বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৯৬
গল্প/কবিতা: ৫টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭৩

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

জলছবি

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

ত্যাগের সুখ

ত্যাগ মার্চ ২০১৬

কোন এক বিষণ্ণ ফাল্গুন

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

অস্থিরতা (জানুয়ারী ২০১৬)

মোট ভোট ৭২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭৩ একটি চিঠি ও কয়েকটি মৃত্যু

সাবিহা বিনতে রইস
comment ২২  favorite ৪  import_contacts ৭৮০
মা,
জানি না তুমি দেখতে কেমন। কেমন তোমার চোখ,
নাক, মুখ কিংবা চুল। জানি না কথায় কথায় তোমার
গালে টোল পড়ে কিনা,কিংবা হাসতে হাসতেআমার মত চোখে পানি এনে ফেলো কি না।
জানো মা, আমার বাপী বলে আমার হাসি নাকি স্বর্গের
অপ্সরীদের মত,আমার হাসি নাকি ভুবন ভোলানো,
তাই আমার নাম সুহাসিনী। আচ্ছা মা, তুমিও কি
আমার মত এমন করেই হাসো?
আমার জানতে ইচ্ছে
করে,খুব বেশি ইচ্ছে করে।
জানো, আমি যখন ছোট
ছিলাম,কত রাত বাপীর বুকে শুয়ে তোমার কথা
জিজ্ঞাসা করেছি, দিদিমাকে তোমার গল্প শোনাতে বলেছি,অথচ সবাই কেন যেন তোমার কথা আমাকে জানতে দিতেই নারাজ।
স্কুলে ছুটির পরে সব বন্ধুদের মা যখন তাদের কোলে তুলে নিত,আমি আমারছোট্ট ছোট্র পা ফেলে একা একা বাসায় ফিরতাম।স্কুলের ভারী ব্যাগটার ভারে কাঁধ ফুলে যেত, তবুও অন্যদের মত আমার ব্যাগটি হাতে নেয়ার মত ছিল না কেউ । বাসার দারোয়ান কাকু মাঝে মাঝেই আমাকে স্কুলে আনতে যেত,কিন্তু আমার তো তোমাকে

দরকার ছিল। পরীক্ষার দিন গুলোতে স্কুলের বাইরের গেটে
অপেক্ষারত মমতাময়ী উৎসুক মুখ গুলোর মাঝে আমি তোমাকে খুঁজে গিয়েছি অনবরত। বাপী আমাকে বড্ড বেশি আদর দেওয়ার পরও মাদারস্ ডে তে তোমাকে একবার দেখার জন্য আমার মনটা আকুল হয়ে থাকত।
দিন পর দিন বাড়ির আঁনাচে কাঁনাচে তোমার একটা
ছবি দেখার জন্য তোলপাড় করেছি কত!
রাতের পর রাত শুধু একটা বার তোমার স্পর্শ পাওয়ার জন্য আমি বালিশে মুখ গুজে হাউমাউ করে কেঁদেছি, তা কিজানো তুমি?
কৈশোরে পা দেয়া মেয়ে গুলোকে যখন মা মাথায় হাত বুলিয়ে সঠিক পথ দেখায়, দিশেহারা আমি তখন তোমার আশ্বাস পাওয়ার আশায় ব্যাকুল হয়ে উঠেছি,শুধু একটি বারের জন্য। আমি তোমার জন্যঅনেক কেঁদেছি,শুধুই কেঁদেছি তবুও তোমাকে পাইনি একবারও। মা জানো,তোমার স্পর্শ ছাড়া বেঁচে থাকা ওই ছোট্র মেয়েটি আজ অনেক

বড় হয়েছে। এখন বুঝতে শিখেছে অনেক কিছু। বুঝতে শিখেছে বাস্তবতাকে, ধারণ করেছে যন্ত্রনাকে বুকের অন্তরালে সযত্নে। তবুও কিছু কিছু সময় মানুষকে হেরে যেতে হয় তার যন্ত্রনার কাছে।
জানো মা, আজ তোমার এই মেয়েটির বিয়ের ক্ষন বয়সের দোরগোড়ায় এসে দাড়িয়েছিল। কিছুক্ষণ আগেও তোমার মেয়েটি লাল টুকটুকে বেনারসী গা জড়িয়ে শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার অপেক্ষায় রত ছিল। কিন্তু তার সে আশা বোধহয় আর পূরণ হওয়ার নয়। বর পক্ষ মন্ডপে এসেসুহাসিনীটার হাসিগুলো বাক্স বন্দি করে একাই ফিরে গেছে।

জানো মা,মানতে বড্ড কষ্ট হয়, ছোট থেকে দেখে আসা এই মানুষ গুলো নাকি আমার কেউ নয়। এই বাসাটার প্রতিটি কোনায় যে আমার শৈশব কৈশোরের হাজার স্মৃতি লুকোচুরি খেলায় মগ্ন সে বাড়িটিতে আমি নাকি অনাকাঙ্খিত মাত্র। বাপীদিদিমা যারা আমাকে বুকে করে এত বড়
করেছে,তারা নাকি সাত কূলেরও কেউ নয় আমার।
আমি নাকি তুমি নামক কোন এক অজানা মায়ের
মেয়ে, যে পৃথিবীর আলো দেখানো মাত্রই আমাকে
ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলো নদর্মার পানিতে।
আচ্ছামা, আমাকে কি সত্যিই তুমি ইচ্ছে করে ফেলে
দিয়েছিলে?সত্যিই তুমি বা আমার ওই জন্মদাতা
মানুষটা কেউ চাইনি আমাকে? আমি কি এতটাই
নিকৃষ্ট ছিলাম?
বড্ড পোড় খাওয়া মেয়ে আমি
তোমার মা। তোমরা যেমন একদিন অন্ধকারে ছুড়ে
দিয়েছিলে আমাকে, যে মানুষটা সারাজীবন পাশে
থাকার আশ্বাস দিয়েছিলো, অজ্ঞাত জাত কূলের
কথা শুনে সেও ফেলে গেল আমাকে! ভুলে গেল সহস্র স্বপ্ন আর ভালবাসাকে। আজ আমি বাঁচতে ভুলে গেছি, উঠে দাড়াতে ভুলে গেছি। স্বপ্ন ভাঙার তীব্র যন্ত্রনাটা তুলোর বালিশের মত বুকে আগলে আমি চলে যাচ্ছি। শুধু তোমার জন্য রেখে যাচ্ছি চিঠি
টি,সময় হলে পড়ে নিও।
ওইপারে তে তোমার
অপেক্ষায় থাকবো,তুমি যদিন আসবে আমার সামনে
সব উত্তর গুলো ধীরে ধীরে জেনে নিব
ইতি,
সুহাসিনী তোমার


চিঠিটি পড়া শেষ করে গোয়েন্দা পুলিশের প্রধানকর্মকর্তা রাশেদ চোখ তুলে সামনে তাকালেন। বিছানার উপর লাল বেনারসী পড়া নিথর দেহটা দেখে কেন যেন বুক কেঁপে ওঠে তার। ঠিক যেন সদ্য ঘুমন্ত দেখতে লাগা মুখটির দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারে না রাশেদ। বা হাতের শিরার কাটাস্থানটা দিয়ে ঝরে পড়া রক্ত গুলো মার্বেল

পাথরের চকচকে মেঝেতে তখন জমাট বেধেছে। আরও কিছুক্ষন সুহাসিনীর নিথর মুখটির দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর পুলিশকে পোস্ট মর্টেমের ব্যবস্থা করতে বলেঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে।
সাজ্জাদ সাহেব তখন ড্রয়ংরুমের সোফায় নিস্তব্দ্ধ
হয়ে বসে আছে।রাশেদ সাজ্জাদ সাহেবের পাশে
বসতেই, তিনি রাশেদকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে
ওঠে।

-ও আমার মেয়ে রাশেদ!ও আমার মেয়ে,আমি ওকে
জন্ম দিইনি তো কি হয়েছে? আমি ওকে এই বুকে করে বড় করে তুলেছি। মেয়েটার জাত নিয়ে কথা বলে ওরা মেয়েটিকে ফেলে দিয়েই চলে গেল। বিয়ের রাতে অপমানে মেয়েটি আমার নিজেকে শেষ করে দিলো।
কথাগুলো বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন
সাজ্জাদ সাহেব।রাশেদ কাঁধে হাত রেখে থামানো
চেষ্টা করলেন।কিন্তু বন্ধুর এই অবস্থা দেখে নিজেই
স্তম্ভিত তিনি।
রাশেদ আর সাজ্জাদ সাহেব স্কুলজীবনের বন্ধু।স্কুল
পাশ করার পর ধীরে ধীরে যোগাযোগটা বন্ধ হয়ে
যায়।আজ সকালে এই ঘটনার তদন্ত করতে এসেই হঠাৎ দেখা তার সাথে। খুব বেশি কাকতালীয় লাগে সবকিছু রাশেদের কাছে। কিন্তু এত কিছুকে পেছনে
ফেলে রাশেদের মনে গেথেঁ গেছে সুহাসিনীমেয়েটা। ঘর ভর্তি মেয়েটির অসংখ্য ছবি। সেই ছবির হাস্যজ্জ্বল মুখ চোখ,টোল পড়া গাল বার বার
রাশেদকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ২০ বছর পেছনের কোন
এক দিনে।


-আজ অমবস্যা নাকি? চারিদিকে বিন্দু মাত্র আলোর
চিহ্ন নেই।
-এইসব কামের জন্যে তো আন্ধারই ভালো শ্যার।
নাইলেই কপালে দুঃখ আছে।
-হুম,তুমি তোমার কাজ কর।
-জ্বি স্যার!
"ওই চুপ! চুপ! অত কান্দস ক্যান? আছড়ায়্যা তোর
কান্দ্যোন বাইর করুম"
-উফ,জয়নাল!
যা করার তাড়াতাড়ি কর, হাতে সময়
নেই আমাদের।
-জ্বি স্যার! তই একখান কথা।
-কি?
-বাচ্চাডারে সত্যি ফ্যালাইয়া দিমু?
-সত্যি না তো মিথ্যে? ষাট হাজার টাকা তো আর
এমনি দিইনি তোমাকে। ওই টাকাটা না পেলে
তোমার নিজের বাচ্চা টার কি হবে ভেবেছো?

জয়নাল আর কিছু বলেনা।কাপা কাপা হাতে বস্তা
টাকে উপরে তোলে,তারপর ব্রীজ থেকে সজোরে ছুড়েমারে বর্ষার উত্তাল নদীতে। মূহুর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে
যায় চারিদিক।


উফফ!
শব্দ করে উঠে হাত থেকে জলন্ত সিগারেটের শেষ
অংশ টুকু ফেলে দেয়।ভাবনায় ডুবে গিয়ে কখন যে
সিগারেট শেষ হয়ে এসেছে বুঝতেই পারেনি রাশেদ।
ছ্যাকা লাগা অংশ মুখে চেপে ধরে জিপ থেকে নেমে
দাড়াতেই ঠান্ডা হওয়ার দমকে শরীর জুড়িয়ে যায়।
কত বছর আগে একরাতে এই স্থানে এসে দাড়িয়ে ছিলো বস্তাবন্দী করে একটা ছোট্র শরীরকে ভাসিয়ে দিবে বলে।রাশেদ আর তিথির মেয়ে সে।

"তিথি"

অনমনে নামটা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে
ভার্সিটিতে পড়ুয়া গালে টোল পড়া মিষ্টি হাসির মেয়েটির মুখ। লাজুক,চুপচাপ বোকা মেয়েটি
ভেবেছিলো রাশেদের মত আল্ট্রা ট্যালেন্টেড
ছেলে নাকি বিয়ে করবে তাকে।
উহু!কখনই না!
তাই বাচ্চাটি হওয়ার পর পরই রাশেদ তাকে সরিয়ে
ফেলেছিলো, তার ওই দূর্বল বোকা মেয়েটা বাচ্চা
হারিয়ে হার্টফেল করে মারা গেল। রাশেদ টাকা
দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে চলে গিয়েছিলো বিদেশে।
সেখানো পোস্ট গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে দেশে
ফিরে গোয়েন্টা কর্মকর্তা।
মনে মনে হেসে ফেলে রাশেদ।এ দেশে সবই সম্ভব।
তবে আজকের ঘটনা মন থেকে যাচ্ছেনা কিছুতেই।
সুহাসিনী আর তিথির চেহারায় অবিকল মিল।
পুরোনো রেকর্ড ঘেঁটে রাশেদ প্রায় বেরও করেছে
ফেলে,ওই ঘটনার পরের দিন সকালে নাকি কিছু
মাঝি একটা অর্ধমৃত নবজাতক কে উদ্ধার করেছিলো এই স্থান থেকেই।
তবে কি আজকের সুহাসিনীই সেদিনের তিথির
মেয়ে?
রাশেদে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে,উত্তর
টাও নিজেই পেয়ে যায়।
কেন যেন পা টা টলে ওঠে
রাশেদের। ২০বছর আগের বস্তা বন্দী বাচ্চার দূর্বল
কন্ঠের আওয়াজ মাথায় প্রতিধ্বনি তোলে বার বার।
সেই সাথে তিথির হাসির শব্দ,সুহাসিনীর নিথর
দেহ...রক্তাক্ত সেই হাত। অসম্ভব তীক্ষ অনেক গুলো
আওয়াজ রাশেদ কে জর্জরিত করতে থাকে।
অস্থিরতা বাড়তে থাকে রাশেদের।অস্থিরতার তীব্র চাপে আনমনে অন্ধকারে রাশেদ ব্রীজের রেলিং এর উপরে উঠে দাড়ায়। নিচে তখন বর্ষার
উত্তাল নদী ক্রমেই ফুশে উঠছে....।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন