বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ এপ্রিল ১৯৯৫
গল্প/কবিতা: ১টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

ভালোবাসা / ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী ২০১৫)

মোট ভোট স্কাইডাইভ

মোরশেদুল Munna
comment ২  favorite ১  import_contacts ৫৭২
বাতাসে ভাসছি আমি। ভাসছি বললে হয়ত ভুল হবে, 9.8 ms-² ত্বরণে ভূ-পৃষ্ঠের দিকে ছুটে চলেছি আমি। বেশি সময় নেই আমার হাতে,আর মাত্র ১০ সেকেন্ড বড়জোর! ভেসে থাকার এই মুহূর্তটা তবুও আমার কাছে খুব সুন্দর। আমার দীর্ঘ ২০ বছরের জীবনের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত হয়ত এটাই!!

আমার গোটা জীবন তন্ন-তন্ন করে খুঁজলেও হয়ত "বিশুদ্ধ সুখকর" কোনো মুহূর্ত পাওয়া যাবে না। বাঁচার মত করে বেঁচে থাকতে যা যা লাগে তার সবটুকুই একে একে হারিয়ে চলেছি জীবনের শুরু থেকেই।

কিন্তু থাক সে সব কথা, এই ১০টা সেকেন্ড আমার, শুধুই আমার! কয়েকটা "বিশুদ্ধ সুখকর" মুহূর্ত দিয়েই আমি চাই শেষটা করতে।

কিন্তু হঠাৎ করেই কি একটা যেন শুরু হচ্ছে, হচ্ছে কি এসব আমার সাথে!! একে একে জীবনের সব কিছু মনে পড়তে শুরু করছে কেন!?

আল্লাহ্‌, সারাজীবনে অনেক তো "আউট অফ সিলেবাস" এক্সাম নিলা, যার প্রত্যেকটাতেই অবধারিতভাবেই আমি ফেইল! জানি এই ১০ সেকেন্ডের পর আমার জন্য তোমার শাস্তিটাও অবধারিত। মাঝখানে শুধু ১০টা সেকেন্ডই তো চেয়েছিলাম ইকটু ভালো থাকতে! ইকটু দয়া করা কি যায় না? মাত্র তো ১০টা সেকেন্ডই , আমাকে কি ইকটু উড়তে দেয়া যায় না?
নাহ, দেয়া যায় না উড়তে। কিছু মানুষের অস্তিত্ব শুধু ভূ-পাতিত হওয়ার জন্যেই, তার আগে আকাশে উড়ে নেয়ার অধিকার টুকু তাদের নেই। আর তাদেরই একজন হওয়ায় শহরের উচ্চতম ভবনটা থেকে লাফিয়ে পড়েও উড়তে পারলাম না আমি, এখন শুধুই ভু-পাতিত হওয়ার অসহায় অপেক্ষা।

চোখ বন্ধ হয়ে আসছে আমার, হারিয়ে যাচ্ছি আমি আমার জ্বরাক্রান্ত দুঃস্বপ্নের মত জীবনটার ফ্ল্যাশব্যাক এ...............পরাজয় মেনে নেওয়া সেই দুর্বল হাসিটা হয়ত এই মুহূর্তে আমার দুই ঠোঁট জুড়ে বিস্তৃত হচ্ছে......


তখন ফেব্রুয়ারী মাস। শীতের শেষ, বসন্তের শুরু। ভালোবাসাময় এক আবহাওয়ায় পৃথিবীতে আগমন ঘটে আমার।
শুরুতে হয়ত সবকিছু ভালোই ছিল, কিন্তু সে ভালো বেশিদিন টিকলো না; আমার যে জন্মই হয়েছিল সব কিছুকে একে একে হারানোর জন্য। তাই পৃথিবীতে আসার ২ মাসের মধ্যেই আমি আমার বাবাকে মেরে ফেললাম।

আমার জন্য কিছু জামা কাপড় কিনে আনতে গিয়েছিলেন তিনি। ফেরার সময় রাস্তা পাড় হতে গিয়ে একটা বাসের ধাক্কা লেগে আহত হন আমার বাবা। তিনদিন হাসপাতালে ছিলেন তিনি। বাচানো সম্ভব হয় নি তাকে। শুনতে অসম্ভব লাগলেও সব সম্ভবের এই দেশে জন্মের ২ মাসের মধ্যেই আমি আমার বাবার খুনি হয়ে যাই আমার পরিবারের কাছে। সম্ভব হলে হয়ত আমার নামে মামলাও করা হত! বাবার মৃত্যুর পর আমাকে সহ আমার মাকে আমার দাদা বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হল।

এরপর আমাদের ঠাই হল আমার মামার বাসায়। মামা আমার বিশাল বড়লোক,আমার নানার প্রচুর সম্পত্তির পুরোটাই তিনি পেয়ে যান উত্তরাধিকার সুত্রে। হিসাব অনুযায়ী হয়ত আমার মা সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ পেতেন,কিন্তু কোনো একটা কারনে তা আর হয়নি। ওহ,আমার মামা হচ্ছেন ঢাকার একজন নামকরা উকিল। ক্যারিয়ার এর প্রায় সব কেস-ই তিনি জিতেছেন।

যাই হোক,আমার পৃথিবীকে চিনতে পারার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই আমার মা আমাকে ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। লিউকোমিয়া ছিল তার। বেশ শর্ট নোটিসেই মারা যান তিনি।

তখন আমার বয়স উনিশ মাস। এরপর আমার দেখাশোনা করতেন গৃহপরিচারিকা নাসরিন খালা। আমার দুই মামাতো ভাইবোন তখনো খুব ছোট, মামিকে তাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হত। মামাতো ভাই অর্ণব ভাইয়া আমার দুই বছরের ,আর অরনী আপু আমার চেয়ে এক বছরের বড়।

ধীরে ধীরে বড় হতে থাকি আমি। বড়লোকের বাড়িতে আমি বেড়ে উঠি কোনো রকমের বিলাসীতার স্পর্শ ছাড়াই। আমার মামাতো দুই ভাইবোন তাদের সমগ্র সত্ত্বা দিয়ে প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে অনুভব করানোর চেষ্টা করত যে তাদের পরিবারের সদস্য আমি নই। এতে শুরুর দিকে কিছুটা খারাপ লাগলেও ইকটু বড় হওয়ার পর তাতে আমি আর কিছু মনে করতাম না। জীবনের সব কিছুর সাথে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হতে থাকি আমি।

মামা অনেক ব্যাস্ত থাকতেন। সারা সপ্তাহ জুড়েই তার ব্যস্ততা। খুব সামান্য সময়ের জন্যই তাকে বাসায় পাওয়া যেত। আর সেটুকু সময়েও তিনি কখনো আমাকে তার সন্তানদের থেকে আলাদা চোখে দেখতে ভুলতেন না! আমার প্রতি তার অবহেলা গুলি ছিল বরাবরই অত্যন্ত পরিষ্কার।

ঘরটাতে আমার একমাত্র আপন জন বলতে ছিলেন আমার মামি। খুব ক্ষমতাবান একটি পরিবারের সবচেয়ে ক্ষমতাহীন সদস্যটির ভালোবাসাই হয়ত ছিল আমার জীবনের একমাত্র পাওয়া।
হয়ত তিনি চাইতেন আমার জন্য অনেক কিছু করার, কিন্তু সবসময় তা পারতেন না। কিন্তু যতটুকু পারতেন সেটুকুই আমার জন্য অনেক। প্রতি বছর জন্মদিনে পাওয়া আমার একমাত্র উপহারটি যে তারই দেয়া! এছাড়াও আমার একমাত্র শখ ছিল গল্পের বই পড়া; সবার কাছ থেকে লুকিয়ে বই কিনার জন্য টাকাও তিনি দিতেন আমাকে!

আমি বাংলা মাধ্যম এর একটা সরকারি স্কুল এ পড়তাম। ছাত্র হিসেবে আমি বরাবরই ছিলাম মাঝারি মানের। তবে আমি প্রচুর পড়াশোনা করতাম, শুধু রেজাল্টটাই অতটা ভালো হত না কখনো! তবুও আমার মামাত ভাইবোনদের চেয়ে হয়ত ভালো অবস্থানেই ছিলাম আমি এ দিক থেকে! প্রতি বছরি তারা ফেল করতে করতেও কীভাবে যেন প্রমোশন পেয়ে যেত!!

ওহ, আমার নাম রিহান! আসলে আমার যে একটা নাম আছে সেটা শুধু স্কুল এ গেলেই টের পেতাম। বাসায় আমি খুব একা হয়েই থাকতাম সবসময় । ঘরের এক কোণের অই রুমটাতে বসেই কাটতো আমার সারাটা দিন। আমার পৃথিবী অনেকটাই সীমাবদ্ধ ছিল আমার রুম আর আমার গল্পের বইগুলোর মধ্যেই।

আমার বাস্তবতায় আমি একা অবশ্যই ছিলাম, কিন্তু তার চেয়েও বেশি একা হয়ত ছিলাম আমার কল্পনার জগৎটাতে। কিন্তু অন্ততপক্ষে আমার কল্পনার জগৎটাতে হলেও আমার একাকিত্ব দূর করে দেওয়ার জন্য একজনের আগমন খুব দ্রুতই ঘটে।


তখন আমি পড়ি ক্লাস এইট-এ। আগে থেকেই চিনতাম মেয়েটাকে, কিন্তু সেদিন তাকে চিনলাম নতুন করে! সেদিনের আগে তাকে সর্বশেষ দেখেছিলাম আরো চার বছর আগে। কিন্তু তখন সে অনেক ছোট,আমিও ছোটই ছিলাম! কিন্তু চার বছর পরের সে দিনটাতে হঠাৎ করেই সব বদলে গেল। কীভাবে যেন এক মুহূর্তেই অনেক “বড়” অনেক গেলাম আমি!

নিজের হৃৎস্পন্দনকে খুব স্পষ্টভাবে সেদিনই প্রথম অনুভব করেছিলাম। নতুন করে তাকে প্রথমবার দেখার সেই মুহূর্তটাতে আমার হার্টবিট যেন একেবারে থেমেই গিয়েছিল! নাটক সিনেমার ওই দৃশ্যগুলির মত সব কিছু স্লো মোশনে দেখতে পাচ্ছিলাম আমি!
হঠাৎ করেই আমি বুঝে গেলাম “হার্টবিট মিস” কিভাবে হয়ে যায়! কয়েক মুহূর্তের ওই স্তব্ধতার পর আমার হৃৎপিণ্ডখানি যেন হাতুড়ি হয়ে বুকের উপর সজোরে আঘাত করতে থাকলো!
যোজন যোজন তুল্য সেই মুহূর্তগুলির বিবর্তনের পর আমি টের পেলাম, যে “আমি আর আমি নাই!”

আমার মামির বোনের মেয়ে, মামাত ভাইবোনদের খালাত বোন অথবা আমার দূর সম্পর্কের কাজিন; যাই বলি না কেন, মিথিলা নামের ঐ মেয়েটি ছিল আমার জীবনের প্রথম আর শেষ ভালবাসা। জানি আমার মত ছেলেদের জীবনে মানায় না এসব, কিন্তু স্বপ্ন তো আর কোনো বাস্তবতা মানে না! ঐ স্বপ্নগুলিই তো আমাকে বাঁচিয়ে রাখলো পুরো বিশটা বছর জুড়ে!

মিথিলা আমার এক বছরের ছোট। ক্লাস থ্রি-তে যখন পড়ত ও, তখনই ওরা সপরিবারে লন্ডন চলে যায়। কিন্তু একটা সময়ে এসে দেখা গেলো যে ওখানকার পরিবেশ বা পড়াশোনা কোনোটাই ভালো লাগছে না তার! বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ের আবদারে তাই দেশে ফিরে এলো তারা। আমার কল্পনার রসদ যোগানো আর ধীরে ধীরে বাস্তবতায় আগমন করার জন্যই হয়ত তার এ ফিরে আসা!

যাই, হোক সেদিন মিথিলার সাথে কোনো কথা হল না আমার। আকস্মিক বিবর্তনের সেই রেশটা কাটিয়ে উঠার পর ড্রইংরুম থেকে আমার রুমটাতে চলে গেলাম।

এরপর প্রায়ই আসত মিথিলা, একই এলাকাতে ছিল ওদের বাসা! এ বাসাটাতে তার প্রায় নিয়মিত আসা যাওয়ার কল্যাণে তাকে “প্রথম” দেখাটির কিছুদিন পর তার সাথে কথাও হয় আমার!

“হাই রিহান, আমাকে চিনতে পেরেছ?”

অংক খাতা কিনে বাসায় ফিরছি তখন আমি। বুঝতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছিলো আমার, যে এটা সত্যিই হচ্ছে কিনা! বেশ কিছুক্ষন শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকলাম আমি! ইকটু পর নিজেকে সামলে নিয়ে শুধু বললাম,
”হু, পেরেছি।“
“এতক্ষন লাগলো চিনতে? তুমি কত্ত খারাপ হয়ে গেছ!”
“আসলে চিনতে পারলেও বলতে পারছিলাম না!”
“মানে!?”

মানে অনেক কিছু। সেই অনেক কিছু বোঝানোর ভাষা আমার ছিল না। মিথ্যে করেই তাই বললাম,
"মানে কিছু না! আমি রুম এ যাই, পড়তে হবে।"

অরনী আপু মিথিলার পাশেই বসা ছিল, রুমে যাওয়ার সময় বেশ দূর থেকেই স্পষ্ট শুনতে পেলাম, "স্ক্রু ঢিলা ছেলে ও একটা! হাহাহাহা!" জবাবে খুব সম্ভবত কিছুই বলে নি মিথিলা। পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম অবাক চোখে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে ও!

এভাবে প্রায় তিন বছর পার হয়ে গেলো। দূর থেকে ওকে দেখতাম লুকিয়ে লুকিয়ে।কখনো সে আমার সামনে পড়ে গেলে হয়ত কথা হত। কিন্তু আমাদের কথোপকথন কখনোই তিন-চার লাইনের সীমাখানি অতিক্রম করতে পারত না। ক্রমে ক্রমে অস্থিরতা বাড়তে থাকলো আমার মধ্যে।

ওহ, মাঝখানে আমার এস.এস.সি পরীক্ষাটাতে খুব বেশি ভালো করতে পারি নি আমি। প্রায় দিনরাত বই নিয়ে পড়ে থাকা একটা ছেলের এর চেয়ে বেশি প্রত্যাশা থাকতেই পারে। কিন্তু নাহ! সবার আশা যে পূরণ হতে নেই! এর পর প্রথম সারির শেষ দিকে থাকা একটা কলেজে ভর্তি হলাম আমি! এবারো প্রতিষ্ঠানটি সরকারিই ছিল!!

কলেজে ভর্তির পর মোবাইল ফোন কিনে দেওয়া হল আমাকে। একদিন সাহস করেই ওর নাম্বার চেয়ে বসলাম! নাম্বার দিয়ে দিল সে, অনেকটা যেন খুশি হয়েই! কিন্তু ওকে ফোন করার মত সাহস হচ্ছিল না আমার।

ওর নাম্বার ওপেন করে পড়ার টেবিলটাতে বসে থাকতাম ঘন্টার পর ঘন্টা, কিন্তু কল বাটন আর চাপা হত না! এভাবে আরো মাস দুয়েক পার হয়ে গেলো। অর্ধেক দিন আমার কাটতো তার ভাবনায়,আর বাকি অর্ধেক দিন কাটাতাম পড়াশোনার ব্যর্থ প্রচেষ্টায়।

কিন্তু একদিন রাতে হঠাৎ করেই ফোনটা তাকে করেই ফেললাম। “হ্যালো, কে?”
“আমি রিহান! কেমন আছো?”
“উফ, ভালো! এতদিনে ফোন করলা তুমি! কেমন আছো!?”
“ভালো! আচ্ছা তোমার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো অনেক পছন্দ না?”
“হুম! কিন্তু হঠাৎ এটা আস্ক করতেসো যে!?”
“ওর একটা স্কেচ আর্ট করসিলাম, তুমি নিবা!?”

অনেক সাহস করেই ওকে ফোনটা করেছিলাম, তবে কি বলব তা চিন্তা করে রাখিনি! কিন্তু তাই বলে যে এরকম নির্বোধ একটা মিথ্যা কথা বলে ফেলবো কখনো ভাবিনি! কথাটা বলে ফেলার পর আমি বুঝতে পারলাম যে কি বলে ফেলেছি আমি!!

খুব অবাক হল সে, হওয়ারই কথা! খুশিও হয়েছিলো নিশ্চিত ভাবেই!

“আল্লাহ্‌! তাই!? নিবো না কেন!? তুমি কবে দিবা!?”

মহা টেনশানে তখন আমি! কিন্তু সেই মুহূর্তের জন্য টেনশানটাকে চেপে রেখে বললাম,
“পরশু? কাল কলেজ খোলা তো! আর পরশু তো শুক্রবার। ওইদিন নিতে পারবা তুমি?”
“হুম! অবশ্যই!”
ফোন রেখে দিলাম ইকটু পর। মিনিট দশেক কথা হয়ে গেলেও আমার মাথায় তখন চিন্তা শুধু একটাই! রোনালদোর স্কেচ!যেভাবেই হোক কিছু একটা করতেই হবে! কিন্তু কিভাবে?

মোটামুটি একটা প্ল্যান দাঁড় করিয়ে ফেললাম মিনিট দশেকের মধ্যেই,যার প্রথম স্টেপ ছিল অর্ণব ভাইয়ার ল্যাপটপ চুরি করা!

ভাইয়া দরজা খুলেই ঘুমায়, তাই খুব বেশি কষ্ট হল না কাজটা করতে! ল্যাপটপটা নিয়ে আমার রুমে আসলাম। মামার বাসাখানি ওয়াই-ফাই করা থাকায় খুব সহজেই ইন্টারনেট থেকে রোনালদোর ভালো কিছু ছবি সেভ করে নিয়ে আমার মোবাইল এ রাখলাম! তারপর ল্যাপটপ এ ছবিগুলো থেকে একটা দেখে স্কেচ আঁকার চেষ্টা করছিলাম!

প্রায় রাতভর প্র্যাকটিস করলাম, শুরুর দিকে একদমই হচ্ছিলো না, কিন্তু রাত ঘনিয়ে আসতে আসতে টের পেলাম বেশ ভালোই হচ্ছিলো আমার আঁকা!

রাত যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন ডিলিট করে দিলাম ছবিগুলি ল্যাপটপ থেকে। তারপর যেখান থেকে এনেছিলাম সেখানেই আবার রেখে আসলাম ওটাকে, সম্পূর্ণ নিরাপদে!

সকালে ছবিগুলি একটা দোকান থেকে প্রিন্ট করিয়ে আনলাম বেশ বড় সাইজের একটা কাগজে। দুই কপি প্রিন্ট নিলাম। একটা কালার সহ আর আরেকটা প্রিন্ট সাদাকালো! তারপর কিনলাম দুইটা আর্ট পেপার আর একটা করে HB,2B আর 4B পেন্সিল।

বাসায় ফেরার সময় ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখতে থাকা অরনী আপু ভুরু কুঁচকে তাকালেও সে ব্যাপারটাকে পাত্তা দিলো না তেমন একটা!

কলেজে গেলাম না সেদিন। এমনিতেও তেমন একটা দরকার পড়ে না যাওয়ার, তবুও নিয়মিত ক্লাস করতাম আমি; যদিও অধিকাংশ ক্লাসমেটরাই ক্লাস না করে ঘুরে বেড়াত বিভিন্ন জায়গায়!

যাই হোক,রুমে ফিরে ছবি আঁকতে লেগে গেলাম আমি! প্রিন্ট করে আনা ছবিটা দেখে ঠিকভাবে আঁকার প্রচন্ড চেষ্টা আর ইরেজার এর চূড়ান্ত সদ্ব্যবহারের পর বিকালের দিকে টের পেলাম বেশ ভালোই এঁকেছি আমি!

কিন্তু নাহ,তবুও পুরোপুরি সন্তুষ্ট না আমি। মিথিলাকে দেওয়ার জন্য আরো পারফেক্ট চাই!
তাই আরেকবার ছবিখানা আঁকলাম আরেকটা আর্ট পেপার এ! এবারে অনেকটাই ফ্রেশ আর আরো কিছুটা সুন্দর করে আঁকলাম আমি! রাত ৯টার দিকে আমি টের পেলাম যে মিথিলাকে দেওয়ার মত কিছু একটা সৃষ্টি করতে পেরেছি আমি!


পরদিন সকালে ফোন করলাম তাকে। ওর বাসার সামনে আমাকে যেতে বলল মিথিলা। স্কেচটা দিলাম ওকে। ভীষণ খুশি হল মিথিলা! অনেকবার “থ্যাঙ্ক ইউ” বলল সে! নিঃসন্দেহে সেটি ছিল আমার জীবনের অতি সামান্য সংখ্যক সার্থক মুহূর্তগুলির একটি!

এরপর মাঝেমধ্যেই কথা হত আমাদের। মিথিলাই ফোন করত। আর আমি শুধু দিনরাত ওর ফোনের জন্য অপেক্ষা করতাম!

এভাবেই আরো কয়েকমাস কেটে গেলো। ধীরে ধীরে অনেক বদলে গেলাম আমি। বদলে গেলো আমার চুলের স্টাইল, পোশাক-আশাক আর বেশভূষা! নিজেকে অনেকটাই ঘুছিয়ে নিলাম আমি।
এরপর বসন্তবরণের দিন ওকে আমার সাথে ঘুরতে বেরোবার জন্য বললাম! আমার সাহস সেই সময়ে আকাশচুম্বী! আকাশচুম্বি সেই সাহসে মিথিলাও বেশ ভালোভাবেই বাতাস দিচ্ছিলো! আমার সাথে ঘুরতে বেরোবার জন্য রাজি হল সে!

সেদিন লাল রঙের শাড়িতে অসম্ভব সুন্দর লাগছিলো মিথিলাকে। তার রুপের ব্যাপারে বিধাতা যেন প্রচন্ড বাড়াবাড়িই করে ফেলেছে! ওর চোখ দুটি থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না আমি। বারবারই রবিঠাকুরের সেই লাইনদুটি মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল,

“প্রহর শেষের আলোয় রাঙা, সেদিন চৈত্র মাস;
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।”

রিক্সায় করে আর পায়ে হেঁটে সেদিন অনেক ঘুরলাম আমরা। ফিরে এলাম প্রায় চার ঘন্টা পর।রিকশায় করে মিথিলাকে ওর বাসার সামনে নামিয়ে দেওয়ার পর ওকে বললাম,
“একটা কথা বলতে চাই, বলব?”
“উহু, বইলো না! আমি জানি তুমি কি বলবা! ওইটা তোমাকে আগে বলতে দিব না আমি! আমি বলব আগে,আমি! কিন্তু এখন না!”

অতটুকুই যথেষ্ট ছিল আমার বুঝে নেওয়ার জন্য,কখনোই হয়ত দরকার ছিল না এর চেয়ে বেশি কিছু বলার!!

পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ তখন আমি!! প্রচন্ড খুশির বহিঃপ্রকাশটাকে অনেক কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করে শুধু বললাম,
"অপেক্ষা করবো আমি!"

মৃদু হেসে সেদিনের মত বিদায় জানালাম তাকে। তখন দ্বিতীয়বারের মত মনে হল ,যে “আমি আর আমি নাই!”

এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ফোনে কথা হত আমাদের। কথা হত রোজ ঘটে যাওয়া খুঁটিনাটি সব বিষয় নিয়ে, রাত শেষ হয়ে ভোর হয়ে যেত, কিন্তু কথার ফুলঝুড়ি ফুরোতে চাইতো না! একদিন রাতে সে বলেই ফেলল “ভালোবাসি”।

সব কিছু খুব সুন্দরভাবেই চলছিলো আমাদের। আমরা কথা বলতে শুরু করলাম আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলি নিয়ে। মিথিলা চাইতো খুব বড় একটা কিছু হই আমি ভবিষ্যতে। আমাকে ভালো করে পড়াশোনা করতে বলত সে।আমরা কথা বলা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিলাম। খুব মাঝেমধ্যে দেখা হত আমাদের; আর কথাও খুব একটা হত না।

দিনরাত বই নিয়ে বসে থাকতাম আমি। পড়াশোনা হয়ত খুব একটা খারাপ হত না, কিন্তু মিথিলার ভাবনাতেই আমি পরে থাকতাম তার চেয়ে বেশি সময় ধরে! পড়তে পড়তেই হঠাৎ হারিয়ে যেতাম মিথিলায়......

জ্যামিতির উপবৃত্তের দিকাক্ষ দুটিকে মনের অজান্তেই বক্ররেখায় পরিণত করে ফেলতাম আমি। আর আমার হাতের ছোঁয়ায় বক্ররেখা দুটি থেকে ক্রমেই চিকন ডালপালা গজিয়ে কখন যে সেটা মিথিলার চুলের রেখাচিত্রে পরিণত হত,তা কখনোই টের পেতাম না! আর তারপর সেই উপবৃত্তখানির ভিতর ক্রমেই চিত্রায়িত হতে থাকত তার টানা দুটি চোখ,ছোট খাড়া নাক আর চিকন দুটি ঠোঁট! আমার খাতাগুলির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় শুধু মিথিলা আর মিথিলা!

প্রিটেস্ট-টেস্ট আর মডেল টেস্ট গুলিতে ধীরে ধীরে ভালো থেকে আরো ভালো করতে থাকলাম আমি, ভালোই চলছিলো সবকিছু। পড়াশোনা, প্রেম আর কল্পনার জগত মিলিয়ে ভালোই কাটছিলো জীবন।

কিন্তু সবাইকে তো আর বেশিদিন ভালো থাকা মানায় না, আর আমাকে তো একদমই না! এইচ.এস.সি পরীক্ষার সময় ফিজিক্স পরীক্ষার আগে অসুস্থ হয়ে পড়লাম আমি। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষাটি আমার দিতে হয় ১০২ ডিগ্রী জ্বর নিয়ে। দ্বিতীয় পত্র ভালোভাবে দিতে পারলেও যথেষ্ট ছিল না সেটা। বাকি সব পরীক্ষা খুব ভালো করে দিতে পারলেও ঐ ফিজিক্সটাই অবিরতভাবে পোড়াচ্ছিল আমাকে...

পরীক্ষা শেষ হল আমার। কিন্তু তারপরও কেনো জানি আমাকে খুব বেশি সময় দিত না তখন মিথিলা। সব সময়ই কোনো না কোনো কাজে সে ব্যস্ত থাকতো। একদিন ও বলল আমাকে ভার্সিটি অ্যাডমিশন পর্যন্ত পড়াশোনা সিরিয়াসলি করতে!!

মেনে নিলাম আমি। বিশ্বাস ছিল, নিশ্চয় আমার ভালোই চাবে সে! আমাদের কথাবার্তার পরিমাণ একদমই কমে গেলো আবারো। পড়াশোনায় মনোযোগী হলাম আমি আবারো। কিছুদিন পরে রেজাল্ট দিল। ফলাফল যা হওয়ার তাই হল।

ঐ এক বিষয়ের জন্যেই আমার পছন্দের কয়েকটি ভার্সিটিতে পরীক্ষা দিতে পারলাম না আমি। মিথিলার কাছ থেকে একটা মানসিক সাপোর্ট আশা করছিলাম আমি,কিন্তু আশানুরূপ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে।

ব্যাপারটাকে পাত্তা দিলাম না আমি। ভাবলাম সে হয়ত আমার উপর ভরসা রেখেছে,তাই বিষয়টাতে এতটুকুও ভেঙে পড়েনি সে! হয়ত সে বিশ্বাস করে যে আমি পারবোই!
নিজেকে বোঝাতে লাগলাম আমি! কি হবে আফসোস করে! বাকি অপশন গুলির জন্যেই পড়তে থাকলাম আমি। মিথিলার জন্যে আমি নিজেকে একটা অবস্থানে নিয়ে যাবোই, সবকিছুর পরও আমি ছিলাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।


দিনগুলি কঠিন ছিল খুব। ভীষণ চাপ অনুভব করছিলাম। কিন্তু সেই সময়টাতে আমাকে সাপোর্ট দেন আমার মামি, তার দৃষ্টিতে অনেক ভালো একটা ফলাফলের পর তখন আমি চেষ্টা করছিলাম সবচেয়ে ভালো ভার্সিটিটাতে পড়ার। ধীরে ধীরে আমিও ব্যাপারটা বিশ্বাস করে হয়ে উঠতে থাকি আত্মবিশ্বাসী।

আমার খাওয়া-দাওয়া, ঘুম সবকিছুর খেয়াল তিনি রাখতেন। কঠিন দিনগুলিকে অতটা কঠিন হতে দিলেন না আমার মামি। প্রিয় মানুষটা আরো প্রিয় হয়ে উঠতে থাকলো আমার। জীবনের অধিকাংশ সময় অনেকটা একাই কাটিয়ে দেয়া আমি হঠাত করেই অভ্যস্ত হতে থাকলাম মামির মায়া-মমতায়।

কিন্তু তবুও মিথিলাকে মিস করতাম। ও এমন করছিলো কেন?

দেশের সবচাইতে ঐতিহ্যবাহী,অনেকের প্রথম পছন্দ আর আমার দ্বিতীয় পছন্দের ভার্সিটিটাতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার দিন আমাকে মামি নিয়ে গেলেন তাদের গাড়িগুলোর একটিতে করে।

আল্লাহ্‌ আমাকে এবার আর নিরাশ করলেন না, জীবনের শ্রেষ্ঠতম পরীক্ষাটা দিলাম আমি সেদিন। পরীক্ষা শেষে বের হয়ে মামির চেহারায় দেখতে পেলাম প্রচন্ড টেনশানের ছাপ; উনাকে আশ্বস্ত করলাম আমি, নাম-রোল ঠিকভাবে লিখে থাকলে চান্স আমি পাবোই!!

অসম্ভব খুশি হলেন তিনি। আমাকে লাঞ্চ করাতে নিয়ে গেলেন শহরের সবচেয়ে অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলির একটিতে। খাওয়া শেষে মিষ্টি কিনে নিয়ে বাসায় ফিরার জন্য গাড়িতে উঠলাম আমরা।

কিন্তু নাহ, বাসায় ফিরতে পারলাম না আমরা। কারণ আমি ছিলাম সেই মানুষগুলির একজন যারা পৃথিবীতে না আসলে পৃথিবীটা হত অনেক সুন্দর একটা স্থান।

ট্র্যাফিক সিগন্যাল পরে যাওয়ার আগেই মোড় পার হতে চাওয়ার নেশায় আমাদের গাড়িটাকে পিছন থেকে ধাক্কা মারলো একটা বাস। হাসপাতালে নেওয়া হল আমাদের। আমি বেঁচে গেলাম সেই যাত্রায়, আহত হলেও তা খুব একটা গুরুতর ছিল না।

কিন্তু চলে গেলেন আমার মামি। অনেক বেশি ব্লিডিং হয়ে গিয়েছিল,বাঁচানো সম্ভব হয় নি তাকে। আরেকটা খুন করলাম আমি।

আইন সেই খুনের স্বীকৃতি না দিলেও অন্ততপক্ষে পরিবার থেকে আরেকটা খুনের স্বীকৃতি পেয়েই গেলাম আমি।

দাফনের আগে শেষ একটা বারের জন্য দেখতে চেয়েছিলাম মামিকে ইকটু কাছ থেকে, কিন্তু সেই সুযোগ দেওয়া হয় নি আমাকে। দূর থেকে দেখছিলাম সব কিছু। কেউ ছিল না আমার পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, মিথিলাও আমাকে দেখে না দেখার ভান করছিল, এড়িয়ে চলল সেদিন সে আমাকে।

নাহ, এবার আর আমাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হল না, মাথা গোঁজার ঠাই আর ক্ষুধা নিবারণের অন্ন দুই-ই আমি পাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার বেঁচে থাকার রসদ যে প্রায় ফুরিয়ে আসছিল!!

আমাকে প্রতি মুহূর্তে ভয়ানক মাত্রার একটা অপরাধবোধ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। পৃথিবীতে সব কিছুই হয়ত মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু বার বার নিজের আপনজনগুলির মৃত্যুর কারণ হওয়াটা একেবারেই মেনে নেওয়া যায় না, পারছিলাম না আমি একটা মুহূর্তের জন্যেও নিজেকে ক্ষমা করতে। কেউ ছিল না আমার পাশে দাঁড়ানোর মত, কেউ না!

মিথিলাকে ফোন করতাম, রিসিভ করত না সে। ওর বাসার সামনে দিনরাত দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি, বাইরে যাওয়ার সময় আমাকে দেখেও পাশ কাটিয়ে চলে যেত সে; আর গাড়ি নিয়ে যখন বের হত, তখন সে গাড়ির জানালাটা লাগিয়ে দিত আস্তে করে। তখনো বুঝতে পারি নি কেন সে এমন করছিল আমার সাথে।

দুই একদিন পর আর ওর বাসার সামনে গেলাম না, দিনরাত ঘুরতাম রাস্তায় রাস্তায়। কখনো বা রাতেও ফিরতাম না বাসায়; বাইরেই কাটিয়ে দিতাম রাতটাও।

এভাবে ৭-৮ দিন কেটে যাওয়ার আমার পর ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দিল,খুব ভালোভাবেই চান্স পেলাম আমি। খুশিটা অনুভব করতে চাচ্ছিলাম আমি,কিন্তু পারছিলাম না। অনেক আগে থেকেই যে আমি হয়ে রয়েছি অনুভূতিশুন্য!

নাহ, এবার আর লুকোচুরি নয়, সোজাসুজি মিথিলার বাসায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। দরজা খুললেন মিথিলার মা, আমার মামির বোন। ভিতরে বসতে বললেন তিনি।

তার ব্যবহারে আমি অবাক হলাম। বাকি সবার মত আমাকে তিনি অপরাধী ভাবছেন না। উল্টো সান্ত্বনা দিলেন তিনি আমাকে! নিশ্চিত হলাম, তিনি আমার মামিরই বোন!
অনেকক্ষণ কথা হল আমাদের। অনেক খুশি হলেন তিনি আমার রেজাল্ট এর কথা শুনে।

এদিকে মিথিলাকে খুঁজছিলাম আমি, কিন্তু সোজাসুজি বলতেও পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেই বললেন তার মেয়ের কথা। মুহূর্তের মাঝে আমার রিক্তপ্রায় পৃথিবীটার রিক্ততা যেন পরিপূর্ণ হয়ে গেল।

লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে মিথিলা,তার ফ্যামিলি একসময় জেনে যায় ব্যপারটা। প্রথমে মেনে নিতে না চাইলেও ছেলে ডাক্তার এবং ফ্যামিলিগত দিক থেকেও ছেলেটার অবস্থান খুব ভালো হওয়ায় একসময় বিষয়টা মেনে নেয় তারা। ছেলেপক্ষের সাথে কথাবার্তা বলে রিসিপশানের ডেট ফিক্স করা হয়েছে আর এক মাস পর। বিয়ের প্রস্তুতিতে
সাহায্য করার জন্য আমাকে বললেন মিথিলার মা!

না করলাম না আমি, সেখানে আর বেশিক্ষণ না থেকে হাসিমুখে বিদায় নিলাম।

সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আমি। কিন্তু তার আগে শেষ একটা বারের জন্য মিথিলাকে দেখতে চাই আমি,খুব কাছ থেকে!!

একটা ম্যাসেজ পাঠাবো তাকে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই লিখেও ফেললাম অনেক কিছু!

“ভেবে সমবময় খুব অবাক হতাম,যে আমার মত একটা অভাগার লাইফেও কিভাবে তোমার মত একটা অপ্সরী আসলো! আমার মত কোনো ছেলেকে কিভাবে এত সহজেই ভালবাসতে পারে তোমার মত একটা মেয়ে!

কিন্তু নাহ, সব জানতে পেরে এখন আর অবাক হচ্ছি না! এটাই তো আসলে হওয়ার ছিল আমার সাথে!

কিন্তু কি দরকার ছিল এমন লুকোচুরি খেলার? আমি তো মেনেই নিয়েছিলাম আমার লাইফের শুন্যতাকে। কেন তুমি মিথ্যে স্বপ্নে আমাকে ভাসিয়ে রাখলে এতদিন?”
নাহ থাক! জানি এ প্রশ্নের উত্তর নেই মিথিলার কাছে! আর কিই বা দরকার আমার উত্তর পাবার! কেনই বা অযথা তাকে বিব্রত করবো আমি!

সম্পূর্ণ লেখাটা কেটে ফেললাম আমি! নতুন করে লিখলাম,
“ দেখা করবা একটা বার? শুধু একবার! এরপর আর কোনোদিন জ্বালাবো না তোমাকে!আমাকে তো দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছ তুমি; বিশ্বাস কর, ঠিক তাই হবে, অনেক দূরে চলে যাবো আমি!
কিন্তু তার আগে একটা বার শুধু দেখা কর? কোনো জিজ্ঞাসা নেই আমার, কোনো কিছুই চাওয়ার নেই তোমার কাছে। একটা বার শুধু দেখতে চাই তোমাকে, খুব কাছ থেকে!”

মেসেজটা পাঠানোর পর খুব অসহায় বোধ করছিলাম নিজেকে। মোবাইলটা সামনে ধরে বসে থাকলাম অনেকক্ষণ। অপেক্ষা শুধু একটা সম্মতির। প্রত্যাশা শুধু একটাবার তাকে মন ভরে দেখার!

মোবাইলটা হাতে নিয়েই একসময় ঘুমিয়ে গেলাম আমি মনের অজান্তেই। ঘুম ভাঙ্গলো ফজরের আযানে। নাহ, রিপ্লাই আসে নি তখনো!

নামাজ পড়লাম। মোনাজাতে কি দোয়া চাইব বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমি। শুধু বললাম, “ আমাকে মাফ করে দিও আল্লাহ্‌! আর যে কিছু করার নেই আমার, আর তো পারছি না!”
সকালে আর অপেক্ষা করে থাকতে না পেরে ফোন করলাম মিথিলাকে, কিন্তু নাহ, রিসিভ করলো না সে।
একবার দুইবার, তিনবার......... সবশেষে ৬৮তম বারে ফোনটা কেটে দিলো সে। আমিও জিরিয়ে নিলাম ইকটু!

মিনিটখানেক পর একটা রিপ্লাই আসলো, “দেখা করা পসিবল না রিহান, স্যরি।“

ম্যাসেজটা পেয়ে কেনো জানি হেসে উঠলাম আমি! মনে হল যেন আমি জানতাম সে এটাই বলবে!

সমস্যা নেই কোনো, মিথিলার বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। রোদহীন দুপুরটাতে কয়েক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে কোনো কষ্টই হচ্ছিলো না আমার।

দুপুর তিনটার দিকে রিকশায় করে বাড়ি ফিরল মিথিলা। সেদিনও অসম্ভব সুন্দর লাগছিল তাকে। আজকেও সেই লাল জামাটাই পড়েছিল সে, কিন্তু মিথিলার আজকের এই সাজ আমার জন্যে নয়; তার আজকের এই সাজ অন্য কারো জন্য!

কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হল আমাদের। মন ভরে দেখে নিলাম তাকে শেষবারের মত। কোনো কথা হল না আমাদের, চেষ্টাও করলাম না আমি!
বাড়ির ভেতর চলে গেল মিথিলা।

এখন আর কোনো পিছুটান নেই আমার। সকল জাগতিক বন্ধন থেকে আমি মুক্ত। ধীর পায়ে এগোতে থাকলাম আমি আমার গন্তব্যের দিকে।

বিকেল হয়ে গেছে তখন। বসুন্ধরা সিটি পার হয়ে সোনারগাঁও হোটেল এর সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আমি। যান্ত্রিক এই শহরে নিজ নিজ যান্ত্রিক জীবনটাতে অনেক ব্যস্ত সবাই। কোনো ব্যস্ততা নেই শুধু আমার। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখতে লাগলাম আমি অফিসফেরত মানুষগুলিকে। বাসের দরজায় তাদের অনেকেরই ঝুলে থাকা বা ভয়ানক সেই ট্র্যাফিক জ্যাম; খুব একটা খারাপ মনে হচ্ছিলো না দৃশ্যটাকে!

জ্যামের মধ্যেই দু-তিনটে রিকশায় দেখতে পেলাম প্রেমিক প্রেমিকা যুগলকে। আচ্ছা তাদের প্রত্যেকেই কি ভালোবাসার বিনিময়ে চিরকাল শুধু ভালোবাসাই পেয়ে যাবে!?

কিছু ফুল বিক্রেতা শিশুকেও দেখলাম। জীবনের মানেটা খুব স্পষ্ট ওদের কাছে। জটিলতা নেই কোনো! হয়তবা আমার চেয়ে অনেক বেশি ভাগ্যবান তারা! একটা ছোট ছেলের তার হাতে থাকা সবগুলো ফুল বিক্রি করে দিতে পারার পর তার মুখে যে হাসিটা আমি দেখলাম, সেই হাসির মুহূর্তটার চেয়ে “বিশুদ্ধ সুখকর” কোনো মুহূর্তের
উদাহরণ হয়ত দিতে পারবো না আমি!

আবার ফুলগুলো কিনে নেওয়ার সময় গাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানুষটাও হয়ত একইরকম “বিশুদ্ধ সুখকর” একটা হাসিই হেসেছিল!! ফুলগুলো তার ভালোবাসার মানুষটিকে দেওয়ার পর কি খুশিই না হবে সেই মানুষটি! আরেকটি “বিশুদ্ধ সুখকর” মুহূর্ত!

সবার জীবনেই জিনিসটা খুঁজে পেতে থাকলাম আমি; নেই শুধু আমার জীবনেই!

তখন সূর্যাস্ত ঘনিয়ে এসেছে প্রায়। শেষ বারের মত নিজের মেধার সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটিয়ে সবার চোখ এড়িয়ে ছাদে পৌছালাম আমি,শহরের উচ্চতম ভবনটির ছাদ!! ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে ছাদের শেষ প্রান্তে পৌঁছালাম আমি......

বাতাসে ভাসছি আমি। ভাসছি বললে হয়ত ভুল হবে, 9.8 ms-² ত্বরণে ভূ-পৃষ্ঠের দিকে ছুটে চলেছি আমি। এক মুহূর্তের মাঝেই আমার সমগ্র জীবনখানি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার!

হঠাৎ করেই একটা ঘ্রাণ পেতে থাকলাম আমি, খুব সুন্দর একটা ঘ্রাণ! পৃথিবীর কোন ঘ্রাণের সাথেই এটাকে মেলাতে পারছি না আমি! প্রায় অবশ হয়ে যাওয়া চোখটা ধীরে ধীরে খুলে যেতে থাকলো আমার। এত্ত সুন্দর লাগছে কেন সবকিছু!?

দূর থেকে একটা ধোঁয়াটে অবয়ব দেখতে পাচ্ছি আমি। আকুল হয়ে অবয়বটার পানে ছুটছি আমি।

মা? হ্যাঁ, তাই তো! সামনে আমার মাকে দেখতে পাচ্ছি আমি! হাত বাড়িয়ে ডাকছেন তিনি আমাকে!!

মায়ের অনেক কাছে এসে পড়েছি আমি, আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত! বেগ বাড়ছে আমার,ক্রমেই আরো কাছে,আরো অনেক কাছে চলে আসছি আমি আমার মা’র!!

তাহলে কি এটাই আমার সেই বিশুদ্ধ সুখকর মুহূর্ত?
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • জোনাইদ  আহমেদ
    জোনাইদ আহমেদ খুব ভালো লাগলো।
    শিরোনামটা বেশ ব্যতিক্রম।প্রতিটি খন্ডই খুব পরিপাটি।
    ভালো লাগা সাথে ভোট রেখে গেলাম।
    আমার পাতায় নিমন্ত্রণ।
    প্রত্যুত্তর . ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫
  • রবিউল ই রুবেন
    রবিউল ই রুবেন আনকমন গল্প ভালো লাগল। শুভকামনা ও ভোট রইল। সময় পেলে আমার লেখা পড়ার আমন্ত্রণ রইল।
    প্রত্যুত্তর . ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫