বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ অক্টোবর ১৯৭২
গল্প/কবিতা: ৩৫টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১০২

দিনপঞ্জি

ব্যথা জানুয়ারী ২০১৫

স্বপ্নভাঙ্গার গান

উচ্ছ্বাস জুন ২০১৪

তুমি কখনো জানবে না...

ভালবাসি তোমায় ফেব্রুয়ারী ২০১৪

মা (মে ২০১১)

মোট ভোট ১০২ "মা"

সূর্য
comment ৫৪  favorite ৯  import_contacts ৯৯৯
: মা, মাগো, এই মা----
ছোট, খুব ছোট একটা মেয়ে "লন্ডন আই" নাগরদোলার প্রকোষ্ঠে বসে টেমস নদীর ঘোলাটে জলের দিকে তাকিয়ে থাকা তার মাকে ক্রমাগত ডেকে যায়।

মেয়েটার বয়স আনুমানিক ৫পেরিয়েছে। দীর্ঘ শীত শেষে সবে বসন্ত শুরু হলো। আমি একটা ট্যুরে লন্ডন এসেছি। খুব বেশিদিনের জন্য নয় আগামী সপ্তায়ই দেশে চলে যাব। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে এখন আমার মতো কোন বাঙালীই আর একাকীত্ব অনুভব করেননা। সস্তা শ্রমের কারণে মুক্ত বাণিজ্যের জোয়ারে পৃথিবীর কোন প্রান্তই আর বাঙালী শূন্য নেই।

:: বোন আপনার মেয়ে আপনাকে ডাকছে।
- হ্যাঁ! ওহ, দুঃখিত মামনি। আমি তোমার কথা শুনতে পাইনি।

মেয়েটাকে পরম মমতায় কোলে টেনে নিলেন ভদ্র মহিলা। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-

- ভাই আপনি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন?
:: হ্যাঁ, আপনার অরিজিনও কি বাংলাদেশ? প্রশ্নটা করার কারণ এখানে পশ্চিম বাংলারও অনেক ইমিগ্রান্ট আছেন।
-জি আমি বাংলাদেশেরই।

কথাগুলো বলতে বলতে ভদ্র মহিলা কেমন আনমনা হয়ে যাচ্ছিলেন। আমার আগ্রহ বেড়ে যায়। তার সাথে কথা বলি, তার জীবনের কথা, দেশের কথা। এই যে ভদ্র মহিলা, ভাবলেশহীন মৃত দুটি চোখে ঘোলাটে জলের দিকে তাকিয়ে আছেন, ইনিই আমার গল্পের মা। একটু চেষ্টা করে দেখি তার জীবনটা তুলে আনা যায় কিনা। বাকিটুকু তার ভাষায়ই শোনা যাক।

১.
ব্রাহ্মনবাড়ীয়া জেলার একটি থানা নবীনগর। নবীনগরের ছোট গ্রাম কনিকাড়া। গ্রামের উত্তরদিকটা ঘেঁষে চলে গেছে তিতাস নদীটা আর পশ্চিমে তিতাসেরই একটা শাখা বুড়ি নদী। বর্ষাকালে গ্রামটার চারদিক পানিতে ভেসে যায়। যোগাযোগের একমাত্র বাহন নৌকা। চারদিকে শান্ত পানি, গ্রামটা যেন হঠাৎ ভুলে পানির নিচ থেকে ভেসে উঠেছে।
আমি সেই গ্রামের মেয়ে। প্রকৃতির কোলে বড় হয়েছি। পড়াশোনা করেছি কনিকাড়া গ্রামের জমিদার- চৌধুরীদের করা প্রাইমারী স্কুলে। তারপর নবীনগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। দিনগুলো ভালই কাটছিল। এসএসসি পাশ করে নানুবাড়ী শাহগদা চলে যাই। নানুবাড়ীর কাছেই অনেক পুরনো নামকরা শ্রীকাইল কলেজ। সেখানে যাওয়ার প্রধান ও একমাত্র কারণ এই বর্ষাকাল। বর্ষায় আমাদের গ্রাম থেকে নবীনগর গিয়ে পড়াশোনা করাটা রীতি মতো যুদ্ধ করার শামিল। সময়মতো নৌকাঘাটে যাওতো ঠিক, না হলে যাতায়ত করা কোন ভাবেই সম্ভাবনা। তাই বাবার ইচ্ছেতেই নানু বাড়ী যাওয়া।

আমার পড়ালেখা ভালই চলছিল। আমি তখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি পরীক্ষারও বেশীদিন বাকি নেই। নানু আমাকে নিয়ে একদিন আমাদের বাড়ি এলেন। আমি কিছুই বুঝলাম না, কেন। সত্যি কথা, আমার জানতে খুব ইচ্ছেও হয়নি। বাড়ি যাচ্ছি, বাবা-মা ভাই-বোনের সাথে আবার উচ্ছ্বাসে ভাসবো, এই আনন্দে আর কিছু চিন্তায়ও আসেনি।

দুপুরের আগেই বাড়ি পৌছুলাম। বাড়িতে বেশকিছু অপরিচিত মেহমান দেখলাম। সবাই ছোটাছোটি করছে, কেমন ব্যস্ত সবাই। মা আমাকে ডেকে ভেতর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। আলমারি খুলে মায়ের সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা বের করে দিয়ে পরতে বললেন। আমার মনে পরে, স্কুলের বিদায় অনুষ্ঠানে এ শাড়িটা পরতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মা দেননি। আজ যখন নিজেই বের করে দিলেন তাও আমার আনন্দ হলোনা।

মেহমানদের খাওয়া দাওয়া প্রায় শেষ হয়েছে। কেউ কেউ খেয়েদেয়ে বিছানায়, চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশ করে মুখে পান পুড়ে দিচ্ছেন। এমন সময় আমার হুকুম হলো

= এই ট্রেটা নিয়ে ও ঘরে যা। আর ঢুকেই সবাইকে সালাম দিবি। মা আমাকে বলে দিলেন।
আমি রিমোট চালিত পুতুলের মতো মায়ের আদেশ পালন করছি। সালাম দেয়ার পর সবাই কেমন একসাথেই সালামের জবাব দিলো, আমি ভয়ই পেয়ে গেলাম। বাড়ীর পড়শি সুলেখা ভাবী আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। বয়স্ক একজন মানুষ বললেন মা বসো এখানে। আমি তার দেখানো চেয়ারটায় বসলাম। অনেকেই অনেক প্রশ্ন করলেন। যেমন, বলতো মা পৃথিবীতে সবচেয়ে দ্রুত কি চলে? আমি তখন রাজ্যের বাহনগুলো ও তাদের গতিবেগ মনে করার চেষ্টায় আছি। মনে হচ্ছে ঘেমেই যাব। ভাবী কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললেন বল "মানুষের মন"। আমি তাই বললাম। একটু শোনাগেল, আর বাকিটা গলায়ই রয়ে গেল বোধ হয়। মাশাল্লাহ্ মাশাল্লাহ্ বলে বাহবা দিল কেউ কেউ। আমার পর্ব শেষ, এরা আমায় ছুটি দিয়ে দিলো। ভেতরের ঘরে চলে এলাম। আচ্ছা মানুষের মন কি মানুষ যেখানে যায়নি, সেখানে যেতে পারে? যত আহাম্মকি কথাবার্তা।

মেহমানরা সব বিদায় নিয়ে চলে গেলে বাবা মা\'কে বললেন-
ঃ দেখো, আমি আমার মেয়েকে বিদেশী জামাইর ঘরে পাঠাবনা। একটা মাত্র মেয়ে আমার।
= তোমার যা আক্কেল, এমন ছেলে আর পাবে তুমি? আর সেতো আরবদেশে থাকেনা যে তুমি নাক সিটকবে। ছেলে লন্ডনে আছে আজ ৫ বছর। নিজের একটা ফ্লাটও আছে। এরা যখন মেয়েকে পছন্দ করেছেন, মেয়ে আমাদের সুখেই থাকবে।
বাবা যেন তবুও রাজি হবার নয়। আমার অবস্থা কি বলব। তখন বয়সও তো খুব বেশি ছিলনা। আর ওঘরে গিয়ে ছেলেটাকেও একনজর আড় চোখে দেখেছি। অপছন্দ হওয়ার মতো কোন কারণও ছিলনা। তারপর আমার নিজের কোন মতামত ও তো ছিলনা।

২.
প্রথমবার ওরা যখন কুষ্টিয়া থেকে আমাকে দেখতে এসেছিল সেটা আজ থেকে ১৫দিন আগের কথা। আজ আবার এসেছেন। আজকের আসাটা কিন্তু শুধু দেখাদেখি না যাকে বলে "পান চিনি" মানে পাঁকা কথা। আমার বাবাটা শেষ পর্যন্ত হেরেই গেলেন। নারীদের কাছে জগতের পুরুষ মানুষরা বিয়ের পর জয়ী হয়েছেন, সেটা বোধ হয় কেউ শোনেননি। মা আর মামাদের যুক্তির কাছে হার মেনে আজ আমার বিয়ের পাঁকা কথা দিলেন বাবা। আগামী মাসেই আমার বিয়ে, কারণ আমার হবু স্বামীর ফিরে যেতে হবে।

সময় কম থাকাতে খুব ঘটা করে না হলেও পাড়া প্রতিবেশী সবার মেজবানিতে আমার বিয়ে হয়ে গেল। সময়টা ছিল ফাল্গুন মাস। বাসর রাতে আমি ও আমার বর একা। জীবনের প্রথম ও একমাত্র উপলব্ধি এটা। তবে আমাকে অবাক করে দিয়ে ও আমাকে বলল আমরা যতদিন সহজ না হতে পারছি আমাদের মধ্যে কিছুই হবেনা। বান্ধবীদের (যাদের বিয়ে হয়েছে) কাছে বাসর রাতের নানা কথা শুনে আমি এমনিতেই চুপসে ছিলাম। ওর এই মধুর কথা শুনে আমি সাহস পাব কি! আরো যেন ভড়কে গেলাম।

দিন পনের পরে ও ফিরে যায় লন্ডনে। আমি আবার ফিরে যাই আগের জীবনে। পরীক্ষা শেষ হয় আমার। ও আবার দেশে আসে চার মাস পর। আমিই তাকে বলি
- তুমি বাবা হতে যাচ্ছ।
* সত্যি!
ওর দুচোখ যেন টলমল করে ওঠে। ভেতরে ভেতরে একটা চাপা খুশির বান বয়ে যায় আমারও। আমি হতে চলেছি পূর্ণাঙ্গ নারী, হতে চলেছি মা। অবশেষে পাঁচ মাস পর আমার কোল আলো করে আসে আমার "পরী"। এই সময়টা আমি মায়ের বাড়ীতেই ছিলাম। ও সারাটা সময় আমার পাশেই ছিল। এর মধ্যেই আমাদের লন্ডন যাওয়ার কাগজপত্র ঠিক হয়ে যায়। মেয়েরা নাকি সৌভাগ্য বয়ে আনে। আমাদের বেলায় একথাটা একশভাগ সত্যি হয়ে দেখা দেয়।

৩.
লন্ডন যাবার জন্য আমার পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজ-পত্র ঠিক করতে করতে প্রায় আট মাস চলে যায়। হঠাৎ পরী অসুস্থ হয়ে পরে। নবীনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই, তিন দিন হয়, ডাক্তার কিছুই ধরতে পারেননা। ঢাকা শিশু হাসপাতালে নিয়ে যেতে লিখে দেন। পরীর বাবা আমাদের নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। শিশু হাসপাতালে পরীর চিকিৎসা চলে। আমি দিন রাত না ঘুমিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে থাকি। আমার ভেতরটা ভেঙ্গে যায়। কাঁদতেও যেন ভুলে যাই। দৌড়াদৌড়ি করে পরীর বাবা অসুস্থ হয়ে পরেন।

সৃষ্টিকর্তার অসীম দয়ায় এ যাত্রা পরী সুস্থ হয়ে ওঠে। এদিকে যাবার দিনও ঘনিয়ে আসে। পরীর বাবাকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রায় এক মাস হয়ে গেলেও ডাক্তাররা কোন অসুখ ধরতে পারলেন না। তার শরীর খুব খারাপ হতে থাকে। একদিকে আমার নাড়ি ছেড়া ধন, অন্যদিকে আমার স্বামী। যে আমি কখনও শহরে আসিনি, সেই আমাকে আজ দুটো মাস ধরে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। পরীর বাবা একটু সুস্থ হলে আমরা লন্ডনে চলে আসি।

চায়না টাউনের কাছেই রিজেন্ট স্ট্রীটের ৮তলা একটি বাড়ীতে ৫ম তলায় আমাদের ফ্লাট। নিচে খুব যতনে সাজানো একটা বাগানও আছে। আমরা এসেছি কিন্তু কেউই শান্তিতে নেই মেয়েটাও আবার অসুস্থ হয়ে পরে, আর পরীর বাবাতো অসুস্থই। আমাদের ফ্লাটের পাশেই একটা ক্লিনিক সেখানে গেলাম পরীর বাবাকে নিয়ে। ডাক্তার বাংলাদেশের খোরশেদ আলম। বাংলাদেশের হলেও তার কাছে বিশেষ কোন সুবিধা পেলামনা। তবে একটা উপকার অবশ্য হয়েছে, অল্পশিক্ষিত একটা মেয়ের পক্ষে অপরিচিত একটা দেশে, অনভ্যস্ত একটা ভাষায় মানুষকে মনের কথা বলা যায়না। এই বাঙালী ডাক্তারের সাথে সবিস্তারে কথা বলতে পেরেছি।

ক্লিনিকের ভেতরে যেখানে রোগী আছেন সেখানে যাওয়ার অনুমতি নেই। তবু ডাঃ খোরশেদ আলম আমাকে পরীর বাবার কাছে নিয়ে গেলেন। অজানা একটা ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরল। আমি পরীর বাবার মাথার কাছে বসি। এই তিন মাসেই প্রাণবন্ত এক যুবক হাড্ডিসার হয়ে গেছেন। তার চোখ জলে ছলছল-

* নয়ন আমি বিয়ের আগেই তোমাকে দেখেছিলাম। আমার যে অবস্থা ছিল খুব সুন্দরী একটা মেয়ে বিয়ে করা অসম্ভব ছিলনা। আমি কখনও কাউকে ভালবাসিনি। কি কারণে যেন তোমাকে আমার অনেক পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। আমিই বাবা-মাকে বলে তোমাদের ওখানে পাঠিয়েছিলাম। নয়ন তুমি আমাকে যতটুকু ভালবাসা দিয়েছ, পৃথিবীর আর কোন নারীর কাছে সেটা পেতাম কিনা তা শুধু সৃষ্টিকর্তাই বলতে পারবেন।

পরীর বাবা আমাকে নয়ন নামেই ডাকেন। আমার চোখদুটো নাকি তার অনেক পছন্দের। কথা বলতে বলতে পরীর বাবার চোখে জল গড়িয়ে পরে।

* নয়ন আমি তোমাকে কোন সুখই দিতে পারলামনা। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও।
- পরীর বাবা চুপ করোতো ক্ষমা করার অনেক সময় বাকি আছে। আগে সুস্থ হও তার পরে দেখা যাবে।
আমার হাতদুটো চেপে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠেন পরীর বাবা।
* নয়ন আমি আর কখনো সুস্থ হবো না। ডাক্তার সময় বলে দিয়েছেন।
- ডাক্তার তো সৃষ্টিকর্তা না যে সব জানবেন।

এই সময় ডাঃ খোরশেদ আলম কেবিনে ঢুকলেন। তার অনুরোধে আমাকে বাইরে যেতে হয়। পরীর বাবার সামনে আমি অনেক শক্ত হয়েছিলাম, কিন্তু বাইরে এলে আর কান্না ধরে রাখতে পারলাম না। ডাঃ খোরশেদের অনুরোধে দুজন লোক আমাদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করলেন। আমরা দেশে ফিরে এলাম।


৪.
আজকে পরীর বাবার ১ম মৃত্যু বার্ষিকী। দেশে ফেরার ১৫দিনের মধ্যে পরীর বাবা মারা যায়। লিউকোমিয়ার লাস্ট স্টেজে তার রোগ ধরা পরে। আমার মেয়ের বয়স এখন আড়াই বছর। গত একবছর পরীর দাদা-দাদী আমার বাবা-মা সবাই আমাকে আবার বিয়ে দেয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করছিলেন।

= মা'রে মানুষের জীবনে কত দুঃর্ঘটনাইতো ঘটে। তুইও এটা একটা দুঃর্ঘটনা মনে করে ভুলে যা। আবার নতুন করে সংসার কর।
- মা আমার পরীর কি হবে? তোমরা একবার ভেবেছ? পরীকেসহ কেউ আমাকে বিয়ে করবে?
= বোকা মেয়ে এটা কেমন কথা হলো? পরী আমাদের কাছেই থাকবে।
- মা তোমার জীবনে যদি এমন হতো তুমি ওকি আমাকে ফেলে চলে যেতে পারতে?
= আমার জীবনে তো এমন হয়নি, তাই বলতে পারছিনা। আমি তোর কোন কথা শুনবনা। পরীর দাদী একটা সম্বন্ধ এনেছেন আমি তাতে সায় দিয়েছি। তুই আবার কোন পাগলামি করিসনা যেন।

আমার আর কোন পাগলামি করতে হলোনা। এপ্রিলের ২০তারিখ হঠাৎ বাবা মারা গেলেন। এযাত্রা পরীও এতিম হওয়া থেকে বেঁচে গেলো।

পরী এখন ভেঙ্গে ভেঙ্গে অনেক কথাই বলতে পারে। সারাদিন ওরসাথে খুনসুটি আর খেলা করে আমার সময় চলে যায়। একদিন ডাকে একটা চিঠি পেলাম, লন্ডনের চিঠি। আমার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। লন্ডন থেকে আমাকে কে চিঠি লিখবে। চিঠিটার ওজনও নেহায়েত কমন।

খুলে দেখলাম, এযে আমার পরিচিত লেখা, পরীর বাবার লেখা

"নয়ন"
আজ যখন এ চিঠি পড়বে, তখন আমি তোমাদের ছেড়ে অনেক অনেক দূরে চলে গেছি। আমি অনেক পরিশ্রমী ছিলাম। লন্ডনে নিজে একটা ফ্লাট কেনা চাট্টিখানিক কথা নয়। আমি বিয়ের আগে কখনও অসুস্থ হইনি। তাই এত তাড়াতাড়ি তোমাদের ছেড়ে চলে যাব এটা ভাবতেও পারিনি। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়ই ডাক্তার আমাকে আমার রোগের কথা জানিয়েছিলেন। আমাদের নতুন বিয়ে হয়েছে, তোমাকে একথা জানাবো কিভাবে। তুমি বাসর রাতে জানতে চেয়েছিলেনা কি দেখে তোমাকে বিয়ে করেছিলাম? তোমার চোখদুটো ঠিক আমার মায়ের মতো। আমার মাকে নিশ্চয় এতদিনে জেনেছ। অসম্ভব মমত্ববোধ তার মাঝে লুকিয়ে আছে। আমি ঠিক এমন একজনকেই চেয়েছিলাম জীবন সঙ্গী হিসাবে। সৃষ্টিকর্তা আমার আশা পূরণও করেছিলেন। আমার কপাল মন্দ তোমার সাথী হয়ে থাকতে পারলামনা। আমি নেই, কিন্তু আমাদের পরী রইল তোমার কাছে। পরীর মাঝেই আমাকে পাবে। আমি জানি তুমি কি ভাবছ। বাড়ী তোমাকে ছাড়তে হবেনা। তুমি কাগজগুলো দেখো তাহলেই বুঝতে পারবে। আমাকে ক্ষমা করে দিও, আমার কারণে তোমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে।

আমি চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম। একটা মানুষ এতো ভালবাসতে পারে? আমি কি করব সেটা সে জানবে কিভাবে? পরীর বাবা আমি যে তোমাকে কতটা ভালবাসতাম তুমি কি তা জানতে?

৫.
চিঠির সাথে ছিল একটা উইল। পরীর বাবা তার সমস্ত সম্পত্তি আমাকে দিয়ে গেছেন। আমি চাইলে লন্ডনে তার সব কিছু বিক্রি করে দিতে পারি। আমি নারী, আমি মা। নারী তো অবলা শুধু অধিকারের কারণে। সম্পদের কারণে নারী মেনে নেয় পুরুষ শাসিত সমাজের যত জুলম আর অনৈতিক শাসন। আজ আমার কিছুর অভাব নেই, আমি আজ শুধুই মা। শুধু চোখে নয় আমি মা হয়ে বাঁচবো সর্বাঙ্গীণ ভাবে। পরীই আমার সব।

মাকে বলি আমি লন্ডন চলে যাব। মা কিছুতেই রাজি হন না। একলা একটা মেয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে একা একা থাকবে। এটা মেনে নেওয়া গ্রামের একজন মায়ের পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব না। কিন্তু আমিও মা, আমিও মেনে নেবনা আমার জীবদ্দশায় আমার মেয়ের এতিম হওয়া।

একরকম কাউকে না জানিয়েই আমি আর পরী বিমানে চড়ে বসি। শুরু হয় এক মা আর তার মেয়ের না লেখা গল্প। আমরা দ্বিতীয়বার দেশ ছেড়ে যাচ্ছি। আমরা দুজন আছি ঠিকই শুধু পরীর বাবা আমাদের সঙ্গী হয়না।

লন্ডনে পৌছে বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে পরীর বাবার ফ্লাটের চাবি বুঝে নেই। শুরু হয় এক মা আর তার মেয়ের সংসার। ফ্লাটের একটা রুম আর একটা বাথরুম বাদে সবটুকু সাবলেট দিয়ে দেই।

পরীকে ওর বাবার সব কথা বলি। ওর সাথে বন্ধুর মতো খেলি। কখনো আমি লুকাই ও খুঁজে বের করে। আবার ও লুকায়।
- এই তো আমার পরী।
:: যাও তোমার সাথে খেলবো না, তুমি আমাকে বের করে ফেলো।
- আচ্ছা ঠিক আছে, এবার তোমাকে আর খুঁজে পাবোনা।
:: আমার পরী কোথায়রে। দরজার আড়ালে পরী খিল খিল করে হাসে। তবু আমি ওকে দেখিনা। হন্যে হয়ে খুঁজি। পেছন থেকে পরী আমাকে জড়িয়ে ধরে।
- বোকা মা এই যে আমি।
ওকে আমি জড়িয়ে ধরি পরম মমতায়।

আমার ভাড়াটে দুজনই লন্ডনের বাসিন্দা। অপরিচিত দুটো মানুষ উইলিয়াম আর ক্রিস্টিনা। ওদের ঘরে বসে আমাদের মা মেয়ের খেলা দেখে, মুগ্ধ হয়ে। পৃথিবীতে সব মায়ের ভাষা আর অনুভূতিই এক রকম। আমার গল্প শুনে উইলিয়াম আর ক্রিস্টিনা দুজনই কেঁদেছে কতবার। ক্রিস্টিনা মা হবে, এইতো আর কটা মাস বাকি।

৬.
আজ পরীর ৫ম জন্ম বার্ষিকী। আমাকে অবাক করে দিয়ে পরী ভারী গলায় ডাকে-
:: নয়ন, এই নয়ন আজ আমার জন্ম দিন। আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা না তোমার। কি হলো? কথা বলছো না কেন?
আমার দুচোখে দুফোটা গরম জল গাল বেয়ে সংগোপনে ঝরে যায়।
:: নয়ন ভালো হচ্ছেনা কিন্তু। আমি কিন্তু তোমার সাথে আড়ি দেবো। দেবো কিন্তু আড়ি।

আমি চোখ মুছে বলি
-ওরে আমার পরীর বাবারে, দেখি পরীর বাবা কেমনে আমার সাথে আড়ি দেয়।
ও খিল খিল করে হেসে ওঠে। আমরা তৈরি হয়ে বেড়িয়ে যাই। যাওয়ার পথে ক্রিস্টিনা আমাদের পথ আগলে দাড়ায়। ওর চোখে জল। আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে এখন কিছু বাংলা বলতেও পারে।

# দিদি আমাকে দোয়া করো, আমি যেন ঠিক তোমার মতো মা হতে পারি।
আমার নিজেকে সার্থক মনে হয়। ক্রিস্টিনার ভারী শরীরটাকে জড়িয়ে ধরি। দুই দেশের ভিন্ন সংস্কৃতির দুটো নারী একজন মা আর একজন হতে যাওয়া মা জড়াজড়ি করে চোখের জল ফেলি।
# দিদি আমার মেয়ে হলে ওর নাম রাখব নয়ন।

পরীর বাবা দেখে যাও, তোমার নয়ন আজ শুধু চোখেই তোমার মা'র মতো হয়নি, আজ সে সত্যিকারের মা।
- তোমাদের আদর-সোহাগ শেষ হলে আমাকে নিয়ে চলো আমি আর দেরি করতে পারবোনা। পরী এসে তাড়া দেয়।
ওর কথায় ক্রিস্টিনা আর আমি হেসে ফেলি।

মেয়েটাকে নিয়ে বাইরে আসি। আমিতো অবাক, উইলিয়াম একটা লিমো নিয়ে হাজির। ক্রিস্টিনার মতো না হলেও উইলিয়ামও কিছু কিছু বাংলা বলতে পারে।
: ভোন আমি সবসময় টোমার ভায় হয়ে থাকতে চায়।
- মামা তোমার আরো ভালো করে বাংলা শিখতে হবে। হি হি হি
: ওকে মা, টুডে আই এ্যম অল ইউর'স্।

আমি শুধু একটু হেসে উইলিয়ামের মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় নেই। আমরা লিমোতে উঠে রিজেন্ট স্ট্রিট ধরে পশ্চিম-দক্ষিণে চায়না টাউনের দিকে রওনা দেই। নিউ লন ফুং রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করি। তার পর লিমোতে চেপে পলমল স্ট্রিট হয়ে ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজ পেরিয়ে লন্ডন আই নাগর দোলায় পৌছাতে বিকাল হয়ে যায়।

শীত সবে শেষ হয়েছে। বরফ গলা পানি টেমস নদীর বুক চিড়ে উত্তরে বয়ে চলে। নাগর দোলায় বসে আমি তাকিয়ে থাকি নদীর ঘোলাটে জলের দিকে। চলে যাই অতিতে যেখানে আমি আছি পরীর বাবা আছে। অস্থিরতা আমাকে গ্রাস করতে চায়। পরীর বাবা তুমি দেখতে পাচ্ছ, তুমি ভুল করনি। আমি মা হয়ে উঠেছি তোমার পরীর মা, যেমন একদিন ঠিক এই বসন্তেই আমি তোমার বউ হয়েছিলাম। আমি স্পষ্ট দেখলাম পরীর বাবা টেমস নদীর জলের ভেতর থেকে যেন হেসে উঠল।

সুলেখা ভাবী তুমি মিথ্যে বলনি মানুষের মন, হ্যাঁ মানুষের মন আছে বলেই মানুষ সব পারে।



**কৈফিয়ত: অনেক ইচ্ছে ছিল, গল্পের শেষে এই "মা" কে নিয়ে কিছু বলব। কিন্তু আমি ক্ষুদ্র লেখক, এই মায়ের কথা লেখার যোগ্যতা রাখিনা। তার কথা শুনতে শুনতে কখন যে আমার দুচোখ বেয়ে অশ্রু ধারা ঝরে গেছে, জানতেও পারিনি। ভদ্র মহিলার নিজের নাম, তার স্বামীর নাম এবং যা কিছু উহ্য আমাকে বলেননি। তাই গল্পে তাদের নাম দেয়া গেলোনা। আর আমার এই দুর্বল চিত্তে তার কাছ থেকে যেচে কিছু জানার সাহস যোগাড় করতে পারিনি। মাঝে মাঝে ইয়াহুতে ভদ্র মহিলার সাথে চ্যাটিং হয়। মা মেয়ে দুজনই ভালো আছেন। ক্রিস্টিনার ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে। তার নামটা হয়তো পাঠককে আর বলে দিতে হবেনা। উইলিয়াম, ক্রিস্টিনা তাদের মেয়ে নয়ন, পরী পরীর মা, দুটো আলাদা দেশের আলাদা সংস্কৃতির "একটি পরিবার" ভালই আছেন। সৃষ্টিকর্তার কাছে করজোড়ে তাদের সুখ কামনা করছি।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মা'র  চোখে অশ্রু যখন
    মা'র চোখে অশ্রু যখন অনেক দিন পর এসে পরে গেলাম গল্প টি ..মধ্যে দুবার পড়েছি কিন্তু মন্তব্য করতে পারনি তাই আজ আবার পড়ে মন্তব্য করলাম.... কি মন্তব্য করব জানি না আজ এই কাহিনীর মত একটা গল্প শুনলাম এক বন্ধুর কাছে ...........একটু ভিন্ন আছে তার মধ্যে একটি নয়নের ছিল মেয়ে পরী..কিন্...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৩০ মে, ২০১১
  • এস, এম, ফজলুল হাসান
    এস, এম, ফজলুল হাসান আমার দৃষ্টিতে মা সংখ্যার সেরা গল্প-কবিতা গুলি হলো (১) প্রথম : # সাত মা # লেখক : মামুন ম.আজিজ , (২) দ্বিতীয় : # ভিখারিনী মা # কবি : Oshamajik , (৩) তৃতীয় : # আমার ভালোবাসার ফুল মায়ের হাতে দেব # কবি : মোহাম্মদ অয়েজুল হক জীবন , (৪) চতুর্থ : # মা # কবি : Kho...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৩০ মে, ২০১১
  • সূর্য
    সূর্য প্রতিটি পাঠককেই সালাম জানাই। পাঠকই লেখকের প্রাণ ভোমড়া। পাঠক না থাকলে লেখক নির্বাক, যেমন সৃষ্টহীন স্রষ্টা। সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা রইল।
    প্রত্যুত্তর . ৩১ মে, ২০১১