বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ জানুয়ারী ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ৭টি

সমন্বিত স্কোর

৪.০৯

বিচারক স্কোরঃ ২.০৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৪ / ৩.০

মানুষ কাহারে বলি

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

পতিত প্রেম

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

বিপ্লবীর মৃত্যু

শ্রমিক মে ২০১৬

গল্প - এ কেমন প্রেম? (আগস্ট ২০১৬)

মোট ভোট ১৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.০৯ কুলহারা কলঙ্কীনি

জসিম উদ্দিন আহমেদ
comment ১১  favorite ০  import_contacts ১৮২

সিরাজের কথা শুনে রফিক ওরফে ডাকু রফিক তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। সিরাজ যেন মিথ্যা বলছে।
‘কস কি সিরাইজ্যা! দেড় দুইশো লোক বাড়ী ঘিরা ফালাইছে?’
‘তবে আর কি কইতাছি উস্তাদ। বেবাক লোকের হাতে দা-লাঠি। অখন কি হইব ওস্তাদ?’
‘হইব হাতি আর ঘোড়া! রফিকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, চোখের পাতা পিটপিট করছে। সে এখন মারাত্মক কোন সিদ্ধান্ত নেবে। ডাকু রফিক যখন খারাপ কোন সিদ্ধান্ত নেয় তখন তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। চোখের পাতা পিটপিট করে। সে ঘরময় পায়চারি করতে থাকে। ঘরে তারা চারজন। সিরাজ রফিকের শিষ্য, সব সময় সাথে থাকে। ঘরের কোনায় খাটে বছর দুয়েকের একটি বাচ্চা মেয়ে ঘুমাচ্ছে। ঘুমন্ত মেয়েটির পাশে অপরূপ সুন্দরী মহিলাটি তার মা। মায়ের চোখে ভয় ও বিস্ময়। সে রফিক ও সিরাজের কান্ড-কারখানা দেখছে। বাইরে বহু লোকের শোরগোল শুনা যাচ্ছে। তারা মারাত্মক কোন কিছু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের কথায় মনে হচ্ছে তারা কারো জন্য অপেক্ষা করছে। সে আসলেই আসল খেলা শুরু হবে।

সিরাজ ডাকাতের সহচর হলেও তার ওস্তাদ রফিকের মতো সাহস তার নেই। ওস্তাদের মতো সাহস থাকলে সে আজ রফিকের জায়গায় থাকত। এ-লাইনে সাহসটাই বড় পুঁজি। যার বুকের পাটা যত চওড়া এ-লাইনে সে তত গেইন করতে পারে। রফিককে মোটেও চিন্তিত মনে হচ্ছে না। সে সিরাজকে অভয় দেয়। দেড়-দুইশ কিরে ব্যাটা! হাজার লোক আইলেও ডাকু রফিক ডরায় নাকি! ব্যাটা আমার লগে থাকলে সিনা টান টান কইরা থাকবি! একদম ডরাইবি না। হাতের কাছে যদি একটা কিছু থাকত!

ওস্তাদের কথায় সিরাজ তেমন আশ্বস্থ হতে পারে না। বাইরে ক্রোধোন্মত্ত জনতা দা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা এই ঘরে বন্দি। সবচেয়ে বড় কথা তারা নিরস্ত্র। কোন প্রকার হাতিয়ার তাদের কাছে নেই। আসার সময় সিরাজ বলেছিল, ওস্তাদ সাথে কইরা একখান দা অন্তত লইয়া চলেন। রফিক তাকে ধমক দিয়ে বলেছিল, ব্যাটা পিরিত করতে যাইতাছি। দা কুড়ালের কোন কাম নাই। ডাহাতি করবার সময় যত পারস প্যাছাত বাইন্দা দা কুড়াল লইয়া যাইস।

সিরাজ ঘনঘন তার ওস্তাদের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। রফিকের চেহারায় ভয়ের লেশমাত্র নেই। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, এসব ব্যাপারে সে খুব মজা পাচ্ছে। সে ঘরে হাতিয়ার কিছু খুঁজতে থাকে। আহা! হাতিয়ার না আনার জন্য তার আপসোসের শেষ নেই। হাতে একখান রামদা থাকলে ডাকু রফিক কাউকে পরোয়া করে না।

বাইরে শোরগোল আরো তীব্র হচ্ছে। দরজায় লাথি মারার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। তবে দরজা খুব মজবুত। এত সহজে ভাঙ্গতে পারবে বলে মনে হয় না। রফিক ভাবে, আর দেরি করা যায় না। যা করার তা এখনই করতে হবে। রক্তারক্তি একটা কান্ড না ঘটালে এখান থেকে বেঁচে ফেরা যাবে না! ঘরের কোনায় ঘুমন্ত মেয়ের পাশে বসে চন্দ্রাবতী ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। রফিক তার কাছে গিয়ে খপ করে হাতটা ধরে টান মেরে তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে, যদি বাঁচতে চাও তাইলে আমার কথা চুপচাপ শুইন্ন্যা যাও। কুন রহম চিৎকার চেঁচামেচি করবা তো এক্কেবারে জানে শ্যাষ!
চন্দ্রাবতী রফিকের কথায় আরো ভীত হয়। সে এতটাই ভয় পেয়েছে যে নিশ্বাস পর্যন্ত নিচ্ছে নিঃশব্দে।
“ঘরে ছুরি চাকু কিছু আছে? থাকলে অহনই বাইর কইর‌্যা দ্যাও” রফিক কঠিনস্বরে আদেশ করে।
চন্দ্রাবতীর মনে পড়ে কয়েকমাস আগে তার স্বামী বিদেশ থেকে বেশ বড়সড় একটি ছুরি পাঠিয়েছিল। মেয়ের ভয়ে ছুরিটি সে আলমারীতে তুলে রেখেছে। চন্দ্রাবতী মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছুরিটা বের করে রফিকের হাতে দেয়। একজন ভংকর ডাকাতের হাতে ছুরিটা দিলে কি অনিষ্ট ঘটবে তা ভাবার শক্তিও এমূহুর্তে তার নেই। মেয়ের অকল্যাণের ভয়ে তার সারা শরীর শিউরে উঠে। সে দৌড়ে মেয়ের বিছানায় যায়। ঘুমন্ত মেয়েকে সজোরে টেনে নিয়ে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। নিজের জীবন থাকতে মেয়ের কোন ক্ষতি হতে দেবে না।



সাহা বাড়ীর উঠোনে বহু লোকের ভিড়। সবার হাতে দা-লাঠি। তারা ক্রোধে ফেটে পড়ছে। এ-বাড়ীর মেঝ ছেলে ইন্দ্রজিৎ সাহার ঘরে ডাকাত পড়েছে। ইন্দ্রজিৎ বছর তিনেক ধরে বিদেশ রয়েছে। ঘরে তার মেয়ে ও বউকে ডাকাতরা জিম্মি করেছে। তারা ডাকাত দলকে ঘিরে ফেলেছে। তাদের ডাকাতের হাত থেকে কিভাবে উদ্ধার করা যায় এই নিয়ে সবাই চিন্তিত। সন্ধ্যার পর থেকে জল্পনা কল্পনা চলছে। কিন্তু কেউ কোন উপায় বের করতে পারেনি। বাইরে দিনের আলোর মত পরিস্কার জ্যোৎ¯œা। হঠাৎ ভয়ানক এক কান্ড ঘটল। ডাকাতের ঘর থেকে একটা কিছু জনতার ভিড়ের মধ্যে ছুড়ে মেরেছে। সে-টা দেখে লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচি একদম বন্ধ হয়ে গেছে। ঘটনার আকস্মিকতা ও ভয়বহতায় সকলে যেন মূর্তি হয়ে গেছে। কেউ চুল পরিমানও নড়ছে না। জীবন্ত মানুষের ছিন্ন একখানা হাত এ-টা। তাদের জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছে। একে একে ঘর থেকে মানুষের রক্তমাখা ছিন্ন মাথা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উঠোনে জনতার মাঝে এসে পড়তে লাগল। সকলের পা যেন মাটিতে পুঁতে গেছে। তারা অবাক বিস্ময়ে দেখল, রফিক ডাকাত রফিক ডাকাত দরজা খুলে ঘর হতে বের হচ্ছে। তার হাতে রক্তমাখা ছুরি। সে ছুরিটা চন্দ্রাবতীর গলায় ধরে রেখেছে। চন্দ্রাবতীর কোলে তার ঘুমন্ত মেয়ে। সে রফিকের আগে আগে হাঁটছে। আশপাশে মোটেও তাকাচ্ছে না। রফিক তার গলায় ছুরি রেখে পিছনে হাঁটছে। লোকজন সরে গিয়ে তাদের যাওয়ার জন্য জায়গা করে দিচ্ছে। কেউ টু শব্দটিও করছে না।


ফল্গুনের শুষ্ক মৌসুম এ-টা। মস্ত বিলের পুরোটা শুকিয়ে গেছে। আকাশে থালার মত শুক্লপক্ষের পূর্ণচাঁদ অকৃত্রিমভাবে জ্যোৎ¯œা বিলাচ্ছে। এই জ্যোৎ¯œায় একবার অবগাহন করলে বস্তুবাদী পৃথিবীর সবকিছু তুচ্ছ মনে হয়। ফাগুনের মৃদু হাওয়ায় ভেসে আসছে জানা-অজানা ফুলের সুবাস। খালের পাড় ধরে চন্দ্রাবতী হাঁটছে। তার পেছনে রফিক। রফিকের কাঁধে চন্দ্রাবতীর মেয়ে শিপ্রা। সে এখনো ঘুমাচ্ছে।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চন্দ্রাবতী ক্লান্ত। এ-ছাড়া চোখের সামনে এত্তসব ঘটনা ঘটেছে যে, সে নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। জলজ্যান্ত একটা মানুষকে নির্মমভাবে খুন হতে দেখেছে। সে ভয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। সিরাজের আর্তনাদ, চাপা গোঙ্গানি তারপরেও চন্দ্রাবতীর কানে খুব বাঁজছে। সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না।
‘ওস্তাদ! এইটা আফনে কি করতাছেন?
‘তোরে মুক্তি দিতাছি সিরাইজ্যা! পাপের জীবন থেইক্যা মুক্তি দিতাছি। তুই আমারে মাফ কইর‌্যা দিস্! এইটা করন ছাড়া এইখান থেইক্যা বাঁচনের আর কুন উপায় নাই’
‘আফনে এই মাগিডার জন্য আমার বুকে ছুরি বসাইলেন? আমি না আফনের শিষ্য?’
চন্দ্রাবতীর গাঁ গুলিয়ে আসে। সে খালের পাড়ে বসে বমি করে দেয়। রফিক কাছে এসে তার কাঁধে হাত রাখে।
‘শরীরডা কি খুবই খারাপ? এইতো পেরাই আইস্যা পড়ছি। আর একটু কষ্ট কর’।
চন্দ্রাবতী রফিকের কথার জবাব দেয় না। এই যাত্রার শেষ কোথায় তা তার জানা নেই। সে শুধু জানে ভয়ংকর একজন লোকের হাত ধরে সে কুলত্যাগী হয়েছে। মেয়েটি নিশ্চিন্তে রফিকের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। বড় অভাগীনি সে। জন্মের আগেই বাবা তার বিদেশ চলে গেছে। মেয়ে তো দূরে থাক, স্বামীর চেহারাটা চন্দ্রাবতীরও ভাল মনে নেই। মেহেদীর রং শুকানোর আগেই যে সে চলে গেল।
রফিক উঠার জন্য তাড়া দেয়। চন্দ্রাবতীর পা আর চলছে না। রফিক বুঝতে পারে তার কষ্ট হচ্ছে। সে কাছে এসে চন্দ্রাবতীর বা হাতটি নিজের কাঁধে তুলে নেয়। চন্দ্রাবতী রফিকের কাঁধে ভর দিয়ে চলতে থাকে। তাদের থেমে গেলে চলবে না। থেমে যাওয়ার আগে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন