বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ জানুয়ারী ১৯৯৮
গল্প/কবিতা: ২টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

ঘৃনা (আগস্ট ২০১৫)

অতঃপর শুধুই ঘৃণা

মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম
comment ২  favorite ০  import_contacts ৪৫৪
‘ছাড়ুন, ছাড়ুন বলছি, পা ছাড়ুন।’- চোখ পাকিয়ে কঠিন
গলায় বলে উঠলো ডাক্তার হরিলাল প্রসাদ।
ধমক খেয়ে বুড়ো মহিলাটি ফুট চারেক দূরে গিয়ে
বসে পড়লো। চোখ থেকে অঝোড়ে অশ্রু ঝড়িয়ে করুণ মুখে
ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়তে লাগল। তার
অনুনয়ে সাহায্যের অভিব্যক্তি। আরও একটু
দূরে ডাক্তার বাবুর গাড়ি এসে দাড়িয়ে আছে। গাড়ির
ভেতরে চন্দ্রিমা দেবী হাসোজ্বলমুখে তাঁকিয়ে হাত
নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।
বুড়ো কাকলী দেবী এবার একদম জেঁকে ধরলেন, পাঁ ধরে
কুকুরের মত ল্যাংচাতে থাকলো। এ অবস্থা দেখে
ডাক্তার-বাবু কাকলী দেবীকে পাঁয়ের সাথে টানতে
টানতে গাড়িতে উঠে বসলেন। কাকলী দেবী ধীরে
ধীরে মড়াকান্না জুড়ে দিল। চারপাশের মানুষগুলো
তাঁকিয়ে তাঁকিয়ে দেখে উপহাস করা ছাড়া আর কিছুই
করতে পারছিলোনা। একসময় কাকলী দেবী আশাহত হয়ে
হাসাপাতালের ভেতরে ঢুকলেন। রিসিপশনে খোঁজ
করলেন বনানী দেবীর। নাহ, সে এখনো পৌছাঁয়নি ।
শুকনো মুখে হাসাপাতাল থেকে বের হয়ে রাস্তায়
পাগলের মত হাঁটতে থাকলেন।

এদিকে, বনানী দেবীর ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে
একটু দেরিই
হয়ে গেল। রবিবার সকালে বনানী লুচি
বানায়। সঙ্গে মুগডাল। মুগডালে মুরগির ছুটকা
ছাটকা। এক মগ মালাই চা'ও নেয় বনানী, রবিবারে।
আয়েশ করে খাওয়ার মত অন্য কোনো সকাল পায়
না তো!
বাসা থেকে হাসপাতাল মাইল দুয়েক।
রিকশায় যায়। গাড়ি কিনেননি, গাড়ি কিনলে নিশ্চয়ই
চাকুরীটা চলে যেত । অফিসের
গাড়িতে যাতায়াত করে। বন্ধের দিন
অফিসের গাড়ি ব্যবহার করে না। ফিরতে
ফিরতে সাড়ে ১২টা নাগাদ হয়।
অক্টোবরের প্রথম দিককার কথা। হেঁটে হেঁটে
হাসাপাতালে যাবে বলে
মনস্থ করলো। শরীরটাও একটু মুটিয়ে গেছে। হাঁটা-হাঁটি
হয়না তো বহুদিন।
রাস্তাটা উঁচু মতোন। ওপর দিকে বেয়ে উঠতে
হয়। দুদিকে ছোট-বড় নানা ঘরবাড়ি। মফস্বল এলাকা বলে
একটু আভিজাত্যপূর্ণই। সবই
পুরনো হয়ে গেছে তবুও আলাদা সৌন্দর্য বিদ্যমান ।
বনানী দেবীর বাড়িটাও আলিশান ।
হাঁটতে হাঁটতে হরিপ্রসাদ লালের বাড়িটার উপর চোখ
পড়লো বনানী দেবীর। আহ!! বাড়িতো নয় যেন সাক্ষাৎ
রাজপ্রাসাদ। সামনে বাহারি ফুলের বাগান, গাড়ি
রাখার সুন্দর জায়গা। রাস্তার দুই পাশে
প্রশস্ত ফুটপাত। ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ
টের পেলেন, ভেতরের যন্ত্রপাতি নড়বড়ে হয়ে
গেছে। নইলে কেন আধা মাইল হাঁটার পর
ছাতি শুকিয়ে গেল! মাথার ওপর সূর্যের
তেজটাও বেশ চাগিয়ে উঠেছে। ভীষণ তৃষ্ণায়
পেয়ে বসল বনানী দেবীকে ।
আশপাশে কোনো
দোকানপাট নেই যে পানি কিনে খাবেন। হঠাৎ
সামনে নজর পড়ল। দেখলো, ফুটপাত ঘেঁষে
একটা রিকশাভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ভ্যানে
থরে থরে সবুজ ডাব সাজানো। পাশে দাও
হাতে ডাববিক্রেতা। প্রায় জোর কদমে হেঁটে
গেলেন ভ্যানের পাশে। একটা ডাবের অর্ডার
দিয়ে দিলেন, দর কষাকষি করার ধৈর্য নেই। ডাবটার
মুখাংশ কেটে একটা স্ট্র ঢুকিয়ে হাতে
দিতে-না দিতেই অনুভব করলেন ঝুপ করে কী যেন বনানী
দেবীর
পায়ে এসে পড়ল।
সম্বিত ফিরে তাকিয়ে দেখলেন আশে-পাশের গাঁয়ের
ষাটোর্ধ কাকলী দেবী। কাঁচা-পাঁকা চুল আর ময়লা
বসনে অনেকটা উন্মাদের মতন মনে হচ্ছিলো। হাস-পাশ
করে পা জড়িয়ে
কী যেন বলতে চাইছে।
চোখেমুখে সব
বিরক্তি ঢেলে বনানী বলে উঠলেন, ‘ছাড়, ছাড়…।’
‘আপাগো আপনে আমারে বাঁচান ।’ -কাকলী দেবী করুণ
স্বরে বনানী দেবীকে বলে উঠলো।
বনানী দেবী কথাটির জবাব দেয়ার কোনো
প্রয়োজনবোধ
করলেননা । একমনে ডাবের পানি আহরণে মনোনিবেশ
করলেন। ডাবের পানি শেষ হলে খয়েরী ভ্যানিটি ব্যাগ
থেকে টুকটাক প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরিয়ে টাকা বের
করে দিলেন ডাব বিক্রেতাকে।
খুচরো টাকা ব্যাগে রাখতে রাখতে ঘড়ির দিকে চোখ
রাখলেন। এখনি তাকে রোগী
দেখতে হবে । জানা আছে, ডাক্তার আসবেন আরও দুই
তিন ঘণ্টা পর ।
ছোট-খাট এই মফস্বল এলাকার ছোট একটি ক্লিনিক ।
একজন ডাক্তার ও চারজন নার্স মিলে কোনোরকমে
ক্লিনিকের কাজ চলে । নামে শুধু ডাক্তার । তিনি
কোনো কাজ করেন না । প্রতিদিন একবার ক্লিনিকে
এসে শুধু হাজিরা দিয়ে চলে যান। তিনি প্রাইভেট
প্র্যাকটিস করেন। শহর থেকে এসেছেন বলে তার এত
কদর।
ক্লিনিকে ডাক্তারদের কাজ নার্সদেরই করতে হয় ।
নার্সদের কাজ
করে দেয় আয়া-বুয়ারা ।
নার্সদের মধ্যে বনানী দেবীই সবচেয়ে অভিজ্ঞ ।
বাকিরা
নতুন । তাঁদের উপর লোকজনের অতটা ভরসা নেই ।
বনানী দেবী শুধু এই অত্র তল্লাটের নার্স বলেই কেউ
কিচ্ছু বলেনা।
তার হাতকাটা জামা আর হাঁটুর উপরের জামা, যে কত ঘর
পুরিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কাকলী দেবীর স্বামীকেও
এই ডাইনীই শেষ করে দিয়েছে।
মফস্বলের মাঝে ছোট একটা কাপড়ের দোকান দিয়ে
ভালোই চলছিল কাকলী দেবীর সংসার। দু'বেলা পেট
পুরে খাবার আর স্বামীর আদর-সোহাগ। বেশ যাচ্ছিল
টোনা-টুনির সংসার। টাকা-কড়িও ভালোই
জমিয়েছিলো।
বনানী দেবী তার কামুক শরীর দেখিয়ে বশ করে ধ্বংস
করে দিয়েছে কাকলী দেবীর সংসার। স্বামী মারা
গেছে তাই বিধবার জীবন কাটাচ্ছে। প্রচন্ড ঘৃণায়
নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দিলো কাকলী দেবী।
আজ অনেক দুঃখ আর বিদ্বেষেই এসেছে, এ কুচক্রী
ডাইনীর কাছে।
মফস্বলের সবাই বনানী দেবীকেই প্রকৃতপক্ষে ডাক্তার
মানে।
এ সুযোগে টাকা-কড়িও কম কামিয়ে নেয়নি বনানী।
এলাকার অবস্থাসম্পন্ন পরিবারগুলো সাধারণত প্রসূতি
মায়েদের প্রসববেদনা শুরুর আগেই শহরের বড়ো বড়ো
হসপিটালগুলোতে নিয়ে যান । সংখ্যায় এদের পরিমাণ
হাতেগোনা ।
মোটামুটি এই মফস্বল এলাকার সিংহভাগ পরিবারই
অনুন্নত। তাই তারা বাধ্য হয়ে
ক্লিনিকটির উপর নির্ভরশীল ।
ছোট্ট এই ঝরে পড়া ক্লিনিকে প্রসূতিদের সঠিক
পরামর্শ, নরমাল ডেলিভারিসহ
সাধারণ কিছু রোগের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়
। যদি রোগীর অবস্থা একান্ত এমন খারাপ হয়ে যায় যে
রোগীকে আর সিজার না করলেই নয় তখন রোগীকে নিজ
খরচে শহরে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না । মাঝে মাঝে
ক্লিনিক
থেকে ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হয় ।
বনানী ক্লিনিকের দিকে রওনা হতেই
মহিলাটি এসে আবার তাঁর পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে
পড়ল।
বনানীর পা দুটি জড়িয়ে ধরল ।
কাকলী দেবী আবার একই কথা উচ্চারণ করল, ‘আপাগো
আপনে আমারে বাঁচান ।’
‘তোকে তো অনেক আগেই বাঁচিয়েছি ’ তাচ্ছিল্যের সুরে
বলে উঠলেন বনানী।
‘তোর স্বামী মানুষ না মহিষ ? জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখ
পেয়েছিলাম সেই কয়েকদিনে’।
‘শেষপর্যন্ত বেচারা মড়েই গেল’। কাকলী দেবী লজ্জায়
মাথা নিচুঁ করলেও পাঁ ছাড়লোনা। কান্নায় ককিয়ে
উঠলো।
বনানীর আশেপাশে এই দৃশ্য দেখার জন্য একটি
ছোটখাট জটলা ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে ।
সবার চোখে বিস্ময়, প্রচণ্ড কৌতূহলো, নাটকের পরবর্তী
দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা । জানার আগ্রহ ঘটনার উৎস
কোথায় । সুতা টেনে ঘটনার নাড়ি-নক্ষত্র উদ্ধারের
চেষ্টা ।
কাকলী দেবীর এমন অবস্থা দেখে সবাই কৌতূহল
দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছেন। একসময়কার মফস্বলের
পরিচিতি সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের
চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন । আশেপাশের দুই তিন
কলোনী
পর্যন্ত তাকে সবাই একডাকে চিনতো, আর আজ তিনি
গ্রামে কালাতিপাত করছেন । রোদ, বৃষ্টি, ঝড়
বন্যা যাই হোক না কেন কাকলীদেবী কখনো কাউকে
পরোয়া করেন নি আর এখনো করছেননা। অস্তিত্ব
টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে তিনি এতদিন বিজয়ী ছিলেন
কিন্তু আজ তিনি পরাজিত।
কাকলী দেবীর জীবনের ইতিহাসের পাতাগুলোও ঘৃণায়
আবৃত। শীতের এক সকালে পতিতালয়ের ধারে তাকে
কুড়িয়ে পায় এডভোকেট কদরীবালা। সেই থেকে তিনি
অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করে যাচ্ছেন।
তিনি কখনো কারো দুঃসময় দেখতে পারতেন না। ভোর
সকালে যখন গৃহিণীরা মাত্র ঘুম থেকে উঠে
ঘরদোর পরিষ্কার করে একটি নতুন দিনের ঘরকন্নার
প্রস্তুতি নিতো অথবা এঁটো থালাবাসন ধোয়ার জন্য
পুকুরের দিকে পা বাড়াতো তখন কাকলী দেবী ঘর থেকে
বের হতেন। ঘর থেকে বের হয়ে মফস্বলের রাস্তায় পড়ে
থাকা ছিন্নমূল মানুষদের খাবার দিয়ে আসতেন।
আজ তার দুঃসময়ে কেউ তার পাশে নেই। তার সুন্দর
দেহখানা আজ কদাকার হয়ে গেছে।
তার পথের সঙ্গী এখন প্রাগৈতিহাসিক যুগের
একটি বাঁশের লাঠি- ক্ষয়ে ক্ষয়ে যার গায়ের পাঁচ
আঙুলের দাগ বসে গেছে, তার বহুযত্নে রাখা একটি
কালচে রঙের কাপড়ের পুঁটলি যার শরীরে ছিঁড়ে যাওয়া
স্থানগুলোতে গিঁট দিতে দিতে অনেকগুলো টিলা পড়ে
গেছে ।
বর্তমানে মেয়ে ও মায়ের সংসার কাকলী দেবীর ।
কাকলী দেবীর স্বামী
গত হয়েছেন ঐ বনানী ডাইনির লোভে পড়ে। হলো তো
প্রায় বছরখানেক।
কাকলী দেবী এখন বাস্তুহারা । কারো দয়ায় কাকলী
দেবী তাঁর
জমিতে কিছুদিন ঘর পাতে, দয়া ফুরিয়ে গেলে সেখান
থেকে আবার সেই গলাধাক্কা ।
কাকলী দেবী আবার সেখানে বসেই বিলাপ শুরু করল,
‘আমারে শেষ
কইরা দিলোরে, আমারে শেষ কইরা দিলো । কে করলো
আমার এই সব্বনাশ । ও ভগবান তুমি অগোর বিচার করো ।’
এবার দর্শক শ্রোতারা এগিয়ে আসে কাকলী দেবীর
দিকে ।
তাকে একটার পর একটা প্রশ্নের তীর ছুড়তে থাকে ।
‘কী অইচে?’
‘কান্দ ক্যান বুড়ি?’
‘আরে বুড়ি ঘটনা কী কইবা তো?’
কাকলী দেবী কারো প্রশ্নের জবাব দেয় না । সে
একইভাবে
বিলাপ তোলে, ‘আমারে শেষ কইরা দিলো, আমার
সব্বোনাশ অইলো ।’
কাজ শেষ করে বনানী অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে
আবার দেখা হয় কাকলী দেবীর সাথে । দ্বিতীয়বার
কাকলী দেবীকে দেখে বনানীর চোখেমুখে চরম
বিরক্তি
ফুটে উঠল । মহিলা তো তাকে জ্বালিয়ে মারবে!
‘তুমি এখনো যাও নাই!’
কাকলী দেবী কিছু বলল না । অপরাধীর মতো তাকিয়ে
থাকল। চোখ বলছে অপছন্দ আর অবঙ্গার দৃষ্টি বনানীর
দিকে । কিন্তু নিষ্পলক দৃষ্টি, চোখেমুখে
করুণার প্রত্যাশা ।
‘তোমার মেয়ে কই?’
‘ঘরে বাইন্ধা রাইখ্যা আইছি ।’
‘কেউ জানে এই কথা?’
‘কেউরে জানতাম দেই নাই, আপা আপনে আমারে রক্কা
করেন । মাইন্সে জানলে আমারে গ্রাম ছাড়া করবো ।
রহমত মাতাব্বর আমারে উডায়া দিবো হের জমির তেন
।’ কাকলী দেবী আবার কেঁদে উঠলো ।
.
.
কাকলীদেবীর মেয়ে নিহারিকা বয়স ত্রিশ ছুঁই ছুঁই
। নিহারিকা জন্ম থেকেই বাক ও মানসিক প্রতিবন্ধী।
বিয়ে হয়নি । বছরের কয়েকমাস ওর আচরণ স্বাভাবিক
থাকে না । কাকলী দেবী তখন বাধ্য হয়ে ওকে শিকল
দিয়ে
বেঁধে রাখে ঘরের কোণে খুঁটির সাথে ।
নিহারিকার শরীরে সমুদ্রের স্রোতের মতো তীব্র যৌবন
উথাল-পাথাল ঢেউ ভাঙে । ওর গায়ের ময়লা আঁটসাঁট
জামা, উষ্কখুষ্ক চুল, পাগলাটে আচরণ যেন একটুও কমাতে
পারেনি ওর প্রতি কামুকদের দৈহিক আবেদন ।
শিকারিরা যেমন শিকারের দিকে তীরছোঁড়া দৃষ্টিতে
তাকায়, এলাকার বেয়াড়া যুবক ছেলেগুলোও ওর দিকে
সেই চোখে তাকায় । শুধু এলাকার বখাটে ছেলেগুলোই
নয়, সমাজের কিছু ভদ্র সমাজসেবীরাও আছেন এই দলে।
শিকারিরা যেমন ঝোপ ঝাড়ে ওত পেতে থাকে
শিকারের অপেক্ষায়, এরাও তেমনি ওত পেতে থাকে
নিহারিকার অপেক্ষায় ।
‘তোমার মেয়ে তো পাঁচ মাস বাধাইছে ।’
বনানীর কথা শুনে কাকলী দেবীর মাথায় বাজ পড়লো ।
কাকলী দেবীর কণ্ঠ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না ।
একটু থেমে বনানী আবার বলল, ‘আমি এই বাচ্চা নষ্ট
করতে পারমু না । বাচ্চা নষ্ট করতে গেলে তোমার
মেয়েকেই বাঁচানো যাইব না ।’
কাকলীদেবী শীতল কণ্ঠে নিহারিকার দিকে ঘৃণার
দৃষ্টিতে
তাকিয়ে বলে উঠল, ‘মাগী মরলেই বাঁচিগো আপা, আগের
জন্মে কী পাপ যে করছিলাম ভগবান আমারে এই শাস্তি
ক্যান
দিলো ।’
রাগে কাকলী দেবীর হাত পা কাঁপছে । হঠাৎ কাকলী
দেবী উঠে
গিয়ে দুই হাতে মুঠো করে ধরল নিহারিকার চুলের গোছা

নিহারিকা মৃদু প্রতিবাদ করে উঠলো।
ওর প্রতিবাদ যেন আরও একটু বাড়িয়ে তুলল কাকলী
দেবীর
ক্ষোভ । শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে পরপর কয়েকটি
লাথি দিল নিহারিকার পেটে ।
নিহারিকার আর্তনাদে এক মুহূর্তে চারপাশে ধ্বনি
প্রতিধ্বনিত হলো ।
বনানী দৌড়ে গিয়ে থামাল কাকলীকে ।
.
.
‘আপা আপনের পায় পড়ি, আপনে একটা কিছু করেন ।’
কাকলী দেবী শ্লেষ্মা জড়ান কণ্ঠে কেঁপে কেঁপে বলল ।
বনানী বললো, ‘আমার কিচ্ছু করার নাই । আমি পারমু না
এই কাজ করতে । অনেক দেরি হয়ে গেছে ।’
কাকলী দেবী বনানীকে রাজি করাতে পারেনি ।
মাঝরাতে বাড়ির সামনে ঝুলানো দুটি দড়ি ঝুলিয়ে
কাকলী দেবী একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল ।
এভাবে বিবেকহীন অমানুষেরা অার কত অত্যাচার
চালাবে এই পৃথিবীর সাধারণ মানুষগুলোর উপরে?
"চলে যাও তোমরা এই পৃথিবী ছেড়ে দূরের কোন এক
জায়গায় । বাঁচতে দাও অামাদের !!!
তোমরা মানুষ নও, তোমরা মানুষরূপী এক ধরণের
"জানোয়ার"। - চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো কাকলী
দেবীর করুণ অতৃপ্ত আত্না।
কেউ শোনেনি এই করুণ হাহাকার সবাইতো শুনেও না
শুনার ভান করছে!!!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন