বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ অক্টোবর ১৯৯৮
গল্প/কবিতা: ৪টি

গল্প - প্রেম (ফেব্রুয়ারী ২০১৭)

বর্ণমালা তোমার জন্য

মোঃ সাকিব চৌধুরী
comment ০  favorite ০  import_contacts ২৯
মাত্র ক’দিন আগেই পৌষ শেষ হয়েছে, এখন মাঘের শুরু । শীতের বিকেল বড় সংক্ষিপ্ত, শুরু হতে না হতেই কেমন ফুরিয়ে যায় । বিকেলের এই সময়টায় বাসাবো বৌদ্ধমন্দিরে প্রচুর লোক সমাগম হয় । কেউ আসে প্রার্থনা করতে, কেউ-বা শুধুই নিদর্শন দেখতে । আজ বিকেলে দর্শনার্থীদের এই জনস্রোতের মাঝে বর্ণমালাও আছে । সে মনেপ্রাণে চাইছে আজ যেন ভিড়টা একটু কম হয়; অন্তত কিছুটা সময়, কোনো একটা স্থানে একখণ্ড নির্জনতা যেন পায় সে । এই নির্জনতাটুকু কি বর্ণমালার ভাগ্যে জুটবে?
মনে হয় না । তার বিশ বছরের জীবনে যা কিছু সে গভীরভাবে চেয়েছে, তা-ই হারিয়েছে; আর যে জিনিস সে কখনো চায়নি, তা নিজ থেকে এসেই তার কাছে ধরা দিয়েছে । প্রথমটার উদাহরণ বাবার মৃত্যু; আর দ্বিতীয়টা, অর্ণবের তার জীবনে আসা ।
বাবার ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রথম যখন কর্কট রোগটা ধরা পড়ল, তখন বর্ণমালা প্রবলভাবে চেয়েছিল যেন ডাক্তারদের এই রোগ নির্ণয়টা কোনো অলৌকিক উপায়ে ভুল প্রমাণিত হয় । আজকাল তো পত্রিকা খুললে হরহামেশায়ই চোখে পড়ে, ডাক্তাররা ভুল চিকিৎসা করছে, ভুল রোগ নির্ণয় করছে । বাবার বেলায়ও কি তেমন কিছু হতে পারে না? পারে তো । কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটল না, বাবা মারা গেলেন ।
আর অর্ণব? বর্ণমালা কোনোদিন ভাবতে পেরেছিল, কলেজের গন্ডি পেরোবার আগেই একটা ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বে সে? না, ভাবতে পারেনি । ভাবা সম্ভবও ছিল না । মাথার ওপর যে মেয়ের ছয়-ছয়টা বড় ভাই থাকে, তার কোনো ছেলের সাথে সম্পর্ক গড়ার কথা চিন্তা করাটাও দিবাস্বপ্নের মতো ।
প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে বর্ণমালা ধীরে ধীরে পুকুরঘাটের দিকে এগিয়ে গেল । পুকুরের জলে বিশাল আকৃতির বৌদ্ধমূর্তির সোনালী প্রতিবিম্ব স্থির হয়ে রয়েছে । মাঝেমাঝে বাতাসের দোলায় একটু একটু কেঁপে উঠছে জল, সাথে তিরতির করে কেঁপে উঠছে বুদ্ধের প্রতিচ্ছবি ।
বর্ণমালা পুকুরঘাটের বাঁধানো বেঞ্চিতে বসল । হাতঘড়িতে সময় দেখল । চারটা বেজে আঠারো । সাড়ে চারটা নাগাদ অর্ণবের আসার কথা ।
অর্ণবকে চিনত না বর্ণমালা । চেনার কথাও না । সেই সময় কোনো ছেলের দিকে তাকনো তো দূরে থাক, তাকানোর কথা ভাবতেও অসম্ভব ভয় করত বর্ণমালার । মনে হতো, ছ’জোড়া চোখ বুঝি কোনো অদৃশ্য ক্ষমতাবলে সারাক্ষণ তার ওপর নজরদারি চালাচ্ছে; গোয়েন্দাদের দৃষ্টির মাঝে সে নজরবন্দী হয়ে আছে ।
একদিন কলেজ শেষে রোজকার মতো বাসায় ফিরতে রিক্সা ডাকছিল সে । একটা রিক্সা ঠিক করে সে যখন প্রায় উঠে পড়েছিল, ঠিক সেই সময় পেছন থেকে কেউ একজন তার কাঁধ খামচে ধরল । ‘এই বর্ণ! একটু দাঁড়া, তোর সাথে আমার জরুরি কথা আছে ।’
বর্ণমালার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম । কোনোরকমে ঘাড় ঘুরিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে । ‘ওহ প্রিয়াংকা তুই! আরেকটু হলে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছিল ।’ বর্ণমালা বুকে ফুঁ দিল । ‘কী বলবি বল তাড়াতাড়ি ।’
‘এইভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলা যায়? তুই এক কাজ কর, রিক্সাটাকে ছেড়ে দে ।’
‘উঁহু, যা বলার এখানেই বল । বেশি দেরি করে বাসায় ফিরলে বড় ভাইয়া আবার বকাবকি শুরু করবে ।’
‘উফ! তোর এই ভাইয়া-ভাইয়া করাটা কবে বন্ধ হবে বল তো? তুই এখন কলেজে পড়িস, ফিডার খাওয়া কচি খুকি না । চল তো আমার সাথে, একটু দেরি হলে কিচ্ছু হবে না ।’ কথা শেষ করেই প্রিয়াংকা রিক্সাওয়ালার দিকে ফিরল । ‘মামা, আপনি যান তো, বিদায় নেন । ও এখন কোথাও যাবে না ।’
প্রিয়াংকা বর্ণমালার হাত ধরে টেনে নিয়ে কলেজগেটের ভেতর ঢুকে পড়ল ।
‘আরে, টানছিস কেন?’
প্রিয়াংকা অদ্ভুত একটা মুখভঙ্গি করে বলল, ‘তুমি দুধের বাচ্চা, হাত ধরে নিয়ে না গেলে যদি হারিয়ে যাও, তোমার ভাইয়াদের আমি কী জবাব দেব?’
‘উফ! প্রিয়াংকা, ফাজলামি বাদ দে । কী বলবি বল ।’
‘বলব,’ হাত ছাড়ল না প্রিয়াংকা । ‘আগে আমার সাথে চল ।’
‘কিন্তু যাচ্ছিস কোথায়, সেটা তো অন্তত বলবি?’
‘ক্যান্টিনে ।’
অগত্যা বাধ্য হয়ে বর্ণমালাকে প্রিয়াংকার সাথে কলেজ ক্যান্টিনে যেতে হলো । পনেরো টাকার কোকাকোলার কাচের বোতলে চুমুক দিতে দিতে প্রিয়াংকা বলল, ‘তুই অর্ণবের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করছিস না কেন?’
‘কোন অর্ণব?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল বর্ণমালা ।
‘আরে ওই যে, লম্বা করে শ্যামলা ছেলেটা, এসএসসির আগে আমাদের সাথে হোসনে আরা ম্যাডামের বাসায় পড়ত ।’
‘ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশন, আমি ম্যাডামের বাসায় ছেলেদের চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতাম না । আর ম্যাডামের বাসায় ‘লম্বা করে শ্যামলা’ অনেকগুলো ছেলে পড়ত ।’
‘চিনিস না ভালো কথা । এখন চিনতে সমস্যা কই? রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট কর, পরিচিত হয়ে যাবি ।’
‘সম্ভব না । ছোট ভাইয়া অপরিচিতদের রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করতে নিষেধ করে দিয়েছে, পরে এগুলো নিয়ে নানারকম সমস্যায় পড়তে হয় ।’
‘উফ! আবার শুরু হলো! এই, তোর ভাঙ্গা রেকর্ডার থামাবি? সারাদিন শুধু ভাইয়া আর ভাইয়া...তোর ভাইগুলোর কি সারাদিন তোর পিছে লেগে থাকা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই?’
বর্ণমালা চুপ হয়ে গেল ।
প্রিয়াংকা গভীর আগ্রহ নিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘জানিস, অর্ণব ছেলেটা না তোকে অনেক পছন্দ করে । আমাকে বলেছে, ওর খুব শখ তোর সাথে রিলেশন করার ।’
বর্ণমালা রীতিমতো আঁতকে উঠল, ‘বলিস কী! অসম্ভব! তুই আমার ফ্যামিলির অবস্থা জানিস না? বাসায় জানলে আমাকে সোজা বাসা থেকে বের করে দিবে ।’
‘এই কারণেই তোর কোনোদিন কিছু হবে না ।’ হতাশ হয়ে বলল প্রিয়াংকা ।
‘আমার কিছু হওয়ার দরকার নেই । তোর এত শখ থাকলে তুই ওই ছেলের গলায় ঝুলে পড় ।’
‘পড়তামই তো । আমার ভাগ্য খারাপ, কোনো ছেলে আমার পিছনে এভাবে লেগে থাকে না । ইশ, কী জিনিসটাই না মিস করলি রে বর্ণ, অর্ণব ছেলেটা যা হ্যান্ডসাম!’
সেদিন কলেজ থেকে বাসায় ফিরে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বর্ণমালা ফেসবুক খুলে বসল । অসংখ্য বন্ধুত্বের অনুরোধের মধ্য থেকে খুঁজে বের করল বিশেষ একটা নাম, অর্ণব চৌধুরী ।
ছেলেটা বর্ণমালার মুখচেনা, হোসনে আরা ম্যাডামের বাসায় যাওয়া-আসার পথে অসংখ্যবার দেখেছে, কিন্তু আরও অনেক ছেলের মতো এর সাথেও কোনোদিন কথা হয়নি । বর্ণমালা শুধু একবার তার ছবিগুলো দেখেই ফেসবুক থেকে বের হয়ে গেল, এর চেয়ে বেশি কিছু করার সাহস সেদিন আর হয়নি তার ।
দু’দিন পর সেই অর্ণব চৌধুরীর কাছ থেকে বার্তা এল, ‘তোমার নামটা খুব সুন্দর । কে রেখেছে?’
ভয়ে বর্ণমালার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল । একটা অপরিচিত ছেলে তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা চালাচ্ছে, ভাইয়ারা কেউ জেনে ফেললে কী হবে—এটা ভেবে শরীরে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছিল । তবু মনে সাহস সঞ্চয় করে উত্তর লিখল, ‘আমার বাবা ।’
‘এই নাম রাখার পেছনে কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?’ ওপাশ থেকে আবারও প্রশ্ন ।
‘আমার বাবার অনেক কবি হওয়ার শখ ছিল । বাবা কবি হতে পারেননি । তাই ছয় ছেলের পর একটা মেয়ে হওয়ায়, তার একটা কাব্যিক নাম রেখেই বাবাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল । সরকারি চাকরির ব্যস্ততার মাঝেও বাবা রাত জেগে জেগে কবিতা লিখতেন । বাবার নাকি মনে হতো, বর্ণমালাটা তাঁর প্রাণ, আর অক্ষরগুলো নিঃশ্বাস । সেই প্রাণকে বাবা তাঁর একমাত্র মেয়ের মাঝে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন । তাই আমার নাম রাখা হলো বর্ণমালা ।’
‘বাহ, নামকরণের কী সুন্দর ব্যাখ্যা! তুমি অনেক সুন্দর করে কথা বলো, বর্ণ ।’
এরপর থেকে মাঝেমাঝেই কথা হতো ছেলেটার সাথে, অবশ্যই সবার চোখ এড়িয়ে । প্রথম প্রথম শুধুই ফেসবুকে, তারপর রাত জেগে মুঠোফোনে । আতঙ্ক কখন আগ্রহে রূপ নিল, ভয় হয়ে গেল ভালো লাগা—সেটা বর্ণমালা নিজেও জানে না । নিজের অজান্তেই সে পথচলা শুরু করল বিশাল একটা ফুলবাগানের মধ্য দিয়ে । রজনীগন্ধা, রক্তজবা, বাগানবিলাস, স্বর্ণচাঁপা—কত রকমের, কত রঙের ফুল সেই বাগানে! কী তার সুঘ্রাণ!
সেই বাগানের সরু খোয়া বিছানো ইটের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বর্ণমালা একদিন নিজেকে আবিষ্কার করল এখানে, এই বৌদ্ধমন্দিরে । কোনো এক আশ্বিনের সন্ধ্যায় প্রাইভেট টিউটরের কাছে যাবার অজুহাতে ফাঁকি দিয়ে বের হয়েছিল বাসা থেকে । অনুরোধ ছিল অর্ণবের, বর্ণমালার ছিল আগ্রহ । অর্ণব তাকে কী দেখাবার জন্য এতটা ব্যগ্র হয়ে আছে, সেটা জানার আগ্রহ ।
হাজার রঙের ফানুস ওড়ানোর উৎসব দেখাতে সেদিন তাকে নিয়ে এসেছিল অর্ণব । সে অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল, কী হচ্ছে এখানে?
‘প্রবারনা পূর্ণিমা,’ উত্তর দিয়েছিল অর্ণব । ‘বৌদ্ধদের ফানুস ওড়ানোর উৎসব ।’
বর্ণমালা বিমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সেদিন । অর্ণব বলেছিল, ‘ওই যে ফানুসগুলো দেখছ, ওরা একদিন আমার হবে, আমাদের হবে...’ বলতে বলতে তার ঠোঁটগুলো কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছিল । চোখ দুটো ভরে উঠেছিল ওই ফানুসগুলোর রঙে ।
বর্ণমালা আর কিছুই বলেনি সেদিন, শুধু অবাক বিস্ময়ে অর্ণবের দু’চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল । নীরবতারও ভাষা থাকে, তাকেও শোনা যায় । শুনতে হয় হৃদয় দিয়ে, উপলব্ধি করতে হয় গভীর আবেগের মাধ্যমে ।

‘ব্যাপার কী?’ অর্ণবের কথায় বাস্তবে ফিরল বর্ণমালা । ‘হঠাৎ জরুরি তলব?’
‘বসো,’ ম্রিয়মাণ স্বরে বলল বর্ণমালা, ‘কথা আছে ।’
অর্ণব সম্ভবত বর্ণমালার কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনটা টের পায়নি । বেঞ্চিতে বসতে বসতে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, ‘জানো বর্ণ, আমার না...’ কথা শেষ করার আগেই হঠাৎ থেমে গেল সে । বর্ণমালার চোখে চোখ পড়েছে । তার উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ল । ‘কী হয়েছে তোমার? চোখ-মুখ এত শুকনো কেন? অসুস্থ?’
‘উঁহু, কী যেন বলছিলে, কথা শেষ করলে না তো?’
‘তোমাকে ফোনে বলেছিলাম না, একটা গুড নিউজ আছে, ফোনে না, সামনাসামনি দেখা হলে বলব?’
‘হ্যাঁ, বলো ।’ বলল বটে বর্ণমালা কিন্তু কণ্ঠস্বরে প্রাণ নেই ।
‘বলব । তার আগে তুমি বলো তোমার কী হয়েছে? এমন দেখাচ্ছে কেন?’
বেশ খানিকটা সময় চুপ করে রইল বর্ণমালা । তারপর ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘বাসা থেকে আমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে ।’
খবরটা শুনে খানিকক্ষণ বিমূঢ় হয়ে রইল অর্ণব । তারপর জানতে চাইল, ‘বিয়ে মানে? কার বিয়ে? কিসের বিয়ে? কার সাথে বিয়ে?’
‘একবার তো বললাম, আমার বিয়ে । ভাইয়ারা আমার বিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে । পাত্র দেখা চলছে ।’
‘কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কেন? তোমার তো ফার্স্ট ইয়ারও কমপ্লিট হয়নি ।’
‘তুমি তো জানো, বাবা মারা যাবার পর থেকে ভাইয়ারা আমাকে আর মাকে নিয়ে কী ভীষণ সমস্যায় পড়ে গেছে । কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না । এ ওকে দেখায়, ও তাকে । মাকে তো ঘাড় থেকে ফেলে দিতে পারছে না, তাই আমাকে যত তাড়াতাড়ি বিদায় করা যায় ততই ভালো ।’
‘কিন্তু তোমার পড়াশোনা, তার কী হবে?’
‘বড় ভাইয়া বলেছেন, বিয়ের পর পড়াশোনা করব । পড়াশোনা করাতে রাজি এমন পাত্র দেখেই বিয়ে দেবেন ।’
‘এখন কী করবে?’
ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বর্ণমালা বলল, ‘জানি না ।’
‘সবকিছু চুপচাপ মেনে নিবে? কিছুই বলবে না?’
‘বলে লাভ কী? কে শুনতে বসে আছে?’
অর্ণব চুপ করে গেল । বর্ণমালা চোখ তুলে অর্ণবের দিকে তাকাল । চোখে চোখ পড়তেই অর্ণব চোখ সরিয়ে নিল ।
খানিকক্ষণ চুপ থেকে বর্ণমালাই আবার বলা শুরু করল, ‘ভাইয়ারা আমার জন্য আহামরি ভালো কোনো পাত্র খুঁজছেন না । মোটামুটি ভালো ফ্যামিলি আর ছেলের আয়-রোজগারের একটা ব্যবস্থা থাকলেই চলবে । মোটকথা, আমাকে কোনোভাবে ঘাড় থেকে নামাতে পারলেই হলো ।’
‘আমাকে কী করতে বলো?’
বর্ণমালা হঠাৎ অর্ণবের ডান হাতটা তুলে তার দু’হাতের মুঠোয় পুরে শক্ত করে চেপে ধরল । শরীর সামান্য ঘুরিয়ে বসল, সরাসরি অর্ণবের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘অর্ণব, এখন তো কোচিংগুলোতে পড়িয়ে অনেক ভালো টাকা পাওয়া যায় । তারপর ধরো, টিউশনি আছে, ছোটখাট পার্টটাইম জব আছে; চেষ্টা করলে কিছু-না-কিছু একটা ব্যবস্থা তো হয়ে যাবেই । তুমিও কিছু করলে, আমিও কিছু করলাম । পারব না আমরা? তুমি যদি তোমার ফ্যামিলিকে রাজি করাতে পারো, আমার ভাইয়ারা মনে হয় না আর আপত্তি করবে ।’
‘কিন্তু তা কী করে হয়?’ ক্ষীণ কণ্ঠে বলল অর্ণব ।
‘কেন হয় না অর্ণব? কোথায় সমস্যা? বাসার মানুষজন? বাবা-মা?’
‘না । বাবা-মা রাজি হলেও সম্ভব হতো না ।’
‘কিন্তু কেন?’ অসহিষ্ণু গলায় বলল বর্ণমালা ।
‘তোমাকে যে কথাটা বলব বলেছিলাম,’ একটা ঢোঁক গিলে বলল অর্ণব । ‘গতকাল আমার জয়েনিং লেটার হাতে পেয়েছি । আমার নেভিতে চান্স হয়ে গেছে বর্ণ ।’
‘সত্যি!’ এই প্রথম একটা খুশির ঝিলিক দেখা গেল বর্ণমালার দু’চোখের তারায় । খুশিতে অর্ণবের হাতটা আরও জোরে চেপে ধরে বলল, ‘তাহলে তো সব সমস্যার সমাধান হয়েই গেল, এমন একটা পাত্র পেলে আমার ভাইয়ারা হাতছাড়া করতে চাইবে না ।’
‘সব সমস্যার সমাধান হয়নি বর্ণ,’ বর্ণমালার উচ্ছ্বাসে জল ঢেলে দিল অর্ণব । ডিফেন্সের চাকরির কিছু নিয়মকানুন আছে; সার্টিফিকেটে পঁচিশ না হলে বিয়ে করা যায় না, আমার এখনো ছয় বছর বাকি । তারপর একটা নির্দিষ্ট র্যাঙ্ক পর্যন্ত প্রমোশন না-হওয়া পর্যন্ত বিয়ে করার পারমিশন নেই ।’
‘তাই?’
‘হুম ।’
বর্ণমালা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে কী যেন ভাবল । তারপর বলল, ‘তাহলে যেও না নেভিতে । তুমি ভালো ছাত্র, চেষ্টা করলে তো ভালো কোনো ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেও অনেক ভালো কিছু করা যায় । তবুও তো আমরা একসাথে থাকতে পারব ।’
‘তা কী করে হয়?’ আমতা আমতা করে বলল অর্ণব । ‘তুমি তো ভালো করেই জানো, এটা আমার কতদিনের শখ । যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকে এই স্বপ্নটাই দেখেছি । প্রথমবার চান্স না পেয়েও, শুধু ডিফেন্সে যাব বলে দু’-দুটো পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েও পড়লাম না । একটা বছর সময় নষ্ট করলাম, এত পরিশ্রম করলাম, ব্যাচমেটদের সবার থেকে, এমনকি তোমার থেকেও জুনিয়র হয়ে গেলাম, সবকিছু তো ওই একটা জিনিসের জন্যই ।’
‘তাহলে?’ জানতে চাইল বর্ণমালা ।
‘তোমার ভাইয়ারা ছয় বছর অপেক্ষা করতে রাজি হবে?’
‘প্রশ্নই আসে না । তাঁরা তো পারলে কাল-পরশুর মাঝেই আমার বিয়ে দিয়ে দেয় ।’
অর্ণব আর কিছু বলল না । বর্ণমালাও চুপ করে রইল । দু’জনেই জানে তাদের অনাগত ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে, তবু দু’পক্ষই রক্ষা করে চলল নীরবতার এই সম্ভ্রমটুকু । অর্ণবের হাতটা তখনো বর্ণমালার মুঠোর মাঝে ধরা ।
সন্ধ্যা নেমে আসছে ক্রমশ । আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে আবির রঙ । শীতের সংক্ষিপ্ত বিকেল একসময় পুরোপুরি মিলিয়ে গেল, আজকের এই নীরবতার অভিনয়ের পালাটুকুও শেষ হলো ।
‘তুমি ভালো থেকো বর্ণ ।’ নিজের হাতটা বর্ণমালার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল অর্ণব । উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘সবকিছু তো আমাদের হাতে থাকে না । ধরে নাও, এটাও তেমনই একটা বিষয় । ভাগ্য আমাদের এক হতে দেয়নি । শুধু জেনে রেখো, আমি তোমাকে সত্যিই অনেক ভালোবাসতাম । তোমাকে নিজের মতো করে পেতে চাইতাম । তোমার প্রতি আমার ফিলিংসে্‌ কোনো খাঁদ নেই । কিন্তু ওই যে বললাম...ভাগ্য ।’ একটু থেমে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অর্ণব । বর্ণমালার বাঁ গালটা একটু ছুঁয়ে আবার বলল, ‘তুমি ভালো থেকো বর্ণমালা, অনেক ভালো থেকো । আমি যেখানেই থাকি সবসময় প্রার্থনা করব, তুমি যেন সুখী হও ।’
কথা শেষ করে অর্ণব আর একটা মুহূর্তও দাঁড়াল না । যেদিক দিয়ে এসেছিল, সোজা সেদিকেই চলে গেল । বর্ণমালা তার যাবার পথের দিকে তাকিয়ে রইল । চোখের কোণে এক ফোঁটা অশ্রু জমতে গিয়েও জমতে পারল না, বর্ণমালা ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে তাকে শুষে নিল ।

হাঁটতে হাঁটতে বাসাবো থেকে আরামবাগ পর্যন্ত চলে এল অর্ণব । এতদূর হেঁটে আসতে গিয়ে পা ধরে গেছে । একবার ভাবল, রিক্সা ডাকে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ইচ্ছে করল না ।
ওদের কলেজের কাছাকাছি পৌঁছে ফুট ওভারব্রিজের ওপর উঠে পড়ল অর্ণব । এই জায়গাটা তার অসম্ভব পছন্দের । যখন সে এই কলেজে পড়ত, তখন প্রায় সন্ধ্যায়ই ক্লাস শেষে একা একা এই ফুট ওভারব্রিজের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে থাকত । কলেজ জীবন শেষ হলেও এই ওভারব্রিজের মায়া কাটাতে পারেনি অর্ণব, প্রায়ই সে চলে আসে এখানে । যখন বিকেলের সব আলো নিভে আসতে থাকে, সোডিয়াম বাতিগুলো একটা একটা করে জ্বলে উঠতে শুরু করে, সন্ধ্যার সেই স্বর্ণালী সময়টায় এখানে দাঁড়িয়ে নিচের ব্যস্ত সড়ক দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়িগুলো দেখতে কী যে ভালো লাগে । ওপর থেকে গাড়িগুলোকে দেখতে অনেক ছোট মনে হয়; মানুষগুলোকেও । মনে হয় পুরো পৃথিবীটা তার কাছে ছোট হয়ে আসছে । অনেক ছোটর মাঝে সে-ই একমাত্র বড় । কেন যে সেই ছোট হয়ে আসা পৃথিবীটাকে ওপর থেকে দেখতে এত ভালো লাগে!
অর্ণবের কলেজের কম্পাউন্ডটাও ভীষণ সুন্দর ছিল । কত রকমের গাছ যে ছিল; কাঠ গোলাপ, বোতল ব্রাশ, নাগলিঙ্গম, আরও কত অদ্ভুত অদ্ভুত সব নাম সেই সব গাছের । একটা গাছ ছিল—গগনশিরীষ । কলেজে দেখার মতো আরও কত কিছু ছিল কিন্তু অর্ণবকে ওই এক গগনশিরীষ গাছটাই টানত । গাছটার সামনে সে কতদিন একা একা গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে । প্রকাণ্ড উঁচু একটা গাছ । হঠাৎ হঠাৎ গাছটাকে দেখলে মনে হতো, গাছটা বুঝি বেড়ে উঠতে উঠতে আকাশ ফুঁড়ে ওপরে উঠে যেতে চাইছে । এই কারণেই এই গাছটার নাম গগনশিরীষ । এই গাছটার সামনে যখনই সে দাঁড়াত তখনই তার মনে হতো, একদিন এই গাছটার মতো বড় হতে হবে । গগনশিরীষের মতো আকাশসমান উঁচু হতে হবে । গগনশিরীষকে দেখতে যেমন মানুষের ঘাড় উঁচু করে তাকাতে হয়, তেমনি তাকে দেখতেও ঘাড় উঁচু করে তাকাতে হবে ।...
আজ অর্ণবের মনটা সত্যি খুব খারাপ । সে বর্ণমালাকে ভালোবাসত, অনেক ভালোবাসত । সব কিছুর বিনিময়ে তাকে পেতে চাইত । সব কিছুর বিনিময়ে? কথাটা কি সত্যি? তাহলে আজ কেন বর্ণমালার কথায় সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আরও শক্ত করে তার হাতটা ধরে সে বলতে পারল না, যাই হোক বর্ণমালা, আমি তোমার পাশে আছি, সবসময় থাকব । কেন বলতে পারল না? কোথায় বাধছিল তার?
ওভারব্রিজের মাঝামাঝি একটা জায়গায় রেলিঙে দু’হাতের বাহুর ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াল অর্ণব । ছোট হয়ে আসা গাড়িগুলোকে দেখতে লাগল । গাড়িগুলো একদিক থেকে এসে আরেকদিকে চলে যাচ্ছে । মানুষের জীবনটাও তো এই গাড়িগুলোর চলার পথের মতোই । সেই কোন ছোটবেলায় ছোটমামার মুখে শুনেছিল, ‘বুঝলি অর্ণব, বড় হয়ে সোলজার হবি । সোলজার হয়ে যুদ্ধে গেলে তোকে অনেক মানুষ স্যালুট করবে ।...’ তারপর থেকে অর্ণব মনের ভেতর সেই স্বপ্নটাকে পুষে রেখেছে । সযত্নে তাকে বাড়তে দিয়েছে । অবশেষে তার আশৈশবলালিত স্বপ্ন পূরণ হয়েছে । আজ বর্ণমালার এক কথায় কীভাবে সে তার এতদিনের কাঙ্ক্ষিত বস্তুকে ফিরিয়ে দেয়? সেটাও কি সম্ভব?
না, কখনোই না । তবু কেন মনটা এমন বিষাদে ছেয়ে যাচ্ছে? অর্ণব কি তাহলে ভুল করল?...

…অবশেষে ভুল ভাঙল অর্ণবের । দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে গেল । সব দোটানাকে পেছনে ফেলে, পৃথিবীর সবকিছুকে একদিকে সরিয়ে, শুধুমাত্র ভালোবাসার টানে সে চলে এল বর্ণমালার কাছে । বর্ণমালা একা একা বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে আছে । অর্ণব তার পেছনে এসে দাঁড়াল । একটা হাত রাখল বর্ণমালার কাঁধে ।
‘কে!’ চমকে উঠল বর্ণমালা ।
‘আমি…আমি অর্ণব ।’
‘অর্ণব! তুমি এসেছ?’
‘হ্যাঁ, আমি এসেছি বর্ণমালা ।’
‘কিন্তু তোমার তো এখন বহুদূরে থাকার কথা । বহুদূরের কোনো সমুদ্রে ।’
‘আমার ভুল ভেঙে গেছে বর্ণ । আমি একটা ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে এতদিন বেঁচে ছিলাম । আজ সব সংকোচ দূর হয়ে গেছে । তোমার চাইতে বড় আমার জীবনে আর কীই-বা হতে পারে?’
‘সত্যি ভুল ভেঙেছে?’
‘হুম,’ অর্ণব লাজুক মুখে হাসল । ‘আমি আমার জয়েনিং লেটার ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি ।’
‘সত্যিই তুমি এসেছ! আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না ।’
‘আমি এসেছি বর্ণমালা । সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছি । শুধু তোমার জন্য বর্ণমালা, শুধু তোমার জন্য ।’
অর্ণব বর্ণমালার অনেক কাছে সরে আসে । অনেক কাছে । বর্ণমালার সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হতে থাকে ।...

...‘কী হয়েছে বর্ণ? এমন করছিস কেন? দুঃস্বপ্ন দেখেছিস?’ মায়ের ডাকে বর্ণমালার ঘুম ভাঙ্গে ।
‘হুম...কই?...না তো...’ চোখ পিটপিট করে তাকায় বর্ণমালা ।
‘যা, চোখে-মুখে পানি দিয়ে আয় । ভালো লাগবে ।’
বর্ণমালা উঠে পড়ে । বাথরুমে গিয়ে চোখে সামান্য পানির ঝাপটা দেয়, ঘরে ফিরে এসে ঢকঢক করে অনেকটা পানি খেয়ে ফেলে । বিছানায় শুতে গিয়েও কী মনে করে আর শোয় না । শোবার ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দায় এসে দাঁড়ায় । এখন মধ্যরাত । বাকিটা সময় তাকে জেগেই কাটাতে হবে । ঘুমুতে গেলেই স্বপ্নেরা তাড়া করবে ।
জীবন স্বপ্ন না, স্বপ্নের মতো সুন্দর না । জীবন গল্প-উপন্যাসের মতো মধুরও না; জীবন শুধুই এক অমসৃণ কঠিন বাস্তব । স্বপ্নে অর্ণবদের ভুল ভাঙে, তারা বর্ণমালাদের কাছে ফিরে আসে । গল্প-উপন্যাসে অর্ণবরা জয়েনিং লেটার ছিঁড়ে ফেলে, বাস্তবে নয় । বাস্তবে অর্ণবরা অনেক হিসেবী, অনেক চৌকস । সামান্য বর্ণমালার জন্য তারা কখনোই আকাশে ওঠার টিকিট ছিঁড়ে ফেলে না । বাস্তবের অর্ণবরা কোনোদিনই ফেরে না; তাদের আচ্ছন্ন করে রাখে সুউচ্চ পাহাড়, সুনীল আকাশ, সুগভীর সমুদ্র—এদের হাতছানিকে অর্ণবরা কখনোই অগ্রাহ্য করতে পারে না । বর্ণমালাদের আহ্বান তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না ।
তবে বাস্তবের বর্ণমালারা কিন্তু ঠিকই অপেক্ষা করে । অপেক্ষা করে এমন একটি দিনের জন্য, যেদিন কোনো একটা অচেনা রাস্তা দিয়ে চলার পথে কেউ একজন পিছু ডেকে বলবে, আমি সব ফেলে চলে এসেছি, সব ফেলে । শুধু তোমার জন্য বর্ণমালা, শুধু তোমার জন্য ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন