বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ জুন ১৯৭৬
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৫

বিচারক স্কোরঃ ১.৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

গল্প - আমার স্বপ্ন (ডিসেম্বর ২০১৬)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৫ বাস্তব স্বপ্ন

ইউনুস সামাদ
comment ৫  favorite ০  import_contacts ১০৯
বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে এসে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে বজ্রাহতের মতো থমকে দাঁড়ালাম। দীর্ঘ বত্রিশ বছর পর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে আসতে পারার যে আনন্দ আমার মনে দোলা দিয়েছিলো এতক্ষণ, তা এক নিমিষেই মন থেকে উধাও হয়ে গেলো। নিজেকে সামলাতে বড় কষ্ট হলো। মনের ক্রুদ্ধ ভাবটা কোনোরকমে চাপা দিয়ে ফিরে গেলাম পঁয়ত্রিশ বছর আগের সেই উত্তাল দিনগুলোতে। যে দিনগুলোতে জীবন বাজী রেখে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম বিনাদ্বিধায়। কোনো ভয়,শংকা তখন এতটুকু দানা বাঁধেনি মনে। আত্মীয়, পরিজন ছেড়ে; স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালবাসাকে বিসর্জন দিয়ে কি অবলীলায় চলে গিয়েছিলাম তখন।

তারপর একদিন দেশ স্বাধীন হলো। যখন দেশকে মুক্ত করে ফিরে এলাম বিজয়ীর বেশে তখন মনে কত আনন্দ, আশা, কত স্বপ্ন দোলা দিয়েছিলো। কিন্তু বাড়ী ফিরে এসে দেখলাম সব শেষ। ঘরগুলো যেন হাওয়াই মিলিয়ে গেছে। কাঠ-কয়লার স্তুপের ছড়াছড়ি চারিদিকে। মা-বাবা, ভাই-বোন আর সন্তানসম্ভবা প্রিয়তমা স্ত্রী কেউ নেই। কেউ বলতেও পারলোনা তাদের কথা। শুধু এটুকুই জানা গেলো, একরাতে মিলিটারি এসেছিলো আমাদের গ্রামে। আর তাদের সাথে সহযোগি হিসাবে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিলো গ্রামের অপকর্মের দোসর রাজাকার মোসলেম। চিৎকার চ্যাঁচামেচি আর আগুনের দাউদাউ লেলিহান শিখা ছাড়া কোনকিছু শোনা বা দেখা যায়নি সে রাতে। মৃত্যুভয়ে যে যার মতো যে যেদিকে পারে পালিয়েছিলো। যারা পালাতে পারেনি তাদের কাউকে ব্রাশ ফায়ারের গুলিতে, কাউকে বা বেয়নেটে খুঁচিয়ে আবার কাউকে বা জ্বলন্ত আগুনে ফেলে হত্যা করেছিলো পাষন্ড শয়তানের দল। জান্তব উল্লাসে মেতে তারা মা-বোনদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছিলো সারারাত। কতক লাশ ভাসিয়ে দিয়েছিলো নদীর জলে। কতক বা ছাই হয়েছিলো আগুনের লেলিহান শিখায়। পাওয়া গিয়েছিলো কিছু হাড়ের স্তুপ আর মাংশপোড়া দুর্গন্ধ। নারীদের ভাগ্যে যে কি জুটেছিলো তা একমাত্র আল্লাহ আর শয়তানগুলো ছাড়া কেউ জানতে পারেনি কোনোদিন। হারিয়ে যাওয়া নারী ও পুরুষদের কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমি হারিয়েছিলাম আমার মা-বাবা, ভাই-বোন আর স্ত্রীকে। সেইসাথে হারিয়েছিলাম আমার স্নেহ, মায়া, মমতা এবং ভালবাসা।

আমি ফিরে এসে খোঁজ করেছিলাম মোসলেম রাজাকারের। কিন্তু তাকে কোথাও খুঁজে পাইনি। কোথায় যে উধাও হয়েছিল মোসলেম রাজাকার সেকথা কেউ বলতেও পারেনি। আমিও উধাও হয়েছিলাম রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে আর নিজের ব্যর্থতায়। কি চেয়েছিলাম আর কি পেলাম।

মাতৃভূমি শত্রুমুক্ত হলো ঠিকই কিন্তু মাকে মুক্ত রাখতে পারলামনা শত্রুদের কবল থেকে। দেশের সম্ভ্রম রক্ষা হলো। দেশের বুকে পতপত করে উড়লো লাল-সবুজের পতাকা। কিন্তু সম্ভ্রম রক্ষা হলোনা স্ত্রী, বোনের। তাদের শরীরের পতাকা লুটিয়ে পড়ল তাদের দেহ থেকে এই বাংলার শ্যামল মাটিতে।

দেশ যখন নতুনভাবে পুনর্গঠনের ডাক এলো তখন তথাকথিত কিছু মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকাররা শুরু করল লুটতরাজ, খুন, জখম, রাহাজানি। রাতারাতি তারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হলো।

যে আশা বা ব্রত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, চারিদিকে চেয়ে দেখলাম তা শুধু অলীক কল্পনামাত্র। চারিদিকে শুধু হাহাকার আর হাহাকার। দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি। ক্ষমতার অপব্যবহার। স্বার্থের বেসাতি। যেন পূর্বদিনের শাসনব্যবস্থাকেও হার মানিয়েছে। মানুষের আশা, আকাংখার কোন প্রতিফলন নেই কোনখানে। নেই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। বৈষম্য ও বিভেদের পাহাড়। সামাজিক অবক্ষয়ে অধঃপতনে দেশ। আশা, আকাংখা আর স্বপ্ন পূরণের অপূর্ণতা নিয়েই তাই তিন বছরের মাথায় দেশ ছেড়েছিলাম আমি। পালিয়ে গিয়েছিলাম নিজের অধিকার ও অঙ্গীকার থেকে কাপুরুষের মতো।

আর আজ দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর পর দেশে ফিরে আমার মনে হলো দেশ অনেক পাল্টে গেছে। চারিদিকে নতুন-নতুন দালানকোঠা। মসৃণ, প্রশস্ত রাস্তাঘাট। যান-বাহনের কত বহর। যেন, উন্নয়নের জোয়ার বইছে চারিদিকে। মানুষ পেয়েছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। স্বস্তিতে শ্বাস ফেলার পরিবেশ। এইসব দেখে কতনা আনন্দিত হলাম। গর্বে ভরে উঠলো বুক। ভাবলাম সার্থক আমার যুদ্ধজয়ের সংগ্রাম।

কিন্তু মঞ্চে উপবিষ্ট প্রধান অতিথির দিকে চেয়ে আমার সার্থকতা, আমার বুকভরা গর্ব, আনন্দ একনিমিষেই উধাও হয়ে গেলো মন থেকে। প্রধান অতিথিকে ভালোভাবে চিনতে না পারলেও মঞ্চের পেছনে টাঙানো ব্যানারে প্রধান অতিথির নাম এবং নামের আগে মুক্তিযোদ্ধা লেখা দেখে আমি বুঝতে পারলাম না-এ কি করে সম্ভব? এটা কি স্বপ্ন না বাস্তবতা?
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • জয় শর্মা
    জয় শর্মা প্রশ্নবিদ্ধ করল- "প্রধান অতিথি হিসেবে কি মোসলেম ছিল?" খুব পরিপক্ব লেখা, আর লিখার মাঝে সব আজকের সমাজের বহিঃপ্রকাশ! শুভকামনা ও ভোট রইল।
    প্রত্যুত্তর . ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬
  • এম এ রউফ
    এম এ রউফ সামাজিক ও সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে লেখা...ভালই
    প্রত্যুত্তর . ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৬
  • গোবিন্দ বীন
    গোবিন্দ বীন ভাল লাগল,ভোট রেখে গেলাম।আমার কবিতা পড়ার আমন্ত্রন রইল।
    প্রত্যুত্তর . ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৬