বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ ডিসেম্বর ১৯৯৪
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৯

বিচারক স্কোরঃ ২.১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (সেপ্টেম্বর ২০১৪)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৯ অমরত্ব

অনন্তের আগন্তুক
comment ২  favorite ০  import_contacts ৫৫৩
প্রায় পনেরো বছরের সাধনা পুরণ হল অন্তর চৌধুরীর। এই দীর্ঘ সময়ে অজস্রবার সংবাদপত্র, নিউজ চ্যানেলে বলাবলি হয়েছে যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর ডঃ চৌধুরীর কোনও উল্লেখযোগ্য কাজ নেই কেন? “হুহ! নিজের চরকায় তেল না দিয়ে আমার সমালোচনা করতেই ব্যাস্ত সবকটা দুর্বুদ্ধিজীবী।” এই কথাটা মনে মনে প্রচুরবার বলেছেন উনি। ‘ওদের যদি সামান্য ধারনাও থাকত যে আমি কি করার চেষ্টা করছি তাহলে আমাকে ভগবানের আসনে বসিয়ে রাখত ওরা।’ আর আজ, প্রায় পনেরো বছরের অক্লান্ত পরিস্রমের পর সত্যিই নিজেকে ভগবানের সাথে তুলনা করতে পারেন তিনি। আরও একবার নিজের ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকালেন উনি। পেরেছেন, উনি পেরেছেন। পৃথিবীর সবথেকে বুদ্ধিমান এই পদার্থবিজ্ঞানীরও দেড় দশক সময় লেগেছে এই জটিল তত্ত্ব আবিস্কার করতে কিন্তু শেষমেশ আবিস্কার করা গেল এই মহাবিশ্বের সবথেকে বড় রহস্যকে। প্রাণ। তার এই ফর্মুলা শুধু যে প্রানের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করবে তাই নয়, মৃত মানুষকে খুব সহজেই কিভাবে পুনরায় জীবিত করা যায় তাও ব্যাখ্যা করবে। এবার পৃথিবী আবার বুঝবে কেন তাকে সমকালিন বিজ্ঞানীরা আইন্সটাইন বা নিউটনের সাথে তুলনা করেন। এরা তবু শুধু বস্তুর ব্যাখ্যা দিয়েছেন কিন্তু আজ এই মুহূর্তে জীবনেরও ব্যাখ্যা দিলেন ডঃ চৌধুরী। এক ধাক্কায় তিনি ছাড়িয়ে গেলেন এযাবৎ যাবতীয় বিজ্ঞানীকে। নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টকে ফোন করে আজ সন্ধায় এক প্রেস মিট আয়োজন করতে বললেন, তাতে যেন পৃথিবীর তাবড় বিজ্ঞানিদের ডাকা হয়। আর সব আয়োজন শেষে নিজের আবিষ্কারটিকে পেন ড্রাইভএ ভরে অনেকদিন পর স্বস্তির ঘুমে তলিয়ে গেলেন ডঃ চৌধুরী।
ঘুম ভেঙ্গেই উনার হঠাৎ মনে হল চারপাশে কি একটা যেন আলাদা। কিন্তু জিবনের বিগত বছরগুলোর অধিকাংশই এই ঘরটায় কাটিয়েছেন তিনি। তবু এমন কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না যা আগে দেখেননি বা আলাদা মনে হবে। কিন্তু মনটা কেমন উশখুশ করছে। “গুড ইভিনিং, প্রোফেসর।” ডঃ চৌধুরী চমকে পেছনে তাকিয়ে দেখলেন একটা লম্বা, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ তার দিকে খানিকটা বিষণ্ণ মুখে তাকিয়ে আছে। “আপনি আমাকে চিনবেন না, আমি আপনার অসাধারণ বুদ্ধির একজন গুণগ্রাহী। আর পৃথিবীতে যারা আপনার এই আবিষ্কারটিকে সম্মান জানাতে পারার মত বুদ্ধি রাখে, আমি তাদের একজন।” ডঃ চৌধুরী চুপ করে শুনলেন। তার অনেক ছাত্রছাত্রী এমনকি সহকর্মীরাও তার জ্ঞানের ভক্ত। তাই গুণমুগ্ধদের প্রশংসা তার কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু একটা ব্যাপারে তার খটকা লাগল। “আমার এই আবিস্কার!? আমি তো এখনও আজকের আবিস্কারের কথা কাউকে বলিনি! তাহলে আপনি জানলেন কীভাবে?” “আমি জানি। এটাও জানি যে আপনি আজ নিজের পেপার সারা বিশ্বের সামনে প্রকাশ করবেন যে কীভাবে মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা অঙ্কের মাধ্যমেই আপনি প্রানের রহস্য উন্মুক্ত করেছেন। সারা পৃথিবী আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে কিন্তু ডঃ হেরান্ড আপনার আবিস্কার নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবেন। আর তাকে ভুল প্রমান করতে আপনি মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই সেই যন্ত্র বানিয়ে ফেলবেন যা সত্যিই মৃত প্রাণীকে বাছিয়ে তুলবে। আমি সব জানি ডক্টর। কিন্তু আপনি যেটা জানেননা সেটা হল আপনার এই কাজের পরিনতি কি হবে।”
জীবনে অনেকবার অবাক হয়েছেন ডঃ চৌধুরী। যেদিন প্রথম রিলেটিভিটি শেখেন, যেদিন ক্যালকুলাসের গভীরতা বুঝতে শেখেন প্রতিবারই তার অসম্ভব উত্তেজনা হয়েছে। কিন্তু এই লোকটার কথায় তার প্রায় দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। হয় লোকটা পাগল, নয় বুজরুকি করতে চাইছে; এই ভেবেই নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু... “আমি জানি আপনি অবাক হয়েছেন খুব। তাই আগে নিজের পরিচয়টা দিয়ে রাখি। আমার নাম হেরানা সিবাসা। আমি আপনার থেকে প্রায় ২০০ বছরের ছোট এবং প্রায় কুড়ি মিনিট আগে আমি হাইপারস্পেস টাইম ট্রাভেল করে আপনার বাড়িতে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করেছি। ক্ষমা প্রার্থনীয়।” এবার ডঃ চৌধুরী ভালমতো এই আগন্তুককে পরীক্ষা করলেন। নাহ! বুজরুকি নয়। এর শরীরের গঠনটাই আলাদা সাধারণ মানুষের তুলনায়। প্রায় সাত ফুট লম্বা, মাথাটা হাতুড়ির মত সামনে-পেছনে লম্বা, দুপাশ চাপা। গায়ে লোম নেই, এমনকি ভ্রু অবধি না। সুতরাং অভিযোজনের বেশ কিছু ধাপ এ পেরিয়ে গেছে যা মানুষের এখনও পেরানো বাকি। তাই ডঃ চৌধুরী একে বিশ্বাস করলেন। “আমার কাজের কোন পরিনতির কথা বলতে চাইছ তুমি?”
“ভবিষ্যতে, খুব বেশিদিন নয় কয়েক মাসের মধ্যেই, আপনার ওই যন্ত্রটা চুরি হয়ে যাবে। যারা চুরি করবে তারা আসলে একটা সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। এবার আশা করি বুঝতেই পারছেন কি হতে চলেছে। কিছু বিকৃত মানসিকতার লোক যারা সমাজের ক্ষতি চায় তারা অমরত্বের বরদান পেলে যতখানি খারাপ হওয়া সম্ভব ততটাই খারাপ হবে এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। মানব সভ্যতা জিনিসটা প্রায় লুপ্ত হয়ে যাবে। আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর পর জনসংখ্যা হয়ে যাবে মাত্র ২ কোটি আর তারও পঞ্চাশ বছর পর দশ লক্ষ। ভাবতে পারছেন, আপনার বিজ্ঞান মানবজাতিকে কোন দুয়ারে নিয়ে যাবে? ঠিক সেই কারনেই ভবিষ্যতে মানুষ আপনাকে মনে রাখবে ‘অন্ধকারের দূত’ হিসেবে।” ডঃ চৌধুরী এত সহজে দমবার পাত্র নন। নিজের নব আবিষ্কৃত পদ্ধতির সত্যিই যে একটা খারাপ প্রয়োগ হতে পারে তা তিনি আগে ভাবেননি ঠিকই কিন্তু তাই বলে উনাকে অসম্মানের কারন বুঝতে পারলেন না। “তো তুমি আমাকে ঠিক কি করার পরামরশ দিচ্ছ? আমি এই আবিস্কার প্রকাশ করবোই। তাতে যা হয় হোক। আমি পরোয়া করিনা।”
“না। আপনি আমার কথা শুনুন বা নাই শুনুন এই আবিস্কার প্রকাশ পাবেনা। আমার গল্পটা পুরোপুরি সুনলেই আপনি বুঝতে পারবেন।” এই বলে একটি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সিবাসা বলতে লাগল “আমার দাদু কুয়ারিন সিবাসা হলেন টাইম ট্রাভেল পোর্টালের আবিষ্কর্তা। আমার বাবার যখন দু বছর বয়স, তখন ওই জঙ্গিরা আমাদের কলোনি তে হঠাত আক্রমন করে লুঠপাট শুরু করে। ওদের গুলিতে আমার বাবা মারা যান।” “কি? তোমার বাবা দু বছর বয়সে মারা যান? আমাকে বোকা পেয়েছ?” ডঃ চৌধুরী রেগে গিয়ে বললেন। “আপনি পুরোটা শুনুন প্লিজ। আমার বাবার মৃত্যুর কারনে দাদু অত্যন্ত ভেঙ্গে পরেন এবং এই সবকিছুর কারন হিসেবে আপ্নাকেই দায়ি করতে থাকেন। তখনি তিনি কিছু কুহুনা অর্থাৎ দলপ্রধানদের সাথে আলোচনা করে ঠিক করেন যে আপনাকে এই আবিস্কার প্রকাশের পূর্বেই হত্যা করলে সমগ্র মানবজাতির দুর্দিন কেটে যাবে।” ডঃ চৌধুরীর শিরদাঁড়ায় একটা শিহরণ খেলে গেল। “তাই আপনি যদি আজ সন্ধ্যার সভায় যেতে ছান তো যাওয়ার পথেই কিছু ভবিসসতের মানুষের হাতের লেসার গানে আপনার মৃত্যু হবে এবং আপনাকে জানিয়ে রাখি যে সত্যিই আমার দাদু পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বদলাতে পেরেছিলেন। এই কারনেই উনি ফিরে গিয়ে দেখেন যে মানব সভ্যতা ধংসের বদলে সৃষ্টির প্রতিক হয়ে আমাদের গ্যালাক্সি ছাড়িয়ে সারা মহাকাশে ছড়িয়ে পরেছে। বাবা, মানে উনার ছেলেও জীবিত। বুঝলেন?”
ডঃ চৌধুরী গুম হয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন “কিন্তু আপনার আসাটা তো এই গল্পে ছিল না।” সিবাসা হাসলেন। “ঠিক ধরেছেন। আসলে আজ আপনাকে মারার সময় আপনার ফর্মুলাটিও ধ্বংস করে দেওয়া হয়। কিন্তু আমি যে সময়ের লোক তখন মানবজাতির মধ্যে হিংসা অবশিষ্ট নেই আর অনেকগুলো গ্রহে ছড়িয়ে পরেছি বলে জায়গারও অভাব নেই। কিন্তু এওতজন বিজ্ঞানী আপনার পর চেষ্টা করেও মৃত্যুর রহস্যকে উন্মোচন করতে পারেনি। তাই আমি চাইনা যে আপনি আজ এটা প্রকাশ করার চেষ্টা করতে গিয়ে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারটি নষ্ট করুন এইভাবে।”
ডঃ চৌধুরী এই কথাগুলোর কোনটাই বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকলেন সিবাসার দিকে। “আমি যদি প্রকাশ না করি তাহলেও এই আবিস্কারের কথা কেউ জানবে না আর যদি প্রকাশ করতে চাই তাহলেও আপনার দাদু আমার আবিস্কার সুদ্ধ আমাকে মেরে ফেলবেন। তাহলে উপায় কি?” সিবাসা শান্ত গলায় উত্তর দিলেন “উপায় আছে। আর সেই উপায়ের খোঁজ দিতেই আমি এখানে এসেছি।”
২০১৪ সালের ১০ই আগস্টের খবরের পাতার হেডলাইন ছিল “হঠাত নিখোঁজ নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী অন্তর চৌধুরী” আর প্রায় দুশ বছর পর ২০৩৩ সালের ১০ই নভেম্বর এর ট্যাবলয়েড হেডলাইন “এতদিনে ডঃ চৌধুরীর অন্তরধান রহস্যের খোঁজ মিলল। হাইপারস্পেস পোর্টালে আজ ডঃ সিবাসা নিয়ে এলেন অতীতের অতিথি ডঃ চৌধুরীকে। দুজনে আজ একটি প্রেস মিটের আয়োজন করেন যেখানে ডঃ চৌধুরী প্রাণের রহস্য উন্মোচন করলেন...”
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন