বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৯৬
গল্প/কবিতা: ২টি

সমন্বিত স্কোর

৩.২

বিচারক স্কোরঃ ২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.২ / ৩.০

গল্প - কি যেন একটা (জানুয়ারী ২০১৭)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.২ কি যেন একটা

কারিমুল ইসলাম
comment ২  favorite ০  import_contacts ৮১
রাত দশটা ত্রিশ। চোখে তার আকাশের বিজলী রেখার মত লাল আঁকাবাকা রেখা। বোঝাই যাচ্ছে তার দুচোখে ঘুমের নেশা। কিন্তু এছাড়াও যে তার অন্তঃকরণে কি যেন একটার চরম আকাক্সক্ষা রয়েছে, তা বোঝার উপায় নেই। সুতীক্ষè সূর্যের প্রখর রৌদ্র গোধুলির মায়ায় যেমন বিলীয়মান হয়ে যায়, ঠিক তেমনি একফালি কষ্ট আর স্বপ্নের যোগ বিয়োগ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল সে। সে মানে যুথি। এটা তার ছদ্মনাম।
বিয়ে হয়েছে তিন মাস। প্রিয়জন কাছে নেই। সৈনিক হলে যে প্রিয়জনকে কাছে খুবই কমই পাওয়া যায়, তা যুথি জানে। তবে ওদের দুজনের মাঝে দুরত্বটা খুব বেশি নয়। প্রায় সময়ই দুজনের একসাথে থাকা হয়। কিন্তু ভাবতেই মেয়েটির মধ্যে কিযে এক অস্থিরতা জেগে ওঠে, যখন তার প্রিয় মানুষটি দূরে থাকে, কিংবা দূরে চলে যাবে। কিন্তু ভাবতেই হবে। মেনেও নিতে হবে। কেননা তার স্বামী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে এমাসেই কঙ্গো গিয়েছে। যুথি গ্রামের মেয়ে। মা বাবার স্বপ্ন আর তার স্বপ্নের স্বার্থকতায়ই এই বিয়ে।
তাদের দুজনের পরস্পরের প্রতি ভালবাসা, শ্রদ্ধার পরিমাণ অনুমেয় নয়। তবে এটুকু বলা যায় যে, স্বামী স্ত্রীর এই অগাধ ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ পার্থিব কোন বস্তু দিয়ে ঘটানো সম্ভব হলেও, আঁচ করা খুব সহজেই সহজ নয়।
যাবার আগের দিন রাতে যুথি ওর গলা ধরে খুবই কান্না করেছিল। সরল মনের এই মেয়েটি ধনার্থী ছিলনা। ছিল ভালবাসার ক্ষুধিত পদ¥লাঞ্ছনা। সেদিন ওর স্বামী ওকে অনেক আদরও করেছিল। সেই রাতে তাদের মধ্যে খুবই আবেগময় কথোপকথন হয়েছিল।
যুথি ওর মলিন মুখখানি ওর স্বামীর কানের কাছে নিয়ে গিয়ে আধো আধো গলায় বলেছিল-
তোমাকে ছাড়া আমার দিন কিভাবে কাটবে?
প্রতিউত্তরে ওর স্বামী বলেছিল--
যুথি, চিরসুহৃত কখোনো একা থাকেনা। আমার স্বপ্ন, সাধনা সবইতো তোমার জন্য। দিনের বেলা তুমি আমার লেখা গানের সুর খুঁজবে। দেখবে তোমার কষ্ট হবেনা। মাত্রতো একটি বছর। তারপর আবার আমি ফিরে আসব। তুমি শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া কর- তোমার প্রিয়জন যেন সুস্থতা আর চিরমর্যাদা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে।
কথাগুলো শেষ না হতেই ওর দুচোখের কোণ বেয়ে জল শান্তধারায় নেমে আসে। কাঁদতে কাঁদতে কাঁপা কাঁপা গলায় একফালি অভিমান নিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল-
আর রাতে কিভাবে থাকব?
ওর মাথা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে ওর স্বামী বলেছিল-
পাগলী, এমন কাঁদেনা। রাতে তুমি আমাকে মনে করে কোল বালিশ জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে। দেখবে স্বপ্নে স্বপ্নে কখন রাত পার হয়ে গেছে।
যুথির কান্না কিছুটা থামল। মুচকি হাসি আড়ালে ঢাকা মেঘের মত উঁকি দিয়েও দিলনা। কিছুক্ষণ নীরবতার পর যুথি আস্তে আস্তে বলল-
আম্মা চেয়েছিল আমাদের একটা বাবু হোক। কিন্তু..........
কথা শেষ না হতেই ওর স্বামী বলে ওঠে- কিন্তু কি? তুমি চাওনা?
নারে বোকা। আমারও খুব ইচ্ছে- আমার একটা ফুঁটফুঁটে বাবু হবে। আমি মা হব। বলার পরেই তার শরীর লজ্জায় সংকুচিত হয়ে গেল। মুখের নিকট থেকে ওর হাত সরিয়ে দিয়ে আবেগময় কন্ঠ নিয়ে ওর স্বামী বলেছিল- আমার আশা, তোমার ইচ্ছা, মায়ের স্বপ্ন সবই পূরণ হবে। আমি ফিরিতো। তারপর আমরা বাচ্চা নিব। কি খুশিতো?
যুুথির মুখখানি লজ্জা থেকে পরিবর্তিত হয়ে বিষাদময় হয়ে গেল। সে এই কথা ভাবে যে এক বছর কতদূর? কবে আসবে? আর কবে হবে আমাদের মধুর মিলন?
আনমনা যুথির মাথা ধরে ঝাকুনি দিতেই যুথি চমকে উঠল। ওর স্বামী বলল- দেখবে, খুব তাড়াতাড়িই ফিরব।তুমি শুধু দোয়া করবে। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে সে রাত পার হয়ে গেল। যাবার আগে ওর স্বামী যুথির স্বচ্ছ অধরযুগল কোণে ঠোঁটের মৃদু স্পর্শ দিয়ে বিদায় নিয়েছিল। ৬ দিন হয়ে গেল। অধর কোণের পাশে লেগে থাকা সেই চুমুর স্পর্শ সে এখনও ভোলেনি। মাঝে মাঝে সে মাঝ রাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। মুখে হাত দিয়ে মনে মনে ভাবে “ কি যেন একটা লেগে আছে”। আবার শুয়ে পড়ে। স্বপ্নের রাস্তায় হেঁটে হেঁটে সে প্রতীক্ষার দিনগুলি একরাতেই পার করতে চায়। যার ফলে আবার চমকে ওঠে। আর ঠেঁটে হাত দিয়ে তার মনে হয়- এখানে কি যেন একটা লেগে আছে। এ যে ঘুম ভাঙ্গা স্বপ্ন। তা ভেবে বিষন্ন মন নিয়ে আবার সে শুয়ে পড়ে সে। এভাবেই তার রাতের আঁধারের দীর্ঘতা কমতে থাকে। বিছানায় ছটফট করতে থাকে। তবু তার কাছে একটা প্রশান্তি আছে। তার স্বামী মিশন থেকে বাড়ি ফিরবে। প্রতীক্ষা রুপান্তরিত হবে আনন্দের জোয়ারে।
রাত পার হতে আড়াই ঘন্টামত বাকি আছে। হয়ত কিছুক্ষণ আগে রাতের আঁধারে তীক্ষè বুলেটে তার প্রিয়জন আঁধারের রাজ্যে পৌঁছে গেছে। গুলিটা খুব কাছ থেকে লেগেছিল বুকের ডানপাশে। মিশন থেকে জীবন্ত, প্রানবন্ত কল্পিত সেই হাসি নিয়ে আর বাড়ি ফেরা হবেনা তার।
যুথি এখনও ঘুমিয়ে। তার স্বপ্ন, আশা, মা হওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা কোথায় হারাল? স্বপ্নের স্বাধীনতা আছে, স্বপ্ন দেখা সহজ কিন্তু মা হওয়া কি সহজ? মা হওয়া যে অনেক তিতীক্ষা,প্রতীক্ষার বিনিময়, দাসত্বের দ্বার ভেঙ্গে কোমলতা,কঠোরতা দিয়েই যে মা হতে হয়। নিয়তির নির্মম পরিহাস ভেদ করে মেয়েটি পারলনা মা হতে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়েটা কি ভাববে? কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যাওয়া। তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই মুদু স্পর্শ ভেবে সে কি বলবে “ কি যেন একটা লেগে আছে”? সকালে যখন সে তার প্রিয়বিয়োগের বিষাদময় খবর শুনবে, জানিনা তখন আর সে কাঁদতে পারবে কি না?
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন