বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৫ আগস্ট ২০১৯
গল্প/কবিতা: ৫টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৮৩

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

বাতিঘর

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

কুকুর, বেড়াল আর জীবন দর্শন

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

নারকেল তত্ত্ব

ঘৃনা আগস্ট ২০১৫

কোমলতা (জুলাই ২০১৫)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৮৩ কাজলি

নাঈম
comment ৬  favorite ২  import_contacts ৫৫৮
মাঝে মাঝেই আমাকে পেশাগত কাজে এদেশে, অর্থাৎ ক্যানাডার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে যেতে হয়। এর মধ্যে হ্যাল্টন হিল এর গ্রাম্য অংশটা আমার বেশ পরিচিতি। প্রায়ই পশ্চিম ডেরী সড়ক ধরে মিসিসাগা, মিল্টন ছাড়িয়ে আরো পশ্চিমে ক্যাম্পবেলভিল এলাকায় যাতায়ত করি। সেদিনও আর সব বারের মতই যাচ্ছিলাম, সুন্দর ঝক ঝকে রোদেলা দিন, ওমাহ পার্ক নামের খামারীদের পাড়াটা অতিক্রম করেছি মাত্র। এ জায়গাটাতে রাস্তাটা দেখতে আমাদের দেশের ডিস্ট্রিক বোর্ড এর রাস্তার মত, গাড়ীর গতি ষাট থেকে আশিতে তুলবার চিহ্নটা পার হয়েছি, গতি বাড়াতে যাব, হঠাৎ করেই পাশের খামার থেকে ছোট্ট একটা খয়েরি রঙের বাছুর রাস্তার উপর লাফিয়ে উঠে আসল। সজোরে ব্রেকে পা দিলাম, চাকার কর্কশ শব্দ তুলে গাড়ী কিছু দূর গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ভাগ্য ভালই বলতে হবে, উল্টো দিক থেকে কোন গাড়ী আসছিলনা। বাছুরটাকে এবং নিজের গাড়ীটাকে রক্ষা করতে পেরে একটু স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করছি মাত্র, বাছুরটা গাড়ীর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে বেশ মনযোগ দিয়ে মাথা নীচু করে তাকিয়ে পুরো ঘটনাটা দেখল, তারপর পরই পরমানন্দে লেজ উঁচিয়ে রাস্তার অন্য দিকে ছুট দিল। ভাবলাম, বিধাতার সৃষ্টিতে সব বাচ্চাই কেমন করে যেন একই রকমের, নিজের মনের আনন্দেই সে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাতে কার কি এসে গেল কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। বাছুরটাকে কয়েক মুহূর্ত মাত্র দেখেছি, ওর খয়েরি রঙের গায়ে, মাথার পাশে চোখের ওপর একটা সাদা ছাপ, দেখতে খুব মায়া লেগে গেল। ওর মালিকের সাথে পরিচয় থাকলে, আর হাতে যদি একটু সময় থাকত, আমি হয়ত গিয়ে এই দুষ্টি বাছুরটাকে আদর করে দিয়ে আসতাম। ততক্ষনে বাছুরটার খোঁজে রাস্তার ওপর ওর মালিক একটা ঘোড়ায় চড়ে এসে হাজির, হাতে ল্যাসো(আঘাত না করে প্রানী ধরবার ফাঁস), আমাকে দেখে মাথার হ্যাট উঁচু করে বাছুরটাকে বাঁচিয়ে গাড়ী থামানোর জন্যে ধন্যবাদ দিয়ে বাছুর এর পেছনে ঘোড়া ছোটালেন। আমিও আমার পথে আবার চললাম। ছোট্ট বাছুরটাকে দেখে আমার কাজলির কথা মনে পড়ে গেল।
আমি যখন ছোট, মনে হয় বয়স বছর দশেক হবে, দাদুর কালো গাই এর একটা তামাটে লাল রঙের বাচ্চা হল। আমরা ওকে নাম দিলাম লাল, দাদু মনে হয় আরো বলেছিলেন হিন্দি বা উর্দুতে ছোটদেরকে আদর করে লাল সম্বোধন করা হয় । সেই লাল নামটাকে আমার তিন বছরের ছোট বোন কয়দিনের মধ্যই লালি করে দিল। লালি ছিল চঞ্চল এক বাছুর, সারাদিন দাদু বাড়ীর খোলা মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্যে প্রান্তে দৌড়ে বেড়াত। ছুটতে ছুটতে একদিন ওর লেজ গাছের নীচু ডালের সাথে পেঁচিয়ে ছিড়ে ফেলেছিল, ওর সাথে আমরাও সবাই খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। ভাগ্যে কাছেই পশু চিকিৎসক থাকতেন, উনি এসে সে যাত্রা পট্টি বেঁধে দিলেন, কিন্তু লেজটা আর জোড়া লাগানোর ব্যাবস্থা হয়নি। কয়েক বছর পর বাবা যখন সরকারী চাকুরীতে দাদু বাড়ী থেকে অনেক দূরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলী হয়ে গেলেন, আমি তখন নবম শ্রেনীতে পড়ি, লালি তখন বড় হয়ে গেছে, দাদু আমাদের খাঁটি গরুর দুধের সুব্যাবস্থা করবার জন্যে ওকে আমাদের সাথে দিয়ে দিলেন।
লালি মা হলে আমাদের বাড়ীতে খয়েরি রঙের একটা মাদী বাছুর এল। ওর বড় বড় চোখ গুলো কাজল কাল আর মাথার ওপরে দুচোখের মাঝখানে একটা বাঁকা চাঁদের মত সাদা ছাপ, দেখতে ভারী মায়া কাড়া। মা ওকে আদর করে নাম দিলেন কাজলি। সকাল বিকাল মা ওকে দেখতে যান, আদর করে দেন। ছোট্ট একটা বাছুর পেয়ে আমিও খুবই আনন্দিত, স্কুল থেকে এসে ওকে একবার আদর করে না আসলেই নয়, সুযোগ পেলেই ওর সাথে খেলা করি। সে বেশ বুঝেছে আমরা ওকে খুব ভালবাসি, গোয়ালের বাইরে ছাড়া থাকলে, মার গলা শুনলেই সে ছুটে আসে, মা ওকে পিঠে, গলায় আদর করে দেন।
বাবাকে দেয়া ঐ সরকারী বাসাতে একজন বামন মালী কাজ করতে আসতেন, আমরা ডাকতাম টুকুভাই। বয়স মনে হয় পঞ্চাশ বা তার কাছাকাছি, উচ্চতায় চার ফুট হবেন হয়ত। টুকুভাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে কাজলি আর লালিকে দেখভাল করতেন। সকাল বিকাল খাওয়ানো, গোসল দেয়া, গোয়াল ঘরটাকে সাফসুতরা করা ইত্যাদি, মা ওনাকে অতিরিক্ত কাজের জন্যে টাকা পয়সা ও ওনার পরিবারের জন্যে দুধ দিতেন। টুকুভাইয়ের সাথে কাজলির সম্পর্কটা ছিল বাবা-মেয়ের মত। মাঝে মাঝে কাজলি ইচ্ছা করেই টুকু ভাইয়ের কথা শুনতে চাইতনা, ঠিক ছোট বাচ্চারা যেমন করে। একদিন বাসার পেছনে উঁচু টুলের উপর দাঁড়িয়ে টুকুভাই কলা গাছে থেকে কলার কাঁদি নামাচ্ছিলেন, কাজলিকে একটু আগেই লালির কাছে দিয়ে এসেছেন। কোন ফাঁকে সে গোয়াল থেকে বেরিয়ে এসছে উনি জানেনা। কাজলিকে এদিকে আসতে দেখেই টুকুভাই ওকে উঁচু গলায় ধমকে উঠলেন, সে যেন আসর চেষ্টা না করে। কিন্তু দুষ্টুটার কথা শোনার কোন ইচ্ছাই ছিলনা, লাফাতে লাফাতে এসে গা দিয়ে ধাক্কাদিয়ে হুড়মুড় করে টুকুভাইকে শুদ্ধ টুলটা উল্টে দিল। তারপর বেশ আনন্দ নিয়ে ল্যাজটা উঁচিয়ে আবার লাফাতে লাফাতে লালির কাছে চলে গেল। আমি ছুটে গিয়ে টুকুভাইকে উঠতে সাহায্য করলাম, উনি তেমন কোন ব্যাথা পাননি, দুজনে এক সাথে ওর দুষ্টুমিতে কিছুক্ষন হাসলাম।
অন্য অনেক বাছুরের মত কাজলি ফুলগাছে খেয়ে ফেলতনা, কেমন করে ওর এই সুবুদ্ধিটা ছিল আমি ঠিক বলতে পারবনা, ও মায়ের বাগান নষ্ট করেনি, তবে শব্জি ক্ষেত ব্যাপারটা অন্য রকম হয়। ওর অতি উৎসাহ আমার কাছে জ্বালাতন মনে হত। মা বাগানে কোন কিছু করলে ওটা দেখবার জন্যে সে খুব উৎসাহি হয়ে উঠত। একদিন মা টবের গাছ গুলোর মাটি নিড়িয়ে দিচ্ছেন, কাজলি ওনার গায়ের ফাঁক দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে দেখার চেষ্টা করল, মা ওকে সরিয়ে দিয়ে কাজ করে চললেন। যতবারই ও দেখবার জন্যে চেষ্টা করে, মা ওকে সরিয়ে দেন। সেও নাছোড়বান্দা, আবার দেখার চেষ্টা করে। সবার শেষে মা নীচু হয়ে গোলাপের গাছটার পরিচর্যা করছিলেন, অতি উৎসাহে সে এক সময় মাকে ছোট্ট একটা গুঁতো দিয়ে সরিয়ে, দেখার চেষ্টা করতে চাইল। হুড়মুড় করে মা গোলাপ গাছের উপর গিয়ে পরলেন। ছুটে গিয়ে ওনাকে উঠতে সাহায্য করলাম, মাকে তুলে কাজলিকে উঁচু গলায় বকে দিলাম। সে যেন খুব লজ্জা পেল, ছুটে গিয়ে লালির কাছে গা ঘেষে দাঁড়িয়ে রইল।
আরেকবারের ঘটনা, তখন গ্রীষ্মের স্কুল ছুটি চলছে, আমরা সবাই বাড়ীতে। দুপুরের খাওয়া শেষে রান্নাঘর গুছিয়ে একটা বই নিয়ে মা ওনার বিছানায় একটু শুতেন। মায়ের ঘরের একটা দরজা পেছন বারান্দার দিকে ছিল, বাতাশ আসার জন্যে ওটা খুলে রাখতেন। আমি পাশের ঘরে গনিত আর রচনা লেখার চর্চা করতাম, বিকেল হলে তবেই খেলতে যাওয়ার অনুমতি মিলত। হঠাৎ আমার ঘর থেকে শুনলাম কেউ যেন মিলিটারি বুট পড়ে বারান্দা দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে। মাও বোধ করি শুনেছেন, আমি যখন মায়ের ঘরে এসে পৌঁছালাম, মা বই বন্ধ করে বিছানায় উঠে বসেছেন, দরজার দিকে লক্ষ রাখছেন, হাতে বিছানা ঝাড়ার ঝাড়ুটা। একটু পরে দরজা দিয়ে কাজলির মাথা দেখা গেল, বারান্দার দরজা খোলা পেয়ে সে মাকে খুঁজতে এসেছে। পাকা মেঝেতে কাজলির ক্ষুরের শব্দই আমাদের কাছে মিলিটারি বুটের শব্দ মনে হয়েছে। আমি হৈ হৈ করে উঠতেই সে এক ছুটে ওর মায়ের কাছে চম্পট দিল।
সে মায়ের আদরটাকে পুরোপুরি নিজের সুবিধায় ব্যবহার করতে শিখে নিয়ে ছিল, শীতকালে বাসার পেছনে মা শব্জির ক্ষেত করতেন, সে জন্যে কাজলিকে গোয়ালে বঁধে রাখা হত। সে মায়ের গলা শুনলেই হাম্বা হাম্বা করে বাইরে ছেড়ে দেয়ার জন্যে বাড়ী মাথায় তুলত। আমার মনে হয় সে বুঝত অমন চিৎকার জুড়ে দিলে মায়ের মন নরম হয়ে যাবে, মা টুকুভাইকে বলতেন ওকে গোয়াল থেকে এনে বাইরে বাঁধতে, তবেই সে চুপ করত।
সব আনন্দের দিন এক সময় শেষ হয়, বাবা বদলী হলেন ঢাকায়, কাজলি আর লালিকে ঢাকায় এনে রাখা সম্ভব নয়, ততদিনে দাদুও গত হয়েছেন। মা আমাদের এক অসচ্ছল আত্মীয়কে কাজলি আর লালিকে দিয়ে দেবেন বলে মনস্থির করলেন। কাজলি ছাড়া যান্ত্রিক ঢাকা শহরটাকে অনেকদিন বড় নিরানন্দ মনে হয়েছিল। কছুদিন পরে খবর পেলাম লালির বয়স হয়ে যাওয়াতে ভাল দুধ দেয়না, ওকে বিক্রী করে দিয়েছেন ওর বর্তমান মালিক, খবরটা শুনে মা অনেক্ষন চুপ হয়ে রইলেন, হাল্কা হবার জন্যে হেসে বললেন,
- এখন কাজলির মা হবার পালা কি বলিস?
মাথা নেড়ে মৌন সম্মতি দিয়েছিলাম। পরের বছর কোরবানীর ঈদ করতে হবে ঢাকায়, গরু দেখতে মা আমাকে প্রতিবেশীদের সাথে বাসার কাছে ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে পাঠীয়েছেন, ঐ বছর ওখানে প্রথমবারের মত গরুর হাট বসেছে। অনেক গরুর মধ্যে একটা খয়েরি গরু চোখে পড়ল, মাথায় পরিচিত সেই ছোট্ট সাদা বাঁকা চাঁদ। কাছে যেতেই গরুর মালিক এগিয়ে এসে জানাল অস্ট্রেলিয়ার গরু, শরীরে অনেক মাংশ, অল্প বয়সের গরুটা খেতেও খুব মজা হবে, একটু তেজী এই যা, একদাম পঞ্চাশ হাজার টাকা। আমাকে একটু সবাধানে কাছে যেতে বলে সে দড়ি দিয়ে মাথাটা খুব শক্ত করে টেনে ধরে রাখল। সরকারী চাকুরে বাবার আয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকার গরু কোরবানী দেয়ার সাধ্য ছিলনা তবু নিজের অজান্তে আমি গরুটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করলাম। আমি ভয় পাচ্ছিনা বুঝে মালিক দড়িটা একটু ছেড়ে দিলে গরুটা গলা উঁচু করে দিল, ওর গলকম্বলে আদর করে দিতেই সে আমার গায়ের সাথে মাথাটা ঘষতে লাগল। গরুর মালিক বেশ অবাক হয়ে বলে উঠল,
-আপনে খুব ইমানদার মানুষ দেইখ্যা এই বোবা গরু বদরাগী হইলেও আপনেরে পসন্দ করসে।
আমার চোখ কখন অস্রুতে ভরে উঠেছে বলতে পারিনা, হাটে গরু না খুঁজে গরুটাকে আদর করতেই যেন বেশী ইচ্ছে করছিল। কেন জানিনা মনে হচ্ছিল এটাই আমাদের কাজলি। ওর মালিক কয়েকবার এটা সেটা বলবার চেষ্টা করল, এক সময় বিরক্ত হয় বলে উঠল,
-ট্যাকা না থাকলে, শুধু সোহাগ কইর্যা তো আর গরু কিনতে পারবেননা, আপনে অন্য গরু দেখেন।
সেই আমার কাজলির সাথে শেষ সৌহার্দ। বিধাতা মানুষকে পথ প্রদর্শনের জন্যে সম্মানিত ইব্রাহীমকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বিধাতার প্রতি তাঁর ভালবাসার চরম পরীক্ষায় সন্তানকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্তেও পিছপা হননাই। স্রষ্টা তাঁর ত্যাগী মনোভাবে মুগ্ধ হয়ে ভালবাসার চিহ্ন হিসেবে সন্তানের বদলে প্রানী উৎসর্গ করার কথা বললেন। আর আমি সই ভালবাসাকেই তুচ্ছ করে, অক্ষমতার ভারে ভারী মন নিয়ে হাট ছেড়ে আসলাম। ফিরতি পথে ভাবলাম, আমাদের কুরবানীতে কতটুকু ভালবাসার ছোঁয়া থাকে? নিত্তকার মত বাসায় বেল বাজাতেই মা দরজা খুলে দিলেন, ঘরে ঢুকে মাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষন কাঁদলাম, কিছু জানতে না চেয়ে মাও আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখলেন।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন