বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ১৭টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

অজানা গন্তব্য

ত্যাগ মার্চ ২০১৬

ফাগুনের দোল

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

তুমি আমার

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

কোমলতা (জুলাই ২০১৫)

সিদ্ধান্ত

আলমগীর মাহমুদ
comment ৪  favorite ০  import_contacts ৩৪৭
বাবুল আর অমিত দুজনে ভাল বন্ধু না হলেও একই সাথে চলা-ফেরা করে। বাবুল পঞ্চম শ্রেণীতে আর অমিত ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে একই স্কুলে। বাবুল হিন্দু আর অমিত মুসলমান। কিন্তু দুজনে দুই ক্লাসে পড়লেও একই সাথে স্কুলে যাওয়া আসা করে। বাবুলের বাড়ি আমিতে বাড়ির মাঝে কয়েক মিনিটের পথ। তবে অমিত প্রায়ই বাবুলের বাসায় পাশের মাঠে খেলতে আসে। বাবুলের বাসার পাশে আরো কয়েকটি হিন্দু পরিবার বাস করতো। বাবুলদের পেশা ছিল হাটে পান বিক্রি করা। তবে খুব একটা ¯^চ্ছলনা। অমিতররা মোটামুটি ¯^চ্ছল। বাবুলদের বাসায় ছিল একটি বড়ই গাছ। গাছটিতে প্রচুর পরিমাণে বড়ই ধরতো। কিন্তু বাবুলের মায়ের বাজখায়ি গলার কাছে কেউ এদিকে ঘেষতে সাহস করতোনা। তারপরও গ্রামের ছোট ছেলেরা বাবুলদের বাসার আশে-পাশে বেশীর ভাগ সময় ঘুরঘুর করতো। স্কুল যেদিন বন্ধ থাকতো সেদিন সকাল থেকেই বাবুলদের বাড়ির পাশের মাঠে খেলা চলতো। যেই বাবুলের মা একটু বাড়ির বাইরে বেরিয়েছে, কিংবা পুকুর পাড়ে গিয়েছে অমনিই ছেলের দল ঢিল ছুড়তো বড়ই গাছে। আর এক ঢিলেই বড়ই ঝড়ে পড়তো অনেকগুলো। আর ছেলের দল এক দৌড়ে গিয়ে যতটা বড়ই কুড়াতে পারে, কুড়িয়ে দৌড়ে চলে আসতো। আর বাবুলের মা চিৎকার করতে করতে যখন বাড়িতে ঢুকতো তখনই ছেলের দল লাপাত্তা। অমিত মুলত বড়ই খাওয়ার লোভেই বাবুলের সাথে একটু খাতির রাখতো। কিন্তু বড়ই খেতে পারতোনা।
অমিত তার খেলার সাথিদের নিয়ে প্রায়ই বাবুলদের বাড়ির পাশের মাঠে খেলাধুলা করতো। একদিন খেলতে খেলতে দেখলো বাবুলের মা পুকুরের পারে হাড়ি পাতিল ধুতে গেছেন। আর অমনিই অমিত এক দৌড়ে বড়ই গাছের নিচে। সাথে অন্যারাও। একটি ঢিল নিয়ে ছুড়ে মারলো গাছে, বড়ই ঝড়ে পড়লো অনেকগুলো। যখন বড়ই কুড়াতে যাবে আর অমনিই বাবুলের মায়ের বাজাখায়ি গলা বেজে উঠলো। অমিত কোন রকমে বড়ই কুড়িয়ে দৌড়ে পালাতে গেল। কিন্তু বিধি বাম। পালাতে গিয়ে পড়ে গিয়ে পায়ে প্রচন্ড রকম ব্যাথা পেল। বাবুলের মা এসে বকাবকি করতে লাগলো এবং অমিতকে চিনে ফেললো আর বললো যে, অমিতের বাবার কাছে আজকেই বিচার দেবে। অমিততো এমনিতেই পায়ে ব্যাথা পেলো। আর যদি বাবার কাছে বিচার দেয় তাহলে আর রক্ষা নেই। পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলে ফেলবে অমিতের বাবা। অমিত খুবই ভয় পেয়ে গেলো।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। অমিত মাত্র পড়তে বসেছে। অমনিই অমিতের বাবার গলা। ভয়ে অমিতের গলা শুকিয়ে গেলো। অমিত ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলো-
- আজ সকালে হিন্দু পাড়ায় গিয়েছিলি ?
- না বাবা, আজকেতো আমি স্কুলে গিয়েছিলাম
- হারামজাদা, আজকে স্কুল খোলা নাকি বন্ধ
- আজকে স্কুল খোলাতো বাবা, স্কুল খোলা
- আজকেতো সাপ্তাহিক ছুটি, আর আজকে স্কুল খোলা। চড় মেরে সবগুরো দাঁতা ফেলো দিবো, কোথায় গিয়েছিলি বল
- কোথাওনা বাব কোথাও না
- বড়ই গাছে ঢিল ছুড়েছিলো কে
- বাবুল বাবা, বাবুল
- হারামজাদা, বাবুলের বাসার বড়ই গাছে, বাবুল ঢিল ছুড়বে, আমাকে বোকা পেয়েছিস

আমিত আর কোন কথা বললোনা। ভাবলো এই বুঝি ওর বাবা ওর গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দেবে। কিন্তু অমিত অবাক ওকে অবাক করে ওর কানে ধরে বরলো
- হারামজাদা, কোন দিন বড়ই খাসনি। তোরা বাবা তোকে কোনদিন বড়ই খাওয়ায়নি। আমাদের বাসায়ওতো বড়ই গাছ আছে, কই একদিনতো সেই বড়ই পারতে দেখিনি। পরের গাছে ঢিল ছুড়তে ভাল লাগে, না। আর যদি কোনদিন হিন্দু পাড়ার বড়ই গাছে ঢিল ছুড়েছিস তাহলে তোর একদিন কি আমার একদিন
কিন্তু কে শোনে কার কথা। সকাল বেলায় হাজির হিন্দু পাড়ায়। কেন যানি এ পাড়ায় না আসলে অমিতের ভাল লাগেনা। শুধু অমিতের কেন, গ্রামের অন্য সব ছেলেরা হিন্দু পাড়ার পাশের মাঠেই খেলতে আসে। অমিতের খুব ইচ্ছা একদিন বড়ই গাছে উঠে ইচ্ছেমতো বড়ই পাড়বে আর মাঠে বসে বড়ইতে লবণ মাখিয়ে বন্ধুদের সাথে খাবে। কিন্তু সে আসা কোনদিনও পুরন হবে বলে মনে হয়না। এদিকে বাবুলের মা প্রতিদিনই বড়ই পাড়ে আর বাবুলকে দিয়ে বাজারে বিক্রি করতে পাঠায়। আজ যখন অমিত হিন্দু পাড়ার দিকে আসছিলো ঠিক তখনই বাবুল বড়ই নিয়ে যাচ্ছিল বাজারে বিক্রি করতে। বাবুলের সাথে পথে দেখা হতেই অমিত বাবুলকে প্রশ্ন করলো
- কিরে বাবুল কোথায় যাচ্ছিস
- বাজারে
- তোর মাথায় কিসের ঝুড়ি
- বড়ই
- কি করবি, এত বড়ই
- বাজারে বিক্রি করবো
- কেন বাজারে বিক্রি করবি কেন ? তোরাতো খেতে পারিস
- বাজারে বিক্রি করে যে টাকা পাবো তা দিয়ে চাল-ডাল কিনবো। আমাদের ঘরে চাল নেই, চাল না কিনলে দুপুরে খাওয়া হবেনা, নে একটা বড়ই খা
- নারে, আমি বড়ই খাবোনা, এভাবে বড়ই খেতে ভাল লাগেনা। গাছে ঢিল ছুড়ে যদি বড়ই না খাওয়া যায়, তাহলে কোন মজাই নেই। তুই যা, বাজারে যা, দেখি তোদের বড়ই গাছে ঢিল ছুড়ে বড়ই পাড়া যায় কিনা।
বাবুল চলে গেলো বাজারে। অমিত মাঠের কোনায় বড় গাছটার নিচে বসে রইলো। মন খুব বিষন্ন হয়ে উঠলো। বাবুলদের ঘরে চাল নেই। বড়ই বিক্রি করে চাল কিনবে। আর অমিত সে বড়ই গাছে ঢিল ছুড়ে বড়ই পারে। অমিতের মনটা একেবারেই নরম হয়ে গেলো। অমিত বুঝতে পারলো যে, কেন বাবুলের মা বড়ই রক্ষার জন্য এভাবে চিৎকার করে। অমিতের চোখ দিয়ে পানি বেড়িয়ে আসলো। সিদ্ধান্ত নিলো আর কোন দিন বড়ই গাছে ঢিল ছুড়বেনা।
স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। রেজাল্টও বেরিয়ে গেছে। নতুন বছরে নতুন বই কিনবে অমিতের এজন্য মনটা খুবই উৎফুল্ল। নতুন বইয়ের ঘ্রানটা অমিতের খুবই ভাল লাগে। বাবার সাথে অমিতও যাবে বাজারের বড় লাইব্রেরীতে বই কিনতে। কিছুক্ষণ পর বাবুলের ডাক শুনতে পেলো অমিত। অমিত বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে বাবুল
- কিরে বাবুল তুই এত সকালে
- তোর কাছে আসলাম, একটা বিষয়ে আলাপ করার জন্য
- কি আলাপ, বল
- না বলছিলাম কি, তুইতো উপরের ক্লাসে উঠেছিস
- হ্যা, তুইওতো উঠেছিস
- উঠেছি ঠিকই, কিন্তু
- কিন্তু কি
- না মানে বলছিলাম যে, তুইতো উপরের ক্লাসে উঠেছিস, তুই এখন নতুন বইও কিনবি, তোর পুরনো বই গুলো আমার কাছে বিক্রি করবি
- পুরনো বই, বিক্রি
অমিত ভাবলো ভালই, বই গুলো বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে তা দিয়ে মিষ্ট কিনে খাবে। যা বিক্রি করতে পারবে তাই লাভ। তাই অমিত বললো
- শোন বাবুল, বইগুলো আমি বিক্রি করে দেবো, বইয়ে যে দাম লেখা আছে তার অর্ধেক দামে
- ঠিক আছে, অমিত, আমি তাই দেবো, কিন্তু টাকা এখন দিতে পারবোনা, মা বলেছে, কয়েক দিন পর টাকাটা দিবে।
- ঠিক আছে, আমি তাতেই রাজি, চল তাহলে দেখি, বইগুলোর দাম কতো
দুজনে মিলে বইগুলো বের করলো, বই গুলোতে মলাট লাগনো ছিল বলে তেমন একটা নষ্ট হয়নি, ময়লাও জমেনি। সবগুলো বই খুলে খুলে এর মূল্য দেখে মোট দাম হলো পঞ্চাশ টাকা। বাবুল বললো “তোর কথা মতো এর দাম এখন পঁচিশ টাকা। ঠিক আছে”। অমিত বললো
- ঠিক আছে, পঁচিশ টাকা, কিন্তু কবে টাকা দিবি, এখন কিছু দে,
- আমার কাছে দুই টাকা আছে, এটা এখন দিচ্ছি, বাকিটা মা বলেছে পড়ে দিবে
- মাত্র দুই টাকা, ঠিক আছে দে,
- চল মা তোকে যেতে বলেছে
- না বাবা, তোর মায়ের সামনে যাবনা, যদি আমাকে বকা দেয়, তোর মা যে কড়া
- না তোকে কিছু বলবেনা, আরে মাতো বড়ই গাছে ঢিল ছুড়লে বকা দেয়, এখন কিছু বলবেনা
- ঠিক আছে, চল তাহলে
দুজনে মিলে বাবুলের বাসায় গেলো। বাবুলের হাতে বই। পুরনো বই পেয়ে বাবুল খুবই খুশি। বারবার বইয়ের দিকে তাকাচ্ছে। অমিত বললো
- কিরে তুই বারবার বইয়ের দিকে তাকাচ্ছিস কেন
- না, নতুন বইতো, বইগুলো দেখছি
- নতুন বই, এগুলো সবই পুরনো
- তোর কাছে পুরনো হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এগুলোই এখন নতুন। আমার খুব ভাল লাগছে
বলতে বলতে ওরা চলে এলো বাবুলের বাসায়। অমিত ভয়ে ভয়ে বাবুলের বাসায় ঢুকলো। দেখলো যে, বাবুলের মা ঘরের বারান্দায় বসে আছে। ওদের ঢুকতে দেখেই বাবুলের মা ওঠে এসে জিজ্ঞেস করলে “কিরে বাবুল বই কত টাকা দাম হয়েছে”
- দাম হয়েছিলো পঞ্চাশ টাকা মা, অর্ধেক দামে কিনেছি, পঁচিশ টাকা। আর ওকে দুটাকা দিয়েছি
বাবুলের মা অমিতকে কাছে টেনে নিলো। বললো
- বাবা, আমরা গরিব, বই কেনার পয়সা নেই, তাই তোমার বইগুলো অর্ধেক দামে বাবুলকে কিনতে পাঠিয়েছিলাম।
এ কথা বলে বাবুলের মা অমিতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। আর বললো
- বাবা, এখনতো আমার কাছে টাকা নেই, তোমাকে কদিন পরে টাকাটা দিবো, তুমি কিছু মনে করোনা। আর বাবা সবগুলো টাকা একসাথে দিতে পারবোনা, কিছু কিছু করে দিবো
অমিতের মাথায় গরিব কথাটা বারবার আঘাত করছিল। ভাবছিলো ওরা গরীব বলে বই কিনতে পারেনা, বড়ই বিক্রির করে খাওয়ার চাল কেনে, আর আমি প্রতি বছর নতুন নতুন বই কিনছি, খাতা কিনছি। অমিতের চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। ভাবলো এই বইগুলো বাবুলকে এমনি দিয়ে দিলে অমিতের কি কোন ক্ষতি হয়ে যাবে। না হয়, মিষ্টি খেতে পারবেনা। তাতে কি হয়েছে, বাবাকে বলে মিষ্টি খাওয়ার পয়সা নিয়ে নিবে। কিন্তু অমিতের মা যেভাবে, মোলায়েম হাতে অমিতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল তার কাছে এই টাকা খুবই সামান্য ব্যাপার। তাই অমিত সিদ্ধান্ত নিলো এই টাকা সে কখনোই বাবুলের কাছ থেকে নেবেনা। তারপর বললো-
- বাবুল শোন, তুই আমাকে যে দুই টাকা দিয়েছিলি নে সে দুটাকা নিয়ে নে। আর চল বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমরা মিষ্টি কিনে খাবো। আর শোন তোকে আর কোন টাকা দিতে হবে না, কোন দিন তোকে আমার কাছ থেকে বইও কিনতে হবেনা। প্রতি বছর আমিই তোকে আমার পুরনো বই এমনি এমনি দিয়ে তোকে দিয়ে যাবো। চল আমরা আমরা মিষ্টি কিনে খাই।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন