বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ আগস্ট ১৯৭৩
গল্প/কবিতা: ৭টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৪৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

একটু চমক একটু ভুল

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

মুখপুড়ি

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

বোবা পিশাচ

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

গল্প - এ কেমন প্রেম? (আগস্ট ২০১৬)

মোট ভোট ১২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৪৮ মৃত-আত্মার কথন

আহা রুবন
comment ১১  favorite ১  import_contacts ২৪৬
দুই সপ্তাহ পূর্বে ডাক্তার বলে দিল যা খেতে চায় খেতে দিন। সব আশাই তখন উড়ে গেল আমার পরিবারের। তাদের সঙ্গে আমিও গলা মিলিয়ে বললাম ‘হ্যাঁ তোমাদের বউ সত্যিই খুব ভাল মেয়ে ছিল।’
আমার পিঠ হাতাল, মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করল তারা।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমার হাত ধরে বলল ‘তুমি কি আবার বিয়ে করবে?’
আমি কোন উত্তর না দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আর অবশেষে বললাম ‘তুমি কী বল?’
ওর দু চোখ গড়িয়ে জল পড়ল এবং আমার মুখে আঙ্গুল ছোঁয়াল। আমি মাথাটা সরিয়ে নিলাম না।
‘হ্যাঁ তোমারও তো একটা জীবন আছে...’
মাথা ঘুরিয়ে ছাদের দিকে তাকাল সে। তার কিছু পরে আমার হাতটা টেনে নিয়ে বলল ‘কথা দাও পাঁচটা বছর অপেক্ষা করবে? তত দিনে ননী একটু বড় হয়ে উঠবে।’
আমি ওর কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালাম।
‘আমি ননীকে দেখে রাখব। কথা দিলাম—বয়স দশ না হওয়া পর্যন্ত কিছু করব না।’
আমি বিয়ে শব্দটা উচ্চারণ করতে পারলাম না। সে আমার হাত টেনে নিল আর গালের সাথে চেপে ধরে রইল। ওর শরীরের উত্তাপ আমাকে বিব্রত করল।
‘আমার সে বিশ্বাস আছে।’
আমি দু চোখ মুছিয়ে দিলাম।

‘দেখ-তো কতগুলো টাকা পেলাম—কিছু খরচও করতে পারলাম না। ভালই হল দেরিতে পেয়ে—অযথা চিকিৎসায় অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে যেত। তোমাদের জন্য রইল কাজে লাগবে। খরচ করার সময় আমার কথা একটু মনে কোরো... তোমার কী মনে পড়বে তখন?’ শুকনো হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুখে।
‘এভাবে বোলো না... বুকটা যে ফেটে যাচ্ছে! আমাদের সুখের জীবনের কথা, সন্ধ্যায় কোনও দিন দেরি হলে যেভাবে বাড়ির সামনের তেঁতুল-তলায় দাঁড়িয়ে থাকতে। তোমার সেই মুখ কি কখনও ভুলতে পারব!’
কথাগুলো বলতে মুখে জড়িয়ে আসছিল আমার। কেননা কথাগুলো সাত বছর আগে সত্য ছিল। অবশ্য ওর কাছে সব সাত বৎসর পূর্বের মতই অপরিবর্তিত ছিল বলে আমার ধারণা। এ ছাড়া আর কিছু করারও তেমন ছিল না ওর।
চোখ বন্ধ করল শান্তি।

অনেক বছর ঝুলে থাকার পর অবশেষে দুই মাস আগে আমার স্ত্রী তার অংশ বিক্রি করতে পেরেছে।
ওর বড় ভাই একদিন জানাল ‘তোমাদের অংশের টাকা কাল জমা করে দেব।’
আগাম ধন্যবাদ জানিয়ে তার বোনের স্বস্থের চরম অবনতির সংবাদ জানালাম। তেমন কিছু আগ্রহ দেখাল না বলে আমি ফোন রেখে দিলাম।
কথা মত দেখলাম আমার ব্যাঙ্কের হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা জমা হয়েছে। মাত্র চার দিন পূর্বে এটা জানিয়েছি। আমি তখন টাকা পাওয়ার ব্যাপারটা জানাইনি কেননা তখনও ডাক্তার চিকিৎসার হাল ছেড়ে দেয়নি। ভাই-বোনদের মনোমালিন্য হওয়াতে আমার বেশ সুবিধে হয়েছে। তারা বোনের মৃত্যুশয্যাতেও দেখতে আসেনি বা কোনও খোঁজ নেয়নি। হয়ত খুশি হয়ে বলেছে ‘বেশি বাড়াবাড়ির ফল...’ তারা বোনকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিল। এতদিন পরে এসে বুঝি তারা সফল হয়েছিল। অবশ্য পেছনের কলকাঠি আমিই নেড়েছিলাম। এগিয়ে দিয়েছিলাম আমার স্ত্রীকে—নিজের গায়ে কোনও আঁচর লাগতে দেইনি।

কিছু দিন আমি আর আমার ছেলে মনমরা হয়ে কাটালাম। গ্রামবাসীরা উপদেশ দিল ছেলেকে সঙ্গে করে খামার-বাড়ি নিয়ে যেতে। আমরা পশু চরাতে মাঠে গেলাম। ননী ভেড়ার বাচ্চা কোলে নিয়ে খেলতে শুরু করল—ধীরে ধীরে মায়ের শোক কাটিয়ে উঠতে লাগল। আমিও খুব দ্রুত স্ত্রী-শোক কাটিয়ে উঠলাম—কারণ এখন আমি একজন ধনি ব্যক্তি, কেননা আমার স্ত্রী মারা গেছে আর এতে করে আমার মনস্কামনা পূরণের যথেষ্ট স্বাধীনতার সৃষ্টি হয়েছে।

দক্ষিণ পাড়ার অপরূপ সুন্দরী জবা ও তার বাবা-মা আমার প্রস্তাবে এক কথায় রাজি হয়ে গেল। নানা ছুতোয় প্রায়ই আমি ওদের বাড়ির আশে পাশে যেতাম। যেদিন দেখা হত মাঝরাত অবধি চোখে ঘুম আসত না। জানতাম কখনই পাব না আমি, তবু কৌশলে দুইবার জবার নিশ্চিত-বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলাম। সেই আমি অবশেষে জবাকে ঘরে নিয়ে এলাম।

আমরা আমাদের নতুন প্রেমে মজে রইলাম। ননী ভেড়ার বাচ্চা নিয়ে রইল। কিন্তু শরীর শুকিয়ে গেল আর সারাদিনে তার দেখাও মেলে না। কী খায়, কোথায় ঘুমায় তেমন একটা খোঁজও নিতে পারতাম না। দিন-রাত আমাকে ব্যস্ত থাকতে হত ব্যবসায়ী কাজ বা জমি চাষের শ্রমিক যোগাড়ে। লাল বকনার বিয়োনর রাতে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম ভেড়াদের সাথে ননী ঘুমিয়ে আছে। আমি আর ঘুম ভাঙ্গালাম না। হতে পারে সারারাত মশা কামড়েছে।

হঠাৎ ননী জ্বরে পড়ল। এক রাতে পাশের কামড়ায় শুয়ে ডাকল ‘বাবা আজ একটু আমার কাছে শোও—খুব ভয় লাগছে।’
‘বাবা তুমি ঘুমোও, ঘুমলে আর ভয় করবে না।’
আমার বুকের ওপর জবা মাথা রেখে ছিল—আমি ওর ঘন চুলে ধীরে ধীরে বিলি কাটছিলাম।
‘একটু জল খাব...’
আমরা তখন পাহাড়-সমুদ্র আবিষ্কারের নেশায় জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছিলাম খড়কুটোর মত। কাজেই পাশের ঘরে কারও কথা শুনতে পেলেও শুনতে পাইনি।
‘খুব পিপাসা লাগছে—বাবা...’
আমি জবার পাশে শুয়ে ওকে ধাক্কা দিয়ে বললাম ‘যাও।’
সে গজ গজ করতে করতে উঠে গেল। ফিরে এলে আমরা বালি হাঁস হয়ে আকাশে সাঁতার কাটতে লাগলাম। পাশাপাশি উড়ে যেতে যেতে হাসিমুখে মুখ ফেরালাম জবার দিকে ‘ননী ঘুমিয়ে পড়েছে।’
‘হ্যাঁ জন্মের ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি।’
‘কী করেছ তুমি!?’
‘দেখে এসো গে...’
আমি উঠে গেলাম। ননী হা করে শুয়ে আছে—জিভ বেরোনো—দাঁতের ফাঁকে।
‘জবা তুমি এটা কী করলে...!?’
‘বেশি কিছু করতে হয়নি—শুধু গলা টিপে-ধরে ছিলাম কিছুক্ষণ। আপদ রাখার কী দরকার?’
ননীর জন্য আমার মায়া হতে লাগল—সে আমাকে খুব ভালবাসত।

জানাজানি হলে বিচারে কী হবে সে-তো জানাই। সুন্দর মুখটি আমি হারাতে চাইলাম না। তাই রাতেই দুজনে মিলে সুর করে মরার গান গাইতে শুরু করলাম। সবাই জানল ননী জ্বরে মারা গিয়েছে।

কবরস্থানে নিলাম না কেননা নতুন স্ত্রীর প্রেমে বিভোর ছিলাম আমি। উঠোনের এক কোণটায় কবর দিয়ে পাকা করে বকুল গাছের বীজ বুনে দিলাম। খুব যত্ন করতে লাগলাম আমরা কবরের। না করে উপায় ছিল না, খুব ভালবাসতাম জবাকে।

অনেক বছর কেটে গেছে। জবার তিন তিনটে সন্তান জন্মানোর কিছু দিন পর বেঁচে থেকে মারা গেছে। তারপর আর সন্তান হয়নি।

ননীর কবরে লাগানো বকুল গাছের বদলে যে একটি বড় গাছ হয়ে আকাশ ছুঁয়েছে, আমরা খেয়ালই করিনি। ভুলেই গিয়েছিলাম ওখানটায় অন্য কিছু নয়, বকুল লাগিয়েছিলাম। প্রথম যেবার ফল ধরল, পুরো পাকতে দিলাম। তিনটে মাত্র ধরেছিল, শেষ পর্যন্ত টিকেছিল দুটি। ফলগুলোর যখন খোসা ছাড়াচ্ছিলাম জবা খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছিল। যেই-না খোসাটা টান মেরে ছাড়িয়ে নিলাম—জবা চিৎকার করে জ্ঞান হারাল। ‘এ কী বেরিয়ে এল, এ যে ননীর মুখ! চোখ, নাক, মুখ একদম ননীর!’
আধ-ছেলাটাসহ ফল দুটো খাটের নিচে লুকিয়ে রাখলাম।

ডাক্তার বলল ‘অনেকগুলো সন্তান মারা গিয়েছে তো, মনের ভেতরে ব্যথা পুষে রাখার ফল এটা। মাথার চিকিৎসা করাতে হবে।’

রাতে খাটের তলা থেকে বের করলাম সেগুলো। দেখি ননী দু চোখ মুদে আছে। হঠাৎ দু চোখ খুলে বলল ‘বাবা তোমরা আমাকে জল দাওনি, তাই আমি সবাইকে জল খাইয়ে—আমি তোমাদের অপমান করি।’
আবার চোখ বন্ধ করল ননী।

জবা পুরোটাই পাগল হয়ে গিয়েছে। আমি শেষ পর্যন্ত সবার কাছে ঘটনা খুলে বলতে বাধ্য হই, কেননা প্রচণ্ড অনুশোচনা হত ইদানীং। কিন্তু কেউ আমাকে বিশ্বাস করল না, সবাই হো হো করে হাসতে লাগল। আমি তাদের শাস্তি দিতে বলি—মনে হত তাতে হয়ত কষ্ট কিছুটা কমবে। সবাই বলতে লাগল ‘দুটোকে একত্রে পাবনা পাঠাতে হবে।’

জবা মারা গেছে বহু কাল আগে—দশ, বিশ, পঞ্চাশ হাজার বা লক্ষ বৎসর হবে হয়ত। আমি শাস্তি চাই, কেউ শাস্তি দেয় না, কেবল হাসে। তাদের হাসি আমার শরীরে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। শত চেষ্টা করি বোঝাতে—আমার কথা কেউ কানে তোলে না। এখন আপনজন বলে কেউ আর বেঁচে নেই, বড়ই নিঃসঙ্গ লাগে—সময় কাটতে চায় না। অসহ্য হয়ে মৃত্যু চাই কিন্তু ঈশ্বর বলেন ‘তোমার তো কবেই মৃত্যু হয়েছে।’
‘তবে বেঁচে আছি যে?’
‘তুমি বেঁচে নেই। যেদিন জবার জন্য লালায়িত হলে, সঙ্গে সঙ্গেই তোমার মৃত্যু হয়েছে।’
‘তবে যে জানতাম প্রেম স্বর্গীয়...’
ঈশ্বর বিরক্ত হয়ে বলেন ‘আমার পৃথিবীকে নরক বানিয়ে স্বর্গের স্বপ্ন দেখ? নরকেও তোমার স্থান হবে না! আমাকে আর কখনও ডাকবে না...’

সত্যিই আমি কিন্তু আজও বেঁচে আছি। আমার জীবনী সবার কাছে বলতে বলতে কবিতার মত হয়ে গেছে। জবা আর আমার মধ্যে প্রেম ছিল, কিন্তু প্রেমিক ছিলাম না কেউ। আমার মরণের মৃত্যু হয়েছে তাই আমাকে সে নিতে আসে না। তুমি নিশ্চয় আমার কথাগুলো বিশ্বাস করেছ। আর হ্যাঁ আমার ননীর মুখটি এখনও গাছে ধরে—তোমরা যাকে নারকেল বল। এ ঘটনার পূর্বে নারকেল নামে কোন কিছু ছিল না পৃথিবীতে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন