বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ১০টি

সমন্বিত স্কোর

২.৬৫

বিচারক স্কোরঃ ১.৭৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ০.৯ / ৩.০

নারী

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

সুখ-বিক্রেতা

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

নূরীর আত্মকথা

দিগন্ত মার্চ ২০১৫

বিজয় (ডিসেম্বর ২০১৪)

মোট ভোট ১৮ প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৬৫ ১৯৭১

মুহাম্মাদ লুকমান রাকীব
comment ৩১  favorite ০  import_contacts ৭৩২
১।
চন্দ্রপূর্ণিমা রাত্রি।
ঊনিশ শত একাত্তর।
পথের দু’পাশ ঘেষে বেশ কয়েকটা বাড়ি।
রাস্তার দু’পাশ সহ বাড়ির চার পাশেই বাঁশঝাড়। সময়টা বর্ষাকাল।
মাঝে মধ্যে ছাড়াবৃষ্টি হয়। সে জন্যে বাঁশবাগানের ফাঁকে ফাঁকে আগাছা ভরে গেছে। এ সময়কালটায় আগাছা একটু বেশিই জন্ম নেয়। তাই এ কয়েকটি বাড়ির চার পাশটা ঝোপ-ঝাপে ভরে গেল।
আশপাশের জায়গাটা এক জমিদারের।
এখানে যারা বসবাস করছে তারা স্থায়ী বসতি নয়। তারা নদী ভাঙ্গা এলাকার লোক। এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের এখানে থাকার বয়সও বেশ।
এখানে বেশ কয়েকটি পরিবারের বসতি।
এখানকার সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। আশপাশের কাজের কোন ব্যবস্থা না থাকায় এক একজন দূর দূরান্তে ছোটে যায় আপন কাজের সন্ধানে। রাত হতেই যে যার ঘরে ফেরে আপন সংসারে। কোনদিন কারও কাজের সন্ধান মেলে কোনদিন কারও কাজের সন্ধান মেলে না। অনেক অভাব অনটনে কাটলে লাগল এ কয়েকটি পরিবারের সংসার জীবন।
এখানে সবচেয়ে প্রবীণ যে তার নাম ছমির উদ্দিন। তার বয়স এক‘শ বছরের উপরে হবে। সে চোখে দেখে না। তবে, তার ধারণা সে মাঝে মধ্যে সাদা আবছায়া কি যেন তার চোখে ভেসে আসে, আর সে জন্যেই সে দেখতে পায় বলে দাবিও করে। কিন্তু তার কানের প্রখর খুবই তীক্ষ্ম। সামান্য শব্দ হলেই তার কানে এসে থপাস করে বাজে।

এই বাড়ি গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় উঠুনওয়ালা বাড়ি হল ছমির উদ্দিনের বাড়িটা। ঘরের চার পাশেই বাঁশঝাড়। ছমির উদ্দিন যে ঘরটায় থাকে সে ঘরটার সামনে বেশ খালি যায়গা আছে, এটা উঠুন হিসেবে তারা ব্যবহার করে।
কর্ম-ব্যস্ততা সেরে সবাই এই উঠুনে এসে জমাট বাঁধে। আর আগ থেকেই বসা থাকে ছমির উদ্দিন। সে একে একে সবার খবর নিতে থাকে।
তার নিজের একটা ছেলে আছে। তার নাম জমির উদ্দিন। সে বিবাহিত। তার একটা মেয়ে আছে। মেয়ের নাম শোভা।

ছমির উদ্দিন প্রশ্চিম দিকে ঘরের পাশে পূর্বমুখী হয়ে উঠুনে ছালার চটের উপর বসা। পূবার্কাশে ফোটা চাঁদের আলো বাঁশঝাড় বেয়ে উঠুনে বেশ স্পষ্ট জোছনার আলো আসছে। যদিও ছমির উদ্দিন চোখে দেখেনা তবুও মনে মনে অনুভব করছে আজকের এই চন্দ্রপূর্ণিমা।

-জমি! জমির! ও জমির উদ্দিন। ছমির উদ্দিন উঠুনে বসে ডাকল তার ছেলে জমির উদ্দিনকে।
ঘরের বিতর থেকে ছমির উদ্দিনের পুত্রবধু শব্দ করে বললে, আপনার পুত্র এহনু আসেনাই।
ছমির উদ্দিন বললে, রাইত ত অনেক হইল, আইল না কেন্?
সে দরজায় এসে জবাব দিল, কেন আসেনাই আমি কেমনে কমু! মাইয়াডা পড়তে বইছে। আপনের শব্দ শুনলে আর পড়ব না।
মাইয়া মানুষের পড়া লেহা কইরা লাভ নাই; ওরে আমার কাছে পাঠাই দাও, দুজন বইসা গল্প করি। একা একা বাল্ লাগে না।
-চুপ করেন। এমন কথা মুখে লইবেন না। বাপ মায়ের মত মেয়েরে অশিক্ষিত রাইখা আর পাপ করতে চাই না। একা একাই কথা কন। আর বাল্ না লাগলে ঘরে আইসা শুইয়া পড়েন।
বৌমার এমন কথা শুনে ছমির উদ্দিন একেবারে চুপ মেরে রইল।

কিছুক্ষণ পর ছমির উদ্দিনের সামনে দিয়ে সুর সুর করে কি যেন একটা যাওয়ার শব্দ পেল। শব্দটা তার খুবই পরিচিত বলে মনে হল। সে অনুভব করতে লাগল। বির বির করে বলতে লাগল,‘কিসের শব্দ! সামনে দিয়ে কি গেল? কোনো শঙখনি না ত?
-কি দাদা! বির বির করে কি কইতাছ?
-কে?
-আমি পরী।
-পরি! ও পরি আইছত? ব। একা একা বাল্ লাগছে না।
পরি ছলার চটের একপাশে বসতে বসতে বললে, দাদা! কি জানে কইতাছিলা?
-ও। সামনে দিয়া একটা সাপ যাইবার শব্দ হল।
-সাপ! না। সাপ আইব কইত্থেকা?
-হ। এখন বর্ষাকাল। সাপের উৎপাত করার এহনই সময়।
[ পরী পাশের ঘর আলী উদ্দিনের একমাত্র কন্যা। তার বয়স একুশ। তার মা নেই। বাবার আদর যত্নেই সে বড় হয়েছে। তার মা সেই ছোটবেলায় বসন্তরোগে মরেছে। তার বাবা তার মুখের দিকে চেয়ে আর দ্বিতীয় বিবাহ করেনি। পরীর ভাল ভাল সমন্ধ{বিয়ে} আসে। সে বিয়ে বসতে রাজি না হওয়ায় এখনো কোন বিয়ে হয়নি তার।
ছমির উদ্দিন বললে, তর বাবা আইছে?
পরী বললে, না।
-এহন দিন কাল ঠিক ভালা না। সকাল সকাল বাড়ি আইয়া পড়নই ভালা। আমার জমির উদ্দি’ন ত এহনু আসে নাই। আচ্ছা দেশের কি খবর? প্রশ্চিম পাকিস্তানের লগে কি আবার বিবাদ হয়তাছে নাকি?
পরী বললে, দুইদিন ধরে রেডিওর ব্যাটারি নাই। সংবাদ টংবাদ কিছুই জানি না। তবে, দুইদিন আগে যা শুনছি মনে হয় সমস্যা একটা বাধব!
ছমির উদ্দিন বললে, বাধুক! সমস্যা বাধলেই সমাধান অইব।
-আচ্ছা দাদা! আমাদের দেশের লোকেরা যে সমস্যা বাধাইতাছে তারা কি পাড়ব?
-পাড়া না পাড়া আল্লার হাতে। তবে, কত আর অন্যায় সহ্য করবে?
তখন পরির বাবার গলা শুনা গেল।
-পরী। ও পরী।
পরী শব্দ করে জবাব দিলেলে, জ্বি আব্বা।
-কি করছ?
-ছমির দাদার লগে কথা কই।
-আয়। মা একটু ঘরে আয়। একটু দেইখা যা।
-যায় দাদা। পড়ে আইমু। বলে পরি চলে গেল।

ছমির উদ্দিনের কানে আবার সেই সুর সুর শব্দ শুরু হল।
ছমির উদ্দিন আবার বির বির করে বলতে লাগল।
এমন সময় জমির উদ্দিন তার বাবার সামনে দিয়া ঘরে প্রবেশ করল। সে কোন কথা বলল না। কেবল তার পায়ের শব্দ শুনা গেল।
-কে, জমি?
জমির উদ্দিন কাপর খোলতে খোলতে বললে, হ।
-এতো দেরি হইল কেনরে, বাবা?
-সংবাদ শুইনা আইলাম।
-কি অইছে? দেশের কি খবর?
-বেশি ভালা না। শহরে গুলমাল চলতাছে।
-কি কছ? কি অইছে?
ঠিক এমন সময় পরী এসে বললে, দাদা! আব্বা রেডিওর ব্যাটারি আনছে। খবর হুনবা?
-হ। লইয়া আয়।
পরী ছুটে গেল ঘরের দিকে।
রেডিও নিয়ে পরী এসে ছমির উদ্দিনের পাশে বসল। রেডিও অন করল।



২।
পরদিন খুব ভোরে বৃষ্টি শুরু হল।
সবাই যার যার ঘরে শুয়ে রইল। কেউ ঘর থেকে বের হল না।
ছমির উদ্দিনের দক্ষিণপাশের ছোট ছনের ঘরটা রহিমার। সে একা মানুষ। হঠাৎ তার ঘরে দরজায় আঘাতের শব্দ। ঘরের দরজাটা বাঁশের বেড়ার। কয়দিন ধরে সে অসুস্থ। দরজায় শব্দ শুনে সে ভয় পেয়ে গেল। এতো সকালে কে এল!
তার একটা মাত্রই ছেলে। তাও আবার সে ঢাকায় থাকে। কে হতে পারে?
রহিমা এসে ধরজা খোলে চমকে উঠল!
রহিমা বললে, লাল?
লাল তার একমাত্র ছেলের নাম। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র।
মাকে জড়িয়ে ধরে লাল বললে, চলে এলাম, মা।
রহিমা কাঁশতে কাঁশতে বললে, হঠাৎ কেন আইলি বাবা, শরীর ভালা না?
-না, ভাল। শুনেন নাই, শহরে গন্ডুগুল হচ্ছে। যে কোন সময় পাকিস্তান ধরে নিয়ে যাবে।
-হ বাবা ভালই করছত। আয় ঘরে আয়। আয় আয়। আহারে পুলাডা আমার ভিজা গেছে। শুকাইয়াও গেছত বাবা। খাওন দাওন অইনা নাকি?
-গত কয়দিন ধরে শরীরটা খুব একটা ভাল ছিল না। জ্বর ছিল।
-কছ কি! আমারে জানাইলি না কেন?
-জানালে তো তুমি আবার চিন্তা করবা। তোমার শরীরটা কেমন মা?
-হ। ভালাই। আগে ভেজা কাপড় চুপুড় খুল্। পড়ে সব কথা।

[রহিমা অন্যের ঘরে কাজ করে ছেলেকে ঢাকায় পড়াচ্ছে।
এটা তার জন্যে গর্বের বিষয়। কিন্তু সে গর্ব করে না। সে ছেলেকে মানুষের মতন মানুষ করতে চায়। তার ধারণা পড়া শোনা ছাড়া একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ নয়।
-মা, ঘরে খাবার কিছু আছে?
-অল্প কয়ডা পানীভাত আছে। দিমু নাকি?
-হ্যা, দাও। খুব খিদে পেয়েছে। রাতেও কিছু খায়নি।
রহিমা ভাত দিয়ে একবার ঘরের বাহিরে গেল। ঘরের কোণে মরিচ গাছ থেকে কয়েকটা মরিচ এনে সাথে একটা পিয়াজ কেটে দিল।
-নে। গরিবের খাওন।
লাল হাসতে হাসতে বললে, মা, এটা আমার প্রিয় খাবার। বহুদিন ধরে এমন প্রিয় খাবার খায়না। এ খানাটার জন্যেই ঢাকা থেকে আসা।
রহিমা মুচকি হেসে বাহিরে গেল।

বৃষ্টি থেমে গেল।
সবাই যার যার ঘর থেকে বের হতে শুরু করল।
যাকে সামনে পাচ্ছে রহিমা তাকেই তার ছেলের কথা বলছে। যে লালের কথা শুনছে সেই আগ্রহের সাথে তার সাথে দেখা করতে আসছে। সবাই লালকে ভালবাসে। শুধু ভালই বাসে না, যে যার যতো সাধ্য সে তা দিয়েই তাকে পড়া-শোনা করার সহযোগিতা করছে। এখানকার সবার সহযোগিতায় আজ লাল ঢাকায় পড়া-শোনা করছে।

৩।
আজ সকাল থেকেই পরীর মনটা ভাল না।
খিট খিটে হয়ে আছে। কাউকে বকতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাউকে বকার সাহসও পাচ্ছে না। একবার এ ঘরে আরেকবার ও ঘরে ঠুকছে। কাউকে কিছু না বলেই আবার বের হয়ে যাচ্ছে। সবাই বুঝতে পারছে পরীর আজকে মন খারাপ। কিন্তু কি জন্যে খারাপ কে জানে?
পরী নিজেও জানে না তার মনটা আজ কেন খারাপ!!

বাড়ির পাশে একটা জমি পরে মেহগনি বাগান। বিকেলবেলা মেহগনি বাগানটা দেখতে বেশ চমৎকার লাগে। প্রশ্চিমে সূর্য যখন লালরঙে রঞ্জিত হয় তখন আরও ভাল লাগে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে লাল আভা এসে বিচিত্র করে তোলে। তাছাড়া এ বাগানের মালিক বাগানের পড়ে থাকা শুক্ন পাতা কাউকে নিতে দেয়না। পাতার মর মর আর ঝন ঝন শব্দ বেশ ভাল ছন্দময় করে তোলে। মোটকথা, এখানে সময় কাটানোর মতন একটা পরিবেশ গড়া পরিস্তান।
পরী মেহগনির বাগানের একপাশে এসে দাড়াল। মেহগনি বাগানটা বেশ বড়। বাগানের পূর্বপাশে একজনকে দেখা যাচ্ছে। সে ঐ লোকটাকে উদ্দেশ্য করে তার দিকে মৃদু পায়ে হেটে গেল। লোকটার পিছন দিকটায় গিয়ে কিছুক্ষণ দাড়াল। একমসয় তার চোখ দুটু পিছন থেকে চেঁপে ধরল।
-কে?
পরী কোন শব্দ না করে মুখটিপে হাসছে।
চেঁপে ধরা লোকটি কায়দা করে তার হাত ছুটিয়ে সামনে টেনে এনে একেবারে বুকের কাছে নিয়ে এল।
পরী বললে, আউ! ছাড় কইতাছি। ছাড়। আউ! ছাড়!!
-ও তুই? তাহলে তো ছাড়া যাচ্ছে না। [লাল বললে]
-না ছাড়! কেউ দেখে ফেলবে।
-দেখুক। লজ্জা কিসের?
-তুমার বুঝি লজ্জা নাই?
-না।
-বেশি পড়া লেহা করলে কি লজ্জা চলে যায়?
-হ্যা।
-তাহলে তো তোমার আর পড়া লেহা করা লাগব না!
-আচ্ছা করব না। কিন্তু তুই আমাকে তুমি করে বলতেছিস কেন?
-জানি না!
-জানাচ্ছি! বলে লাল পরীকে আরও কাছে টেনে নিয়ে কপালে চুমু দিল। পরী লজ্জায় জোড়ে টেনে লালের কাছ থেকে ছুটে পিছনে দৌড়ে পিছন চলে যেতে লাগল। পিছন থেকে লাল ডাকল।
পরী শুন! কথা আছে।
এখন না। কাজ আছে।
জরুরী কথা। শুন।
পরী দাড়াল। পিছন ফিরে এল না। লাল সামনে এগিয়ে গেল। পরীর পিছনে গিয়ে দাড়াল।
লাল বললে, আমি খুব শিগ্রই ঢাকা চলে যাব। কখন ফিরি কি না ফিরি তা ঠিক নেই।
পরী পিছন থেকে লালের দিকে মুখ করে তাকাল।
-ঢাকায় যাবা কেন?
-দেশের পরিস্থিতি ভাল না। যে কোন সময় যুদ্ধে নামতে হবে!
-যুদ্ধে! ওসব যুদ্ধে টুদ্ধে তুমি কেন নামবা?
-আমি না নামলে কে নামবে?
-যাগুর খাইয়া কাম নাই, তারা নামব!
-আমারও তো খেয়ে কাম নাই!
-দেখ্ ভালা অইব না কিন্তু!
-কি করবি, কান্না করবি নাকি?
-হ। [পরী লালের কাছে এসে দাড়াল। বললে, তুই ছাড়া আমার কে আছে?
-দেখ্! এখন ভালবাসার সময় নেই। আমার রক্তে মিশে আছে প্রতিশোধ।
-প্রতিশোধ! কিসের প্রতিশোধ?
-তুই বুঝবি না।
-কেন্ বুঝব না?
-শুন! যদি বেঁচে থাকি তোর সাথে আমার বিয়ে হবে। সেই ছোটকাল থেকে আমি তোকে ভালবাসি। এখনো বাসি। সারাজীবন বাসব। আমাকে তুই ভূল বুঝবি না।
-আমি এমন না পাওয়া ভালবাসা বাসতে চাই না।
-তাইলে ভূলে যা।
ভূইলা যাব! হ্যা, ভূইলাই যাব। ভূলে যাব। [পরী কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির দিকে ছুটে গেল]




৪।
[রাতে লালের কাছে শহর থেকে তার দুজন বন্ধু এল। সে খুব ভোরে ঢাকায় চলে গেল।]

সেদিন সকালেই পরী ফটিকের মাধ্যমে লালের একটি চিঠি পেল। ফটিক পাশের ঘর ফয়েজ উদ্দিনের ছোট ছেলে। চিঠিটা অসম্ভব সুন্দর হাতে লেখা। চিঠিটা খোলে পরী পড়তে লাগলে-

পরী,
গতকাল তোকে কষ্ট দেয়ার জন্য আমিও সারা রাত ঘুমুতে পারি নি। আমার অসমাপ্ত ভালবাসা তোর জন্যে সব সময় আছে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ থাকবে। আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে অপেক্ষায় থাক। সে কষ্টের বিনিময়ে ভালবাসায় জীবন রাঙিয়ে দেব।
তোকে ছেড়ে আমার একদম যেতে ইচ্ছে করেনি। আমি আমার মাকে ভালবাসি। সে মা প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে আছে। আর মায়েদের ভালবাসা মিশে আছে সারা বাংলায় প্রত্যেকটা মাটির কণায়। সে মা ও মাটি রক্ষায় আমি লড়তে যাচ্ছি কিছু দেশদ্রেুাহী নর-পশুদের সাথে।

তোর ভালবাসা একসময় আমাকে বেঁধে ফেলেছিল। আমি যুদ্ধে না যাবার পণও করেছিলাম। আমার বন্ধুদের অনুরোধে আমার বৃদ্ধ মাও গর্জে উঠে। তার আদেশে আজ আমি যুদ্ধের জন্য ঘরছাড়া। আমার মা আমাকে সাহস জাগিয়েছে। বলেছে, যদি বেঁচে থাক তবে এই অভাগা মায়ের বুকে ফিরে এসো। আর যদি শহীদ হও! আমি তোমার জন্য চোখের জল ফেলব না। কারণ, আমার ছেলে আমার জন্য জীবন উৎসর্গ করে মরেছে। তবে, আমার দোয়া সব সময় থাকল। কখনো মাথা নত করে জীবন ভিক্ষার চেয়ে শিংহের মতন মরা লাশ অনেক ভাল। তোমার নত জীবিত শির আমার বুকে ঠাই পাওয়ার চেয়ে তোমার গর্বিত মৃত শির আমার বুকে ঠাই এবং ভালবাসা পাওয়ার যোগ্য। আমার দোয়া থাকবে সব সময়। বাংলার জয় নিশ্চিৎ। হবেই বাংলার জয়!!

আমার মায়ের এমন সাহসী ত্যাগি কথা আমার বুকে দেশাত্ববোধ আরও বেড়ে উঠল। তোর ভালবাসার আমার মায়ের ভালবাসার কাছে হেরে গেল। তুই যদি আমাকে সত্যিই ভালবেসে থাকিস তবে, আমার জন্য অপেক্ষায় থাকবি। দেশ বিজয়ের সাথে সাথেই আমি ফিরে আসব। ¯^vaxb বাংলায় নিরাপদ নিশ্চিন্তে তোর আমার বিয়ে হবে ইনশাআল্লাহ!!
[ আমার এ বৃদ্ধ মাকে তোর কাছে রেখে গেলাম। আমার যতো ভালবাসা সব আমার মায়ের প্রতি নিবেদন করবি। আমার মা কিন্তু সাধারণ মা নয়! সে গর্বিত মা। তার উৎসর্গ আর ত্যাগের বিনিময়েই হয়তো গড়ে উঠবে নতুন সবুজ শ্যামল বাংলা। ]

[চিঠিটা পড়তে পড়তে পরীর চোখে জল এসে ভরে গেল। পরি হু হু করে কাঁদতে লাগল।]

৫।
ইদানিং ছমির উদ্দিনের শরীরটা খুব খারাপ যাচ্ছে। সারা রাত ঘুম হয় না। চৌকির এক কোণে বসে বসে রাত কাটিয়ে দেয়। রাতে প্রায়ই মানুষ হাটার শব্দ হয়। খুব শক্ত শব্দ। একদল লোক যাবার শব্দ হয়। ছমির উদ্দিনের বুঝার বাকি নাই যে এগুলো পাকিস্তানি মিলিটারির পায়ে চলার শব্দ। সারাদেশে মানুষ খুন, নারী নির্যাতন সবই যখন তখন ঘটছে।
একসময় সারা বাড়ি বোটের কট কট শব্দে বড়ে উঠল। দরজায় দরজায় শব্দ হতে লাগল। কেউ বের হতে না চাইলেও তাকে দরজা ভেঙ্গে বের করা হচ্ছে। ঠাস ঠাস গুলির শব্দ হচ্ছে। এক সময় ছমির উদ্দিনের ঘরে এসে মিলিটারিরা প্রবেশ করল। তার ছেলে সন্তান বৌমা সহ সবাইকে বাহিরে বের করে ছমির উদ্দিনের উঠুনে জমাট করল। ছমির উদ্দিন বুড়ু বলে তাকে ঘর থেকে বের করল না।

তাদের অত্যাচার শেষে একসময় পরির দিকে নজর গেল। পরী ঠিক পরির মতনই সুন্দর। তাকে একটা ঘরে নিয়ে গেল পাকিস্তানি মিলিটারি অফিসাররা। পরির বাবা বাড়িতে নেই। সেই এলাকার মুক্তিবাহীনির সাথে যোগ দিয়েছে। রাতে বাড়ি আসে না। সে লালের মা রহিমার সাথে থাকে। তার ঘর থেকে বের করল। আবার তার ঘরেই নিয়ে গেল মিলিটারিরা। এতে রহিমা বাধা দিলে তাকে গুলি করে। সে মুহুর্তে মাটিতে লুটে পড়ে।

[সে রাতে রহিমার মত কয়েকজনের জীবন নাশ হয়। আর পরীর মতন কয়েকজন যুবতি ধর্ষিতা হয়।]

একসময় তাদের অত্যাচার থেমে গেল। বহু ত্যাগ তিতীক্ষায় আর রক্তের বিনিময়ে বাঙগালীদের জয় এল। বহু মা বোন ধর্ষিতা হয়েছে। কেউ লজ্জায় আত্মহত্যা করেছে। কেউ একবারে লজ্জায় চুপ মেরে গেছে। পরীও তাদের একজন। সে আত্মহত্যা করেনি। সেদিন থেকে তার বাকশক্তি লোপ পেয়েছে। কারও সাথে সে কথা বলেনি। একেবারে চুপ মেরে থাকে।

বিজয়ের লাল সবুজের পতাকা লয়ে সবাই ঘরে ফিরছে। কিন্তু লালের কোন খবর নেই। পরী এই রাস্তায় একবার অই রাস্তায় একবার লালের অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ থাকছে। লালের কোন খবর কেউ জানে না।
লাল যেন লাল সবুজের পতাকায় লাল হয়েই মিশে রইল। পরী পতাকার লাল রঙে নিজের মনকে স্থির করল। এক সময় লাল রঙেই ঢলে পড়ে গেল তার মাথা। সে সেজদারত অবস্থায় পতাকার লাল রঙের মাঝে চৌরাস্তার মোড়ে পড়ে থাকল।।সেখানে কয়েক গ্রামের লোকের কোলাহল পড়ে গেল।।
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
[[ এ গল্পটি আমার লেখা উপন্যাস ১৯৭১ এর অবলম্বনে লেখার চেষ্টা করেছি। তাই হয়তো কিছুটা এলো মেলো হয়ে গেল। সম্পূর্ণ উপন্যাসটা প্রকাশের অপেক্ষায় আছি। আশা করি তখন বেশ ভাল করে সম্পূর্ণতা পাবেন। এটা সাধু এবং চলতি ভাষায় লেখা। তাই হয়তো উচ্চারণের স্বার্থে বানানগত কিছু ভূল থেকে যাবে। এটা মার্জনার চোখে দেখবেন।]]
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন