বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ১৭টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৫৮

বিচারক স্কোরঃ ১.৯৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬ / ৩.০

ফাগুনের দোল

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

তুমি আমার

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

রুম হিটার ও একটি চট

শীত / ঠাণ্ডা ডিসেম্বর ২০১৫

গল্প - ত্যাগ (মার্চ ২০১৬)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৫৮ অজানা গন্তব্য

আলমগীর মাহমুদ
comment ২  favorite ০  import_contacts ৪২৩
আকরাম সাহেব পেশায় একজন শিক্ষক। শিক্ষকতা করা তার পেশা হলেও তিনি কখনোই শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করতে পারেননি। এই মহান পেশাটাকে তিনি তার একটি নেশা হিসাবেই স্বীকৃতি দিয়েছেন সবসময়। কলেজের সবার কাছে তিনি একজন প্রিয় শিক্ষক হিসাবে পরিচিত। পড়ান ইতিহাস। কিন্তু ছাত্রদের কাছে কখনোই মনে হয়নি তাদের স্যার তাদেরকে ইতিহাস পড়াচ্ছেন। ইতিহাসকে এমন ভাবে আকরাম সাহেব পড়ান কোন ছাত্রের পক্ষেই তা ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। কোন ছাত্রই ক্লাসে অমনোযোগী হওয়ার সুযোগ নেই। তাই কলেজের সবার প্রিয় শিক্ষক এক নামে সবাই চেনেন আকরাম সাহেবকে।
বিয়ে করেছেন গ্রাজুয়েশন করেই। বাবা-মা এক প্রকার জোড় করেই বিয়ে করিয়েছেন আকরাম সাহেবকে। আকরাম সাহেবের শশুর শহরের এক বিত্তবান মানুষ যাকে এলাকার সকল লোক খুবই ভাল জানেন। তার সম্পর্কে এলাকার সকলেরই খুব ভাল ধারণা। অন্যের উপকার করতে আকরাম সাহেবের শশুরের কোন প্রতিদ্বন্দি নেই বললেই চলে। উপকরা করা তার যেন এক নেশা। আর এলাকার উন্নয়নে তার অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ন। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা ঈমান আলী। আকরাম সাহেবের শশুর। এই বিষয়টা আকরাম সাহেবের জন্য খুবই গর্বের বিষয়। তিনি তার স্ত্রীকে মুক্তিযোদ্ধার কন্যা হিসাবে শ্রদ্ধা ও সম্মান করেন।
আকরাম সাহেব অধ্যাপনার পাশাপাশি গবেষণাও করেন মাঝে-মধ্যে। ইতিহাসই তার গবেষণার মূল বিষয়। বিভিন্ন বিষয়ে জাতীয় দৈনিকে তার কয়েকটি লেখাও প্রকাশিত হয়েছে। যখন পত্রিকায় কোন লেখা প্রকাশ হয় তখন আকরাম সাহেব খুবই উৎসাহ বোধ করেন। অনেকেই লেখা পড়ে তাকে বাহাবা জানায়। কলেজের ছাত্র-ছাত্রিরাও আকরাম সাহেবকে অভিনন্দিত করে। আকরাম সাহেব চিন্তা করলেন পত্রিকায় তার যে কয়টি লেখা প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়ে একটি বই বের করবেন। বই প্রকাশের জন্য আকরাম সাহেবের খুব একটা বেগ পেতে হলোনা। তার প্রকাশক বন্ধু এগিয়ে এলেন, বই প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন। যথাসময়ে বইটি প্রকাশও হলো এবং বইটি বেশ সাড়া ফেলল। অনেকেই বললেন গবেষনার মত একটি জটিল বিষয়কে আকরাম সাহেব খুব সহজ ভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
আকরাম সাহেবের প্রকাশক বন্ধু খুবই খুশি। বইয়ের কাটতি বেশ ভালো। তাই প্রকাশক বন্ধু আকরাম সাহেবকে আরো একটি গবেষণামূলক বই লেখার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু আকরাম সাহেব এতে রাজি হলেননা। তিনি বললেন পত্রিকায় মাঝে-মধ্যে লিখতাম বলে আজকে এই বইটা প্রকাশ করতে পেরেছি। কিন্তু ধৈর্য ধরে বই লেখা এটা তার কাজ নয়। তিনি তার প্রকাশক বন্ধুকে ফিরিয়ে দিলেন। তার বন্ধু হতাশ হলেননা, বললেন-
- শোন আকরাম, তোর যে বইটা বেরিয়েছে তা খুবই ভাল লেগেছে পাঠকের কাছে
- আরে দুর, কি না কি লিখেছি, পাঠকরা না বুঝেই ভাল বলছে
- আরে তুই যা বলিস না কেন, বইটা খুবই সুন্দর হয়েছে, তুই আরেকটা বই লিখে ফেল
- আরে দোস্ত, লিখে ফেল বললেই লেখা যায় নাকি, আর আমি কোন প্রফেশনাল লেখক নই যে, বই লিখে ফেলবো
- তুই খুব সুন্দর ভাবে একটি বিষয়কে উপস্থাপন করতে পারিস, যে কোন বিষয় নিয়ে গবেষণা করলে সেটা তুই সহজ ভাবে তুলে ধরতে পারিস, এটা একটা বড় গুণ। তুই একটা কাজ কর তুই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটা লেখা লিখে ফেল
- মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে
- হ্যাঁ, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে, এদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধাই অযতœ-অবেহেলায় দিন-যাপন করছে। কেই ভিক্ষা করছে, কেউ রিকশা চালাচ্ছে, কেউ দিন মজুরী করছে আবার অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করে, স্বচ্ছল ভাবে জীবন-যাপন করছে।
আকরাম সাহেবেরও অনেক দিনের ইচ্ছা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করবেন। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গবেষণার বিষয়টি তার কাছে খুবই ভাল লাগলো। তিনি তার প্রকাশক বন্ধুকে আস্বস্থ্য করলেন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গবেষণা করবেন। চলে এলেন বাসায়। তার স্ত্রীর সাথে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলেন। তার স্ত্রীও বিষয়টা নিয়ে খুব উৎসাহিত হলেন। আকরাম সাহেব নেমে পড়লেন তার কাজে। কিন্তু এ কাজ তিনি কবে শেষ করতে পারবেন তা তিনি জানেননা। তবে তিনি কাজটা করবেন। তিনি একটা পরিকল্পনা তৈরী করলেন। তিনি প্রাথমিক ভাবে তার এলাকায় যে সকল মুক্তিযোদ্ধা আছেন তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানবেন, তাদের সঙ্গে কথা বলবেন।
আকরাম সাহেব তাদের এলাকায় যে সকল মুক্তিযোদ্ধা আছেন তাদের নামের তালিকা সংগ্রহ করলেন। এবং তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেন। সকল পেশরা মুক্তিযোদ্ধার সাথে আকরাম সাহেব কথা বলা শুরু করলেন এবং তাদের কথাগুলো রেকডিংও করলেন। রাতে বাসায় গিয়ে সেগুলো খাতায় লিখে রাখেন। তার কাজ ধীরে ধীরে খুব সুন্দর ভাবে এগিয়ে যেতে লাগলো। ইতিমধ্যে তিনি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে একশতের অধিক মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলছেন। তবে একজন বৃদ্ধ যিনি পথের ধারে বসে ভিক্ষা করেন। আকরাম তার সঙ্গে কথা বললেন একটু বেশী সময় নিয়ে
- আপনিতো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাইনা
- তাইতো মনে হয়, কিন্তু কেন ?
- না এমনিই জিজ্ঞেস করলাম
- এমনি এমনিতো জিজ্ঞেস করোনাই বাজান, নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে
- না মানে, আমি আপনার মতো মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গবেষণা করছি
- আমি মুক্তিযোদ্ধ, তা আপনারে কেডা কইলো
- আমি জানতে পেরেছি
- কেমনে জানলেন, আমার নামতো কোন বইতে লেখা নাই, কোন কাগজে নাই, কোথায় লেখা নাই, তাইলে আপনে জানলেন কেমনে
- যে কোন উপায়েই হউক, আমি জেনেছি
- জানছেন, খুবই ভাল করছেন, তা কি জানতে চান বলেন
- প্রথমেই জানতে চাই, আপনার সাথে আর কে কে যুদ্ধ করেছে, কোন কোন মুক্তিযোদ্ধা আপনার সঙ্গে ছিল
- আপনে একটা বোকার মতো কথা বলনে
- বুঝলামনা
- খুবই সহজ এর মানে, ঐ সময়টা যারা এদেশের বিরোধিতা করেনি, তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, এদেশের মানুষদের উপর অত্যাচার করেছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, শান্তি কমিটি বানাইছে তাগো ছাড়া বাংলাদেশের সবাই মুক্তিযোদ্ধা। যাদের বুকে বাংলাদেশের জন্য এতটুকু, বিন্দুমাত্র ভালবাসা ছিল বা আছে তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধার তালিকা না কইরা রাজাকারের তালিকা করেন। রাজাকার বাদ দিলে বাকি সকলেই মুক্তিযোদ্ধা।
কথাডা আকরাম সাহেবের খুবই মনে ধরলো। রাজাকার বাদ দিলে বাকি সবাই মুক্তিযোদ্ধা। কথাটা মহা মূল্যবান মনে হলো আকরাম সাহেবের কাছে। কথাটা নিয়ে গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন আকরাম সাহেব। এখন পর্যন্ত তিনি যে কোন মুক্তিযোদ্ধার সাথে আলাপ করেছেন তাদের মধ্যে কেউ এ ধরণের কথা বলেনি। এ কথার সূত্র ধরেই তার বাকি কাজ করবেন বলে আকরাম সিদ্ধান্ত নিলেন। ঐ দিনই অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইলেন আকরাম সাহেব, লিখলেনও অনেক। বিশেষ করে বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার কথাই তিনি বারবার চিন্তা করতে লাগলেন।
পরের দিন বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাকে তার নির্দিষ্ট জায়গায় খুঁজে পাওয়া গেলনা। অনেক খোঁজা-খুঁজি করেও বৃদ্ধকে পাওয়া গেলনা। আকরাম সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোথাও পেলেননা। তার মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। এই বৃদ্ধের কাছ অনেক তথ্য পাওয়া যাবে বলে মনে হলো আকরাম সাহেবের। কিন্তু লোকটি গেল কোথায় সেটাই বোঝা গেলনা। স্থানীয় কয়েকজন জিজ্ঞেস করলেন কিন্তু কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারলোনা। বিষন্ন মনে বড়ি ফিরে গেলেন আকরাম সাহেব। এবং বললেন, যে করেই হোক বৃদ্ধ লোকটিকে খুঁজে বের করতেই হবে।
বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। বৃদ্ধ লোকটি খুঁজে পাওয়া গেলনা। আকরাম সাহেবের মনটা বিষন্ন হয়ে উঠলো। তার ধারণা এ লোকটার কাছ থেকে অনেক তথ্যই জানা যাবে। অথচ লোকটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। তিনি এটা মানতেই পারছেননা। কিন্তু তিনি হাল ছাড়লেনা। যত দিন লাগে তিনি বৃদ্ধ লোকটিকে খুঁজে বের করবেনই বলে সিদ্ধান্ত নিলেন।
রাতে স্ত্রীর সঙ্গে যখন কথা বলছেন তখন তার স্ত্রী বললেন
- আচ্ছা তুমি মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বেরাচ্ছো, অথচ তোমার ঘরেই মুক্তিযোদ্ধা আছে, সেটা তুমি মনে হয় ভুলে গেছো
- আমি ভুলিনি, আমার মনে আছো। তুমি নিশ্চয়ই তোমার বাাবার কথা বলছো
- হ্যাঁ, বাবার কথা বলছি। তুমি জানো আমার বাবা কত বড় মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। উনার অনেক নাম হয়েছিলো। আর উনার সার্টিফিকেটও আছে।
- সেটা আমি জানি। কিন্তু তোমার বাবা একজন স্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা আর আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের
- স্বচ্ছল হউক আর অস্বচ্ছল হউক, আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা, এটাই সত্য।
- বিষয়টা সত্য হলেও, আমার গবেষনার বিষয় এটা নয়, আমার বিষয় অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা, তাই আমি সর্ব প্রথম অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করবো তারপর অন্যদের তালিকা করবো।
- তোমার যা ইচ্ছা তাই করো কিন্তু আমার বাবার নাম তোমার গবেষণায় থাকতেই হবে
- দেখ আমার গবেষণায় কি থাকবে না থাকবে সেটা আমাকেই ঠিক করতে দাও, তবে হ্যাঁ আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলবো। উনি হয়তো অনেক অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ঠিকানা দিতে পারবে।
আকরাম সাহেব এ পর্যন্ত বলে থেমে গেলেন। তার স্ত্রীও আর কোন কথা বলার সাহস পেলনা। পরদিন আকরাম সাহেব কলেজের উদ্দেশ্যে বের হলেন। মাঝ রাস্তায় যেতেই তার আর কলেজে যেতে ইচ্ছে করলোনা। ভাবলেন আজ সারাদিন একটা রিকশা নিয়ে ঐ বৃদ্ধ লোকটাকে খুঁজে বের করবেন। যে ভাবা সেই কাজ। একটা রিকশা ঠিক করে সেটাতে উঠে বসলেন। রিকশা চলতে লাগলো গন্তব্যহীন গন্তব্যে। রিকশাওয়ালা প্রশ্ন করে
- স্যার কই যাইবেন
- কোথায় যাবো তা বলতে পারছিনা, তুমি চালাতে থাকো
- কিন্তু স্যার, কোথায় যেতে হবে তা না বললে আমি কোন দিকে যাবো স্যার
- তোমার যেদিকে মন চায় সেদিকে যাও, তবে মনে রেখো আমি একজন বৃদ্ধ লোককে খুঁজছি
- বুড়া লোকরে খোঁজতাছেন। বুড়া লোক দিয়া কি হইবো স্যার
- বৃদ্ধ লোক দিয়ে কি হবে তা তুমি বুঝবেনা
- বুঝাইলেই বুঝুম স্যার, আপনে বলেন
- বৃদ্ধ লোকটি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল
- এমনতো কত মুক্তিযোদ্ধাই আছে, আপনে কয়জনরে খুঁজবেন
- আমি সকলকেই খুঁজবো, কিন্তু তার আগে আমার ঐ বৃদ্ধ লোকটাকে প্রয়োজন
- কি আছে ঐ বৃদ্ধ লোকটার কাছে
- হয়তোবা অনেক কিছুই আছে, আমি যেটা জানতে চাই হয়তো তার উত্তর ঐ বৃদ্ধ লোকটার কাছেই আছে
- কি জানতে স্যার
- আচ্ছা তুমি এত কথা বলছৈা কেন ?
- কথা বলছি এই কারণে যে, হয়তো আমি ঐ বৃদ্ধ লোকটার খোঁজ জানি
- কথাটা সত্য, ঠিক আছে তাহলে শোন, ঐ বৃদ্ধ লোকটা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক তথ্য জানে। উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার কাছ থেকে অনেক কিছুই জানার আছে
- তাইলে এক কাম করেন, আমাগো বস্তিতে একটা বৃদ্ধ লোক কয়দিন ধইরা আসতাছে, চলেন গিয়া দেখি উনি কিনা
আকরাম সাহেব আর দেরী করলেননা। তৎক্ষনাত রিক্শা নিয়ে চলে গেলেন রিকশাওয়ালার বস্তিতে। এবং ঠিক ঐ বৃদ্ধটাকে খুঁজে পেলেন। তিনি মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলেন। রিকশাওয়ালাকে নিয়ে চলে গেলেন বৃদ্ধ লোকটার কাছে। তিনি রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেন
- আমি আপনাকে বেশ কয়েকদিন যাবত খুঁজছি। আপনি কোথায় হারিয়ে গেলেন
- হারিয়ে যাইনি বাবা, ঐ জায়গাটায় আর বসতে দেয়না, তাই অন্য জায়গা খুঁজতাছি। জায়গা খুঁইজা না পাইয়া এখন হাইটা হাইটা ভিক্ষা করি। খুব কষ্ট হয় বাবা
- আপনাকে আর ভিক্ষা করতে হবেনা, আপনি আমার বাড়িতে থাকবেন।
- তা হয়না বাবা, আমি ভিক্ষুক মানুষ, পথে-ঘাটে ভিক্ষা কইরা বেড়াই
- তাতে আমার কিছু হবেনা। আমি আপনাকে আমার বাড়িতে রাখবো
- না বাবা তা হয়না, আর আমি আপনার বাড়িতে যামু কেন ?
- একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আপনার প্রতি আমার ভালবাসা, আর কিছুই না
- দরকার নাই বাবা, আমার এই ভালবাসার দরকার নাই
- কেন, দরকার নেই কেন
- কি দরকার বাবা, সারা জীবন কোন সম্মান পাইলাম না, তাই এহন আর সম্মানের দরকার নাই, আপনে জান বাবা
- আমি যাবোনা, আপনাকে না নিয়ে আমি যাবোনা
- বাদ দেন বাবা, আপনি যান
- আমি যাবো, তার আগে আমাকে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে হবে
- আমি কিছুই কইতে পারুমনা
- আমি এই আপনার সামনে বসলাম, আপনি যদি না বলেন তাহলে আমি এখানেই বসে থাকবো
দুজনের কথার মাঝে রিকশাওয়ালা কথা বলে উঠে
- বাবা, বলেননা, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন, আমিও শুনি
এবার বৃদ্ধ লোকটি একটু নড়ে-চড়ে বসে। আমতা আমতা করতে থাকে। তারপর বলা শুরু করে। কথা বলতে বলতে আকরাম সাহেবের শশুর ঈমান আলী সাহেবের কথাও চলে আসে হঠাৎ। একটা অদ্ভুত তথ্য বেরিয়ে আসে বৃদ্ধের মুখ থেকে। আকরাম হকচকিয়ে উঠেন কথাটি শুনে। তিনি বৃদ্ধকে পুনরায় কথাটা বলতে বলেন
- শোনেন বাবা, আইজ আপনারা যাকে দানবীর, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবক, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বলে জানেন, তিনি কখনোই মুক্তিযুদ্ধ করেননি। তিনি পরোক্ষ ভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন খবরা-খবর তিনি পৌঁছে দিতেন পাক বাহিনীর কাছে। তিনি এই কাজগুলান করতেন খুবই গোপন ভাবে। এরপর তিনি কেমনে যে মুক্তিযোদ্ধা হইয়া গেলেন তা আইজ পর্যন্ত বুঝতে পারলমনা।
- লোকটার নাম কি বললেন
- ঈমান আলী
নামটা শুনে আকরাম সাহেব কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেননা। চুপ করে বসে রইলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন বৃদ্ধ লোকটি হয়তো ভুল বলছে। তিনি নামটা আবার শুনতে চাইলেন। বৃদ্ধ লোকটি পুনরায় ঈমান আলীর নামটা উচ্চারণ করলেন। কিন্তু আকরাম সাহেব কি করবেন কিছুই বুঝতে পারলেননা। তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলেননা তার শশুর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন কথাটার সত্যতা যাচাই করবেন। তিনি মুখোমুখি হবেন তার শশুরের। চলে এলেন বাসায়। সারারাত ঘুমুতে পারলেননা। একটা নির্ঘুম রাত পার করলেন আকরাম সাহেব।
সকাল বেলা কারো সঙ্গে দেখা না করে আকরাম সাহেব চলে গেলেন তার শশুর বাড়ি। উদ্যেশ্য তার শশুরকে মুখোমুখি কথাগুলো জিজ্ঞেস করা। যা ভাবা তাই কাজ। সকাল বেলায়ই পেয়ে গেলেন তারা শশুর ঈমান আলী সাহেবকে। যিনি নিজেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করেন। আর সেটা করেও এসেছেন এতদিন যাবত। সবাই সেটা বিশ্বাসও করে এসেছেন। আকরাম সাহেব বসে আছেন ড্রইং রুমের সোফায়। সামনে চা পড়ে আছে
- কি ব্যাপার আকরাম, চা নিচ্ছনা যে
- চা খাবনা, একটু গম্ভীর ভাবেই বললেন আকরাম সাহেব
- তোমার কি কিছু হয়েছে, শরীর ঠিক আছেতো
- আমার শরীর ঠিক আছে, আপনাকে একটা প্রশ্ন আছে আমার
- কি প্রশ্ন বলো
- আপনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন পরোক্ষ ভাবে, মুক্তিযোদ্ধাদের খবরা-খবর গোপন ভাবে পৌঁছে দিতেন পাক বাহিনীর কাছে, কথাটা কতটুকু সত্য
- তুমি এসব কি বলছো
- আমি শুধু হ্যা বা না উত্তর চাই
ঈমান আলী সাহেব নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন। আকরাম সাহেবের কাছ থেকে এ ধরণের প্রশ্ন তিনি কখনো শুনবেন তা ভাবতেই পারছেন না। তিনি কি বলবেন সেটাও বুঝতে পারছেননা। বুকের মধ্যে বিরাট বড় একটা ধাক্কা অনুভব করলেন। এত বড় একটা সত্য এতদিন পর প্রকাশ হয়ে যাবে সেটা তিনি কখনোই ভাবতে পারেননি। মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলেন। আকরাম সাহেবের আর কিছু বুঝতে বাকি রইলোনা। উঠে আসলেন আকরাম সাহেব। ঈমান আলী সাহেব মাথা উঠিয়ে দেখেন আকরাম সাহেব বেরিয়ে গেছেন। তিনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আকরাম সাহেবের পথের দিকে।
বাড়ি গিয়ে আকরাম সাহেব তার স্ত্রীকে ডাকলেন। সকল ঘটনা খুলে বললেন তার স্ত্রীকে। তার স্ত্রী বললেন
- তুমি নিশ্চয় ভুল শুনেছো
- আমি কোন ভুল শুনিনি
- তোমার কোথায় হয়তো ভুল হচ্ছে
- আমার কোথায় ভুল হচ্ছেনা
- আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন তার কোন প্রমাণ আছে কি ? সবাই জানে আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সমাজসেবী
- সবাই ভুল যানে। এতদিন মানুষ যেটা জেনে এসেছে, সেটা ভুল জেনে এসেছে। মানুষ আজ যেটা জানবে, সেটাই সত্য জানবে। আর আমার সবচেয়ে বড় লজ্জার বিষয় হচ্ছে আমি এতদিন একজন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীর মেয়ের সাথে সংসার করেছি। আমার ভাবতে ঘৃণা হচ্ছে তুমি একজন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধির সন্তান।
- এতদিন পর তোমার এটা মনে হচ্ছে
- হ্যা, এতদিন পর আমার এটাই মনে হচ্ছে। আর আমিও একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, আমি এ সংসারে আর থাকবোনা।
- তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে
- হ্যা আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাবো। একজন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতাকারীর মেয়ের সাথে আমি সংসার করতে পারবোনা
- কোথায় যাবে তুমি
- কোথায় যাবো আমি জানিনা, তবে আমি আজ, এই মুহুর্তে এ সংসার ছেড়ে চলে যাবো।
আকরাম সাহেবের স্ত্রীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তিনি কি করবেন বুঝতে পারলেননা। আকরাম সাহেব ঘর থেকে বোিরয়ে গেলেন। তিনি কোথায় যাবেন জানেন না। একজন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীর মেয়ের সাথে সংসার করবেনা এটাই তার শেষ কথা।

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • গোবিন্দ বীন
    গোবিন্দ বীন ভাল লাগল,আমার কবিতা ও গল্প পড়ার আমন্ত্রন রইল।ভোট রেখে গেলাম।
    প্রত্যুত্তর . ১ মার্চ, ২০১৬
  • মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্
    মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্ আপনি ভাল লিখেন । আপনার এবারের গল্পে যথেষ্ট আবেগ আছে । তবে বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোন বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করা খুব কঠিন ।
    কারণ যে দেশে এখন অনেক নেতা-মহা নেতাদের বাড়ির ছেলে মেয়েকে বিয়ে দেবার সময় খুঁজে খুঁজে স্বাধীনতা বিরোধীদের ছেলে মেয়ে কে পছন্দ করা হয় ।
    আ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১৬ মার্চ, ২০১৬