বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৩৮টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৪৯

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১৬ / ৩.০

অধরা সৌরভ

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

স্বপ্নে দেখা বিভীষিকা

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

স্বপ্নের সিঁড়ি ভেঙে...

আমার স্বপ্ন ডিসেম্বর ২০১৬

গল্প - এ কেমন প্রেম? (আগস্ট ২০১৬)

মোট ভোট ১৮ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৪৯ নিভৃতে

ফাহমিদা বারী
comment ১৭  favorite ১  import_contacts ৫৪৯
এক
বর্ষাকাল আসলেই তিন গাছ ভর্তি চালতা নিয়ে রাহেলা বেগম মহা ঝামেলায় পড়ে যান। এখানে চালতা ওখানে চালতা। সারা বাড়ি তখন চালতাময় হয়ে যায়। ছেলেপুলেরও চালতার আচার খেতে খেতে জন্মের অরুচি ধরে গেছে। হাটে নিয়ে গিয়ে বেচে আসলেও দুটো পয়সা ঘরে আসে। তা সেটা বিক্রি করতে যাবে টা কে? নবাবের দুলাল ছেলে তার চালতা বিকোতে গিয়ে সম্মানের হানি করবে না। আর খোদ নবাব সাহেবের সামনে তো এমন কথা মুখেও আনা যাবে না। অগত্যা পড়ে থাকা চালতা গুলোকে পলিথিনের প্যাকেটে পুরে প্রতিদিন পাড়া বেড়াতে বের হন রাহেলা বেগম। প্রতিবেশিও চালতা পেলে খুশি হয়, আর তারও কদরটা দ্বিগুণ বাড়ে।
আজ বিকেলেও গোটা আষ্টেক চালতা প্যাকেট বন্দী করে, গায়ে নতুন কেনা তাঁতের শাড়িটা কুচি করে পড়ে রাহেলা বেগম সবে বাড়ির বাইরে পা দিতে যাবেন... এমন সময় টুসু’র উচ্চস্বরে আওয়াজ শোনা গেলো। হাঁপাতে হাঁপাতে কোথা থেকে যেন ছুটে আসছে।
‘ও, মা! তুমি কি পিয়ালী চাচীগো বাড়িত যাবা আজ? খবরদার! এখন পিয়ালী চাচীগো বাড়িত যাইয়ো না! ও বাড়িত আজ মেলা গণ্ডগোল!’
স্যাণ্ডেলটা পা থেকে খুলে যথাস্থানে রেখে দিয়ে অবাক হয়ে টুসুর দিকে চাইলেন রাহেলা বেগম। আজ যে তিনি ঐ বাড়িতেই যাওয়ার নিয়ত করেছেন তা এই টুসু কী করে জানলো? পড়াশুনার নামে লবডঙ্কা, সকাল থেকেই তার ড্যাং ড্যাং করে পাড়া বেড়ানো শুরু হয়। তেরো বছরের ডাঙর হয়ে গেছে, তবু এ কাজে কোনো কামাই নেই। মা ইতিমধ্যে কোন কোন বাড়ি ঘুরে এসেছে আর কোথায় কোথায় যেতে বাকি আছে, তা এই মেয়ের নখদর্পণে।
পিয়ালীদের বাড়িতে কী হয়েছে তা টুসুর কাছে বিস্তারিত শুনলেন রাহেলা বেগম। সকাল থেকেই নাকি আজ স্বামী-স্ত্রীর খিটখিট শুরু হয়েছে। দুপুরের পর তা তুমুল আকার ধারণ করেছে। ওদের বাড়ির উঠোনভর্তি নাকি মানুষ।
এমন খবর শুনে রাহেলা বেগম উত্তেজিত বোধ করলেন। এই খবর তার একার পক্ষে হজম করা সম্ভব না। চালতা রেখে খালি হাতেই বের হলেন তিনি। অন্যরা জেনেছে কিনা সেটাও তো জানতে হবে! এখন কী তার বসে থাকলে চলে!
রুনু আর সবুজের মা’কে রুনুদের বাড়ির উঠোনেই পাওয়া গেলো। তারাও ইতিমধ্যে জেনে গেছে। এটা নিয়েই আলাপ-আলোচনা চলছে।
‘ও বু, চলেন যাই ঐ বাড়িত থিইক্যা ঘুইর্যা্ আসি। এহানে বইস্যা কিছুই তো বুঝা যায় না। দু’জন তো অনেকদিন ভালাই ছিল। আবার লাগলো ক্যানে?’ রুনু’র মা রাহেলা বেগমকে আসতে দেখে বলে।
সবুজের মা’র ভারী মুখ কাটা। কাটকাট করে জবাব দেয়,
‘ঐ পিয়ালীই সব নষ্টের গোড়া! কিছু হইলেই বাপের বাড়ির পথ দেহে। মাইয়্যামাইনষ্যের গায়ের চামড়া হওন লাগে গণ্ডারের মতোন। এত্তো অল্পে ফোসকা পইড়লে চলে নি?’
উত্তরে রাহেলা বেগম একটা কিছু বলেন। আলোচনা তুমুল বেগে এগিয়ে চলে। তাদের আলাপ করতে দেখে আশেপাশের বাড়ির আরো দু’চারজন এসে যোগ দেয় তাদের সাথে। কেউ কেউ মৃদুস্বরে একটু আহা উহু করে,
‘ইস, এই সেদিনই তো বাচ্চাটা হইলো। এহনই আবার কী নিয়া গণ্ডগোল শুরু হইলো?’
অনুমান আর আন্দাজে চলতে থাকলো সমান তালে ঢিল ছোড়াছুড়ি। এক পশলা বৃষ্টি শেষে প্রকৃতি খানিকটা যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। নিস্তরঙ্গ বর্ষার বিকেলটা এমন একটা কুড়মুড়ে বিষয়ের অবতারণায় একেবারে জমজমাট হয়ে ওঠে।

দুই
স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া এই জগতের নতুন কোনো ঘটনা নয়। কথায় আছে, পেয়ালা-পিরিচ একত্রে রাখলে ঠোকাঠুকি বাঁধবেই। সেই ঠোকাঠুকির জন্য কারণ অনুসন্ধান করতে যাওয়াই বৃথা।
সমস্যা কার ঘরে হয় না? কিন্তু এই পিয়ালী আর শাজাহানের সমস্যাটা আর দশজনের সমস্যার মতো না। বিয়ের পর থেকে এরা ঝগড়া করেছে বেশি, সংসার করেছে কম। একেকবার ঝগড়া শুরু হলে সেটা দিনভর চলে। দিন গড়িয়ে রাত নামে তবু ঝগড়া থামে না। শেষমেষ পরেরদিন সকালবেলা পিয়ালীর ভাই এসে তাকে তার বাপের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে দিন দশেক থেকে মাথা ঠাণ্ডা করে আবার পিয়ালী ফিরে আসে। বেশীরভাগ সময় সে একাই ফিরে আসে, মাঝে মাঝে তার বাবা বা ভাইও এসে রেখে যায়। শাজাহান কখনো নিতে যায় না।
মাত্র দু’বছর হলো বিয়ে হয়েছে এই গ্রামের ছেলে শাজাহানের সাথে পাশের গ্রামের মেয়ে পিয়ালীর। শাজাহান ছোটখাট কাপড়ের ব্যবসায়ী। শহরতলী থেকে অল্প দামে কাপড় কিনে সপ্তাহে দু’দিন শহরের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। গ্রামে বাপের রেখে যাওয়া কিছু জমি জিরাতও আছে। সেগুলো থেকে ফসলপাতি খারাপ আসে না। বাবা গত হয়েছে প্রায় সাত বছর হতে চললো। বৃদ্ধা মা ছাড়া গোটা দুনিয়াতে আর কেউ নাই। পিয়ালীর বাবা’র সাথে শাজাহানের ব্যবসা সূত্রে পরিচয়। পিয়ালীর বাবাও একই কাজ করেন। সহজ সরল ছেলে শাজাহানের সততা আর বিনয়ে মুগ্ধ হয়ে পিয়ালীর বাবা তার মেয়ের জন্য শাজাহানের মার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। পিয়ালীও ঘরকন্নার কাজ জানা আপাত শান্ত সুশীলা মেয়ে। তাকে অপছন্দ হওয়ার কোনোই কারণ ছিল না। বিয়েটা হয়ে যাবার পরে সবাই ভেবেছিলো, এবার শাজাহান বউয়ের আঁচলের নীচে বাঁধা পড়লো। বৃদ্ধা বিধবা মায়ের বুঝি কপাল পুড়লো এবার। দু’জনের ভাবসাব দেখে এমনটা মনে না হওয়াই ছিলো অস্বাভাবিক। সারাক্ষণ কুটুর কুটুর করে দু’জন চড়ুই পাখির মতো গল্প করে, আর ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে এদিক ওদিক যায়। এই সিনেমা, এই শহরে কেনাকাটা...লেগেই আছে। বৃদ্ধা মায়ের অযত্ন করতো না শাজাহান বা তার বউ। কিন্তু তাদের মাখামাখি ছিলো দেখার মতো।
এদিকে শাজাহানের মার দিক থেকেও কোনো সমস্যা ছিলো না। সবাই ভেবেছিলো, কানে খাটো চোখে কম দেখা বুড়ি বুঝি এবার বউএর দোষ ধরার জন্য সচল হয়ে উঠবে। কিন্তু নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে বউ শাশুড়ির কোনো ঝামেলাই বাঁধলো না। এই দুটিতেও ভারী মিল। পিয়ালী শাশুড়ির দেখভাল করে, সময়মতো খাবার খাওয়ায়। রোজ বিকেলে দাওয়ায় বসে শাশুড়ির পাকা চুল বেছে দেয়, মাথায় তেল দিয়ে বেণী গেঁথে দেয়।
নিন্দুকের দল হতাশ হয়ে ফিরে যায়। তবে তো কিছুই ঘটলো না!
কিন্তু ঘটলো একদিন। বিয়ের তিন মাসের মাথায় এক বিকেল বেলা।
শাজাহান সেদিন শহর থেকে একটু সকাল সকাল ফিরেছে। পিয়ালী তার তদারকিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এমন সময় শাজাহান কিছুটা অন্যমনষ্ক ভাবে বলে উঠলো,
‘আইজ তোমার ভাই আসছিলো আব্বার সাথে। তোমার ভাইয়ের কি পায়ে একটু সমস্যা আছে নি? কেমুন যেনো খুঁড়াইয়্যা খুঁড়াইয়্যা হাঁটে দ্যাখলাম।’
‘আমার ভাইএর পায়ের সমস্যার কথা তুমারে কে কইলো? আমি আইজতক জানলাম না। তুমি একদিনে জাইন্যা গেলা?’
‘আরে চেতো ক্যান? না থাগলে নাই। আমার মনে হইলো তাই কইলাম।’
‘না, তুমি ইচ্ছা কইর্যাু কইছো। আমার ভাই তোমার কী ক্ষতি করছে?...’
পিয়ালী কেঁদে কেটে হুলুস্থুল একটা কাণ্ড ঘটায়। তুচ্ছ কারণ। শাজাহান প্রথমে কিছুক্ষণ শান্তভাবে বউকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পিয়ালীর বাড়াবাড়ি দেখে আর মাথা ঠিক থাকে না। রেগেমেগে বলে ওঠে,
‘আমি কইলাম টা কী? এট্টু কথায় এতো গোসসা! ভাইই সব? স্বামী কিছুই না? তাইলে আর এই বাড়িত থাইক্যা কী করবা?...’
ব্যস, শুরু হয়ে গেলো মহাপ্রলয়। শাজাহানের বৃদ্ধা মা বার কয়েক থামানোর চেষ্টা করতে এসে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলেন। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অনর্থক ঝড় বয়ে গেলো। পরদিন পরিস্থিতি সামাল না দিতে পেরে পিয়ালীর ভাইকে ডেকে পাঠানো হলো। সে এসে তার বোনকে নিয়ে যায়।
দিন সাতেক পরে পিয়ালী একদিন নিজেই এসে হাজির হয়। যেনো কিছুই হয়নি এভাবে বাড়ির কাজকর্ম শুরু করে। সময়মতো সব কাজ করে যায় আগের মতোই। শাজাহানও এমন ভাব করে যেনো পিয়ালী কোথাও গিয়েছিলোই না, বরাবরের মতোই এখানে আছে।
কিন্তু সব আঁচড়ই কিছু না কিছু দাগ ঠিকই ফেলে যায়। শাজাহানের মা আর আগের মতো সহজ হয় না পিয়ালীর সাথে। তার ভালোমানুষ ছেলে কী এমন দোষের কথা বলেছিলো যে, বউ এভাবে খিঁচড়ে উঠবে? মন থেকে তিনি আর পিয়ালীকে ক্ষমা করতে পারেন না। পিয়ালী সেটা বুঝতে পারে। শাশুড়ির মন রক্ষার জন্য আগের চেয়েও বেশি যত্ন আত্তি করে। কিন্তু বিশেষ কিছু লাভ হয় না। কোথায় যেনো একটা সুর কেটে যায়।
এভাবে দু’তিন মাস ভালোই চলে। তারপর আবারো একদিন ঝড় ওঠে। ঝড়ের উৎপত্তি আগের মতোই। পিয়ালীর বাপের বাড়ির কিছু একটা নিয়ে বলা শাজাহানের কোনো একটা কথার সূত্র ধরে আগের মতোই তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায় ওদের সংসারে।
পাড়া প্রতিবেশি থেকে শুরু করে পিয়ালীর বাপের বাড়ির লোকজনেরও কানে আসে সব কথা। ঘুম হারাম হয়ে যায় পিয়ালীর বাবা-মা’র। দু’দিন পরপর এ কী অশান্তি!

তিন
পিয়ালীর বাবা ফজর আলী ফজরের ওয়াক্ত থেকেই উঠে বসে আছেন। পিয়ালীর মা আর ভাইয়ের মুখও থমথমে। গতকালই তারা ঐ বাড়ির খবর শুনেছেন।
এতোদিন পর্যন্ত মনে হয়েছে বাচ্চা হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কীসের কী! অথচ কেন যে প্রতিবারে এতো বাড়াবাড়ি হয়ে যায় এদের, কিছুই তারা বুঝতে পারেন না। সামান্য কথার পিঠে কথা, তাও আবার অতি তুচ্ছ বিষয়। ধরলে ধরা, না ধরলে কিছুই না। পিয়ালী এ বাড়িতে আসার পরে ফজর আলী শাজাহানকে ডেকে এনে কথা বলতে চেয়েছেন। নিজে শাজাহানের সাথে দেখা করতে চেয়েছেন। পিয়ালী কোনোটাতেই রাজি হয়নি। মেয়েকে বোঝানোরও চেষ্টা করেছেন তারা। পিয়ালী কিছুই বলেনি। শুধু ঘাড় গোঁজ করে রেখেছে।
পিয়ালীর ভাইয়ের মাথা গরম। তার সব রাগ গিয়ে পড়েছে দুলাভাইয়ের উপর। দু’দিন পরে পরে তার জন্য পিয়ালী’বু রাগে দুঃখে বাপের বাড়ি চলে আসে। দু’একবার সে এটা নিয়ে উচ্চবাচ্যও করেছে। পিয়ালী এসে ঠাস করে ভাইএর গালে চড় দিয়ে বলেছে,
‘খবরদার যদি হেরে নিয়্যা কিছু কইছোস তরে কইলাম পুঁইতা ফেলুম।’
পিয়ালীর বাবা-মা আর ভাইয়ের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। একান ওকান হয়ে তাদের কানেও এই কথা এসেছে যে, বাপের বাড়ি সন্মন্ধে বলা মন্দ কথা সইতে না পেরেই পিয়ালী আর শাজাহানের ঝগড়া বেঁধেছে। অথচ, বাপের বাড়ি এসেই পিয়ালীর ভোল যায় বদলে। এখানে এসে সে শাজাহানের সম্পর্কে একটা কথাও শুনতে পারে না। চিন্তায় পড়ে যান তারা। এর কী সমাধান? সমস্যার মূলেই তো ঢোকা যাচ্ছে না। কিন্তু সমাধান তো একটা কিছু করতেই হবে। হঠাৎ হঠাৎ এমন হলে একটা কথা ছিলো। এ তো নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনায় দাঁড়িয়ে গেছে। পাড়া প্রতিবেশি বন্ধু স্বজন এমনকি হাটে বাজারে লোকজন পর্যন্ত এদের ঝগড়া নিয়ে আলাপ আলোচনা করে। এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না।
বেলা দ্বিপ্রহরের আগেই পিয়ালী বাচ্চাসহ একাই চলে আসে। মুখ চোখ থমথমে। একরাতেই চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। বাচ্চাটা কাঁদছে। হয়তো ঠিকমতো খাওয়ানোও হয়নি। পিয়ালীর মা ছুটে গিয়ে বাচ্চাকে কোলে নেন।
ফজর আলী চিন্তিত মুখে তাকিয়ে থাকেন। নাঃ! কিছু একটা করতেই হবে এবার।
পরদিন কাজে না গিয়ে পিয়ালীর বাবা মেয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসেন। শাজাহান বাড়িতে নাই এটা নিশ্চিত হয়েই তিনি সেই বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ান।

চার
‘ও বাপ, আমি কিছু শুনুম না। তোরে আমি আবার বিয়া দিমু।’
‘আঃ মা। কী শুরু করলা! থামো তো কইলাম।’
‘আমি কী শুরু করলাম! ক’ তোরা কী শুরু করলি! আমার নাতিনরে আইনা দে। নাইলে আবার বিয়া কর। হের চেয়ে হাজার গুণ ভালা মাইয়া আইনা দিমু আমি। কথায় কথায় গায়ে হুল ফোটে। এইডা কিমুন স্বভাব! পাড়া প্রতিবেশি কেউ জানতে বাকি নাই। কারো বাড়ির বউই এমুন কথায় কথায় বাপের বাড়ি যায় না। হের স্বভাব ভালা হইলে কী এমুন দুইদিন পরে পরে যাইবার পারতো? হাড় জ্বালানি মাইয়া! লজ্জায় মাথা কাটা যায় আমার।’
মার কথায় অতিষ্ট হয়ে শাজাহান উঠে বাইরে চলে যায়। বাইরে এসে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়। আহা! মা তার বউকেই দোষারোপ করছে! কিন্তু পিয়ালী তো কখনো আগে শুরু করে না। সেই তো পিয়ালীর বাপের বাড়ি নিয়ে এটা ওটা বলে ওর মেজাজ খারাপ করে দেয়। পিয়ালী চটে ওঠে, কিন্তু এটাই তো স্বাভাবিক। সে নিজেও কী এমন পরিস্থিতিতে চটতো না? লোক জানাজানি হওয়ার পিছনে তার নিজের হাতও তো কিছু কম নয়। সেই তো তখন মেজাজ হারিয়ে জোরে জোরে কথা বলা শুরু করে। রাগ নয়, প্রচণ্ড অভিমান হয় তার পিয়ালীর প্রতি। বাবার বাড়ির একটা পোষ্যকে নিয়ে সামান্য কথা বললেও পিয়ালী রেগে ওঠে। তার স্বামীর কোনো তোয়াক্কাই তখন সে করে না। কেন? সে কী পিয়ালীর কেউ নয়?
কিন্তু মা এমন করছে কেন? এতোদিনে একবারের জন্যও তো মা কখনো পিয়ালীর বিরুদ্ধে কিছু বলেনি। বরং তাকেই বউকে এটা ওটা বলার জন্য গালমন্দ করেছে। মা কি সত্যিই তাকে আবার বিয়ে দিতে চায়?
এদিকে পিয়ালীর বাবা-মাও একেবারে বদ্ধপরিকর তারা তাদের মেয়েকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেবেন। দিনের পরে দিন তারা তাদের মেয়েকে এভাবে অত্যাচারিত দেখতে রাজি নন। পিয়ালী এসব শুনে ফোঁস করে ফুসে উঠে,
‘তোমাগো কেডা কইছে হে আমারে অত্যাচার করে?’
‘কেডা কইছে মানে? অত্যাচার না করলে কী তুই দুই দিন পরে পরে এমুন কইর্যার চইল্যা আসোস? কই, তোর সই শেফালীর তো গত বছর বিয়া হইলো। হে তো এমুন কইরা আসে না! আর কাউরেই তো আসতে দেহি না। আর তুই তো হের লগে থাগবারই পারোস না! এতো অত্যাচার করে!’
পিয়ালী শুনে চুপ করে যায়। কথা সরে না মুখে। তাইতো, সে কেন দুইদিন পরে পরে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে আসে? লোকে তো এটাই ভাববে যে তার স্বামী অত্যাচারী। এতো ভালোমানুষ স্বামী তার! কখনো তার কোনো শখ অপূর্ণ রাখে না। না হয় তার বাপের বাড়ি নিয়ে একটা কথাই বলেছে। মানুষ তো এমনিতে গল্প করবার জন্যও কতো কী বলে। সেও তো চুপ করে থাকতে পারতো! কিছু একটা শুনে সেই তো প্রতিবারে ফোঁস করে উঠে গণ্ডগোল বাঁধিয়েছে।
কতো কী মনে পড়ে যায় পিয়ালীর! কতোদিন তার স্বামী তাকে কাজে সাহায্য করেছে, তার জ্বর হলে পাশে বসে মাথায় জলপট্টি পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছে। পিয়ালীর বাবা-মাকেও তার স্বামী কখনো অসম্মান করেনি। কথাচ্ছলে কিছু একটা বললেই কী এমন ফুঁসে উঠতে হবে? সে ই বা তবে কেমন বউ! এখন বাবা-মা কি সত্যি সত্যি তাকে অন্য কোথায় বিয়ে দিয়ে দেবে? হায় হায়! শাজাহানকে ছাড়া কীভাবে বাঁচবে সে?
দুপুরে ভাত খাওয়ার জন্য ডাকতে গিয়ে পিয়ালীর মা দেখেন পিয়ালী আর তার বাচ্চা কেউ ঘরে নাই। সাথে যে ব্যাগটা নিয়ে এসেছিলো সেটাও নেই। উঠোনের দিকে আসতেই দেখতে পান, শাজাহান ভ্যান থেকে নামছে। হাতভর্তি বাজার সদাই। হঠাৎ অসময়ে জামাইকে আসতে দেখে পিয়ালীর মা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। শাজাহান শাশুড়ির পা ছুঁয়ে সালাম করে। কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে শুধু এদিক ওদিক তাকায়। দুপুরের খাওয়া শেষে ফজর আলী বলেন,
‘বাড়িত যাও বাবা। তুমার বউ-বাচ্চা ওহন তুমার বাড়িতেই আছে।’
হতচকিত শাজাহান অপ্রস্তত হয়ে তৎক্ষনাৎ বাড়ির পথ ধরে। ফজর আলী পরিতুষ্ট হয়ে ভাবেন, মেয়ের আবার বিয়ে দিতে চাওয়ার বুদ্ধিটা কেন এর আগে তার মাথায় আসলো না!
.............................................................................................
ওদিকে শাজাহানের মা অনেকক্ষণ ছেলের সাড়াশব্দ না পেয়ে এঘর ওঘর করেন। ছেলে কোথাও নাই। চিন্তিত মুখে নিজের ঘরে ঢুকতে যাবেন এমন সময় বাচ্চার কান্নার শব্দে সচকিত হয়ে ওঠেন। আরে! এ যে পিয়ালী!
পিয়ালী ঘরে ঢুকে শাশুড়ির হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
দুপুরের পর পর শাজাহান বাড়িতে ফিরে আসে। দুজনেই দুজনকে দেখে। কিন্তু কিছুই বলে না। মনের একান্ত নিভৃতে বলা কথামালা বাকরুদ্ধ দ্বারে ছটফট করে। আগল খুলে বেরুতে পারে না। আপন পরিমণ্ডলে পিয়ালী আবার মেতে ওঠে তার ঘর সংসার নিয়ে। তার নিজের ঘর। এটাই তার ঠিকানা।
পাড়া প্রতিবেশি অনেকদিন কান পেতে থাকে শাজাহান-পিয়ালীর সংসারে। আবার যদি কিছু গল্প-গাঁথার সন্ধান মেলে।
নিন্দুক প্রতিবেশির মুখে ছাই! পিয়ালী আর শাজাহান আবার চড়ুই পাখির মতো কুটুর কুটুর করে সংসার করে। ভালোবাসার চারাগাছটিতে রোজ জলসিঞ্চন করে। সব সম্পর্কেই যে পরিচর্যা লাগে এটা তারা বুঝতে পারেনি। ভেবেছিলো, যা তাদের নিজের তা নিজেরই থাকবে। সেটাও যে ক্ষণিকের ভুলে হারিয়ে যেতে পারে তা কখনো মনেই আসেনি।
ভারমুক্ত হয়ে শাজাহানের মা মনে মনে চিন্তা করেন, ঔষধ এতো কাছেই ছিলো। আর তিনি কিনা এতোদিন অন্ধকারেই হাতড়ে মরলেন!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন