বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪
গল্প/কবিতা: ১০টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৪২

বিচারক স্কোরঃ ২.৯২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

বনলতা বিভ্রম

কোমলতা জুলাই ২০১৫

দেয়াল

কোমলতা জুলাই ২০১৫

কালবেলা

বৈরিতা জুন ২০১৫

শ্রম (মে ২০১৫)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৪২ কানিজের হাত

সোহেল আহমেদ পরান
comment ৪  favorite ০  import_contacts ৪৫৭
কানিজের হাতটা খুব ঠাণ্ডা ঠেকলো আজ। প্রতিদিনের চেয়ে একটু বেশি। আজ কি রুমের তাপমাত্রা অনেক কম করে রাখা হয়েছে? না। এসি'র তাপমাত্রা প্রতিদিনের মতো ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই সেট করা আছে। ইউনাইটেড হাসপাতালের এই ছোট ক্যাবিনে গত সাতদিন ধরে আছি। মোটরসাইকেল এক্সিডেন্টে বাঁ হাতের হাড় -হিউমেরাস ভেঙ্গে যায় অফিস থেকে ফেরার সময়। তারপর অফিসের তত্ত্বাবধানেই এই হাসপাতালে ভর্তি। আমার সার্জারি হয়েছে আজ পাঁচদিন। এই পাঁচদিন কোনো না কোনো সময়ে কানিজের সেবা পেয়েছি আমি। পালস দেখার যান্ত্রিক উপায় থাকলেও যন্ত্রের পাশাপাশি হাতেও প্রতিদিন পালস দেখেছে কানিজ। আজ তার হাতটা অনেক ঠাণ্ডা মনে হয়েছে।
- কেমন আছেন স্যার আজ?
একটা মায়াময় আপন হাসি ছড়িয়ে দিয়ে জানতে চায় কানিজ। এ হাসপাতালের নার্স কানিজ ফাতেমা।
- বেটার।
ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে তাকিয়ে বললাম আমি। জিজ্ঞেস করলাম- আপনি ভালো আছেন কানিজ?
কানিজ ভালো আছি বললেও, হাসলেও আমার মনে হলো- ভালো নেই কানিজ। কোনো একটা সমস্যা যাচ্ছে। কিন্তু কানিজ কিছু বলতে রাজি হয়নি। গতকাল কানিজের কাছে জানতে চেয়েছিলাম- সে কোথায় কার সাথে থাকে। সে বলেছিলো যে, বাবা-মার সাথে কচুক্ষেত এলাকায় থাকে। আমার স্ত্রী কানিজকে বিয়ে, নিজের সংসার- এসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিলো- "নার্সের আবার সংসার কী? কে ভালোবেসে বিয়ে করবে নার্সকে?"
গতকাল কানিজের কথা থেকে আর আজ কানিজকে দেখে আমার ও ক্যাবিনে আমার এটেন্ডেন্ট আমার স্ত্রীর খুব মায়া হলো কানিজের জন্য। সত্যি বলতে কি- এ ক'দিনে এই মেয়েটি আমাদের মন জয় করে নিয়েছে তার আন্তরিক সেবা দিয়ে, আন্তরিক কথা দিয়ে। আজ তার হাতটা বেশি শীতল ঠেকল ঠিকই। কিন্তু তার ভালোবাসা আর সেবার যে মন তা যে যথারীতি উষ্ণ। মন ছুঁয়ে যায়। শ্রদ্ধাবোধ আসে।

আমার স্ত্রী কাঁকন। সেও মেয়েটির ব্যাপারে আরো উৎসাহী হয়ে জানার চেষ্টা করে। তারপর কানিজের ইন-চার্জ সিনিয়র নার্স শায়লা নাসরিনের কাছ থেকে কানিজের বিষয়ে সব জানতে পেরে - কাঁকন ও আমার- দুজনেরই মন যারপরনাই খারাপ হলো।

দুবোনের মধ্যে কানিজ ছোট। বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। এখন অবসরে। অবসরকালীনপ্রাপ্ত টাকা দিয়ে ছোট দুরুমের বাসা করেছেন তিনি। নার্সিং-এ ডিপ্লোমা করেছে কানিজ - পাঁচ বছর হয়ে গেলো। এ হাসপাতালে জয়েন করার আগে একটা ক্লিনিকে দুবছর কাজ করেছে সে। নার্সিং কলেজে পড়ার সময়ই পরিচয় হয় প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি-করা যুবক ইমনের সাথে। তারপর ঘনিষ্ঠতা। কানিজ কোনো আহামরি সুন্দরী না। কিন্ত শ্যামলা বর্ণের এই মেয়েটির মুখশ্রী খুব আকর্ষণীয়। একটা অদ্ভুত মায়া আছে তার চোখে মুখে। পরিচয় আর ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে পারবারিকভাবেই বিয়ে হয় কানিজ আর ইমনের দুবছর আগে।

বিয়ের পর ইমনের ভাড়াকরা বাসায় শুরু হয় নতুন সংসার। বাড্ডায়। ছোট বাসা। দুটি ছোট রুম। অল্প ক'খান আসবাব যা না হলেই নয়। তবু নিজের সংসার। সুখ ছুঁয়ে থাকা প্রতিটি প্রহর। ভালোই যাচ্ছিলো।

বছর ঘুরতে না ঘুরতে না ঘুরতেই একটু কেমন অবিন্যস্ত হতে থাকে সবকিছু। কানিজের চাকরি নিয়ে কথা তোলে ইমন। সহজভাবে নিতে পারে না সে। একদিন পর পর নাইট ডিউটিকে কেন্দ্র করে খুঁটিনাটি নিয়ে মাঝেমধ্যে লেগে যেতো স্বামী-স্ত্রীতে। আবার মিটেও যেতো। এভাবেও চলছিলো কানিজ-ইমনের সংসার।

আর মাঝে লক্ষ করে কানিজ- গোপনে কারো সাথে প্রায়ই কথা বলে ইমন। প্রথমপ্রথম কিছুই মনে করতো না কানিজ। কিন্তু দিনদিন এর মাত্রা বাড়লে এবং ইমনের হাবভাব দেখে সন্দেহ হয় কানিজের। একদিন কথাও তোলে। ক্ষেপে যায় ইমন। অনেক কথা কাটাকাটি হয়। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে কানিজ।
এতোকিছুর পরও হাল ছাড়তে নারাজ কানিজ। সংসারটা টিকিয়ে রাখতে চায় সে। বৃদ্ধ মা-বাবার ওপর বোঝা হতে চায় না কানিজ। ছাড় । নিজের দিক থেকে যতোটা ছাড় দেয়া যায় দেবে কানিজ। বুকে কষ্টের পাহাড় চেপে হলেও।
একমাস আগের ঘটনা। কানিজের নাইট ডিউটি ছিলো। যথারীতি সন্ধ্যেয় বের হয়ে যায় বাসা থেকে সে। ইমনের মনটা বেশ ফুরফুরে মনে হলো কানিজের কাছে। "মিস ইউ, গুড নাইট" বলে তাকে বিদায় জানিয়েছে দরজায় দাঁড়িয়ে। খুব ভালো লাগে কানিজের কাছে। যদি প্রতিটা দিন এমন হতো!

ঠিক আটটায় ডিউটিতে যোগ দেয় কানিজ। দায়িত্ব বুঝে নেয় আগের শিফটে থাকা ঝুমার কাছে থেকে। চার্ট দেখে পেশেন্টদের খোঁজ নেয়া ও ঔষধ দেয়ার এক পর্যায়ে চার শ একুশ নম্বর ক্যাবিনে দ্রুত ঢুকার সময় অসাবধানে বেশ আঘাত লাগে কানিজের কপালে। দরজার শক্ত চৌকাঠে। অনেকটা কেটে যায় কপালের বাঁপাশটা। চোখের ঠিক ওপরে। রক্ত গড়িয়ে পড়ে। সহকর্মী নার্সরা ছোটে আসে। তাকে ফার্স্ট এইড দেয়া হয়। ব্যান্ডেজ করা হয়।

শিফট ইন-চার্জ সুলতানা খুব ভালো মনের মানুষ। কানিজকে সে রাতের জন্য ছুটি দিয়ে দিলেন তিনি। জানালেন - তিনি নিজেই কানিজের ডিউটিটুকু দেখবেন। কানিজ প্রথমে রাজি হয়নি। পরে সবার পীড়াপীড়িতে রাজি হয় সে।

বেড়িয়ে একটা রিকশা নিয়ে নেয় কানিজ। বাড্ডায় তাদের বাসা এখান থেকে বেশি দূর নয়। ভালো লাগে খুব কানিজের। ইমনের হাসি মুখটা মনে পড়ে তার। ইমন নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে তাকে দেখে। ইমনকে নিয়ে অনেককিছু ভাবে কানিজ। ইমনের বুকে মাথা রাখবে কানিজ। একটু বন্য হতে দোষ কী? প্রথম দিনগুলোর মতো। আর ঝগড়া করবে না। একটা সারপ্রাইজ হবে তার ফিরে আসাটা। মাথার আঘাতটা তার কাছে কোনো কষ্টের বলে মনে হয় না। ববং খুশিই হয় কানিজ। এটা না হলে ইমনকে চমকে দিতে পারতো না। - ভাবতে ভাবতে রিকশা পৌঁছে যায় বাসার সামনে। ভাড়া মিটিয়ে এগিয়ে যায় কানিজ।

রাত এগারটা। নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে যায়নি ইমন। কলিংবেল চাপে। একবার । দুবার। তিনবার। এতো দেরি হচ্ছে কেনো! তবে ঘুমিয়ে গেলো ইমন? হতে পারে। সারাদিনের পরিশ্রান্ত শরীর। আহা বেচারা! এবার দরজায় টোকা দেয় কানিজ। দুমিনিট ত্রিশ সেকেন্ড পরে দরজা খুলে ইমন। কানিজকে দেখে ইমন এমন চমকে যায় যে কানিজ ভয় পেয়ে যায়।
- কী হয়েছে ইমন? শরীর খারাপ? কী হয়েছে তোমার?
ধরতে যায় কানিজ ইমনকে। হাত সরিয়ে দেয় ইমন। কিছুই বলে না।

ঘরে ঢুকে ভীষণ চমকে যায় কানিজ! এই কী দেখছে সে! এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কোনো দৃশ্য? সে কি স্বপ্নে দেখছে এসব? নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। - তারই বিছানা অবিন্যস্ত পোশাকে একটি মেয়ে। বয়েস বিশ-বাইশ হবে।

অপ্রস্তুত ইমন কিছুই বলতে পারে না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। যা বুঝার বুঝে ফেলে কানিজ। কান্না নয়; তার চোখে আগুন তখন। হাত ভালো আছে কানিজের। আঘাত শুধু কপালে পেয়েছে সে। কানিজের হাতে অসুরের শক্তি ভর করে। ঠাস। ঠাস। দুটি পরিষ্কার শব্দ। ইমনের দুই গালে কানিজের পাঁচ আঙুলের দাগ বসে যায়। ইমন বসে পড়ে নিচে।

এরপর ঘর থেকে বেড়িয়ে আসা কানিজের।

নার্স ইন-চার্জের কাছে কানিজের জীবনকথা শোনে মনটা বড়ই বিষাদে ভরে যায় আমার। আমার স্ত্রীরও। আমাদের সমাজে আজও একজন মেয়ের এই অবস্থান। সে শিক্ষিত হোক বা নাই হোক। কর্মজীবী হলে যেনো সমস্যা আরো বেশি।- আমার ভাবনায় ছেদ পড়ে ডাক্তার ও তার সঙ্গী সহকারীদের আগমনে।
- মিঃ জুনায়েদ, ইউ হ্যাভ রিকাভারড ওয়েল। কালই আপনি ডিসচার্জ হচ্ছেন। একসপ্তাহ পর ওপিডিতে ফলোআপম করাবেন। উইশ ইউ অল দ্য বেস্ট।
-থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর। আপনাদের আন্তরিকতার জন্য কৃতজ্ঞ।- বললাম আমি।

হাত ভেঙ্গে হাসপাতালে এসেছিলাম। আমার হাতে অপারেশন করে প্লেট বসানো হয়েছে। আমার হাত হয়তো ভালো হয়ে যাবে একদিন। কিন্তু ভাবছি- কানিজের হাতের মতো এমন শক্তিশালী কি হতে পারবে আমার এই হাত? আবার একই সাথে মমতাময় স্পর্শের উৎস।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন