বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ জুলাই ১৯৮৩
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭৫

বিচারক স্কোরঃ ১.৭৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

দুঃখ (অক্টোবর ২০১৫)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭৫ হত্যাকারী

মেহেদী হাসান অপু
comment ৫  favorite ০  import_contacts ৩৩৯
তখনো সন্ধ্যা নামেনি।অনন্ত বিশ্বলোক থেকে আলোকিত সূর্য বিদায় নিয়েছে,অথবা নেয়নি।চিরন্তন দ্বন্দ্ব।দুটোই সত্য,দুটোই মিথ্যা।
আমার আসতে একটু দেরি হয়েছে।প্রাসাদসম বাড়িতে বসে আছি অনেকক্ষণ।আকাশে এককোণে সন্ধ্যাতারার মতো।অগোচরে জ্বলা,অগোচরে নেভা।এরপর পায়ের শব্দ।একটি মেয়ে।
সে কিছু বলার পূর্বেই আমি বললাম, “আসিফ চৌধুরী আছেন?”
মেয়েটি বলল, “বসুন,বাবা বাইরে গেছেন”।
আমি যেন বসে আছি অনন্তকাল,কোন মহাসমূদ্রের অতলস্পর্শে ঘুমন্ত বীজ হয়ে।সেখান থেকে আলো অনেকদূরে।সূর্য তো অন্যজগতে।
আসিফ চৌধুরী আসলেন।আমাকে দেখে একটু হাসলেন।হয়ত আমার মনঃক্ষুন্নতা তাকে যেন স্পর্শ না করে এ জন্যই।লোকটি ভীষণ চালাক।ব্যাপারটা খুব রহস্যময়।তার সামান্য হাসিতে আমিও ভুলে গেলাম।
আসিফ চৌধুরী বললেন, “এই যে ছবি।আর এখানে অগ্রিম টাকা।বাকীটা কাজ শেষ করার পর”।
আমাকে আর সময় দিতে চাইলেন বলে মনে হলো না।আমি যেন মধ্যরাতের সাইরেন।সতর্ক করে দিতে মানুষকে জাগাই।কিন্তু কেউ আমার যন্ত্রণা সহ্য করতে রাজী নয়।
সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম।পরদিন সকালে আবার আসিফ চৌধুরীর বাসায় গেলাম।ঘাসে মোড়ানো মাটির চাদরে বসে চা খাচ্ছেন।আমার দিকে তাকালেন।মূহুর্তে চোখ ফিরিয়েও নিলেন।
আমি কাছে গিয়ে বললাম, “পুরো টাকাটাই দিতে হবে”।
আমার কথা শুনে খুশি হওয়ার কারণ নেই।খুশি হলেনও না।খুব যে বেশি পীড়িত তা বোঝাতে চাইলেন না।আমিও বুঝলাম না।
তিনি বললেন, “কাল এসে নিয়ে যেও।আমার মেয়ের কাছে রেখে যাব”।
আমি বললাম, “যাকে হত্যা করব তিনি আপনার কাছের কেউ?”
আসিফ চৌধুরী কর্কশ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন।তার দৃষ্টির সাথে আমার দৃষ্টির অদ্ভূত মিল।
এরকম অনেকবার হয়েছে।আমি টাকা নিয়ে আর কাজ করিনি।পরে টাকা ফেরত দিয়েছি।মনের অদ্ভূত খেয়াল।আমি মানুষ খুন করি।আমার কোন দয়া-মায়া থাকার কথা নয়।কিন্তু এটা ভুলে যাওয়া ঠিক নয়,আমার একটা মন আছে।তাই তার কোন না কোন দুঃখ আছে।
একবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলাম।বেশ কিছুদিন জেলে থেকেছি।মাথার উপর খুনের মামলা।কিন্তু ভয় পাইনি।আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবার সাহস কই?যাকে টাকা দিয়ে বশ করতে পারি না,তাকে রক্ত দেখিয়ে বশ করি।টাকা ও রক্তের অদ্ভূত মিল।একটির জন্য আরেকটি ক্ষয় হয়।
আমার টাকার প্রয়োজন ছিলো।আবারও আসিফ চৌধুরীর বাসায় গেলাম এবং সেই মেয়েটির দেখা পেলাম।আজ সে আমার সামনে নির্ভার।নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা নেই।সে খুব রহস্যময়ী।
কর্কশকন্ঠে বলল, “কেন এসেছেন?”
আমি বললাম, “টাকা নিতে”।
সে ধীর পায়ে আবার উপরে উঠে গেল।ভেতর থেকে টাকা নিয়ে এসে আমাকে দিলো।আমি তার হাত চেপে ধরে বললাম, “তুমি খুব সুন্দর”।
সে বলল, “ছাড়ুন”।
আমি বললাম, “যে আমার হতে চায় না,তাকে আমি জোর করি”।
সে বলল, “আমাকে পাবেন না”।
আমি বললাম, “যদি তোমার জন্য জীবন দিয়ে দিই”।
সে বলল, “তবুও আমাকে পাবেন না”।
তার চোখ দেখে মনে হলো সে আমাকে অনবরত ঘৃণা করছে।কিন্তু তাকে স্পর্শে মনে হলো,মহাসমুদ্রের উত্তালতা কোথায়? সে যেন প্রশান্তের বুকে প্রতিনিয়ত ভেসে চলেছে।কাউকে ভাসিয়ে নিচ্ছে।
আমি তাকে আরও কাছে টেনে নিতে চাইলাম।কিন্তু সে নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিল।আমি তার দিকে পিস্তল ধরলাম।কিন্তু তার নির্লিপ্ততা আমাকে হতাশ করল।সে কি পাথর?
আমি বললাম, “আমি তোমাকে হত্যা করতে পারি”।
সে বলল, “তবে তাই কর।তোমার যা ইচ্ছা”।
আমি প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হলাম।কী চায় মেয়েটি?কেন সে মৃত্যুকে ভয় পায় না?আমি কি তাকে হত্যা করব?কিন্তু ফুলকে হত্যা করে কী লাভ?সে তো টোকা দিলেই ঝরে যাবে।
আমাকে সবকিছু জানানো হয়েছে।কখন কী করতে হবে।আমার কাজ হলো সময়মতো পৌঁছে সব শেষ করে দেওয়া।কথা ছিলো আমার দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে হবে।সে কথাও রাখা হয়েছে।মানুষ খুন করে আনন্দ পাই তা নয়।মানুষের রক্তে পিপাসা মেটে তাও নয়।মনের ক্ষুধা মেটানোর জন্য মানুষ প্রেম করে,খুনও করে।
রাত এগারোটা বাজার পর সংকেত পেলে আমি ভেতরে ঢুকব।একটি ভবনের তিনতলায় যেতে হবে।সেখানে আসিফ চৌধুরী আছেন।তার অনেক আগেই বের হয়ে আসার কথা।আমি সংকেত পেলাম।কিন্তু আসিফ চৌধুরী এখনও বের হয়ে আসেননি।আমি চিন্তিত হয়ে দ্রুত উপরে যাবার চেষ্টা করলাম।আমি ভেতরে ঢোকার আগেই সামনে থেকে আমার দিকে গুলি ছোড়া হলো।আমি কিছুটা হতভম্ভ হলাম।নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করলাম।যতক্ষণে গুলি ছুড়ে আমি প্রতিরোধ গড়লাম,ওরা পালিয়ে গেল।বিশাল ফ্লোরে একটি লাশ দেখতে পেলাম।কাছে গিয়ে দেখলাম সেটা আসিফ চৌধুরীর।
আমি কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলাম।একদম নিস্তব্ধ।এখন ভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করলাম।কিন্তু চারপাশ থেকে পুলিশ আমাকে আটকে দিয়েছে।পরিস্থিতি আমার অনুকূলে নয়।পুলিশের কাছে আত্মসমর্পন করব?সেটা কি কাপুরুষের মত নয়?যাই হোক,ইতিহাস তো কাপুরুষদেরই পক্ষে।
ইতিহাস অন্ধকারে হারিয়ে যায়।তাই সেটাকে বিশ্বাস করা দায়।আমি পাপী বটে।কিন্তু যে আলোকময়ী দূর দিগন্তে কিরণের বহ্নিধারা জ্বালিয়ে রেখেছেন, তা কি শুধু অন্যকে পোড়ানোর জন্যই?সে নিজে কি পোড়ে না?পাপী দিগন্তের কাছে মাথা নোয়ায়।সে ইতিহাসকে দাম দেয় না।ইতিহাসও তার ধার ধারে না।
আমাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো।উকিলের সব কথা আমার বিপক্ষে গেল।আমার দন্ডই তার উদ্দেশ্য।তাতে কী সুখ?আমি তো খুন করিনি।আমার তো ফাঁসি হওয়ার কথা নয়।কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আমার কথা কে বিশ্বাস করে।মানুষের তৈরি বিচার,যা সত্যকে মিথ্যা বানায়,মিথ্যাকে সত্য বানায়।আমার ভয় ছিলো বিচারে।মৃত্যুতে নয়।
এরপর কাঠগড়ায় দাঁড়াল সেই মেয়েটি।কী ক্ষতি করেছিলাম তার?তাকে তো আমি ক্ষণিকের জন্য চেয়েছিলাম।আমার জন্য তার দয়া নেই।একদিন হত্যা করার জন্য তার দিকে পিস্তল ধরেছিলাম আমি।আজ আমার দিকে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।সে দৃষ্টি আগে দেখিনি।তার দৃষ্টিতে অগ্নি।তাকে তো আমি ফুল ভেবেছিলাম।কিন্তু আজ সে ভাবনা অর্থহীন।প্রদীপের নিচে অন্ধকার।প্রদীপের চারপাশে আলো।সে ও আমি।প্রদীপ অথবা আলো,আলো অথবা অন্ধকার।
মেয়েটি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “মহামান্য বিচারক,এই লোকটি,সেই আমার বাবার হত্যাকারী”।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন