বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ নভেম্বর ১৯৬৭
গল্প/কবিতা: ৩০টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৪৪

বিচারক স্কোরঃ ৩.৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৩ / ৩.০

অতি-নাটকীয়

ভালোবাসা / ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৫

লেজ

অসহায়ত্ব আগস্ট ২০১৪

দিনের আঁধার

রাত মে ২০১৪

শাড়ী (সেপ্টেম্বর ২০১২)

মোট ভোট ১৬৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৪৪ জামদানী সমাচার

মোঃ আক্তারুজ্জামান
comment ৬০  favorite ৯  import_contacts ৯৪৪
ছিঃ ছিঃ! সব কিছুর লগে শরমটুকুও ধুইয়া খাইয়া শেষ করছ?- গিন্নীর চিৎকারে আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কাঁচা ঘুমের সাথে ছেদ টানতে আমার শরীরের উপর দিয়ে যেন ছোটখাট একটা ঝড়ই বয়ে গেল। মাথাটা একটা চিন্ করে এমন ডাক দিয়ে বসল যেন ওটা একটা গাছ-লাটিম। প্রায় অবশ হাতের পাতায় চোখ কচলে নিয়ে আমি আমার সহধর্মিণীর মুখের দিকে তাকালাম।

-ঘরে বড় বড় পোলা মাইয়া আর তুমি লুচ্চা বেডা শুইয়া শুইয়া মধূটিলা জিয়ারত কর! ঘোলা চোখে এইসব গিলতে একবারও নিজের মরণের কথা মনে অয় না? গিন্নীর পুন:হুংকারে আমি বয়স দোষে আমার ঘোলা হয়ে যাওয়া চোখে তাজা সর্ষে ফুল দেখতে থাকলেও মনের অজান্তেই আমার চোখ দুটি টিভি পর্দার উপর গিয়ে আটকে যায়।

আমার ঘোলা চোখ পর্দায় যে অনাচার দেখল তা এক মুহুর্তও সহ্য করতে পারল না, আমি মাথা নীচু করে ফেললাম। সাগরের নীল জলে ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিনের ছুটে চলা দেখতে দেখতে কখন যে সুখী হয়ে উঠেছিলাম আর তারই জের ধরে চোখের পাতায় ঘুম নেমে এসেছিল আমি টেরই পাইনি। হায় রে দুর্ভাগ্য আমার! নয়ত অমন নির্মল বিনোদনের বুকের জমিনে জন্ম নিয়ন্ত্রণের এই বিজ্ঞাপন চিত্র ভেসে উঠবে কেন? আমার দুর্ভাগ্য না হলে পুরুষের ব্যবহারের জন্য তৈরী সামগ্রীর বিজ্ঞাপন চিত্রে অমন যৌবনবতী প্রমীলাই বা হাজির হবে কেন?

-বুঝছ? তুমি আইজ কাইল যা শুরু করছ না, আল্লাহর কসম দিয়া কইতে পারি আমি ছাড়া দুনিয়াত আর কোন বেডি মাইনষে এই সব সহ্য করব না!

- এ্যাই তুমি এই সব কি কইতাছ? আমি যেন শুধূ শ্বাস টানার জন্যই শব্দ করার চেষ্টা করি। লজ্জায়, অস্বস্তিতে দম বন্ধ হয়ে আমার যেন মরণ দশা!

-কি কইতাছি মানে? এইডা কী? এইডা কী কও! গিন্নী গলা চড় সপ্তমে তুলে চিৎকার করতে থাকে।

-ক্যান্ এত্ত বড় একটা ডিম কি তোমার চোখে পড়ে না? আমি গিন্নীর হাতের তালুতে রাখা ডিমের দিকে তাকিয়ে চরম বিরক্ত হই।

- আগে ঢং দ্যাহাইতা আর এহন আমার লগে নতুন কইরা রং করা শুরু করছ, না? তোমার রং ঢং করার বয়স থাকলেও আমার নাই। তোমার সংসারে আয়া বুয়ার মত খাটতে খাটতে আমার ডিব্বার রং কোন সময় যে ফুরাইছে টেরও পাই নাই। আমি কি ডিম চিনি না? আমাগো বাড়ীর মুরগিগুলি প্রত্যেকদিন যেই ডিম দিত, তোমাগো গাছে সারা বছরে ততগুলি জাম্বুরাও ধরত না! আর হেই আমারে তুমি ডিম চিনাও? আমি কি এতই যা তা অইয়া গেছি যে তুমি আমারে একখান আন্ডা দেহাইয়া আমার লগে ফাইজামি কর! সে চরম ক্রোধে ফেঁটে পড়ে।

আমি আমার বিবশ অবসন্ন দেহটাকে কোন মতে খাট থেকে টেনে নামিয়ে আলনার একপাশে ঝুলিয়ে রাখা শার্টের পকেট হাতড়াতে লাগলাম। খুব তাড়াতাড়ি কাঙ্খিত কাগজের টুকরাটা পেয়েও গেলাম। আমারও সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে কাগজটা হাতে নিয়েই মনে মনে একটা ভয়ানক কিছু ঘটিয়ে ফেলার শপথ নিয়ে ফেললাম। চশমা ছাড়াই বাজারের ফর্দটা চোখের সামনে মেলে ধরলাম- গুড়া মাছ, একটা বড় ইলিশ, ঝিঙ্গা, বেগুন, আলু, পিয়াজ................ এক আটি মেহেদী পাতা, একটা ভিম!

চিন্ করে ডাক দিয়ে থাকা কানে অকস্মাৎ যেন একটা এটম ফাটার শব্দ হল। তারপরেই যেন আমার দুকান নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। ছিঃ ছিঃ বাজার করার সময় আমি তবে কি দেখেছিলাম? ডিমটা কিনার সময় দোকানদারও আমার দিকে কেমন চোখে তাকিয়েছিল।

বাজারের ফর্দে একটা ডিম দেখে আমিও যে খুব অবাক হইনি তা নয়। কিন্তু সাত পাঁচ ভেবে একটা ডিমই কিনেছিলাম। বেশি কিনার মত যথেষ্ট টাকাও আমার পকেটে ছিল। এমনিতেই এই মহিলা আজকাল আমার সব কাজেই ত্র“টি খুঁজে বেড়ায়। পান থেকে চুন খসে পড়ার মত সামান্য ভূল ভ্রান্তি খুঁজে পেলেই আমার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়ে।

আমি অনেক ভেবে চিন্তেই একটা ডিম কিনেছিলাম। দু’তিন হালি ডিম কিনে আনলে দেখা যেত সে আমার দিকে তেড়ে এসে চিৎকার করছে- ফালু বাবা কি আমারে ডিমের আড়ত খুলতে কইছে? আরে আন্ডা কপাইলা শুধু একটা ডিম পড়ার লাইগা আমি কত কষ্টই না করছি। হায়, হায়, আল্লাগো কত কষ্ট কইরা ফালু বাবারে রাজী করাইছিলাম এই ব্যাডার কপাল থেইকা আন্ডার আছড় ছাড়াইতে আর এই ব্যাডায় এইডা কী করল গো!

আমি একেবারে ফেঁটে যাওয়া বেলুনের মত চুপসে গেলাম। একটা ভিমের জায়গায় একটা ডিম কিনা কত বড় ভূল ভাবতেই আমার মাথাটা ঘুরতে লাগল। সে মুখটা চরম বিকৃত করে আমাকে শাসিয়ে বলল- চোরের মত চেহারা কইরা খাড়াইয়া থাকলেই তুমি মনে কর সব ঝামেলা শেষ? একটুও না। এই এক আন্ডা ছাড়া আমিও যদি আইজকার ইফতারিতে তোমারে অন্য কিছু দেই তবে আমি খাঁ’য় গো বাড়ির মাইয়াই না!

খাঁ’য় গো বাড়ী যাইতে গো মা চিপাচিপির পথ- বাল্য কৈশোরে আমি কোন বাউলের গলায় এরকম গান শুনেছিলাম গানের কথার মর্মার্থ তখন বুঝিনি কিন্তু গিন্নী নিজেকে খা’য় গো বাড়ীর মাইয়া বইলা যখন হুমকি দেয় তখন আর আমার আফসোসের সীমা পরিসীমা থাকে না। আগে যদি ঐ গানের মর্মার্থ বুঝতে পারতাম তবে আমি কস্মিন কালেও বিয়ে নামক অমন জটিল পথে পা বাড়াতাম না। চিরকুমার থেকে মরাও খাঁ’য়গো বাড়ীর মেয়ে মানুষের কাছে নাজেহাল হওয়ার চেয়ে হাজার গুন ভাল!

মাত্র একটা ডিম দিয়ে ইফতার করার বিষয়টা নিয়ে আমি কোন ভয় পেলাম না। বয়সের দোহাই দিয়ে ডাক্তাররা নিয়মিত ডিম না খাওয়ার পরামর্শ দিলেও আমি ডিম ভালই হজম করতে পারি। কিন্তু আমার কিনে আনা ডিমটাকে আন্ডা আন্ডা বলে এত তিরস্কার করা হয়েছে যে, ওটার দিকে তাকাতেও আমার ঘৃণা লাগছিল।

যার কেউ নেই তার আল্লাই আছে- এ সত্য চিরন্তণ। ইফাতারির কিছুক্ষণ আগে আমি এক প্রতিবেশীর ইফতার পার্টির তাত্ক্ষনিক দাওয়াত কবুল করে বাসা থেকে সটকে পড়লাম। যেতে যেতে আমি খা’য়গো বাড়ীর মেয়েকে মনে মনে কঠিন কঠিন গালাগাল করতে লাগলাম- হালার বইন- শ্বশুরের বেডি, নে এইবার বইসা বইসা তোর চৌদ্দ গুষ্টিগো আন্ডা সিদ্ধ কর!

রাতে শুতে গিয়ে নিজে বেশ হালকা বোধ করলাম। যাঃ বাবা অনেক দিন পরে বেশ আরাম করে ঘুমানো যাবে। মনে মনে ভাবলাম দিনের বেলায় যে কান্ড ঘটে গেছে তাতে অন্তত মাস তিনেক এক খাটে শোয়া তো দুরের কথা আমার ঘরের দিকে সে উঁকিও দিবে না। স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে সে বরাবরই চটকে যাওয়া ভাঙ্গীর মত প্রায় সারাটা খাট দখল করে পড়ে থাকে- আমার পিঠের তলায় থাকে শুধু একখান তক্তা!

আমাকে প্রচন্ড অবাক করে দিয়ে সে রাতে আমার পাশে বিড়ালের মত হাত পা গুঁটিয়ে শুয়ে পড়ল। তার হাব ভাব দেখে বোঝার কোন উপায়ই রইল না যে আমার সাথে তার রাগারাগি বা মনোমালিন্য জাতীয় কোন কিছুর বিন্দু মাত্র ঘটেছে। কিছুক্ষণ পরই ধীর স্থির গলায় সে আমাকে বলল- ঈদ ত পরায় আইয়া পরছে পোলাপানের কিনা কাটার কি করছে?

আমি না শোনার ভান করে চোখ বন্ধ করে বিছানায় পড়ে রইলাম। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার শব্দ করে উঠল- আমার কতা কি মাইনষের কান যায় না!

আমারে কিছু কওনি?- আমি গলায় ঘুম জড়ানোর কৃত্রিম রেশ তৈরি করার চেষ্টা করি।

-তয় কি শ্রীকান্তের বাপেরে কইতাছিনি! সে বেশ ঠান্ডা গলায়ই আমার কথার একখান তেড়চা জবাব দিল।

আমি বিপদ টের পেলাম। এই মহিলা যখনই খুব ঠান্ডা গলায় কথা বলে তারপরেই কোন না কোন কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। সাধারণত ঝড় উঠার আগে আবহাওয়া যত বেশী গুমোট হয় ঝড় বাদলটা তত জোরে আসে, ঝড় বাদল শেষে খুব ঠান্ডা নেমে আসে। আর এই খাঁ’য়গো বাড়ীর দজ্জাল মহিলার বেলায় সচরাচর তার উল্টোটাই হয়। সে যত বেশি ঠান্ডা দিয়ে শুরু করে তত বেশি গরম দিয়ে শেষ করে- তাও আবার খুব ঠান্ডা মাথায়!

ও গো কার কি লাগবো?- আমি অসহায়ভাবে জানতে চাইলাম।

ওরা তোমার কিনা জামা কাপড় নিব না। ভাইবইনে দশ হাজার টাকা চাইছে। ও গো কাপড় ওরাই কিনব- খাঁ’য়গো বাড়ীর মাইয়ার কথা শুনে আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল।

পোলাপান দুইডা আমার না ভাওয়ালের রাজার!- আমার মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে গেল।

এ্যাঁই তুমি খুব সাবধানে মুখ সামলাইয়া কতা কইবা! কী কইবার চাও পরিষ্কার কইরা খুইলা কও- খাঁ’য় গো বাড়ীর মাইয়ার গলা তেতে উঠে।

না মানে, আমার পোলাপান অইলেতো ওগো এত টাকা দাবী করার কতা না। ওগো বয়সে আমার বাবা আমারে পাঁচ টাকার লুঙ্গি, বড় জোর দশ টাকার একটা শার্ট আর চাইর আনা দিয়া একটা কাগজের টুপি কিনা দিত। তাতে কি আমার ঈদ অইত না? নাকি ওগো চাইতে আমাগো ঈদের আনন্দ কম অইত?- অর্থহীন জেনেও আমি তার কাছে কৈফিয়ত দিলাম।

তোমার পোলাপান তুমি বুঝ! আমি তো আর হাতে লইয়া আইসা তোমার কাছে হাঙ্গা বসি নাই- খাঁ’য়গো বাড়ির মাইয়া আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে ছাড়ল যে ছেলে মেয়ে দুটি আমারই জন্ম দেয়া, ভাওয়ালের রাজা বা অন্য কারোরই না।

আমি বুঝতে পারলাম আমার আর কোন উপায় নেই। যত কষ্টই হোক না কেন ওরা পুরো দশ হাজারই আদায় করে ছাড়বে। এই অভাব অনটনের সংসারে আমি কত কষ্টে ওদের ভরণপোষণ করি। ওদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলি। ওসব ভাববার ওদের যেন কোন ফুরসত, প্রয়োজন কিছুই নেই। ওদের বয়সেই বাবা মায়ের দুঃখ কষ্টের না বলা কথাটা অনুভব করে আমরা মনে মনে কত কষ্ট পেতাম। ভেবে পাই না সময়ের সাথে সাথে মানুষের বুকের খাঁচার ভিতরে থাকা হৃদপিন্ডটাও কি দিনে দিনে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে কিনা!

-আমার? বেশ কিছুক্ষণ পর নীরবতা খান্ খান্ করে দিয়ে গিন্নীর মুখ থেকে খসে পড়া শব্দটা সারা ঘরময় যেন দাপিয়ে বেড়ায়। কথাটা ধাতব আচরণে আমার কানে বাঁজে।

বুঝলাম না!- আমি ঠিক মত কিছু ঠাহর করতে না পেরে বলে ফেলি।

- আকাম কুকামডাতো খুব ভালই বুঝ। খালি আমারে বুঝুনের সময় অয় না! আমারে বাড়ীর আয়া বুয়া মনে করতে খুব যুইত লাগে, না? আমার কোন দু:খ নাই, কষ্ট নাই, আমার পিছে কারও কোন খরচ নাই, আমার সব কিছু ফিরি! বান্দীগীরি অনেক করছি কোন লাভ নাইক্কা! বান্দীগীরি করতে করতে তোমার দানাই পানাই হুনতে হুনতে আমার জীবনডাই শ্যাষ অইছে। আর না। আমারেও এইবার দশ হাজার ট্যাকা দিবা- একটা জামদানী শাড়ী কিনমু। প্রত্যেক বছর ত একটা গামছা দিয়াই শ্যাষ কর। এইবার আর তা অইব না। ট্যাকা দিবা না, ঈদের দিন চুলায় আগুনও জ্বলব না।

খাঁ’য়গো বাড়ীর মাইয়ার ডায়লগ শুনে আমার বুকের মাঝে যা ঘটে গেল তাতে আমি যেন হার্ট এ্যাটাকের প্রাক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফেললাম। মনে হল হৃদপিন্ডটা কেউ যেন দুহাতে চেপে ধরে হেচকা টানে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলতে চাইছে।

আমার আর একটা কথা বলারও ইচ্ছে হল না। বলেও তাতে কোন লাভ নেই। কাজেই আমি নিস্তেজ শরীর নিয়ে মনে মনে ঘুম প্রার্থনা করতে লাগলাম। তাতে লাভ হল না। সেহেরীর সময় পর্যন্ত প্রায় নির্ঘুম থেকে একসময় বিছানা ছেড়ে গিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও খাবার টেবিলে বসলাম। এক দলা ভাত মুখে দিয়েই আমার বমি আসার উপক্রম হল। খাঁয়গো বাড়ীর মাইয়ার মুখের দিকে প্রচন্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও একবার তাকিয়ে বললাম- ভাতের চাইল কি গোলাপজল দিয়া ধুইছনি?

হেইডা করলেই ভালইত! তয় চাইল পানি দিয়া ধুইলেও থালা বাসন বাসনার সাবান দিয়া ধুইছি!- মুখ চোখ এমন বিকৃত করে সে আমার কথার উত্তর দিল যে আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হল এই মহিলা আমার অর্ধাঙ্গিনী।

বহু কষ্টে সৃষ্টে দশ হাজার টাকা যোগাড় করতেই আমার কয়েক দিন কেটে গেল। টাকাটা নিয়ে নিঃশব্দে খাঁ’য়গো বাড়ীর মাইয়ার চোখের সামনে রেখে দিলাম। সে অনভ্যস্ত হাতে অনেকক্ষণ লাগিয়ে তা গুনে দেখেই চোখ কপালে তুলল। কোন খিস্তি খেউড় করার আগেই আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে তার জামদানী কেনার টাকাটা দু’একদিনের মধ্যেই আমি তাকে দিব।

ঈদের আর আছেই কয়দিন! শীত গেলে গা কম্বল পাছায়...........তার কথা গরম সীসা হয়ে আমার কানে প্রবেশ করে।

আমি তার কথার কোন জবাব দিলাম না। দেখতে দেখতে রোজাগুলিও টপাটপ শেষ হয়ে যেতে লাগল। আমি জামদানী শাড়ী কেনার টাকা আর যোগাড় করতে পারলাম না। বন্ধুবান্ধব যার কাছেই গিয়ে হাত পাতি সবাই ঈদের দোহাই দিয়ে সটকে পড়ে।

একেবারে শেষ মুহুর্তে আমার মনে পড়ল একটা সমিতিতে আমি প্রতি মাসে কিছু কিছু টাকা সঞ্চয় করতে শুরু করেছিলাম। ইচ্ছে ছিল সামনের শীতে ঐ টাকা দিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে কক্সবাজার সাগর দেখতে যাব, রাঙামাটি পাহাড় দেখব। তাতে ওদের হৃদয় সুবিস্তৃত, সুউন্নত হবে।

সাগর পাহাড় দেখার শ্রাদ্ধ করে আমি পড়ি মরি করে সমিতিটার অফিসের দিকে ছুটলাম। সাত হাজার টাকার সামান্য উপরে জমা হয়েছে। কিন্তু ঈদের আগে ওরাও টাকাটা দিতে চাইল না। আমি রীতিমত লোকজন ধরে একটা যুদ্ধ করার মধ্য দিয়েই টাকাটা তুলে আনলাম।

মস্ত একটা অনাসৃষ্টির কথা ভেবে আমি এই সাত হাজার টাকা খাঁ’য়গো বাড়ীর মেয়ের হাতে দিতে পারলাম না। আমাকে একটা চালাকীর আশ্রয় নিতেই হল। হাসি হাসি মুখ করে তাকে বললাম- শেষ রোজার দিন কিছু ট্যাকা পামু! ট্যাকাটা হাতে পাইলেই আমি তোমারে দিয়া দিমু, বুঝছ?

হ বুঝছি, বুঝতাম না ক্যা! শেষ রোজার দিন যে কি আত্তি বেচা ট্যাকা আইব তা আমার জানা আছে। - চরম অবজ্ঞা মাখিয়ে সে আমাকে তিরস্কার করল।

যাহোক শেষ রোজার দিন আমি আমার চালাকীর অংশ বিশেষ হিসেবেই বাকী কাজটুকু করলাম, বললাম- ট্যাকাটা কোন সময় পাই তার ঠিক নাই। আমিই না অয় শাড়ীডা কিনা লইয়া আমুনে নাকি কও!

আরে হ! এই সব নাটোক অহনে প্রত্যেকদিনই টিভিত দ্যাহায়! আমি দ্যাইহা দ্যাইহা আসতে আসতে মরি- গিন্নী বিদ্রুপের হাসিতে ফেঁটে পড়ে।

আরে না তুমি খাঁ’য়গো বাড়ীর মাইয়া না! তেনামেনা আইনা জামদানী কইলে কি আর খাঁ’য়গো বাড়ীর মাইয়ারা জিনিস চিনব না?- আমি গলার স্বর বেশ নরম করে বিপদ মুক্ত থাকার চেষ্টা করি।

তা ঠিকই কইছ। হেই চালাকী কইরা আবার পারবা না, খাঁ’য়গো বাড়ীর মাইয়ারা ঠিকই জিনিস চিনে- বেশ বাহাদুরী মিশিয়ে সে আমার কথায় সায় দিল।

শেষ রোজার দিন সারাদিন আমি মার্কেটে টো টো করে ঘুরে ঘুরে ম্যালা দোকানীদের তিত্ বিরক্ত করে চার হাজার টাকায় একখানা শাড়ী কিনলাম। তবে তা জামদানী না। সীমান্তের ওপার থেকে আসা নেটের শাড়ী। বেশী টাকা দিয়ে কাপড়চোপড় কিনার মত বিলাসিতা করা আমার একেবারে না পছন্দ। হাজার হাজার টাকায় একটা কাপড় না কিনে কয়েকটা কাপড় কিনে অনেকে পরলে তাতে আনন্দটাও অনেক বেশি বলে মনে করি। কাজেই বাকী টাকায় পাড়া প্রতিবেশী নিকটাত্মীয় গরীবগরবাদের জন্য কয়েকটা লুঙ্গি আর তাঁতের শাড়ী কিনে মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে বাসায় ফিরলাম।

বাসায় ফিরার পর আমার হাতে বেশ কয়েকটা ছোট ছোট ব্যাগ দেখে খাঁ’য়গো বাড়ীর মাইয়া বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাঁকিয়ে রইল। আমি তার জন্যে কিনে আনা লাল রঙের শাড়ীটা খাটে ছড়িয়ে দিয়ে বললাম- এই দ্যাহ কত সুন্দর শাড়ী!

সে শাড়ীটা দেখতে লাগল। আমি মনে মনে লা ইলাহা.......পড়তে থাকলাম।

জাপানী জামদানী! মার্কেটে এইবারই নতুন আইছে মাইনষে এক্কেবারে লাইন ধইরা কিনতাছে- সে শাড়ীটায় হাত দিতেই আমি একেবারে রেডিও টিভিতে খবর পড়ার মতই গড়গড় করে বলতে শুরু করলাম।

সে অনেকক্ষণ ধরে শাড়ীটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সুতা টিপে, কচলিয়ে দেখল তারপর হাসি মুখেই শাড়ীটা ভাজ করে ব্যাগটা এক পাশে সরিয়ে রাখল। আমি তার জামদানী জ্ঞান দেখে মনে মনে আল্লাহর শুকুর গুজার করলাম!

এগুলি বাসে কোন বেক্কলে জানি ফালাইয়া গেছে- অন্য ব্যাগগুলির দিকে সে দৃষ্টি দেয়া মাত্রই আমি আবার বলতে শুরু করলাম।

- এক কাম করলে অয় না! গরীব মিসকিনগো এগুলি বিলাইয়া দিলে যেই ব্যাডার কাপড় চোপড় তারও ছোয়াব অইত, লগে আমাগোও। এই ধরো মঞ্জুর দাদায় তো সামনের বছর আর একটা ঈদ নাও পাইতে পারে তারে একটা লুঙ্গি দিয়া দেও। জমিলা খালারে একটা কাপড়- আমি আমার পরিকল্পনা মত সামনে এগুতে থাকি।

সে কোন কথা না বলে সব কিছু গুছিয়ে রাখল। আমি খুব খুশি হলাম এত সহজে পার পাব ভাবতেই পারিনি। যাহোক রাতে সে একটা ছোট কাগজের প্যাকেট আমার সামনে রেখে বলল- পোলা মাইয়া তোমার লাইগা কিনা আনছে।

- কী আনছে? খুশীতে আমার মন ভরে গেল। ওরা সবাই খুব স্বার্থপর ভেবে অভিমানে আমি নিজের জন্য কিছুই কিনিনি। আমার ছেলে মেয়ে আমার জন্য কিছু কিনেছে শুনেই ছোট বেলা বাবার কাগজের টুপি কিনে দেয়া ঈদের মত একটা ঈদের আমেজে আমার মন ভরে গেল।

- দু’ইটা বেলাউজ!

বেলাউজ দিয়া আমি কী করমু?- আমি বেশ অবাক হই।

জাপানীরাও অহনে জামদানী শাড়ী পিন্দে! ওই দ্যাশের মাইনষে পিন্দা যেগুলি বেশি অয় হেগুলিই আমগো দ্যাশে বেচে। জাপানীরা যদি জামদানী শাড়ী পিনতে পারে তবে বাংলাদেশের ব্যাডারা বেলাউজ পিনব এতে আশ্চর্য্য অওনের কি আছে!- খাঁ’য়গো বাড়ীর মাইয়ার কথার মাথামুন্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারি না। সে প্যাকেট থেকে ছেলেমেয়ের কিনে আনা আমার পছন্দের গ্রামীন চেকের দুটি ফতুয়া বের করে দেয়!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন