বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ আগস্ট ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ১৫টি

তবু আমারে দেবোনা ভুলিতে

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

নীলকমল

রহস্যময়ী নারী জুলাই ২০১৬

অচিনপুর

শ্রমিক মে ২০১৬

অস্থিরতা (জানুয়ারী ২০১৬)

বিবর

শামীম খান
comment ২৫  favorite ০  import_contacts ৭৬০
আমার কাছে মানুষের মন একটি ছিমছাম ঘরের মত । সে ঘর পূর্ণ থাকে রকমারি ভালবাসায় । একটুও ফাঁকা নেই , নেই শুন্যতা । ঘরের উপরের দিকে সম্ভবত পাটাতনে থাকে কোরান-হাদীস , বেদ , বাইবেল যা কিছু আমরা শ্রদ্ধা করি । চেয়ার-টেবিল , আয়না-চিরুনি , খাট-পালঙ্ক ঘরের প্রতিটি বৃত্তান্তে সাজানো ভালোবাসা , শুধুই ভালোবাসা । সেগুলো দেখতেও বড় বিচিত্র , মোটেও সাধারণ আসবাব পত্রের মত নয় । দেয়ালে ক্যালেন্ডার , তাতে শুধু প্রিয় দিনগুলো শোভা পাচ্ছে । আয়নাটা কারো চোখের মত , নিজেকে দেখতে বড় বিশ্বস্ত সেখানে । মায়ের আঁচলটি যেন খাট হয়ে জুড়ে আছে ঘরের প্রাঙ্গন। তবে মজার কথা হোল এই ঘর এমনকি ঘরের ভেতরের সব কিছু শুধু আপনি নিজেই দেখেন । খাট দেখেনা জানালা-দরোজা । দেয়াল জানেনা আলমারির খোঁজ , অথচ আলমারিটি তার গায়েই ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । দৈবাৎ এরা যদি একে অন্যকে দেখে ফেলে , ফলাফল যে ঠোকাঠুকি হবেনা কে জানে ? যারা ভাল লাগার গণ্ডী পেরিয়ে এখনো ভালোবাসার রাজ্যে ঢুকতে পারেননি , তারা এলে আমরা বারান্দায় পাটি বিছিয়ে দেই । এক বাটি মুড়ি-পাটালী সামনে রেখে মাথার উপর তাল পাখাটা দোলাতে থাকি কিন্তু হুট হাট ঘরে টেনে তুলিনা । আজ আমার সে ঘরটি আপনাদের জন্য খুলে দেবার আগে বস্তুজগতে কয়েকটি মুখের সাথে পরিচয় করিয়ে দেব ।
এই সাজ সকালে খুব ব্যস্ততা আমার স্ত্রী রেহানার । এখন সে ছাদে লেপ শুকোতে দিচ্ছে । তার মতে শীতের সকালে সবকিছু তাজা রোদে ফেলা স্বাস্থবিধিতে খুবই জরুরী । একে একে ঘরের লেপ-কম্বল-চাঁদরগুলো টেনে টেনে সে রোদে মেলবে । নিত্যকার রুটিন , সাতাশ বছর ধরে দেখে আসছি । একধরনের বাতিক আর কি । রৌদ্র বাতিক । তার ধারনা এখনো ঘুমোচ্ছি আমি । গায়ের কম্বলটির জন্য সে আরও কিছুক্ষন অপেক্ষা করবে । এক সময়ে কাপ পিরিচের ঠোকাঠুকিতে চোখ মেলতেই চায়ের কাপ হাতে ধরিয়ে দিয়ে কম্বলটা টেনে নিয়ে নিমিষে চলে যাবে ছাদে । কাপ হাতে পেছন থেকে হৈ হৈ করতে থাকবো আমি ।
আমাদের মেয়ে টিউলিপ , খুব সকালে ভার্সিটি গেছে । আজ বিকেলে তার বান্ধবীর গায়ে হলুদ। অনুষ্ঠান হবে শেরাটনে । ছেলেপক্ষ বিরাট বড়লোক । বিয়ে উপলক্ষে কনের বান্ধবীদের একটি করে দামী শাড়ী দেয়া হয়েছে পাত্র পক্ষ থেকে । এলাহী কাণ্ড । সব মিলে যুক্তি পরামর্শ করে ফেলেছে কে কিভাবে সাজবে , কি করবে । আজ তার প্লান ছিল ক্লাস মিস দিয়ে বিউটি পার্লারে যাবার । রাতে মায়ের কাছে টাকা চেয়ে সুবিধে করতে পারেনি । খুব সকালে নাস্তা না করেই ফোলা ফোলা চোখে ভার্সিটির পথ ধরেছে সে । আমার মেয়েরও একটা বাতিক আছে । প্রেম বাতিক । খুব ছোট বেলা থেকে সে প্রেমে পড়ে আসছে । তখন ক্লাস ওয়ানে । হঠাৎ এক বিকেলে দেখি মেয়েটি মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । কাছে ডাকতেই অকপটে স্বীকার করলো , সিরাজ মামাকে সে বিয়ে করতে চায় । তাকে ছাড়া কিছুতেই বাঁচবে না । সিরাজ হোল পাশের বাড়ীর সমবয়সী রনির ছোট মামা । এস এস চি পাস করে বোন-দুলাভাইয়ের সংসারে উঠেছে । দুবছর ধরে তার কাজের রুটিন একই রকম , সকালে শর্ট হ্যান্ড এন্ড টাইপিং শেখা আর বিকেলে ওদের গল্প শোনানো । তিনদিন আগে তার চাকুরী হয়েছে , অফিস সেক্রেটারি । কালই যাবে চিটাগং । মেয়ের বিরহ ভোলাতে সেদিন সবাইকে নিয়ে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে যেতে হোল । কদিন বাদেই নতুন বিপত্তি সামনে এসে দাঁড়ালো । রাস্তার পাশে এক বাদামওয়ালা ছোকরাকে পছন্দ করে ফেলেছে আমার মেয়ে । কাঁদো কাঁদো গলায় এসে বলল , ‘বাবা , আমি ওই বাদামওয়ালা ছেলেটাকে ভালবাসি । বাবা তুমি কি রাগ করলে ?’ গল্প লেখার সময় সবকিছুতেই বিরক্তি লাগে , মেয়ের কান্না ছাড়া । আমি বললাম , ছেলেটি বাদামওয়ালা না হয়ে আইস্ক্রিমওয়ালা হলেই ভাল হত । রোজ ফ্রি ফ্রি আইস্ক্রিম খেতে পারতি । আজ ক্লাসে নোট বুক খুলেই তার চোখে জল এসে যাবে । সেখানে এক হাজার টাকার দুটো নোট আর একটি চিরকুট -“পার্লারে যাবার আইডিয়াটা মন্দ নয়” । পরের পিরিয়ডেই সে বান্ধবী টুম্পাকে নিয়ে ছুটবে নিউ মার্কেট এরিয়ার কোন বিউটি পার্লারে ।
আমাদের ছেলেটি লেদার টেকনোলজিতে এদেশে পড়া শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে গেছে উচ্চতর শিক্ষার জন্য। ডাকনাম রুবেল , আমি ডাকি চণ্ডীদাস । অল্প বয়স থেকেই সে ভাবুক আর কবি হয়ে উঠেছে । তারও একটি বাতিক আছে । মিথ্যে বলার বাতিক । তার কবিতাগুলো বেশ ভাল মানের । কিন্তু মিথ্যগুলো আরও সুন্দর । উদাহরন দেই । বছর দুয়েক আগের কথা । চণ্ডী বিদেশে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে । এমব্যাসি ফেস করার আগেরদিন হঠাৎ সবগুলো সার্টিফিকেট হারিয়ে ফেললো । ওর মায়েরতো পাগল হবার দশা । আমি ছেলের নির্বুদ্ধিতায় মর্মাহত হয়ে ছুটলাম এম্ব্যাসীতে । যেভাবেই হোক ইন্টার্ভিউয়ের ডেট পেছাতে হবে । ফিরে এসে চণ্ডীদাসকে বাড়ীতে পেলাম না , পেলাম একটি চিঠি ।
বাবা , মা ।
আমাকে মাফ করে দিও । সার্টিফিকেটগুলো রফিকের খুব দরকার ছিল । নাম-ঠিকানা পর্যন্ত মনে মনে বদলে ফেলেছে । আমিতো বিদেশে যাবো । ওর কি হবে ?
তোমাদের রুবেল
রফিক গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের ছেলে । পরীক্ষার আগে বাবা মারা গেলে সবচে মেধাবী ছাত্র হয়েও এবার আর পাস করা হোল না । রফিকের অনুপস্থিতিতে চণ্ডী সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট করেছিল । পরে বুঝেছি ও লড়াই করে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হতে চেয়েছিল , ফার্স্ট নয় । পরের দিন রুবেল ফিরে এলে আমি রাগ করতে পারিনি , বিস্মিত হয়ে তাকিয়েছিলাম । এক বছর পরে অবশ্য রফিক ভাল রেজাল্টসহ পাস করে আমার বিবেককে মুক্ত করেছে । এন জি ওর সে চাকুরীও ছেড়েছে । এখন সে বিসিএস ক্যাডারে , অবশ্যই নিজের সার্টিফিকেটে ।
( ২ )
সকালের রোদে বসে ভাবছিলাম বাংলাদেশে ডাক বিভাগের আর কোন প্রয়োজন আছে কিনা । ছুটির সকালে অলস চিন্তার উদাহরণ আরকি । এমন সময় নতুন কাজের ছেলেটা হন্ত দন্ত হয়ে ছুটে এলো । হাতে একটি চিঠি , দুদিন আগেই এসেছে । আগের ছেলেটা রিয়াদ , কাল ছুটিতে গেছে । ঘরে ফেরার আনন্দে যাবার আগে চিঠিটা আমাদের হাতে তুলে দিতে ভুলে গেছে । চণ্ডীর চিঠি ! ভারী অবাক হলাম । কাল রাতেও ওর সাথে কথা হয়েছে ফোনে । একবারও চিঠির কথা বলল না । খামটি খুলতে অনিন্দ সুন্দর এক বিদেশিনী হেসে উঠলো ।
বাবা , মা ।
মেয়েটি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে । টার্ম একজাম পর্যন্ত দিতে পারলাম না সিন্থিয়ার পাল্লায় পড়ে । হ্যাঁ বা না কিছু একটা লিখে দিও । ফোনে কিছু জানতে চেয়ো না , প্লিজ ।
ভাল থেকো ।
রুবেল ।
দুজনে পরামর্শে বসলাম । টার্ম একজাম তো চণ্ডী দিয়েছে । কেন যেন মনে হোল , মেয়েটি নয় ও নিজেই মেয়েটির প্রেমে পাগল হয়ে গেছে । হয়তো মেয়েটিকে একজাম পর্যন্ত দিতে দেয়নি । একজন দায়িত্বশীল বাবা হয়ে অন্যের মেয়ের এমন ক্ষতি হতে দেই কিভাবে ? সিদ্ধান্ত হোল , আগামী এক মাসের মধ্যে রেহানা স্টেটসে যাবে বিয়ের কাজটা ঠিকমত শেষ করার জন্য । ওখানে কিছুদিন থেকে ছেলে আর পুত্রবধুকে নিয়ে দেশে ফিরলে আমাদের মত করে রিসেপ্সন সারা হবে । সে মতে পরদিন একটি ফিরতি চিঠি পাঠিয়ে দিলাম ।
বিকেলের চা সামনে নিয়ে একা বসে আছি । সাংসারিক কাজে রেহানা গেছে মার্কেটে । এতদিন কল্পনায় ছিল মিষ্টি স্বভাবের একটি বাঙালী মেয়ে আমার ছেলের ঘরের চাবি আঁচলের গোছায় বেঁধে সংসারময় ঘুরে বেড়াবে । ওর চঞ্চল স্বভাবের বিপরীতে সে হবে শান্ত দীঘির মত । কালো কেশ আর কাজল চোখের এক আবহমান বাঙালী নারী । চণ্ডী বিদেশিনী মেয়ে বিয়ে করতে চাইবে , আগে ভাবিনি । বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে । এমন সময় কাজের ছেলেটা খবর নিয়ে এলো , এক ভদ্রমহিলা কথা বলতে এসেছেন ।
ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই আমার হৃদপিণ্ডের বেগ বেড়ে গেল , ঠিক পঁয়ত্রিশ বছর আগের মত । আমার বয়স তখন সতেরো কি আঠারো । যৌবনের সিঁড়িতে টলোমলো পা । নতুন একটা কল্পরাজ্যও গড়ে উঠেছে । সে রাজ্যে প্রথম অনুপ্রবেশ ঘটেছিল যে মেয়েটির , সেই লতা এমুহূর্তে আমার সামনে বসা । বয়সে আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড় । তার চেহারায় ছিল লাবন্যের জোয়ার , তবে মাদকতা ছিল তারও ঢের বেশী । পতঙ্গের মত ছুটে গেছি বার বার তার রুপানলে আত্মাহুতি দিতে । নীরবে মিষ্টি হেসে ফিরিয়ে দিয়েছে লতা । দূরের হলেও আত্মীয় , অচেনাতো নই । সেটাই হয়তো ছিল স্বাভাবিক । দুটো পরিবারের মধ্যে আসা যাওয়া নিয়মিত না হলেও দুই ঈদে দুবার অন্তত দেখা হয়ে যেত । শহরের অন্য প্রান্তে যে ছোট্ট নদীটি , তারই পাড়ে ছিল ওদের গাছ গাছালী ভরা বাগান বাড়ী । অনেক সম্পদশালী ছিল ওরা । শেষ দিকে মদ আর জুয়া , দুটোতেই আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন পরিবারের কর্তা । দ্রুত সহায় সম্পত্তির মালিকানা বদল হচ্ছিল । আত্মীয় হিসাবে আমার বাবা এই অবিমৃশ্যকারীতার প্রতিবাদ করেছিলেন । এ নিয়ে জীবদ্দশার শেষ প্রান্তে বাবার সাথে লতিফ চাচার ভুল বঝাবুঝি সৃষ্টি হয়। সে ভার সইতে পারেনি দুর্বল সম্পর্কটি ।
কুশলের কথাগুলো শেষ করেই লতা একটি কার্ড বাড়িয়ে দিল । ওর ছেলে তন্ময়ের বিয়ে , আমাকে থাকতে হবে । আমার কিছু ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা আছে , তা সত্ত্বেও হুট করে না বলা যায় না । কি বলবো ভাবছি , এরই ফাঁকে অন্য একটি খাম থেকে কনের ছবিটি বের করলো সে । দুচোখে নিবিড় প্রশান্তি , কালো চুলে নিদ্রামগ্ন অমারাত , জোছনা ধোয়া মুখাবয়ব , এক অকৃত্রিম বাঙালী নারী । বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ছিলাম । লতার কথায় সম্বিৎ ফিরলো ,
-কই , তোমার বৌকে ডাকলে না ? কথা বলে যাই । নাকি মুখোমুখি করতে এখনো ভয় পাও !
-মেয়েকে নিয়ে মার্কেটে গেছে । একটু বসে যাও । এখুনি এসে পড়বে ।
এই ফাঁকে আমার সেই সীমাবদ্ধতার কথাটা বলে রাখি । লতার সাথে শেষ দেখা হয়েছিল সাতাশ বছর আগে , এই বাড়ীতেই । রেহানা তখন নতুন বৌ , সেদিন ভাইয়ের সাথে প্রথম বারের মত বাপের বাড়ী বেড়াতে গেছে । ঘরে আমি একা । লতার হাতে ছিল একটি অ্যাপ্লিকেশন । আমার কলেজে একটি শুন্য ক্লারিক্যাল পোষ্টে জব করতে চায় । এসিস্ট্যান্ট প্রোফেসর হলেও ম্যানেজিং কমিটিতে আমার কিছুটা প্রভাব আছে । ক্ষুদ্র এই আজিজ আরেফিনের একটি রিকোমেণ্ডেশন এপ্লিকেশনটিতে যথেষ্ট মূল্যবান বৈ কি । এই প্রত্যাশাই ওকে টেনে এনেছিল । বাইরে আকাশ কালো করে দশ দিগন্ত ছেপে বৃষ্টি এসেছে। ঘন ঘন ঝলকে উঠছে দেয়া । ঘরে কেউ নেই আমি আর সেই মেয়েটি ছাড়া , যার মুখচ্ছবি প্রথম যৌবনে ঘুম কেঁড়ে নিতো প্রতি রাতে , বিনম্র আগ্রাসনে । কেউ ফেরাতে পারে কিনা জানিনা , আমি পারিনি । বর্ষণের সেই দুপুরে একটি নয় দুটি দস্তখৎ করেছিলাম আমি। বাঁধা দেয় নি লতাও । সেই প্রথম , সেই শেষ । পরে অবশ্য চাকুরীটা আদৌ হোল কিনা , সে খোঁজও নেয়া সম্ভব হয়নি । এতদিনে ছেলের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে আজ ফের আমার দরোজায় । আমি ইতস্তত করে বললাম ,
-এতো দিন পরে এলে , তোমার ছেলেকেই তো দেখা হয়ে উঠেনি । তার ছবি নেই সাথে ? কি যেন বলতে যেয়ে ওর ঠোঁটদুটো একটু কেঁপে উঠে আবার থেমে গেল । সামলে নিয়ে বলল ,
-নেই । এ আর এমন কি ? কালই না হয় তন্ময়কে পাঠিয়ে দেবো । তোমাকে সালাম করে যাবে । হাতের একগাদা কার্ডের দিকে ইশারা করে লতা উঠে দাঁড়ালো , আজ তবে আসি । একটুও সময় নেই । বৌ আর মেয়েকে নিয়ে ঠিকঠাক চলে এসো কিন্তু ।
মিষ্টি হেসে পা বাড়াল সে ।
( ৩ )
পরদিনই দেখা করতে এসেছিল ছেলেটি । আমি তখন মাত্র জগিং শেষ করে এসে সরাসরি বাগানের যত্নে লেগে পড়েছি । পরনের ট্রাকস্যুট , সানগ্লাস কিছুই খোলা হয়নি । হঠাৎ গেটে দাঁড়ানো তন্ময়কে দেখে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম । এও কি সম্ভব ! আমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে আমার ক্লোন । হাত , পা , চুল , চোখ এমনকি চোখের চাউনি সবই হুবহু আমার মত । স্কন্ধের ওপর বসানো অবিকল যেন আমার মুখখানি ! আমার হাতের তালু ঘেমে গেল , গলা শুকিয়ে কাঠ । বুকের ভেতর কেউ হাতুড়ী পেটাচ্ছিল । ভাগ্যিস কাছেপিঠে কেউ ছিল না । একরকম অভদ্রতা করেই তাড়াতাড়ি আপদ বিদায় করলাম । ছেলেটি চলে যাবার পর চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম দুদণ্ড । ভেসে উঠলো চণ্ডীর মুখ , মনে পড়লো টিউলিপের কথা । আর রেহানা , অকুণ্ঠ শ্রদ্ধায় প্রতিদিন যে প্রাণদায়ী ভালবাসা সিঞ্চন করে চলেছে আমার শেকড়ে । চোখ না মেলেই দেখতে পেলাম কিভাবে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে আমার বন্ধুজন , আত্মীয় , প্রতিবেশী আর পরিচিতজনেরা । নিমিষেই হিসাবটা ধরে ফেললাম , সাতাশ বছর আগে যে টোপ আমাকে গেলানো হয়েছে আজ সে বড়শীটি গুটিয়ে ঝুড়িতে শিকার তুলতে চাইছে লতা । নিশ্চয় এতদিন আমার গতিবিধি নজরে রেখেছিল গোপনে । কি চায় ও আমার কাছ থেকে ? টাকা ! পরিচয় ! প্রতিহিংসা ! পৈত্রিক শত্রুতা ! প্রথমটাই ঠিক , টাকা চাই তার ! নিঃস্ব করে গেছে সিরাজ চাচা । ব্লাক মেইল , মনে হচ্ছে মা-বেটা মিলে এঁটে সেঁটে নেমেছে । প্রথমে নিজে এসে একটা ধাঁধাঁ তৈরি করেছে । পরে ছেলেকে পাঠিয়েছে নীরব হুমকি স্বরূপ । সারা রাত নির্ঘুম এপাশ ওপাশ করে কাটালাম । সকালে সবাই জাগার আগেই ল্যান্ড ফোনের পাশে মোড়া পেতে বসে রইলাম আমি । জানি একটি কল আসবে , যে কোন সময় । শরীর খারাপের বাহানা বানিয়ে কলেজে যাবার ঝামেলা মিটিয়ে দিয়েছি । ভীষণ উত্তেজনার মধ্য দিয়ে সময় গড়াচ্ছে টিক টিক টিক । মোবাইলে আননোন বা আনসেভড কোন নাম্বার থেকে কল এলেই ছুটে যাচ্ছি এক কোনে । রেহানা বোধহয় সন্দেহ করতে শুরু করেছে । মুখে কিছু বলছেনা , কিন্তু কেমন যেন সরু সরু চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে ।
তিন দিন কেটে গেল , এখনো কল আসেনি । একটুও ঘুমুতে পারছি না । কাল রাতে রেহানা কাঁদছিল । হাত ধরে টানাটানি করছিল , ছাদে নিয়ে যাবে জোছনা দেখাতে । আহাম্মকি ! যত্ত সব আহাম্মকি ! জোছনা দেখাবার কি আছে ? এখন ও কি একটু শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে ? কানের কাছে একটা প্রশ্ন নিয়ে বারবার ঘ্যান ঘ্যান করেছে , কি হয়েছে , কি হয়েছে ? সন্দেহ হচ্ছে , লতা শুধু আমাকে নয় , আমার স্ত্রীকেও ব্লাক মেইল করতে পারে । আচ্ছা , কত টাকা চাইতে পারে , বিশ লাখ ! ত্রিশ লাখ ! আমার গ্রাচুয়িটির পরিমান জেনে নিয়ে থাকলে দাবীর অংক পঞ্চাশ লাখে যেয়ে ঠেকতে পারে । রেহানাকে না জানিয়ে জীবনের সব সঞ্চয় এভাবে ডাকাতের হাতে তুলে দেব ! না কি ওকে ডেকে এখুনি সব স্বীকার করে আইনি লড়াইয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া ঠিক হবে ? এরপর আর কি কখনো টিউলিপ তার গোপন কথাটি বাবার সাথে শেয়ার করতে আশেপাশে ঘুরঘুর করবে ? চণ্ডী কি বাবার ভেতর আর কখনো খুঁজে পাবে একজন অকৃত্রিম বন্ধুকে ? স্ত্রীর সাথে গড়ে ওঠা মধুর সম্পর্কটি কি আজই শেষ হয়ে যাবে ! আর কি কোন তুমুল বৃষ্টির দুপুরে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে রেহানা বলবে না , ছেলেমেয়েরা বাড়ীতে নেই , চল না কিছুক্ষন ফুল বাগানে যেয়ে দাঁড়াই । চোখ দুটো বারবার ভিজে উঠছে , কাঁদতে পারছি না ।
আজও সকাল থেকে দুপুর অব্দী যুগপৎ গেট আর ফোনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাটিয়ে দিলাম । হঠাৎ মনে হলো টেলিফোনের লাইনটা কেটে দিলে কেমন হয় ! ঐতো যন্ত্রটার পেছনে লেজের মত তারগুলো নেমে গেছে । একটি ছোট্ট প্লাস হাতে নিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম । এরপর কি হয়েছিল মনে নেই । চোখ মেলে দেখি আমি হাসপাতালে । এরিমধ্যে নাকি তিনদিন গড়িয়ে গেছে । ইলেকট্রিক শক খেয়ে হার্টের রিদমে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিয়েছিল । আমি নাকি মরতে বসেছিলাম । চারিদিকে চেয়ে বুঝতে পারলাম , সত্যি বেশ কয়েকটি যন্ত্রে বেঁধে ছেধে আমাকে আটকে রাখা হয়েছে । আস্তে আস্তে সবই আমার মনে পড়তে লাগলো । টেলিফোনের তার কাটতে যেয়ে ভুলক্রমে সম্ভবত পাশে রাখা টেলিভিশনের তার কেটে ফেলেছিলাম । ফলাফল ইলেকট্রিক শক , হাসপাতাল ।
আমার জ্ঞান ফিরেছে জেনে হার্ট স্পেশালিষ্ট দেখা করে গেলেন । তারপর লম্বা , কুঁজো মত এক ভদ্রলোক এসে গল্প করতে শুরু করলেন । অমায়িক , ভীষণ গল্পবাজ । কিছুক্ষণ পরে নিজেই পরিচয় দিলেন , সাইকিয়াট্রিস্ট , ডাঃ আশফাক আহমেদ । এই পেশার প্রতি চিরদিন আমার একটি নীচু ধারনা আছে । কিন্তু এই লোকটি অন্যরকম । গল্পচ্ছলে কত সহজেই না ঢুকে গেলেন আমার ভেতরে । এটা ধরেন তো ওটা নাড়েন । একসময় ঠিকই ধরে ফেললেন গোলমেলে সম্পর্কটি , ওনার ভাষায় শর্ট সার্কিট । এবার আর দাঁড়ালেন না , কয়েকটি প্রয়োজনীয় নাম-ঠিকানা আর ফোন নম্বর নিয়ে বললেন , কাল আবার আসবো । পরদিন অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করলাম , তিনি এলেন না । এদিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়ার সময় হয়েছে । তিনি এলেন তৃতীয় দিন । আমার আর তর সইছে না । প্রশ্ন করলাম ,
-কি খবর ডাক্তার সাহেব ?
-খবর ভাল । আমার এক বন্ধু আছে টি এন্ড টিতে । তাকে দিয়ে গত এক সপ্তাহে আপনার ল্যান্ড ফোন আর মোবাইলের ইন কামিং কললিস্ট ঘেঁটেছি । কোন অপরিচিত কল আসেনি এসময়ে ।
ডাক্তারের কথায় আমি একটু একটু করে মনে শক্তি ফিরে পাচ্ছিলাম ।
-তবে কি অন্য কোন ভাবে ওরা যোগাযোগ করবে ? মানে সশরীরে , সরাসরি ?
-আমার তা মনে হয়নি । সত্যি বলতে কি বিষয়টা আপনার জন্য যত শক্ত বা জটিল ভাবছেন , ওদের সামাজিক অবস্থান থেকে আরও বেশী । আমার মনে হয়না টাকার জন্য মিসেস লতা আপনার পিছু নিয়েছেন ।
আমার মুখাবয়বে প্রশান্তির রেখাগুলো ভেসে উঠতে শুরু করেছে ।
-তবে কি কারনে এসেছিল মনে করেন ?
-হয়তো হেয়ালী । হয়তো সাতাশ বছরের লম্বা সময়ে মিসেস লতা আপনার চেহারাও খানিকটা ভুলে গিয়েছিলেন । আপনাকে দেখে দাওয়াত করতে আসার ভুলটা ধরতে পেরেছিলেন । তাই আপনি যাতে না আসেন সে জন্য পরদিন ছেলেকে পাঠিয়েছেন ।
-এবার ছেলেতো নিজেই জানে নিল সে দেখতে কার মত ।
-আপনার মুখাববয়ব অনেকটাই দাড়িতে ঢাকা , তাছাড়া চশমা ছিল চোখে । আপনার সাথে ছেলেটির সাদৃশ্য আপনি যেভাবে দেখেছেন , তন্ময় সে ভাবে দেখতে পাবার কথা নয় । তারপরও যেটুকু ঝুঁকি থেকে যায় মিসেস লতার পক্ষে সেটুকু এড়ানো সম্ভব ছিল না ।
-জানেন ডাক্তার ছেলেটাকে দেখে আমার মোটেও ঘৃণা হয়নি , ভয় পেয়েছিলাম । প্রথমে মনে হয়েছিল বুকে জড়িয়ে ধরি । আমারই রক্ত মাংস , হুবহু আমার মত । ছেলেটির জন্য আমার কিছু করতে ইচ্ছে করছে ।
-কিছুই করতে হবে না । বিধাতা তার সৃষ্টিকে শুধু শুধু কষ্টে রাখেন না । কে জানে , হয়তো সেও ভাগ্যবান । নিজের বাবাকে না পেলেও হয়তো একজন সুন্দর মানুষকে বাবা ডাকছে সারা জীবন !
জানতে ইচ্ছে হোল ডাঃ আশফাক নিজেই যেয়ে ওদের বাড়ীতে সব দেখে এসেছেন কিনা । কিন্তু ততক্ষনে বেশ কয়েকজন নার্স দাঁড়িয়ে পড়েছে একটু দূরে ডাক্তারের অপেক্ষায় । আর দেরী না করে শেষ প্রশ্নটা করে ফেললাম ।
-আমার স্ত্রী কি লতার ব্যাপারটা জানে ?
-কাল রাতে আমার সাথে ইন্টার্ভিউ ছিল ওনার , কিছুই জানেন না । অবশ্য আজ অন্য কোথাও থেকে কিছু জেনে থাকলে সেটা ভিন্ন ।

( ৪ )

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেছি দশ দিন হয়ে গেল । আজ রাতে রেহানার ফ্লাইট , ছেলের কাছে যাচ্ছে । আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে । সকাল থেকে থমথমে ভাব । ড্রয়িং রুমে বসে না দেখা ম্যাগাজিনগুলো উল্টাচ্ছিলাম । হঠাৎ ম্যাগাজিনটির ভেতর থেকে একটি ইনভাইটেশন কার্ড ফস্কে পড়লো মেঝেতে , তন্ময়ের । চোখের সামনে মেলে ধরতেই এবার বিস্ময়ে কাঁটা দিল গায়ে । বরের মায়ের স্থানে নাম লেখা হয়েছে , মুনীরা পারভীন লতা । বাবার স্থানে , ডাঃ আশফাক আহমেদ ! একই সাথে একটি আনন্দ আর একটি হাহাকারের জন্ম দিয়ে এই কদিনের অস্থিরতাটি আমাকে ছেড়ে উড়ে গেল অন্য ঠিকানায় ।
বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে । আমার কাঁধে রেহানার হাতদুটি বেড়াতে এসেছে । এবার তপ্ত নিঃশ্বাস পড়লো গ্রীবায় , ‘বৃষ্টি এলো , ভিজবে নাকি ফুল..............!’ কথাগুলো শেষ হবার আগেই ছুটে বাইরে চলে এলাম । কেউ জানুক , না জানুক , আকাশটাকে জানিয়ে যাবো আমি । আকাশের কান্নার মাঝে মিলিয়ে দেবো পেয়েও না পাওয়া সন্তানের জন্য জমে ওঠা দুফোঁটা অশ্রু ।
পুনশ্চ- প্রিয় পাঠক , শুরুতে মনের ঘর দেখাব বলে ডেকেছিলাম । জানা ছিল না আমার সে ঘরে আছে শুন্যতা , বিবর । মনের ঘরের শুন্যাতাকে সদাই আমরা অস্বীকার করি । সেখানে বাস করে গোপন স্খলন । খুব নীরবে সে শুন্যতা তুলে রাখে সব পাপ , পাপের পদচিহ্ন । আমরা ভুলে যাই , সাধু সাজি । একদিন জীবাশ্মের মত সব কিছু সামনে মেলে ধরে বিবর ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন