বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২০ নভেম্বর ১৯৮৬
গল্প/কবিতা: ২টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৪৫

বিচারক স্কোরঃ ১.৭৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৭ / ৩.০

শ্রম (মে ২০১৫)

মোট ভোট ১৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৪৫ জকি ল্যংড়া!

এস আহমেদ লিটন
comment ১০  favorite ০  import_contacts ৫৩১
জকি ল্যংড়ার তিন কূলে কেউ নেই! বয়সটাও বেশ হয়েছে পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই! চার হাত পায়ের উপর ভর দিয়ে তাকে চলতে হয়! চলাফেরার সময় হাতে পায়ে গাড়ির টিউব লাগিয়ে নিতে হয়! সম্পদ বলতে তার একটা কূঁড়ে ঘর আর সংসার চলে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষে করে! ভিক্ষে করে খেলেও ভাল চলছিল কিন্তু সমস্য অসুখ! প্রায় না খেয়ে থাকতে হয়! সারাদিন কাতরালেও কেউ দেখতে আসে না কপালে হাত ভুলিয়ে দেয়া সে তো অনেক দূরের স্বপ্ন! ডাক্তারের কাজ কি তা জকি ল্যংড়া জানে কি না কে জানে! চৈত্রের তাপ দাহ, বৈশাখী ঝড় বৃষ্টি সবই মাথার উপর দিয়ে যায়! তাই অসুখ বালাই লেগেই থাকে! আজ ক'টা দিন জ্বরে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে দেখার কেউ নেই! সারাদিন ঘরে শুয়ে আবল-তাবল বকে! নিজেই নিজের মাথায় পানি ঢালার চেষ্টা করে! শত চিৎকার করলেও আশেপাশের কেউ এসে একটু দেখে যায় না! দেয় না একফুটা পানি! মণ্ডল বাড়ির কাজের মেয়ে সকিনা আজ বিকেলে কাজে যাওয়ার সময় মাথায় পানি পট্টি দিয়ে ভিজা কাপড় দিয়ে শরীরটা মুছে দিয়ে গেছে! কিন্তু জ্বরের মাত্রা এতটা বেশি কে কখন এসেছিল কিছুই জানে না জকি ল্যংড়া! গভীর রাতে একবার চেতনা ফিরে এলে দেখে কপালে পানি পট্টি বুঝতে বাকি রইল না কেউ একজন এসেছিল কিন্তু কে তা মনে করতে পারল না, সম্ভাব্য কে হতে পারে তাও খোজে পেল না! এভাবে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল! এদিকে সকিনার যে ঘুম হচ্ছে তা নয়, অসহায় মানুষটার কথা বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে! লোকটা সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবে কিনা! এভাবে রেখে আসা মোটেও উচিত হয়নি! রাতে আরেকবার যাওয়া দরকার ছিল! এভাবেই কেটে গেল রাতটা!
সকালে আবার এসে দেখে এখন কিছুটা চেতনা আছে কিন্তু জ্বরের তাপ কমে নি! আবল-তাবলও বকছে না! সকিনা ভিজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছতে মুছতে বলল, জ্বরে তো পুড়ে যাচ্ছ গো খুড়া!
:জ্বর হলি কি করব ক'
:ক্যান আগে থেহে সাবধান হতি পার না?
:ক্যম্বা হব ক'! বের না হলি খাতি দিবেনে কিডা? আচ্ছা নাত্রি কিডা আইছিল জানিস নি?
:নাত্রি না বিহাল বেলা আমি আইছিলাম! তুমি জ্বরে কি মি কচ্ছিলে! কিছু খুদ ভেঝে দিয়ে বলল, এইগুলোন খাও আমার কামের সুমায় হলো যায়!
:বিহালে আসবেনে?
:বিহালে আসতি পারবান না কাম থেহে যাওয়ার সুমায় নাত্রি বেলা আসবানে!
:কয়ডা খুদ বাজা খা?
:তোমারডা তুমি খাও গো খুড়া! বলে চলে গেল!
এই সকিনারও কেউ নেই! এক বৃদ্ধা মা আছে মণ্ডল বাড়ি কাজ করে যা পায় দুজন মিলে খেয়ে পড়ে চলে যায়! ১৪/১৫ বছর বয়সে একবার বিয়ে হয়েছিল তাও স্বামী ছেড়ে চলে গেছে! এমনিতেই আমাদের দেশের মেয়েদের দ্বিতীয় বিয়ের চিন্তা করা দুষ্কর তারপর গরীব মানুষ তাই আর হয়ে উঠে নি! বয়স ৩০ পার হয়েছে! এখনো লম্বা সময় পাড়ি দিতে হবে একা একা! ছেলে পুলে নেই শেষ বয়সে কে দেখবে, এমন প্রশ্ন যে মাঝে মাঝে আসে না তা নয় কিন্তু কিছু করার নেই! কাজ শেষে সকিনা সোজা ল্যংড়ার বাড়িতে চলে এলো! রাতও বেশ হয়েছে খুব অন্ধকার, একফুটা কেরোসিন নেই! আবার জ্বর উঠেছে, বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে! অন্ধকারেই ভিজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিল! শীতে কাঁপছিল আরো দুটো কাঁথা শরীরে জড়িয়ে দিল! বেশ কিছুক্ষন মাথায় পানি ঢালার পর হুঁশ ফিরল!
:সকিনা তুই আইছির?
:না আইলে তুমার যে কি হত!
:হ'রে আমি মরে যাতাম!
:খুড়া এইডা কি কও?
: মিছা কইনাইরে সকিনা! নাত কট্টুক হয়ছে?
:অর্ধেক নাত!
:এত নাত্রি হেনে তোর মা চিন্তা করবেন না?
:কও খুড়া তোমারে এম্বা নাখে যাব ক্যম্বা!তয় তুমি ঘুমালে যাবানে!
খুড়াও বুঝলো না ঘুমালে যাবে না! ওর মাও না খেয়ে আছে তাই ঘুমের ভান ধরল! সকিনা যখন দেখল গভীর ঘুমে আছন্ন, তখন কাঁথা শরীরের সাথে জড়িয়ে দিল! শরীর টেনে বেডের মাঝ খানে এনে বালিশ মাথার নিচে দিয়ে দিল! খুড়ার চেতন ঘুমে সবই বুঝতে পারল কিছু বলল না! এবার নি:শব্দের ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল!

পরদিন সকিনা কাজ শেষ করে সোজা বাড়িতে চলে গেল! মাকে খাইয়ে দুজনায় শুয়ে পড়ল! শুয়ে শুয়ে মা মেয়ে গভীর রাত পর্যন্ত গল্প করে! সকাল থেকে রাত অব্দী, কি ঘটেছে, কে কি বলেছে, কি করেছে, রাজ্যের গল্প করতে করতে একে অন্যের জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে যাওয়ায় প্রতিদিনেন রুটিন! কিন্তু আজ আর সকিনার ঘুম হল না! খুড়ার অসুস্থতা, খুব জ্বর, আবল-তাবল বকছে, সব খুলে মাকে যখন বলছিল, মা তখন বলেছিল আজও গিয়ে দেখে আসতি! অনেক সময় ধরে ছটফট করতে লাগল! ভাবতে লাগল, খুড়ার কি অবস্থা, কি করছে, জ্বর কি বেড়েছে, কিছু খেয়েছে কিনা, উঠতেই পারে না আবার খাবে কি করে! আর শুয়ে থাকতে পারল না! মা যখন গভীর ঘুমে, অনেকটা নি:শব্দে বেড়িয়ে এল! এটা কি প্রেম নাকি মনুষ্যত্ব, মানবিকতা, মানবিক বোধ বুঝে উঠা দায়! তবে যায় হোক না কেন, পৃথিবী যখন শান্ত, নিরব ঘুমে আছন্ন, গভীর অন্ধকার, একা একটা নারী উঠে এসেছে আর একজন বিপদগ্রস্ত অসাহায় মানুষের পাশে, এটাকে মহানুভাবতা বলা যায়! এই অজপারাগাঁয়ে কুসংস্কারে জরাজীর্ণ একটা সমাজে, আসন্ন বিপদ উপেক্ষা করে উঠে আসা সহজ কথা নয়!
রাতে খুড়ার ঘরে ফিস ফিস শব্দ, মেয়ে মানুষের কন্ঠ সর! পাশের বাড়ি পৌঁছাতে দেরি হল না! এতোদিন জ্বরে কত বকবকানি, কাতরানি, পানি পানি করে বুক ফাটালেও কারোর কানে পৌছে নি! আজ পাশের বাড়ির রহিমের কানে ঠিক পৌছে গেছে! কিন্তু একা সাহস করল না, পাশের ঘরের গফুরকে নিয়ে খুড়ার ঘরের কোণে যেতেই স্পষ্ট কথা শুনা গেল! বুঝতে বাকি রইল না কে ঘরের ভিতরে! দুজনই ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল! এতে চমকে উঠল সকিনা ও খুড়া, যদিও খুড়ার অবস্থা তখনো খুব ভাল না তবে কিছুটা চেতনা আছে! গভীর রাতে এদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, চারিদিকে সাড়া পরে গেল! লোকজন ছুটে আসতে লাগল খুড়ার বাড়ির দিকে! ছি: ছি: কি কান্ডই না ঘটিয়েছে! ওরে মুখপুড়ি গভীর রাতে তোর এই কান্ড! সারাদিন কি ভাল আর রাতে রাতে এই! এ যে সমাজের মুখে চূন কালি দিল গো!হায় হায়! বেহাইয়ে, লাজ শরম বলে কিচ্ছু নেই! মাতবারের বাড়ি খবর পৌছাল! মাতবার হুকুম দিলেন, ওঁকে গাছের সাথে বেঁধে রাখ, সকালে বিচার করা হবে! কথা মত সকিনাকে বেঁধে রাখা হল! কেউ লাঠি দিয়ে পিঠায়, কেউ কলসি ভর্তি পানি ঢেলে দেয়, গায়ের কাপড় ছিড়তে বাকি রইল না! অর্ধোলঙ্গ হয়ে গেল! ক্ষনে ক্ষনে কেউ কাপড় ধরে টানে, কেউ খোঁচা দেয়! ওদিকে খুড়া শুয়ে শুয়ে চিৎকার করতে থাকল! সকিনার আর্তনাদ কিম্বা খুড়ার চিৎকার কারো
কানে পৌছাল না! সকিনার মা হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এসে সকিনাকে জড়িয়ে ধরল! সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, বাবারে আমার মায়াডারে ছাড়ে দাও, ও মরে যাবেনে! শালা বুড়ি যা এখান থেকে সর বলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হল!

এটা যে শুধু সমাজ রক্ষার জন্য এই খড়গ নেমে এসেছে তা বলা যায় না! কেননা যুবক থেকে ষাটোর্ধ বুড়া অনেকেই সকিনার অসাহায়ত্বের সুযোগ নিতে চেয়েছে, চাল, ডাল, কাপড়-চোপড় কত কিছু কিনে দিতে চেয়েছে, মন্ডল বাড়ির মন্ডল কিম্বা মাতবার কেউ কম ছাড়ে নি কিন্তু সবাই ব্যার্থ হয়ে মনে মধ্যে রাগ পুঁষে রেখেছে আজ তার ঝাল উঠানোর দিন! তাই যতটা না সমাজ রক্ষা তারচেয়ে উপমানিত হওয়ার প্রতিশোধ নেয়া মুখ্য হয়ে দাড়িয়েছে! এর আগে একবার মাতবার চুড়ান্তভাবে উপমানিত হয়েছে! তাই তার চেলা-বেলা লেলিয়ে দিতে ভুল করে নি!
পরদিন সকালে বিচার! এলাকার বুড়া-গুড়া সবাই এসেছেন! মাতবার কয়েকজন মুরব্বীর সাথে কথা বলে রায় ঘোষণা করলেন, পঞ্চাশ ঘা জুতার বাড়ি, মাথার চুল কেটে, মুখে চূনকালি দিয়ে, জুতার মালা পড়িয়ে সারাগ্রাম ঘুরাতে হবে! এরপর খুড়ার সাথে বিয়ে! আর খুড়া অসুস্থ্য থাকায় তার কোন বিচার করা হল না!
মাতবার মন্ডল সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি বলেন মণ্ডল সাব!
মণ্ডল বললেন, ঠিক বিচার করেছেন মাতবার সাব, এগুলো আর বাড়তে দেয়া যায় না, সমাজ যে সমাজ যে দিন দিন রসাতলে গেল! এদের জন্য সমাজে বাস করার জো নেই, পুরা গ্রামের মান সম্মান যে শিঁকায় উঠিয়ে ছাড়ল! ছি: ছি:!
সালিশীমতে রায় কার্যকর করা হল, সন্ধ্যায় বিয়েও দেয়া হল! মণ্ডল বাড়ির কাজও বন্ধ, আর দুজনই অসুস্থ্য! খাবার বলতে খুড়ার অল্প কিছু চাল ছিল তাই দিয়ে কয়েকটা দিন চলল! এই কয়দিনে সকিনাও কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠল! এরপর পাশের গ্রামে কাজ করতে লাগল! জোড় করে বিয়ে হলেও একে অন্যের মেনে নিতে কষ্ট হয় নি বরং দুজনারি
সুবিধা হয়েছে! দুই ভাসন্ত মানুষ একজায়গা হয়েছে! কষ্ট হোক, দিনে কেউ কারোর সাথে দেখা না হোক, তবু রাতের আঁধারে দুজন দুজনের সাথে কথা বলতে পারে, একমুঠো খেয়ে প্রশান্তির একটা ঘুম দিতে পারে! কেরোসিন না থাকলেও ভাঙ্গা বেড়া চালা দিয়ে ঠিকই চাঁদের আলো পৌছে যায়! সুখ না থাকলেও অসুখে নেই! হয়ত মনের আবেগ মুখে প্রকাশ করতে পারে না, হৃদয় দিয়ে ঠিকই অনুভব করে! ঝির ঝির দক্ষিনা বাতাসে মন জুরে যায় দুজনেরই! অগোছালো কথাগুলো যেন আজ অমীয় বাণী! ফুর ফুর বাতাসে চাঁদের আলোই রোদে পুড়া মুখ দুটি যেন পরম ভালবাসায় অনাবিল সুখে কখন যে ঘুমিয়ে যায় কেউ জানে না! গুনিজন বলেন, "অভাব দরজা দিয়ে এলে ভালবাসা জানালা দিয়ে পালায়"! আজ যেন কথাটা বড়ই মিথ্যে! অভাবের মাঝেই জানালা দিয়ে ঝির ঝির করে ভালবাসা ঢুকছে, ভালবাসার আলো আসছে! ভালবাসার ঢেউ যেন আছড়ে পড়ছে এই ভাঙা দুয়ারে! হাল্কা মুখের দুর্গন্ধ যেন সুগন্ধী হয়ে উঠে!

এত ভালবাসাবাসী, এতো মাখামাখী যেখানে, সেখানে সে ভালবাসার ফল আসবে এটাই স্বাভাবিক! তাই কিছু দিন যেতে না যেতেই সকিনা সন্তান সম্ভবা হল! খুশির জোয়ার যেমন বইছে তেমনি দুশ্চিন্তার ভাজ কপালে পড়ে নি তা নয়! কে বা সংসার দেখবে, কে দেখবে সকিনার? এখন খুড়া ভিক্ষে করে কিভাবে চলবে তিন জনের সংসার? এত প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলেও অনাগতর প্রতি ভালবাসার কমতি নেই! সকিনা এখনো কাজে যায় তবে একটু আগে ফিরে আসে! চক্ষু লজ্জার ভয়ে কাউকে জানানো হয় নি! তেঁতুল টেতুল যা খাবার গোপনে খায়! খুড়া এই নিয়ে বেশ হাসি তামাশা করে! বাচ্চা নাকি এখন নড়াচড়া করে! খুড়া বলে, আমার ছাওয়াল ডিশুম ডিশুম শিখতেছে, ছোট বেলা নাকি কোন এক ছবিতে দেখছে! খুড়ার চাওয়া ছেলে হলেও সকিনার কোন চয়েচ নেই, একটা হলেই হল! এখন কাজ দুজনই করে, কিছুটা জমানোর চেষ্টা! কিন্তু ক'টাকা বা ইনকাম আর ক'টাকা জমাবে তারপরও অনন্তর চেষ্টা!
এখনো রাতের বেলে বেলে জোছনা ফুটো চাল দিয়ে আসে, ভরে দেয় একমুঠো সুখ! এখন যেন এ আলোই তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি অনুভূব করে! এখন যত কথা হয়, যত হাসি আনন্দ হয় ঐ অনাগতকে নিয়ে! পেটে নাকি খুব নড়াচড়া করে, গুতাগুতি করে!
খুড়া বলে, ছাওয়াল হবেনে!
সকিনা: হ' কয়ছে তোমারে!
খুড়া: তুই দেহিস, আমার ছাওয়াল হবেনে!
সকিনা: এই দেহ! দেহ! ক্যামন জানি করে বলে খুড়ার হাত নিয়ে পেটের উপর ধরল!
খুড়া দেখল সত্যি নড়াচড়া করে! এবার পেটের উপর কান রেখে কিছু একটা বুঝার চেষ্টা করল! তারপর বলে উঠল এই দ্যাখ দ্যাখ কথা কয়!
কথায় সকিনা বেশ জোড়ে হেসে উঠল!
:এই হাসলি ক্যন? আমি মিছে কইছি? ভাল করে হুনে দ্যাখ?
:হয় আমিও হুনছি বলে বলে সমর্থন দিল!
রাতগুলো এভাবেই কেটে যায়! সারাদিন কাজের মাঝেও যেন ঐ একি চিন্তা! অনাগত ভবিষ্যত যেন দুটি হৃদয়ে মিশে একাকার হয়ে গেছে! ঘুম খাওয়া চিন্তা চেতনা যেন ঐ অনাগতকে নিয়ে! আলো আশা ভালবাসা সবকিছুর মাঝে অনাগত সন্তান! নামও ঠিক করে রেখেছে অনেকগুলো! এর মধ্য থেকে একটা বাছাই করবে! তবে খুড়া এখন সখিনাকে জহিরের মা বলেই ডাকে! সকিনাও মিটমিট করে হাসে কিছু বলে না! সে হাসিটাও যেন কিছু একটা প্রকাশ করতে চাই! কিছু একটা বলতে চায়! পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, গায়ে গতরে চার খানা হাড্ডি ছাড়া কিছু নেই! শরীরও এখন আর চলে না! এই বয়সে বাবা হওয়া অনুভূতি একটু আলাদা হবে এটা স্বাভাবিক!

যার গায়ে গতরে কিছু নেই চার খানা হাড্ডি ছাড়া! সোজা হয়ে দাড়াতে পারে না, একফুটা বল-শক্তি নেই, বড় রোগা-সোগা মানুষ! সে কি করে বাবা হবে? এটা কখনো সম্ভব হতে পারে না! আর হলেও তা লোক গাঁয়ের কেন মেনে নিবে? এ গাঁয়ে অনেক যুবক ও বয়স্ক আছে যারা কম বেশি সকিনার দিকে নজর দিয়েছে, তাদেরই কেউ.........! তাই সারা গাঁয়ে সাড়া পড়ে গেল সকিনা মা হতে যাচ্ছে কিন্তু বাবা কে? সবার মুখে মুখে একি প্রশ্ন! দিন দুয়েক আগে গাঁয়ের মোড়ল মাতবার সাহেব এসেছিল! কে জানতে! কিছু টাকা কড়ি খসিয়ে দেয়া যাবে যার অংক নেহাত কম নয়! শুধু নামটা ক' বাকি বিষয়গুলো আমরা দেখব! তোর কোন ভয় নেই! এভাবে অনেক বুঝিয়ে গেল!
বুঝতে আর বাকি রইল না খুড়ার ঘরে নতুন এক ঝড় উঠতে যাচ্ছে! এটা যে বড় ঝড়েরই পূর্বাভাস! কাল সকালে সালিশ বসবে! সালিশ নাম বলতে হবে তাও মাতবরের ইঙ্গিত করা নাম! তাতে টাকার অঙ্কটা বেশ মোটা হবে! মাতবার বারবার বলে গেছে এ সুযোগ হাতছাড়া করিস না, সুযোগ বার বার আসে না! আর মাতবারের কথা না শুনলে তার ভয়াবহতা সম্পর্কে খুব ভাল জানা আছে!


এখানে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, গাঁয়ের মানুষ সত্যি যদি মনে করে তার বাবা হওয়ার ক্ষমতা নেই তাহলে কেন সেদিন এত নির্যাতন করল! আর যদি থেকে থাকে তাহলে কেন এখন নতুন করে সালিশ দরবার! কেন এই স্ববিরোধী নীতি তার জবাব স্বাধারণত পাওয়া যায় না! তবে অবস্থা, সামাজিক মর্যাদা, টাকা কড়ি এসবের উপর নির্ভর করে এসব বিচার আচার! বিচার বসেছে স্কুল মাঠে! ছেলে বুড়ি থেকে শুরু করে সবাই এসেছে! সকিনা ও খুড়াও এসেছে! মাতবার সকিনাকে নাম বলতে বলল কে এই কাজ করেছে! সকিনা কোন কথা বলতে পারল না চোখ দিয়ে শুধু অশ্রু ঝরছে! খুড়া কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল ধমক দিয়ে বসিয়ে দেয়া হল! সকিনার মুখ থেকে কোন কথা না বের করতে পেরে রায় ঘোষণা করলেন মাতবার! ১০০ বেত্রাঘাত দিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন! সবার সামনেই বেত্রাঘাত শুরু হল! ২৫/৩০টি আঘাত করতেই সকিনা বেহুঁশ হয়ে গেল! তার উপর একশত বেত্রাঘাত কার্যকর করা হল! এর কিছুক্ষন পরই ব্লাডিং শুরু হল! মরা বাচ্চা বের হয়ে এল! তখনো বেছে ছিল সকিনা! খুড়া সকিনাকে জড়িয়ে ধরে কান্না ভেঙ্গে পড়ল! সকিনা কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল কিন্তু কোন শব্দ বের হল না! মুখ নাড়াতে নাড়াতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল! খুড়ার কান্নায় পরিবেশ ভারি হয়ে উঠল! নিস্তব্ধতা নেমে এল! কেউ কোন কথা বলল না! সে কান্না শুন্যে মিলিয়ে গেল! শুন্যে মিলিয়ে গেল আরো একটা সংসার, পরিবার!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মোহাম্মদ ওয়াহিদ হুসাইন
    মোহাম্মদ ওয়াহিদ হুসাইন বাস্তব! ভাল লিখেছেন। সাকিনার মায়ের ...? শুভেচ্ছা আর ভোট রইল।
    প্রত্যুত্তর . ২২ মে, ২০১৫
  • হুমায়ূন কবির
    হুমায়ূন কবির সত্যি বাস্তবতা অনেক সুন্দর হয়েছে। সাথে ভোট...
    প্রত্যুত্তর . ২৪ মে, ২০১৫
  • ফাহমিদা   বারী
    ফাহমিদা বারী আমি আপনার লেখা আগে পড়িনি। আমার বেশ ভাল লাগল। আপনার লেখায় যথেষ্ট সাবলীলতা আছে। সহজ ছন্দে গল্প বলতে পারার ক্ষমতা নিঃসন্দেহে একটি বিশাল ব্যাপার। ভোট রইল। ছোটখাট দু'একটি বিষয় মাথায় রাখবেন। লেখাটা একই প্যারায় না লিখে ছোট ছোট ভাগে লিখলে পড়তে ভাল লাগে। অনেকসময় স...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৫ মে, ২০১৫
    • এস আহমেদ লিটন আসলে না পড়ারই কথা! এই ব্লগে এটিই প্রথম পোস্ট। আমি জানি বেশ কিছু ভুল আছে কিন্তু বড় কাঁচা হাত! গল্প সব মিলে গোটা তিন চারে সীমিত। আপনার উপদেশ মাথায় থাকবে আগামীতে। চমৎকার মন্তব্যের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। ভাল থাকুন সবসময়।
      প্রত্যুত্তর . ২৬ মে, ২০১৫