বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

বিচারক স্কোরঃ ১.৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.২ / ৩.০

প্রত্যয় (অক্টোবর ২০১৪)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট নামের প্রভাব

স্বপন চক্রবর্ত্তী
comment ৪  favorite ০  import_contacts ১,৫১২
- কে আপনি ? কি চাই ?
- আমি? আমার নাম লালন জহির - সবাই আমাকে বিচ্ছু বলে ডাকে ।
- বিচ্ছু ! সে আবার কেমন নাম ! ওই জহিরই তো বেশ নাম ।
- ছোটবেলা থেকে এই ডাকনামেই সবাই ডাকে – শুধু মা ডাকেন লালন ।
- তা’ কি চাই এখানে ?
- একটা চাকরী চাই । যদি দয়া করে আমাকে –

বলতে বলতেই মুখের উপর দড়াম করে দরজাটি বন্ধ করে দিলে নিরাপত্তা প্রহরী ।আজ সকাল থেকে এই নিয়ে চারবার হলো একই রকম । শুরু ও শেষ প্রায় একইরকম সবখানেই ।

রাণা প্লাজা ধ্বসে সেই যে চাকরীটি গেছে – এর মধ্যেই ছয়মাস হয়ে গেছে । হাতের সঞ্চয় যা ছিল সবই শেষ । মা অসুস্থ । মায়ের ঔষধ কেনার পয়সা নেই, খাবার কেনার পয়সাও নেই ।
যেদিন রাণা প্লাজা ধ্বসে পড়লো সেদিন সে কাজে যেতে পারেনি মায়ের অসুখের বাড়াবাড়ির জন্যে । বলতে গেলে মা-ই তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে । সে কি পারবে মা-কে বাঁচিয়ে রাখতে ! যে ছেলে মায়ের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারে না সেকি যোগ্য ছেলে !

ভাবতে ভাবতে চোখের কোণে দু’ফোঁটা জল জমে – সার্টের আস্তিন দিয়ে আলগোছে চোখ মুছে নেয় । বুকের ভেতর একটি পাথরের দলা যেন পাক খেয়ে ওঠে । কাল রাতে কিছু খায় নি – যা খাবার ছিল মাকে খাইয়ে দিয়েছে – মাকে মিথ্যে বলেছে সে – তার জন্যে খাবার আছে –পরে খাবে । মাকে মিথ্যে বললে কি পাপ হয় ? হয়তো হয় । কিন্তু তার যে উপায় ছিলো না। মিথ্যে না বললে মাকে যে খাওয়ানোই যেত না । মনে মনে বলে সে- মা আমায় ক্ষমা করে দিও ।

এই মা-ই লোকের বাড়ী বাড়ি কাজ করে তার পড়ার খরচ যুগিয়েছেন । নিজে খেয়ে না খেয়ে তার উদরপূর্তি করেছেন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাষ্টার্স পাশ করে ভেবেছিল একটা ভাল চাকরি যোগাতে পারলেই মাকে সে আর লোকের বাড়ী কাজ করতে দেবে না । হন্যে হয়ে ঘুরে ঘুরে আশাপ্রদ কিছুই না পেয়ে অবশেষে তারই এক কলেজের বন্ধুকে ধরে রাণা প্লাজার এই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীটাতে প্রোডাকশন সুপারভাইজার এর চাকরিটি পেয়েছিল । চাকরি পেতে না পেতেই মায়ের বড় রকমের অসুখ ধরা পড়লো । আর জহিরের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেলো ।

জীবন হয়তো এমনি এক ফাঁদ – যা গরীব ও সৎ মানুষদের কিছুতেই চরম দুঃখের গণ্ডী থেকে বের হতে দেয় না । একটু আধটু এদিক ওদিক করতে পারলে সেও হয়তো আজ খুব বড় কেউ না হোক – অন্ততঃ খেয়েপড়ে বাঁচতে পারতো – কিন্তু ওই যে, ছোট্টবেলা থেকে মায়ের শিক্ষা । সৎজীবিকা মানুষের জীবনকে শুদ্ধ রাখে । এই ভাবখানির সাথে সে কিছুতেই আপোষ করে উঠতে পারলো না – আর পারলো না বলেই আজও সে একটি যেনতেন চাকরির জন্যে দুয়ারে দুয়ারে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।

তার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিদের অনেকেই ভালভাবে দাঁড়িয়ে গেছে । এমনকি বিচারবিভাগের নিম্নতম করণিকের চাকরি পেয়েছে যে আধপাগলা শিহাব সেও এখন মাসে লাখ দু’লাখটাকা উপার্জন করে - যদিও তার মাসিক বেতন পনের হাজার টাকা । সরকার যদি একবার অন্ততঃ হিসাব নিয়ে দেখতো সকল কর্মচারী অফিসারদের চাকরী পরবর্ত্তী কালের সম্পদের – তাহলে দেখা যেতো কি বিশাল বৈষম্য – কোথা হতে এতো টাকা পায় ওরা ! উপর থেকে নীচে সর্ব্বস্তরে দূর্নীতি এখন নিয়মে পরিণত – বরং সৎ থাকাটাই যেন এই যুগে অপরাধ । কিন্তু জহির কিছুতেই সততা বিসর্জন দিতে পারে না । মা বলেছে – “বাবা তোর নামের সাথে এমন এক মহামানবের জীবন জড়িত যার তুলনা শুধু তিনিই । তাঁর নামে যেন কোন কলঙ্ক না লাগে –এমনভাবে জীবনে চলো” ।

মায়ের এই কথাটি সারাক্ষণ তার কানে বাজে । সৎ থাকতে পারার মধ্যে একটা আনন্দ আছে – সেই আনন্দের সন্ধান জহির পেয়ে গেছে আগেই। আর তার জন্যেই মায়ের প্রতি জহিরের শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায় । খুব অল্প বয়সে সে হারিয়েছে বাবাকে । তার ঠিক মনেই নেই বাবার মুখচ্ছবি । বাবাও ছিলেন খুব নীতিবাদী মানুষ । সেই কারণেই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে দুর্বৃত্তের হাতে । বাবা যেখানে কাজ করতেন সেই অফিসের টাকা নিয়ে ব্যাংকে যাবার পথে দুর্বৃত্তরা তাঁকে আক্রমণ করে – কিন্তু প্রাণ দিয়েও তিনি তাঁর মালিকের টাকার ব্যাগ ছাড়েননি । অমন বাবার সন্তান হয়ে সে কি করে হাত বাড়াবে অবৈধ উপার্জনের পথে । মাঝে মধ্যে অভাবের তাড়নায় প্রলোভনের হাতছানিতে মন যে দুলে উঠে নি তা’ নয়, কিন্তু বারবার তার মনে হয়েছে মায়ের সেই অমোঘ কথাটিই ।

ভাবতে ভাবতে রাস্তার কল হতে ঢকঢক করে পেটপুরে জল খেয়ে নিলো সে, তারপর ঊঠে বসলো সামনে দাঁড়ানো একটি সিএনজি তে । পাশে একজন ভদ্রলোক ঝিমুচ্ছেন । কিছুদূর গিয়েই সেই ভদ্রলোক নেমে গেলেন । সিএনজিতে সে একা বসে – চোখ গেলো পাশে একটি ছোট্ট ব্যাগে । হাতে নিয়ে দেখলো ব্যাগটা বেশ ভারী । ব্যাগের চেইন খুলে জহিরের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো । এযে অনেক টাকা । নিশ্চয়ই ঝিমুতে থাকা ভদ্রলোকের ব্যাগ – ঝিমুতে ঝিমুতেই নেমে গেছেন – আর ব্যাগের কথা মনে নেই । এতক্ষণে নিশ্চয়ই ভদ্রলোকের ঘুম টুটে হার্টফেল হবার যোগাড় । জহিরের মনের পাতায় তার বাবার আবছা মুখ ভেসে ওঠে ।

সে ব্যাগটা হাতে নিয়ে তড়িৎ নেমে পড়ে – আর হাটঁতে থাকে পেছনদিকে – খুঁজে নিতে হবে সেই ভদ্রলোকটিকে । এই টাকা নিয়ে সে বাড়ী চলে গেলে মায়ের সুচিকিৎসা হবে । বেশ কিছুদিন চাকরি না পেলেও ভালভাবে চলে যাবে । কিন্তু না, লালন সাঁইয়ের নাম জড়ানো এই জীবনে সে অমন কাজ করতেই পারে না । তার চোখে্মুখে এক দৃঢ় প্রত্যয়ের ছাপ পড়ে - যে করেই হোক, সেই ভদ্রলোকটিকে খুঁজে তাঁর ব্যাগটি হাতে তুলেই দিতেই হবে ।

লালন জহির কাঠফাটা এ রোদ্দুরে ঢাকার রাজপথের ভিড় ঠেলে ঠেলে সেই লোকটিকে খুঁজে বেড়ায় ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন