বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৭৯
গল্প/কবিতা: ১৯টি

সমন্বিত স্কোর

৩.১২

বিচারক স্কোরঃ ১.৫২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬ / ৩.০

পাগলা রাজু ও সুপার ট্রান্সফার ডোর

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৬

ভালোবাসি তাই

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

ভালোবাসার একটি রাত

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

গল্প - ঘৃণা (সেপ্টেম্বর ২০১৬)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.১২ অষ্পষ্ট গোধুলী

জসিম উদ্দিন জয়
comment ৫  favorite ১  import_contacts ১৩৭
গ্রীষ্মের দুপুর প্রচন্ড গরম। দুপুর গড়িয়ে দিনটি তখন সোনালী বিকেলের দখলে। বিকেলের স্বর্ণালী সূর্য্যের আলো হঠাৎ রং পরিবর্তন করলো। আকাশটা অন্ধকার করে উঁড়ে এসে জুড়ে বসলো কালো মেঘ। খানিকটা ঘুরুম ঘুরুম শব্দ করে শুরু হলো বৃষ্টি। অঝরে ঝড় ঝড় বৃষ্টি আর উত্তরের বাতাসের ঝাপটায় নাহিদা খাতুনের ততক্ষনে মনে পরে তার মেয়ে ও ছাগলগুলোর কথা । বাঁশঝার পেরিয়ে মাঠের উত্তর কোনে নদীর ধারে মুলি বাশেঁর খুঁটিতে বড় দুটি ছাগল বেঁধে রেখেছে, সাথে চার পাঁচটি ছাগল-ছানা । তবে ছাগল ও ছাগল-ছানা নিয়ে তার কোন দুশ্চিন্তা তেমন নেই। মনে মনে প্রচন্ড ভয়-ডর করছে তার একমাত্র আদরের ফুটফুটে মেয়ে সোনীয়ার জন্য। দুপুরে দেখে এসেছে বড় কাঁঠবাদাম গাছটার ছায়ায় তালপাতার ডা¹া দিয়ে গাড়ি বানিয়ে খেলা করছে সোনীয়া আর গাবলু । তালপাতার ডা¹ার গোড়ালীতে বসে আছে সোনীয়া আর তালাপাতার আগার দিকটায় দাঁড় টানা নৌকার মতো টানছে মোটাসোটা গাবলু। গাবলু মোটাসোটা হলেও বেশ চালাক । বৃষ্টির একটু শব্দ পেলেই দৌঁড়ে বাসায় চলে যাবে। কিন্তু সোনীয়া একা একা ছাগলের মতো ব্যে. . ব্যে. . করে কাঁদবে ইত্যাদি নানান কথা ভাবতেই নাহিদা খাতুনের গতরটা ঝিম মেরে উঠে। তাছাড়া নদীতে একটু পরেই জোয়ার আসবে। কি ভয়ানক কান্ড ভাবতে না ভাবতে নাহিদা খাতুন এক দৌঁড়ে ঘর পেরিয়ে উঠোনে। বৃষ্টির পানি আর মাটির আঠালো কাদায় নাহিদা খাতুনের পা দু‘টি যেনো আঁকড়ে ধরেছে তার মাঝে উত্তরের ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির ঝাপটা। বাড়ীর উঠোনের তেঁতুল গাছের ডালপালাগুলো আছরে পড়ছে উঠোনে। নাহিদা খাতুন খানিকটা থমকে দাড়িঁয়ে ভাবছে, “এই সময় সোনীয়ার বাপটা কেন যে বাড়ীতে এলো না। সেই বিয়ানরাইতে বাড়ী থেকে বাইর হইছে, বিলেরধারে মাছ ধরতে গেছে, দুপুরে মানুষটা কি খাইছে আল্লাই জানে, । এখন কি করি, এই ঝড়ের মাঝে মাইয়্যাডারে কেমনে আনতে যাই।’’
অজানা আতংকে গাঁ শিউরে উঠছে। প্রচন্ড ঝড়ে নারিকেল গাছের একটি ডাল গায়ে পরতেই চোখ গড়িয়ে পানি পরতে থাকে নাহিদা খাতুনের। মাটিতে লুটিয়ে পরে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে বলতে থাকে,,‘‘ আল্লাহ্ রে.. আমার মাইয়্যাডারে ঘরে আইন্নাা দাও, আল্লাহ তোমার কাছে মানতি করি, আমার মাইয়্যাডারে ঘরে আইন্ন্যা দাও, আমি একটি ছাগল তোমার নামে জবাই কইরা এতিমদের দিয়া দিমু. . . . . . । কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়ায়। কালবৈশাখী ঝড়ের গতিবেগ প্রচন্ড হওয়ায় বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপটায় রোগাক্লান্ত নাহিদা খাতুন উঠোনে পরে যায়। নাহিদা খাতুনের গর্ভে পাঁচ মাসের শিশু সন্তান । তাই এবার সে উঠোনের পিচ্ছিল মাটিতে পরে উঠে দাড়াঁবার শক্তি ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। বাড়ীর দক্ষিন কোনে যেখানে খঁেড়র কুটের মাচাঁ তার পাশ দিয়েই গরুর গোয়াল ঘর। সেদিকটায় নাহিদা খাতুনের স্বামী জলিল বাড়ী ফেরে। তার কাঁধের একপাশে ফুটফুটে মেয়ে সোনীয়াকে তার পরিহত ছ্যোঁড়া জামাটি দিয়ে গুটিশুটি করে আগলে রেখেছে । কাধেঁর অন্যপাশে মাছ ধরার আনতা, পলো, কোনা জাল এর মধ্যে একটি সিলভারের হাড়ি।
ভোর হতেই পাখির গুঞ্জন আর কলকাকলির শব্দে গৃহপালিত মোড়গের এক্কা এক্কা শব্দে ঘুম ভাঙ্গে নাহিদা খাতুনের । নাহিদা খাতুনের মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকছে, মা . . . ও মা, ওমা. . . কথাকউ, মা . . . . তোমার কি হইছে, কথা কও. . . । পাশে বসে নাহিদা খাতুনের স্বামী জলিল, নাহিদা খাতুনের হাত ও পায়ে গরম শরিষার তৈল মালিশ করছে আর বলছে সোনীয়ার মা ও..ও.. সোনীয়ার মা, তোমার কি হইছে ? কথা কও। নাহিদা খাতুন চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে তার মেয়ে সোনীয়া । সোনীয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে। সোনীয়ার বাবা জলিলের মুখে হাসি ফুটে উঠে। সোনীয়ার বাবা নাহিদা খাতুনের দিকে মায়াবি দৃষ্টিতে তাকিয়ে খানিক রাগান্নিত স্বরে বলে,‘ এই ঝড়-তুফানের মইধ্যে তুমি ঘরেরত্তোন বাইর অইছো কেন ? বুঝছি মাইয়্যাডার জন্য বাইর অইছো। মাইয়্যাডা কি তোমার একলার . .। খুব হয়েছে এখন তারাতারি উঠো, কাইলে অনেকগুলা জিয়ান মাছ আনছি, ওই হাড়িটার মধ্যে টেংরা, বইচা, পুটি, গুতম, খইলসা মাছ, অনেকগুলান শিং মাছও জিয়ান আছে । আমরা বাপ-মেয়েতে সারারাত ঘুমাই নাই। তোমার যতœ -তালাস করছি। খুব খিদা পাইছে । কিছু খাইতে দাও । নাহিদা খাতুন কাতঁরাতে কাতঁরাতে তড়িঘড়ি উঠে দাড়াঁয়। হাড়ি থেকে জিয়ান মাছগুলো কেটেকুটে নেয়। পাকেঁরঘরের ছালনী থেকে লাউগাছের শাকঁ তুলে। মাছগুলোতে বেশী করে ছালন দিয়ে রান্নাবান্না শুরু করে । জলিল মাটির চুলার নিচ থেকে কয়েকটুকরা জ্বলন্ত কয়লা আর ছাঁই নিয়া হুঁক্কা ধরায়। তামুক পাতার গোল গোল বড়াগুলো জ্বলন্ত কয়লার নিচে ধরিয়ে হুক্কাঁয় চুমক দেয়। বাড়ীর আঙ্গীনায় জলপিড়ি রেখে আসনগিরে বসে। তারপর হুঁক্কায় বরংবর চুমক দিয়ে হুড়–ৎ হুড়ূৎ টানতে থাকে। খোলা আকাশের দিকে তাকায়। গিলে খাওয়া এক গাল ধুঁয়া আকাশ প্রাণে ছুরে দেয়। সকালের আকাশে তখনও সূর্য্য উঠেনি । মেঘলা আকাশ । একগুচ্ছ কালো মেঘ । দলছুট হয়ে খন্ড খন্ড আকারে ছুটে বেড়াচ্ছে আকাশজুড়ে। কখনও রোদ্দুরের আলামত কখনও বৃষ্টির আলামত। আকাশের উত্তর দিকটায় কেমন ভয়ানক জমাট বাধাঁ কালো রং ধারন করেছে। বিশাল কালো দৌত্য এসে গ্রাস করবে নদীর পারের মানুষগুলোকে। জলিল শেষবারের মতো হুক্কায় ফুঁক দিয়ে হুড়–ৎ হুড়–ৎ কয়েকটি টান দেয় । অজানা আতংক তাকে গ্রাস করে। হুক্কায় টান দেওয়া ধোঁয়া শেষ করতে না করতেই । ছোট্ট মেয়ে সোনীয়া ঘর থেকে ডাকছে, , , বাবা ও বাবা মা‘য়ে ডাকছে, ভাত খাইবানা ও বাবা তাড়াতাড়ি আসো। মা‘য়ে বেশি কইরা ছালুন দিয়ে মাছের ঝোল পাক করছে তাড়াতাড়ি আসো, ভাত খাইয়া যাও । জলিল হুঁক্কার শেষ শুক-টান দেয়। হুঁক্কাটা জলপিরির উপরে রেখে উঠে দাঁড়ায় তারপর উঠোনের দক্ষিন দিক তাকিয়ে হুঁক্কার ধুঁয়ার কুন্ডলি ছুরে দেয় বাতাসে। সাদা ধুঁয়ার কুন্ডলি অষ্পষ্ট ফাঁকে তাকিয়ে দেখে উঠোনের দক্ষিন কোনে যেখানে পুকুরঘাট। পুকুরঘাটে ¯œান করছে একটি ভর-যুবতী মেয়ে । সকাল সকাল পুকুরঘাটে কে সে যুবতী ¯œান করছে ? কৌতুহুল দৃষ্টি নিয়ে খানিক এগিয়ে যায় জলিল । ঢেউয়ে আছরে পড়া লাবন্যময় শরীরে সাথে জড়িয়ে থাকা শাড়ীর আচল চিপে মুখের পানি শুকিয়ে নিচ্ছে। কখনো ভেজা শাড়ীর কুচিগুলো ভাজ করে গুজে দিচ্ছে নুয়ে পড়া নাভির নিচে। চুলের জমে থাকা পানি মনে হচ্ছে যেনো শিঁশিরভেজা কালো গোলাপ । অবচেতন মনে জলিল নারীর সৌন্দয্যে পিপাসায় এগিয়ে যেতেই ঘর থেকে নাহিদা খাতুন উচ্চস্বরে ডেকে বলে, ‘‘সোনিয়ার বাপ, ভাত খাইবা না, তোমারে সেই কখন থেকে মাইয়্যাডা ডাকতাছে।” জলিলের পেট, খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে আছে তাই পুকুরঘাট থেকে চোখ ফিরিয়ে নেই ঘরের দিকে । তড়িঘড়ি করে আসন গেরে খেতে বসে যায়। জলিলের স্ত্রী নাহিদা খাতুন জলিলের ভাতের-বাসনে খানিকটা মাছের-ঝোল তুলে বলে উঠে,‘‘ সোনীয়ার বাপ, তুফান আইবো, মহাবিপদ সংকেত দিতাছে রেডুতে, ৬ নম্বর মহা বিপদ সংকেত। সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে কইছে, কাইল বিয়ানে নয়তো রাইতের মধ্যে ঘুন্নিঝড় অইবো। সবাইকে আইজ সন্ধ্যের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলেছে। জলিল রেডিওর শব্দ একটু বাড়িয়ে দেয়। দুঃশ্চিন্তায় ভয়ানক থাবা এসে গ্রাস করে জলিলকে। রোদ-বৃষ্টি হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে কিছুদিন আগে ঘরের নতুন ছাউনি দিয়েছে। আবারো সর্বনাশা ঝড়ে সবকিছু কাইরা নিবো । সবার আগে পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে । সোনীয়ার মায়ের পেটে ৫ মাসের সন্তান। ইত্যাদি নানান কথা ভাবছে আর এক নোকমা, দুই নোকমা, করে ভাত খেতে খেতে খানা শেষ হয় জলিলেল । দুশ্চিন্তা তার পেছন ছারে না। একটি পিতলের কলসিতে কায়েক খন্ড গুর, চিনি, চিঁড়া, মুড়ি, ইত্যাদি ভরে ঘরের এক কোনে মাটিতে পুঁেত নিলো। মাটিতে বড় একটি মাটির গামলাতে খাবার পানি ভর্তি করে পলিথিন দিয়ে ডেকে দিয়ে মাটিতে খানিকটা পুঁেত রাখলো।
বিছানায় হেলান দিতেই ক্লান্ত অবচেতন চোখ দু‘টি শুধুই ঘুমের ঘোরে হারাতে চায়। ভয় আর দুশ্চিন্তায় জলিল শক্ত হয়ে বসে এবং বিছানা ছেরে উঠে দাড়াঁয়। পরিবারকে আগে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে আসতে হবে। তারপর ঘরের গৃহপালিত পশুগুলোকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে। তখন দুপুর গড়িয়ে রোদ-বৃষ্টি আর ঝড়ের ছায়া বিকেলে দিকে মোড় নেয়। সন্ধ্যের অন্ধকার হওয়ার আগেই জলিল তার পরিবারকে ঘুন্নিঝর আশ্রয় কেন্দ্রে রেখে আসার জন্য রওনা হয় । তখন বৃষ্টির ঝড়ো হওয়ায় কিছুটা উত্তাল আকাশ । সর্বনাশী ঝড়ের অজানা ভয়-ডরে গ্রামের বানবাসী মানুষের চোখে আতংকের ছাপ। জলিলের স্ত্রী, নাহিদা খাতুন যতই অশ্রয়কেন্দ্রের উদ্দ্যেশে পা ফেলছে ততই যেনো ঘর-দুয়ার আর সংসারের মমতা তাকে আচ্ছন্য করে রাখছে। সর্বনাশী ঘুন্নীঝড় তার সংসারের আসবাবপত্র সবকিছু তছনছ করে দিবে। তবুও মেয়ে সোনীয়া এবং নিজের পেটের সন্তানের কথা ভেবে দ্রুত আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে পথ চলতে থাকে কিন্তু পেছন পড়ে থাকে ঘড়-দুয়ারের নিরবিচ্ছিন্ন মায়া। জলিল তার পরিবারকে সতর্কতার সাথে আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে আসে এবং বাড়ীর দিকে রওনা হয় কেননা গৃহপালিত গবাদি পশুগুলোকেও নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে হবে। জলিলের ফিরে আসতে খানিকটা রাত হয়ে যায়। বাসায় ফিরেই গবাদীপশু গুলোকে তাজা ঘাস ও পানিসহ ভুসি খেতে দেয় । ততক্ষনে একটু বিশ্রামের জন্য ঘরে ফিরে আসে জলিল। তখন সময় সন্ধ্যে রাত্রী পার হয়ে মাঝরাত্রীর দিকে। ঝড়-বৃষ্টি আর বাতাসের হুংকারে প্রকৃতির ভীষন- বিরূপ-রুপ। জলিলও ক্লান্ত নিজের অজান্তে খানিকটা ঘুমিয়ে পরে। খানিক ক্ষন পরেই দরজায় কড়া নারার শব্দে ঘুম ভাঙ্গে জলিলের। দরজার বাহির প্রান্ত থেকে এক ভর-যুবতি বলছে , ও জলিলের বউ ঘুমাইছো নি . . . . । ভয়ানক বিপদ সকালের মধ্যেই ঘুন্নিঝড় আঘাত হানবো, । তারাতারি আশ্রয় কেন্দ্রে যাইতে হইবো । জলিল দরজা খুলে বাহির হয়ে বলে ‘‘কেডা এই ঝড় বৃষ্টির রাইতে... . . মনে কি ভয়-ডর নাই. .. .
। তখন ঝড় বাতাসের আলামত সুবিধের ছিলো না । জলিল তাকিয়ে দেখে তার সামনে, কুসুমী বেগম দাঁড়িয়ে আছে । দমকা হাওয়া বইছে.. . . . । এলোমেলে দমকা হওয়া কুসুমী বেগমের শাড়ীর সাথে যেনো যুদ্ধ করছে। ব্লাউজহীন পরিহত শাড়ীর আচলদিয়ে নিজেকে আঁড়াল করতে চাইলো । কোন ভাবেই পারছে না। চুল আর শাড়ীর আঁচলের ঝাপটা জলিলের মুখ ছুঁয়ে যায়। বহুদিন পর যেনো সে অতীত জড়ানো সেই স্মৃতি মনে পরে যায়। কুসুমী বেগমের গায়ের ঘ্রানটা জলিলের এক বাক্যে মুখস্ত। পুরোনো সেই দিনের কথা, তা -বছর সাত পুরোনো হবে। তখন জলিল আর পাশের বাড়ীর কুসুমী বেগমের মধ্যে ছিলো ভালোবাসায় আদর জড়ানো উত্তাল দিন। একটু সন্ধ্যে হলেই পুকুরের দক্ষিন দিকে কলাগাছের বাগানটায় ছিলো তাদের ভালোবাসার নাঙ্লীলা খেলা। জলিল খানিকটা হতভম্ব । এতদিন পরে কুসুমী কোথায় থেকে এলো। সে তো শহরে থাকে। শহরের বড় মাইনশের সাথে তার সাদী হইছিলো । জলিল গাঁওগেরামের মানুষ । অল্প শিক্ষিত, চাষাভুষা । কুসুমীর বাবা কুসুমীকে শহরের মাইনশের সাথে বিয়া দিছে। যেদিন কুসুমীকে শহরের মাইনসেরা নিয়ে যায় সেদিন জলিলের খুব কষ্ট হয় । সে পুকুরপারে তেতুলগাছের একটি নরম ডালের সাথে গামছা পেঁচিয়ে সেই গামছা নিজের গলার সাথে পেচিয়ে ফাঁসি দিয়েছিলো । কিন্তু ফাঁসি কার্যকর হয় নাই। জলিল একটু মোটাসোটা তাই গাছের ডাল ভেঙ্গে পুকুরের পানিতে পরে হাবুডুবু খেয়েছিলো। সেই কষ্টের কথা মনে করে ও মুগ্ধবিস্ময়ে তাকিয়ে জলিল বলে উঠে , , , , , কুসুমী তুমি এত রাতে এখানে ? তুমি গ্রামে আইছো কবে ?
কুসুমী : কেন গো জলিল তুমি মনে হয় জানো না । আইজ সকালে পুকুরঘাটে অমন কইরা চাইয়া কারে দেখলা ।
জলিল : ঠিক বুঝতে পারি নাই । তবে একজন ভর-যুবতী গোসল করছিলো । খুব সুন্দর তার গায়ের গরন । ঠিক তোমার মতো ।
কুসুমী : হাইরে সব ভুইল্যা গেছো । যার সাথে এত্তোকিছু করছো তার শরীর এতো সহজে ভুইল্যা গেছো । ওইডা আমিই ছিলাম গো ।
জলিল এখন সংসারি সে তার মেয়ে সোনীয়া ও নাহিদা খাতুনকে খুব ভালোবাসে। তাই কুসুমী বেগমের কথার কোন পাত্তা না দিয়ে, খানিকটা গম্ভির হয়ে কথা প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়ে বলে ,‘‘ তোমার জামাই কই ? সে গ্রামে আসে নাই ।
কুসুমী বেগম খানিকটা হতাসাকন্ঠে বলে ‘‘সে অনেক কাহিনী , পরে কমুনে, ঘরে ঢুকতে কইবা না। নাকি এই ঝড় -তুফানের রাইতে বাহিরতন খেদায়া দিবা।’’
যাই হোক এই ঝড়তুফানের মাঝে কারোরে বাইরে রাখা অমানবিক। তাই তরিঘরি করে খানিকটা ভাবসাব নিয়ে জলিল বলে ,‘‘ কুসুমী ঘরে আসো”।
কুসুমী ঘরে ঢুকে খাটের এক কোনে বসে। ঝড়ো বৃষ্টিতে ভিজে খানিকটা শীতে কাঁপছে কুসুমী । জলিল ঘরের ট্যাংক থেকে নতুন একটি তোয়ালে বের করে দিয়ে কুসুমী কে বলে,‘‘ বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার, তাড়াতাড়ি গতরের পানি শুঁকিয়ে নাও । ঘুন্নিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে যাওন লাগবো। আমার ঘরে একটা বড় পলিথিন আছে এটা গায়ের সাথে জড়াইয়া দুইজন যাউন যাইবো, গতর ভিঁজবো না । তারিতারি চলো, সর্বনাশী ঘুন্নীঝড় থেকে আমাদের বাচঁন লাগবো । ”
কুসুমী নিজের জীবনের প্রতি উদাসীন। প্রাণের মায়া বা বেচেঁ থাকার বিশেষ কোন আকুতি বা মিনতি নাই। তাই সে হোঃ হোঃ করে হেসে উঠে বলে, ‘‘কি কইলা জলিল, বাঁচন লাগবো, আল্লাহ্ বাঁচাইলে বাচুম, নয়ত মইরা যামু, তয় বাচঁনের লাইগা আল্লাহ্ কাছে কিছুই চামু না। সুন্দরভাবে বাচঁনের জন্য বাবা মা‘য় শহরের বড়লোকের সাথে বিয়া দিছে। হেরা আমরে শহরে নিয়া ঘরের চাকরের মতো খাটাইছে, আমার জামাই মাঝে মাঝে আমারে বিভিন্ন পার্টিতে নিয়া যাইতো । সে বিভিন্ন কিসিমের মেয়েদের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে আর আমারে পাঠাইতো তাদের পাটনারদের সাথে ফষ্টিনষ্টি করার জন্য । এই মনের মধ্যে কইলজাডা ফাইট্য্ াকান্না আসতো । কিন্তু কাদঁতে পারতাম না । নিমর্ম অত্যাচার আর ভয় আমাকে চুপ করিয়ে দিতো ।”” বলতে না বলতে কুসুমীর উজ্জ্বল বর্ণের মায়াবী চেহারাটার মাঝে নেমে আশে কালসে অন্ধকার । কুসুমীর চোখের বাধঁ গড়িয়ে কয়েক ফোটা জল ঝরে পরে।
জলিল ও কুসুমীর আতীতের গভীর ভালোবাসার স্মৃতিকথা বুকের সীমানায় কড়া নাড়ে । আবেগ আপুøত জলিল কুসুমীর গাঁ ঘেষে বসে। কুসুমী চোখের জল হাত স্পর্শ করে মুছে দিয়ে বলে,‘ অহন দুঃখ কইরা কোন লাভ অইবো না, যা অয়নের তা হইছে, তেমার কিছুটা মত ছিলো বলেই বিয়াটা অইছে, ।” এখন কোন উপাই নাই, আমার সংসার আছে, আমার বউ আছে, আমার মেয়ে আছে, আমার সংসারে আরো একটি নতুন মেহমান আসতাছে।
কুসুমী খানিকটা ইর্ষান্নিত। বিষর্নদৃষ্টিতে জলিলের দিকে তাকিয়ে থাকে। কান্নাজড়িত জলিলের বুকের উপর মাথা গুজে দিয়ে বলে,‘‘ আমার সব শেষ হয়ে গেছে, আমার সংসার নাই, স্বামী নাই আর সন্তানের কথা কি কমু, স্বামী আনন্দ ফুর্তি করার জন্য আমাকে ‘মা’ হতে দেয় নাই। আমাকে তোমার কোলে একটু ঠাঁই দাও বলেই দুই হাত দিয়ে জলিলকে জড়িয়ে ধরে। বহুদিনের তৃষ্ণাত্ত জলিল খনিকটা ধমকে যায়। সেই সুগন্ধী তেলমাখা চুলের ঘ্রান, কুসুমীর গায়ের উষ্ণ গরমে খানিকটা তালমাটাল হয়ে পরে জলিল । তবুও নিজেকে খানিক সামলে নিয়ে শক্ত হয়ে বসে বলে,‘‘ কুসুমী অতীতের সবকিছু ভূইল্যা যাও। এখনও তোমার যৌবনের তেমন কোন আপচয় হয় নাই। নতুন করে কাউকে বিয়া কইরা ঘর বান্দ্যো । ”
কুসুমী সংসার নামের শব্দটাকে সে ঘৃনা করে। তাই জলিলকে সে পুনরায় আবারও জড়িয়ে ধরে বলে, ‘‘জলিল আমি তোমাকে ভুলতে পারি নাই, আমি তোমারে খুউব ভালোবাসি। বলতে বলতে দুইজনেই যেনো পুষ্পউদ্যানের মতো ঝড়ো বাতাসে লেপটে যায় । দুই জনরই কন্ঠস্বর ভারী হয়ে উঠে। নীলকন্ঠের জড়তায় কুসুমী বলে, ‘হুম‘, । জলিল আবেগের জড়াজাড়ির কবলে পরে কুসুমীর গলা জড়িয়ে ধরে। ঘুন্নীঝরের তান্ডবের কথা ভুলে গিয়ে চুম্বনে চুম্বনে তারা যেনো আগ্নীঝরের সৃষ্টি করে । নদী-সমুদ্র পারের মানুষগুলোর এমনিতেই বেশী বেশী। আবেগ আপ্লুত সময় কখন যে আতিবাহিত হলো টের পেলো না। দীর্ঘদিনের ভালোবাসার তৃষ্ণা নিবারনরত জলিল ব্যস্ত। হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় ঘরের এক কোনের একটি টিনের চাল উড়েঁ যায়। বাঁেশর সাথে বেধেঁ রাখা কাঠ জলিলের মাথার উপর পরার সাথে সাথে জ্ঞান হারায় জলিল। কুসুমী তখনও চেষ্টা করছে জলিলের জ্ঞান ফিরিয়ে আনার জন্য, বলছে, ‘‘ ও জলিল.,. তোমার ঘরে জোয়ারের পানি আইসা পরছে, তাড়াতাড়ি উঠো ।” জলিলের কানে কুসুমীর কোন কথা পৌঁছায় না। ইতিমধ্যে চুরান্ত ঘুন্নীঝড়ের আলামত আরম্ভ হয়ে যায়। ঘরের চালের টিনের ছাউনী খানিক উড়ে যাওয়ার আগেই কুসুমী, জলিলকে রেখেই চলে যায় নিরাপদে। চুড়ান্ত ঘুন্নীঝড় আর জোয়ারের পানি এসে ঘরের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। গ্রামের বাড়ী-ঘর গরু-ছাগল সবকিছুই ভাটার টানে নদী থেকে সমূদ্রের গর্ভে বিলিন হয়ে যায়।
পরের দিন জলিলের বউ নাহিদা খাতুন আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ঘরে ফেরে । নাহিদা খাতুন দেখে ঘুন্নীঝড়ে লন্ডভন্ড হওয়া ঘরের ক্ষতি সে পুরন করতে পারবে, কিন্তু স্বামী হারানো ক্ষতি সে কি করে পুরণ করবে । ফুটফুটে মেয়ে সোনীয়া তার প্রিয় বাবাকে কিভাবে ফিরে পাবে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন