বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জুন ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৪টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৩৮

কষ্ট (জুন ২০১১)

মোট ভোট ৩৮ দু'টি মৃত্যু

ইমরান খান
comment ১৪  favorite ২  import_contacts ৩৭৩
(১)
''এঙ্কিউজ মি, এটা কোন থানা?"
গুলশান থানার ওসি আকরাম হোসেন মহাবিরক্ত হয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝবয়সী ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন। চল্লিশ/পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স্ক মাঝারি উচ্চতার একজন মানুষ। মাথার কোঁকড়ানো চুল জেল মেখে সুক্ষ্ণ দাঁতের চিরুনি দিয়ে টেনে সোজা করার চেষ্টা করা হয়েছে। চেষ্টা মোটামুটি ব্যর্থ বলা চলে। কারণ, জেল আর চিরুনির কড়া শাসন ভেঙে কোঁকড়া চুল তার স্বরূপে ফিরতে শুরু করেছে। কপালের চিন্তার সিঁড়ি এবং কোঁচকানো ভ্রুর নিচে উদ্বিগ্ন দুটি চোখ দামি ফ্রেমের চশমায় ঢাকা। চশমাটি তাঁর সম্ভ্রান্তটা রক্ষা করলেও এর পুরু কাঁচ নির্ঘুম চোখের কালিকে স্পষ্টতর করে তুলেছে। স্যুট পরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে প্রথম দর্শনে কালের কর্কশ কষাঘাতে পতনোন্মুখ কোন প্রাচীন মূর্তি বলে মনে হয়।
''কী চাই?" যুগপৎ উদাসীন এবং বিরক্ত কণ্ঠে বললেন আকরাম হোসেন।
''একটা জিডি করতে চাই।"
''বসেন।" হাই তুলতে তুলতে সোজা হয়ে বসলেন আকরাম হোসেন,''জিডি করার কারণ?"
''জ্বী?"
''বলছি জিডি করতে চান কেন?"
''জিডি কেন করে মানুষ?" সরল প্রশ্ন ভদ্রলোকের।
বিরক্ত মুখে সিগারেট ধরালেন আকরাম হোসেন,''আপনার কি মানিব্যাগ হারিয়েছে? মোবাইল চুরি হয়েছে? নিজের বউকে খুঁজে পাচ্ছেন না? আইডেন্টিটি কার্ড খোয়া গেছে? কেউ হুমকি ধমকি দিয়েছে? কী সমস্যা না বললে জিডি করব কি করে?"
অপ্রস্তুত হয়ে অমায়িক হাসলেন ভদ্রলোক,''একটা সিগারেট পেতে পারি? ধন্যবাদ। জ্বী, আমার প্রাণ সংশয়।"
''কেউ কি আপনাকে খুন করার হুমকি দিয়েছে?"
''জ্বী।"
''কীভাবে? মোবাইলে? চাঁদা চাচ্ছে?"
''না, মুখে কিছু বলেনি। তার আচরণে আমার মনে হচ্ছে সুযোগ পেলেই সে আমাকে খুন করবে।"
কাগজ কলম নিলেন আকরাম হোসেন,''কী নাম আপনার?"
''নিজামুদ্দিন।"
''কী করেন?"
''বিজনেস।"
''থাকেন কোথায়?"
''উত্তরা।"
চোখ বড় বড় করে তাকালেন আকরাম হোসেন,''উত্তরা থেকে আপনি গুলশানে এসেছেন এই মাঝরাতে জিডি করতে? উত্তরা থানা কি সরকার তুলে দিয়েছে?"
''ও, এটা গুলশান থানা?"
''আপনি জানেন না?"
''জ্বী না। এই মাত্র পথে তাকে দেখলাম তো, তাই সামনে থানা পেয়ে ঢুকে পড়েছি।"
''কাকে দেখলেন এই মাত্র?"
''যে আমাকে খুন করবে।"
''সে কে? নাম কি?"
''নাম তো জানি না। তবে দেখলে চিনতে পারব।"
''কোথায় থাকে জানেন?"
''জ্বী না। তার চেহারা ছাড়া আর কিছুই আমি জানি না।"
''মুশকিলে ফেললেন। সে আপনাকে খুন করতে চায় বুঝলেন কি করে?"
''তার সাথে আমার যেখানে সেখানে দেখা হয়। বাসে, ট্রেনে, ফুটপাতে, রেস্টুরেন্টে। আমার দিকে তাকিয়ে সে হাসে, সেই হাসিতে মিশে থাকে তীব্র বিদ্রূপ আর কটাক্ষ। তার ডান হাতটা সবসময় জিনসের পকেটে লুকানো থাকে। আমি আতঙ্কে অস্থির হয়ে থাকি কখন ওই পকেটে লুকানো একটি আগ্নেয়াস্ত্রের একটি মাত্র বুলেট আমাকে ভেদ করে অদৃশ্য হয়ে যাবে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এক মোহনীয় আকর্ষণ আছে তার চোখে, হাসিতে। আমাকে প্রায় হিপনোটাইজ করে ফেলে ওই চেহারা। অনেক কষ্টে আমি তার কাছে ছুটে যাওয়া থেকে নিজেকে ফিরিয়ে রাখি।"
''হুম।" চিন্তিত মুখে থুতটি চুলকালেন আকরাম হোসেন,''ঘটনা শুনে মনে হচ্ছে কেউ আপনার পেছনে ভাড়াটে খুনি লেলিয়ে দিয়েছে। সে আপনাকে যত্রতত্র ফলো করছে। মোক্ষম সুযোগ খুঁজছে গুলি করার। তবে ব্যাপারটা অন্যরকমও হতে পারে। হয়ত কেউ আপনার সম্পর্কে খোঁজ খবর করছে। টিকটিকি লাগিয়েছে পেছনে। লোকটা দেখতে কেমন?"
'' পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলে। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, লম্বা চুল, খদ্দরের পাঞ্জাবি আর জিনস পরা, ডান হাত পকেটে।"
'' আপনার কাউকে সন্দেহ হয়? কোন ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী?"
এক মূহুর্ত চিন্তা করলেন নিজামুদ্দিন,''ওসি সাহেব, ব্যবসা এক ধরণের প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা মানেই প্রতিদ্বন্দ্বীর উপস্থিতি। তবে আমাকে খুন করতে চাইবে এমন কারো কথা মনে পড়ছে না। আমি কোন বিজনেস ম্যাগনেট নই, ছোট খাট ব্যবসা করি। আমার প্রতিদ্বন্দ্বীরা খুব বেশি হলে ফোনে হুমকি ধমকি দিতে পারে, কিংবা বদনাম রটিয়ে আমার বাজার খারাপ করতে পারে। খুন করার বা টিকটিকি লাগানোর কোন দরকার দেখছি না।"
''তবুও খুন হয় নিজামুদ্দিন সাহেব। আমার তেইশ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কারণের চেয়ে অকারণে খুনের সংখ্যা কম নয়।"
''তা অবশ্য ঠিক। মানুষ তো নিজেকেও খুন করে। এ জন্য আপনি কাকে গ্রেফতার করবেন? হতাশা, অবসাদ, বিতৃষ্ণা এদেরকে তো আর গ্রেফতার করা সম্ভব না।"
''বেশ ইন্টারেস্টিং কেস।" নড়ে চড়ে বসলেন আকরাম হোসেন,''বহুদিন এমন কেস পাইনি। বস্তাপচা কেস ঘাটতে ঘাটতে জীবনটাও পচে গেল। চা খেলে কেমন হয়?"
''ভাল হয়, কিন্তু এত রাতে কি চা পাওয়া যাবে?"
''নিজামুদ্দিন সাহেব, এটা থানা। ঘুষ, কয়েদী, চা আর ফাইল বন্দী কেস, এই চারটি জিনিস এখানে চব্বিশ ঘণ্টা অ্যাভেইলেবল। মাঝরাতে এসেছেন বলে সরাসরি আমার ঘরে ঢুকে পড়লেন। দিনের বেলা এলে কতক্ষণ বাইরে সিরিয়ালে থাকতেন বলা যায় না। হয়ত সেন্ট্রিকে ঘুষও দিতেন। সেন্ট্রি!"
চা এলো, সিগারেট জ্বলল। আকরাম হোসেনের চেহারায় একটা সুখী সুখী ভাব চলে এসেছে,''বুঝলেন নিজামুদ্দিন সাহেব, কিছুই না বুঝে পুলিশের চাকরিতে ঢুকে পড়েছিলাম। জীবনটা নষ্ট করে ফেললাম। ঘুষ খেতে খেতে সরষে ইলিশের স্বাদ ভুলতে বসেছি।"
''ঘুষের স্বাদ সরষে ইলিশের চেয়েও চমৎকার নাকি?"
''ঠিক তা না। তবে সত্য কথা হচ্ছে, ঘুষ না খেলে বর্তমানে ইলিশ খাওয়া দুষ্কর। আবার ঘুষ খেলে ইলিশের স্বাদ নেবার ক্ষমতা কমে যায়, তাও সত্য।"
''আমারও অবস্থা আপনার চেয়ে খুব একটা ভাল না।"
''কীরকম?"
সিগারেটে সুদীর্ঘ টান দিয়ে বিলীয়মান ধোঁয়ার সাথেই যেন মিশে গেলেন নিজামুদ্দিন,''এখন ভাবলে অবাক লাগে, ছাত্রজীবনে আমি বই পড়তাম। আরো অবাক লাগে যখন ভাবি বেকার থাকতে আমি রাতে শান্তিতে ঘুমোতাম।"
''এখন কি রাতে ঘুম হয় না?"
''ওসি সাহেব, ব্যবসায়ীরা মোটামুটি দুটো কমন সমস্যায় ভোগে। গ্যাস্ট্রিক আর ইনসমনিয়া। চোখের নিচে কালি দেখে বুঝতে পারছেন না? আমার মাথার দিকে চেয়ে দেখুন। ছত্রিশ বছর বয়সে শতকরা চল্লিশটি চুল পেকে গেছে। ক্লিন শেভড না হলে দেখতেন, সিংহভাগ দাড়ি সাদা। হাঁটার সময় আমি আপনা আপনি কুঁজো হয়ে যাই।"
''তাই নাকি?"
''আরেকটা সিগারেট দিন ওসি সাহেব। থ্যাংকস। হ্যাঁ তাই। আকাশটা যেন আমার মাথার চেয়েও দু'ইঞ্চি নিচে নেমে এসেছে, ''তব উন্নত মম শির" আমার আর হচ্ছে না। এক সময় যদিও তাই ছিল। ব্যবসায় লোকসান হলে দুশ্চিন্তা, পরিবারের খরচ চলবে কী করে? লাভ হলে দুশ্চিন্তা, সামনের মাসেও এই পরিমাণ লাভ থাকবে তো? দিন দিন খরচ যেভাবে বাড়ছে, মাঝে মাঝে ব্যবসায়ে কিছু ভেজাল না দিলে চলে না। আমি না দিলে অন্যরা দেবে। পিছিয়ে পড়ব প্রতিযোগিতায়। এভাবে দিন যাচ্ছে আর কি। তার উপরে এই প্রাণ সংশয়। আচ্ছা ওসি সাহেব, একটা কথা বলুন তো।"
''কী কথা?"
''আমরা কোথায়?"
''ভুলে গেলেন? এটা গুলশান থানা।"
''গুলশান এলাকাটা কোথায়?"
''কী বলছেন বুঝতে পারছি না।"
''বলুন না, গুলশান এলাকাটা কোথায়।"
''ঢাকা শহরে।"
''সেটা কোথায়?"
''বাংলাদেশে।"
''এই দেশটার অবস্থান কোথায়?"
''পৃথিবী নামক একটি গ্রহে।"
''আমরা এখানে কেন?"
''মানে?"
''আমি কেন এই গ্রহের বাসিন্দা?"
''আপনার বাবা মা আপনাকে এখানে এনেছেন তাই।"
''বাবা মা আমাকে পেলেন কোথায়?"
''সৃষ্টিকর্তা আপনাকে উপহার হিসেবে তাদের কাছে পাঠিয়েছেন।"
''আমার মতামতের কোন প্রয়োজন পড়ল না?"
সিগারেটে টান দিতে ভুলে গেছেন আকরাম হোসেন,''কী বলছেন নিজামুদ্দিন সাহেব?"
''ভেবে দেখুন ওসি সাহেব, আমার কোন মতামত ছাড়াই আমাকে এই নরকে পাঠিয়ে দেয়া হল। আমাকে একবার অন্তত জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করলেন না ঈশ্বর? আমার তো পৃথিবীতে আসার ইচ্ছে নাও থাকতে পারত। জোর করে আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়ে বলা হল পুণ্য কর, পুণ্য কর নয়ত জাহান্নাম। অথচ পুণ্য করার মত কোন পরিস্থিতিই এখানে নেই। পৃথিবী আর ব্ল্যাক হোলের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখি না আমি। এই ভয়ংকর বিশ্ব এক সর্বনাশিনী বেশ্যার মতই আমাকে আকর্ষণ করে। সর্বনাশ জেনেও বেঁচে আছি। মাঝে মাঝে ভাবি, পৃথিবী নামক জায়গাটা সৃষ্টি করার পর আবার সৃষ্টিকর্তার কেন আলাদা করে একটা জাহান্নাম তৈরি করার প্রয়োজন পড়ল?"
আকরাম হোসেন এবং নিজামুদ্দিন একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাকিয়ে আছেন কিন্তু দেখছেন না। নিজামুদ্দিন বলতে লাগলেন,'' আমার যদি জন্ম না হত, তবে বিশ্ব শান্তির কি কোন সমস্যা হত? যেদিন আমি থাকব না, সেদিন কি এই পৃথিবী কিছু হারাবে? তবে কেন আমি এখানে, এই সময়ে, এই দেশে এই পরিবারে? আমার অস্তিত্বের সার্থকতা কোথায়? তার উপরে আবার এই খুনি আমার পেছন পেছন ঘুরছে।"
ঘোর লাগা চোখে কিছুক্ষণ বসে রইলেন আকরাম হোসেন। অকালে অপঘাতে নিভে যাওয়া সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন। শেষবারের মত একবার পোড়া তামাকের গন্ধ ছড়িয়ে মুখ থুবড়ে ছাইয়ের গাদায় পড়ে রইল সেটা, ''চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি কী করা যায়। ব্যাটা খুব সাহসী বলে মনে হচ্ছে না। নইলে এতদিন পেছন পেছন ঘোরে? প্রফেশনাল খুনিরা কখনোই খুন করার আগে সামনে আসে না। কটাক্ষ মাখা হাসি তো দূরের কথা। নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি যান। আমাদের গাড়ি আপনাকে পেঁৗছে দেবে। ভয়ের কিছু নেই।"
(২)
গালিয়াকান্দা থানার ওসি আমিনুল্লাহর মন আজ বেশ ফুরফুরে।
আজ তিনি তিন তিনটে ঘুষের প্রস্তাব আনন্দের সাথে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতার হুমকি ধমকিকেও উপেক্ষা করেছেন নির্বিকার ভাবে । দীর্ঘদিন সাধনার পর তিনি ঘুষ না খাওয়াটাকে এক ধরণের আর্ট হিসেবে নিতে শিখেছেন। আর্টিস্ট হয়ে ওঠার উপযুক্ত পুরস্কারও পেয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতে হতে আপাতত এসে ঠেকেছেন এই জরাজীর্ণ মফস্বল শহরে। এই বোধহয় শেষ। আগামী মাসেই তাঁর অবসর নেবার কথা।
''আসতে পারি?"
আমিনুল্লাহ দেখলেন বিষণ্ণ বিকেলের আলোয় থানার দরজার কাছে পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে। মাথার অযত্ন লালিত ঈষৎ কুঞ্চিত কুচকুচে কালো চুল এলোমেলো। গালে সপ্তাহ খানেকের খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে টি শার্ট এবং জিনস। তার ডানহাত জিনসের পকেটে। ভাঙাচোরা দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে দেখে প্রাচীন ফ্রেমে বাঁধানো একটি সাম্প্রতিক ছবি বলে মনে হচ্ছে। আমিনুল্লাহ মাথা নেড়ে অনুমতি দিলেন। ইশারায় চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন। ভাল করে দেখলেন ছেলেটিকে। এই ছোট মফস্বল শহরের প্রায় সবাইকে তিনি চেনেন। একে কখনো দেখেছেন বলে মনে পড়ছে না।
''কী ব্যাপার বলুন।"
''একটা জিডি করতে চাই।"
''কারণ?"
''আমার প্রাণ সংশয়।"
''কীভাবে?"
''কেউ আমাকে খুন করতে চায়।"
''কে সে? নাম কি?"
''নাম ঠিকানা কিছুই জানিনা। তবে দেখলে চিনতে পারব।"
''সে আপনাকে খুন করতে চায় বুঝলেন কী করে?"
''সে আমাকে ফলো করে সব জায়গায়। পথে- ঘাটে, বাসে- ট্রেনে। এমন কী বাড়িতে আমার ঘরে ঢুকে পর্যন্ত বসে থাকে মাঝে মধ্যে। আমি যে থানায় এসেছি তাও সে জানে।"
''দেখতে কেমন?"
''দেখে ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। মধ্যবয়সী, স্যুট পরা। চোখে পাওয়ার ফুল চশমা।"
''আপনার নাম?"
''মিজানুদ্দিন।"
''শোনেন মিজানুদ্দিন। কেউ আপনাকে ফলো করলেই আপনি বলতে পারেন না যে সে আপনাকে খুন করতে চায়। এমন ভাবার পেছনে কী যুক্তি আছে?"
''তার চাহনি দেখলেই বুঝতে পারি। অদ্ভুত এক উন্মাদনা তার চোখে। কোন সুস্থ মানুষ এভাবে তাকায় না। ওই চেহারা দেখলেই এক চরম বিতৃষ্ণা চলে আসে জীবনের প্রতি। ওই লোকটার সবকিছুকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে হয়। তাঁর বাঁ হাতে একগাছা দড়ি। উপযুক্ত সুযোগ পেলেই সে আমাকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দেবে।"
''স্যুট পরা একজন মানুষ হাতে দড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে? আপনি ঠিক দেখেছেন তো?"
''ওসি সাহেব, হ্যালুসিনেশন একবার হতে পারে। আমি তো রোজই তাকে দেখছি।"
''আপনার কাউকে সন্দেহ হয়? কোন শত্রু?"
''খুন করার মত শত্রু আমার কেউ নেই। আমি নির্বিরোধী মানুষ।"
''নির্বিরোধী মানুষরা বিরোধী মানুষের চেয়ে খুন হয় কম না। কী করা হয়? পড়াশোনা?"
''পড়াশোনা শেষ করেছি। এখন প্রফেশনাল বেকার।"
''খরচ চলে কী করে?"
''এটা কি জানা জরুরি?"
''হ্যাঁ। যে আপনাকে ফলো করছে তার মোটিভ জানা দরকার।"
''দু'একটা টিউশনি করি।"
''ঢাকায় গিয়ে চাকরি খুঁজছ না কেন?" ছেলের বয়সী কাউকে বেশিক্ষণ আপনি বলতে পারেন না আমিনুল্লাহ।
''সেই সামর্থ্যর নেই। ইচ্ছাও নেই হয়ত বা।"
''ইচ্ছে নেই মানে?"
''বেশ তো আছি। খাচ্ছি দাচ্ছি, আড্ডা দিচ্ছি, রাতে শান্তিতে ঘুমাচ্ছি, নিশ্চিন্তে বই পড়তে পারছি। কারো কাছে দায়বদ্ধতা নেই। এখন যেমন আছি, ঢাকায় গেলে এর চেয়ে ভাল থাকব, এর কী নিশ্চয়তা আছে?"
''বারে। চাকরি করতে হবে না? বিয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে তো।"
''মানুষ বিয়ে করে কেন?"
''মানে?"
''মানুষ আসলে বিয়ে করে কী পায়?"
এই সরল প্রশ্ন নিজেকেও করলেন আমিনুল্লাহ। বিয়ে করে তিনি কি পেয়েছেন সেটা ভাবতে চেষ্টা করলেন। মানুষ বিয়ে করে শান্তির আশায়। সে বস্তু কি তিনি পেয়েছেন? বিয়ে না করলে কি তিনি এরচেয়ে শান্তিতে থাকতেন? যেহেতু বিয়ে করেই ফেলেছেন, কাজেই অবিবাহিত জীবন এরচেয়ে শান্তির হত কীনা বলা যাচ্ছে না। আবার যদি বিয়ে না করতেন, তাহলে বিবাহিত জীবন তার চেয়ে ভাল হত কীনা বলতে পারতেন না। অদ্ভুত জটিলতা!
''আমি জানি," মিজানুদ্দিনের কথায় আপাতত অদ্ভুত জটিলতা থেকে মুক্তি পেলেন আমিনুল্লাহ,''আমি জানি আমাকে চাকরি করতে হবে। হয়ত ঢাকায়ই যেতে হবে, সেখানে চাকরির সুযোগ বেশি। পরিবারের বড় ছেলে আমি। দায়িত্ব এড়ানো যাবে না। বিয়েও হয়ত করতে হবে। বিবাহিত মানুষের জন্য বাসা ভাড়া পাওয়া সহজ হয়।"
''আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি যান। গালিয়াকান্দা ছোট শহর। ব্যাটাকে খুঁজে বের করা কঠিন হবে না।"
ঋজু ভঙ্গিতে দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল মিজানুদ্দিন।
(৩)
কয়েকদিন পর একটি অখ্যাত দৈনিক পত্রিকার বিজ্ঞাপনের পাতার নিচে পরিত্যক্ত খালি জায়গায় দুটি অনুল্লেখ যোগ্য অপমৃত্যুর খবর ছাপা হয়।
খবর-১: উত্তরায় নিজামুদ্দিন নামের একজন ব্যবসায়ী নিজের লাইসেন্স করা রিভলভারের গুলিতে নিহত হয়েছেন। ডান চোয়ালের হাড় গুঁড়ো করে বাম কানটা উড়িয়ে নিয়ে গেছে বুলেট। রিভলভারে কারো হাতের ছাপ আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তার মৃতদেহের পাশে কম্পিউটার কম্পোজ করা একটা চিরকুট পাওয়া গেছে। চিরকুটে লেখা আছে- অনধিকার প্রবেশের অপরাধে নিজামুদ্দিনকে হত্যা করা হল।
খবর-২: গালিয়াকান্দা থানার রঘুনাথপুর গ্রামে মিজানুদ্দিন নামে একজন যুবকের গলায় ফাঁস দেয়া ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার রেখে যাওয়া চিরকুটে লেখা- সীমালঙ্ঘন করার পূর্বেই মিজানুদ্দিনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হল।
আমাদের প্রতিবেদক জানাচ্ছেন, মৃত্যুর পূর্বে এরা দু'জনেই থানায় জিডি করেছিলেন যে কেউ তাদের খুন করতে চায়। গুলশান এবং গালিয়াকান্দা থানা পুলিশ জানায়, এরা যে শত্রুর বর্ণনা দিয়েছিলেন, তেমন কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • শুকনো পাতা
    শুকনো পাতা গল্পটা খুবই সুন্দর,পড়ে ভালো লাগল।
    প্রত্যুত্তর . ২৭ জুন, ২০১১
  • সূর্য
    সূর্য গল্পে ডায়লগের আধিক্য একটা নাটক নাটক ভাব নিয়ে আসে যেমন''আরেকটা সিগারেট দিন ওসি সাহেব। থ্যাংকস। হ্যাঁ তাই।">> এখানে ওসি সাহেব সিগারেট দিলেন এবং নিজামুদ্দন তা নিলেন দৃশ্যটা নাটকেরইতো। ডায়লগ থাকবেই না এমন নয়। এমনিতে গল্পটা অনেক সুন্দর হয়েছে। আচ্ছা নিজা...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৮ জুন, ২০১১
  • ঝরা
    ঝরা অ সাধারন লিখেছেন l
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুন, ২০১১