বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ এপ্রিল ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ৭টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৩৭

বিচারক স্কোরঃ ২.২৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.০৮ / ৩.০

বৃষ্টির সাথে..

ব্যথা জানুয়ারী ২০১৫

সরীসৃপ

বিজয় ডিসেম্বর ২০১৪

অলীক সুখ

অসহায়ত্ব আগস্ট ২০১৪

দুঃখ (অক্টোবর ২০১৫)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৩৭ হাসনুহানার গন্ধ

সুগত সরকার
comment ৮  favorite ০  import_contacts ৩৩২
সুলোচনা সমুদ্রের ধারে বসে আনমনা হয়ে ঢেউ এর পর ঢেউ দেখছে।একটানা ঢেউ দেখতে দেখতে কেমন যেন একটা নেশা হয়ে যায়। ওর গায়ের পাতলা চাদর ওর গা থেকে খুলে বালিতে লুটোচ্ছে।পড়ন্ত বিকেলের লাল আভা এসে পড়েছে স্থির মুখটায়।
সুলোচনা একদৃষ্টিতে ঢেউ দেখছে।সুলোচনার বয়স প্রায় ষাটোর্ধ।পাতলা ছিপ ছিপে চেহারা।কপালে বার্ধক্যজনিত বলিরেখা। চোখ দুটি ভীষণ রকম শান্ত এবং নিষ্প্রভ। পড়নে সাদা শাড়ি।তার উপর একটা হাল্কা রঙের পাতলা তসরের চাদর। তার অন্যান্য গুরুভাই ও বোনেরা এদিক সেদিক বেড়াতে ব্যস্ত। কিন্তু সুলোচনা ভীষণ ক্লান্ত তাই ওর বেড়াতে যাবার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। তার চেয়ে সমুদ্র উপভোগ করাই ওর বেশী ভাল মনে হয়েছে। সমুদ্র বরাবরই তার একটা কৌতূহলের বিষয়। অগাধ জলরাশি, বিশাল আকার, সারাদিন ঢেউ আর ঢেউ। কত উত্থান, কত পতন তবু কি দুর্নিবার জীবনীশক্তি।একবারের জন্যও ভেঙে পড়ে না। একবারের জন্যও ক্লান্ত হয় না।
সুলোচনা এর আগেও পুরী এসেছে।তখন তার স্বামী অনিন্দ্য বেঁচে ছিল। তা প্রায় বছর ত্রিশ আগের কথা।তখন পুরী শহরটা এতটা জমজমাট ছিল না।এত লজ, জমাটি বাজার, এত সাজানো গোছান রাস্তা, এত এত দোকানপাট...... মনে আছে সেবার তারা এসে উঠেছিল ভারত সেবাশ্রমে। সমুদ্রের আশপাশটা ছিল প্রায় ফাঁকা। যত আশ্রম,পান্থনিবাস, অতিথিশালা কিংবা হলিডে হোম তার প্রায় সবই ছিল জগন্নাথ মন্দিরের আশেপাশে । হেঁটে হেঁটে আসতে হত সমুদ্র দর্শনে। সন্ধ্যের আগেই ফাঁকা হয়ে যেত সমুদ্রতট। বাবাই তখন অনেক ছোট। সমুদ্র দেখে ওর যে কি আনন্দ হয়েছিল... সমুদ্রের জল যখন ওর পা ভিজিয়ে ফিরে যাচ্ছিল, ওর চোখ দুটো আনন্দে কেমন চকচক করে উঠছিল। মনে আছে সেবার পুরী থেকে ফেরার আগের দিন বাবাই-এর সেকি কান্না। সে অনিন্দ্যকে জিজ্ঞেস করেছিল ‘ বাবা আমরা আবার কবে পুরী আসব?’ উত্তরে অনিন্দ্য বলেছিল “ বাবু তুমি হাতজোড় করে সমুদ্রদেবকে বল হে সমুদ্রদেব তুমি আবার আমাদের ডেকো,আমরা যেন আবার তোমার কাছে আসতে পারি। ” মনে আছে বাবাই হাতজোড় করে প্রার্থনা করেছিল।তার নরম তুলতুলে গাল বেয়ে ঝড়ে পড়ছিল ফোঁটা ফোঁটা চোখের জল। আসার আগে সে সমুদ্রের তটে বালিতে লিখে এসেছিল তার নাম সায়ন রায়... বেশ কিছুদিন হল বাবাই- এর কোন খবর নেই। শেষ চিঠিটা এসেছে ছ মাস আগে। তাতে লেখা ছিল গত নভেম্বরে সুলোচনার একমাত্র নাতনি ইশাবেলার পাঁচ বছর বয়স হল, সে রোজ রাতে শোবার আগে গ্র্যান্ডমম আর তার ইন্ডিয়ার গল্প শোনে।
স্বামী অনিন্দ্য মারা গেছে আজ প্রায় বছর দশেক হবে। সেই শেষবার বাবাই এসেছে এদেশে।তার কয়েক বছর পর একটা চিঠিতে সুলোচনা জানতে পারে সে জেসিকা নামে সে দেশেরই একটি মেয়েকে বিয়ে করে সেখানেই সেটেলড হয়ে গেছে। বড় একা হয়ে যায় সুলোচনা। কিন্তু সন্তান সুখে আছে এই ভেবে সে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়। আর খুব কষ্ট হলে চোখের জল দিয়ে ধুয়ে দেয় শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহের চরণ দু’খানি। এখন কৃষ্ণ সেবায় তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রত। শ্রীকৃষ্ণয় তার পরম আত্মীয়। তার পরম আরাধ্য।তার প্রিয় বন্ধু। তার একমাত্র কাছের মানুষ।
অনিন্দ্যর ডাক্তার হিসাবে একটা সুখ্যাতি ছিল। তাই পসারও ছিল বেশ ভাল। তাই অনিন্দ্য চলে গেলেও সুলোচনার জন্য যা রেখে গেছে তাতে তার মোটামুটি চলে যাওয়ার কথা। আর রেখে গেছে একটা বিশ্বস্ত বয়স্ক চাকর। যে সুলোচনার দেখভাল করে।
বাবাই বরাবরের ভাল স্টুডেন্ট। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক দুটোতেই স্টার।জেলার মধ্যে প্রথম। তারপর খড়গপুর আই আই টি থেকে পাশ করেই স্কলারশিপ পেয়ে পাড়ি দেয় ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেখানে পড়াশুনোর পাট চুকিয়ে একটা মোটা মাইনের চাকুরীও জোগাড় করে ফেলে। অনিন্দ্য বেশ কয়েকবার দেশে ফেরার কথা বললেও বিশেষ ফল হয়নি। এতগুলো বছরে সে মাত্র তিনবার এদেশে এসেছে। সাতদিনের বেশি অবশ্য কোনবারই থাকেনি। আসলে এদেশটাকে ও কোনদিনও সেভাবে ভালবাসতে পারেনি। ছোট থেকেই ওর ইচ্ছে ছিল বিলেত পাড়ি দেওয়ার। কি অসম্ভব সে ইচ্ছে শক্তির জোর ......
হঠাৎ অনেকগুলো শঙ্খ বিক্রেতার সম্মিলিত শঙ্খধ্বনির কোলাহলে সুলোচনার সম্বিৎ ফিরল।তার মনে পড়ে গেল গীতার প্রথম অধ্যায়ের কথা। যেখানে পাণ্ডব ও কৌরবদের মধ্যে যুদ্ধের প্রাক্কালে পিতামহ ভীষ্ম বাজিয়ে ছিলেন তাঁর সিংহ গর্জনের ধ্বনিযুক্ত শঙ্খ। ভগবান কৃষ্ণ বাজিয়ে ছিলেন ‘পাঞ্চজন্য’ শঙ্খ। অর্জুন, ভীম, যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব যথাক্রমে ‘দেবদত্ত’, ‘পউন’, ‘অনন্ত বিজয়’, ‘সুঘোষ’, ‘মনিপুষ্পক’ শঙ্খ বাজিয়ে ছিলেন এবং তাতে রণক্ষেত্রে অদ্ভুত এক কোলাহলের সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর মনে পড়ে গেল অর্জুনকে রণভূমিতে বলা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণী “ যে মানুষ সুখ, দুঃখ কোন কিছুতেই বিচলিত নয়। যে মানুষ ইন্দ্রিয় সুখের প্রতি আসক্ত নয়। যে একমনে শুধু আমার এবং আমার চিন্তা করে,তার নিশ্চিতরূপে মোক্ষ প্রাপ্তি হয়।”
মোক্ষ অর্থাৎ মুক্তি । সেই মোক্ষ লাভের জন্যই তো তাঁর এই ‘শ্রীক্ষেত্রে’ আসা। মহাপ্রভু জগন্নাথের কাছে সে চেয়ে নেবে মুক্তি। মুক্তি......শুধুই মুক্তি।মুক্তি এতদিন ধরে তিলতিল করে গড়ে তোলা সংসার থেকে। মুক্তি অনিন্দ্যর দেওয়া সমস্ত দায়-দায়িত্ব থেকে।মুক্তি সমস্ত কর্তব্য থেকে।মুক্তি সমস্ত আনন্দ ও দুঃখ থেকে। মুক্তি সমস্তরকম সম্পর্কের বাঁধন থেকে। মুক্তি সমস্তরকম পার্থিব সুখ থেকে। আর মুক্তি এই ইনটেস্টিনাল ক্যানসারের তীব্র যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীর থেকে।
হঠাৎ চারিদিকে তার প্রিয় হাসনুহানা ফুলের তীব্র গন্ধ পায় সুলোচনা। তার মনে পড়ে গেল ছেলেবেলায় বাড়ির উঠোনের এক কোনে লাগানো হাসনুহানা গাছটার কথা। সে তার পড়ার টেবিলের এক পাশে একটা কাজ করা মাটির সড়ায় সেগুলো সাজিয়ে রাখত। আর তার সুন্দর মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত সারা ঘরে। সে বুক ভরে দুবার শ্বাস নেয়। কিন্তু আশেপাশে কোথাও হাসনুহানা ফুল দেখতে পেল না সুলোচনা।
সি-বীচ রোড দিয়ে একদল মানুষ কাঁধে একটি শবদেহ নিয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে স্বর্গদ্বার মহাশ্মশানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সুলোচনা উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম করল।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন