বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ অক্টোবর ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ৫টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৩৫

বিচারক স্কোরঃ ৩.৬২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৭৩ / ৩.০

সরে সরে যায় তটভূমি

দিগন্ত মার্চ ২০১৫

জয়া

বিজয় ডিসেম্বর ২০১৪

যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের

অসহায়ত্ব আগস্ট ২০১৪

ভয় (এপ্রিল ২০১৫)

মোট ভোট ৫২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৩৫ মুখোশ

আখতারুজ্জামান সোহাগ
comment ৩৫  favorite ১  import_contacts ১,৩৯২
এক
দিন পনের আগে, এক সন্ধ্যায়, হঠাৎ করেই ইরফানের মুখোশটা টুপ করে খসে পড়েছিল তন্দ্রার সামনে। অথচ তার আগে তন্দ্রা বুঝতেই পারে নি ইরফান একটা কাক, দিব্যি ময়ূর সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার সাথে সাথে, খুঁটে খুঁটে খেয়ে বেড়াচ্ছে এটা ওটা। এখন ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে। ভালোবাসার মানুষের কাছে কত ধরনের আবদার থাকে মানুষের। তাই বলে এই রকম! তন্দ্রাও একটা বোকা মেয়ে। তা না হলে দুনিয়ায় এত মানুষ থাকতে এমন কাউকে সে কেন ভালোবাসতে যাবে যে তাকে নগ্ন হয়ে দাঁড়াতে বলতে পারে ক্যামেরার সামনে। আবার গর্ব করে বলে কি না, ডকুমেন্টারি বানাবে! উফ, ভাবলেও গা গুলিয়ে ওঠে। সেদিন ও-কথা শোনার পর যেভাবে সে ইরফানকে ফেলে চলে এসেছিল, তাতে তো ধরেই নিয়েছিল তন্দ্রা, এই জীবনে সে আর তার সামনে এসে দাঁড়াবে না কোনদিন। কিন্তু না, তন্দ্রা ভুল ভেবেছিল। সেই ইরফান এসে দাঁড়াল আবারও তার সামনে।
অফিস থেকে বের হয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর তন্দ্রা দেখতে পেল খয়েরি রঙের এফ প্রিমিও গাড়িটা অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার বামপাশ ঘেঁষে। অভ্যাসবশতঃ নম্বরপ্লেটটার দিকে চোখ চলে গেল তন্দ্রার। অনেকদিন ধরে দেখতে দেখতে গাড়ির নম্বরটা এক প্রকার মুখস্তই হয়ে গেছে তার। ইরফানের গাড়ি। একটু লম্বা পায়ে হেঁটে গাড়িটা পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল তন্দ্রা ফুটপাথ ধরে, তখনই গাড়ির সামনের দিককার বামপাশের কাচটা নিচে নেমে গেল সরসর করে। ইরফান ড্রাইভিং সিট থেকে গলা বাড়িয়ে বললো, ‘উঠে এসো, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসি।’
তন্দ্রা হাঁটার গতি বাড়াল। ইরফানও গাড়ি নিয়ে এগোতে লাগল তার পাশাপাশি। কিছুটা এগোনোর পর ফের তাড়া দিল সে, ‘কি হলো? উঠে এসো। জরুরী কথা আছে।’
তন্দ্রার অফিস ছুটি হয়েছে ছ’টায়। অন্যান্য সহকর্মীরা তার আগেই অফিস ছেড়েছে। তারপরও একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল পিছনে, অফিসের কেউ পড়ে রয়েছে কিনা দেখার জন্য। তেমন কাউকে চোখে পড়ল না। তবে দেখতে পেল আশেপাশের মানুষ কৌতূহল নিয়ে তাকাচ্ছে তার দিকে, তাকাচ্ছে চকচকে গাড়িটার দিকে। একবার ভাবল ইরফানের কোন কথায় কান পাতবে না সে আজ, একটা রিকশা নিয়ে হুড উঠিয়ে সোজা চলে যাবে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত, সেখান থেকে উঠে পড়বে যেকোন একটা গাড়িতে। কিন্তু পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদলাল। ইরফানকে চেনে সে বছর দেড়েক ধরে। আর চেনে বলেই জানে সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র সে নয়। হয়তো রাস্তার মাঝখানেই একটা সিন-ক্রিয়েট করে বসবে। বাধ্য হয়ে তাই গাড়ির দরজার হাতলে হাত রাখল তন্দ্রা, দরজা খুলে বসল ইরফানের পাশে। ইরফান এক্সিলেটরে চাপ দিল, গাড়ি চলতে শুরু করল গুড়গুড়িয়ে।
‘এসবের মানে কি?’ ইরফানের দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল তন্দ্রা। গলায় ঝাঁজ ঢেলে বললো, ‘আমাকে তুমি মাস্কট প্লাজার সামনে নামিয়ে দাও। আর ভুলেও আমার পিছু নিও না।’
ইরফান মুখে কিছু বললো না, শব্দ করে হাসল একটু। সিডি প্লেয়ারটা অন করল, লো ভলিয়্যুমে একটা ইংরেজি গান বাজতে লাগল। গাড়ি ছুটতে লাগল উত্তর দিকে। তন্দ্রা বুঝতে পারছিল একটু বাদে বাদেই ইরফান আড়চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে। এমন একটা ভাব করছে যেন সবকিছুই স্বাভাবিক রয়েছে, সে-রকম কিছুই ঘটে নি সেদিন দিয়াবাড়ীতে গিয়ে। তন্দ্রা লম্বা শ্বাস ফেলল। সামনেই ১১ নং চৌরাস্তা। সেখান থেকে ডানে ঘুরলে মাস্কট প্লাজা। সব মিলিয়ে দশ মিনিট। কিছু করার নেই, এই সময়টুকু সহ্য করতেই হবে ইরফানকে। তন্দ্রা টানটান হয়ে বসে রইল সিটের উপর।
‘মুখটা ওরকম কাঠকাঠ করে রেখেছো কেন? রিল্যাক্স হয়ে বসো।’ ইরফান বললো।
শুনে সারা শরীর জ্বলে উঠল তন্দ্রার। আড়চোখে একবার ইরফানের দিকে তাকাল সে। তারপর কাচ গ’লে তাকাল সন্ধ্যে নামতে থাকা রাজপথের দিকে। গাড়ি ১১ নং চৌরাস্তা পার হলো, কিন্তু ডানে মোড় নিল না, সোজা চলতে লাগল জোরের উপর। ইরফানের মতিগতি ঠিক ভালো ঠেকছিল না তন্দ্রার কাছে। তাই শশব্যস্ত হয়ে জানতে চাইল, ‘কি হলো, কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?’
ইরফান মিষ্টি করে হাসল। বললো, ‘চলো, একটু আশুলিয়ার ঐ দিকটাতে যাই।’ বাম হাত দিয়ে তন্দ্রার ডান হাত ধরতে চাইল ইরফান, সেটা টের পেয়ে দ্রুত হাত সরিয়ে নিল তন্দ্রা। বললো, ‘না, না। মা’র শরীরটা ভালো না। আমাকে বাসায় যেতে হবে। তুমি এখানেই আমাকে নামিয়ে দাও। এক্ষুণি।’
ইরফান গাড়ির গতি বাড়াল। বললো, ‘তন্দ্রা, তোমার মনে আছে? তোমাকে নিয়ে প্রথম যেদিন বের হয়েছিলাম, সেদিন আমরা কোথায় গিয়েছিলাম?’
তন্দ্রা কোন কথা বললো না। বছর দেড়েক আগে ইরফানের সাথে তার প্রথম আলাপ হয়েছিল। সেদিন এমডি সাহেব অফিসে আসেন নি। দুপুর আড়াইটে-তিনটের দিকে হঠাৎ তিনি ফোন দিয়েছিলেন তন্দ্রাকে, বলেছিলেন, ‘আমি অন দ্য ওয়ে, অফিসে আসছি। রাস্তায় জ্যাম, একটু দেরী হবে আমার পৌঁছাতে। আমার একজন স্পেশাল গেস্ট যাচ্ছেন অফিসে, আমার রুমে তাকে বসতে দেবেন। আমি না আসা পর্যন্ত তাকে একটু টেক কেয়ার করবেন।’
জ্বি স্যার বলে ফোনটা রাখতে রাখতেই তন্দ্রা দেখতে পেয়েছিল কাচের পাল্লা ঠেলে অফিসে ঢুকছে কেউ একজন। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের মতো বয়স, ফর্সা গায়ের রং, লম্বা। লাল টি-শার্ট আর একটা হালকা নীল রঙের জিন্সের প্যান্ট পরা। মাথায় ঘন চুল, বাম পাশ থেকে সিঁথি করা, কপালের পুরোটা ঢাকা নেমে আসা কালো চুলে। আগন্তুক এসে দাঁড়িয়েছিল তন্দ্রার সামনে, নিজের একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে এগিয়ে দিয়েছিল। ইরফান মাহমুদ। কার্ডে লেখা নামটা পড়েই তন্দ্রা বুঝতে পেরেছিল উনার কথাই ফোনে বলছিলেন এমডি সাহেব।
এমডি সাহেবের পিএস হিসাবে কাজ করে তন্দ্রা। সেদিন নির্দেশমতো ইরফানকে নিয়ে বসিয়েছিল সে এমডি সাহেবের কামরায়। কফি এগিয়ে দিয়েছিল। টুকটাক কথাও হয়েছিল ইরফানের সাথে। কিন্তু সেদিন সে এক মুহূর্তের জন্যেও ভাবেনি, ভাবতে পারেনি এই মানুষটার সাথে একদিন সে এভাবে জড়িয়ে যাবে!
এমডি সাহেবের এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা। সে সময় তার মাথায় একটা শখ চেপেছিল, তিনি ফিল্ম প্রযোজনা করবেন। ইরফান ফিল্ম জগতের মানুষ, ভালো জানাশোনা রয়েছে তার। খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য তাকে অফিসে আসতে বলেছিলেন তিনি। সেদিন ইরফানের সাথে দীর্ঘক্ষণ আলাপ করেছিলেন এমডি সাহেব।
তারপর থেকে তিন-চার মাস প্রতি সপ্তাহে দু-তিনদিন আসত ইরফান তন্দ্রাদের অফিসে। কিন্তু আলোচনা বোধ হয় খুব একটা এগোয় নি। কারণ, এমডি সাহেব ফিল্মে ইনভেস্ট করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছিলেন। কিন্তু তবুও ইরফান আসত ওদের অফিসে। এমডি সাহেব যখন দেশের বাইরে থাকতেন তখনও আসত। আর সে এলেই তন্দ্রাকে সময় দিতে হতো। এমডি সাহেবের তরফ থেকে সেভাবেই নির্দেশ দেওয়া ছিল। তাছাড়া প্রায়ই ইরফান ফোন করত তন্দ্রার অফিসে পিএবিএক্স নম্বরে, এক্সটেনসন চেয়ে নিয়ে কথা বলত ওর সাথে।
সেই দিনটার কথা মনে পড়ল তন্দ্রার। ঘড়িতে পাঁচটার মতো বাজে। এমডি সাহেব অফিসে ছিলেন না। সে-কারণে একটু আগেভাগে অফিস থেকে বের হবে বলে তৈরি হচ্ছিল তন্দ্রা। এমন সময় ইরফান এসে হাজির। এমডি সাহেব অফিসে নেই, সেও বেরিয়ে যাচ্ছে শুনে চটজলদি বলেছিল সে তন্দ্রাকে, ‘টঙ্গির ওদিকে যাব আমি একটা কাজে। আপনি আমার সঙ্গে যেতে পারেন, আপনাকে স্টেশনরোডে নামিয়ে দিয়ে যাব। আপনার বাসা তো স্টেশনরোড তাই না?’
‘না, না। শুধু শুধু আপনি কেন আবার! আমি একাই চলে যাব।’ বলেছিল তন্দ্রা। কিন্তু ইরফানকে মানাতে পারে নি। ইরফান ওকে পাশে বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছিল, সোজা নিয়ে গিয়েছিল আশুলিয়ায়। তখন সবে শরৎকাল শুরু হয়েছে, রাস্তার দু’পাশে নিচু ভূমিতে জলের অবিরাম মাতামাতি। আগে কখনো এদিকটায় আসে নি তন্দ্রা। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ফুটে থাকা সাদা সাদা কাশফুলের দিকে তাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল। সে মুগ্ধতা আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল ইরফান, ভীষণ অবাক করা গলায় তন্দ্রাকে বলেছিল, ‘আজ আমি আপনার এমডি স্যারের কাছে যাইনি। গিয়েছিলাম আপনার কাছে। ইনফ্যাক্ট, মাঝে মাঝে আমি আপনার কাছেই যাই।’
বড় লোকের ছেলে ইরফান। এমবিএ করেছে। ছুটছে প্যাশনের পিছনে। তার প্যাশন একটাই। শর্ট ফিল্ম বানানো, ডকুমেন্টারি বানানো। সে স্বপ্ন দেখে, অনেক বড় স্বপ্ন। তার তৈরি করা চলচ্চিত্র মানুষের কথা বলবে। গোটা পৃথিবীর মানুষ মুগ্ধ হয়ে দেখবে তার বানানো চলচ্চিত্র। একদিন তার নাম ঘুরবে সারা দুনিয়ার মানুষের মুখে মুখে। সেই শরতের সন্ধ্যায়, প্রায় ডুবতে বসা সূর্যের কমলা-রঙা আভায় উজ্জ্বল ইরফানের চোখদুটো সেদিন এমন ভাবে তাকিয়ে ছিল দূর পশ্চিম দিগন্তে, যেন সে দেখতে পাচ্ছিল দিগন্তের ওপাশটাও, যেখানে আকাশ মিশেছে গিয়ে গাছেদের মাথায়। আর তার দু’চোখের স্বপ্নগুলো প্রতি মুহূর্তে সঞ্চারিত হচ্ছিল তন্দ্রার চোখ দু’টোয়।
সেই একদিনই। তারপরে আর কখনো আশুলিয়ার ঐদিকে যায় নি ওরা। এতদিন পরে যাচ্ছে আজ আবার। অফিস থেকে বের হওয়ার সময়ও তন্দ্রা ভাবতে পারে নি ইরফান এভাবে পথে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর মাঝপথ থেকে তাকে ধরে নিয়ে আসবে এ দিকটায়। গাড়ি ছুটছে এখন হাইওয়ে ধরে। তন্দ্রা এক মনে ভাবছে। সেই প্রথমদিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় যদি ইরফানের সঙ্গে সে না যেত আশুলিয়ায় তবে কেমন হতো তার জীবনটা? তার জীবনে কি ইরফানের কোন অস্তিত্ব তৈরি হতো? দেড় বছরে যতটুকু কাছে এসেছিল ইরফান, চোখের পলকে তার চেয়ে বেশি দূরে কি তাকে ঠেলে দেয় নি তন্দ্রা সেদিন সন্ধ্যায়? সেদিন সন্ধ্যার কথা মনে হতেই আবার মুখ-চোখ শক্ত হয়ে গেল তন্দ্রার। কিভাবে ইরফান তাকে এই প্রস্তাবটা দিল!
অফিসের পর তন্দ্রাকে সেদিন কেএফসিতে আসতে বলেছিল ইরফান। আর সে ওখানে থাকবে আগে থেকেই। সেই মোতাবেক সাড়ে ছ’টার দিকে কেএফসিতে পৌঁছেছিল তন্দ্রা। দু’জনে মিলে হালকা কিছু খেয়েছিল। তারপর ইরফান বলেছিল, ‘চলো, দিয়াবাড়ীর ওই দিকটাতে যাই আজ।’
দিয়াবাড়ীতে আগে কখনো যায় নি তন্দ্রা। শুনেছে জায়গাটা নাকি খুব সুন্দর। নিরিবিলি। কিন্তু সন্ধ্যের পর ওদিকটাতে যেতে তার মন সায় দিচ্ছিল না। তবুও গিয়েছিল ইরফানের জোরাজুরিতে। সেখানেই প্রস্তাবটা দিয়েছিল ইরফান। কথাটা শুরু করেছিল একটু অন্যভাবে। বলেছিল, ‘একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানাব ভাবছি। পতিতাদের নিয়ে।’
পপকর্ন চিবোতে চিবোতে বলেছিল তন্দ্রা, ‘বেশ তো। কে কে থাকছে তোমার সে ফিল্মে? মানে নায়ক-নায়িকা কারা?’
‘প্রধান পুরুষ চরিত্রে কাকে নেব এখনও ঠিক করিনি। তবে তুমি থাকছ, প্রধান নারী চরিত্রে। নায়িকাও বলতে পারো।’ বলে তাকিয়েছিল তন্দ্রার দিকে। মুখে হাসি।
‘ধ্যাৎ। খালি ফাজলামো।’ পপকর্ন গালে পুরে বলেছিল তন্দ্রা, ইরফানের গায়ের উপর হেলান দিয়ে।
‘নোপ। আই অ্যাম কোয়াইট সিরিয়াস।’ বলেছিল ইরফান।
প্রথমটাতে যখন ইরফান কথাটা বলেছিল তখন আসলেই বিশ্বাস করেনি তন্দ্রা। কিন্তু যখন সে কথাটা রিপিট করেছিল তখন ভীষণ চমকে উঠেছিল, ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘এই ইরফান, কি বলছো? তোমার মাথাটাথা ঠিক আছে?’
তন্দ্রার হাত ধরেছিল ইরফান, ‘সত্যি বলছি। তোমাকেই কাস্ট করব ঠিক করেছি।’
‘কেন, আমাকে কেন?’ কিছুতেই বিস্ময়ের ঘোর কেটে বের হতে পারছিল না তন্দ্রা।
‘আসলে যে ধরনের স্ক্রিপ্ট তাতে তোমাকেই ভালো মানাবে। তোমার ফেসে একটা ন্যাচারাল ব্যাপার আছে, একটা ইনোসেন্স আছে, আমি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারব না, আমি সেটাকেই কাজে লাগাতে চাই। তুমি করবে না?’ একটু আকুতির মতো শোনা গিয়েছিল ইরফানের শেষের কথাটা।
তন্দ্রা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না কি বলা উচিৎ। কিছু একটা বলতে হয় তাই বলেছিল, ‘অনেক নায়িকা তুমি পাবে যাদের মুখে ন্যাচারাল ব্যাপার আছে। আমাকে মাফ করে দাও।’
‘আমি একটা নতুন মুখ খুঁজছি। জানো তন্দ্রা, ফ্রেশ মুখ হলে ব্যাপারটা ফুটবে ভালো। তাছাড়া সবাই চরিত্রটা করতে রাজি হবে না। রাজি হলেও অনেক ডিম্যান্ড করবে।’
ইরফানের এ কথা শুনে আরও চমকে উঠেছিল তন্দ্রা, ‘কেন, রাজি হবে না কেন? আর বেশি টাকাই বা চাইবে কেন?’
‘কিছু খোলামেলা দৃশ্য থাকবে এটাতে, কয়েকটা বেড-সিন।’ বলেছিল ইরফান, অন্য দিকে তাকিয়ে।
তন্দ্রা ফুরিয়ে যাওয়া পপকর্নের ঠোঙাটা দূরে ছুড়ে ফেলেছিল। তারপর এক ঝটকায় ইরফানের কাছ থেকে হাতটা টেনে নিয়েছিল। ইরফান হাতটা ধরার চেষ্টা করেছিল আবার, কিন্তু পারে নি। শেষমেষ তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলেছিল, ‘তুমি না করো না, প্লিজ।’
‘তোমার ভালোবাসার মানুষকে তুমি এইভাবে উপস্থাপন করতে পারবে? এই তোমার রুচি?’ গলা চড়িয়ে বলেছিল তন্দ্রা।
জোর করে তন্দ্রার হাত ধরেছিল ইরফান, বলেছিল, ‘তুমি ব্যাপারটাকে এভাবে নিও না, প্লিজ। তুমি আমার প্যাশনটাকে অন্তত রেসপেক্ট করো।’
‘তোমার প্রেমিকাকে দিয়ে তুমি পর্নো মুভি তৈরি করবে, লাখ-লাখ মানুষকে তা দেখাবে, আর তুমি বলবে এটা তোমার প্যাশন?’
‘খুব বেশি না, মাত্র দু’তিনটে দৃশ্য।’ বলেছিল ইরফান।
তিনটে শব্দই শুধু বের হয়েছিল তন্দ্রার মুখ দিয়ে। ‘জাস্ট শাট আপ।’ বলেই আর দাঁড়ায় নি সে। হাঁটতে শুরু করে দিয়েছিল। কিছু দূর গিয়ে একটা রিকশা নিয়ে নিয়েছিল, একবারও পিছন ফিরে তাকায় নি আর।
তারপরে এই পনের দিন আর নিজের মুখ দেখায় নি ইরফান। ফোনও করে নি। তন্দ্রাও আর তাকে ফোন-টোন দেয় নি। ভেবেছিল ইরফান আর আসবে না তার সামনে। কিন্তু আজ! অফিস থেকে বেরিয়েই দেখল গাড়ি নিয়ে বসে রয়েছে ইরফান। তারপর তো এক প্রকার জবরদস্তি করেই তাকে ধরে নিয়ে এলো এখানে। আশুলিয়ায়।
রাস্তার একপাশে গাড়ি দাঁড় করাল ইরফান। দরজা খুলে নেমে এলো তন্দ্রা, গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো পশ্চিম দিকে মুখ করে। সূর্য ডুবে গেছে। কিন্তু এখনও হালকা কমলা রঙের বিভা ছড়িয়ে রয়েছে পশ্চিম আকাশে। আগেরবার যখন এখানে এসেছিল তন্দ্রারা তখন রাস্তার দু’পাশে পানি থই থই করছিল। অথচ এখন! দু’পাশে যতদুর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ, বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা জুড়ে শুধু ধানক্ষেত। তন্দ্রার পাশে এসে দাঁড়াল ইরফান, ‘কি খাবে? ফুচকা না চটপটি?’
‘আমাকে বাসায় যেতে হবে। মা’র জন্য ওষুধ কিনে নিয়ে যেতে হবে।’ বললো তন্দ্রা।
‘আমি তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসব।’ বললো ইরফান। একটু বাদে একপ্লেট ফুচকা নিয়ে এসে তুলে দিল তন্দ্রার হাতে। খাওয়া-দাওয়া সারল তারা একপ্রকার নিঃশব্দেই। এরপরই আগের দিনের প্রসঙ্গটা তুলল ইরফান। বললো, ‘তুমি কি ব্যাপারটা আর একবার ভেবে দেখবে?’
জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল তন্দ্রা তার দিকে। সে দৃষ্টি পড়ে নিয়ে বললো ইরফান, ‘ঐ যে, আগের দিন বলেছিলাম, ডকুমেন্টারিতে অভিনয় করার ব্যাপারটা।’
‘এই তোমার জরুরী কথা? এই কথা বলার জন্য আমাকে এখানে নিয়ে এসেছো? যদি তাই হয়, তবে স্পষ্ট শুনে রাখো। কখনোই না।’ বললো তন্দ্রা।
‘ঠিক আছে, তোমার যা ইচ্ছে।’ বললো ইরফান। তারপর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, ‘চলো, তোমাকে ছেড়ে আসি।’
মনে মনে এই সময়টার অপেক্ষায় ছিল তন্দ্রা। ইরফান বলা মাত্রই গাড়িতে গিয়ে বসল সে। ইরফান গাড়ি স্টার্ট দিল। কিছুটা পথ যাওয়ার পর বললো, ‘তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।’ তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, তারপর তার মোবাইলটা এগিয়ে দিতে দিতে বললো, ‘ভিডিও ফোল্ডারে যাও। তোমার একটা ভিডিও আছে।’
তন্দ্রা মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না। তবুও মোবাইলটা হাতে নিয়ে ভিডিও ফোল্ডারে ঢুকল। একটাই ভিডিও ক্লিপস আছে সেখানে। ভিডিওটা প্লে করতেই নিজেকে দেখতে পেল সে, আরও কিছুদূর এগোতেই সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে। মাস তিনেক আগে এক ছুটির দিনে পূবাইলের ওদিকে একটা রিসোর্টে বেড়াতে গিয়েছিল সে ইরফানের সাথে। সেখানে নির্জনে একটি ঘরে তারা দুজন... আর ভাবতে পারছিল না তন্দ্রা। সেটাই ভিডিও করে রেখেছে ইরফান! এতটা নীচ আর জঘন্য সে! তাড়াতাড়ি ডিলিট বাটনটাতে চাপ দিল তন্দ্রা, ফাইলটা মুছে মোবাইলটা ছুড়ে দিল সে ইরফানের দিকে।
সেটা দেখে শব্দ করে হেসে উঠল ইরফান। বললো, ‘মুছে ফেলেছো? বেশ করেছো। কিন্তু এটার একটা কপি যে আমার কম্পিউটারেও রয়েছে!’ বলে আবার হাসল।
গাড়ি ছুটছিল ইজতেমা ময়দানের পাশ দিয়ে, গিয়ে উঠবে ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়েতে। নিয়ন বাতির আবছা আলো ঢুকে পড়ছিল গাড়ির ভিতরে। সে আলোয় ইরফানকে ভীষণ অচেনা লাগছিল তন্দ্রার। চুপ করে বসে ছিল সে, কোন কথা বলার শক্তিই যেন তার দেহে আর অবশিষ্ট ছিল না। একটা অজানা ভয় গ্রাস করছিল তাকে, যতই সময় যাচ্ছিল ভয়ের মাত্রাটা ক্রমশ বাড়ছিল। আর কি এক অজানা আশঙ্কায় ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠছিল সে। তার বুকের ভিতরটা মনে হচ্ছিল একদম ফাঁকা। শুধু শূন্যতা আর শূন্যতা সেখানে!
স্টেশনরোডের ওভার-ব্রীজটা চোখের সীমানায় এলে তন্দ্রা ইরফানকে বললো নামিয়ে দিতে। গাড়ি বামে চাপিয়ে ব্রেক চাপল ইরফান, তারপর তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বললো, ‘এক সপ্তাহ সময় দিলাম। আমার প্রস্তাবটা ভেবে দেখো। রাজি হলে ভালো। না হলে তোমার ভিডিওটা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেব।’
তন্দ্রা নিচে নেমে দরজা ঠেলে দিতেই চলে গেল গাড়িটা। তন্দ্রা কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। যেন তার দু’পায়ে শিকড় গজিয়েছে! তার পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে শত শত মানুষ, রিকশা, প্রাইভেট কার, সিটি সার্ভিস বাস। অথচ সে নির্বিকার, দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। যেন তার কোথাও যাওয়ার নেই!
বেশ কিছুক্ষণ পরে হাঁটতে শুরু করল তন্দ্রা। হাতব্যাগের মধ্যে হাতড়ে খুঁজে ফিরল মায়ের প্রেসক্রিপশনটা। পেল না। নিয়ন লাইটের নিচে মেলে ধরল হাতব্যাগটা, তারপরেই পেল সেটা। আলুথালু পায়ে হেঁটে গেল সে ফার্মেসীটার দিকে। ওখান থেকেই মায়ের প্রতিমাসের ঔষধ কেনে সে। প্রেসক্রিপশনটা বাড়িয়ে দিতেই দোকানদার তাকাল তন্দ্রার দিকে। তন্দ্রা চোখ নামিয়ে নিল, তার দিকে তাকাতেও যেন সংকোচ হচ্ছিল তার। ‘আপা, কয়দিনের ওষুদ দিমু?’ জানতে চাইল দোকানদার।
‘একমাসের দেন।’ কোন মতে বললো তন্দ্রা।
গত দু’তিনদিন ঔষধ খায় নি মা। ঔষধ ফুরিয়েছে সে কথা বলেওনি তাকে। ইরফানের সঙ্গে আগের দিন বাদানুবাদ হওয়ার পর থেকে সেও কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল, ভুলে গিয়েছিল মায়ের ঔষধের কথা। বাতের ব্যথাটা তাই বেড়েছে আবার। ব্যথার ঔষধ নিতে হবে। নিতে হবে ঘুমের ঔষধও। প্রতিদিন রাতে একটা ঘুমের ঔষধ খেলেই যা একটু ঘুমাতে পারে মা।
ঔষধ হাতব্যাগে ঢুকিয়ে দাম মেটাল তন্দ্রা। তারপর হাঁটতে শুরু করল ফুটপাথ ধরে। এখান থেকে হেঁটে গেলে পাঁচ-সাত মিনিট লাগবে বাসায় পৌঁছাতে। তন্দ্রা হাঁটছিল। তার কেবলই মনে হচ্ছিল বহুদিন ধরে সে হাঁটছে, হেঁটেই চলেছে এ পথ ধরে। তার মনে হচ্ছিল, এ পথচলা চলবে অনন্ত কাল ধরে। ইরফানের কথা মনে হতেই শব্দ করে একদলা থুথু ফেলল তন্দ্রা। এত নীচ কোন মানুষ হতে পারে! নিজের উপরও রাগ হচ্ছিল তন্দ্রার। কেন সে সেদিন প্রশ্রয় দিয়েছিল ইরফানকে? কেন সে তাকে রুখতে পারে নি সেদিন?
কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিল মা। তন্দ্রাকে দেখেই বলে উঠল, ‘তোর ভাইয়া এসেছিল। এই তো বেরিয়ে গেল। তোর সাথে দেখা হয়েছে?’
তন্দ্রা মাথা নাড়ল।
মা বললো, ‘এত দেরী হলো যে আসতে! তোর ভাইয়া অনেক রাগ করল এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকিস শুনে। আমিও শুনিয়ে দিয়েছি দু’কথা। বলে দিয়েছি, তুমি তো বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়েছো, আমাদের এত কিছু নিয়ে আর ভাবতে এসো না। ঠিক করেছি না?’
তন্দ্রা মাথা নাড়ল। বাবা টিভিতে সংবাদ দেখছিল, গলা তুলে বললো, ‘তুমিও না! মেয়েটা খেটে-খুটে এলো কই তাকে আগে ভিতরে ঢুকতে দেবে, তা না রাজ্যের...।’ কথা শেষ করল না বাবা। তবে মা চুপ করে গেল।
তন্দ্রা ঘরে ঢুকল। ছোটবোন তন্বীর এইচএসসি পরীক্ষা সামনে, পড়ছে জোরে জোরে। তন্দ্রাকে ঢুকতে দেখে একটুখানি চোখ তুলে তাকাল, তারপর আবার মনোনিবেশ করল বইয়ে। ব্যাগটা আলনার কোণায় ঝুলিয়ে রেখে বসল তন্দ্রা খাটের উপর। তারপর গড়িয়ে পড়ল বিছানায়। একটুবাদে পাশ ফিরে শুলো, তাকিয়ে থাকল দেয়ালের দিকে। আর ঠিক তখনই মোবাইলটা বেজে উঠল। উঠে গিয়ে সেটা কানে ধরতেই তন্দ্রা শুনতে পেল এমডি সাহেবের গলা। তিনি বললেন, ‘ইরফান সাহেবের কথা মতো চললেই আপনি ভালো করবেন।’

দুই
রাতে কিছু খায় নি তন্দ্রা। শুয়ে পড়েছিল সাড়ে দশটার দিকে। ঘুম আসছিল না কিছুতেই, তবুও চোখ বুজে পড়ে ছিল বিছানায়। তন্বী শুতে এলো সাড়ে এগারোটার দিকে। একটু বাদেই তার ভারী নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল তন্দ্রা।
এলোমেলো অনেক ভাবনা ভীড় করছিল মাথার মধ্যে। কিন্তু ভেবে কোন কূল-কিনারা করতে পারছিল না তন্দ্রা, পৌঁছাতে পারছিল না কোন স্থির সিদ্ধান্তে। মাঝখান থেকে ভয় নামের অক্টোপাসটা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছিল আরও শক্ত করে।
কি করবে এখন সে! ইরফানের কথা মতো চলবে? অসম্ভব! এটা সে কিছুতেই করতে পারবে না। মুখে বলছে সে ডকুমেন্টারি বানাবে, দু-একটা খোলামেলা দৃশ্য থাকবে। কিন্তু পরে দেখা যাবে চাপ দিয়ে তাকে দিয়ে একটা রগরগে নীলছবিই বানিয়ে নিয়েছে সে। যে লোক প্রেমিকার সঙ্গে কাটানো একান্ত অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো ভিডিও করে রাখতে পারে প্রেমিকার চোখকে ফাঁকি দিয়ে, তার পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। কিন্তু ইরফানের কথা না শুনলেও তো বিপদ! নগ্ন ভিডিওটা সে আপলোড করে দেবে ইন্টারনেটে। এসব জিনিস খুব দ্রুত ছড়ায়। রাতারাতি ছড়িয়ে যাবে তা সবখানে। লাখ-লাখ মানুষ তা দেখবে। এক সময় তার চেনা-পরিচিত মানুষদের চোখেও পড়বে। তার অফিসের সহকর্মীরা দেখবে। যাদেরকে সে এতদিন প্রশ্রয় দিত না, তারা এবার তাকে পেয়ে বসবে। তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করবে, রসিয়ে রসিয়ে শুনিয়ে শুনিয়ে বলবে দশ কথা। এ পাড়ার কয়েকটা ছেলে গলির মুখের কম্পিউটারের দোকানের সামনে আড্ডা দেয়। সারাদিন শুধু মোবাইলে এটা ওটা ভরে আর চার-মাথা এক জায়গায় করে দেখে। কারণে-অকারণে হাসাহাসি করে। মেয়েছেলে পাশ দিয়ে গেলে চোখ দিয়ে গেলে, বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি করে। ওদের মধ্যে একটা ছেলে তন্দ্রার পিছনে খুব লেগেছিল। একদিন তাকে খুব করে বকা দিয়েছিল সে। তারপর থেকে আর কাছে ঘেঁষে না। এক সময় হয়তো সে ছেলেটার হাতেও এসে পড়বে তার নগ্ন ভিডিওটা। তারপর যখন সে অফিসে যাবে কিংবা অফিস থেকে ফিরবে তখন বখাটে ছেলেগুলো দলবেঁধে সে ভিডিও দেখবে, নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করবে, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করবে, তন্দ্রার দরদাম জানতে চাইবে। তাদের কাছ থেকে ভিডিও ছড়িয়ে পড়বে মহল্লার আর সবার কাছে। সবাই দেখবে। এক সময় এ ভিডিওর কথা জেনে যাবে তন্বীও। মা-বাবারও জানতে বাকি থাকবে না এক সময়। ভাইয়া এমনিতেই তার চাকরি করাটাকে মন থেকে মেনে নিতে পারে না, মেনে নিতে পারে না সন্ধ্যার পরে বাড়ির বাইরে থাকা। এখন যদি এমন ভিডিওর খবর তার কানে যায়, তবে বাবা-মাকে সে যা তা বলে ভর্ৎসনা করবে, আর তার মুখে বিষের শিশি উপুড় করে ধরবে।
হঠাৎ করেই তন্দ্রার মনে হলো, তার এ জীবনটা বড় বেশি অপ্রয়োজনীয়। তার মনে হলো, তার এ বেঁচে থাকাটা নিদারুণ অপমানের।
উঠে বসল তন্দ্রা। অন্ধকারে নিঃশব্দে বের হলো ঘর থেকে, তারপর পা টিপে টিপে ঢুকল মা’র ঘরে। নাক-ডাকার শব্দ আসছে বাবার। তার পাশেই ঘুমের ঔষধ খেয়ে নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে মা। মোবাইলের আলো জ্বেলে ঔষধের কৌটা থেকে মা’র ঘুমের ঔষধের পাতা তিনটে নিয়ে বেরিয়ে এলো তন্দ্রা। বসল বসার ঘরে। একটা ঔষধ খেয়েছে মা আজ রাতে। আরও রয়েছে ঊনত্রিশটা। সোফার পাশে ছোট্ট টেবিলটার উপর রাখা কাচের জগ থেকে পানি ঢালল গ্লাসে। তারপর ঘুমের বড়ি গুলো একটার পর একটা খোসা ছাড়াতে লাগল, জমাতে লাগল হাতের তালুতে। হঠাৎ কেন কে জানে, তন্দ্রার মনে পড়ে গেল, খুব ছোটবেলায় তারা একবার দাদুবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। আরও মনে পড়ল, দাদুবাড়ির ঠিক পাশেই ছিল বড় একটা পুকুর, আর সে পুকুরের টলটলে জল ছাওয়া ছিল ঘন কচুরিপানায়। তারা যখন গ্রামে ছিল, তখন একদিন পুকুরটা পরিষ্কার করার জন্য কচুরিপানাগুলো তুলে জড়ো করে রাখা হয়েছিল পুকুর-পাড়ে। তার উপর দিয়ে পুরো এক বেলা খুব দৌড়াদৌড়ি করেছিল তন্দ্রা-তন্বীরা। কচুরিপানার উপর দিয়ে হাঁটার সময় কচুরির পটকাগুলো ফাটছিল একটার পর একটা, পটপট শব্দ করে। বহুদিন বাদে, বহুদূর থেকে সেই পটপট শব্দটাই যেন ভেসে আসছিল তন্দ্রার কানে, ঔষধের খোসা ছাড়ানোর সময়। তন্দ্রা সে শব্দগুলো গুনছিল এক ঘর অন্ধকারে ডুবে থেকে। তের, চৌদ্দ, পনের।...
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন