বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ নভেম্বর ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ২১টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৭৮

বিচারক স্কোরঃ ১.৯৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

ছুঁতে না পারা

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

বোধোদয়

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

অপেক্ষমান

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

প্রত্যয় (অক্টোবর ২০১৪)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৭৮ প্রতীপতরণ

সূনৃত সুজন
comment ৮  favorite ০  import_contacts ৫৫৩
তীর্থ |
আসন্ন ঈদসহ ওর জীবনের হিসেবঘরে ঈদসংখ্যা ৪৮ | জীবনের প্রথম দিকের ঈদ গুলো ওর কাছে সীমাহীন আনন্দের এক একটা আকাশ | সারাবেলা খেলাধূলা আর দস্যিপনায় এতটাই নিমগ্ন থাকত যে খাওয়া দাওয়া ঈদের নামাজের সময় কখন গড়িয়ে যেত টেরই পেতনা সে | বর্ষাকালে বিলের জলে ক'জন মিলে শাপলা, শালুক,পদ্ম আর কচুরীপানার ফাঁকে ফাঁকে কলার ভেলা চালিয়ে হৈ-হুল্লোড় কিংবা রিমঝিম বৃষ্টিতে নালার ওপর বাঁশের সাঁকো থেকে বিচিত্র ভঙ্গির ডিগবাজিতে জল-কাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া, পুকুরে ছোঁয়া ছোঁয়া খেলা অথবা ঝুম বৃষ্টিতে পুকুর তলায় ডুবে থেকে বৃষ্টি ফোঁটার শব্দ শোনার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত সময় পার করত ওরা |
আম কুড়ানোর ফাঁকে মাঝে মধ্যেই গহীন জঙ্গলে ঘুঘু আর বকের ছানার খোঁজে ওদের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ার মত | কখনোবা বাঁশের কঞ্চির বন্দুকে পাটের পাতা কিংবা কচি ফলের গুলি ভরে অথবা কলাপাতার ডাঁটা দিয়ে রাইফেল বানিয়ে গ্রুপিং করে যুদ্ধ করত ওরা | একরাশ ধুলোমাখা শরীরে সাঁঝের বেলায় বাড়ি ফিরে হজম করত মায়ের আদরমাখা পিটুনি আর লোক দেখাও বকুনি | স্নানাহার শেষে ঘুম পাড়াতে মা শোনাতেন কেন্দুয়া বাঘের কিংবা রাক্ষস গুহায় বন্দী রাজকুমারীর গল্প |

রূপকথার মত এরকম হাজারো স্মৃতি যাকে ঘিরে তিনি তীর্থের জননী নন ,মা | ওর ভাষায় -''হাজার নক্ষত্রের দেশ,আঁধারখুনি ফিনিক্স পাখি''|যখন শুক্রাণু সংক্রান্ত পারিবারিক জটিলতায় ওকে ফেলে ওর জননী ওর নানা বাড়িতে চলে যান অস্তিত্ব রক্ষায় তখন ও মাত্র দেড় মাসের বাচ্চা | কাজের লোকদের অবহেলা-অযত্নে মাতৃস্নেহহীন তীর্থের অবস্থা দাঁড়ায় দুর্ভিক্ষের হাড্ডিসার মুমূর্ষু শিশুর মত | ঠিক তখনি ত্রাতার ভূমিকায় আবির্ভাব ঘটে মজিরন নেছার | নিজের চার ছেলেমেয়ে থাকতেও বিধবা এই কোমলমনা মানুষটা বুকে টেনে নেন তীর্থকে | লালন পালনের ভার নেন কোনো প্রকার স্বার্থ ছাড়াই | ততদিনে জননীকে ফিরিয়ে এনেছেন জনক | সে ঘরে কেবল জায়গা হলনা নিষ্পাপ শিশুটির | ভীষণ রোগা পটকা ছিল বলে সবাই ধরেই নিয়েছিল যে তীর্থ বাঁচবেনা | অনেকে মুখ ফসকে বলেই ফেলত -''বাপু, দাওনা পরের ছেলেকে ফিরিয়ে ; কেন পন্ডশ্রম করছ? পারোও বটে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে |'' কারো কোনো কথায় কান না দিয়ে তিনি নির্ঘুম রাত কাটালেন তীর্থের আরোগ্য চিন্তায় | ভোর হবার আগেই দ্রুত বিছানা ছেড়ে ওকে কোলে নিয়ে পায়ে হেঁটে ছুটতেন এগারো কিলোমিটার দুরের খ্রিস্টান মিশনারিতে অথবা সাত কিলোমিটার দুরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে | গাভীর দুধ খাওয়ান মায়ের দুধের পরিবর্তে | এভাবেই তাঁর অদম্য চেষ্টা আর সীমাহীন ভালবাসার জোরে ক্রমশ সুস্থ্য হয়ে ওঠে তীর্থ |
এবার বাঁধলো আর এক ঝামেলা,অর্থাভাবে তীর্থের মৌলিক চাহিদাই মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন তিনি | তাই ও যখন ক্লাস ফাইভ শেষ করলো তখন সিক্স এ ভর্তি হবার বদলে ওকে করতে হলো রুটির দোকান | বিলে মাছ ধরে বিক্রি করত টাকার জন্য | তারপরও হৃদয়ে লালন করত আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন | ওর প্রবল আগ্রহের কারণে ওকে রাখা হলো এতিমখানায় | শুরু হলো দুর্ভোগের দ্বিতীয় অধ্যায় | পরিচালনা কমিটির সীমাহীন দুর্নীতি,অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতার ফলে সেটা হয়ে ওঠে জেলখানা | এতিম্দ্রে স্বাস্থ্যহীনতার বদৌলতে কমিটি সদস্যদের পকেটের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটতে থাকে |

ঠিক এই সময়টায় ওর বাবা-মা আবিস্কৃত হন | ছেলে এতিম খানায় থাকে যখন এ কথা পাড়ার লোকের মুখে মুখে তখন নতুন করে জাগে তার আত্মসম্মানবোধ | কিছু বুঝে ওঠার আগেই মায়ের আদেশ মেনে সে ফেরে জনক-জননীর নীড়ে | ওকে ভর্তি করানো হয় ক্লাস এইটে | কিন্তু কনক্রিটের ঘেরা খাঁচায় তার বাঁধনহারা মন ছটফট করে ওঠে | কিছুতেই ওই পরিবার ও পরিবেশের সাথে খাপ খেতে পারেনা সে | `মা' এবং 'বাবা' ডাকগুলো সে উচ্চারণই করতে পারেনা সংকোচের কারণে | সহজ হতে পারেনা ভাই বোনদের সাথেও | ওর অবস্থা হলো খাঁচায় বন্দী বুনোপাখির মত | এর সাথে আবার সবার স্নেহহীন কৃত্রিম আচরণ |ওহ! অসহ্য যন্ত্রনায় দগ্ধ হতে থাকে সে |

একরাতে বড় ভাইয়ের বাক্তিগত ডায়রিটা চুপিসারে পড়ছিলো তীর্থ | পড়া শেষে দেখল বালিশের অনেকখানি জায়গা ভিজে গেছে অশ্রুতে | ওর বড় ভাইয়ের জীবন কেটেছে ও কাটছে চরম-পরম আদরে | আর ওর ? মনে পড়ল স্কুল থেকে ও কখনই শিক্ষাসফরে যেতে পারেনি অর্থ সংকটে | এখন পর্যন্ত কোনো ঈদ এ পরতে পারেনি নতুন জামা | বাবার আদর কেমন হয় ও বোঝেনা | ভাই বোনের স্নেহ-ভালবাসা কাকে বলে সেও তার অজানা | নিজের মায়ের কোলে চুপটি করে শুয়ে আদর পাওয়ার সৌভাগ্য হইনি ওর |এ জাতীয় অনেক অভাববোধ আজ দানা বেঁধে উঠছে ওর মন-মগজে | বুকফাটা বোবা কান্নার গোপন ব্যথায় বিধ্বস্ত হচ্ছে হৃদয় কুটির | সারারাত ঘুমাতে পারলনা সে | পরদিন কৃত্রিম জগতের মোহমায়া ছেড়ে ও ফিরল পালক মায়ের কুঁড়েঘরে | সবাই অনেক বোঝালো ওকে , সম্পদের লোভ দেখালো কেউ কেউ | কিন্তু ওকে ফেরানো গেলনা কিছুতেই | পরদিনই কাউকে কিছু না বলে ও চলে গেল সবার আড়ালে | পরিচিত কারো সাহায্য ছাড়াই কেবল টিউশনি করেই মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরোয় সে |

তারপর কেটে গেছে অনেকটা সময় | অনেকটা স্রোত বয়ে গেছে জীবননদীর দুকূল ছাপিয়ে | পরিবারের প্রথাগত বন্ধন থেকে সে আজ অনেক দূরে | শাসন-বারণ ,আদেশ-নিষেধের অনেক উর্ধ্বে | নিজকে বারবার ভেঙ্গে বারবার গড়তে ব্যস্ত সে | এতদিনে ও বুঝেছে, কেবল শুক্রাণু বা ডিম্বাণু দিলেই মা কিংবা বাবা হওয়া যায়না | একজন নারীকে তার স্নেহ-ভালবাসা আর যোগ্যতা দিয়ে মা হয়ে উঠতে হয় | তেমনি দায়িত্ব আর কর্তব্য পালনের মাধ্যমে একজন পুরুষকে ক্রমশ বাবা হয়ে উঠতে হয় | তাই সে মনে করে দু জন মানুষের মাধ্যমে জন্মালেও সে পৃথিবী ও প্রকৃতির সন্তান | এখানকার প্রতিটি মানুষ তার আপনজন | গাছতলার মুচিভাই থেকে শুরু করে ঠান্ডা ঘরের সাদা চামড়ার মানুষ গুলো তার চোখে সমান গুরুত্বপূর্ণ | ও ভাবে , যেহেতু দুর্লভ মানবজনম সে একবার পেয়েছে এবং অন্য প্রাণীর পরিবর্তে মানুষ হয়ে জন্মেছে | সে জন্য সে মানুষের কাছে , দেশের কাছে , পৃথিবীর কাছে সর্বোপরি প্রকৃতির কাছে ঋণী | ও জানে এই ঋণ তাকেই শোধ করে যেতে হবে | মাঝে মাঝে তার ভেতরের মানুষটা বলে ওঠে ' মানুষ সেজনা , মানুষ হও'| তাই মানুষ হওয়ার নেশায় বিভোর সে দৃপ্ত প্রত্যয়ে বলীয়ান | সে চিন্তা করে , কোনো সুস্থ্য চিন্তার সুস্থ্য মানুষ কখনো নেশা বা মাদকাসক্ত হতে পারেনা এমনকি সিগারেটেও নয় | মানুষ কখনো মানুষ হত্যা কিংবা আঘাত করতে পারেনা | দুর্নীতি অথবা মিথ্যার চর্চা কোনো স্বাভাবিক মানুষের কাজ নয় | হাস্যকর হলেও ভয়ংকর সত্য কথা হচ্ছে , শত চেষ্টা করেও নিজেকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারেনি তীর্থ | হাজার দুশ্চিন্তায় মাস্তান কিংবা নেশাখোর হওয়ার পরিবর্তে ও হয়েছে শিল্পশ্রমিক , স্বপ্ন চাষী আর প্রচন্ড আত্মপ্রত্যয়ী | কুসুম কোমল সরল মুখোশের আড়ালে মানুষের ভয়ংকর কুটিল রূপ দেখে মাঝে মাঝে আঁতকে ওঠে তীর্থ | যেদিক তাকায় সেদিকই অসংগতি আর ভুল চিন্তার প্রয়োগ দেখে অবাক হয় সে | তারপর হতাশ হওয়াটা ওর অভিধানে নেই | ও বোঝে , সমাজ-সংসারের চলমান এই বিপরীত স্রোতই তার চলার পথ | ও মনে করে , একমাত্র মানুষই পারে মুখোশধারী মানুষগুলোকে সত্যিকারের মানুষ বানিয়ে পৃথিবীকে ভূস্বর্গ রূপে গড়ে তুলতে | আর তখনই সার্থক হয়ে উঠবে সৃষ্টিকর্তার প্রতিটি সৃষ্টি | সেই বোধ আর চেতনা থেকেই নিজেকে পৃথিবীর যোগ্যতম মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তার নিরন্তর প্রচেষ্টা বহমান |
প্রত্যয়ী তীর্থ |
জন্ম যার উঁচু ঘরের নিচু মানুষের মাধ্যমে , শৈশব-কৈশোর কেটেছে নিচু ঘরের উঁচু মানুষের স্নেহ-ছায়ায় | যৌবন কাটছে তার আপন আঙ্গিনায়...( চলবে )
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন