বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ জানুয়ারী ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ২টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

শ্রম (মে ২০১৫)

কর্মচারি

Monikanchon Ghosh Projit
comment ৩  favorite ০  import_contacts ৩৫৬
মানুষের সব আশা পূরণ হয় না। কোনো কোনো আশা অপূর্ণ থেকেই যায় । তবে আমার বেলাতে এর ব্যতিক্রম হবে কেন? আমারও অধিকাংশ চাওয়াই পূরণ হয়েছে। আবার অধিকাংশ চাওয়াই পূরণ হয় নি। আর এই আশা পূরণ করার জন্য তো শরীরের রক্ত জল করতেই হয়। আমিও তাই করি প্রতিদিন।

মাস দুয়েক আগে একটি প্রতিষ্ঠানে বেসরকারীভাবে কাজ করছি কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে। চাকরিটা আমার কাছে দিনমজুর বা শ্রমিকের কাজ বলেই মনে হয়। কেননা আমাদের দেশে লোকজনকে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হলে তো দিন শেষে কাজের টাকা দিয়ে দেওয়া হয়। আমিও দিন শেষে দুইশো টাকা পাই। আর দশটা শ্রমিকের মত শ্রমের মূল্য হাতে হাতে পেয়ে গান গেয়ে বাড়ি যাই। এটা শ্রমিকের চেয়ে কম কিসে? তাই নিজেকে দিনমজুর বলে পরিচয় দিতে আমার একটুও লজ্জা করে না। কেননা এই অফিসে কাজ করার আগে আমি কাঠমিস্ত্রির যোগালে বা সাহায্যকারী হিসেবেও কাজ করেছি। সেখানে দিন প্রতি একশো পঞ্চাশটাকা পেতাম। এখানে দুশো পাই। ওখানকার চেয়ে ঢের বেশি।

যাক সেসব কথা। ঘড়ি ধরে স্কুলের বারান্দায় পৌঁছাবার অভ্যাস আমার কোনোদিন ছিলো না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই চোখ মুছতে মুছতে মাঠে যেতাম কাঁচি হাতে করে। কাজ করতে করতে যখন পাশের ক্ষেতের লোকের মাঠে ভাত আসতো। ঠিক তখনই বাড়ি ফিরে ¯œান খাওয়া-দাওয়া সেরে বগলে বই নিয়ে স্কুলের দিকে ভোঁ দৌড় দিতাম। কোনো দিন ১০টা কিংবা কোনো দিন ১১টা বেজে যেতো। স্কুল শিক্ষক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলতো- ‘কয়টা বাজে রে নাপিত? এখন তোর আসার সময় হলো? কান ধরে উঠ-বস কর।’ আমি কান ধরে উঠ-বস করতাম। আমাদের সময় স্যারের কথা শুনতে হতো। তা না হলে স্যার বেদম প্রহার করতো। এখন স্যারের কথা শুনতে হয় না। বরং স্যারকেই ছাত্রদের কথা শুনে লেখাপড়া করাতে হয়।

স্কুল-কলেজের বারান্দায় নিয়মিত না হতে হতে এই অফিসের বারান্দায়ও তেমন নিয়মিত হতে পারছি না । তবু চেষ্টা করছি। আমাদের বাড়ি থেকে শহরের অফিস প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। এর বেশি ছাড়া কম হবে না। আমি বাড়ি থেকে সাইকেলে আসা-যাওয়া করি। অন্য কিছুতে আসা-যাওয়া করলে প্রায় ৪০-৫০টাকা খরচ হয়। তাই বাড়ি থেকে সাইকেলেই সুবিধা হয়। যাই হোক আজ একটু বেলাই হয়ে গেছে। বাড়িতে সামান্য কাজ ছিলো। গ্রামের মানুষ, ক্ষেত-খামার আছে। তাই কাজ না করলে চলেও না। রাতে খাবার সময় বাবা বলেছিলো- ‘কালকে সকালে গোবরের সারগুলো হালটের কাছের ভুঁইতি দিয়ে আসিস তো! আমি জিজ্ঞাসা করলাম- সার কি বস্তা বোঝাই করা আছে? বাবা বলল- আছে। তাই ঘুম থেকে উঠেই বাবার কথা পালনের জন্য সকাল বেলা শিশির ভরা কুয়াশা ঠেলে মায়ের সাহায্য নিয়ে সারের বস্তাগুলো সাইকেলে তুলে মাঠে রেখে আসি। তাই এই দেরি। গেইটে সাইকেলটা তালা মেরে তিন তলায় এসে কম্পিউটার খুলে চেয়ারে বসতেই অফিসার সাহেব মোঃ ফজলে আলম আমাকে গম্ভীর কণ্ঠে ডাকলেন- প্রদীপ বাবু! এসেছেন? আমি কোনো অন্যায় করি নি। তবুও একটু চমকে উঠে বললাম- হ্যাঁ স্যার! আসুন। আমি স্যারের জন্য চেয়ারটা এগিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম । কিন্তু স্যার আমাকে বাধা দিলেন। ‘থাক থাক আমিই নিচ্ছি! আপনি বসুন’। চেয়ারটা টেনে নিয়ে নিজেই বসলেন আমার ঠিক বামপাশে। স্যারের বাম হাত ভর্তি কাগজ। আমাকে দেখিয়ে বললেন- ‘এই এত্ত কাজ প্রদীপ বাবু! শরীরের আর সয়না। আজ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে চাকরি করছি। দুইবছর আগেই বয়সটা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সরকার চাকরির মেয়াদ দুইবছর বাড়ানোর জন্য যত্ত ঝামেলা। এসবের কোনো দরকারই ছিলো না।’ ক্লান্ত শরীরের হতাশার চিহ্নরেখা স্যারের চোখে-মুখে-বুকে। তাছাড়া স্যার পঞ্চগড় থেকে এখানে এসে রয়েছে। পরিবারের সাথে বিচ্ছিন্ন একাকী উদাস চাতকের মত। সারাজীবন যেন এই একাকীত্ব জীবন চলছেই সরকারী চাকরি পাবার পর থেকেই। আর ভালো লাগে না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে স্যারের সঙ্গে বেশ গল্প জমে ওঠে। তবে অন্য কোনো গল্প নয় । অফিসের কাজেরই গল্প। কাঠামো বদ্ধ জীবনের গল্প। কর্মচারীদের জীবনের ছোট ছোট গল্প।
স্যার আমাকে বেশ আদর করেন । কেন ? তা আমি জানি না। কোনো দিন জানতেও চাইনি। দুপুর বেলা অফিসের টেবিলে আমাদের খাবার হয়। স্যার আমাকে পাশে বসিয়ে খাওয়ান। গল্প করেন। তিনি বেশ আধুনিক ও রোমান্টিক মানুষও বটে। বিদেশে ভ্রমণে গিয়ে অনেকে অনেক কিছু আনলেও স্যার একটা রেডিও নিয়ে এসেছেন। স্যারের সঙ্গে গল্প করে জানতে পেরেছি যে, তিনি একসময় গান লিখতেন। কিন্তু বেতার থেকে মনোনীত হন নি। কিন্তু রেডিও শোনা ছেড়ে দেন নি।

সেদিন স্যারের হাতে রেডিওটা দেখে স্যারকে বললাম- স্যার রেডিওটার দাম কত? স্যার বললেন- তা বাংলাদেশী প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। আমি তো শুনেই অবাক! একটা রেডিওর দাম এত্ত টাকা! স্যার বললেন- ওদের দেশে কম টাকা। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক টাকা । এটা টাকার বাটার উপর নির্ভর করে। জানেন না বিদেশি টাকার মান বেশি? মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম। হ্যাঁ জানি। স্যারকে বললাম স্যার রেডিওতে কি কি অনুষ্ঠান শোনেন? স্যার বললেন- রবীন্দ্র,নজরুল সংগীত এবং খবর শুনি। রাত জেগে এফএমএ অন্ধকারের গল্প বলে একটা অনুষ্ঠান হয় তা শুনি। এই সবই শোনা হয়। সারা দিনে তো শোনা হয় না। এই রাতে একা একা শুয়ে শুয়ে শুনি আরকি।

এই অফিসেরই অফিস সহকারী আকরাম দাদা। প্রথম দুয়েক দিন স্যার স্যার সম্বোধন করতাম। কিন্তু আমাকে গোপনে ডেকে বললেন- প্রদীপ বাবু! আমাকে স্যার বলার দরকার নেই। ভাই বললেই হবে। তারপর থেকে স্যার না বলে দাদা বলি তাঁকে। তিনি অমায়িক ধরনের লোক। যে কথা সেই কাজ ঠিক আমার মতোই। কথা না দলিল। আর তাঁর হাত ধরেই এই অফিসে চাকরিটা পেয়েছি। তিনিই আমাকে প্রতিদিনের টাকা নিজের হাতে দিয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে দুয়েক দিন টাকা দেন না । যেদিন দেন না সেদিন বলেন-‘জয় বাংলা বলে চলে যান। কালকে দিবো।’ পরের দিন অবশ্যই টাকা দিয়ে দেয়।
অফিসের গাড়ি চালক শহিদুল ভাই বেশ রোমান্টিকও লোক। তিনি আমার সাহায্যকারী হিসেবে অনেক কাজ করেন। আমাকে প্রতিটি কাজ ভালো ভাবে বুঝিয়ে দেন। মাঝে মাঝে আমাকে মজার মজার গল্প বলেন।
অফিসের আরেক সদস্য নাজমুল ভাই নৈশ প্রহরী সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। যেদিন রান্নার মহিলা অফিসে না আসে সেদিন নাজমুল ভাইয়ের রান্না খেয়ে সবাই তৃপ্ত হই। খুব সুন্দর রান্না করেন তিনি। আমরা সবাই তার রান্নার যশ করি। এবং তার বিয়ে নিয়ে মস্করা করি।

এই আমাদের কর্মচারীদের সংসার। বেশ ভালই চলছে। কিন্তু সেদিন আমি একটু অবাকই হলাম। কেননা দেখলাম স্যার ছুটির দরখাস্ত নিয়ে এসেছেন। ছুটির দরখাস্ত। স্যার বাড়ি যাবেন তাই। স্যারকে বললাম- স্যার আপনাকেও ছুটি নিতে হয়? আপনিতো চারটি থানার দায়িত্বে আছেন? স্যার বললেন- তবুও ছুটি নিতে হয় প্রদীপ বাবু! দ্যাখেন না স্যারের যেমন স্যার থাকে তার কাছে ছুটি নিতে হয় । আমিও যে আপনার মত একজন কর্মচারি। আমি উত্তর দিলাম-হুঁম! স্যার বলতে থাকলেন- সেই রকম আমার ছুটি নিতে হয় অঞ্চল প্রধানের কাছ থেকে। আর অঞ্চল প্রধান ছুটি নেন মহাপরিচালক মহোদয়ের কাছ থেকে। বুঝেছেন বিষয়টা ! হুঁম! আর মহাপরিচালক কার কাছ থেকে ছুটি নেন সেটা আমার জানা হয় নি। কিন্তু পিছনে তো কেউ না কেউ আছেই । কেননা, মহাপরিচালকও তো একজন সরকারী কর্মচারী। বাস্তবে আমরা সবাই এক একজন কর্মচারী। কেউ চেয়ারে বসুক আবার কেউ মাথায় বস্তা তুলে নিক।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন