বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ১টি

সমন্বিত স্কোর

৪.০৮

বিচারক স্কোরঃ ১.৯৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

দুঃখ (অক্টোবর ২০১৫)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.০৮ দুঃখের ধারা

Mir An-Nazmus Sakib
comment ৪  favorite ১  import_contacts ৭১৬
বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে তাকিয়ে আছি বাইরের দিকে। বর্ষার শেষ মুহূর্ত। কাল থেকে শুরু হবে শরৎ। যদিও বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও নেই। মৃদু বায়ে যেন বইছে শরতের স্নিগ্ধ হাওয়া। সে হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার প্রতিটি শিরা-উপশিরাগুলোকে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আছে ভেতরে ভেতরে। যদিও বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না। মাটির চুলোয় আগুনকে যেমন বাতাস করে উষ্কে দেয়া হয়, তেমনি শরতের মৃদু হাওয়া যেন আমার অন্তরের আগুনকে বার বার উষ্কে দিচ্ছে। আমি কি আজ তবে পরাজিত? পরাজিত এক পঙ্গু যোদ্ধা? চিরকাল জয়ের সুবাতাস পাওয়া মানুষটি কি আজ জীবন যুদ্ধের নির্মমতায় হারের স্বাদ পেতে চলেছে? ভাবতে পারছি না। বুক ফেটে উদগীরিত চোখের জল যেন আজ নয়ন কোটর হতে উথলে আসতে চাইছে। পারছি না, আমি আর পারছি না...

আমার অন্তরে আগুনের এই লেলিহান শিখা প্রজ্জ্বলিত হলো মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে। অথচ ধীরে ধীরে তা অন্তরে বাসা বেঁধেছিল আজ থেকে বছর চারেক আগে। ভার্সিটিতে বছর খানেক কাটানোর পর আজকের মতো কোন এক বৃষ্টিহীন বর্ষার শেষ প্রহরে। ধোঁয়াটে এই জীবন যেন সেইদিনের পর আর পিছু ছাড়েনি। প্রতিনিয়ত গ্রাস করে গেছে এই শরীর আর অন্তরকে। ধীরে ধীরে কেড়ে নিয়েছে আমার সবকিছু।

আজ থেকে বছর পাঁচেক আগের কথা। ভার্সিটির প্রথম দিন, ডিপার্টমেন্টাল ওরিয়েন্টেশন। আমি বসে আছি সামনের সিটে। বসে বসে শুনছি স্যার-ম্যাডামদের জ্বালাময়ী বক্তব্য। ভার্সিটিতে আসার আগে শুনেছিলাম, ভার্সিটি জীবন অনেক স্বাধীন; কোন বাধা নেই। অথচ স্যার-ম্যাডামদের এটা করতে পারবে না, ওটা করতে পারবে না শুনতে শুনতে কান প্রায় ঝালাপালা হওয়ার অবস্থা। মনে হল কলেজ জীবনের গৎবাঁধা, বিস্বাদ জীবন ছেড়ে আরেক বিস্বাদ জীবনে এসে পদার্পণ করেছি। এক কারাগার থেকে অন্য এক কারাগারে এসে পড়েছি। পরিবর্তন হয়েছে শুধু কারাগারের নামে, কাঠামোটা একই আছে।

‘কী, খুব বিরক্ত লাগছে তাই না?’ – পাশ থেকে একটা কণ্ঠ কানে আঘাত হানলো। মনে হল কণ্ঠটা কানে নয়, সরাসরি মনের গহীনে আঘাত করেছে। এত মধুর কণ্ঠ যেন আগে শুধু একবারই শুনেছি। যেন মায়ের মুখের সেই মমতামিশ্রিত বুলি, যেটা শুনলাম আজ মায়ের মৃত্যুর বছর তিনেক পর। তাকিয়ে দেখি পাশে বসা এক সুনয়না অনন্যা আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যদিও সেই চোখজোড়া ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। মুখ হিজাবে ঢাকা সদ্য তরুণীটির উম্মুক্ত চোখদুটো যেন আরেকবার মনের গহীনে আঘাত করলো। আমি তার কথার জবাব দিলাম, ‘এই আর কী’? হাসলো সে, যদিও সে হাসি চাপা পড়ে গেলো ঢাকা মুখের নিচে। এককথা-দুকথায় শুরু হল সুনয়না তরুণীটির সাথে আমার নতুন অধ্যায়। ওর নাম দিয়া। সেদিনের পর থেকে আমার সামনে উঠে গেলো ওর অবগুণ্ঠন। ওর সাথে গড়ে উঠলো আমার এক প্রগাঢ় বন্ধন।

আমি আর দিয়া প্রতিদিন ক্লাসে পাশাপাশি বসতাম। পরীক্ষাতেও তাই। ক্লাস শেষে আড্ডা চলতো বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত। আমরা একজন আরেকজনকে এতো বেশি ভালো বুঝতাম, একে অন্যের কাছে এতো বেশি নিজেদের হাসি-কান্নার কাহিনী শেয়ার করতাম যে, অল্পদিনেই আমরা হয়ে উঠলাম ‘সোল মেট’। একে অন্যকে এমনভাবে কেউ এতো বেশি চিনতে পারে, বুঝতে পারে, তা আমাদের না দেখলে বোঝাই যেত না! ওর প্রতি আমার মনের গভীরে এক ধরণের দুর্বলতা কখন যে জন্ম নিয়েছিল তা টেরও পাই নি। তা যে শুধু বন্ধুত্ব নয়, এর চেয়েও বেশি কিছু তা অনুভব করি শিগগিরই। ততদিনে প্রায় বছর খানেক পেরিয়ে গেছে। এক স্নিগ্ধ বর্ষার বিকেলে সিদ্ধান্ত নিলাম দিয়াকে মনের কথাটা বলার। ক্যাম্পাসের পুকুরপাড়ে ওকে ডেকে পাঠালাম। ও মোবাইলে জানালো আমাকে কিছু বলার আছে ওরও। খুশিতে মনটা ভরে উঠলো, আমি যা চাই ও ওতো তাই চায়! ওর প্রিয় রজনীগন্ধা পেছনে লুকিয়ে রেখে প্রথমে জানতে চাইলাম ও কী বলতে চায়? কিন্তু সেদিন ওর মুখ থেকে নিঃসৃত কথাগুলো আর মধুর মনে হয় নি। মনে হয়েছে কাঁটার মতো, ঠিক যেন বুকে এসে বিঁধছে। দিয়াকে গতকাল দেখতে এসেছিলো, এনগেজমেন্ট করে গেছে। আগামী সপ্তাহে ওর বিয়ে। ছেলে বিলাতে থাকে। বিয়ের পর বউকে নিয়ে বিলাতে চলে যাবে। দিয়া তার পরবর্তী পড়াশোনা বিলাতেই করবে। আমার হাতের আড়াল থেকে ছুটে নিচে পড়ে গেলো রজনীগন্ধার স্টিকগুলো।

দিয়ার বিয়ে হয়ে গেলো। কিন্তু বুকে কষ্টের লেলিহান শিখা জ্বলছে বলে আর তাতে তুষের গুঁড়ো দিতে বিয়েতে যাই নি। আর যোগাযোগও রাখি নি। ও কবে বিলাতে চলে গেছে সে খোঁজখবরও নেই নি। হয়ত বন্ধুত্বের জায়গাটা থেকে আমি কাজটা খুব খারাপ করেছি। প্রাণের বন্ধু হিসেবে ওর অন্তত এতটুকু পাওয়ার অধিকার ছিল। যা আমি দিতে পারি নি। কিন্তু ওর এই চলে যাওয়াটা যে আমার জীবনটাকে এমনভাবে পরিবর্তন করবে ভাবি নি কখনো। ঠোঁট নিকোটিনকে বহু বছর আগেই ছুঁয়েছিল। সেদিনের পর থেকে অ্যালকোহল, গঞ্জিকা, হেরোইন, ইয়াবা, প্যাথিড্রিনকে এক এক করে ছুঁয়ে দেখলো আমার ঠোঁট, গলা, লিভার, ফুসফুসসহ শরীরের সবকিছু। ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকলো পুরো শরীরটাকে। ক্লাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান ছাত্রটি পরিণত হল ক্লাসের সবচেয়ে অপদার্থ ছাত্রতে আর একজন সুঠাম দেহের অধিকারী পরিণত হল কংকালসারে।

মাকে হারিয়ে বাবা গত কয়েক বছর ধরেই নিঃসঙ্গ, ব্যথিত; হার্টের রোগে জর্জরিত। একমাত্র ছোটবোন রিতা বলতে গেলে আমার আর বাবার নয়নের মণি। বাবা আর রিতার একমাত্র ভরসা ছিলাম আমি। মাস্টার্স শেষ করে ভালো একটা চাকরি করবো, রিতাকে ভালো পাত্রস্থ করবো। কিন্তু সব আশায় গুঁড়েবালি। নেশা আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। শরীরে শত শত ছিদ্র। এই ছিদ্রগুলো দিয়ে সিরিঞ্জের সাথে কখন যেন শরীরে প্রবেশ করেছে এইচআইভি ভাইরাস। দিন গুণছি চিরতরে বিদায়ের। বাবা আর রিতাকে সমাজে একরকম একঘরে করে দিয়েছে। তাঁদের খুব একটা খোঁজখবরও কেউ নেয় না। এইচআইভি পজিটিভ একটা শীর্ণকায় মাদকাসক্ত তরুণের পরিবারকে বোধহয় এভাবেই লাঞ্ছনা সহ্য করে যেতে হয়! মায়ের মৃত্যুশোক আর আমার দুঃসংবাদ সব মিলিয়ে বাবা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়লেন। হয়ে পড়লেন আরও অসুস্থ।

বাবার চিকিৎসার টাকা যোগাড় করতে পারি নি, অথচ নেশার টাকা ঠিকই ছিনিয়ে নিয়েছি মানুষের কাছ থেকে। প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করে, টিউশনি করে অনেক কষ্টে রিতা সংসারটাকে টানছিলো, বাবার চিকিৎসা চালাচ্ছিলো। কিন্তু আমি এ কী করলাম? আদরের বোনটার পার্স থেকে টাকা সরিয়ে নিলাম নেশার জন্য। কী করে করলাম আমি এটা? পরে অবশ্য জেনেছি সংসার চালাতে আর বাবার চিকিৎসার খরচ জোটাতে আমার আদরের বোনটাকে নিজের শরীরটাকে পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। রিতার কাছে ক্ষমা চাইলাম মনে মনে- ‘পারলে তোর অপদার্থ ভাইয়াটাকে মাফ করে দিস বোন, তোর ভাইয়া তোর জন্য কিছুই করতে পারে নি’।

দুদিন আগে বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়। হাসপাতালের সিসিইউতে অচেতন বাবার দেখটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম এক দৃষ্টিতে। বাবার এ অবস্থার জন্য আমিই দায়ী। আমার জন্যই বাবাকে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে এতো তাড়াতাড়ি। আমি বাবার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। বাবার অপারেশন হলো। কিন্তু বাবাকে প্রয়োজনীয় রক্তও দিতে পারি নি। এইচআইভি ভাইরাস আর মাদক বহনকারী রক্ত কী করে দেবো আমি? যথারীতি রিতাই যোগাড় করেছে রক্ত ব্লাড ব্যাংকগুলোতে ঘুরে ঘুরে।

কিন্তু কোন লাভ হল না। আজ ভোরবেলা বাবা চলে গেলেন। আমাদের ছেড়ে দিয়ে চিরতরে চলে গেলেন তাঁর প্রিয়তমার কাছে। বাবা বেঁচে গেছেন- সকল কষ্ট, সকল দুঃখ সহ্য করার হাত থেকে। রিতা শোকে পাথর হয়ে গেছে। অথচ কী অপদার্থ ছেলে আমি! বাবার জানাযা পড়তে পারলাম না, পারলাম না তাঁর কবরে প্রথম মাটিটা দিতে। কী করে পারবো? আমি তো পাপী, এ সমাজে যে আমার জায়গা নেই, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পবিত্রতা তো আমার জন্য নষ্ট হয়! আমার তো কোন ক্ষমা নেই। তাই বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে আছি। বসে আছি সকল দুঃখকে বুকে চেপে ধরে। প্রহর গুণছি আমিও, চিরতরে বিদায়ের। আমার মতো একটা নরকের কীট যত তাড়াতাড়ি এ সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, ততই পৃথিবীর জন্য মঙ্গল।

হঠাৎ করে যেন আকাশে মেঘ জমলো, ডেকে উঠলো মেঘেরা। অবশেষে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি এসে যেন জানিয়ে গেলো শরতের আগে এটাই তার শেষ আগমন। অঝোর ধারায় ঝরছে সে। এ যেন শান্তির ধারা নয়, সুখের ধারা নয়। এ হলো আমার বুকে চেপে রাখা দুঃখের ধারা!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন