বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২২ জানুয়ারী ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ১৫টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৪৭

বিচারক স্কোরঃ ৩.৬৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮৩ / ৩.০

"হে অধরা"

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

কৈশোরের একখন্ড স্মৃতি

কৈশোর মার্চ ২০১৪

চাইনা আজব গণতন্ত্র!

ক্ষোভ জানুয়ারী ২০১৪

শীত (জানুয়ারী ২০১২)

মোট ভোট ৭০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৪৭ পিছুটান

আশা
comment ৬৫  favorite ৩  import_contacts ৬৫৫
অপেক্ষার প্রহর গুনতে গেলে এক একটি মিনিট সবার কাছেই ঘণ্টার চেয়ে বেশি মনে হয়। অরুনের বেলায়ও তাই। দিন যেন তার কাটছেই না। গত তিন দিন ধরে এই সমস্যা। বন্ধু সফি গ্রাম থেকে ফোন করে আধার রাতের ডেটিং নামক কী একটা প্রোগ্রামের কথা বলেছে, সেটা নিয়েই এত অস্থিরতা। কী এমন গুরুত্বপূর্ণ ডেটিং, তা সে ভেবে পায় না। সফিকে জিজ্ঞেস করেছিল। কিন্তু সে বলতে চায়নি। গ্রামে এলেই দেখতে পাবি- এমনটি বলেই ফোন রেখে দিয়েছিল।

এদিকে অরুনের ভাবনার অন্তরালে হরেক রকম প্রোগ্রামের আনাগোনা চলে। ব্যাডমিন্টন টুর্ণামেন্টই হবে। তা না হলে অন্যের খোয়ার থেকে হাঁস-মুরগী এনে গভীর রাতে পোলাউ-মাংস খাওয়ার আয়োজন। এরই মাঝে গত শীতের কথা মনে পড়তে তার জিভে জল এসে যায়। কী মজাটাই না হয়! মাঝ রাতে কাদির গাজীর গাছ থেকে হাড়ি নামিয়ে সবে মিলে মিষ্টি-মধুর খেজুরের রস পান করে। তারপর করিম মিজির ঘরের পেছন হতে নারিকেল পেড়ে চিনি-মুড়ি মিলিয়ে বিলের মধ্যখানে সবে খুব মজা করে খায়। ঠিক ঐ সময় আবার চুরি করে গরু নিয়ে পালাবার সময় তাদের নজরে পড়ে এক ভিনদেশী চোর। কৌশলে সবে মিলে গরুসহ চোরকে ধরে ফেলে। তাও যার-তার গরু নয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় চেয়ারম্যান সাহেবের গরু। পরের দিন চেয়ারম্যান সাহেব এমন কৃতিত্বের জন্যে সবাইকে দুই হাজার টাকা পুরস্কারও দেয়। সেই টাকা দিয়ে তারা চাঁদপুরের নামকরা রেষ্টুরেন্ট ধানসিঁড়িতে একদিন মধ্যাহ্ন ভোজ সারে। আরো কত রকমের মজা যে হয়, বলে শেষ করা যাবে না।

আহা, এবারও যদি এমন একটা কিছু হতো! ভাবতে ভাবতে অজানা কোন খুশিতে অরুনের ঠোঁট মেলে মৃদু হাসির ফুল ফুটল। মনের অজান্তেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল- চোর হলেই চোর ধরা যায়, কথাটা আসলেই বাস্তব। সাথে সাথে বিকট শব্দে হেসে উঠল। সেই হাসি আবার একদল হাসির আড়ালে লুকিয়ে গেলে, মুহূর্তেই সম্বিত ফিরে পেল সে। অবাক হয়ে তাকাল চারিদিকে। সে যে শ্রেনীকক্ষে বসে আছে, এই মাত্র তা চোখে পড়ল। কয়েকটা টেবিল ডিঙ্গিয়ে নজর একটু সামনে যেতেই তার মাথায় কঠিন বজ্রপাত আঘাত হানলো। মাষ্টার সাহেব শ্রেনীকক্ষে বসা। কান ধরে নাকে বসে থাকা জিনিসটার উপর দিয়ে চোখ দুটি বের করে তিনি তাকিয়ে আছেন অরুনের দিকেই। অরুন ভয়ে ঢেকুর গিলতে লাগল। মাষ্টার মশাই গলা খাকারি দিয়ে বললেন- এই বেত্তমিজ, বলতো এতক্ষণ কী পড়াচ্ছিলাম?

অরুন ভয়ে ভয়ে বলল- স্যার এখন কী আপনার ক্লাশ?

বাহ্, ভেরি গুড। শুনলে তোমরা ? সারা রাত লাইলি-মজনুর গান শুনে সকালে শ্রোতা জানতে চায় লাইলি বেডা না বেডি!

কথাটা শেষ হতেই এক ঝাক হাসির শব্দ শোনা গেল। অরুন কিছু না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মাষ্টার সাহেব কিছু একটা বুঝে নিলেন। এ বয়সটা আসলেই ভেজাল টাইপের। কোন সময় কার মন উড়ে গিয়ে কোন গাছে বসে, আর কোন ডালে বাসা বাঁধে বুঝাই মুশকিল। এমনটি ভেবে তিনি ধমকের সুরে অরুনকে বসতে বললেন। অরুন ডানে-বায়ে তাকিয়ে ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল। তারপর মনোযোগ দিল পাঠের দিকে।

নির্ধারিত সময় পার করে মাষ্টার মশাই চলে গেলে, সবাই অরুনের প্রতি দৃষ্টি ফেলল। কিছুক্ষণ পূর্বে যা ঘটেছে, অরুনের বেলায় তা একেবারেই বিরল ঘটনা। সবাই জানে সবসময় পাঠের প্রতি মনোযোগী ও। তাহলে নিশ্চয়ই কারো কথা মনে করে ওর মন ভালো নেই। এমনটি ভেবে সহপাঠী শুভ খোঁচা মারার ছলে বলল- কিরে অরুন, তর ভাবনার দুনিয়া কোথায়? ক্লাশের বাইরে না ভেতরে?

সেটাতো অনেক দুরে। আমার গ্রামের আলো-বাতাসের সাথে মিশে আছে।

কথাটার পর অনেকেই হা হয়ে গেল। কারণ; ক্লাশে এমন কোনো ছাত্রী নেই যার সাথে অরুনের সখ্যতায় কিঞ্চিত ঘাটতি আছে। সুদর্শন, তার উপর আবার মেধাবী ছাত্র বলে কথা। সেই হিসেবে অনেকের মনেই কথাটা আঘাত হেনেছে ভীষণভাবে। বিশেষ করে যাদের ভাবনার দুনিয়ায় সতত অরুনের আনাগোনা চলে। এর মধ্যে ঋতুর চোখের নদীতে স্বচ্ছল জলরাশির মৃদু ঢেউ খেলা শুরু হয়ে গেছে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই সে অরুনের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি ছুড়ল। তারপর কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিমানী সুর ছেড়ে বলেই ফেলল- তাহলে শহরে আটকে আছো কেনো? গ্রামে ছুটে গেলেই পারো।

অরুনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। ধ্যাত, মেয়েদের এই একটা সমস্যা। কিছু না বুঝেই গন্ডগোল পাকিয়ে দেয়। এখন কী হবে? ক্লাশের সবচেয়ে বোকা ছাত্রটাও সবকিছু বুঝে ফেলবে। নাহ্, আজকের বাকী ক্লাশগুলো করা মোটেও নিরাপদ নয়। সুযোগ পেলেই ঋতুর সদ্য জাগ্রত এন্টি পার্টিরা কথার আঘাতে বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। তারচেয়ে বরং বাসায় চলে যাওয়াটাই ভালো। এমনটি ভাবতে ভাবতে অরুন বইপত্র গুছিয়ে ব্যাগ নিয়ে শ্রেনীকক্ষ হতে বাইরের দিকে পা বাড়াল। ঋতু দৌড়ে এসে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। মৃদু কণ্ঠে বলল- কী হলো, আমার কথায় রাগ করে চলে যাচ্ছো?

নাহ্, রাগ করে যাচ্ছি না। এমনিতে।

এমনিতে তুমি যেতে পারো না। শীতকালিন ছুটি উপলক্ষে ভার্সিটি কদিন বন্ধ থাকবে জানো না?

হ্যা, জানি। অর্ধমাস।

বলেই অরুন আবারো পা বাড়াতে লাগল। ঋতুও ত্বরিত ব্যাগ হাতে নিয়ে অরুনের পিছু পিছু হাটা ধরল। কিছুক্ষণ হাটার পর নির্জনে এসে অরুন ঋতুর দিকে দৃষ্টি ফেলল। বিরক্তির সুরে বলল- তুমি এটা কোনো কাজ করলে? দিলে তো সবার সামনে পিরিতির বোমা ফাটিয়ে।

ফাটিয়েছি বেশ করেছি। এসব কথা গোপন রাখাটাই বোকামি। এখন সবাই শুনেছে, তাই কেউ আর তোমায় নিয়ে স্বপ্ন দেখবে না।

ইশ। আমি মনে হয় তুমি ছাড়া আর কাউকে স্বপ্ন দেখাই?

সেটাতো তুমিই ভালো জানো। ক্লাশে থেকেও গ্রামের আলো-বাতাসে যার ভাবনা ঘুরে বেড়ায়, সে নাকি আবার শহুরে মেয়ের প্রেমে পড়ে।

আরে বোকা, এ জীবনের সবটাই তো গ্রামে কাটিয়ে এসেছি, তার একটা পিছুটান আছে না? সেই টান থেকেই ক্লাশে একটু নীরবতা। এছাড়া আর কিছু নয়। তুমি তো জানো, গ্রামের কথা ভুলে সাত সাতটি মাস শহরে কাটিয়ে দিয়েছি শুধু তোমার টানেই।

তার মানে এখন ছুটি কাটাবে গ্রামে গিয়ে?

হ্যা। তবে পুরোটা না, অর্ধেক।

যাচ্ছো কবে?

আজ রাতেই রওয়ানা হবো। তুমি মন খারাপ করো না প্লিজ, ভালো থেক। মনে মনে জেনে রেখো গ্রামে যাবার পথেও আমার একটা পিছুটান থেকে যাবে। যা তোমার কাছে খুব শিঘ্রই আসতে সাহায্য করবে।

ঋতু কিছু না বলে গোমরা মুখে অরুনের দিকে তাকিয়ে রইল। অরুন ঋতুর ডান হাতটি তার হাতের মুঠোয় নিয়ে এদিক ওদিক একবার তাকাল। সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে হাতে একটা চুমু খেল সে। তারপর বলল- মনে পড়লেই ফোন দিব। আমি যাচ্ছি, বাই।

অরুন এক পা এক পা করে চলে যেতে থাকল। ঋতু তাকিয়ে রইল অরুনের চলে যাওয়া পথের দিকে। কিছুটা পথ হাটার পর অরুন পেছনে ফিরে তাকালে, ঋতু মাথায় ইশারা দিয়ে পুনরায় বিদায় জানালো। তারপর কয়েক ফোটা অশ্রু ঝরিয়ে সে বাসার উদ্দেশ্যে ধীরে ধীরে পা বাড়াল।

এখানে না বলে দিলে সবারই অজানা রয়ে যাবে। অরুন হায়ার সেকেন্ডারি পাসের পর উচ্চ শিক্ষার জন্যে শহরে এসেছে। ভর্তিও হয়েছে নামকরা একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। থাকে মামার বাসায়। বাবার হুকুম পালন করতে এসেই আজ সে শহুরে জনতার তালিকায়। যদিও শহরে আসার ব্যাপারে সে ঘোর প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু অদৃষ্টের লিখন যে খন্ডায় না। তাই মনের জমিনে এক প্রকার জেদের বীজ বুনেই সে বাড়ি থেকে নেমেছিল। বাবার উপস্থিতিতেই মাকে বলেছিল- আব্বুকে বলে দিও, আমি সার্টিফিকেট নিয়ে তবেই ফিরব, তার আগে নয়।

অথচ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছবার পূর্বেই অরুন প্রেমের ডিগ্রী অর্জন করে ফেলেছে। অবশ্য কথাটা ভুলও হতে পারে। প্রেমের ডিগ্রীই হয়তো অরুনকে অর্জন করে নিয়েছে। কারণ; ইদানিং সে একটা গান খুব পছন্দ করে। তাকে গাইতে শোনা যায়- আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে। তবে ঋতুর প্রতি তার ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই। এমনকি তার পড়া-লেখায়ও প্রেমের প্রভাব পড়ে না। সবই চলে সমান তালে। এখন তার শহুরে জীবনে কিছুটা ছন্দপতন ঘটতে যাচ্ছে, শুধু শীত এসেছে বলে।

ছন্দপতন ঘটবেই বা না কেন? শীত তো আর যেন-তেন কিছু নয়। প্রতি বছরই একটা নির্দিষ্ট সময় হাতে নিয়ে, কুয়াশার সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে শীত আসে। কোমল ছোঁয়ায় কাঁপায় সারা দেশ। তাকে প্রাণ দিতে ফসলের মাঠ জুড়ে সরষে ফুলের গন্ধেরা ভেসে বেড়ায়। সূর্যের সোনালী আলোয়, হিমশীতল বাতাসের তালে দুলে দুলে সরষে ফুল মধু আহরণের আহ্বান জানায় মৌমাছিদের। তা দেখে মনের আনন্দে খেজুর গাছ তার মিষ্টি মধুর রস মানবের তরে বিলিয়ে দিতে থাকে। সেই রস দিয়ে গ্রামের ঘরে ঘরে চলে পিঠা বানাবার ধুম। রস পিঠা, তেলের পিঠা, পাটিসাপটা, ভাপাপুলি সহ নানান পিঠায় ভরে ওঠে গ্রামের শীতের সকাল।

সত্যিকার অর্থে শীত মৌসুমের তাৎপর্য গ্রামেই। পাতা-ঝরা কুয়াশা-মোড়া সকালের দিকে তাকিয়ে গ্রামীন জীবন কেমন যেন বিষণ্ন হয়ে ওঠে। শিশির ভেজা ঘাঁসের বিছানা মাড়িয়ে কিষাণ চলে যায় মাঠে। গাঁয়ের বধু মোটা কাপড় জড়িয়ে পা বাড়ায় ঘাটের দিকে। ছোট্ট ছেলে-মেয়েরা রৌদ্রের একটুখানি পরশ পেতে হাত-পা গুটিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। এর মধ্যে আবার দেখা যায় কোনো দরিদ্র পরিবারের ছোট্ট শিশুটি বস্ত্রাভাবে ঠকঠক করে কাঁপছে, আর একটু সূর্যের উত্তাপের জন্যে প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। এ বেদনার চিত্র দেখেই হয়তো কবি লিখেছিলেন এক মর্মস্পর্শী কবিতা। তিনি বলেছিলেন-
হে সূর্য, তুমি তো জানো, / আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব !
সারা রাত খড়কুটো জ্বালিয়ে / এক টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে
কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই !

শীতের বিকেল আবার ভীন্ন রঙের। পড়ন্ত বিকেলে সোনালী ফসলের মাঠ জুড়ে চলে ছেলে-বুড়োদের বিচরণ। সৌখিন তরুণ-তরুণী সবে সরষে ফুলের ভীড়ে নিজেকে ক্যামেরাবন্দী করতে মরিয়া হয়। রাখাল তার বাঁশিতে সুমধুর ধ্বনি তুলে কারো দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। আর গ্রামের দরিদ্র পরিবারের কর্তা যে শুধু খেজুর গাছের উপর নির্ভরশীল, সে খেজুর গাছের গলায় তার ধারালো হাতিয়ার চালনায় ব্যস্ত থাকে। সব মিলিয়ে গ্রাম-বাঙলায় শীতের এক মনমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

অথচ শহরের কৃত্রিমতার নিদারুণ চাপে শীত তার নিজস্ব রূপে প্রকাশিত হতে পারে না। পারবেই বা কেমন করে? এখানে তো গ্রামের মতো কুয়াশার স্নিগ্ধ জৌলুস নেই। তবু কুয়াশার বুক চিরে যখন বাদুরের মতো মানুষ ঝুলে থাকা ভোরের বাসটি দুলতে দুলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন সত্যই অপূর্ব লাগে। যদিও গ্রাম থেকে আশা কেউ এ দৃশ্য হঠাৎ দেখে হাসতে হাসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার অবস্থা হবে। তবে এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে- শহরের রাজপথে শীতের রূপ কুণ্ঠিত হলেও, ছোট ছোট দোকানগুলোর গরম চা সকালের যাত্রীদের উদ্যমী করে তোলে। আর শীতের সকালের যে প্রধান আকর্ষণ- খেজুর রস বা রসের পায়েস ও পিঠেপুলি, তার জন্যে শহর ছেড়ে দূর গ্রাম-বাঙলায় যেতেই হবে। সেখানেই তো শীতের সকাল তার সৌন্দর্য ও মাধুর্যের অনবদ্য পসরা সাজিয়ে বসে থাকে। এই সৌন্দর্য ও মাধুর্যের রূপ, রস ও গন্ধ থেকে কারো বঞ্চিত হওয়াটা মোটেও সমীচীন হবে না। যদি সে হয় গাঁয়ের মানুষ, তবে তো কথাই নেই। আর অরুনের বেলায় তা তো এক আকাশ কুসুম স্বপ্ন।

যা হোক, অরুন ভার্সিটি থেকে বাসায় ফেরার পর দুপুরের খাবার কোনো মতে সেরে নিল। তারপর পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ততায় পড়ল। তার প্রতিদিনের ডিউটিতে আছে- ভার্সিটি থেকে ফেরার পর মামার দুই মেয়ে সেতু আর ঋতুকে নিয়ে পড়ার টেবিলে বসা। তাও দু’জনকে নিয়ে একত্রে বসা যায় না। মামা আর মামনিকে দিয়েও ওদের বুঝানোর চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু ফলাফল জিরো। তাদের একটাই কথা- আলাদা না হলে পড়বেই না। কী আর করার? বাধ্য হয়েই তাদের পেছনে দুই ঘণ্টা সময় প্রতিদিন ব্যয় করা লাগে অরুনের। সেতু একাদশে আর ঋতু পড়ে দশম শ্রেনীতে। প্রথমে সেতুকেই পড়ায় সে। তাই আজো সেতুকে নিয়ে পড়ার টেবিলে বসল। কিন্তু আজ আর বেশি পড়াতে ইচেছ হলো না তার। কয়েকটি অংক আর কিছু ইংরেজি ব্যাকরণের নিয়ম দেখিয়েই ক্ষান্ত হলো। অর্ধ ঘণ্টা পার হলেই সেতুকে বলল- যাও, আজ ছুটি।

সেতু যেন আকাশ থেকে পড়ল। হা করে অপলক তাকিয়ে আছে অরুনের দিকে। অরুন ভয়ে ঢেকুর গিলতে গিলতে বলল- কী হলো, শুনতে পাচ্ছো না।

হ্যা, শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু আপনি কি বুঝতে পারছেন না?

কী?

সেতু কিছু বলল না। বিরবির করে কতগুলো বকা দিল অরুনকে। ধ্যাত, অরুন ভাই একটা আস্ত বোকা। এত করে বুঝাতে চাই, কিছু বুঝতে চায় না। কতবার বলি আপনার কাছে বেশি সময় বসে থাকতে আমার ভালো লাগে। তাতেও কাজ হয় না। ইশ! কী বড়াই হ্যার মনে। হ্যায় ভার্সিটিতে পড়ে, আর আমি মাত্র একাদশে বলে দূরত্বে থাকতে চায়। আমি কি এখনো ছোট মানুষ? দাঁড়াও, আর মাত্র বছর দুয়েক। ভার্সিটিতে এডমিশন নিয়ে নিই। তারপর দেখাবো মজা। হ্যায় কথায় কথায় চাপা মারে- আমাকে ছোট বেলায় নাকি অনেক আদর করেছে। কাঁধে নিয়ে দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়িয়েছে। তাহলে এখন আদর করতে দোষটা কী? মনে মনে কথাগুলো বলতে বলতে সেতু নীরবতার গভীরে লুকিয়ে গেল। তা দেখে অরুন কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল।

অরুনের অনেক কাজ বাকি আছে। এর মধ্যে কাপড়-চোপড়গুলো গোছানোটাই মহা ঝামেলার। সেতুর রুম থেকে বের হয়ে প্রথমে পা বাড়াল ছাদের দিকে। যেখানে সকালে অনেকগুলো কাপড় শুকোতে দিয়েছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে অবাক হলো। পাশের বাসার বারান্দা থেকে মেলে দেয়া একটা শাড়ি ছাড়া আর কিছুই তার নজরে পড়ল না। বুঝে নিল ব্যাপারটা। নিশ্চয়ই সেতুর কাজ। সব জায়গামতো রেখে দিয়েছে। যা সে প্রায়ই করে। তাই নিজের রুমে চলে গেল। দেখতে পেল বিছানার উপর সুন্দরভাবে সবগুলো পোষাক ভাজ করে রাখা আছে। তা দেখে মনের অজান্তে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল- আহা, সেতু কত ভালো। লক্ষ্মী মেয়ে। দোষ শুধু একটাই, আমার ঋতুর জায়গাটা দখল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।

কথাটা শেষ হতেই ফিক একটা হাসির শব্দ এল অরুনের কানে। পরক্ষণে আবার সেই হাসি হা.. হা.. হা... তে পরিণত হলো। এমন হাসি, যেন ফুরোতেই চাইল না। এ হাসির আওয়াজ পেয়ে সে পেছনে ফিরে বোকা বনে গেল। ঋতু কোন ফাঁকে তার রুমে এসে দরজার আড়ালে লুকিয়েছে, সে বুঝে উঠতে পারল না। বলল- একি, তুমি এলে কখন?

আপনি যখন আপুর রুমে, আমি তখন ছাদে। আপনি যখন ছাদে, তখন আমি কাপড়গুলো ভাজ করছি। আর আপনি যখন রুমের দরজায় পা রাখলেন, আমি এক সেকেন্ডের মধ্যে দরজার আড়ালে।

বাহ্, বাহ্, বাহ্। দারুণ হয়েছে তোমার এ্যাক্টিং। আর এ্যাক্টিং করতে হবে না। এবার বলো, এসব তুমি কেন করলে?

আপুই তো এতদিন করেছে। আজ আঠার মতো লেগেছিলাম আপুর পেছনে। তোমার কাপড়ে হাতই দিতে দেইনি। আর কেন করেছি সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় তোমার?

অসুবিধা নাই, খুব ভালো করেই বুঝি। কিন্তু ম্যাডাম ওসব ফাও প্যাচাল বাদ দিয়া দেন। আপনাদের দু’বোনের জ্বালায় এখন বনবাসে চলে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি কিন্তু মামনি আর মামাকে বলে দিব।

কথাটা শেষ হতেই সেরের ওপর সোয়াসের পড়ল। ঋতু ধাক্কা দিয়ে অরুনকে বিছানায় ফেলে দিয়ে, গায়ের উপর আছড়ে পড়ল। অরুনের বুকের ওপর গড়াগড়ি দিয়ে বলল- আমি কিন্তু আপুর মত ভিতু নই। এমন কামড় মারব, গালে দাগ ফেলে দিব।

ওরে বাবা, মাপ করে দে। ছেড়ে দে বলছি। মামনি এসে দেখে ফেলবে তো। প্লিজ, ছাড়না।

নাহ্, ছাড়বো না। সঠিক কথাটা আগে বলে ফেল। আপু কি তোমাকে নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করছে?

আরে নাহ্। বাড়াবাড়ি তো করছ তুমি। পান থেকে চুন খসলেই আমার বারোটা বাজাও। উহ... মারে....। নাম না একটু।

ঋতু অরুনের নাকের সাথে নাকটা লাগিয়ে বলল- আগে বলো, একটু আগে যে বললে আপুর দোষ শুধু একটাই, ঋতুর জায়গা দখলের অপচেষ্টায় লিপ্ত। কথাটার মানে কী?

অরুনের মুখ থেকে কথা বের হলো না। সারা দেহে প্রচন্ড একটা ঝাকুনি খেল সে। কেমন একটা অনুভূতি যেন তার বুকের ভেতরটায় মোচর দিয়ে উঠল। যে অনুভূতি এর আগে কখনো পায়নি। নাহ্, কী ঘটতে যাচ্ছে এসব? শীতের সময়ও সমস্ত দেহ ঘামে ভিজে গেল তার। সহ্য করে থাকতে পারল না সে। দু’হাত দিয়ে শক্ত করে ঋতুকে চিৎ করে ফেলল। তারপর বুকের উপর গড়াগড়ি দিয়ে বলল- কথাটার মানে ঘোড়ার ডিম বুঝলে? ঝড়ে বগ মরে আর ফকিরায় নিজের কেরামতি বুঝে খুশিতে লাফ মারে।

কথাটা বলেই অরুন বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। পা দুটিতে ভয়ঙ্কর শীতের মতো কাপুনি ধরে গেল। ঋতু বিষয়টা বুঝে উঠতে পারল না। ভয়ে আতকে উঠল। বদন জুড়ে যে হাসির ঝিলিক ছিল, শেষ বিকেলের সূর্যের মতো ধীরে ধীরে তা মিলিয়ে গেল। অবশেষে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। অরুনের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে বলল- স...স...স... সরি।

তারপর ঋতু চলে গেল। অরুন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠল। এক গ্লাস পানি পান করে ব্যাগের মধ্যে কাপড়গুলো পুরে দিতে শুরু করল। যেগুলো নেয়ার কথা ছিল না, সেগুলোও ব্যাগবন্দী করতে লাগল। কিন্তু কাপড়ের একটা আইটেম শর্ট দেখে সে চিন্তায় পড়ে গেল। একি, আন্ডারওয়্যার আরেকটা কোথায়? পুরো রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কিন্তু পেল না। বুঝে নিল এটা নিশ্চয়ই ঋতুর কাজ। ইচ্ছে করেই লুকিয়ে রেখেছে ও। তাই ধৈর্যহারা হয়ে সরাসরি মামনির কাছে চলে গেল। ঋতুর সামনেই বলল- মামনি ঋতুকে বলে দিন, আমার জিনিসটা যেন দিয়ে দেয়।

ঋতু অবাক হয়ে বলল- কী জিনিস?

বলতে পারবো না। তুমি কাপড় ঘরে আনার সময় অবশ্যই হিসেব করে এনেছিলে।

আহা, কী নেই সেটা বললেই তো হলো।

ছোট দুইটা জিনিস থেকে একটা পাচ্ছি না।

ঋতু হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে লাগল। মামনি কিছু একটা বুঝে চলে গেলেন অন্য দিকে। অরুন ঋতুকে বলল- আমার আন্ডারওয়্যারটা কী দোষ করেছে? সেটা লুকানোর অর্থ কী?

ঋতু মুচকি হাসি দিয়ে বলল- আমি ওখানে একটাই পেয়েছিলাম।

অরুন আর কিছু বলল না। হয়তো বাতাসে উড়ে নিচে পড়ে গেছে। এমনটা ভেবে ছাদের দিকে পা বাড়াল। ছাদে যেতেই দূর থেকে নজর পড়ল পাশের বাসার বারান্দা থেকে মেলে দেয়া শাড়িটা ওপর। এখনো সেভাবেই আছে ওটা। কিছুটা নিকটে যেতেই ভয়ে মুর্ছা যাবার উপক্রম হলো তার। ওমা! শাড়ির আচলের গিট্টুতেই আন্ডারওয়্যার বন্দী! এটা কী করে সম্ভব? কেমন ভদ্রলোকের কান্ড এটা, বুঝতে একটু হিমশিম খেতে লাগল সে। যদিও এটা কোনো ব্যাপারই না। গিট্টু খুলে এক মিনিটের মধ্যেই নিয়ে আসা যায়। কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়াল ঐ বাসার গৃহবধু। বারান্দায় ঠিক শাড়িটার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে গৃহবধুটি। এখন উপায়? কীভাবে কী করবে, ভেলে পেল না অরুন। নাহ্, আগে মহিলা সরে যাক, তারপর ওটা খুলে আনব। মনে মনে এমনটি বলে সে কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে রইল।

ঐদিকে গৃহবধুর মনেও একই ভাবনা। কেউ আন্ডারওয়্যারটা খুলে নিলে, সে তার শাড়িটা উপরে তুলবে। কারণ; কিছুক্ষণ পূর্বে মাত্র সে শাড়ি উপরে তুলে আবার ছেড়ে দিয়েছে। তারপর থেকে এটার পেছনেই তার সময় ব্যয় হচ্ছে। জিনিসটা কার, সেটা নিয়ে এতক্ষণ অস্থিরতায় থাকলেও, অরুনকে দেখার পর কিছুটা স্বস্তি এসেছে তার মনে। কিন্তু অরুন জিনিসটা খুলে না নেয়াতে সে দিশাহারা হয়ে পড়ল। একবার ডানে, একবার বায়ে পায়চারি করতে লাগল।

ব্যাপারটা খুবই রোমান্টিক বলা যায়। কারণ; গৃহবধুটি একেবারেই নতুন। এখনো মাস হয়নি সে এ বাড়ির বাসিন্দা হয়েছে। অরুনের সাথে তার এ পর্যন্ত কথা তো দূরের কথা, মুখোমুখি দেখাই হয়নি কোনো দিন। তাই দু’জনেই অনেকটা বেকায়দায় আছে। অরুনের একদিকে যেমন সময় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে টিকটিক টিকটিক করে। অপর দিকে গৃহবধুটিরও ঘর গোছানোতেও বিঘ্ন ঘটছে। এর মধ্যে যখন মাগরিবের আযান চারদিকে ধ্বনিত হতে শুরু করেছে, তখন ঐ গৃহবধুর টনক নড়ল। সব ভয় আর লজ্জা উপেক্ষা করে একটু খাটো গলায় বলল- এই যে ভাই, আপনার জাইঙ্গাটা তাড়াতাড়ি খুলেন, আমি কাপড়টা উপরে তুলব। আমি আর সইতে পারছি না।

কথাটার পর অরুন আর দেরি করল না। তড়িঘড়ি খুলে এক ভো দৌড় দিল নিজের রুমের দিকে। ততক্ষণে কতগুলো মুখ যে অরুন আর ঐ গৃহবধুর দিকে দৃষ্টি ফেলেছে তার হিসেব মেলানোটা অসম্ভব। মজার ব্যাপার হলো- কথাটা নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে আশেপাশে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। কোথা হতে কথাটা ভেসে এল, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া কেউ বুঝে উঠতে পারল না। তাই অনেকের মধ্যে কৌতুহলের শেষ নেই। পাশের বাসা থেকে এক বুড়ির কণ্ঠে শোনা গেল- কেমন বেয়াদব মেয়েলোক হলে এই কথা আবার পাবলিসিটি করে। ছি... ছি... ছি..... ছি....।

সন্ধ্যার পরেই অরুন তল্পিতল্পা গুটিয়ে রওয়ানা হবার জন্যে তৈরি হলো। প্রথমে মামনির কাছ থেকে শান্তিপূর্ণভাবে বিদায় নিল সে। তারপর সেতু আর ঋতুর কাছ থেকে পৃথকভাবে বিদায় নিতে গিয়েই থমকে গেল। একি? দু’জনে তাকে বিদায় দিতে একসাথেই দাঁড়িয়ে আছে। অরুন মৃদু হাসি দিয়ে বলল- বাহ্, দারুণ তো! এত চেষ্টা করেও দু’জনকে একত্র করতে ব্যর্থ ছিলাম। সেই ব্যর্থতা দেখি আজ ঘুচে গেল।

ঋতু এক পা এগিয়ে এসে কাঁপা কণ্ঠে বলল- তু..তু.. ইয়ে আপনি একেবারে চলে যাচ্ছেন কেন?

কে বলেছে আমি একেবারে যাচ্ছি?

সেতু বলল- একেবারে না গেলে সবকিছু গোছালেন কেন? আমরা আপনাকে যেতে দিব না। আর কথা দিচ্ছি- আপনি গ্রাম থেকে আসার পর আমরা দু’জন একসাথেই পড়ব।

অরুনের মনটা হালকা হয়ে গেল। মুখে মৃদু হাসির ফুল ফুটল তার। কাপড়ের ব্যাগ একটা সেতুর হাতে দিয়ে বলল- ধর রাখো, তাহলে আমি থেকেই গেলাম। তবে এটাই শেষ সুযোগ। ফিরে আসার পর কথা যেন ঠিক থাকে।

দু’বোন একসাথে বলে উঠল- আর সুযোগ দিতে হবে না। আমাদের খেলা ড্র হয়েছে, ড্রই থাকুক।

ওমা ! সেটা আবার কেমন কথা?

যেমন কথাই হোক, খেলা ছিল আমাদের আর জয় হয়েছে আপনার। এর চেয়ে বেশি কিছু বলা যাবে না।

সেতু একথা বললে অরুন কিছু একটা আন্দাজ করে নিল। মনে মনে বলল তবে আন্ডারওয়্যারের শাস্তিটা আমি ঠিকই দিব। তারপর বিদায় নিয়ে চলতে লাগল আপন ঠিকানার উদ্দেশ্যে। সিএনজিতে ঘণ্টা দেড়েক চড়ে হামাগুড়ি দিয়ে কোনোমতে রাত দশটার লঞ্চ ধরল। লঞ্চে বসেই মোবাইলটা হাতে নিল সে। সাথে সাথে বাজ পড়ল মাথায়। ঋতুর দেয়া ত্রিশটি মিসড কল ভেসে উঠল মোবাইলের পর্দায়। দেখে ঠোঁট কামড়াতে লাগল সে। ইশ! না জানি কতটা রেগে আছে ও। মনে মনে এমনটি বলে ঋতুর নম্বরে ডায়েল করে মোবাইল কানে ধরে বসে রইল। কাজ হলো না তাতে। আওয়াজ শোনা গেল- এই মুহূর্তে তার সাথে সম্পর্ক ভালো না। ভাগ্যের ফের বুঝে নিয়ে একটা দীর্ঘঃশ্বাস ছেড়ে সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

পরের দিন অরুনের ঘুম সহজে ভাঙতে চাইল না। পাখির কিচিরিমিচির শব্দের মাঝে যে অরুনের ঘুমিয়ে থাকা পূর্বে কখনো কল্পনা করা যেত না, সেটা এখন বাস্তবেই দেখা গেল। ঘড়ির কাটা যখন সকাল দশটার সীমানা ছুঁয়ে টিং টিং টিং টিং শব্দ ছাড়ায় ব্যস্ত, তখন অরুন স্বপ্নের রাজ্যে থেকেই তার আঁধার রাতের ডেটিং সারতে উঠে পড়ে লেগেছে।

অরুনের স্বপ্নের দুনিয়ায় এখন গভীর রাত। রাত দুইটার এলার্ম বেজে উঠার সাথে সাথে তার ঘুম ভেঙে গেলে, তড়িঘড়ি সে বাইরে নেমে পড়ল। ডানে-বায়ে তাকিয়ে হাটতে লাগল বিলের দিকে। যেখানে সবাই মিলিত হবার কথা পূর্বেই ঠিক করা ছিল। যেইনা সে বিলের মাঝখানটায় পৌঁছল- সাথে সাথে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনা গেল। খানিক পরেই দূর থেকে একদল দৌড়ের আওয়াজ ভেসে এলে, ভয়ে তার দম বন্ধ হয়ে যেতে চাইল। তবে শরিফের কণ্ঠ কানে এলেই তার ভয় কেটে গেল। বুঝে নিল ব্যাপারটা। শালারা, আমাকে দুইটার টাইম দিয়ে তার আগেই রস চুরি করছে? দাড়াও দেখাচ্ছি মজা। মনে মনে একথা বলে কতগুলো মাটির টুকরা হাতে নিয়ে সে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে গেল। কিন্তু শরিফদের আর কোনো আওয়াজ পেল না। প্রকৃতি একেবারেই নীরব নিস্তব্ধ। তাই ঝোপের আড়াল থেকে বের হওয়ার জন্যে কিঞ্চিত মাথাটা উঁকি দিল। অমনি নজরে পড়ল পাঁচজন তার সামনে মাত্র ঝোপের একহাত দুরে দাঁড়িয়ে আছে। কে কে আছে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করল সে। দেখতে পেল- শরিফ, টুটুল, ফকিন, বিল্লাল আর রাসেল। এর মধ্যে হঠাৎ রাসেল বলে উঠল- ঐ যে কে জানি আসছে।

টুটুল বলল- ওই ওই পালা, সফি আসছে। চল সবে মিলে ওকে ডর দেখাই।

কথাটা শোনা মাত্র অরুন স্থান পরিবর্তন করে ফেলল। কারণ; সব কয়টা এখন এ ঝোপের আড়ালেই চলে আসবে। সেই সুযোগে একগাদা প্যাক ছুড়ে ওদের শায়েস্তা করা যাবে। মুহূর্তের মধ্যেই অরুন নিঃশব্দে ঝোপ থেকে বের হয়ে সফির কাছে চলে গেল। চুপি চুপি সফিকে বলল- সব কয়টা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে আছে তোকে ভয় দেখাবার জন্যে। চল প্যাক মেরে ওদের ভূত খেলা দেখাই।

সফি মুখ চেপে কিছুক্ষণ হাসার পর বলল- নাহ্, কাদা না। কোন পাশে লুকিয়েছে তুই আমাকে দেখাবি, তারপর যা করার আমিই করব।

এ কথার পর নিঃশব্দে দুজন সুপারি বাগানের কিনারা ঘেষে ঝোপের নিকটে গিয়ে দাঁড়াল। গুনগুন আওয়াজ শুনেই অরুন তাদের অবস্থান বুঝে নিল। সফিকে দেখিয়ে দিয়ে সে একপাশে সরে গেল। সফি বলল- বাহ্, চমৎকার হবে খেলাটা। উপরে আছে খেজুর গাছ, আর নিচে চোরের দল। আমরা আগে রস নামিয়ে খেয়ে নিই। তাইলে ওয়াটার মাইনসটা বেশি হবে।

অরুন বাঁধা দেবার ছলে বলল- আরে না না। বিল্লালের কাকার গাছ এটা। পরে বিল্লাল রাগ করবে।

ধুর, হের রাগের গুষ্টি কিলাই। শালায় না অন্য মাইনষের গাছের রস চুরি করে খায়।

সফি কথাটা বলে, চিকন একটা পাঠকাঠি অরুনের হাতে দিয়ে, তরতর করে গাছে উঠে গেল। অরুনও কিছুদুর উঠল হাড়িটা ধরার জন্যে। দু’জন সাবধানে হাড়ি নামিয়ে পাঠকাঠি ভাগ করে সবটুকু রস মজা করে টেনে নিল। তারপর অরুনই গাছে উঠে হাড়িটা সুন্দরভাবে পেতে দিল। সে নেমে এলে কয়েক সেকেন্ড পরেই সফির প্যান্টের চেইন খোলার একটা আওয়াজ পেল। পর মুহূর্তেই ঝোপের মধ্যে সবাই একসাথে বলে উঠল- হায় হায়রে রসের হাড়িটা মনে হয় ভইরা গেছেরে।

কথাটা শুনেই মুখ চেপে ধরে হেসে উঠল অরুন। এমন সময় তার মোবাইলটাও বেজে উঠল। তড়িঘড়ি সেটা বন্ধ করতে সুইচ চেপে ধরল। কিন্তু বন্ধ হলো না। যার পর নাই এমন চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলো সে, তখন ব্যাটারিটাই খুলে ফেলল। তবু মোবাইলের আওয়াজ তার কানে আসতেই লাগল। ব্যাপারটা কী? কোথা থেকে এ শব্দ আসছে? দিশাহারা হয়ে শেষে এক চিৎকার দিয়ে বলল- এই কেরে? কে বাজাচ্ছিস মোবাইল? বন্ধ কর বলছি। আমার কানটা ঝালাপালা হয়ে গেল। উহ....।

ঘুমের ঘরে অরুনের সেই চিৎকার শুনে তার ছোট বোন রূপা ছুটে এল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ঋতুর নামটি দেখতে পেয়ে সে অরুনের ঘুম ভাঙাতে চেষ্টা করল। বলল- ভাইয়া, এই ভাইয়া, ঋতু আপু ফোন করেছে। দেখতো কী বলতে চায়।

ডাক শুনে অরুন লাফিয়ে উঠল। কিন্তু তখনো ঘুমের ঘোর কাটেনি তার। তাই কল রিসিভ করে বলল- হ্যালো, ঋতু। কেমন আছো?

ওপার থেকে আওয়াজ এলো- হ্যা ভালো, তুমি কেমন আছো?

ভালো, মামনি কেমন আছে?

ঋতু রাগান্বিত কণ্ঠে বলল- কী হয়েছে তোমার? কিছুইতো বুঝতে পারছি না। কাল এতবার ফোন দিলাম রিসিভ করলে না, আজও একই অবস্থা। তাও এখন আবার কথা বলছো আবোল তাবোল।

এবার অরুনের ঘুমের ঘোর কাটল। হাত দিয়ে চোখ ভালোভাবে পরিস্কার করে কলটি একবার দেখে নিল। ঋতু নম্বর-১ দেখে অবাক হয়ে বলল- একি? তুমি ফোন করেছো? সরি সরি। ঘুমিয়ে ছিলামতো।

ঠিক আছে তুমি ঘুমিয়েই থাকো। আজ আর কথা বলতে হবে না।

এ কথা বলে ঋতু লাইনটা কেটে দিল। অরুনও কী মনে করে মোবাইলটা বন্ধ করে দিল। সেটা আলমিরার ওপর রেখে ঘর থেকে নেমে গেল। ফ্রেশ হয়ে হালকা কিছু নাস্তা সেরে এবার বন্ধুদের খোঁজে রাস্তায় নেমে পড়ল। প্রথমে সফির উদ্দেশ্যেই পা বাড়াল সে। তার সাথে দেখা হবার পর হাসতে হাসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার অবস্থা হলো। সফি কারণ জানতে চাইলে স্বপ্নের ঘটনাটা বিস্তারিত শুনালো। শুনে সফিও হাসতে হাসতে শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। কিন্তু পরক্ষণে ঝোপের আড়ালের ঐ বন্ধুদের কথা মনে পড়তে তার মুখটা মলিন হয়ে গেল। তা দেখে অরুন বলল- কীরে, হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেলি তুই?

সফি মৃদু কণ্ঠে বলল- তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস অরুন। ওরা কেউ আর গ্রামে নেই। সবাই বিভিন্ন কাজে যার যার মতো চলে গেছে।

কথাটা শুনে ভূমিকম্পের মতো অরুনের বুকের ভেতরটা ভেঙ্গে গেল। হা করে সফির দিকে তাকিয়ে রইল সে। সফি বলল- সেদিন গত বছরের নানান ঘটনা মনে ঘুরপাক খেয়েছিল, তাই আধার রাতের ডেটিং নামে মিথ্যা একটা শিরোনাম বানিয়ে তোকে বাড়িতে আনার চেষ্টা করেছি। আসলে আমার একা একা আর ভালো লাগে নারে। পড়া-লেখাও বন্ধ হয়ে গেল টাকার অভাবে। যদি তোর সাথে পড়া-লেখায় ব্যস্ত থাকতাম, তাহলে দু’জন একসাথে অনেকগুলো বছর দুষ্টামি করে কাটিয়ে দিতে পারতাম। পেছনের কথাগুলো মনে পড়লে খুউব কষ্ট লাগে আমার। মনে চায় ওখানে উড়ে চলে যেতে।

অরুন কিছু বলার মতো আর ভাষা খুঁজে পেল না। চোখের কিনারা বেয়ে পাহাড়ি ঝর্ণার মতো অশ্রু ঝরতে লাগল তার। কিছু না বলে ধীরে ধীরে হাটা শুরু করল রাতের ঐ খেজুর গাছটির দিকে। গিয়ে দেখল এবার তাতে হাড়ি দেয়া তো দুরের কথা, গাছের একটি পাতাও নেই। নিষ্প্রাণ দাঁড়িয়ে আছে গাছটি। অরুনকে যেন কী বলতে চাইছে সে। কিন্তু পারছে না। গাছটি নিয়ে অতীতের জমে থাকা স্মৃতিগুলো অরুনের বুকের ভেতরটা কুটি কুটি করে কাটতে লাগল। সফিও অবাক হয়ে গেল অরুনের কান্না দেখে। নিজেকে অপরাধী করে সে বলল- তুই আমাকে ক্ষমা করে দে অরুন। মিথ্যা বলে তোকে গ্রামে এনে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেললাম।

অরুন কিছু না বলে চুপটি মেরে দাঁড়িয়ে রইল। বুঝে নিল সফির একা থাকার ব্যথাটা। তাই এ মুহূর্তে চিৎকার করে গ্রামের আলো-বাতাসের কাছে তার জানতে ইচ্ছে করছে- কৈ, আমার প্রিয়তম বন্ধুদের মধুমাখা মুখগুলি এখন কোথায়? বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে ওদের। সেই অতি সহজ, সরল, কোমল, অপরিপক্ক, কালো, শ্যামলা, গৌর বর্ণের অতি পরিচিত সোনার মুখগুলি কোথায় হারিয়ে গেল? যাদের আমি স্মৃতির সবচেয়ে মধুময় স্থানে অতিযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছি। যাদের পিছুটানে আমি এসেছি, কোথায় ওরা? কোথায়?

কিন্তু মুখ ফুটিয়ে কিছু বলার সাহস তার হলো না। কারণ; আর কেউ না বুঝলেও সে তো বুঝে, সে হারাবার পরেই যে একে একে সবাই হারিয়ে গেছে সফির কাছ থেকে। অবশেষে নীরবতা ভেঙ্গে সফিকে বলল- চল ঘরের দিকে যাই।

আর কোথায়ও যাবি না?

নাহ্, ভালো লাগে না। গ্রামটাকে কেমন যেন কৃপন মনে হয়। দেখছিস না শীত এসেছে, কিন্তু শীতের মাঝে আমার যে প্রধান আকর্ষণ- বন্ধুদের সাথে মজা করা, তা থেকেই এবার বঞ্চিত হলাম।

তুই কি আর থাকবি না?

নাহ্। কাল ভোরেই চলে যাবো।

সফি আর কিছু বলল না। অবশ্য বলারইবা কী আছে তার? বুঝে নিল হয়তো বা সেখানেও অরুনের কোনো পিছুটান তৈরি হয়ে গেছে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • আশা
    আশা পড়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। সকলে দোয়া করবেন যেন আপনাদের মনের মতো করে লিখতে পারি।
    প্রত্যুত্তর . ১৯ জানুয়ারী, ২০১২
  • এস, এম, ফজলুল হাসান
    এস, এম, ফজলুল হাসান তৌহিদ উল্লাহ শাকিল: । আগামী ১৭ ই ফ্রেব্রুয়ারী গল্প কবিতার বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে সম্পৃক্ত হওয়ার লক্ষ্যে একটি ইভেন্টের আয়োজন করেছি । যেহুতু নেট ছড়া সম্ভব নয় তাই নেটের মাধ্যেমে করছি ।গল্প কবিতায় প্রকাশিত আপনি আপনার সেরা লেখাটি এখুনি পাঠিয়ে দিন এই লিঙ্কে [ আরও...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৮ জানুয়ারী, ২০১২
  • আশা
    আশা .....
    প্রত্যুত্তর . ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪