বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৯৬
গল্প/কবিতা: ৫টি

জলছবি

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

কোন এক বিষণ্ণ ফাল্গুন

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

একটি চিঠি ও কয়েকটি মৃত্যু

অস্থিরতা জানুয়ারী ২০১৬

গল্প - ত্যাগ (মার্চ ২০১৬)

ত্যাগের সুখ

সাবিহা বিনতে রইস
comment ১২  favorite ১  import_contacts ৪৯৪
পুরো ১ঘন্টা ধরে যানজটে আটকা পড়ে আছেন আনিস সাহেব।বাইরে গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ্দুরে বিপর্যস্ত জনজীবন।যদিও শীততাপ নিয়ন্ত্রিত এ গাড়ীর মধ্যে দাবদাহ শুধু কল্পনা মাত্র।

-বাবা,তুমি বড্ড বোর হচ্ছো না?আসলে ঢাকা শহরের যা অবস্থা,তাতে মানুষের বাস করায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

ছেলের কথা শুনি মৃদু হাসলেন আনিস সাহেব।এখনকার ছেলেরা ভীষন অধৈর্য্য।অবশ্য হবেই বা না কেন?পৃথিবী যে দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলছে,তার সাথে পাল্লা দিতে হলে নষ্ট করার মত সময় কোথায়?যান্ত্রিক জীবনে দু দন্ড দাড়াবার জোঁ নেই।

-বাবা,গান শুনবে?তোমার পছন্দের রবীন্দ্র সঙ্গীত?
-হুম,দাও
আসিফ ক্যাসেট প্লেয়ার টা অন করে দেয়।

"এই কথাটি মনে রেখ,
তোমাদের এই হাসি খেলায়..মনে রেখো...."

গানটি শুনতে শুনতে উদাস হয়ে যান আনিস সাহেব।মনে পড়ে যায় অনেক কিছু।হাসি খেলায় জীবনের অনেকগুলো বছর পেছনে ফেলে এসেছেন,অথচ ফিরে তাকানোর সময় হয়নি একবারের জন্যও।আজ হঠাত্‍ ঝট করে দমকা হাওয়ার মত এক পশলা স্মৃতি তাকে অতীতে উড়িয়ে নিয়ে যায়।
বিলাস বহুল গাড়ীর গ্লাসের বাইরে তখন বাস,ট্রাক,সিএনজির লাইন।কিন্তু সব ছাপিয়ে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিরিবিলি,ছিমছাম গ্রাম্য মেঠো পথ।পথের দুধারে ছোট ছোট কাটা গাছ আর জংলি লতা পাতার ঝোপ।গ্রামের এক প্রান্তে ধূলোময় পথের ধারে জরাজীর্ন একচালা বাড়ি, দুটো ঘর,খোলা রান্নাঘর।উঠানে পেয়ারা,লেবুর গাছ।পেছনে সারি সারি নারিকেল আর সুপারি গাছের সীমানা।আনিস সাহেবের ছোটবেলা টা কেটেছে দুরন্তপনায়।ছুটোছুটি করে,নদীতে সাতার কেটে,বনের গাছের ফল পেড়ে,আর কত কি।যেন অনেকটা বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীর প্রতিবিম্ব।তবে তার জীবনে শৈশবের সময় সীমাটা খুব বেশি ক্ষনস্থায়ী ছিল।স্কুলের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ থাকার পরও ক্লাস সেভেনে ওঠার পর পরই লেখাপড়া টা বন্ধ হয়ে যায়।দ্রারিদ্রতা শিক্ষার দ্বার রূদ্ধ করে সংসারের দায়িত্ব ঘাড়ে এনে ফেলে।অসুস্থ বাবার জরাজীর্ণ মুদি দোকান,ছোট দুই ভাইয়ের পড়ালেখা আরো কত কাজ তার তখন।মায়ের লাগানো গাছের লাউ,কুমড়া,সুপারি,নারিকেল নিয়ে যখন পথের পাশের জরাজীর্ণ দোকানে বসত,তখন কান্না পেত প্রচন্ড।পুরানো স্কুলের বন্ধুরা,বই পত্র নিয়ে যাওয়ার সময় চোখ ভর্তি করুণা নিয়ে তাকাতো তার দিকে।লজ্জা আর কষ্টে মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করত তার।তবুও কিছু করার ছিল না।ছোট ভাইগুলোকে যে বড় করতে হবে।গভীর রাতে মাঝে মাঝেই বই পত্র গুলো নিয়ে বসত।মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকা হ্যারিকেনের আলোয় পড়তে পড়তে চোখ ঝাপসা হয়ে আসত।মা বুঝতেন তার কষ্ট গুলো,,তাই মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন,,আর বলতেন,
- বাপধন, মাঝে মাঝে নিজের শখ আহ্লাদ ছাড়তে হয়,নিজের কাছের মানুষের জন্য।তোমার ভাই-বোনেরা তো তোমার কাছেরই মানুষ, তাইনা?
আনিস সাহেব,মাথা ঝাকিয়ে সায় দিয়েছিলেন সেদিন।বুঝেছিলেন,এইসব দায়িত্ব তাকে পূরণ করতে হবে, তা নিজের স্বপ্ন ত্যাগ করে হলেও করতে হবে।

গাড়ীর হর্ণের শব্দে চমকে ওঠেন আনিস সাহেব।এক যানজট পেরিয়ে গাড়ীটি অরেকটি নতুন যানজটে আটকা পড়েছে।
"থাকুক,থেমে থাকুক!পথ দীর্ঘ হয়ে যাক"
মনে মনে ভাবেন আনিস সাহেব।এইবছর বয়স সত্তর পেরিয়েছে তার।বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল চাকরি থেকেও অবসর নিয়েছেন।কাজকর্মহীন অলস জীবনে কোন কাজেই তাড়া নেই।
গাড়ীর জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন তিনি।জোষ্ঠ্যের খা খা রোদ্দুরে বিদ্ধস্ত প্রায় জন জীবন।দূরে ছোট ছোট বাচ্চা গুলো ফুল বিক্রি করছে।টকটকে লাল গোলাপ তাদের মুঠোবন্দি।সেই রক্তরঙা গোলাপ গুলো দেখে বুকের ভেতরটা হঠাত্‍ টনটন করে ওঠে আনিস সাহেবের।একটা সময় তার প্রতিদিনের রুটিন ছিল একটি করে টকটকে গোলাপ নীরুর হাতে দেওয়া।গোলাপ তার বড্ড পছন্দের।আর তার মন রাখতে প্রতিদিন বিকেলে একটা করে গোলাপ নিয়ে হাজির হত নীরুর সামনে।হুশ করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আনিস সাহেব।
নীরু!বড় বড় কাজল চোখের সেই মেয়েটি,যে চোখে চোখ রেখে যৌবনে কত স্বপ্নই না দেখেছিলো তারা।ক্লাস সেভেনে পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার দুই বছর পর পড়াশুনা টা আবার শুরু করেছিলেন তিনি।সারাদিন কাজ,আর রাত্রিকালীন স্কুল।এইভাবেই পড়েই পৌছে গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার প্রান্তে।আর সেখানেই পরিচয় ডাগর চোখের নীরুর সাথে।তারপর শুধুই স্বপ্নজগতে ভাসতে থাকা।কিন্তু এখানেও স্বপ্নগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করা,বেকার যুবক আনিস,বার বার চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে যার ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডেল জোড়া বদলানোরও সামর্থ্য নেই,তার হাতে কন্যা সম্প্রদান করবে কোন বাবা?তাই ত্যাগ করতে হয়েছিল নীরুকে পাবার আশা,মুঠোই ধরা স্বপ্নগুলোকে উড়িয়ে দিয়েছে কিছু না ভেবেই।সে অনেক দিন আগের কথা।
চোখ টা ভিজে ওঠে আনিস সাহেবের।যার জন্য নীরুকে একদিন ত্যাগ করেছিলেন,সেই সোনার হরিণ চাকরির নাগাল পেয়েছিলেন মাস ছয়েক পরই।জীবন কারো জন্যই থেমে থাকেনা।আনিস সাহেবেরও থাকেনি।বছর পার হতেই তাই আলতায় পা ডুবিয়ে চৌকাঠ পেরিয়ে এসেছিল রাবেয়া নামক এক সাদাসিধে রমনী।কোর্ট অফিসের সেকেন্ড ক্লাস কর্মচারীকে যে দিয়েছিলো সংসারের সাধ।২ছেলে মেয়ে আর তাকে ঘিরে মায়ায় বেঁধে তৈরী করেছিল কল্পঘর।সীমিত আয়,হাজার সাংসারিক টানাপোড়েনের পরও যে জীবনে ছিল অফুরন্ত ভালবাসা।নিম্ন মধ্যবিত্ত সে সংসারে সুখ আর ভালবাসা ছিল ১০টাকার প্যাকেট বিস্কুট,কিংবা লাল চায়ের কাপে।আনিস সাহেবের মনে পড়ে যায়,রাবেয়া একবার সোনার বালা জোড়া চেয়েছিল।বিয়ের সময় পাওয়া বালাগুলো হঠাত্‍ই পারিবারিক দূঃসময়ে হাতছাড়া করতে হয়েছিল।বহুদিন ধরে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছিলেন আনিস সাহেব,ভেবেছিলেন তাদের ৩০তম বিবাহ বার্ষিকীতে রাবেয়াকে নতুন করে বালাজোড়া বানিয়ে দিবেন।বড় ছেলে আসিফ তখন আর্কিটেকচারের স্টুডেন্ট।হুট করেই সে এসে ল্যাপটপের আবদার করে বসে।ছা পোষা মধ্যবিত্তের সংসারের সব ইচ্ছে পূরণ হওয়ার নয়।তাই বালা জোড়া বানানোর শখ ত্যাগ করে বহুদিনের জমানো পুরো টাকাটাই বড়ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
তারও বহুদিন পর ছোট মেয়ে তিশার বিয়েতে মান রক্ষার মত সবকিছুই দিয়েছিলেন।শুধু রাবেয়াকে আর বালাজোড়া দিতে পারেননি।কোন এক পূর্ণচন্দ্রের রাতে আনিস সাহেব আক্ষেপ করে স্ত্রীকে বলেছিলেন,
" এ সংসারে তোমার জীবন ব্যর্থ রাবু,,এ সংসার তোমাকে কিছুই দেয়নি "
রাবেয়া হেসে বলেছিলেন,
" স্বামী বিবেকানন্দ একটা কথা বলেছিলেন জানো তো,'ভোগে সুখ নয়,ত্যাগেই সুখ' "
আনিস সাহেব শুধু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেছিলেন।
ত্যাগ কে সুখ ভেবে পাহাড় সম অপূর্ণতা নিয়ে তারপর একদিন চুপিসারে চলে গিয়েছিল রাবেয়া।

বুকের ভেতর টা হুহু করে ওঠে আনিস সাহেবের।নিজেকে বড্ড বেশি একলা লাগে।একে একে সবাই তাকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে।শুধু পুরানো ঘুনে ধরা খুঁটির মত জর্জরিত হৃদয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

ঝাঁকি দিয়ে গাড়ী টা থেমে যায়। বিলাস বহুল মার্সিডিস বেঞ্জটি এসে থামে সবুজ রঙের একটা লোহার গেটের সামনে।গেটের ফাক দিয়ে দূরে একটা বাংলো ধরনের বাড়ি দেখা যাচ্ছে।বাড়ির সীমানার চারপাশে উচুঁ পাচিল।সবুজ গেটের উপর সাদা রঙের বাগান বিলাসের সমারোহ।আসিফ নেমে আসে গাড়ী থেকে,ধীরে ধীরে নামে আনিস সাহেবও।
- বাবা...
- হুম,বলো..
- আমি চাই তুমি খুব ভাল থাকো,সবসময় ভাল থাকো।
- জানি আমি।
মৃদু হেসে উত্তর দেয় আনিস সাহেব।ডান হাত টা ছেলের মাথায় রাখেন তিনি,এলোমেলো করে দেন চুল গুলো।
আসিফ মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে।কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়।
আনিস সাহেবও একটু থামেন,
তারপর বলেন,
- তোমার ফ্লাইট কয়টায়?সবকিছু ঠিকমত গুছিয়ে নিয়েছো তো?
আসিফ চোখ তুলে তাকায় বাবার দিকে,
আস্ফুট শব্দে বলে ওঠে,
- বাবা!তুমি জানো??
তার গলায় স্পষ্ট বিস্ময়ের আভাস ঝরে পড়ে।
- হুম,জানি!তোমরা আজ রাতের ফ্লাইটে ইতালি চলে যাচ্ছ।আমাকে কথা টা নিজের মুখে বলতে পারতে!!
যাই হোক,সাবধানে থেকো,বৌমা আর দাদুভাইয়ের দিকে খেয়াল রেখো।
- বাবা,,আমরা প্রতি বছর.....
আনিস সাহেব হাত উঠিয়ে থামিয়ে দেন ছেলে কে।

তারপরও আসিফ কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়,তারপর গাড়ীতে গিয়ে বসে।

গাড়ীটা দৃষ্টির সীমানা অতিক্রম করা পর্যন্ত তাকিয়ে থাকেন আনিস সাহেব।চৈত্রের বৈকালী বাতাসে শরীর টা শিরশির করে ওঠে।সেই সাথে চোখটাও অজান্তে ভিজে ওঠে।জীবনের সকল দ্বায়িত্ব তিনি পালন করেছেন।ভাই-বোন দের প্রতিষ্ঠিত করেছেন,নিজের সন্তানদেরও সাফল্যের শিখরে পৌছে দিয়েছেন।আজ তিনি দায়মুক্ত একজন মানুষ।কিন্তু আশা টা বড্ড বেশি করে ফেলেছিলেন।ভেবেছিলেন শেষ জীবনটা ছেলে-বউ,নাতি-নাতনীদের সাথে কাটাবেন।ভুলেই গিয়েছিলেন জগত্‍ সংসারে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।সুখ ভোগ করা টা হয়ত তার কপালে লেখা নেই।
স্যুটকেস টা হাতে নিয়ে সবুজ গেট টার দিকে পা বাড়ালেন আনিস সাহেব।শেষ বিকেলের সোনালী আলোয় চারিদিক উজ্জ্বলিত।আনিস সাহেব একবার গেটের উপর লাগানো সাইনবোর্ড টার দিকে তাকালেন,,যেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা " বৃদ্ধ নিবাস "
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে তিনি ফিসফিস করে বললেন, " ভোগে সুখ নয়,ত্যাগেই সুখ "
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন