়ে নিতে পারলে বাঁচে। মনের খাঁচাটা মুক্ত হবে। সে তো সম্ভব নয়।

এখন আর বৈশাখের সাথে সময়ের সীমাবদ্ধতা নেয়। শ্রী মিত্র একজন ভালো বন্ধু পেয়েছেন। সেই সুবাদে মনের টানে প্রায়ই শিরিষতলায় বসতে হয়। ফুচকা কিংবা লেবু চা’র সাথে টোষ্ট চুবিয়ে খেতে খেতে কথা হয়। এক বৈশাখী মেলায় অনুরাধার খোঁপায় বেলি ফুলের মালা গুজে দিয়েছিল শ্রী মিত্র। তাতে অনুরাধা কিছু মনে করেনি। চোখের ভাষায় কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারেনি। দু’টো মন কাছাকাছি আসার স্বপ্ন দেখে। অনুরাধার মনটাও বুঝি তাই বলছে। সম্বোধনটা শিথিল হয়। আপনি থেকে তুমি এবং অনুরাধা থেকে অনু-তে এসে ঠেকেছে। নারীর মন বলে হয়তো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছে না। সংসারি মানুষের চিত্ত দুর্বল। অনুরাধার কাছে এ ভালোবাসা অর্থহীন হতে পারে। আর কিছুদিন এভাবে সময়ের ¯্রােতে ভেসে যেতে পারলে মন হয়তো একটা ঠাঁই খুঁজে পাবে। মনের সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ ঝেড়ে ফেলে চরম সত্যটা বলতে পারবে। কিন্তু কীভাবে?

আবার সেই সময়ের বিড়ম্বনা। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে থেমে গেছে অনেককিছু। ফোনালাপও নেই। অনুরাধার ফোন বন্ধ। আলোচনা, কথাবার্তা, ভাব বিনিময় কিছুই নেই। ছুঁয়ে যাওয়ার অনুভূতি নেই। শুধু মনের নৈকট্য নিয়ে সারাক্ষন জেগে থাকে স্মৃতিগুলো। বসন্ত চলে যায। চৈতী হাওয়া ছুঁয়ে যায় ঝরা পাতার দীর্ঘশ্বাস। বৈশাখ আসে। বর্ষবরণ হয়। আনন্দ হয়। শিরিষতলা ভরে উঠে কোলাহলে। আনন্দের ঢেউ আঁচড়ে পড়ে বাঙালির উঠোনে। শ্রী মিত্রর পূর্ণপাত্রে সংযোজিত হয় তৃতীয় সংস্করণ।

কাল পহেলা বৈশাখ। বেলা শেষে ফোন বেজে উঠে। এ নিশ্চয় অনুরাধা। আজ এতদিন পর আবার মনটা দুলে উঠল। সাথে দ্বিধা, সংকোচ, নিজেকে আড়াল করার অভিপ্রায়। শ্রী মিত্র ফোন ধরলেন। কথা শেষে বললেন-আমি অবশ্যই আসবো। ফোন রেখে স্ত্রীকে বললেন-আমাকে একটু নিয়ে যাবে?

শ্রী মিত্রর সহধর্মীনি শিরিষতলায় নিয়ে গেলেন। সেই একই ছবি। প্রতিবছরের মতো। আনন্দের হাট বসেছে। অনুরাধার সিঁথিতে সিঁদুর। স্বামী সহ শ্রী মিত্রকে খুঁজছে। একেবারে কাছে অথচ চিনতে পারছে না ইনিই শ্রী মিত্র।

হুইল চেয়ারে বসা প্যারালাইজড শ্রী মিত্রর সাথে হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন