বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ৬৯টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৪২

বকধার্মিক

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

চুপকথা

রহস্যময়ী নারী জুলাই ২০১৬

ধ্বংসপুরের যাত্রী

রহস্যময়ী নারী জুলাই ২০১৬

গ্রাম-বাংলা (নভেম্বর ২০১১)

মোট ভোট ৪২ পথের পরিচয়

আযাহা সুলতান
comment ৪৪  favorite ৬  import_contacts ৬৮৯
সেদিন স্নেহবাংলা আমার মাধুর্য জন্মভূমিরে ত্যাগ করি যখন উঠলেম আকাশযানে উপসাগরের উদ্দেশে, তখন দেখি আমার পার্শ্বাসনে বসা উনিশ-বিশ বছরের এক অতি সুন্দরী ললনা! বেশ কিছু খবরের কাগজ ও কিছু মাসিক-পত্রিকা সামনে রেখেই উদাস মনে কি জানি কী ভাবছে! আমি আসনস্থ হওয়ার পরও তার ভাবান্তর চৈতন্য লাভ করে না! ভাবার তো কথাই, স্বদেশ জন্মভূমি যেমন জননী : আরও কতকি ফেলে যাচ্ছে- মাতা-মাতৃমহ, পিতা-পিতৃমহ; ভাই-বোন কত আপন-জন, আত্মীয়-পরিজন, প্রেমপ্রণয়-ভালবাসা-রাগানুরাগ কতকি! নিজেরও তো সেই দশা- আপনঘর, স্নেহনিবাস, ছত্রিশ হাজার বান্ধব, বাহাত্তর হাজার বান্ধবী; এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার গ্রামবাসীরে এসেছি পশ্চাতে রেখে- বহু পশ্চাতে রেখে। যেন মনে হচ্ছে- সাড়ে দশ কোটি জনতা কাঁদছে আমার লাগি! মেয়েটি কিছুক্ষণ নীরব রইল- আমিও তাই। তারপর নড়াচড়া- আমতা আমতা করে বললাম, পত্রিকা চাই।
ও ঈষৎ হেসে সাদরে অনুমতি দিল। এভাবে শুরু হয় টুকটাক আলাপ- যাবেন কোথায়? আমাকে জিজ্ঞেস করল!
তার পর তুমুল আলাপ : আমার জবাব- এমিরাটস্।
-কোন্ উদ্দেশ্যে?
-উপার্জনে।
-এই প্রথম যাত্রা?
-বেশ কয়েকবার।
-সেখানকার পরিস্থিতি ও জনভক্তি কেমন?
-তেমন সুবিধা নয়।
-তা হলে...?
-কী করি : উপায় নেই-
তার পর প্রশ্নসূত্র আমার- আপনার সম্পর্কে কিছু বললেন না?
-কী বলি?
-যাচ্ছেন কোথায়? একা কেন?
-যাব কানাডা। পুরো পরিবার সেখানে। এসেছিলেম কাকার পরিণয়ে। মা-বাবারা চলে গেছে মাসের মধ্যে। আমি আজ এক শ একষট্টি দিনে ফিরলাম-
-সেখানকার লোকেরা কেমন?
-আমি বলব না সবাই একেবারে ভাল। ভাল-মন্দ সবখানেই আছে। তবে-
-তবে?
-আমাদের দেশের তুলনায় বলতে গেলে, শতকরা নিরানব্বই জনকেই ভাল বলতে হয়।
-স্বদেশ সম্বন্ধে এমন ধারণা কেন?
-জন্ম থেকেই স্বদেশকে কখনও চোখে দেখি নি! তবে পত্রপত্রিকায় ও বেতার-টেলিভিশনে যা শুনতাম এবং দেখতাম তাতেও কখনও কান দিই নি; সুতরাং আজ বাস্তব চিত্রটাই দেখে যাচ্ছি!
-অর্থাৎ?
-কি আর বলি! বলার তো রাহায় নেই। দীর্ঘদিন প্রবাসে বসবাস করে স্বদেশের প্রতি যে একটা মমত্ব গড়ে উঠেছিল, সেটা নিমেষেই মাটি করা হল!
-মানে?
-অতি ধূমধামে কাকার পরিণয় সম্পন্ন হল। সবেমাত্র নববধূ ঘরে এল। আমি বধূর পাশে বসা। হাসি-উলস্নাস-আনন্দোৎসব চলছে : বেলা বারটা। কখনও কখনও ভোজনের ডাক পড়ছে-কেউ কেউ খাচ্ছে, কেউ কেউ খেতে বসছে; কেউ কেউ কথোপকথনে রত এবং কেউ কেউ এদিক-ওদিক ঘুরাফেরা করছে। এমন সময় হুড়মুড় করে একদল সশস্ত্র বাহিনী বাড়িতে প্রবেশ করে! আমি নব কাকিমার কানে-কানে বললাম : কোথাও যুদ্ধ বাধল নাকি?
কারণ, আমি যুদ্ধভিত্তিক একটা গ্রন্থ পড়েছিলেম, সেখানে গুপ্তচরদের এমন কর্মকাণ্ড ছিল।
কাকিমা লজ্জা ত্যাগ করে বলল : চুপ রও, এরা সন্ত্রাস।
-সন্ত্রাস! আসলে শব্দটা আমার অত পরিচিত নয়। কাকিমা বুঝিয়ে বলল- ‘টেররিষ্ট’। আমার খুব ভয় লেগে গেল। কারণ ক্রিমিন্যাল কখনও আমি নিজচোখে দেখি নি...
বাড়িতে অতিথি ভরপুর। সবাই ফ্যালফ্যাল করে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। কারও মুখে সাড়াশব্দ নেই। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবী বিবর্ণ হয়ে গেল! ওরা বাবাকে ও কাকাকে ডেকে নিয়ে গেল! বাড়িতে মাতম পড়ে গেল! দিদিমা আহাজারি করতে করতে বেহঁশ হয়ে পড়লেন! মায়েরও একই দশা- তবে হুঁশ ছিলেন। দুই ঘণ্টা পর বাবা ফিরে এলেন! সবাইকে সান্ত্বনা দিয়ে ঘটনা বলতে লাগলেন...
কী চায়? ঘনিষ্ঠ একজন জিজ্ঞেস করলেন।
‘টাকা।’
‘কত?’
‘পঞ্চাশ...’
‘পঞ্চাশ- ?’
‘পঞ্চাশ লক্ষ।’
‘পঞ্চাশ লক্ষ!’
সকলে আশ্চর্য অনুভব করল। অত টাকা দেওয়ার ক্ষমতা বাবার ছিলেন না। কেউ কেউ বললেন, থানায় খবরটা দেওয়া হোক। কেউ কেউ বললেন, কোনও লাভ হবে না। সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী নাকি আমাদের দেশের পুলিশ? তারা নাকি টাকা ছাড়া কিছুই চিনে না! বাবার মুখে সব সময় একটা কথা শুনতাম- ‘যেই দেশের প্রশাসন দুর্বল হয়, সেই দেশের জনগণ নিরাপদ নয়। সেই দেশে ক্রাইম উত্থান হওয়াটা স্বাভাবিক। এমন দেশে বসবাস করার চেয়ে বনবাস শ্রেয়।’
-বেশ তো...তারপর?
-দিনের পর দিন গড়িয়ে যেতে লাগল, টাকার ব্যবস্থা হচ্ছে না; বাবা পাগলপ্রায়!
কানাডা থাকে : তার মানে এ নয়, টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন। আমাদের ঠাকুরদা নেই। তিনি খুব দরিদ্র ছিলেন। বহু বছর পূর্বেই দেবলোক গমন করেছেন। অনেক কষ্ট করেই বাবা এতটুকু মানুষ। চাকরি করে যা পেতেন, তা ব্যয়বহুল সংসারের ব্যয়বহনপর সঞ্চয় করবার মতো অতিরিক্ত থাকেবা আর কতুটুকু! এর মধ্যেও যতটুকু সঞ্চিত হয়েছে : ভিটাবাড়ি ভূ-সম্পদ সবটুকু বিক্রি করেও তাদের দাবি পূরণ হওয়ার মতো নয়। তার পরেও বাবা সবকিছু বিক্রি করে দিলেন! উদ্বৃত্ত রইল শুধু ভিটেবাড়িখানা।
অনেক কষ্টের বিনিময়ে মাত্র বিশ লক্ষ টাকা যোগাড় করতে পারলেন বাবা। রোজ তাদের কাছ থেকে একটা করে চিরকূট আসছে, ... ...কী হল? মনে হয় ভাইয়ের মায়া নেই? আর মাত্র... ...তারপর তাকে... ...
বাবা মত্ত হতে লাগলেন। কোনও সুরাহা খোঁজে পাচ্ছেন না। বিশ লক্ষ টাকা ওদের কাছে পৌঁছে দিলেন, এবং বললেন : বাকিগুলোর জোরদার ব্যবস্থা চলছে, অচিরেই পৌঁছে দেওয়া হবে; তবে অলখকে যেন আজই মুক্তি দেওয়া হয়।

কাকার নাম ‘অলখ পাল’। কানাডা ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিসাহিত্যে এম এ পাস করেন। বাবার আগ্রহ ছিলেন, নিজদেশের কোনেক সম্ভ্রানত্ম পরিবার থেকে কাকাকে বিয়ে করাবেন। সো তাই করা হল। কে জানে, এই বিয়ের জামা কাকার মৃত্যুপরিধান হবে!
-তা হলে! ... ...?
-হাঁ, বিশ লক্ষ টাকার বিনিময়েও কাকাকে তারা রেহাই দিল না! এমনকি ওঁর লাশ পর্যনত্ম ফিরিয়ে দিল না! ঘটনাটা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল, তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করল; পেপার-পত্রিকা হতে শুরম্ন করে এমনকি রেডিও-টেলিভিশনেও প্রচার হয়ে গেল। তারপর কী হল। এর মধ্যে কোন একটা অপরাধীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হল না!
অপরাধীরা রীতিমতো বাবাকে হুমকি দিচ্ছে : মামলাটা যেন দ্রম্নত নিষ্পত্তি করা হয়, অন্যথা পরিবারের কাউকে রক্ষা নেই!
পুত্রশোকে দিদিমা হার্টএ্যাটেক করে মারা গেলেন! মা কাঁদতে কাঁদতে উন্মাদ হতে লাগলেন! কাকিমাও একপল বাঁচতে চাইছে না! বললেন, আমরা হিন্দু বলে এমন জোরজুলুম!
বাবা আরও অসহায় হয়ে পড়লেন; একেবারে ভেঙে গেলেন। সেদিন দেখেছি বাবার চোখে স্বদেশের প্রতি ঘৃণা! অথচ ওঁ একজন দেশপ্রেমিক।

অতঃপর ক্রদ্ধ হয়ে সবাইকে নিয়ে চলে গেলেন কানাডা। আমাকে জোর করে কাকিমা রেখে দিলেন। বাবার ইচ্ছা, আমাদের কাউকে একমুহূর্তের জন্যেও এখানে রেখে যাবেন না; কিন্তু কাকিমার অবস্থা দেখে মত পরিবর্তনে বাধ্য হলেন- আমরা কাকিমার বাপের বাড়ি চলে গেলাম।
-আপনার একটা কথার সঙ্গে আমার দ্বিমত আছে।
-সেই কেন?
-অনুমতি দিলে বলতে পারি।
-বলুন।
-আপনার কাকিমার সঙ্গে আমি একমত হতে পারছি না।
-যেমন?
-এই যে, একটু আগে বললেন আপনার কাকিমার ভাষ্য ‘হিন্দু বলে এমন জোরজুলুম’ কথাটা আদৌ সত্য নয়। আসলে অপরাধীদের কাছে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান জাতিভেদের কোনও ভেদাভেদ নেই; ওরা চিনে কেবল অর্থ, শুধু অর্থ।
-তা হলে কি সামান্য অর্থের জন্যে কাউকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করবে! তারা কি জানে না, মানবহত্যা যে কত বড় অপরাধ এবং কত বড় পাপ!
-জানবে না কেন, যারা অপরাধী তারা করে; তারা তো আর পাপপুণ্যের হিসাব করে চলে না।
-আমার মতে, ওদেরকে পশুত্বের পরিচয় দেয়াও প্রযোজ্য নয়; কারণ পশুরাও একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আপনজনের প্রতি এদেরও একপ্রকারের দরদ আছে- মায়া আছে-
-কথাটা নেহাত সত্য। অপরাধীদের কাছে বন্ধুবান্ধব, আপনজন ও আত্মীয়স্বজন বলতে কোন পরিচয় নেই। যারা অপরাধী তারা আজীবন অপরাধই করে...
-তা হলে এখানেই আমার দুয়েকটি প্রশ্ন : ওরা অপরাধী হয় কেন? অপরাধ করে কেন? ওদেরকে লালনপালন করছে কারা? অর্থ যোগান দিচ্ছে কারা? সবচেয়ে বড় অপরাধী তো তারাই! আর আমাদের দেশের সরকার এসব অপরাধজগৎকে সমূলে উৎখাত করতে পারছে কেন?
-সরকারের পক্ষে হয়তো তা অসম্ভব?
-অসম্ভব! তা আমি কিছুতেই মানতে পারি না; কোন দেশের সরকার দুর্বল হতে পারেন না। সরকার ইচ্ছা করলে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গোটা দেশকে লৌহদণ্ডের ন্যায় ঋজু করতে পারেন। পারেন কি না?
-অবশ্যই পারেন। কিন্তু-
-কিন্তুর কোন মানেই নেই। ছোট্ট একটা গল্প বলি শুনুন : এক ভদ্রলোকের একটি অপূর্ব ফুলের বাগান ছিলেন।
সন্তানসম যত্ন করিয়া লোকটি বাগানটিকে দিন দিন পরিপূর্ণ করিয়া গড়িয়া তুলিতে লাগিলেন। বাগানটি যখন একদিন পরিপূর্ণ রূপ ধারণ করিলেন, তখন তাহাকে একজন মালির হস্তে সোপর্দ করিয়া ভদ্রলোক প্রবাস গমন করিতে বাধ্য হইলেন। কয়েক বৎসর কাটিয়া যাইবার পর, একদিন মনে পড়িল তাঁহার অপূর্ব বাগানটির কথা। বড়ই বাসনা হইল স্বহস্তে মানুষ গড়া বাগানটিকে একবার দেখিতে। একদিন দেখিতে আসিয়া দেখিলেন : সেই ভরপুর যৌবনপ্রাপ্ত বাগানটি আর সেইরূপ নাই! একেবারে অন্তিমশয্যায় শয্যাশায়ী হইয়া গিয়াছে। ইহা দেখিয়া তাঁহার চিত্ত বিদীর্ণ হইয়া গেলেন। দুঃখ প্রকাশ করিয়া- সঙ্গে সঙ্গে মালিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, একি অবস্থা! ... ...?
অবস্থার কথা মালি বিনয়ীকণ্ঠে ব্যক্ত করিলেন- হুজুর! ...
-শত্রু! কেমন শত্রু?
-একেবারে গৃহশত্রুসদৃশ।
-ঘরে যে প্রথম শত্রু জন্ম নিতেছিল তখন তুমি কোথায় ছিলে? একমাত্র শত্রুকে দমন করা সহজ; কিন্তু অসংখ্য শত্রুকে দমন করা কঠিন।
-হুজুর! বহু কীটনাশক- ব্যবহার করেছি, কোন ফল হল না : একটু দমন হলে- পুনরায় তুমুলাকারে বেড়ে উঠে।
-এখন তো তোপকামানেও কিছু করা সম্ভব না, সুতরাং এভাবে বাড়তে থাকলে তোমারও বিপদ আছে; কোনেক সময় তোমাকেও আক্রমণ করতে পারে।
-হুজুর! তা হলে সুরাহা?
সেই ষোড়শী যুবতীর ন্যায় ভরপুর যৌবনপ্রাপ্ত বাগানটি আর তাহার হারানো যৌবন ফিরিয়া পাইতে পারিবে না, বরঞ্চ শত্রুহস্তে লাঞ্ছিত হইয়া তিলে তিলে মরিতেই হইবে; তাহা দেখিতে পাইয়া ভদ্রলোক দাহ্য মনে করিলেন, রাগান্বিত হইয়া মালিকে হুকুম দিলেন যে, দাবাগ্নিসম দহন করিয়া অনতিবিলম্বেই বাগানটিকে যেন সম্পূর্ণ ভস্মসাৎ করা হয়। আর এমনিভাবে দগ্ধ করিতে হইবে যে, যাহাতে কোন শত্রু অর্ধমৃত হইয়া বাঁচিয়া থাকিতে না পারে।

-এই থেকে বুঝা যায় যে, কোন দুষ্ক্রিয়া মাথা তুলে দাঁড়াতেই তাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে।
-নিশ্চয়; তবেই দেশের মঙ্গল, দশের মঙ্গল।
-অপরাধ এমন একটা জিনিস যেটা সব সময় অন্ধকারেই চলতে সক্ষম, যেইমাত্র আলোর সম্মুখীন হয় তখন আর ক্ষমতা থাকে না।
-অপরাধ এবং অপরাধী দুটোকেই আমি ঘৃণা করি।
-আপনি বা কেন, সকলেই ওদের ঘৃণা করে; কিন্তু ঘৃণাই এর সমাধান নয়। যেখানে তোপকামানের প্রয়োজন সেখানে ইট-পাটকেল দিয়ে কী হবে? যুদ্ধ করে পরাজয় স্বীকার করার চেয়ে আগেই আত্মহত্যা করে মরে যাওয়া ভাল।
-এই ফাঁকে একটা কথা বলি?
-বলুন।
-আমাদের দেশকে কোন একদিন একমাত্র শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসাবে পেতে পারি না?
-একমাত্র! সেই আকাশকুসুম কল্পনা না করাটাই ভাল। স্বর্গরাজ্যও আজ নরক হতে চলেছে- সুতরাং পৃথিবীটা দিন দিন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।
-বটে। তবে পৃথিবীতে এখনও অনেক রাজ্য আছে, যা স্বর্গ চেয়ে অন্যূন। যেমন, মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে বলতে হয় : তারা আজও স্বর্গরাজ্যে বসবাস করছে?
-অবশ্য করছে! তবে আজ নাহয় কাল তাদেরও একদিন গণতন্ত্রে ফিরে আসতে হবে।
-অবশ্য আসতে হবে; কারণ গণতন্ত্র এমন এক মাধ্যম, যেখান থেকে দেখলে মানবাধিকার অতি স্পষ্ট দেখা যায়; কিন্তু রাজতন্ত্রে তা অস্পষ্ট?
-তা সত্য এবং সত্যকে মিথ্যার পদতলে কখনও পিষ্ট করা যায় না।
-তবে এটাও সত্য, ইউরোপ আমেরিকার বেশকিছু দেশকে এখনও নিঃসন্দেহে স্বর্গ বলা যায়।
-নিশ্চয়; তন্মধ্যে কানাডার নাম আমি প্রথম সারিতে উল্লেখ করতে পারি?
-অবশ্যই পারেন।
-কত বছর ধরে আপনারা সেই দেশে অবস্থান করছেন?
-প্রায় একুশ-কি-বাইশ...। মায়ের বক্তব্য : কানাডা আসার দুই বছর পর আমার জন্ম হয়।
-তা হলে কি আপনার জন্মভূমি সেটাই মানা হবে?
-হতে পারে না; জন্ম যেখানেই হোক না কেন, জন্মভূমি শুধু নিজের দেশকেই মানা হয়। আজ না হয় কাল বা কোন একদিন পরদেশ ত্যাগ করে স্বদেশ ফিরে আসতেই হবে।
-শুনলাম নাকি ইউরোপ আমেরিকার প্রবাসীদের একটা জিন্দেগি আছে।
-কেন নয়, অবশ্যই আছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে...?
-এখানে তো আমরা যাযাবর...
-যেখানে যা-ই হোক...স্বদেশ স্বর্গতুল্য...নয় কি?
-কেন নয়। বেশ বলেছেন, আমার অন্তরের গভীরতা আপনি ছুঁয়ে ফেলেছেন। আমারও এই উক্তি। কিন্তু অনেকে মানতেই চায় না...
-তাও মিথ্যা নয়। তবে নিজদেশের প্রতি সকলেরই স্বতন্ত্র একটা টান, স্বতন্ত্র একটা মমত্ব অবশ্য থাকে; যা কিছুতেই ক্ষুণ্ন হয় না।
-এস্থলে একটি কবিতা আবশ্যিক :-

কত প্রিয় মাতামাতি
কত বন্ধু, কত সাথি
কত আপন-জন-স্বজন
কত প্রেমপ্রণয়, কত প্রিয়জন
কত হাসি-কান্না-গান
কত স্নেহের টান : মুক্তপ্রাণ
মমতার ভাণ্ডার : বলতে নারি-
স্বরাজ্যের রাজেশ্বর আমি পরদেশে ভিখারি।

-নিজদেশের প্রতি দেখছি আপনার বড়ই টান! একেবারে আমার বাবার মতো।
-সে তো সকলেরই থাকা চাই। যে নিজের দেশকে ভালবাসে না, সে তার মাকে ভালবাসে না।
-এই কথাটা তবে আমার বাবারও- স্বদেশ স্বর্গতুল্য; স্বদেশকে ভালবাসা সকল নাগরিকের কর্তব্য।
-স্বদেশে এসে এত বড় একটা আঘাত পেলেন! এর পরেও স্বদেশের প্রতি-
-তা তো থাকবেই, হাজার হলেও নিজের দেশ। নিজসন্তান যত বড় অপরাধই করুক না কেন, তাকে যেমন ক্ষমা করতেই হয়; তদুরূপ, নিজদেশ যত আঘাতই দান করে-না কেন, তায় ভুলতে হয়।
-বেশ তো। তা হলে, দেশের অন্যান্য দিক দিয়ে আপনার কেমন লাগল?
-যেমন?
-সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক-
-সামাজিক ব্যাপারটা কেমন যেন একঘেয়েমি মনে হল। কেউ কারও প্রতি সহানুভূতিশীল নয়! মানসম্মান ও আদরস্নেহ যেন একেবারে সমাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে!
আর রাজনৈতিক ব্যাপারস্যাপার : রাজনীতি আমি মোটেও বুঝি না। এর মানেটা কী। নিশ্চয় রাজাদের চালচলন? তাই যদি হয়, তা হলে আজকালকার রাজাদের আচারাচরণ এমন কেন? কে কাকে মেরে : আঘাত করে উপরে উঠবে তার প্রচেষ্টায় নিত্য উন্মুখ! আর যেখানে রাজাদের শান্তি নেই, সেখানে প্রজাদের শান্তি কী করে হতে পারে! রাজারা হচ্ছে প্রজাদের আশ্রয়স্থল। তাই আশ্রয়স্থলে যদি হিংসা-প্রতিহিংসার অনল হাওয়া বইতে থাকে, সেই ঈর্ষানলে কেবল আশ্রয়স্থল ভস্মান্ত হবে না, সুতরাং আশ্রিতরা আগেই ভস্মিত হবে। এ রাজনীতিকে আজ এমনভাবেই দুর্নীতিয়ে গ্রাস করে আছে; যেখানে দাঁড়িয়ে সুনীতি কেন, সামান্য নীতির কথাও কল্পনা করা সম্ভব নয়।
রইল অর্থনৈতিক ব্যাপার : মানবজীবনে অর্থের কী প্রয়োজন সেইটা বুঝাবার জন্যে কোনও পণ্ডিতের শরণাপন্ন হওয়ার গরজ পড়ে না; দোলনার ঘুমন্ত শিশুর হাতে টাকা গুঁজে দিলে সেও তা আঁকড়ে ধরে। অর্থ এমন এক বস্তু, যার জন্যে মানুষ নরকে ঝাঁপ দিতেও এক-পা-কাড়া! তার একমাত্র কারণ- ‘দারিদ্র্য’। তবে এ-ই দারিদ্র্যের কবল থেকে রক্ষা পেতে হলে, অর্থনীতি সবল অত্যন্ত জরুরি। আর যেদেশের অর্থনীতি প্রায়ই দুর্বল থাকে, সেদেশে দারিদ্র্যবিমোচন আদৌ সম্ভব নয়। এবং অর্থনীতি জোরদার করতে হলে বড় চোরদের দমন চাই-ই চাই...
-আমাদের দেশের অর্থনীতি কোনদিক দিয়ে কম নয়; তবে একটা কানাপাত্রের মতো।
-বটে। তবে পৃথিবীতে অসম্ভব বলতে কিছু নেই; মানুষ সবকিছুই করতে পারে। মনকে আপনি যেভাবেই চালাবেন মন সেভাবেই চলবে : আপনার নিয়ন্তা কিন্তু বিধাতা- আপনি বিধানের কর্তা- আপনার মনের নিয়ন্ত্রণকারী আপনি-

-বহুক্ষণ আলাপ হল আপনার নামটা তবে এখনও জানা হল না!
-আপনি জিজ্ঞেস করলেই তো : ‘নীলিমা স্মারক পাল’।
-সুন্দর! অতি সুন্দর! একেবারে দেশের নাম। আপনারা...?
-দুই ভাই- দুই বোন : সবাই আমার কনিষ্ঠ- আমি জ্যেষ্ঠ। আপনার নাম?-
-আমার নাম ‘দোলন’। আমরাও দুই ভাই, দুই বোন; আমিও সকলের বড়।
-কী আশ্চর্য! ...যদি কিছু মনে না-করেন।
-সেই কেন?
- আপনার সাক্ষাৎ বেশ ভাল লাগল : ঠিকানাটা চাই- ঢের অবকাশ আছে আমার- চিঠিপত্রই একমাত্র মাধ্যম...
-অবশ্য...
এভাবে পাঁচ ঘণ্টা আলাপের পর এসে পড়ল আমার বিদায়ের পল। যার সঙ্গে কোন পরিচয় নেই, যাকে কোনদিন দেখি নি; তার সঙ্গে হয়ে গেল চিরপরিচয়! যেন শতাব্দীর সঙ্গিনী আমার : বন্ধু বা বান্ধবী আমার! আমি যাত্রা সমাপ্ত করলাম; কিন্তু নীলিমার আলাপ- নীলিমার কথা- নীলিমার হাসি- নীলিমার চাহনি- নীলিমার শালীনতা সমাপ্ত হল না, অহরহ আমার সাথে-পশ্চাতে চলছে প্রেমিকার মতো।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মগজ ধোলাই.কম
    মগজ ধোলাই.কম হুনলাম ওই সুন্দরী ললনারে নিয়া আফনে বিদেশ যাইতাছেন! মাগার দেইখেন আমাগোরে ভুইল্লা যাইয়েন না। গল্পডা তো ফাডাফাডি অইলো।
    প্রত্যুত্তর . ২৪ নভেম্বর, ২০১১
  • দিগন্ত রেখা
    দিগন্ত রেখা আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অনেক দূরে
    তবুও থাকবে তুমি আযহা সুলতান অনেক মানুষের ভিড়ে
    একটি চেনা মুখ
    আমাদের প্রিয় বন্ধু তুমি।
    তোমাকে হাজার সালাম
    তোমার নামটি প্রিয়তে নিলাম।
    প্রত্যুত্তর . ২৪ নভেম্বর, ২০১১
  • আযাহা সুলতান
    আযাহা সুলতান মোশাররফ ভাই, সালমা বোন, মগজধোলাই ও দিগন্তরেখা বন্ধু আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ এবং আন্তরিকতা......
    প্রত্যুত্তর . ২৭ নভেম্বর, ২০১১