বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৩
গল্প/কবিতা: ৫টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

তুমিক্ষমা করোনা

মা মে ২০১১

তোমার চরণ ছোঁব শতবার; ক্ষমা করো এই অধমেরে

মা মে ২০১১

একটি বোমা হামলা পরবর্তী মানসিক জটিলতা

বিশ্বকাপ ক্রিকেট / নববর্ষ এপ্রিল ২০১১

স্বাধীনতা (মার্চ ২০১১)

নিঃসঙ্গতা

বাবুল হোসেইন
comment ৩৩  favorite ২  import_contacts ৫৯৭
একতলা বাড়ী। গলির শেষ মাথায়, সব কটি বাড়ী ছাড়িয়ে, কিছুটা নিঃসঙ্গ তালগাছের মত একা দাঁড়িয়ে। এবং আশ্চর্য্য হলো, বাড়ীর মানুষগুলোও এক একেকটা নিঃসঙ্গতায় মোড়ানো মৃতপ্রায় বৃক্ষের মত। বাড়ীতে বাস করেন দুইজন মাত্র মানুষ। একজন বয়স্কা, বৃদ্ধা বলা যায়, আরেকজন অর্ধ-বয়স্কা, প্রায়-বৃদ্ধা। দুজনেই ভীষণ ত্যাগী। দুজনেই একই মানুষের শোকে কাতর, কিন্তু অনুভূতিগুলো ভিন্ন মাত্রার। একই মানুষের স্মৃতি দুজনেই বহন করে আসছেন দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে কিন্তু আশ্চর্য রকম নিস্পৃহ আর শীতল; জমানো বরফের মত অনড়, দৃঢ়; একটু উষ্ণতা পেলেই যেনো গলে যাবে!

বিলকিস বানু। বয়স সাতাত্তর। এখনো মনে দৃঢ়চেতা, স্বাধীন আর নিজের দেখভাল করার মত সামর্থ্যবান। বাড়ীতে দুজনমাত্র মানুষের জন্য অতিরিক্ত একজন মানুষ রাখা ঝামেলা বলে নিজেই বাজার সদাই করে নেন এদিক ওদিক থেকে, আর বেশী ঝামেলার কাজগুলো; ইলেকট্রিক বিল এবং এ জাতীয় বিষয়গুলো আগে তিনিই দেখতেন, কিন্তু অতিরিক্ত সময় লাগে বলে ইদানিং নিজের এক ভাইপোর ছেলেকে দিয়ে করিয়ে নেন। আরেকজন শাহানা বেগম; নিজের পুত্রবধু। কিন্তু এতদিন পরে সেটা আর পুত্রবধূর পর্যায়ে থাকেনি। মনে হয় নিজের খুব কাছের বন্ধু, একাকীত্বের সঙ্গী আর সুখ-দুখ ভাগাভাগির একান্ত আপনজন। তাই তাদের মধ্যে মান-অভিমান থেকে ভাব-ভালোবাসাটাই যেনো প্রকট। এতদিন পরে দুজনের কেউ আর খুঁজেন না সম্পর্কের রকমফের, বরং এইটুকু দুজনেই বুঝেন আজ আর তারা বিশেষ কোন সম্পর্কের গণ্ডিতে আটকা নেই, তারা দুজনই পরস্পরের সাথে মিলেমিশে একাকার এক মানুষে পরিণত হয়েছেন।
সদ্য কৈশোর শেষ করা টগবগে তরুণ রাফি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবে হবে এমন সময় দেশে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। বন্ধু-বান্ধবরা সবাই যে যেদিকে পারে দেশমাতৃকার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে দেখে নিজেও স্বপ্ন দেখতে লাগলো একদিন যুদ্ধে যাবার। মা তাকে আগেই আটকে ফেলেছেন বিয়ে দিয়ে সাহানার সঙ্গে। বয়স হলে ছেলেরা উচ্ছন্নে যায়, তাই কম বয়সেই ছেলেকে বিয়ে দিয়ে নিজের পছন্দমত বউ ঘরে তুলেছেন। নিজেদের মধ্যে জানাশোনা ছিলো আগেই, তাই কোন ঝামেলা ছাড়াই বউ করে তুলে এনেছিলেন সাহানাকে। রাফির কোন ইচ্ছে-অনিচ্ছা ছিলো না। মার ইচ্ছের প্রতি পূর্ণ সমর্থন রেখেই সে বিয়ে করেছিলো। মাকে বোঝানো গেলেও সাহানাকে বোঝানো মোটেও সম্ভব নয়। তাছাড়া সাহানাকে কে বোঝাতে যাবে যুদ্ধের কথা। তাই সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় কাউকে না বলেই যুদ্ধে চলে যাবে। কিন্তু এ পরিবারে সেই একমাত্র পুরুষ মানুষ, যুদ্ধের সময় কে কিভাবে থাকবে তার নিশ্চয়তা নেই, মাকে আর সাহানাকে কে দেখবে। তাছাড়া এখানেও যে যুদ্ধের আগুন জ্বলবে না সেটা কে জানে? তখন কে দেখবে তাদের? তাই সে মাকে ও সাহানাকে জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে সাহানার প্রতি অতিরিক্ত কেয়ারিং মনোভাব নিয়ে এটা ওটা জিজ্ঞেস করতেই ধরা পড়ে যায় সাহানার কাছে। তাছাড়া মা এমনিতেই কিছু একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলেন ছেলের হাবভাবে। মার চোখ ফাঁকি দেয়া অনেক কঠিন। পান থেকে চুন খসলেই মা টের পান। আর এতো বিশাল পরিবর্তন। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য যে মানসিক দৃঢ়তা প্রয়োজন, সবই সে তৈরি করে ফেলেছে এই কদিনে। তাই তার মনের মধ্যে এক সুখ সুখ চঞ্চলতা খেলা করে যাচ্ছে, মা সেটা খুব সহজেই বোঝে ফেলেন। মা তাকে ডাকেন সাহানাকে সহ।
-দেখো, তোমার বাবা নেই। এ বাড়িতে তুমিই একমাত্র পুরুষ মানুষ, অভিভাবক। এবং দুজন মহিলা তোমার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু দেশের যে পরিস্থিতি এখন তাতে তোমাকে বারণ করাও যায় না, আবার বলাও যায় না যুদ্ধে যাও। এখন তুমিই বলো তুমি কি করবে?
--আমি আসলে ঠিক কি করবো বুঝতে পারছি না মা। আমার ঠিক কি করা উচিৎ আমি জানি না।
-আমি যথেষ্ট সামর্থবান আছি, ঝক্কি ঝামেলা আমি সামাল দিতে পারবো কিন্তু সাহানার দেখভাল কে করবে।
সাহানা তখন মাত্র সদ্য বিবাহিত। তখনো ভালো করে চেনাজানা হয়নি। কিন্তু দেশের যে অবস্থা তাতে স্বামীকে ঘরের ভিতর আটকিয়ে রাখা যায় না। নিজের সুখটা অনেক তুচ্ছ এখন, এখন চিন্তা করা দরকার জাতীয় সুখের।
---আমার কোন আপত্তি নেই মা, আমি আপনার সঙ্গে থাকতে পারবো। তাছাড়া আমরাতো বাড়িতেই আছি। আপনার ছেলেকে যুদ্ধে যেতে বলেন।
মার মনটা হুহু করে কেঁদে উঠলেও নিজের চোখর পানি গোপন করে, ছেলে ও ছেলের বউকে বুঝতে না দিয়ে হাসিমুখে ছেলেকে যুদ্ধে পাঠানোর সব বন্দোবস্ত করে দেন--
- দেশের এখন হাজার হাজার ছেলে দরকার, তাই তোমাকেও দেশের ছেলে বানিয়ে যুদ্ধে পাঠালাম। মায়ের সম্মান নিয়ে ফিরবে, মাকে কখনো অশ্রদ্ধা করবে না। আমি সাহানাকে নিয়ে ভালো থাকবো। চাইলে সাহানা তার বাবার বাড়ী গিয়েও থাকতে পারবে। তুমি আমাদের জন্য চিন্তা করো না।
দুচোখের জলে একাকার বিলকিস বানু সরে গিয়েছিলেন ছেলের সামনে থেকে। সাহানা তখন স্বামীকে প্রেরণা দিচ্ছে,
--- তুমি ভালো থাকবে, দেশ স্বাধীন হয়ে গেলেই আমরা নতুন করে সাজাবো আমাদের নতুন সংসার। নতুন দেশে নতুন সংসার হবে আমাদের। এ যে পরম পাওয়া হবে!!

যুদ্ধ চলছে। চলমান যুদ্ধে রাফি যোগ দেয় আরো কয়েকজন সহ। বন্ধুদের দেয়া তথ্যমত সে আগেই যোগাযোগ করে চলে যায় যুদ্ধের ময়দানে। মনের মধ্যে একরাশ চিন্তা মা আর সাহানার জন্য। কিন্তু দেশও তো কম না। দেশের জন্যও কিছু করা দরকার। এখন সবচেয়ে বড় সময় দেশের জন্য কিছু করার। তাই চিন্তা বাদ দিয়ে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে সে। ভালোবাসা থাকলে যে কোন কিছু ত্যাগ করা যায় অনায়াসে। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকলে পিছুটান কখনো আটকাতে পারে না সামনে থেকে। যুদ্ধে মনোযোগ দেয় রাফি। এখন এত ভাবার সময় নেই। মাঝে একবার মাকে ও সাহানাকে দেখতে গিয়েছিলো অল্প সময়ের জন্য। তাতেই মা ও সাহানা ভীষণ খুশী হয়েছেন। যদিও সাহানা স্বামীকে একান্ত করে পায়নি, তাতে কি। দেখা তো হয়েছে। কতদিন সাহানা দেখেনি এই চাঁদ-বদন মুখ। সে তো নিজের সংসার স্বাধীন দেশেই সাজাবে, তাই এত তাড়া নেই তার। রাফিকে সাহানা বলেই দিয়েছে দেশ স্বাধীন হলেই তারা নতুন সংসার গোছাবে। এখন তাই এই তুচ্ছ জিনিস নিয়ে না ভাবলেও চলবে তার। তাই নিজেকে শাসন করেছে নিজেই
---সবুর করো মন। আর তো মাত্র কটা দিন? তারপর সদ্য জন্ম নেয়া স্বাধীন দেশের মুক্ত বাতাসে তুমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিবে আর সুখের স্বপ্নে মগ্ন হবে।
একটা অপারেশনে সামনা সামনি পড়ে যায় রাফির দল। বেকায়দায় পড়লে কি কি করতে হবে তার ট্রেনিং নেয়ার মত সময় রাফি পায়নি। মানে সময় ছিলো না। প্রথমদিন-ই যুদ্ধে গিয়েছিলো সে ট্রেনিং না নিয়েই এবং তার দক্ষতা দেখে ক্যাম্পের সবাই এত খুশী হয়েছিলেন যে, তাকে টিম-লিডার বানিয়ে দিয়েছিলেন। পরে আরো ট্রেনিং নেয়ার কথা তাদের মাথায়-ই আসেনি। তাছাড়া সময়ও ছিলো না। রাফি যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছেলে। আর কোন রাস্তা না দেখে কৌশলে সবাইকে বাঁচিয়ে নিজেই নিজেকে সঁপে দিয়েছিলো মৃত্যুর মুখে।
যুদ্ধে যাওয়ার পরে সবাই-ই নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছার কথা জানাতো সবাইকে। তেমনি একটা ইচ্ছে ছিলো রাফিরও। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইচ্ছাটাকে প্রশ্রয় দিয়েছিলো সে।
--আমার কিছু হলে আমার মা আর সাহানাকে কিছু জানাবেন না। আমাকে এখানে কোথাও কবর দিয়ে দিবেন।
----কি কারণ?
--কারণ, মা কখনো মেনে নিতে পারবেন না আমার মৃত্যু। বাবা মারা যাবার পর থেকে মা আমাকে নিয়ে একা সামাল দিচ্ছেন শত প্রতিকূলতা। মা মেনে নিতে পারবেন না একদম। আর সাহানা, ওকে তো আমি কিছুই দিতে পারি নি। না সংসার, না ভালোবাসা।
তাই রাফির কথামত পাশের গ্রামের এক কবরস্থানে রাফিকে সমাহিত করা হয়। যুদ্ধ চলতে থাকে রাফিকে ছাড়া। হাজার হাজার রাফি তখন যুদ্ধের ময়দানে সমবেত হয়েছে জীবনের মায়া তুচ্ছ করে। একজন একজন করে কয়জনকে শেষ করবে? একজনকে শেষ করলে হাজারজন সহস্র-গুন তেজে
জ্বলে উঠবে। দেশতো স্বাধীন হবেই। যে দেশের সন্তানেরা নিজের জীবন থেকে বেশী ভালোবাসে সে দেশ স্বাধীন হবেই, খুব শীঘ্রই স্বাধীন হবে।
বিলকিস বানু আর সাহানা বেগম কম কষ্ট স্বীকার করেননি। এখানেও যুদ্ধের দামামা কম লাগেনি। মাস খানেক এক গ্রামে গিয়ে থাকতে হয়েছিলো এক আত্মীয়ের সাথে। যদিও এখানে তেমন কিছুই হয়নি, কিন্তু সাহানার কথা চিন্তা করে তাকে যেতে হয়েছিলো। নিজের কিছু হলেও সমস্যা নেই। কিন্তু সাহানাতো তার কাছে আমানত স্বরূপ। তার ছেলে যুদ্ধে গছে সাহানাকে তার কাছে রেখে। সাহানাকে রেখে আসতে চেয়েছিলেন বাবার বাড়ীতে, কিন্তু সাহানা থাকবে না। তাই সে মায়ের সাথে চলে আসে। এর মধ্যে যদি রাফি ফিরে আসে!
যুদ্ধ শেষ হলো। দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু রাফি আসে না। প্রতিদিন দুজন মানুষ ঘুমুতে যান রাফির অপেক্ষা করে, ঘুম থেকে উঠেন রাফির মুখ দেখবেন বলে। প্রতিদিনই কেউ না আসছে, আর বিলিকস বানু দৌড়ে যাচ্ছেন খবর আনতে রাফির। রাফি আসে না। অপেক্ষা করে করে দুজন মানুষ পার করে দেন দীর্ঘ চল্লিশ বছর। মাঝে মাঝে চেনা-পরিচিত দুয়েকজন আসেন দেখা করার জন্য কিন্তু কেউই তাদের মুখের দিকে তাকাতে পারেন না। দুজনেই বহন করছেন বহু শতাব্দীর জমানো কষ্ট!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন