বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ এপ্রিল ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ১৩টি

সমন্বিত স্কোর

৫.১৭

বিচারক স্কোরঃ ২.১৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

ত্যাগ

ত্যাগ মার্চ ২০১৬

প্রেম সাগরে

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

অন্য আলো

অস্থিরতা জানুয়ারী ২০১৬

গল্প - ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী ২০১৬)

মোট ভোট ২৫ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.১৭ ফাগুন লেগেছে আজ মনে

মোহাম্মদ আবুল হোসেন
comment ৬  favorite ২  import_contacts ১,১২১
কোন কাজেই মন বসছে না অনিকের। সন্ধ্যায় ল্যাপটপ নিয়ে বসেছিল `টাইটানিক’ দেখার জন্য। বরফের চাঁইয়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে যখন পানি ঢোকা শুরু হলো জাহাজে তখন হঠাৎ করেই উঠে পড়ে সে। আজ কিচ্ছুতেই ভাল লাগছে না তার। কতক্ষণ ঘরের ভিতর দিয়ে পায়চারি করে রান্নাঘরে গেল। চুলায় বসিয়ে দিল এককাপ চা হয় এতটুকু পানি। তাতে চা পাতি ছেড়ে দিয়ে মনে হলো, আজ তার হাতের চা খুব ভাল হবে। মাঝে মাঝে এমন হয়। অনিক নিজে নিজে চা বানায়। তা গলির মোড়ের ল্যাংড়া রহিমের চেয়ে অনেক স্বাদের হয়। একটা মাতা মাতা ঘ্রাণ তাকে আবিষ্ট করে রাখে।
চা বানিয়ে একটি পিরিচে নিয়ে বসল বিছানার এক কোণায়। চায়ে ঠোঁট ভিজিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। আস্তে আস্তে শীত কেটে যাচ্ছে। কয়েকদিন পরেই বসন্ত নামবে ধরায়। চারদিক ফুলে, ফুলে ভরে উঠবে। রমনায়, চন্দ্রিমা উদ্যান বা বোটানিক্যাল গার্ডেনে জোড়ায় জোড়ায় যুবক-যুবতী হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়াবে মুক্ত বিহঙ্গের মতো। কখন তাদের দিন হবে, কখন নামবে রাত তা তারা টেরও পাবে না। এতটুকু ভাবতেই অনিকের মনটা খারাপ হয়ে যায়। সে চায়ের কাপ টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ায়।
অনিক থাকে ঢাকা শহরে ফার্মগেট এলাকায় তেজকুনি পাড়ায় একটি ব্যাচেলর ম্যাচে। তার রুমে আরও একজন আছেন। তিনি অনিমেষ দা। এখনও বাসায় ফেরেন নি। তাই কারো সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারছে না অনিক। চল্লিশ বছর তার জীবন থেকে গত হয়েছে। এর মধ্যে অনেক হিসাব নিকাশ মেলেনি। অনেক হিসাব মিলাতে না পেরে ছেড়ে দিয়েছে মাঝপথে।
চায়ের কাপ রেখে সে উঠে যায় বাসার ছাদে। আজ চাঁদ উঠেছে। অর্ধেকটা দেখা যাচ্ছে। বাকি অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে মেঘ। শীত যখন যাই যাই করে তখন এমন ছেড়া ছেড়া মেঘ দেখা যায় আকাশে। হালকা কুয়াশা পড়ছে। তার মাঝ দিয়ে চাঁদটাকে দেখতে মনে হচ্ছে রূপালি থালার মতো। সেদিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই অনিকের মনে পড়ে যায় তপতীর কথা। তপতী তাকে ভালবাসা দিয়েছিল। স্কুল জীবনে তাদের ছিল মধুময় প্রেম। একজনকে ছাড়া আরেকজন চিন্তাই করা যেতো না। তপতীর মুখখানা দেখতে অনিক প্রতিদিন সকাল আটটায় গিয়ে হাজির হতো স্কুলে। স্কুলে এসেই তপতীর দুটি চোখ শুধু খুঁজতো অনিককে। ক্লাসের সবাই এ কথা জানতো না। শুধু জানতো সিরাজ। অনিকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
স্কুলে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর দু’জনের সম্পর্ক টিকে ছিল। কথা ছিল তারা পড়াশোনা শেষ করে একে অন্যকে বিয়ে করবে। অনিকদের বাড়ি তপতীদের বাড়ি থেকে দু’তিনটি গ্রাম পরে। তাই যোগাযোগটাও অতোটা সহজ ছিল না।
তপতীর পিতা ছিলেন গ্রামের মধ্যবিত্ত। মেয়ের বয়স হয়েছে, বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে তাই তিনি তাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একদিন এক পাত্র এলো তপতীকে দেখার জন্য। দেখেই তার পছন্দ হয়ে গেল। কথা হলো সামনের ফাল্গুনেই তাদের বিয়ে হবে।
এর মাঝে কেটে গেল কয়েক দিন। অনিকের কাছে খবর এলো তপতী বিয়ে করছে। তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। ফাল্গুন মাসের ১০ তারিখে। প্রথমে এ কথা বিশ্বাস করতে চায় নি অনিক। কিন্তু সিরাজ বলল, সব সত্যি। সত্যিই তপতীর বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়েতে তার সায়ও আছে।
এ কথা শোনার পর অনিক বাড়ি ছেড়েছে। ঢাকা এসে পড়াশোনা করেছে। টিউশনি করে নিজের খরচ যোগাড় করেছে। প্রথম প্রথম বেশ কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে একটি ছেলের যে জায়গা করে নেয়া কত কষ্টের তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে অনিক। প্রথমে ঢাকার পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নিতেই চলে যায় কয়েক মাস। তারপর যখন টিউশনি পেল তখন তাদের সঙ্গে তাল মেলাতে বড্ড কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। কেন ছেলে সব সাবজেক্টে একশতে একশ পেল না সেই উত্তর দিতে হয় তাকে। প্রথম প্রথম এসব গায়ে মাখতো অনিক। তারপর আর এসবের তোয়াক্কা করে না। কোন অভিভাবক প্রশ্ন করলেই পাল্টা বলে দেয়- আমি পড়াই। কিন্তু আপনার বাচ্চা বাসায় না পড়লে আমি কি করবো। আবার একদিন পড়াতে না গেলে অনেক অভিভাবক টাকা কেটে রাখে। অনিক এমন করলে সে বাসায় আর পড়াতে যেত না। এভাবেই মাস্টার্স পাস করে এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। বেতন মোটামুটি ভালই। পঞ্চাশ হাজার টাকা মাসে। সেই টাকার বেশির ভাগ পাঠিয়ে দেয় গ্রামে, পিতামাতার কাছে। বাকিটা নিজে রাখে। ছাদে পায়চারি করতে করতে সিনেমার রিলের মতো ঘটনাগুলো একে একে পার হয়ে যেতে থাকে তার কল্পনার চোখের ওপর দিয়ে।
অনিক থামে। বেশ ঠাণ্ডা লাগছে এখন। রুমে ফেরা দরকার।
অনিমেষ দা ফিরেছেন অনেকক্ষণ আগে। খেয়ে দেয়ে তিনি শুয়ে পড়েছেন। স্কাইপে বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছেন। তার মুখে মাঝে মাঝেই মিষ্টি হাসি ঝিলিক মেরে যাচ্ছে। নিশ্চয় কোন রোমান্টিক আলাপ হচ্ছে। তা দেখে অনিকেরও ইচ্ছে জাগে ইশ যদি সেই বিবাহিত হতো, না হোক অন্তত একটা প্রেমিকা থাকতো তাহলে সেও সময়ে অসময়ে ওই রকম গল্প করতে পারতো। সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে যখন তারা বাসায় ফেরে তখন স্ত্রী হোক বা প্রেমিকা হোক, তার এক চিলতে হাসি যেন টনিকের মতো কাজ করে, যেমনটা করছে অনিমেশ দার বেলায়। কে বলবে অনিমেশ দা সারাদিন ক্লান্তিকর কাজ করে ঘরে ফিরেছেন।
ইশারায় তার সঙ্গে কথা বলে বিছানায় শুয়ে পড়ে অনিক।
আস্তে আস্তে সময় পাড় হচ্ছে। কিছুতেই ঘুম আসছে না তার। যতই চোখ বন্ধ করে ঘুমাতে চেষ্টা করছে ততই তপতী এসে তার চোখের ওপর হামলে পড়ছে। কেন তপতী কেন এতদিন পর তুমি আমার সত্ত্বায় নাড়া দিয়েছো। কেন আজ আমার সারা অন্তরজুড়ে শুধু তোমার ছবি। আমি তো তোমাকে ভুলে গিয়েছিলাম। কেন আজ আবার পুরনো কথা মনে করিয়ে দিচ্ছ। কি আনন্দ তোমার। তুমি তো অন্যের ঘরে দিব্যি আরামে ঘরসংসার করছো। তাহলে আমাকে এখনও কষ্ট দেয়ার কি মানে- নিজের মনে মনে বলতে থাকে অনিক।
রাত তখন প্রায় শেষের দিকে। কোন ফাঁকে যেন একটু ঘুমের মতো এসেছে অনিকের চোখে। এমন সময় অকস্মাৎ বেজে ওঠে মোবাইল ফোন- ক্রিং ক্রিং ক্রিং....
প্রথমে রিং হওয়ার পর ঘুম জড়ানো চোখে কল কেটে দেয় অনিক। তার পাঁচ মিনিট পরে আবার। ভীষণ মেজাজ খারাপ হয় তার। ইচ্ছেমতো বকা দিতে ইচ্ছে করছে। এমন সময় কোন সেন্সওয়ালা মানুষ কাউকে ফোন দেয়। যত্ত সব বেয়াক্কেল মানুষ!
ফোন ধরে কর্কশ কণ্ঠে অনিক বলে ওঠে- কে? কে বলছেন?
আপনি অনিক। অনিক বলছেন?
জানেনই যদি তাহলে কেন অকারণে প্রশ্ন করছেন? এমন সময় কাউকে মানুষ ফোন করে?
আমি করি?
কে আপনি? কাউকে ফোন করে আগে নিজের পরিচয় দিতে হয় জানেন। এটা নূন্যতম ভদ্রতা।
জানি।
জানেন যদি তাহলে পরিচয় দিন।
তার আগে আমার কথা শুনতে হবে।
আমি এই রাতের বেলা কোন অপরিচিত নারীর সঙ্গে কথা বলা পছন্দ করি না।
পছন্দ আপনাকে করতেই হবে....
ধুত যত সব বাজে কথা। বলেই ফোন কেটে দেয় অনিক। যথারীতি আবার ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে ঝরঝরে হয়ে ঘুম থেকে ওঠে। গোসল সেরে খোশমেজাজে ছোটে অফিসের পথে। রিস্কায় বসে বসে ভাবতে থাকে কে এই নারী? এত রাতে ফোন করার উদ্দেশ্যই বা কি? আবার তার নামও জানে। তাকে তো ফোন করার মতো কোন নারী নেই। তপতীর সঙ্গে তার প্রেম হয়েছিল। সেই প্রেমকে কবর দিয়েছে। তারপর সে আর কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায় নি। তাহলে কে তাকে ফোন করল?
ভাবতে ভাবতে অফিসে পৌঁছে গেল অনিক। কিন্তু তার মনের ভিতর যতগুলো প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে তার একটিরও উত্তর পেল না সে। কাজ শুরুর আগে ক্যান্টিনে গিয়ে এক কাপ কফি পান করতে থাকে। এতে হয়তো মনের ভিতর জমে থাকা ময়লা আবর্জনা সাফ হয়ে যাবে। ভুলেও সিগারেট পান করে না অনিক। সে ভালভাবে জানে ধুমপান করা মানে বিষ পান করা। এ বিষক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। ধীরে ধীরে তা নিজের ভিতর থেকে খেয়ে খেয়ে খোসা বানিয়ে ফেলে শরীরকে। যখন তা কেউ টের পায় তখন সব শেষ। আর কোন উপায় থাকে না। তাই নিজেতো ধুমপান করেই না, কাউকে ধুমপান করতে দেখলে দূর দিয়ে হাঁটে অনিক।
২.
অফিসের কাজ শেষে বাসায় ফিরেছে অনিক। আজ আর তেমন ক্লান্তি নেই। বেশ ফুরফুরে লাগছে মন। ফেরার পথে পুরনো একটি বাংলা সিনেমা নিয়ে এসেছে। নাম ‘বাবা কেন চাকর’। ছবিটা দেখতে শুরু করার আগে এককাপ চা বানিয়ে এনে বসল বিছানায়। তারপর ল্যাপটপে ছেড়ে দিল ছবি। প্রতিটি পরতে পরতে বাবার কষ্ট দেখে চোখ ভিজে ওঠে শোভনের। মানুষের জীবনে আসলেই ঘটছে এমন সব কাহিনী। তার কতটা এমন সিনেমার সেলুলয়েডে ধরা পড়ে! এর চেয়েও করুণ কাহিনী আছে। এই সমাজেই এখনও সন্তান খুন করছে পিতাকে। অনেক পিতা বা মাতা আছেন যাদের সমর্থ ছেলে থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষা করে, অন্যের মুখের কড়া কথা শুনে দিন পাড় করতে হচ্ছে। অনেক পিতামাতা আছেন যাদের ঠাঁই হয় নি সন্তানের সংসারে। তাদের দিন কাটছে নিঃসঙ্গতায় প্রবীণ নিবাসে। তাদের চোখের জলের দাম কে দেবে! এমনটা ভাবতে ভাবতে অনিকের ফুরফুরে মেজাজটা ভারী হয়ে ওঠে। পুরো ছবিটা শেষ করতে পারে না। এক পর্যায়ে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় সে। না, এত কষ্টের ছবি দেখা যায় না।
অনিক ল্যাপটপ বন্ধ করে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। চোখ গিয়ে পড়ে ঘরের কোণে বাঁশ দিয়ে তৈরি বুক শেলফে। সেখানে সেযত্নে সাজিয়ে রাখা কয়েকটি বই। তার মাঝে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘দূরবীণ-এ গিয়ে চোখ আটকে যায় অনিকের।
বইখানা নামিয়ে পড়তে শুরু করে সে। সেখানে রিমার সঙ্গে তার স্বামীর যে সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে তাতে ভীষণ নাড়া দেয় অনিকের মন। রিমার মতো একজন মেয়েকে যেভাবে তার স্বামী কষ্ট দিয়েছে, তারপরও রিমা যেভাবে তার স্বামী-সংসার ছেড়ে যায় নি তাতে মুগ্ধ হয় সে। পুরো বই দু’একদিনে পড়ে শেষ হবার নয়। প্রথম একটা চ্যাপ্টার পড়ে রেখে দেয় অনিক। তার কল্পলোকের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে তপতীর সেই চিরচেনা মুখ। তপতী কি এখনও তাকে ভালবাসে। স্বামী সংসারে গিয়ে নিশ্চয় তাকে ভুলে গেছে এতদিনে। থাক সে যদি সেখানে সুখী হয় তাহলে তাতেই তো অনিকের সব সুখ। সে যাকে ভালবাসে তার সুখ তাকেও স্পর্শ করে। তপতী কষ্টে থাকলে তাতে কষ্ট পাবে অনিক।
বইটা বন্ধ করে উঠে পড়ে সে। আজ সকাল সকাল বাসায় ফিরেছেন অনিমেষ দা। দু’জনে সারা দিনের ব্যস্ততা নিয়ে খানিকটা সময় গল্প করে কাটিয়ে দিল। তারপর রাতের খাবার খেয়ে যথারীতি বিছানায়।
৩.
রাত একটা।
অকস্মাৎ মোবাইল ফোন বেজে উঠল অনিকের। ঘুম জড়ানো চোখে কোনমতে দেখল নাম্বারটা। না, কোন পরিচিত নম্বর নয়। কারো কোন বিপদ নয় তো! ফোন রিসিভ করে বলে- হ্যালো!
হ্যালো। ঘুমিয়ে পড়েছেন?
কে বলছেন?
আমি সেই। কাল রাতে ফোন করেছিলাম।
কি কারণে এত রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছেন?
আপনার সঙ্গে কথা বলবো বলে।
আপনি কি আমাকে চেনেন?
হ্যা, চিনি।
কিভাবে? আমার তো কোন জানাশোনা মেয়ে বন্ধু নেই।
বারে মেয়ে বন্ধু ছাড়া কেউ ফোন করতে পারে না?
রাখুন তো এসব আমার ভাল লাগে না। কি জন্য ফোন করেছেন চটজলদি বলে ফেলুন।
আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।
তাতো বলছেনই। আর কি?
আপনি কেমন আছেন?
ভাল আছি।
কেমন ভাল?
আচ্ছা নাছোড়বান্দা তো আপনি। হঠাৎ রাতের বেলা ফোন করে অচেনা, অজানা একটা পুরুষের সঙ্গে কথা বলছেন। আপনার লজ্জা করছে না।
কে বলেছে আপনি অচেনা, অজানা? আপনি তো অনিক। তাই না? কোন ভুল করলাম?
না, মানে আমি অনিক আপনি জানলেন কিভাবে?
জেনেছি।
অদ্ভুত এক যন্ত্রণায় পড়েছে অনিক। তাকে কি কেউ এখনও গোপনে ভালবাসে? একজনকেই তো সে ভালবেসেছিল। সে তপতী। তার সেই স্মৃতি গত হয়েছে অনেক অনেক বছর আগে। এখন আর সে কথা মনে আনতে চায় না। তপতীর কথা মনে হতেই কান্না পায় অনিকের। এত স্বার্থপর মেয়েটি! পিতামাতা বিয়ে ঠিক করলো বলে শ্বশুরবাড়ি চলে যেতে হবে! তাদেরকে তো বলতেই পারতো সে অনিককে ভালবাসে। তাকে ছাড়া অন্য কাউকে সে বিয়ে করবে না। কিন্তু সে তা করে নি। আর এ জন্য অনিকই বা দায়ী কম কিসে। সেওতো তপতীর বিয়েতে বাধা দিতে পারতো। বলতে পারতো তপতীকে সে-ই বিয়ে করবে। তবে সে জন্য তাকে সময় দিতে হবে। পড়াশোনা শেষ হলেই সে তাকে বিয়ে করবে।
কার কাছ থেকে জানলেন? আমার নাম্বারই বা পেলেন কোথায়? জানতে চায় অনিক।
পেয়েছি। যারা ভালবাসে তারা গোয়েন্দাদের চেয়েও বেশি চালাক হয়, চতুর হয়। তেমনি করে পেয়েছি।
তা বলুন। আত্মসমর্পণ করলাম। আপনার কি কথা আছে বলুন। সব শুনব।
আপনি কি কাউকে ভালবাসেন?
না।
কাউকে ভালবাসতেন?
জানি না।
সে কেমন কথা। তার মানে কাউকে আপনি ভালবাসতেন। তার নাম কি?
জানি না।
এখনও কি সে আপনার বুকে জায়গা করে আছে?
তাও জানি না। এসব কথা আসছে কেন?
আপনি না বললেন সব কথা শুনবেন!
তাই বলে এইসব?
হ্যাঁ আমি যা বলব তাই শুনতে হবে। তা নাহলে আপনাকে ফাঁসিয়ে দেব।
বলুন কি বলতে চান।
আপনি আমার সঙ্গে সাক্ষাত করবেন।
না, তা হতে পারে না। আমি আপনাকে চিনি না। দেখি নি কোনদিন। কি করে আপনার সঙ্গে সাক্ষাত করবো। তা হয় না। তা ছাড়া আমি মেয়েদের এড়িয়ে চলি।
যদি সাক্ষাত না দেন তাহলে প্রতি রাতে আপনাকে ফোনে বিরক্ত করবো। যদি ফোন না ধরেন, সিম পাল্টে ফেলেন তাহলে অফিসে গিয়ে হেনস্তা করবো। ভাবুন তাতে কি আপনার সম্মান বাড়বে?
কবে কোথায় সাক্ষাত করতে হবে?
১৪ই ফেব্রুয়ারি। ভ্যালেন্টাইনস ডেতে। বিকাল সাড়ে চারটায় আমি দাঁড়িয়ে থাকবো চারুকলার গেটে।
আপনাকে তো আমি চিনবো না।
আমাকে চিনতে হবে না। আমি আপনাকে চিনি। আপনি এলেই আমি চিনে নেব। নিশ্চয়তা দিচ্ছি আপনার কোন ক্ষতি হবে না।
৪.
আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি। সারাবিশ্ব ভালবাসার রঙিন আকাশে উড়ছে। শুধু ভালবাসা নেই অনিকের হৃদয়ে। কার জন্য, কাকে সে ভালবাসবে? তার তপতীই তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। ভালবাসা সে তো একজনের জন্যই হয়। এক জীবনে অনেক জনকে ভালবাসা যায় না। হয়তো ভাল লাগে। তার মানে এই নয় যে একাধিক মেয়েকে সে ভালবাসবে।
তবু চারদিকের আবহ দেখে তার আজ খুব বেশি ভালবাসতে ইচ্ছে করছে। তেমন সাজে নি সে আজ। সাদামাটা একটি টিশার্ট পরেছে। পরনে জিন্সের প্যান্ট। পায়ে চামড়ার জুতো। এভাবেই অফিস থেকে আগেভাগে বেরিয়েছে। শাহবাগ এসে দাঁড়িয়েছে ফুলের দোকানে। ধুমছে বিক্রি হচ্ছে ফুল। দামও বেশি। সেখানে দাঁড়িয়ে কতক্ষণ দেখল যুগলরা কিভাবে হাতে হাত ধরে হাঁটছে। মুখে তাদের কোটি টাকার হাসি। এমন হাসি আজ তার মুখেও থাকার কথা ছিল।
সেখান থেকে গোমড়া মুখে সরে আসে। সাড়ে চারটা বাজতে এখন পাঁচ মিনিট বাকি। সে সোজা হাঁটা শুরু করে। চারুকলার গেট দেখা যাচ্ছে। সেখানে কে তার জন্য অপেক্ষা করছে, নাকি আসলেই ভুয়া কোন নারীর খপ্পড়ে পড়েছে। চারুকলার গেটে কত মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। তারা প্রেমিক বা বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে হাঁটছে। কাউকে তো সেখানে স্থির দেখা যাচ্ছে না। কে তার জন্য অপেক্ষা করছে? শুধু এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনিকের এখানে আসা। এর বাইরে আর কিছু নয়। কে তাকে ফাঁসিয়ে দিতে চাইছে। তার ফোন নম্বর পেল কোথায়। তার অফিসের ঠিকানাই বা পেল কোথায়।
অনিক এখন গেটের সামনে। গেটের ভিতর থেকে একটি মেয়ে এগিয়ে এল। এতক্ষণ তার মুখটা দেখা যাচ্ছিল না। এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে অনিক। এ একি? তার সেই প্রেমিকা তপতীর মতো একেবারে হুবহু একই রকম দেখতে। মেয়েটির দু’চোখ বেয়ে কান্না ঝরছে। অনিক স্থির করতে পারে না মেয়েটি কে। কাছে এসেই যখন মেয়েটি তাকে জড়িয়ে ধরে শিশুদের মতো কেঁদে উঠল, বলল- ওগো, আমি তোমার তপতী। আমি সেই তোমার জান। তোমার তপতী। তাকে তুমি কাছে টেনে নেবে না। আগের মতো তাকে কি ভালবাসা দেবে না।
পাথর হয়ে গেছে অনিক। স্থির করতে পারে না কিছু। তপতী, সত্যি তপতী! কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে। তপতীর তো বিয়ে হয়েছে। তার তো ছেলে সন্তান, স্বামী থাকার কথা। সে একা এখানে কি করছে। তার কাছে এত বছর পরে আজ কি চাইছে সে?
তপতী নিজের থেকেই বলে যেতে থাকে- আমার বিয়ের খবরে তুমি রাগ করেছ। তুমি গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছ। কই একটিবারও তো খবর নিলে না তোমার তপতী কেমন আছে। না হয় বিয়েই করেছে তাই বলে ভালবাসা কি শেষ হয়ে গিয়েছে। সংসার জীবনে সে কতটুকু সুখী। যাকে ভালবাস তার বিয়ে হয়ে গেছে বলে তুমি তাকে ভুলে যাবে। এ কেমন ভালবাসা। ভালবাসলে কি বিয়ে করতেই হবে এমন কোন নিয়ম আছে। কথা বলছো না কেন অনিক?
অনিক নিরুত্তর। তার হিসাবের খাতা আজ অনেক বড়। এতসব হিসাব এই চারুকলায় বসে মিলানো সম্ভব নয়। শুধু জানতে চাইলো- তোমার স্বামী, সন্তান রেখে তুমি এখানে কেন?
কেন? শুনতে চাও সে কথা। তাহলে শোন- যেদিন আমার বিয়ের কথা হয় সেদিন বিকালে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই রাজবাড়ী। সেখানে আমার এক বান্ধবীর বাসা। তার মাকে সব খুলে বললাম। বললাম- আমি অনিককে ভালবাসি। তাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবো না। আমি যে আপনাদের কাছে এসেছি এ কথা কোনদিন যেন আমার পিতামাতা জানতে না পারে। তিনি আমার কথা রেখেছেন। সেখানে থেকেই একটি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। তারপর ঢাকায় এসে একটি গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছি। একদিন সেই গার্মেন্টসেই তোমার বন্ধু সিরাজের সঙ্গে দেখা। শুনলাম তোমার সম্পর্কে। শুনলাম তুমি এখনও বিয়ে করনি। এখনও আমার জন্য অপেক্ষায় আছ। তার কাছ থেকেই তোমার মোবাইল ফোনের নাম্বার নেয়া। এবার বল তুমি কি করবে? আমাকে ফেলে দেবে নাকি কাছে টেনে নেবে?
শোভনের বুক কেঁপে উঠছে বার বার। একি বলছে তপতী। সেও তার মতো নিজেকে এতটা বছর নিঃসঙ্গ রেখেছে তার জন্য! সে তো অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখী হতে পারতো। তা করে নি শুধু তার ভালবাসা পাওয়ার জন্য। অনিক মুখ তুলে তপতীর চোখে চোখ রাখে। দু’জোড়া চোখ তখন রাজ্যের কথা বলে ফেলে কয়েক সেকেন্ডে। তপতীর চোখের জল মুছিয়ে দেয় অনিক। তার মাথাটি তার বুকের মধ্যে নিয়ে বলে- ভালবাসি তোমায়। তপতী সেই স্কুল জীবনের মতো এখনও ভালবাসি। আজ তাই এই বসন্তে, এই ফাল্গুনে দেখ কৃষ্ণচূড়া সেজেছে, পলাশ রেঙেছে লাল হয়ে- ঠিক আমার মনের মতোই। আজ এই বসন্তকে আমরা আরও রাঙিয়ে দেব। ফাগুনের রঙে আজ তোমাকে সাজাবো।
তপতীকে দু’হাত ধরে টানতে টানতে শাহবাগে ফুলের দোকানে নিয়ে যায় অনিক। সেখান থেকে একটি লাল গোলাপ নিয়ে গুঁজে দেয় তার খোঁপায়। তখন পাশের দোকানে বাজছে - আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন দিল.....
আজ সে রাজা। তার অনুভূতি প্রকাশ করার মতো নয়। এতটা বছর পর তার তপতীকে কাছে পেয়েছে। আজ আর তার চাওয়ার কিছু নেই। তাকে নিয়ে গিয়ে রমনা পার্কের নিচে বসল একটি ছায়াবৃক্ষের নিচে। সেখানে সবুজ ঘাস। লিকলিক করছে ডগা। যেন সাদরে আহ্বান জানাচ্ছে তাদের। সেখানে বসেই কথা শুরু হয়ে যায় দু’জনে।
তুমি আমাকে এতটা দিন মনে রেখেছ? জানতে চায় অনিক।
হা। যাকে ভালবেসেছি তাকে ভুলব কি করে। শুধু এটুকু মনে সাহস ছিল যাকে ভালবাসি তাকে একদিন কাছে পাব। আমার অনিক আমাকে ভুলে যেতে পারে না। গার্মেন্টসে যখন তোমার বন্ধু সিরাজ বলল- তুমি এখনও বিয়ে কর নি। এখনও একা আছ। এখনও আমাকে কল্পনা কর।
অনিকের চোখে অশ্রু টল টল করে।
তুমি কি আমাকে সত্যি মনে রেখেছ? জানতে চায় তপতী।
মনে রেখেছি বলেই তো তোমাকে কাছে পেয়ে আপন করে নিয়েছি।
আমাকে নিয়ে তোমার কোন সন্দেহ জাগে নি? মনে হয় নি আমি সব হারিয়ে ফেলেছি। তোমার জন্য আমার কাছে যে পবিত্র আমানত ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে?
না। যখন তুমি আমাকে ভালবেসে এতটা পথ এসেছে, তখন কি করে বলি তুমি আমার সঙ্গে শঠতা করেছ! তুমি তা করতে পার না। এতটা বছর আমি তো তোমার জন্যই অপেক্ষায় ছিলাম। বিধাতা যখন তোমাকে আমাকে আজ আবার এক করে দিলেন তখন দেখ এই ফাগুনে আগুন লেগেছে। গাছে গাছে পাখি গান গাইছে। পুরো টিএসসি যেন প্রেমাবেগে ভেসে যাচ্ছে। আজ আমার জীবনে সত্যি বসন্ত এসেছে। চল তাকে রাঙিয়ে তুলি।
অনিকের কথা শুনে হু হু করে তার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠল তপতী।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন