বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ মার্চ ১৯৯৩
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

২.১৭

বিচারক স্কোরঃ ০.৮২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৩৫ / ৩.০

ভৌতিক (নভেম্বর ২০১৪)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.১৭ টাইম মেশিনের ফাঁদ

রাব্বি রহমান
comment ৬  favorite ০  import_contacts ৪৫৩
প্রখর রৌদ্র , উতপ্ত রাস্তা , গরম বাতাস বইছে । চোখের পাতাটাও ভারী হয়ে আসছিলো । হয়তো মরিচীকার দিকে ধ্যান মগ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকার ফল । দেশের অবস্থাও ততটা ভাল নাহ , রাজনৈতিক ডামাডোল বাজছে সব যায়গায় । আতিশীগ্রই পার্লামেন্ট নির্বাচন । আজকের দুপুরটা কেন জানি অন্য রকমের সব খারাপ লাগাও ভাল লাগছে । প্রতিদিন এই সময়াটায় রাস্তার জ্যাম , হকারের চিৎকার , সুন্দরী ললনাদের হেটে চলা , জীবন জীবিকার খোজে ছুটে চলা মানুষের লাইন অর্থহীন মনে হলেও আজ কেন জানি এসবের মধ্যে বিশেষ অর্থ খোজার চেষ্টা করে যাচ্ছে তাসরীফ । তাসরীফ একটা গার্মেন্টেসের মার্চেন্ডাইজার পদে কাজ করে । প্রতিদিন সকাল ৮ টায় অফিসে ঢোকে আর রাত ৯ টার সময় লোকাল বাস ধরে বাসায় ফেরে তাসরীফ । আজ বিশেষ কারনে অফিসে অনেক বলা বলির পরে , দুপুরের সময় ছুটি নিয়েছিল । ছুটি নেয়ার কারন তাসরীফ আজ এক জনের সাথে দেখা করতে যাবে । হাটতে হাটতে ক্লান্ত হয়ে পরছে তাসরীফ । ঘড়ির দিকে তাকায় তাসরীফ দুপুর ১২ টা ৩০ । তার হাতে অনেক সময় এখনো বাকী রয়েছে । যার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে তাসরীফ , সে আসবে দুপুর ২ টায় । একটা লোকাল বাস ধরে তাসরীফ তার কর্মস্থল থেকে অভিজাত বারিধারার দিকে রওনা হয় ।
ঢাকার জ্যামের বর্ণনা দেয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে কেউই মনে করে নাহ । এক ঘন্টা পনের মিনিটের বাস যাত্রা শেষে সে বারিধারায় পৌছায় । দুইটা বাজতে এখনো পনের মিনিট বাকী । তাসরীফ বিশ্রাম নেবার জন্য বারিধারা পার্কের মধ্যে নির্জন একটা বসার যায়গায় বসে । গরম আর জার্নির ক্লান্তি দুটো মিলে প্রচন্ড অবসাদ ভর করেছে তাসরীফের উপর । লেকের স্বচ্ছ পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের অগোচরেই কিছুটা নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পরে তাসরীফ ।
ঘুমের ঘোরে লেকের স্বচ্ছ পানির মধ্যে ভেসে ওঠা নিজের ঘর্মাক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তাসরীফ নিজের সাথে কথোপকথন শুরু করে –
কেমন আছিস রে তাসরীফ ?
- ভালই ।
কি নিজেকে চিনতে কষ্ট হচ্ছে ?
- নাহ তা কেন হবে ।
তুই অনেক শুকিয়ে গেছিস ।
- যেতেই পারি সারাদিন যে কষ্ট করি ।
তাসরু তুই কি টাইম মেশিন দেখেছিস ?
- না , তবে জানি সেটার উপর ভর করে অতীতে ফিরে যাওয়া যায় ।
তোর কি টাইম মেশিনে চড়ে অতীত থেকে ঘুরে আসতে ইচ্ছে করে নাহ ?
- নাহ এখনই ভাল আছি নাটক সরণি , সেকেন্ড লেন , লোকাল বাস , শ্রমিকের সেন্টিমেন্ট , প্রডাকশন লাইন নিয়েই আমি বেশ আছি ।
চল না আজ আর একবার ভাল-খারাপের মাঝে অতীতের জাবকাটি ?
- তবে তাই হোক ।
ছায়ার হাত ধরে অতীতে ফিরে যায় সুদূর অতীত , পনের বছর আগের অতীতে । তার বসের হোমরা-চোমরা ছেলেটার মতোই ছিল দেখতে সে । এইচ এস সি পাশ করার পরে ঢাকায় পারি জমিয়েছিল সে । ব্যাচেলর বাসায় একা একা থাকতো সে । অনেকটা প্রনোচ্ছল সেই সময় । ভর্তি যুদ্ধে ব্যার্থ হয়ে নাম সর্বস্ব একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল । অনেক কষ্ট করে জীবন যাপন করতো সে । অনেকটা নিরামিষ জীবন যাপন ছিল । তবুও সে জীবনটা অনেক উপভোগ্য ছিল তাসরীফের কাছে । এক পর্যায়ে সে একটা মেয়েকে ভালবেসে ফেলেছিল । মেয়েটার লম্বাচুল ছিল আর মেয়েটা ছিল অনেক রাগী । তাসরীফ মেয়েটার দিকে কেন জানি অপলক তাকিয়ে থাকতো । মেয়েটার নাম কেন জানি মনে করতে পারছে না সে । অনেকগুলো বিকেল , অনেকগুলো বসন্ত ঐ মেয়েটার হাত ধরেই কেটে গেছে তাসরীফের । তাসরীফ মেয়েটাকে বলতো তাকে ছাড়া সে বাঁচবে না । তাকে ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করবে নাহ । মেয়েটা অনেক মেধাবী ছিল । এইচ এস স্যার পরে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যায় মেয়েটা । তাসরীফ তখন কেবল পড়াশুনা শেষ করে নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে । হঠাৎ একদিন মেয়েটা জানায় সে স্কলারশিপ পেয়ে ইউএসএতে চলে যাচ্ছে । মেয়েটা তাসরীফকে অনেক ভালবাসতো । মেয়েটা বলে চলো তাসরীফ বিয়ে করে ফেলি । তাসরীফ জানে সে অযোগ্য তার আর একটা জীবন ধ্বংস করা ঠিক হবে না । তাই অনেক বুঝিয়ে মেয়েটিকে রাজি করিয়েছিল ইউএসএতে যেতে । কথা দিয়েছিল সেও তার জন্য অপেক্ষা করবে । মেয়েটি যেদিন দেশ ছেড়ে চলে যায় ঐদিন তাসরীফ অনেক কেঁদেছিল । মেয়েটি চলে যাবার পরে তাসরীফ তার নতুন চাকরিটা হারিয়ে ফেলেছিল । সেও প্রায় বছর দশেক আগের কথা । তাসরীফ টাইম মেশিনে চড়ে অতীত হাতড়ে বেড়াচ্ছে । প্রথম দিকে ফেসবুকে যোগাযোগ হলেও তারপরে আর তাসরীফের সাথে মেয়েটার যোগাযোগ হয় নি । তাসরীফ অনেক কষ্ট পেয়েছিল । সে তার মোবাইল নাম্বার বদলে ফেলে , ফেসবুক একাউন্ট ডিএক্টিভেট করে দেয় । নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেয় সব কিছু থেকে । পরে অবশ্য আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নেয় জীবন জীবিকার তাগিদে কিন্তু আর ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করেনি তাসরীফ কারন মেয়েটির সাথে প্রথম যোগাযোগও ফেসবুকেই হয়েছিল তো তাই । মেয়েটার দেয়া কিছু চিঠি তাসরীফ বুক পকেটে রেখে দিত । মেয়েটাকে দেয়া কথা মত তাসরীফ আজ অবধি বিয়ে করেনি । সে এখনও অপেক্ষা করে মেয়েটির জন্য । মাঝে মাঝে মেয়েটিকে তাসরীফ মনে মনে দোষারপও করে চলে ।
হঠাৎ মোবাইলের মেসেজ অ্যালার্ট টোনে ঘোর কাটে তাসরীফের । মোবাইলে একটা টেক্সট দেখতে পায় তাসরীফ । টেক্সটটা ছিল এমন-
তাসরীফ ,
আমি তন্দ্রা । ভাল আছেন নিশ্চয়ই । দেশে আসার পরে অনেক কষ্টে আপনার নাম্বার সংগ্রহ করেছিলাম । ইচ্ছে ছিল আপনার সাথে জীবনে শেষবারের মত দেখাটা হবে । আপনি হয়তো বিয়ে টিয়ে করে বাচ্চার বাবা হয়ে গেছেন । আমি ইউএসতে যাবার পরে আমার ফেসবুক একাউন্টটা হ্যাক হয়ে যায় । ফোনটাও কিছুদিন পরে হারিয়ে যায় । এরপরে আপনার ফেসবুকও আর খুজে পাইনি । ফোনে অনেক বার ট্রাই করেও আপনাকে পাইনি । অনেক চেষ্টা করেও আপনার নাম্বার সংগ্রহ করতে পারিনি । আমি জানি আপনি আমাকে ভুল বুঝেছেন । তাসরীফ আমি কিন্তু আপনাকে দেওয়া কথা রেখেছি । আজও আমি বিয়ে করিনি । অনেক ইচ্ছা ছিল আপনাকে দেখার । অনেক দিন কাশবনের ভেতরে কারও হাত ধরে হাটি না । আমি এখন আফ্রিকাতে কাজ করছি একটা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের হয়ে । আমি কুয়াশা ভরা সকাল গুলোতে গায়ে চাদর জড়িয়ে বসে থাকি আপনার অপেক্ষায় । আপনার এক ঘন্টা সময়ও হলো না আমার জন্য । আমি আপনাকে ফেরত চাইতাম নাহ । দুই দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলাম । বাবা মাও ছোট ভাইয়ের সাথে ইউএসএতে স্থায়ী ভাবে বাস করে তাই আর বাংলাদেশে আসা হয় না । তাসরীফ আপনি বলতেন নাহ আপনাকে তুমি করে বলতে আজ ইচ্ছে ছিল আপনাকে তুমি করে বলে শেষবারের মত আপনার হাতটা ছুয়ে দেখবো । আমিও এখন আর ভার্চুয়াল পৃথিবীতে নেই । একা একা বেশ ভালই আছি । জানেন আজ আপনার পছন্দের প্রিয় নীল শাড়ি পরে এসেছিলাম । আপনার ব্যাস্ততা থেকে এক ঘন্টা সময় অন্তত আমাকে ভিক্ষা দিতেন । আপনার মনে আছে আপনি আমাকে অনেক ভয় পেতেন । যেদিন আমরা দেখা করতাম আপনি সময়ের এক ঘণ্টা আগে আসতেন । আমি আপনার অপেক্ষায় দুইটা থেকে তিনটা পর্যন্ত গুলশান-১ এ বসে ছিলাম । শুধু আপনাকে একবার দেখার জন্য । আমি চারটার ফ্লাইটে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি ।
আজ আমি আর আপনার উপরে রাগ করিনি তাসরীফ । এয়ারপোর্টের পথে বসে এই টেক্সটটা আপনাকে লিখলাম । ভাল থাকবেন । আপনার সন্তান-বউকে আমার কথা কখনও জানতে দিয়েন না । দোয়া রইলো সুখী থাকবেন ।
“এখনও আপনাকে ভালবেসে
মুহূর্তের মধে ফিরে এসে
বুঝেছি অকূলে জেগে রয়
ঘড়ির সময় আর মহাকাল
যে খানেই থাকুক এ হৃদয় ।”
আপনার অপ্রিয়,
তন্দ্রা ।

তরিঘড়ি করে হাত ঘড়ির দিকে তাকায় তাসরীফ দেখে বিকেল সাড়ে তিনটা বেজে গেছে । ক্লান্ত অবসাদ গ্রস্ত তাসরীফ টাইমে মেশিনে চড়ে অতীত হাতরে বেড়াতে বেড়াতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল । কখন যে এত সময় পার হয়ে গেল । তন্দ্রার টেক্সটটা পড়তে পড়তে চোখ ভিজে আসে তাসরীফের । অফিস থেকে ফিরে বের হওয়ার সময় অনেক খারাপ লাগা ব্যাপারও ভাল লাগছিল তাসরীফের এখন তার কাছে সব ভাললাগা ব্যাপারও খারাপ লাগছে । পার্কের ছায়ায় বসে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে থেকেই বিকেলটা পার করে দিতে চায় সে ।
টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে ছোটছুটি করতে করতে বর্তমান টাকেই হারিয়ে ফেলল সে । অফিস থেকে বের হওয়ার সময় চোখের পাতা ভারী হয়েছিল তার তন্দ্রা কে এত বছর পরে খুব কাছ থেকে দেখতে পাবে বলে । তাসরীফ আজ পাঞ্জাবি পরে বেরিয়েছিল কারন তন্দ্রা পাঞ্জাবি পছন্দ করতো । তাসরীফ ভেবেছিল তন্দ্রাও বিয়ে টিয়ে করে দুই তিন বাচ্চার মা হয়ে গিয়েছে । রাগ ঘৃণায় একবার দেখা না করার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিল । পরে ভেবেছিল তন্দ্রা না হয় করুণা করে তার দুরবস্থা দেখতে আসছে ।
মনে মনে নিজেকে গালি দেয় আর বলে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো মুখ, ফেলে আসা দিন, সোনালী অতীতের ব্যাখ্যাহীন বন্ধন আর ধুলো জমে যাওয়া সম্পর্কে হাতড়ে মরছি আমি । মানুষ পরিবর্তিত হয় , সময় পরিবর্তিত হয় , অনুভূতি পরিবর্তিত হয় তার সাথে পরি বর্তিত হয় কাছের দূরের সম্পর্কের নামও । শুধু পরিবর্তিত হয় না স্মৃতি । যেমনটা ফেলে এসেছি , তেমনিই আছে ।
অপরিবর্তনীয় , বিবর্তনহীন , আনকোরা .........
অস্থির সময় যাচ্ছে.…
বোধহয় আবার হারিয়ে যাবো চোরাবালিতে, আবার সর্বহারা অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে জীবন।
হঠাৎ আকাশে গর্জন করে একটা বিমান উড়ে যেতে দেখে আকাশের দিকে তাকায় । উড়ে যাচ্ছে তাসরীফের আজন্মের ভালবাসা তন্দ্রা । তাসরীফের মনে পরে যায় জীবনান্দ দাসের কোন একটা কবিতার কয়েকটা লাইন –
“শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে
বলিলামঃ ‘একদিন এমন সময়
আবার আসিয়ো তুমি, আসিবার ইচ্ছা যদি হয়! –
পঁচিশ বছর পরে!”
নিজের ভালবাসাকে আকাশে উড়িয়ে কষ্টগুলো বুক পকেটে জমা করে বাসার দিকে পা বাড়ায় তাসরীফ । মনে মনে তন্দ্রার কাছে ক্ষমা চায় । আমাকে মাফ করে দিও প্রিয়তমা । আমিও তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম , আছি আর যতদিন বেঁচে থাকবো তত দিন অপেক্ষা করেই যাবো । বাসায় ফিরে রান্না করতে হবে , শার্টটা ধুয়ে দিতে হবে , এক জোড়া মুজো না ধুয়ে দিলে কাল সকালে অফিসে যেতে পারবে না সে ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন