বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ ডিসেম্বর ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ১৪টি

সমন্বিত স্কোর

৫.০৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.১৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৩ / ৩.০

ভালবাসার অপূর্ণতা

পূর্ণতা আগস্ট ২০১৩

একটি ইচ্ছার অপমৃত্যু

ইচ্ছা জুলাই ২০১৩

হে যোদ্ধা

মুক্তিযোদ্ধা ডিসেম্বর ২০১২

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (নভেম্বর ২০১২)

মোট ভোট ৬১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.০৮ ব্লাডি হান্টার

শিশির সিক্ত পল্লব
comment ২৩  favorite ১  import_contacts ৬৮৯
এক
শেষরাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঘরটা আচ্ছন্ন। খোলা জানালার ফাক দিয়ে একফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘুমন্ত মুখটার উপর। অসম্ভব সুন্দর লাগছে সে মুখটাকে। এমন মুখের পরশ পাবার শখ কার না জাগে। তাইতো চাঁদ তার আলোর হাত প্রসারিত করেছে মুখটাকে ছুয়ে যেতে। এত সুন্দর কোন নারীর মুখ হতে পারে। সৃষ্টিকর্তা যেন তার মনের সব মাধুরী মিশিয়েই এই মুখটাকে সৃষ্টি করেছেন। কাল হরিণী দুটি চোখ, সুউন্নত নাক আর তার নিচেই লাল টকটকে দুটি ভরাট ঠোট। যেন অন্য কোন ভূবনের নারী সে। যে কোন পুরুষই তার এই সৌন্দর্যে মুগ্ধ।
খুব শান্তভাবেই ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা। আজ ওর জন্মদিন ছিল বলেই একটা কাল রঙের শাড়ি পরেছিল ও। সেটা পরেই ঘুমিয়ে পড়েছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অমৃতা এখন স্বপ্নলোকের বাসিন্দা। স্বপ্নের মধ্যে দেখতে পায় বিশাল এক সম্রাজ্যের রাণী সে। হাজার হাজার মানুষের মধ্য দিয়ে সে যখন রাজপ্রাসাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন সকলেই মাথা নিচু করে তাকে সম্মান জানাচ্ছে। অমৃতা খেয়াল করল এখানকার সব মানুষ গুলোরই গায়ের রং কেমন যেন ধূসর বাদামী। লোকগুলোর চেহারাও প্রায় একই। অমৃতা কারো দিকে না তাকিয়েই সোজা প্রাসাদের সিড়ি বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। রাজা সিংহাসন থেকে নেমে এসে রাণীর সামনে দাড়ালেন। রাণী তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। রাজা মাথা নিচু করে রাণীর হাতের উল্টো পিঠে চুমু খেলেন। তারপর দুজন একসাথে চলে গেলেন প্রাসাদের অন্দরমহলে।
স্বর্ন দিয়ে তৈরী মহামূল্যবান বিছানার উপর আলতো করে রাণীকে বসিয়ে দিলেন রাজা। আস্তে আস্তে এক এক করে রাণীর পোশাকগুলো খুলতে থাকলেন তিনি। তারপর রাণীকে জড়িয়ে ধরে কপালে, ঠোটে, গলায় চুমু খেলেন। এরপর পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লেন বিছানার উপর।
ভীষন কষ্ট হতে লাগল অমৃতার। প্রচন্ড কষ্টে যখন সে কাতরপ্রায় তখনই ঘুম ভেঙে গেল। বোজান চোখদুটি মেলতেই তার চোখ পড়ল একটি মানব আকৃতির প্রানীতে। ঠিক তার ডান পাশেই বসে আছে প্রানীটা। চোখদুটো অন্ধকারেও জ্বল জ্বল করছে। তার স্বপ্নে দেখা রাজার মতই যেন তার চেহারা। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে প্রানীটার গায়ের রং ধূসর বাদামী। ভযে চিৎকার করে উঠল অমৃতা। সাথে সাথেই প্রানীটা জানালার গ্রিল ভেদ করে বাইরে লাফিয়ে পড়ল। কিন্তু কি আশ্চর্য! জানালার এই ছোট ফাক দিয়ে এত বড় প্রানীটা কিভাবেই গেল? অমৃতার মাথায় কিছুই কাজ করলনা। সে জ্ঞান হারাল।
পরের দিন সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল অমৃতার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে নয়টা বেজে গেছে। কলেজে যেতে হবে। দশটায় তার ক্লাস। তড়িঘড়ি করে লাফিয়ে উঠতেই সে অনুভব করে সারা শরীরে তার প্রচন্ড ব্যাথা। অবাক হয় অমৃতা। সারা শরীরে ব্যাথা হল কিভাবে। হঠাৎ তার চোখ যায় মেঝের দিকে। তার পরনের শাড়িটা মেঝেতে পড়ে আছে। এবার নিজের দিকে তাকায় সে। পেটিকোটটায় শুকিয়ে আছে থোকা থোকা কালচে রক্ত। বুকের আবরনীটাও খোলা। কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা অমৃতা। গত রাতের কথা মনে করার চেষ্টা করে সে। মনে পড়ে যায় সে ধূসর মানবের কথা। কে সে লোকটা, কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে, কেন তার এত বড় ক্ষতি করল কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা সে। শুধু হৃদয় মুছড়ে ওঠে। অঝোর ধারায় দু চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে তার।
অমৃতার ঘুম থেকে উঠতে দেরি হচ্ছে দেখে তার মা আবার বাইরে থেকে দরজায় টোকা দেয়। কি ব্যাপার অমী, আজ কি কলেজে যাবি না, কয়টা বাজে দেখেছিস?
আসছি মা, বলেই অমৃতা দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বাইরে বের হয়ে আসে।
কাউকেই কিছু বলে না অমৃতা। প্রথমে ভেবেছিল মাকে বিষয়টা বলবে। কিন্তু পরে অনেক কিছু ভেবে আর বলেনা সে। কলেজে যেতে ইচ্ছা করছে না তার। তবু মাকে কারন দর্শান বা মায়ের জেরার মুখে না পড়ে কলেজে যাওয়াটা ভাল মনে করেই সে কলেজে যায়। কলেজে যেতে যেতে একটু দেরি হয়ে যায় তার। প্রথম ক্লাসটা ধরতে পারেনা। এছাড়া ক্লাস করার ইচ্ছাও তার আজকে নাই। লাইব্রেরীতে এসে একটা বই বের করে উদাসভাবে বসে আছে। পেছন থেকে রাজ এসে একটা চেয়ার টেনে ওর পাশে বসে।
* কি ব্যাপার অমী? ক্লাসে পেলাম না। ক্লাস না করে লাইব্রেরীতে থাকবি জানলে তো আমিও ক্লাস করতাম না।
অমৃতা কথা বলেনা। চুপ করে বসে থাকে। অমৃতার এমন ভাব দেখে রাজ আবার জীজ্ঞাসা করে, কিরে, কি হয়েছে তোর, কথা বলছিস না কেন?
অমৃতা রাজের চোখের দিকে তাকায়। তারপর চোখদুটো নিচের দিকে নিয়ে মাথা নিচু করে বলে, দেখ রাজ, তোর সাথে আমার সম্পর্কটা ব্রেক করতে হবে।
* মানে কি? অবাক হয় রাজ।
* এত মানে দিয়ে কি হবে। তোকে আমার ভাল লাগছেনা তাই সম্পর্কটাও ব্রেকআপ করতে চাই, ব্যাস।
* তুই কি পাগল হয়ে গেলি না কি?
* না, আমি সিরিয়াসলি বলছি। আরও একটা বিষয় শোন, আমার বিয়ে হয়ে গেছে।
* বিয়ে হয়ে গেছে মানে, কবে হল, কিভাবে হয়েছে, কেউ কি জানে?
* কেউ জানেনা। শুধু তুই জানলি। মুখটা বিকৃত করেই বলে অমৃতা।
এরপর আর কথা না বাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে সে। রাজ ওকে পিছন থেকে ডাক দেয়। তবু সে পিছনে না ফিরে সোজা চলে যায়।
কিছুদিন পরই পত্রিকায় বের হয় আলোড়নকারী খবর। বৃহষ্পতির আকাশ থেকে একটি নভোযান পৃথিবীর রাডারকে ফাকি দিয়ে পৃথিবীপৃষ্ঠে অবতরন করে। বিজ্ঞানীরা ধারনা করছে নভোযানটি ভারতীয় উপমহাদেশের কোন একটি দেশের মাটিতে এসে অবস্থান নেয়। প্রায় এক সপ্তাহ এটি পৃথিবীপৃষ্ঠে অবস্থান করে আবার সফল ভাবে বৃহষ্পতির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। ধারনা করা হচ্ছে নভোযানটিতে বৃহষ্পতি গ্রহের প্রানীরা ছিল এবং তারা পৃথিবী গ্রহকে পর্যবেক্ষনের জন্যই পৃথিবীতে এসেছিল।
বাইরের জগতের এলিয়েন নিয়ে সারা পৃথিবীতে যখন আলোড়ন চলছে তখন চারকোনা ছোট্ট ঘরের মাঝে বসে একাকী দুশ্চিন্তায় বিভোর অমৃতা। নিজের ভুবনে সে বার বার খুজে ফেরে নিজেকে। মাঝে মাঝে ভাবে কি এমন হারিয়েছে সে যে দুশ্চিন্তা করতে হবে। পরক্ষনেই ভাবে সে তো সবই হারিয়েছে যেটা তার অহংকার ছিল, যেটা তার একান্ত নিজের ছিল।
দিন চলে যায়। মাসও পেরিয়ে যায়। অমৃতা বুঝতে পারে নতুন কোন অতিথীর আগমন ঘটেছে তার মধ্যে। এবার সে ভাবে যে মাকে তার বিষয়টা বলতেই হবে। কিন্তু পরক্ষনেই ভাবে তার মধ্যে যে এসেছে সে তো এক ধূসর প্রানীর সৃষ্টি, বাইরের জগতের বাসিন্দা কোন এলিয়েনের ঔরসজাত। কেন সে এলিয়েনটা পৃথিবীতে এল, কেনইবা তার মধ্যে রেখে গেল ভীন গ্রহের বীজ। এই অনাগত সন্তান কি পৃথিবীর কল্যানের জন্য নাকি ধ্বংসের জন্য। যদি কল্যানের জন্যই হয় তবে একে বাচিয়ে রাখাটা একান্ত জরুরী। নানা কৌতুহল বুকে চেপে অমৃতা শেষ পর্যন্ত সন্তানটাকে বাচিয়ে রাখতে চাইল। কিন্তু মাকে যদি সে বিষয়টা বলে তবে তার মা নিশ্চয় বলবে সন্তানটাকে নষ্ট করে ফেলতে। কিন্তু এটা আর সম্ভব নয়।
মাসের পর মাস পেরিয়ে যায়। অমৃতার দেহের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। কাউকে বুঝতে দেবেনা ভেবে সে ইদানীং ঢিলেঢোলা জামা পরে। কিন্তু কতদিন এভাবে। এক সময় দেহের পরিবর্তনটা তার মায়ের দৃষ্টিগোচর হয়। মা সন্দেহ করতে থাকেন অমৃতাকে। একসময় সন্দেহের অবসান ঘটে এবং অমৃতা সব ঘটনা মাকে বলে দিতে বাধ্য হয়। ততোদিনে অনেক সময়ই পেরিয়ে গেছে। তার গর্ভের সন্তানের বয়সও প্রায় আট মাস পেরিয়ে এসেছে। সবকিছু শুনে অমৃতার বাবা তো ভীষন টেনশনে পড়ে গেলেন। আপাতত অমৃতাকে বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করলেন তিনি। গোপনে যোগাযোগ করলেন ঢাকা শহর থেকে সুদূর দুরে খুলনা শহরে তার এক ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে।
নির্ধারিত দিনে অমৃতা, তার মা-বাবা ও ছোট বোন মিলে চলে এলেন খুলনা শহরে। অমৃতাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। রাত দশটার দিকে খুব সুন্দর ফুটফুটে একটি ছেলে সন্তান প্রসব করল অমৃতা। কিন্তু প্রসবের পর পরই সে জ্ঞান হারাল। ডাক্তার আপ্রান চেষ্টা করেও তার সে জ্ঞান আর ফেরাতে পারল না।
অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চাটাকে সাদা কাপড়ে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন অমৃতার মা। পাশেই অমৃতার লাশটা কাপড়ে ঢাকা। ছোটবোন কেঁদেই চলেছে তার পায়ের কাছে বসে। কিছুক্ষন পর অমৃতার বাবা গাড়িতে ওঠার সাথে সাথেই ড্রাইভার গাড়িটা ছেড়ে দিলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। সবার জলে ভেজা চোখ। কেউ কোন কথা বলছে না। গাড়ি ছুটে চলেছে দ্রুত গতিতে। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা খুলনার মূল শহর অতিক্রম করল। আশেপাশে এখন আর শহরের মত নিয়ন বাতি গুলো জ্বলছে না। অমৃতার বাবা ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললেন। তারপর কারোর বুঝে ওঠার আগেই অমৃতার মায়ের কাছ থেকে সাদা কাপড়ে জড়ানো বাচ্চাটাকে নিয়ে ছুড়ে ফেললেন রাস্তার পাশে। এরপর ড্রাইভারকে দ্রুত গাড়ি চালাতে বললেন। অমৃতার মা আর ওর ছোটবোন অবাক হয়ে অমৃতার বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে ভাষা নেই ওদের। গাড়ি ছুটে চলেছে অবিরাম গতিতে।

দুই
বাবা রিকশা চালক। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। তিন বোনের একমাত্র ভাই রকিবুল সবচেয়ে ছোট। অনেক কষ্ট করে ওর বাবা তিন বোনকে বিয়ে দিয়েছেন। রকিবুল পড়াশুনা করছে। এবার সে ক্লাস নাইনে। বাবার টাকা পয়সা নাই তাকে পড়ানোর। কিন্তু অসম্ভব মেধাবী হওয়ায় স্কুল থেকেই তার যাবতীয় পড়াশুনার খরচ চালানো হয়। তাছাড়া বিভিন্ন এনজিও বা সংস্থা থেকে সে ছোটখাট বৃত্তিও পায়। কেনই বা পাবেনা। রকিবুলের মত অদম্য মেধাবী দেশে খুব কমই আছে। খুব বেশী যে পড়াশুনা করে তা নয়। তারপরও ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষায় বোর্ডে প্রথম, ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষায়ও বোর্ডে প্রথম হয়েছে সে। কি যেন আধ্মাতিক শক্তি আছে ছেলেটার মধ্যে। যেখানে যে কাজেই যাক না কেন সফল হবেই সে।
এমনিতেই রকিবুল ছেলেটা খুবই শান্ত। সবার সাথে নম্র ভদ্র ভাবে কথা বলে। নিয়মিত বাবার সাথে মসজীদে গিয়ে নামাজ পড়ে। বাবার কোনদিন রিকশা চালাতে গিয়ে ফিরতে দেরি হলেও সে ঠিকই মসজীদে গিয়ে নামাজ আদায় করে। এলাকার সকলেই তাকে খুব স্নেহ করে। স্কুলের স্যাররা তাকে অনেক ভালবাসেন। সহপাঠী কারোর সাথে কখনো ঝগড়া বিবাদে যায়না সে। স্যাররা প্রায়ই রকিবুলের বাবাকে বলেন, তোমার ছেলে দেশের একটা সম্পদ। ও ভবিষ্যতে অনেক কিছুই করবে। রকিবুলেরও নিজের মধ্যে কনফিডেন্স অনেক। সেও অনেক চেষ্টা করে।
দেখতে দেখতেই দিন পেরিয়ে যায়। রকিবুল এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ করে। এস.এস.সি তেও অনেক ভাল রেজাল্ট করে সে। ভর্তি হয় একটি সাধারন কলেজে। কিন্তু সাধারন কলেজে ভর্তি হলে কি হবে ঠিকই অসাধারন রেজাল্ট করে এইচ.এস.সি তে। পেপারে নাম আসে গরীব অথচ অদম্য মেধাবী রকিবুলের। তার স্বপ্ন ডাক্তার হবার। অনেক বড় ডাক্তার হয়ে দেশের সেবা করার ইচ্ছা তার।
রকিবুলের ইচ্ছা পূরন হয়। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সারাদেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয় সে। কিন্তু মেডিকেলে পড়ানোর খরচ কিভাবে যোগাবে রিকশাচালক পিতা। অবশেষে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় বিভিন্ন দাতা সংস্থা। রকিবুলের পড়াশুনার যাবতীয় ভার তারা গ্রহন করে।
মেডিকেলে পড়ার দিনগুলো যেন বিরক্ত লাগে রকিবুলের কাছে। আগে স্কুল কলেজে পড়ার সময় সে যেমন সকলের সাথে মিলেমিশে থাকত, এখানকার ক্যাম্পাস জীবনে সেই আগের ভাবটা পায়না রকিব। সবাই যেন স্বার্থপর। কেউ তার সাথে মিশতে চায়না। কারো সাথে কথা বলতে গেলেও খুব আগ্রহ নিয়ে কথা বলেনা। খুব কষ্ট লাগে রকিবুলের। সে আসলে এই নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে না। সেই আগের মতই হ্যাংলা দেহটার উপর ঢিলেঢোলা শার্ট, গোড়ালির উপর পর্যন্ত তোলা প্যান্ট. মুখ ভর্তি দাড়ি সব একই রকমই আছে। কিছুই বদলায়নি তার। তাহলে এমন ছেলের সাথে কেই বা মিশবে।
আসলে পৃথিবীতে সকলের সবকিছু থাকেনা। তবে প্রত্যেকের মধ্যেই বিশেষ কিছু একটা থাকে যার মাধ্যমে নিজেকে সে অপরের সামনে মেলে ধরতে পারে। অনেকে টাকার জোরে, অনেকে মুখে বড় বড় বুলি আর স্মার্টনেসের জোরে, অনেকে মিষ্টি চেহারার জোরে, অনেকে গান বাজনা বা খেলার জোরে, এমনি অনেকে অনেক কিছুর জোরে অপরের সামনে নিজেকে মেলে ধরে। কিন্তু রকিবুলের তো এসবের কিছুরই জোর নাই। সে নিজেকে মেলে ধরবে কিভাবে।
অবশেষে রকিব পারে। যখন ফার্স্ট সেমিস্টারের রেজাল্টে সে অনেক ভাল স্টুডেন্টের ফেল করার মধ্যেও অনেক মার্কস পেয়ে ভাল রেজাল্ট করে। আসলে সে সকলের কাছেই পরিচিত হয়ে উঠতে থাকে তার মেধার জোরেই। মেধাই তাকে অন্যের কাছে মেলে ধরতে সাহায্য করে। সে খুব দ্রুতই শুধু সহপাঠী নয় স্যারদের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠে এবং বুঝতে পারে স্টুডেন্ট লাইফে সব জোর গুলোর মধ্যে মেধার জোরই বেস্ট এবং ইউনিক।
ইদানীং সিমির সাথে রকিবের খুবই ফ্রেন্ডশীপ গড়ে উঠেছে। সিমি মেয়েটাকে রকিবের খুব ভালও লাগে। হালকা পাতলা গড়নের শ্যামলা চেহারার মেয়েটা। ওর চোখের চাহনীটাই ওকে অন্য সব মেয়ে থেকে আলাদা করেছে। রকিবের দিকে যখন সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায় রকিব যেন মনের মধ্যে আলাদা সুখময় কোন কিছু একটা অনুভব করে। আসলে সিমির সাথে মেলামেশার পর থেকে রকিব যেন নিজেকে হালকা হালকা পরিবর্তন করে ফেলেছে। আগের মত মুখ ভর্তি দাড়ি আর এখন নেই, প্যান্টও গোড়ালীর উপরে ওঠেনা, বডি ফিটিং শার্ট পরে সে এখন।
রাত এখন দুইটা। রকিব পড়াশুনা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ে। পরের দিন খুব ভোরেই মানুষের শোরগোল শুনে ঘুম ভেঙে যায় রকিবের। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে জানালা দিয়ে হলের নিচের দিকে তাকায়। লক্ষ্য করে অনেক লোকের কোলাহল। সাথে সাথেই ও এবং ওর রুমমেটরা নিচে চলে আসে। কে একজন বলে ওঠে রুমা ম্যাডামকে কারা যেন হত্যা করেছে কলেজের ল্যাবের মধ্যে। খবরটা শোনামাত্রই রকিব এবং ওর বন্ধুরা ছুটে যায় ল্যাবের সামনে। অবাক হয় ম্যাডামকে দেখে। ক্ষত বিক্ষত লাশ। সারা শরীরে ছোরা দিয়ে কোপানোর দাগ। লাশটা দেখে মনে হচ্ছে মৃত্যুর আগে তাকে রেপ করা হয়েছিল। আর সে লাশের পাশেই ছোট্ট চিরকুটে লেখা আছে, নাম্বার ওয়ান……….ব্লাডি হান্টার।
রকিব মৃত্যুর এমন ভয়াবহ দৃশ্য সহ্য করতে পারেনা। দু চোখ বেয়ে পানির ধারা নেমে আসে তার। ম্যাডামকে সে খুবই পছন্দ করত। এইতো গতবছর লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছিলেন তিনি। অসম্ভব সুন্দরী ছিলেন ম্যাডাম। রকিবের মনে পড়ে সেই ক্লাসের প্রথম দিনের কথা। সেদিন ম্যাডামেরও ছিল চাকরীতে জয়েনের পর প্রথম ক্লাস। ম্যাডাম ক্লাস নিচ্ছিলেন। রকিবের ক্লাসে যেতে একটু দেরি হয়ে যায়। গায়ে অ্যাপ্রোন ছাড়া এবং জুতা মুজা ছাড়াই ক্লাসে ঢুকে পড়ে সে। ম্যাডাম চেচিয়ে ওঠেন- কি ব্যাপার , তুমি কি প্রাইমারীতে পড়? অ্যাপ্রোন এবং জুতা মুজা ছাড়া ক্লাসে আসা নিষেধ সেটা কি জানোনা? বেরিয়ে যাও। রকিব মাথা নিচু করে সেদিন চলে এসেছিল। পরবর্তীতে ম্যাডামের সাথে ভাল সম্পর্কই গড়ে উঠেছিল তার। আজ খুব খারাপ লাগছে। কে মারল ম্যাডামকে, কেনইবা মারল।
ম্যাডামের হত্যার প্রকৃত খুনীদের গ্রেফতার করা সম্ভব হলনা। ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করল, শোক পালন করল। কিন্তু কিছুদিন পরই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল। রকিব এমন বাস্তবতার মুখোমুখি কখনো হয়নি। নতুন পরিবেশে এসে সে অনেক কিছুই শিখছে।
মেডিকেলের বাকি দিনগুলো খুব ভাল ভাবেই কেটে যায় রকিবের। এখানেও তার মেধার বহি:প্রকাশ ঘটে যখন সে ফাইনাল পরীক্ষায় সবাইকে হটিয়ে প্রথম স্থান লাভ করে। সিমির সাথে আর দেখা হয়না। একজন সুইডেন প্রবাসীকে বিয়ে করে সে এখন সুইডেনে অবস্থান করছে। সিমির বিয়ে হয়ে যাবার পর প্রথম প্রথম রকিবের খারাপ লাগত। এখন আর তেমন লাগেনা।
রকিব এখন একটা বেসরকারী ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত। কিছুদিন আগে বিসিএসের ভাইভাটা দিয়ে এসেছে। হয়তো চাকরীটা হয়ে যাবে। শিক্ষায় দিয়েছে সে। চাকরীটা যদি হয় মেডিকেল কলেজের লেকচারার হয়ে যাবে সে। এমনিতেই বেসরকারী ক্লিনিকটায় অনেক ব্যাস্ত সময় কাটছে তার। এরই মধ্যে সিমি একদিন ওকে ফোন করে জানায় ও এবং ওর হাজবেন্ড ঢাকায় আসছে। রকিবকে নিয়ে সে ঘুরতে চায়। রকিব প্রথমে না না করলেও পরবর্তীতে সিমির পীড়াপীড়িতে রাজি হয়।
এদিকে বিসিএসের রেজাল্ট পাবলিশড হবার পর আনন্দে রকিবের মন প্রাণ ভরে যায়। সে বিসিএসে চান্স পেয়েছে। কিছুদিন পরই নিয়োগ পাবে যেকোন একটি সরকারী মেডিকেল কলেজে। রকিবের ইচ্ছা ঢাকা মেডিকেল কলেজেই যেন যেতে পারে। ঢাকা মেডিকেলের অনেক স্যাররাও চাইছিল রকিবের মত একটা মেধাবী ছেলেকে নিজেদের কলেজে রেখে দিতে। অবশেষে ঢাকা মেডিকেলেই নিয়োগ হয়ে যায় রকিবের।
কিন্তু আবার একটি অঘটন ঘটে গেল। সিমিকে কে বা কারা যেন হত্যা করেছে। ঘটনাটা শোনার সাথে সাথেই রকিব সিমিদের বাড়িতে যায়। প্রিয় বান্ধবীর ক্ষত বিক্ষত লাশ দেখে ডুকরে ওঠে সে। ছোরা দিয়ে কোপান হয়েছে লাশের সর্বদেহ। দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মৃত্যুর পূর্বে তাকে রেপ করা হয়েছে। লাশের কাছেই পাওয়া গেছে একটা চিরকুট যাতে লেখা আছে, নাম্বার টু………..ব্লাডি হান্টার।
রকিবের মন ভাল নেই। বহুদিন পর বাড়ির জন্য মনটা কেমন জানি করে ওঠে। বাবা মার কথা মনে পড়ে তার। বাবাকে যদিও সে এখন রিকশা চালাতে দেয়না। মাকেও দেয়না অন্যের বাড়িতে কাজ করতে। বাবা মার জন্য সে প্রতিমাসে টাকা পাঠায়। আজ কেন যেন তার মা ও বাবাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। খুবই অসহায় মনে হচ্ছে নিজেকে। সে আর দেরি করেনা। ব্যাগটা গুছিয়ে রওনা হয় রাস্তায়। একটা সিএনজি ধরে চলে আসে গাবতলী। সেখান থেকে গাড়ীতে ওঠে খুলনার উদ্দেশ্যে।
বাড়িতে পৌছালেই রকিবের মা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। ওর বাবা ভীষন খুশী হয়। বহুদিন পর মায়ের হাতের রান্না পেয়ে আনন্দে ভরে ওঠে রকিবের মন। রকিবের আনন্দে ওর মা তো বেজায় খুশী। খাওয়া দাওয়া শেষ হয়। রকিব ওর মা বাবাকে নিয়ে একসাথে বসে গল্প শুরু করে। রকিবের সেই পুরানো ছোট বয়স থেকে আজ অবধি সব ঘটনার স্মৃতিচারন করে ওরা। রকিব বলে আর তোমাদের এখানে থাকতে দেবনা মা। এবার আমি তোমাদের ঢাকায় নিয়ে যাব। আর আমিও একটি বিয়ে করব। খুব সুন্দর একটা ফ্লাট ভাড়া করে সবাই মিলে থাকব সেখানে।
রকিবের মুখে বিয়ের কথা শুনতেই কেমনজানি অন্যমনষ্ক হয়ে ওঠে ওর বাবা। অবাক হয়ে রকিব জীজ্ঞাসা করে কি হয়েছে বাবা? ওর বাবা কথা বলেনা। শুধু ওর দিকে তাকিয়েই থাকে। রকিব দেখে ওর বাবার চোখে পানি। আস্তে করে বাবার গায়ে হাত রাখে সে, কি হল বাবা, আমার বিয়ের কথা শুনে তুমি কাঁদছ কেন? দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি রকিবকে বলেন, না বললে যে আমার বড় পাপ হবে। আসল সত্য তোকে বলাটা জরুরী। খেকিয়ে ওঠে রকিবের মা। কি সত্য বলবা তুমি, কি জান তুমি? একথা বলেই কাঁদতে কাঁদতে এসে ওর বাবার মুখ চেপে ধরেন তিনি। বিষ্মিত হয় রকিব। কি সত্য বাবা। আমাকে বল।
* এটা যে বলার নয়, বলে কেঁদে পড়লেন রকিবের মা।
* কি এমন কথা যা নিজের ছেলেকে বলতেও বুক কাপে। বলনা বাবা কি এমন কথা।
* তোকে যে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। সাবলীল ভাষায় বলে ফেলেন রকিবের বাবা। কথাটা শোনার সাথে সাথেই চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠেন রকিবের মা।
অবাক ও বিষ্ময় ভরা দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকায় রকিব। বাবা তখনো বলে চলেছেন ওকে কিভাবে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন তিনি। রকিব বাবার মুখ চেপে ধরে। তারপর বলে, আমি জানিনা আমি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ নাকি খ্রীস্টান। শুধু জানি আমার মধ্যে একটি প্রান আছে তাই আমি প্রানী। আরও সত্য আমার মধ্যে আছে একটা মন, যার জন্য আমি মানুষ। তোমরা আমাকে লালন পালন করেছ। তোমরাই আমার প্রকৃত বাবা মা। এটা ছাড়া আর কিছুই বুঝিনা আমি। বুঝতে এবং জানতেও চাইনা।

তিন
মেডিকেলের লাশকাটা ঘরের মেঝের উপর অর্ধ উলঙ্গ ক্ষত বিক্ষত মেয়েটির লাশ পড়ে আছে। পাশেই একটি চিরকুট। চিরকুটে লেখা আছে, নাম্বার থ্রী………ব্লাডি হান্টার। পুলিশ ভাল করে চারিপাশ পরীক্ষা করে দেখছে। খুনের আলামত খুজে দেখছে তারা। দরজার বাইরে ছাত্রছাত্রীদের উপছে পড়া ভিড়। প্রিয় সহপাঠীর মৃত্যুতে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েছে।
এদিকে কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে চলছে গভীর আলোচনা। কিভাবে খুন হচ্ছে, কে খুন করছে, কেনইবা খুন করছে এসব মেধাবী ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের। পুলিশের কাজের গতি মন্থর। তারা এ পর্যন্ত কোন সন্তোষজনক উত্তরই দিতে পারেনি। খুনী তো ধরা ছোয়ার সম্পূর্ন বাইরে। শিক্ষকরা আর পুলিশের উপর নির্ভর করতে পারছেন না। এভাবে যদি চলতে থাকে তবে নতুন তরুন প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের মেডিকেল কলেজে পড়ার প্রতি আগ্রহই হারিয়ে যাবে। শিক্ষকরা ভীষন চিন্তিত। জরুরী ভিত্তিতে সকল শিক্ষককে ডেকে মিটিং বসান হল। সেখানে আলোচনা করে সবাই নিশ্চিত খুনী এই কলেজেরই কেউ। সে হতে পারে কোন ছাত্র, শিক্ষক, সুইপার অথবা কর্মচারী। অধ্যক্ষের নির্দেশে দ্রুত একটি সিন্ডিকেট গঠন করা হল খুনীকে সনাক্ত করার জন্য। সিন্ডিকেটের প্রধান করা হল ডা: রকিবুল হাসানকে। তার অসম সাহস এবং মেধাই পারবে খুনীকে সনাক্ত করতে।
পুলিশ, র্যাবের পাশাপাশি এবার মেডিকেল কলেজের গঠিত সিন্ডিকেটটিও নেমে পড়ল খুনীকে সনাক্তকরনের জন্য। কিন্তু কোন সমাধানই আসেনা। দেখতে দেখতে আরও ছয় মাস কেটে গেল। খুনের পরিমানও বেড়ে চলল দ্রুত গতিতে। এই ছয় মাসের মধ্যেই দুই জন ম্যাডাম সহ খুন হয়েছে ১১ জন। বিষয়টা আর শুধু মেডিকেল কলেজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলনা। সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ল এমন সিরিয়াল খুনের ঘটনা। প্রশাসনের এবার খুব ভাল করেই টনক নড়ল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত খুনীকে ধরার জন্য প্রশাসনের উপর চাপ প্রয়োগ শুরু করল। কিন্তু কোন কিছুতেই খুনীকে নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব হলনা।
এবার রাষ্ট্রপতির নির্দেশেই সেনাবাহিনীর একজন চিকিৎসক মেজর ডা: হারুনকে নিয়ে গঠিত হল বিশেষ একটি টিম। সেই টিমে কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে থাকল ডা: রকিবুল হাসান। বিশেষ পদ্ধতিতে তারা এগিয়ে যেতে লাগল।
আবারও খুন। এবার খুনটা হয়েছে গাড়ীর ভিতরেই। রাত বারোটার দিকে ক্লিনিক থেকে নিজেস্ব প্রাইভেটে করে বাসায় ফিরছিলেন ডা: ফারিয়া। পথেই তাকে খুন করা হয়েছে। খুনের ধরনটাও একই রকম। প্রথমে শ্বাসরোধে হত্যা করে রেপ করা হয়। তারপর ছোরা দিয়ে সারা শরীরে কুপিয়ে ক্ষত বিক্ষত করা হয়। পাশেই চিরকুটে লেখা আছে, নাম্বার ফিফটিন……….ব্লাডি হান্টার। হত্যার পর থেকে ডা: ফারিহার গাড়ীর চালককে খুজে পাওয়া যাচ্ছেনা। পুলিশ আশা করছে গাড়ীর চালককে ধরতে পারলে খুনীকে হয়তো এবার সনাক্ত করা সম্ভব হবে।
অপরদিকে মেডিকেলের ছাত্রছাত্রীরা ফুঁসে উঠেছে। একের পর এক খুনের ঘটনার পরও কিভাবে খুনী ধরাছোয়ার বাইরে থাকে, কেন পুলিশ তাকে ধরতে পারছে না। এসব নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা এবার আন্দোলনে নেমে পড়ে। তারা কলেজের অধ্যক্ষের রুমে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে প্রতিবাদ, সমাবেশ শুরু করে। পুলিশ এসে বাধা দিলে ক্ষেপে যায় ছাত্রছাত্রীরা। ইট পাটকেল ছোড়াছুড়ি শুরু হয় ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকে। ডা: রকিবুল হাসান এবং অন্যান্য শিক্ষকরা এসে তাদের থামাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু উত্তেজিত ছাত্রছাত্রীরা কোন কথা শুনতে রাজি নয়। তারা শিক্ষকদের উপরও ইট পাটকেল ছোড়া শুরু করে। হঠাৎ একটি ইটের অর্ধেক অংশ এসে লাগে ডা: রকিবুল হাসানের মাথায়। মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে অনর্গল ধারায়। জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে।
ডা: রকিবুল হাসানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। গুরুতর জখম হওয়া মাথায় করা হল সিটি স্ক্যানিং। এদিকে খুব দ্রুতই জ্ঞান ফিরে পেল সে। আসলে তার মাথাটা ফেটে যায়নি, হালকা কেটে গিয়েছিল। তবু সিটি স্ক্যানিং এর রিপোর্টটা দেখা দরকার তার মাথার ভিতর বিশেষ কোন সমস্যা হল কিনা জানার জন্য। সেনাবাহিনীর চিকিৎসক মেজর ডা: হারুন রিপোর্টটা দেখলেন। কিন্তু রিপোর্টটা দেখতে গিয়েই তিনি চমকে উঠলেন। অবাক বিষ্ময়ে তিনি খুব ভাল করেই খুটিয়ে খুটিয়ে পর্যবেক্ষন করতে লাগলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন রকিবুল হাসানের একই মাথার ডান ও বাম পাশে আলাদা আলাদা ভাবে অবস্থান করছে দুটি মস্তিষ্ক। এটা কখনো সম্ভব হতে পারেনা। একই মানুষের একটা মাথার মধ্যে দুইটি মস্তিষ্ক থাকা অসম্ভব। এমন ঘটনা আগে কখনো পৃথিবীতে ঘটেছে কিনা জানা নাই তার। কিন্তু কেমন করে রকিবুল হাসানের মাথার মধ্যে এটা সম্ভব হল। মেজর ডা: হারুন চিন্তায় পড়ে গেলেন। অন্য চিকিৎসকদের ডেকে বোর্ড বসানো হল। বোর্ডে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল ডা: রকিবুল হাসানের মাথাকে ভালভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। খুব দ্রুতই ডা: রকিবুল হাসানের মাথাটা পরীক্ষা করার ব্যাবস্থা করা হল।
অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা নিশ্চিত হলেন যে ডা: রকিবুলের একই মাথার মধ্যে দুইটি মস্তিষ্ক। তার শরীরের যাবতীয় স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুগুলোর প্রত্যেকটি মাথার মধ্যে প্রবেশ করার পর আবার দুই ভাগে বিভাজিত হয়ে একটি মাথার ডান মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে এবং অপরটি বাম মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে যুক্ত হয়েছে। পরীক্ষা করে স্পষ্ট বোঝা গিয়েছে তার দুইটি মস্তিষ্কের একটি সর্বদা সক্রিয় থাকে এবং অপরটি থাকে নিষ্ক্রিয়। তবে তার ডান মস্তিষ্কই সর্বদা সক্রিয় থাকে। কিন্তু তার বাম মস্তিষ্ক যে সবসময় নিষ্ক্রিয় থাকে এমনটা নয়। কারন বাম মস্তিষ্কের সুস্পষ্ট গঠন দেখেই বোঝা যাচ্ছে কখনো কখনো এটাও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
চিকিৎসকরা ডা: রকিবের নিষ্ক্রিয় মস্তিষ্কটাকে সক্রিয় এবং সক্রিয় মস্তিষ্কটাকে সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় করতে চাইলেন। মূলত তারা বুঝতে চাইলেন ডা: রকিবের নিষ্ক্রিয় মস্তিষ্কটি প্রকৃতপক্ষেই কাজ করতে পারে কিনা। এজন্য আবার ডা: রকিবের মাথাটি পরীক্ষার ব্যাবস্থা করা হল।
চিকিৎসকরা ডা: রকিবুলকে অজ্ঞান করে তার মাথার উপর পরীক্ষা শুরু করলেন। একটানা বার ঘন্টা পরিশ্রমের পর চিকিৎসকরা অবশেষে সমর্থ হলেন। রকিবুলের বাম মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকল। চিকিৎসকরা লক্ষ্য করলেন রকিবুলের বাম মস্তিষ্ক সক্রিয় হবার সাথে সাথেই তার দেহের মধ্যেও কেমন হালকা পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। কোন বিশেষ হরমোন নি:সরনের কারনে এমনটা হতে পারে।
কিছুক্ষনের মধ্যেই ডা: রকিবুল জ্ঞান ফিরে পেল। লাফিয়ে উঠল সে বিছানার উপর। দেহে তার আমূল পরিবর্তন এসেছে। চোখ দুটি জ্বল জ্বল করছে। সম্পূর্ন দেহ তার ধূসর বাদামীতে পরিনত হয়েছে। চোখে মুখে হিংস্রতা। সে হিংস্রতা কোন নারীকে খুজে ফিরে চলেছে। এক লাফে সে বাইরে বেরিয়ে যেতে চাইল। সকলে তাকে জোর করে ধরে আবার অজ্ঞান করে ফেললেন। জ্ঞান হারিয়ে বেডের উপর এলিয়ে পড়ল ডা: রকিবুল।
অবশেষে সিরিয়াল কিলারকে সনাক্ত করা সম্ভব হল। চিকিৎসকরা নিশ্চিত হলেন ডা: রকিবুলের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক সক্রিয় হবার সাথে সাথেই সে হিংস্র হয়ে ওঠে। তখন সে ব্লাডি হান্টার নামে খুন করে চলে একে একে নিষ্পাপ নারীদের। সে নিজেও তার এই দ্বিতীয় রূপ সম্পর্কে অবগত নয়। চিকিৎসকরা ধারনা করছে তার দ্বিতীয় মস্তিষ্কের মধ্যে নিশ্চয় এমন কোন হরমোন নি:সৃত হয় যা তাকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যেতে উদ্ভুদ্ধ করে।
পুলিশ ডা: রকিবুলকে আটক করল। কিন্তু চিকিৎসকরা চাইলেন তার মস্তিষ্কের প্রকৃত রহস্য উৎঘাটন করতে। কেন তার মস্তিষ্কের এমন গঠন, কেন তার মধ্যে দুই ধরনের মানুষের বসবাস, তার জন্ম কি বিশেষ কোন ভাবে হয়েছে কিনা এসব জানার জন্য পুলিশের হেফাজতে রেখেই বিদেশে পরীক্ষার জন্য পাঠান হল তাকে। বিদেশ থেকে আসার পর অবশ্যই তার ফাসি হবে। কেননা সে পনেরটি খুন করেছে। আর প্রত্যেকটা খুনই করা হয়েছে ভবিষ্যতের তরুন মেধাবী চিকিৎসকদের।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন