বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৩ আগস্ট ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ১১টি

সমন্বিত স্কোর

২.৪

বিচারক স্কোরঃ ১.৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ০.৬ / ৩.০

সেই প্রথম একদিন

শ্রমিক মে ২০১৬

তুমি কত সুন্দর

ভালোবাসা / ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৫

ব্যথা

ব্যথা জানুয়ারী ২০১৫

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (সেপ্টেম্বর ২০১৪)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৪ ঘণ্টা

মোঃ জাহিদুল ইসলাম
comment ৬  favorite ০  import_contacts ৫৫৬
(এক)
১৯৯৭ সাল।
শহুরে কোলাহল, ঢাকা নারায়ণগঞ্জ মহাসড়ক এর উপর দুর্বার গতিতে ছুটে চলা গাড়ির আওয়াজ আর খেটে খাওয়া মজুর কুলিদের হাক ডাকে শোরগোল শিবু মার্কেট জোন। শহুরে এমন একটি পরিবেশেই মহাসড়কের পূর্ব পাশে একটি বিদ্যালয়, কুতুব আইল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শহরে অবস্থিত হলেও বিদ্যালয়ের পরিবেশটা একেবারে গ্রামের মত। মস্ত মস্ত কতগুলো কড়ই গাছের ছায়ায় সমস্ত বিদ্যালয়টাকে ঢেকে রাখে। উত্তর পাশে বিদ্যালয়ের প্রধান ভবনটা অনেক পুরাতন। পূর্ব ও পশ্চিম পাশের শ্রেণিকক্ষ গুলো টিনের তৈরি। চারপাশের টিনগুলোর অবস্থাও করুণ। সকাল বিকাল তির্যক রৌদ্র খেলা করে ভাঙা টিনের ফাঁক দিয়ে। শুধু দুপুরে যখন সূর্য মাথার উপর থাকে তখনি কেবল কক্ষের ছাত্ররা তির্যক সূর্যরশ্মি থেকে বেঁচে থাকতে পারে। কোন কোন শ্রেণীকক্ষে এমন বিরাট ফাঁক রয়েছে যে, যে কেউ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। অনেকে যায় ও। শিক্ষক মহোদয় গনের সেদিকে খেয়াল রাখার তেমন সময় কই, শহুরে সরকারি বিদ্যালয়। আসেপাসের অন্য সকল বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এখানে ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা ঢের বেশি। কিন্তু এদের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক এখানে নেই। যারা আছেন তারাই কোনরকমে বিদ্যালয়টাকে চালিয়ে যাচ্ছেন। টিনের ফাঁক দিয়ে একজন পালিয়ে গেল মানে দায়িত্ব পালন একটু সহজ হল শিক্ষকদের কাছে। তাই ওদিকটা কেউ তেমন একটা লক্ষ করেন না।

ছয় বছর পূর্ণ করে জাহিদ এবার সাতে পা দিয়েছে। মা বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন ওকে এবার বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেবার। আলমগির জাহিদের এক প্রতিবেশি। বয়েসে দুই বছরের বড়। বাবা যখন জাহিদকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন আলমগিরের মা জাহিদের বাবার কাছে এসে বললেন আলমগিরকেও একি সাথে ভর্তি করে দিয়ে আসতে। বাবা দু জনকেই নিয়ে গিয়ে কুতুব আইল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণীতে বসিয়ে শ্রেণী শিক্ষক আজিজ স্যারকে বললেন দুজনকে ভর্তি করে নিতে। স্যার বাবার কাছে থেকে যাবতিয় তথ্য রেখে তাকে আস্বস্থ করে বিদায় দিলেন। যাবার আগে জাহিদ ও আলমগির কে কোন প্রকার দুষ্টুমি করতে নিষেধ করে গেলেন।

অন্য সকল শ্রেণীর জন্য বেঞ্চ, টেবিল থাকলেও শিশু শ্রেণীতে তা নেই। মেঝের ওপর হোগলা বিছিয়ে তাতে সকল ছাত্র ছাত্রীরা বসে। আজিজ স্যার শ্রেণীকক্ষে ঢুকতেই সবাই একটা লম্বা সালাম দিল। আজিজ স্যার তাঁর আসনে এসে বসলেন। গাঁয়ে পাজামা পাঞ্জাবী, মাথায় টুপি, চোখে চশমা আর মুখ ভর্তি পাকা-কাচা দাড়ি। কিন্তু উনি একজন ভীষণ লোক, খুবই রাগী। যাদের নাম আগেই খাতায় ছিল একে একে তাদের ডেকে গেলেন স্যার। সবার উপস্থিতি দেয়া শেষ হলে জাহিদ ও আলমগির কে আজিজ স্যার বললেন নিয়মিত ক্লাশে আসতে। ক্লাশে নিয়মিত হলে খাতায় নাম তুলে নিবেন। জাহিদ ও আলমগির হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল। স্যার পড়াতে শুরু করলেন অ আ ই ঈ......

জাহিদ ও আলমগির এখন ক্লাশে নিয়মিত। স্যার ওদের নাম খাতায় তুলে নিয়েছেন। জাহিদের দুজন বন্ধুও হয়েছে মামুন আর গোলাম রাব্বি। মামুন কিছুটা কালো, হ্যাংলা আর লম্বা আর গোলাম রাব্বি খাটো, সুঠাম দেহ আর ফর্সা। আর জাহিদ সব দিক থেকেই মাঝারি... ও কালোও নয় ফর্সাও না, শ্যামলা; লম্বাও নয় খাটো ও নয় আবার হ্যাংলা ও নয় মোটাও নয়। তিন জন তিন রকম। দারুণ একটি দল বলা যায়। আলমগির কিছুটা মোটা আর ওর সাথে জাহিদের তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই, শুধু প্রতিবেশী বলে একসাথে আসা যাওয়া হয় এ পর্যন্তই। ওরা সবাই স্কুল শুরুর বিশ পঁচিশ মিনিট আগেই স্কুলে এসে পরে। এ সময়টা ওরা মাঠে বরফ পানি খেলে। এ খেলায় একজন থাকে বরফ আর বাকিরা পানি। বরফ যাকে দৌড়ে একবার ছুঁয়ে দিতে পারে তাকে ঐখানেই বরফ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অন্যান্যরা যদি তাকে ছোঁয়া দিয়ে ‘পানি’ দিতে পারে তবে সে আবার দৌড়াতে পারবে কিন্তু এর আগেই যদি বরফ সবাইকে ছুঁয়ে বরফ করে দেয় তবে এ পর্বের খেলা শেষ হয় আর প্রথম যাকে বরফ করা হয়েছিল তাকে বরফ বানিয়ে পুনরায় নতুন পর্ব শুরু হয়। খেলোয়াড়ের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে প্রাথমিক ‘বরফ’ এর সঙ্খ্যা নির্ধারণ করা হয়। চার জনে একজন, আটজনে দুইজন, বারো জনে তিনজন এভাবে তা নির্ধারণ করা হয়। ওদের আজকের খেলাটা বেশ জমে উঠেছে। টস করার পর ‘বরফ’ হয়েছে জাহিদ। আলমগির মোটা বলে খুব বেশী দৌড়াতে পারে না। তাই সবার প্রথম লক্ষ্যই হয় আলমগির। জাহিদ ও তাই করল। প্রথমে আলমগির কে ‘বরফ’ বানিয়ে দিল। এরপর একে একে সবাইকে। এবার আলমগির যখন বরফ হয়েছে, ও আর কাউকে ছুঁয়ে দিতে পারছে না। জাহিদ, মামুন আর গোলাম রাব্বি তিনজনে মিলে বেশ মজা করছে। আলমগির ঘেমে নেয়ে একাকার। ওর যেন জান বেড়িয়ে যাচ্ছে দৌড়াতে দৌড়াতে। এমন সময় ঘণ্টা বেজে উঠলো, এসেম্বলির ঘণ্টা। আলমগির যেন মুক্তি পেয়ে গেল। একে একে সবাই সারিতে দাঁড়াতে শুরু করল। পি.টি হবে, শপথ পাঠ হবে আর জাতীয় সংগীত গাওয়া হবে এসেম্বলিতে। এ সময়টা জাহিদের বিরাট বিরক্ত লাগে। নড়াচড়া নেই, রোবটের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কয়েক জন্য শিক্ষক হাতে বেত নিয়ে প্রতি সারির মাঝে টহল দেন। কারো একটু নড়াচড়া চোখে পড়লেই পায়ের গোছায় আর পাছায় ঠাশ ঠাশ শব্দে বেত বসিয়ে দেন। শিশু শ্রেণীর কাউকে অবশ্য তারা মারেন না তবে বড় ভাইদের মার দেখেই তাদের কলিজার পানি শুকিয়ে যায়। এ সময় জাহিদ আরেকটি ঘণ্টার অপেক্ষায় থাকে। এক দৌড়ে ক্লাশে গিয়ে বসে পড়বে সে, কিন্তু তাও করা যাবে না; সারিবদ্ধ হয়ে যেতে হবে। হোক সারিবদ্ধ এখান থেকে যাওয়াটাই বড় কথা। কখন বাজবে সে ঘণ্টা???

(দুই)
১৯৯৮ সাল। জানুয়ারি মাস।
আজ বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। এবছর জাহিদ প্রথম শ্রেণীতে বিনা হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে। বিনা হিসেবে উত্তীর্ণ হওয়ার কারণ হিসেবে বলা যায় সরকারি বিদ্যালয়ে পরীক্ষা নেয়ার ঝামেলাকে। এ বিদ্যালয়ে শিশু ও প্রথম শ্রেণীর ছাত্রদের কোন পরীক্ষা হয় না। কদাচিৎ হলেও সে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন হয় না। শিশু ও প্রথম শ্রেণীর সব ছাত্র ছাত্রীকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করার মতো সাধারণ পাশ ঘোষণা করা হয়। ছাত্র ছাত্রীরা সবাই মিলে এর একটা গাল ভরা নাম দিয়েছে, ওরা একে বলে ‘লাডে পাশ’। আলমগির, মামুন, গোলাম রাব্বি, জাহিদ সহ শিশু শ্রেণীর বাকী সবাই ‘লাডে পাশ’ হয়ে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। শ্রেণী রোল নং পূর্ববর্তী শ্রেণীরটাই বহাল আছে। আজ প্রথম পিরিয়ড হচ্ছে বাংলা। বাংলা শিক্ষিকার নাম জেসমিন। জেসমিন আপা কিছুটা মোটা তবে রাগী নন। আজ শুধু রোল কল করেই তিনি ছুটি ঘোষণা করে দিলেন। বললেন আগামীকাল বই দেয়া হবে। কাউকে উনুপস্থিত না থাকতে বললেন তিনি। ওরা শ্রেণী কক্ষ থেকে বের হবার একটু পরেই ছুটির ঘণ্টা পড়ল। অন্যান্য শ্রেণীর সকলের ও ছুটি। তাদের ও বই কাল দেয়া হবে বলে ছুটি হয়ে গেল। ওরা বিদ্যালয়ের ফটক পেরিয়ে এসে পড়েছে এখনও বাজছে সেই ঘণ্টা। দপ্তরী আজ থামছে না কেন। আজ কি ওরও আনন্দ লাগছে তাড়াতাড়ি কর্ম হতে ছুটি পেয়ে। সেই আনন্দেই কি কাঠের হাতুড়ি দিয়ে একটানা পিটিয়ে যাচ্ছে কাসার তৈরি গোলাকার ঐ ঘণ্টা?

বিদ্যালয়ের সবাই বই পাওয়ার পর গত একমাস যাবত নিয়মিতই বিদ্যালয় চলছে। আলমগির, মামুন, গোলাম রাব্বি, জাহিদ সবাই নিয়মিত বিদ্যালয়েও যাচ্ছে। ওদের বরফ পানি খেলাও জমছে আগের মতই। জেসমিন আপা, আজিজ স্যার, হক স্যার সবাই নিয়মিত শ্রেণী কার্যক্রমে আসছেন। দিনগুলো ভালোই যাচ্ছে। জানুয়ারি মাসের শীতে শ্রেনিকক্ষের ভাঙা টিনের ফাঁক দিয়ে রোদ গাঁয়ে পড়ছে, কেউ কেউ পড়া ফাঁকি দিয়ে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে রোদ পোহাচ্ছে। একটু দুষ্টু প্রকৃতির মামুন কখনো কখনো ঐ আরামপ্রিয়দের খোঁচা মেরে শান্তি ভঙ্গ করছে। কেউবা দাঁড়িয়ে নালিশ করছে আপার কাছে। ফলাফল স্বরুপ শাস্তি জুটছে দু’জনের ভাগ্যেই। এতে বিনোদন পাচ্ছে পুরো শ্রেণীর সবাই। পড়াশুনাকে উপভোগ করছে বাচ্চা বাচ্চা ছাত্র ছাত্রীরা। বাড়ির চেয়ে বিদ্যালয় এখন মজার। ছুটির ঘণ্টার চেয়ে এখন হক স্যারের কাশি মজা লাগে বেশী। পড়তে খুবই মজা, মজা খুবই পড়তে। ‘পড় সব, এক রব... পড়ি বই, জ্ঞানী হই... পড়ার জুটি, এবার ছুটি’। ঘন্টা পড়ে। বিদ্যালয় ছুটি হয়ে যায়। মামুন, আলমগির, গোলাম রাব্বি, জাহিদ সবাই বেড়িয়ে পড়ে বিদ্যালয় হতে। বরাবরের মতই আজও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কটি পাড় হতে হবে। জাহিদ, মামুন ও আলমগির পাড় হয়ে যায় এক সাথে। গোলাম রাব্বি একটু পিছু পড়ে যাওয়ায় ওকে একটু অপেক্ষা করতে হয় যান ফাঁকা হওয়া পর্যন্ত। ওপারে ওরা তিনজন দাঁড়িয়ে আরছে। ফাঁকা পেতে তর সইছে না গোলাম রাব্বির। ও রাস্তা পাড় হতে চায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। রাস্তার অর্ধেকটা পাড় হতেই একপাশ হতে টিন টিন ঘণ্টা বাজিয়ে আসতে থাকে একটি রিকশা। অনেক কাছা কাছি। রিকশাটিকে যেতে দেয়ার জন্যেই কয়েক পা পিছিয়ে যায় গোলাম রাব্বি। কিন্তু পেছন দিয়ে যে আধুনিক ইঞ্জিনের নিঃশব্দ মিনিবাসটি আসছিল ও তা খেয়াল করেনি। মিনি বাসের গতি স্বাভাবিকই ছিল। ঘটনার পড়ে তা দ্বিগুন গতিতে ঐ স্থান থেকে হারিয়ে গেল। কিছু লোক জড় হয়ে গেল মুহূর্তেই। ঘটনার চাক্ষুস সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তিনটি শিশু। জাহিদ ওর চোখ বন্ধ করে নিয়েছে। দু’কান হাত দিয়ে চেপে ধরেছে। ও আর কিছু দেখতে চায় না, শুনতেও চাচ্ছে না কিছু এখন। ওর মাথা ঘুরছে। মনে হচ্ছে ও পড়ে যাচ্ছে। রাস্তার ধারে। ও চক্ষু এখনও খোলেনি, তবুও মনে হচ্চে ও দেখছে। একটি রিক্সা আসছে, বেশী দূরে নয়। রিকশায় একজন চালক। দুটি হাত রিকশার দুটি হ্যান্ডেলে। ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলটা একটা ঘণ্টা বাজাচ্ছে। আর চিকন সুরে সেখান থেকে বেরুচ্ছে একটাই শব্দ টিন, টিন, টিন, টিন।

জাহিদ চোখ খুলে দেখে ও একটি ঘরে শুয়ে আছে। মাথাটা ভেজা। হয়ত কেউ এতক্ষণ পানি ঢেলেছে। ও ভালো করে চোখ কচলে তাকায়। ঘরটা বেশ অন্ধকার। টেবিলের উপরে একটি মোম জ্বলছে। মনে হয়ে এখন রাত। ও ভালো করে চোখ কচলে তাকায়। ও ওদের নিজেদের ঘরেই শুয়ে আছে। ও কি তাহলে এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু বাড়ি আসল কখন ও। ও তো মহাসড়ক পাড় হলো মাত্র আলমগির আর মামুনের সাথে। গোলাম রাব্বি এখনও পাড় হয়নি। ওরা তো ওর জন্যই অপেক্ষা করছে। তবে কি ওরা গোলাম রাব্বিকে রেখেই চলে এসেছে? কখন আসল। জাহিদের মনে পড়ছে না। কিন্তু কেন? বারবার ওর মনে ভেসে উঠছে একটি রিক্সার ঘণ্টা, একটা টিন টিন শব্দ। গোলাম রাব্বির ফর্সা চেহারাটা মনে পড়ছে না, কেমন যেন ভেজা ভেজা লাল রঙ ভর্তি ওর চেহারায়। ও গালে রঙ মেখেছে কোথা হতে? ওকি তাহলে রঙ কিনতে গিয়ে পিছিয়ে পড়েছিল। জাহিদ আবার চক্ষু বুজে ফেলে। গোলাম রাব্বি আবার আসে গালে রঙ মেখে, ওর হাতে একটা রিকশার ঘণ্টা।

(তিন)
বিদ্যালয়টা বাড়ির চেয়েও মজার ছিল। একদিন বিদ্যালয়ে না গেলে মনটাই খারাপ হয়ে যেত জাহিদের কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি তার। শরীর খারাপ। থেমে থেমে জ্বর আসে রাত হলেই। ঘুমে ভয়ংকর সব স্বপ্ন দেখে। একদিন দেখল একটা রিক্সা আর একটা মিনিবাস। মিনিবাসের একটা দরজা খোলা। সেই খোলা দরজাটা রিকশার হাতলের সাথে লেগে আছে, মনে হল যেন করমর্দন করছে তারা, আর পরিকল্পনা করছে কোন এক বিরাট কর্মের। মিনিবাসটা কুচকুচে কালো, আর রিকশাটা নীল কিন্তু তার ঘণ্টা টা টুকটুকে লাল। জাহিদ দেখে রিক্সার সিটে বসে আছে গোলাম রাব্বি। তার একপাশের গাল বেয়ে লাল রঙ গড়িয়ে পড়ছে আর কিছুক্ষন পর পর সেই রঙ হতে একটু রঙ নিয়ে ঘণ্টার গায়ে মাখছে সে। মিনিবাসটা চালাচ্ছে আলমগির। আর রিক্সার পেছন সিটে বসে আছে ও আর মামুন। ওরা বারবার গোলাম রাব্বিকে বলছে মিনিবাসের দরজাটা সরিয়ে দিতে, কিন্তু গোলাম রাব্বি সেটা শুনছে না, মিনিবাসের সাথেই সম দ্রুতিতে এগিয়ে চলছে সামনের দিকে। হঠাৎ রিকশার চাকা একটি গর্তে পরে গেলো। একটা ঝাঁকুনি খেয়ে গোলাম রাব্বি পরে গেল রাস্তায়। সে মিনিবাসের দরজাটা ধরে ঝুলে আছে। আলমগির তবুও মিনিবাস থামাচ্ছে না। ও আরও গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। গোলাম রাব্বি আর ধরে রাখতে পারছে না। পিচ ঢালাইয়ের রাস্তার ঘর্ষণে পা দুটো ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেছে। অসহ্য যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে গোলাম রাব্বি। ও প্রাণপণ চেষ্টা করছে দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার। কিন্তু পারছে না। এক সময় পরাস্ত হয়ে গেলো ও। হাত হতে ফসকে গেল মিনিবাসের দরজা। লুটিয়ে পড়ল পিচ ঢালাইয়ের রাস্তার ওপর ওর শরীর। আর মিনিবাসের পেছনের চাকাটা চলে গেল ওর ঠিক বুকের উপর দিয়ে, মা বলে একটা বীভৎস আওয়াজ বের হল ওর মুখ দিয়ে। ‘মা’ শব্দটা এত বীভৎস হতে পারে এর আগে কখনো শোনেনি জাহিদ। ততোক্ষণে ওদের রিকশা অনেক পেছনে পড়ে গেছে। রিকশার গতি থেমে গেছে। জাহিদ আর মামুন দৌড়ে যায় গোলাম রাব্বির কাছে। ততোক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে ছেলেটা। ওকে বাড়ি নিতে হবে। মহাসড়কের মাঝখানে কি কেউ ঘুমায়? বাড়িতে ভালো বিছানা আছে। একটা রিকশা দরকার ওকে বাড়ি নিতে। দূরে ওদের সেই রিক্সাটি থেমে আছে। নীল, গাঢ় নীল তার রঙ। কিন্তু দূর হতেও স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে টুকটুকে লাল সেই ঘণ্টাটা। জাহিদ ভয় পেয়ে যায়, না ঐ রিকশাতে আর উঠানো যাবে না গোলাম রাব্বিকে। ঘুম ভেঙ্গে যায় জাহিদের।

সেদিন সকাল হতেই ভীষণ জ্বর আসে ওর। মামুন আর আলমগির আসে ওকে নিয়ে একসাথে বিদ্যালয়ে যাবে বলে। ওদেরও শরীর ভালো ছিল না বলে এ কয়দিন বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি। এসেই দেখতে পায় জাহিদের শরীর ভীষণ খারাপ। ওদেরও মনটা খারাপ হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেয় ওরাও আজ বিদ্যালয়ে যাবে না। কিছুক্ষন জাহিদের পাশে বসে থেকে ওরা ফিরে যায় যার বাড়ি। আবার একা হয়ে পড়ে জাহিদ। বিছানায় শুয়ে থাকে চুপ করে। ও একটু ঘুমুতে চায়, কিন্তু ভয় পায় ঘুমুতে। চোখের পাতা বন্ধ হলেই ভেসে উঠে বিদ্যালয়ের সেই ঘণ্টা, যার প্রতীক্ষাতে এসেম্বলির মাঠে কত অধীর আগ্রহে থাকতো ওরা। আর সেই রিকশার ঘণ্টা, যা বেজে চলেছে টুন টুন টুন টুন, আর গোলাম রাব্বি পিছিয়ে যাচ্ছে একপা দু পা করে।। অতঃপর একটি মিনিবাস... অতঃপর...... একটি সর্বনাশ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • ওয়াহিদ  মামুন
    ওয়াহিদ মামুন অনেক ভাল লাগা জানিয়ে গেলাম। সুন্দর গল্প উপহার দিয়েছেন। শ্রদ্ধা জানবেন।
    প্রত্যুত্তর . ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
  • সহিদুল  হক
    সহিদুল হক valo laga janalam vote-er madhyome, onek suvo kamona
    প্রত্যুত্তর . ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
  • মোজাম্মেল  কবির
    মোজাম্মেল কবির গল্পটা বেশ ভালো লেগেছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বিষয়ের সাথে মিল খুঁজে পেলাম না। শুভ কামনা রইলো...
    প্রত্যুত্তর . ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
    • মোঃ জাহিদুল ইসলাম ঠিক বলেছেন ভাই। আসলে গল্পটা সেদিনই পোস্ট করা যেদিন 'গল্পকবিতা'য় যোগ দিয়েছি। অনেক নিয়ম কানুন ই জানা ছিল না। পোস্ট করার পর জানতে পারি এখানে বিষয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতা হয়। তখন ড্যাশবোর্ড হতে ডিলিট করতেও পারিনি। তাই এটাই রয়ে গেল। আগামীতে অবশ্যই চেষ্টা করবো বিষয়ভিত্তিক লেখা দিতে। সুন্দর মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ ভাই।
      প্রত্যুত্তর . ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪