বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ ডিসেম্বর ১৯৭৪
গল্প/কবিতা: ৩৯টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

ষষ্ঠদশী বালিকা

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৬

সুখ

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

অভিমান

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

অসহায়ত্ব (আগস্ট ২০১৪)

মোট ভোট মানুষের কাবাব

খোরশেদুল আলম
comment ৯  favorite ০  import_contacts ৫৪৮
বনের রাজা সিংহ। স্বভাব-প্রকৃতি রাজকীয়। ক্ষুধা লাগলে শিকার করে। বাকী সময় বিশ্রাম। আয়েসী ঘুম। হিংস্রতা দুষ্ট খিদে পৈশাচিক আর বেহায়া-পনা যোগ করলে ছোট্ট প্রাণী হায়ানা সিংহকে হার মানায়। সিংহ শুধু রাজা হয়েই সন্তুষ্ট। বিনা প্রয়োজনে এরা কেউ কোন প্রাণী হত্যা করে না। বনের কোন পশু পাখি মেরে তারা মজুদ করেও রাখেনা। পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে জীবন বাঁচাতে। স্বজাতি টিকিয়ে রাখতে এই মাংসাসী প্রাণীদের দ্বিতীয় কোন পথ খোলা না থাকাতে, যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই। বনে হিংস্র প্রাণীদের সাথে নিরীহ প্রাণীর বসবাস। কোটি কোটি বছর ধরে খাদ্য শৃঙ্খল টিকে আছে সৃষ্টি থেকে। পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে হিংস্রতা অমানবিকতা নিজের স্বার্থ সিদ্ধি লোভ বিশ্বাস-ঘাতকতা খুনি চোখের-ক্ষুধা ও বেহায়া-পনার হিসাবে, মান আর হুশ বিহীন মানুষ বিশ্ববেহায়া হায়ানাকেও হার মানায়। এই গ্রহের সর্বোচ্চ হিংস্র প্রাণী মানুষ।

ভোর চারটা। গাইডের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। প্রচন্ড সূর্যের তাপ, অগ্নি দাহে প্রাণীরা হাঁপাতে থাকে। গাছের নিচে বিশ্রামের নামে শুয়ে বসে দিন পার করে। এখন গেলে বাঘ সিংহের শিকার ধরা দেখতে পাবেন। কপাল ভাল থাকলে আরো অনেক কিছু। গাইডের কথায় আমার স্পিড বেড়ে যায়। যদিও আজকের সূচী গতকালের নির্ধারিত। চোখে পানি দিয়ে হালকা নাস্তা করে, দুপুরের খাদ্য সহ গাড়ীতে উঠি। কখন ফিরি তার ঠিক নেই। জানি না আদৌ ফিরব কি না। যদিও প্রশিক্ষিত ড্রাইভার। বিশেষ ভাবে তৈরি গাড়ী। অভিজ্ঞ গাইড। ক্যাটালগ দেখে ত্রিশজন গাইডের মধ্য থেকে তাকেই আমি নির্বাচন করেছি। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই এই পেশায় জড়িত। তার বাবার কাছ থেকেই শেখা। যেমন লম্বা তেমন স্বাস্থ্য। বাইশ বছরের অভিজ্ঞতা। বহুবার হিংস্র প্রাণীদের সাথে মোকাবেলা হয়েছে তার। অনেক প্রাণীদের জীবন চরিত্র মুখস্ত। কিছু প্রাণীর নামও দিয়েছে। এই ষ্টীল বডি নিগ্রু।

গাড়ী স্টার্ট দিয়েই গাইড বলে, স্যার কোন শব্দ করবেন না। অবশ্যই আমাকে ফলো করবেন। চোখে চোখ রাখবেন। আমি যা বলি তা মানবেন। হঠাৎ কোন প্রাণী সামনে এসেগেলে উল্লসিত হয়ে অথবা ভয়ে চিৎকার করবেন না। হাত তুলে দেখাবেন না। কোন কথা বললে আস্তে আস্তে বলবেন। আমি আছি আপনার কোন ভয় নেই। আমার গা গরম হয়ে গেল। যদিও আমি প্রচন্ড সাহসী। তার দিক থেকে চোখ ফিরাতেই বলে, স্যার আমরা এখন বনের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। গভীর বনে যেতে আরো আধ ঘন্টা সময় লাগবে। তবে এখান থেকেই সাবধান। নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বললাম ঠিক আছে।

সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করেছে। চার পাশের সব কিছুই দূর থেকে দেখা যায়। গভীর বনের মাঝে মাঝে বিস্তর ফাঁকা জায়গা। এই মরু অঞ্চলে খুব সামান্যই বৃষ্টি হয়। নভেম্বর মাসের আবহাওয়া চরম অগ্নি-দাহ। ফাঁকা জায়গাগুলোতে কোথাও কোথাও একটি ঘাস পর্যন্ত নেই। শুকনো মাটিতে মহিষের খুরার আঘাতে ধুলা উড়ছে। মোটা মোটা গাছের শুকনো গুঁড়ি। ছাউনি বিহীন ছাতার মতো মরা ডাল-পালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বনের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলছে আমাদের গাড়ী। গাড়ীর নিদৃষ্ট রাস্তা ছাড়া কোথাও আবার দু-পাশে বড় বড় ঘাস। আর একটু দূরে দূরে ঘনগুল্ম লতার ঝোপ। সূর্যের আলো কোনদিন মাটিতে পড়েছে কিনা সন্দেহ। ঝোপের আড়ালে কি আছে তা দেখা যায় না। দূরের পাহাড়টা বড় বড় গাছে আবৃত। কোটি কোটি বছর ধরে অনাবৃষ্টিতে বংশানুক্রমে, বংশ পরমপরায় কালের ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুনো গাছ গুলো। আর ঘাসেরা বৃষ্টির জল ছাড়া, রক্ত খেয়ে বেঁচে আছে মরুভূমিতে। লাল রক্ত খেয়ে ক্রমান্নয়ে হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। ঘাসের জাজিমের মধ্যে অনায়েসে যে কোন প্রাণী লুকিয়ে থাকতে পারে । শুধু জিরাফ ছাড়া। হাতিরাও এখানে ডুবে যায়। রাস্তার ডানে বামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নতুন পুরাতন কঙ্কাল। জোড়া জোড়া শিং। মাথার খুলি। কোথাও বা সদ্য খাওয়া আস্ত মহিষের তাজা কংকাল। এই বিশাল বনের প্রতিটি ইঞ্চিতে কত শত প্রাণীর রক্ত ঝড়েছে তার কোন হিসাব এই বংশ পরমপরায় দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলির কাছেও নেই।

প্রায় তিনঘন্টা চলার পর একটি মৃত নদীর পাশে থামল আমাদের গাড়ী। গাড়ীর ছাদ খুলে চার পাশ দেখে গাইড বলল, স্যার আমরা এখানেই অপেক্ষা করব। হালকা ঝোপের পাশে দাঁড়ানো গাড়ী। সামনে নদীর তলায় কিছু জল। পুরো নদীর যে কয়েকটি স্থানে পানি আছে। এই স্থানটি তাদের মধ্যে একটি। ঘোলা দুটি চোখ বের করে ভেসে আছে কুমিরের দল। দেখে মনে হয় শেওলা পড়া গাছের ছোট ছোট ডাল। কিন্তু পানির নিচে লুকিয়ে আছে বারো চৌদ্দফিট শরীর। পানি ঘিরে চার পাশ দখল করে আছে হিংস্র শিকারীরা। প্রতিটি পয়েন্ট দখল করে রেখেছে শিকারীর দল। শিয়াল কুকুর হায়ানা গুলো আশে পাশে ঘুরে, শুয়ে বসে সময় পার করে। অপেক্ষা করে শিকারের জন্য। এছাড়া আর কোন কাজ নেই। এ যেন জমিদারী প্রথা। জল খেতে এলে খাজনা দিতেই হবে। নিরীহ প্রাণীগুলোও তা জানে। তাই যত মূল্য দিয়েই হোক। জীবন বাঁচাতে হবে। একটি প্রাণ দিয়ে শত জীবন বাঁচায়।

শুকনো একটি ঝর্ণা আঁকাবাঁকা হয়ে সুতার মতো পহাড়ে ঝুলে আছে। তাই নদী এখন মৃত। রুয়ান্ডা এবং গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো বিসৃত। হাজার হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিশাল বনের ভিতর মাত্র কয়েকটি নদী ও খাল আছে। এই অগভীর নদীটি ঝর্ণা থেকে সৃষ্ট। বাকী নদী গুলো অরো অনেক দুরে দূরে। যা এই বিশাল বনের হাজার হাজার পশু পাখির তৃষ্ণা মিটায়। নিরিহ প্রাণীরা প্রাকৃতিক ভাবেই জানে কখন কোথায় জল পাওয়া যায়। তার সাথে আছে বয়স্ক প্রাণীদের অভিজ্ঞতা। আশপাশের এমনকি পাহাড় থেকেও প্রাণীরা নেমে আসে জলের খোঁজে। আর শিকারীরাও সেই সুযোগে প্রাসাদ তৈরি করে নিয়েছে এখানে।

হঠাৎ চোখ পড়ল একটি সিংহের দিকে। মাথা উঁচু করে শুয়ে আছে। একটু পর পর কেশর নাড়াচ্ছে। চারপাশে চোখ রেখে দেখছে ভয়ানক সুন্দর মাথাটি। হয়তো মাছি বিরক্ত করছে। পাশেই শুয়ে আছে তার পরিবার। সিংহের রাজকীয় স্বভাবে বাচ্চা সহ শুয়ে আছে মরার মতো। পিছন দিক থেকে নিঃশব্দে নয়টি হাতির একটি দল আসছিল। ফাঁকা স্থান তবু আগে দেখতে পাইনি। খুব কাছ দিয়েই চলে গেল জলের দিকে। সিংহ গুলো উঠে দাঁড়িয়ে এক নজর দেখে আবার শুয়ে পড়ল। যেন কিছু হয়নি। গাইডকে বললাম কি ব্যাপার সিংহ গুলো কিছুই করছে না কেন ? না স্যার, এগুলোকে ধরবে না। এদের মধ্যে সাধারণত যুদ্ধ হয় না। আর একটু অপেক্ষা করুন। হাতি গুলো নদী পারহয়ে ওপাড়ে চলে গেল।

সূর্যের তেজ বেড়ে যাচ্ছে। বনের ভিতরে গোমট ভাব, ভ্যাপসা গরম টের পাচ্ছি। স্যার দেখুন ঐযে হরিণের দল আসছে। তাকিয়ে থাকুন। সিংহ ও হরিণের দিক থেকে চোখ সরাবেন না। গাইড আমাদের চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছিল। দোনলা বন্দুকটি লোড করে রেখেছিল গাড়ীতে উঠার আগেই। গুলির বাক্সটাও ছিল হাতের কাছে। পনের বিশটি হরিণ। হরিণ শাবক গুলো দৌড়ে মা হরিণের সামনে যাচ্ছে আবার পিছনে পড়ছে। বাচ্চার লাফালাফিতে মা খুব খুশি। বাচ্চা গুলোকে আগলে রেখেছে। কিন্তু শিকারের ভয়ে চাদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে পথ চলছে। সিংহ গুলোর যেন সকালের নাস্তা ও সারাদিনের খাবারের সু-ব্যবস্থা হয়েগেছে। ডিসকভারী ও জিওগ্রাফী চ্যানেলে তিন চার ইঞ্চি ব্যাসের ক্যামেরার চোখে শুধু সামনেই যা দেখেছি। পিছনের দৃশ্যগুলো থেকে গেছে অদেখা। শব্দ গুলো ডাব্লিংকরা। এখানে তার চেয়ে শতগুণ ভিন্ন। বাস্তব। সরাসরি চারপাশ দেখছি। ডাক চিৎকার শুনছি।

আমরা আরো সামনে গেলাম। অনেকটা কাছে। খুব সহজেই একটি হরিণ ধরে ফেলল। দলের বাকী হরিণ গুলো নিমিশেই চোখের আড়াল হয়ে গেল। হরিণটি নিঃপ্রাণ না হওয়া পর্যন্ত ঘাড়ে কামড় দিয়ে ধরে রাখল। তার পর টেনে নিয়ে গেল তাদের উন্মুক্ত প্রাসাদে। যেখানে অপেক্ষা করছে পরিবারের অভুক্তরা। আমার ক্যামেরা চলছিল। দৃশ্যগুলো দেখছিলাম আর শুনছিলাম প্রাণ বাঁচানোর কি আর্তনাদ। আমার পানির পিপাসা লেগে গেল। গাইড বলল, এখানে কয়েক ঘন্টার জন্য শিকার ধরা বন্ধ। এই চিৎকার অনেক দূর থেকে শোনা গেছে। আর একটি ব্যাপার আছে যা প্রাকৃতিক। প্রাকৃতিক ভাবেই বন্য প্রাণী গুলো টের পাবে যে এখানে একটি হত্যা হয়েছে। স্থান ও বাতাসের ঘ্রাণ থেকেই তারা বুঝে যাবে। তাই কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত কোন প্রাণী এখানে আসবে না। চলুন অন্য স্থানে যাই। এবড়োখেবড়ো রাস্তা। হরিণের খুড়ার মতো। পিছনে ধুলা উড়িয়ে এগিয়ে চলে আমাদের গাড়ী।

সারাদিন ঘুরে ঘুরে সিংহ হায়ানা কুমিরের শিকার ধরতে দেখেছি। জিরাফ দুর্লব শিম্পাঞ্জীর দৌড়াদৌড়ি দেখেছি। বাঘ হাতি সহ অনেক প্রাণী দেখেছি। সন্ধা হয়ে গেল। ফিরতি পথে একটি হায়ানা গাড়ীর বামদিক থেকে এসে সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। গাড়ী থামল। তার পর আরো কয়েকটা, তার পর আরো। গাড়ীটিকে তারা কিছুই মনে করল না। এমনকি একবার আমাদের দিকে তাকিয়েও দেখল না। গাড়ীও ডান দিকে ঘুরল। চলে গেলাম মাইল খানেক। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। দূরে আলো ফেলতেই গাইড বলল, দেখুন একটা মহিষকে ঘিরে রেখেছে পঁচিশ ত্রিশটা হায়ানা। বাঘ সিংহের কিছু ধর্ম আছে। তারা ক্ষুধা না লাগলে প্রাণী হত্যা করে না। কিন্তু হায়ানাগুলোর পেটে দুষ্ট খিদে লেগেই থাকে। তাদের পেট কখনও ভরে না। তাদের ধর্ম একটাই যতপার জীবন্ত প্রাণী খাও। রক্ত গরম থাকতে থাকতে খাও। সে যেই হোক। গাইড বলল, আসুন আমার সাথে। ড্রাইভারকে বলল মহিষের দিকে লাইট ধরে রাখতে। আশপাশে বাঘ সিংহও থাকতে পারে। তাই আমরা খুব সাবধানে আরো একটু সামনে গেলাম। গাড়ীর লাইট ফেলে ক্যামেরা চালু করলাম।

হয়তো অনেকক্ষণ আগেথেকেই তাকে আটকে রেখেছিল। কামড়ে কামড়ে শরীর ব্যথায় ভরে গিয়েছিল। রক্ত ঝড়িয়ে শক্ত পোক্ত তাজা শরীরটা দুর্বল করে ফেলেছে। মহিষটি আর নড়তেই পারল না। পাঁচটি হায়ানা মহিষের পিঠের উপর উঠল। আরো কতগুলি মহিষটিকে ঘিরে ধরে কামড়ে ঝুলে আছে। পিছন থেকে খাওয়া শুরু করেদিল। তার পর পেটের নিচে খাবলাতে শুরু করল। নাড়ীভুঁড়ি বেরহয়ে ঝুলছে আর খাবলে খাবলে খাচ্ছে। ফিনকি দিয়ে ঝরছে রক্তের স্রোত। মহিষটি এখনো জীবিত। অস্ফুট চোখদুটো টেনে টেনে অসহায় ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে খুনি হায়ানাগুলোকে। চোখের ভাষায় কি বলছে তা সৃষ্টি কর্তাই জানেন। মহিষের অসহায়ত্বের ভাষা হায়ানাগুলোর বুঝার কথা নয়। মহিষের প্রাণ বাঁচানোর আর্ত চিৎকারে আমার বুকের ভিতরে সব শুকিয়ে দুমড়ে মুচড়ে দিতে লাগল। মনে হচ্ছে আমি গিয়ে মহিষটাকে বাঁচাই। গাইডের কড়া নির্দেশ ছিল আর সামনে যাবেন না।

দশমিনিটেই সাবার করে দিল। এমনকি মেরুদন্ডটা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ভাগাভাগি করে নিয়ে গেল। শুধু শিং দুটি পড়ে রইল। তখনো আরো হায়ানা আসতে ছিল। রক্ত গুলো চেটেপুটে খেয়ে পরিষ্কার। যেন এখানে কিছুই ঘটেনি। অথচ আমার বুকের ভিতর জ্বালা-পোড়া করছে। চিৎকার কানে লেগে আছে। হার্ড দুর্বল মানুষদের জন্য এগুলো নয়। আমার হার্ড শক্ত। আমিই এখন হাটতে পারছি না। শরীর অবশ। মুখে কথা নেই হাত পা কাঁপছে। বিশ ফিট দূরের গাড়ীতে যেতে পারছি না।

রুমে ফিরার পর হতাসা লাগছিল। শরীর ও মন দুর্বল। আজ সারাদিন অনেক পরিশ্রম হয়েছে। আগামী কাল বিকাল ছাড়া বের হতে পারব না। সময় ও স্থান নির্ধারণ করে গাইডকে বিদায় দিলাম।

ভিডিওটা কয়েকবার দেখেছি। কী হিংস্রতা ! আজ পর্যন্ত আমার দেখা পৃথিবীর সমস্ত হিংস্রতাগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে এই দৃশ্য। বাঘ সিংহ কুমির এবং হোয়াইট সার্ককে ছাপিয়ে গেছে। এই বেহায়া চির ক্ষুধার্ত ছোট্ট প্রাণী হায়ানা। বনের মধ্যে তৈরি করা তিন তলা সমান উঁচু বাড়িতে শুয়ে শুয়ে শুনছি পুশু পাখির ডাক। সিংহের গুহা আর হায়ানার দাঁতের মধ্যে শুয়ে আছি। মনে হচ্ছে ঘুমালে হায়ানাগুলো আমাকে তুলে নিয়ে যাবে। এখানে যারা আসে তারা দুই তিন দিনের জন্যই আসে। নিয়ে যায় কষ্টের অভিজ্ঞতা। যা সারা জীবনে ভুলার নয়। বাস্তব কত নির্মম। দিনের পর দিন চলছে এভাবেই। লোম হর্ষক খাদ্য শৃঙ্খল।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে নেটে চোখরাখতেই দেখি ইসরাইল ফিলিস্তিনি যুদ্ধের সংবাদ। ভেবেছিলাম চির অন্ধকার দেশের মানুষ শহর গ্রাম ফুল ফল জঙ্গল আর হিংস্র প্রাণীগুলোর জীবন চরিত্র। কিছু ছবি ভিডিও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করব। যা খাদ্য শৃঙ্খল হয়ে চলেছে কোটি কোটি বছর ধরে। আজো টিকে আছে পৃথিবীর বুকে। কিন্তুতা আর হল না। হাত পা পোড়া এক শিশুর লাস দেখে আমি আঁতকে উঠি। হাত পা পুড়ে খসে পড়েছে। বীভৎস শরীর। পাশের আত্মীয় অনাত্মীয়দের কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে গেছে। সারা দেশে চলছে মাতম। আমার নিঃশ্বাস কাজ করছে না। মাথা ঘুরছে। বিশ্বাস করতে পারছি না, এটা মানুষ না কি পোড়া দুম্বা ? শুনেছি মধ্যপ্রাচ্যে আস্ত দুম্বা পুড়ে কাবাব করে। মরুভূমিতে তাবু ফেলে রাত ভর ফুর্তি করে। এক পাশে এ্যরাবিয়ান নর্তকির নাচ গানের তালে ধুলা উড়ে। অন্য পাশে উড়ে দুম্বা পোড়ার কালো ধোঁয়া। তার পর বিশাল একটি পাত্রে রেখে দামী দামী মদে মাতাল হয়ে দুম্বা পোড়া মাংস চিবিয়ে রসনা পুজা করে। কিন্তু এটা কি ? কেন ?

গাছ বিহীন মানুষের জঙ্গলে সভ্যসমাজের নামে চলে গুম হত্যা। বিজ্ঞানের উন্নতির অপব্যবহারের ফলে গ্রাম শহর দেশ ধ্বংশ হচ্ছে। একজন মানুষ ধ্বংশ করছে হাজার হাজার মানুষ। একটি দেশ ধ্বংশ করছে কয়েকটি দেশ। নিজের শক্তি প্রকাশ করার জন্য। স্বজাতিকে এভাবে ধ্বংশ করে তার দ্বিতীয় কোন প্রমাণ প্রাণী জগতে নেই। প্রাকৃতিক ভাবে এত প্রাণ ধ্বংশ হয়ওয়ার কোন নজির নেই। কৃষি গবেষণায় দেখেছি গাছ ও ফলের প্রতিযোগীতা। জাতীয় জাদু ঘরে দেখেছি বাহারি পিঠা ও আচারের প্রতিযোগীতা। মানুষের কাবাব প্রতিযোগীতা ? অকল্পনীয় অভাবিতপূর্ব।

বনের রাজা সিংহ। স্বভাব-প্রকৃতি রাজকীয়। ক্ষুধা লাগলে শিকার করে। বাকী সময় বিশ্রাম। আয়েসী ঘুম। হিংস্রতা দুষ্ট খিদে পৈশাচিক আর বেহায়া-পনা যোগ করলে ছোট্ট প্রাণী হায়ানা সিংহকে হার মানায়। সিংহ শুধু রাজা হয়েই সন্তুষ্ট। বিনা প্রয়োজনে এরা কেউ কোন প্রাণী হত্যা করে না। বনের কোন পশু পাখি মেরে তারা মজুদ করেও রাখেনা। পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে জীবন বাঁচাতে। স্বজাতি টিকিয়ে রাখতে এই মাংসাসী প্রাণীদের দ্বিতীয় কোন পথ খোলা না থাকাতে, যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই। বনে হিংস্র প্রাণীদের সাথে নিরীহ প্রাণীর বসবাস। কোটি কোটি বছর ধরে খাদ্য শৃঙ্খল টিকে আছে সৃষ্টি থেকে। পেটের ক্ষুধা মিটিয়েও হিংস্রতা অমানবিকতা নিজের স্বার্থ সিদ্ধি লোভ বিশ্বাস-ঘাতকতা খুনি চোখের-ক্ষুধা ও বেহায়া-পনার হিসাবে মান আর হুশ বিহীন মানুষ বিশ্ববেহায়া হায়ানাকেও হার মানায়। এই গ্রহের সর্বোচ্চ হিংস্র প্রাণী মানুষ।

উত্তর গোলার্ধ থেকে দক্ষিণ গোলার্ধ। পূর্ব থেকে পশ্চিম। সব স্থানে চলছে হত্যা। মানুষ নিধন মানুষ নিধন খেলা। কোথাও মানুষ নিরাপদ নেই। গভীর সাগর থেকে তীরে ফেরার নিশ্চয়তা আছে। পৃথিবীর হিংস্রতম জঙ্গলের হিংস্র প্রাণীদের মুখ থেকে বেঁচে ফেরার নিশ্চয়তা আছে। কিন্তু নিজের ঘরে ? কি নিশ্চয়তা আছে বেঁচে থাকার ? বাড়িতে গাড়ীতে মসজিদে রাস্তায় স্কুলে বাজারে সব স্থানে মানুষের কাবাব। মানুষের কাবাব বানানোর প্রতিযোগিতা চলছে এই ছোট্ট সবুজ গ্রহে। কোথায় মানুষের মনুষত্ব। কোথায় বিশ্ব বিবেক। অসহায়ত্বে থুবড়ে পড়েছে পৃথিবী। হত্যা শৃঙ্খলের সর্বোচ্চ চুড়ায় মানুষ। ভুলে গেছি বিশ্ববেহায়া হায়ানাগুলোর হিংস্রতা। অসহায় হয়ে তাকিয়ে দেখি মানুষের কাবাব।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • এস, এম, ইমদাদুল  ইসলাম
    এস, এম, ইমদাদুল ইসলাম হ্যা, লেখার শুরুতেই অনুমান করেছিলাম, এই কাবাব ফিলিস্তিনের জনগনের কাবাবের দিকে নিয়ে চলেছেন লেখক । আসলেই তাই । হায়নাদের কাবাব খাওয়া দেখছে , অথচ বিশ্ব বিবেক চেয়ে চেয়ে দেখছে । যেন মানবাতার সাথে তামাসা করছে । অনেক ধন্যবাদ ।
    প্রত্যুত্তর . ১০ আগস্ট, ২০১৪
  • আখতারুজ্জামান সোহাগ
    আখতারুজ্জামান সোহাগ দারুণ লেখার হাত আপনার ভাই। পড়তেই থাকলাম। ভীষণ উত্তেজনা নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে। শেষে এসে বুঝতে পারলাম আপনার গল্পের বক্তব্য। এক কথায় বলতে গেলে, মনে হলো প্রথমের শিকারগুলো এবং নৃশংস খাদ্যচক্রগুলো ছিল আসলে রূপক উপস্থাপন, মানুষের হিংস্রতা এবং পশুত্ব নির্দেশক।
    লেখকের ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১২ আগস্ট, ২০১৪
  • সেলিনা ইসলাম
    সেলিনা ইসলাম যুগে যুগে মানুষ যত শিক্ষিত হয়েছে মনের পশুত্বও যেন ততই বেড়েছে...!গল্পে বাস্তবতা তুলে এনেছেন লেখক । ধন্যবাদ সুন্দর গল্প শেয়ার করার জন্য সতত শুভকামনা
    প্রত্যুত্তর . ১৬ আগস্ট, ২০১৪